সুখটান

মণীশ রায় | ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৫ ৯:১০ অপরাহ্ন

লোকটিকে কি আমি চিনি ?
রাস্তা দিয়ে চলতে গিয়ে কোনো নর-নারীর সঙ্গে চোখাচোখি হলেই স্বাভাবিক এই প্রশ্নটি চলে আসে মগজে।
আরো একবার তাকাই। স্মৃতির খাতা হাতড়াই ; যখন ফেরত উত্তর আসে ‘না’. তখন চোখ তুলে নিই সেই মানুষটির উপর থেকে। ফিরেও আর তাকাবার ইচ্ছে করে না ফের।
প্রতিদিন এভাবেই তো আমাকে পথ চলতে হয়। একটা অফিসব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে পথ চলি আর চালসে চোখ মেলে বিশাল জনরাশির ভেতর পরিচিত মানুষের মুখ খুঁজে বেড়াই।
ছাপোষা মানুষ আমি। একটা প্রাইভেট অফিসে যার নটা-পাঁচটা করে জীবন কাটে, চলার পথে তার আর কজন পরিচিত জন মিলবে এ শহরে?
কিছু মানুষের মুখাবয়ব চোখ-সওয়া ; আমার মতো ওদেরও ছুটাছুটির জীবন। একই এলাকায় থাকি ; দেখলেই বুঝতে পারি লোকটির বাসা আমার আশেপাশে। কোনো কথা নেই ; সেকেন্ডের জন্য দৃষ্টি আর্দ্র হলেও পরক্ষণে নির্বিকার হয়ে পড়ি। যাকে চিনি না তার সঙ্গে কিসের অত চোখাচোখি?
ফের ছুটতে শুরু করি। কখনো বাসে, কখনো রিক্সা বা টেম্পোয় করে অফিস থেকে ফিরি কিংবা ছুটে যাই অফিসের দিকে। এরই ভেতর আমার চোখ আমার হয়ে কাজ করতে থাকে। বাসে পা রেখে চারপাশে চোখ মেলে দেখি যদি কোন পরিচিত জন মেলে; যার পাশে বসছি তাকেও ক সেকেন্ডে দেখে নিই ,পরিচিত নয়তো ?
বাস থেকে নেমেও তা-ই করি। রিক্সার সীটে পাছা রেখে শুরু করে দিই দৃষ্টির কসরত। ডান-বাঁ -পূর্ব-পশ্চিম করতে করতে কেবল পরিচিত মানুষটিরই খোঁজ করি। এ কিসের তৃষ্ণা তা বুঝি না।
আমার নিজের বাড়ি যে গ্রামে সেখানে পরস্পরের ভেতর চেনা-জানা সম্পর্ক। গুরুজনকে দেখে যদি কেউ সালাম না দেয় তো জুমার নামাজের পর মসজিদে এই নিয়ে কথা ওঠে। ওমুকের পোলাটা বেআদব হয়ে গেছে বলে মুরুব্বীরা মুখ কালা করেন।
সেই গন্ডগ্রামের ছেলে আমি। ঢাকায় সামান্য চাকুরি নিয়ে এসে হেলাফেলায় দীর্ঘ একুশ বছর ফেলে দিয়েছি এই রাজধানী শহরে।
একুশ বছরের যুবক এখন বিয়াল্লিশ বছরের নতজানু প্রৌঢ়। তবু এই তুষ্ণা আমার যায় না। মানুষের মুখের গড়নে এমন কি বিশেষত্ব যে আমাকে প্রতিনিয়ত টানে। কেন যে ভেতর থেকে দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে , আহা! আমার গ্রামের মানুষের মত আমি যদি এই শহরের সবাইকে চিনতে পারতাম!
কেন পারি না ? বানরের দল কি সবাই সবাইকে চেনে? জন্তু – জানোয়ার যত, ওদের ভেতরও কি এই আকাক্সক্ষা থাকে ?
কেউ কাউকে চিনিনা বলে বড় দুঃখ হয়। দুচারবার গ্রামের এই বিপুল জনারণ্যে এক-দুজন চেনাজানা মানুষের সঙ্গে যে দেখা হয়নি তা তো নয়। দেখেছি , আনন্দে টগবগ করতে করতে রাস্তার কিনারে দাঁড়িয়ে কত যে গল্প করেছি। বাসায় ফিরে স্ত্রী -সন্তানকে বলেছি ,‘ আইজ আমার গ্যারামের লোকের লগে দেহা অইল। আইতে কইলাম বাসায়। রাজি অইল না। কাম লইয়া আইছে তো। সময়ের বড় দাম। ’
স্ত্রীর কাছে একথা বলতে গিয়ে বড় স্বস্তি খুঁজে পাই। নিত্য নৈমিত্যিক হাজারটা অনটনের অনুযোগ-তীরে বিষবিদ্ধ হওয়া সত্বেও একধরনের প্রশান্তি ফেরত পাচ্ছি অন্তরে। আমার দেশের লোক, দেশের মাছ, দেশের সব্জি ভাবতেই ভরসায় মন ভরপুর হয়ে ওঠে!
কোনোদিন আমরা বরফ-মাছ খাইনি। গল্পে শুনেছি। মাছ মরে গেলে সেই মাছে বরফ দিয়ে তাজা রাখ হয়। আমাদের গন্ডগ্রামের লোকজন এখনো বরফমাছকে অবহেলার চোখে দেখে। মাছে আবার বরফ দেয়া কি ? মাছ তো লাফাবে খলুইর ভেতর। সেই মাছ দেখে দাম হাঁকবে ক্রেতারা। দুচারটা মাছের জাত যেমন বেলে-কাঁচকি-ইলিশ ডাঙ্গায় আনতে আনতে মরে গেলেও ওদের চোখ দেখে আন্দাজ করা যায় ওরা খাওয়ার উপযোগী কিনা। মরে গেলেও চোখের দিকে তাকিয়ে যে কেউ বলে দিতে পারে , মাছটা তাজা কিনা। পঁচা মাছ বরফ দিয়ে খাওয়াকে সবাই এখনো কেন যেন ঘেন্না করে। অথচ ঢাকায় এসে কত যে পরফ-পঁচা মাছ বিপুল মূল্য দিয়ে কিনে খেতে পেয়ে সুখে-আনন্দে বগল বাজাচ্ছি। আহা! কী আনন্দ আকাশে বাতাসে !
ঢাকা শহরে থেকে এই সামান্য রুটিরুজির বদৌলতে আমার পক্ষে কোনভাবেই দিশি জিওল মাছ খাওয়া হয়ে ওঠে না। মাঝে মাঝে চাষের থাই কই কিনে নিয়ে এলে আমার ছেলে রিংকু একটা দুটো নিয়ে বাথরুমের বালতিতে ছেড়ে দিয়ে জিওল মাছের আনন্দ নেয়। আর বর্ষাকালে গ্রামে এলে আমি নিজেই লুঙ্গিকে ল্যাঙ্গট বানিয়ে নেমে পড়ি কাদাজলে। হাতে থাকে জাল। কয়েক ঘন্টার পরিশ্রমে যে মাছ সংগহ্র করি তা দেখে রিংকুর চোখ বড় বড় হয়ে যায়। সে উঠোনের একপাশে গর্ত করে পুকুর বানিয়ে তাতে কিছু মাছ ছেড়ে দিয়ে হল্লা করে।
আমার স্ত্রী রাহেলা ; সে-ও গ্রামের মেয়ে ; তবে আমার মতো পাড়াগাঁ নয়। হাইওয়ের পাশে আধুনিক গ্রাম। তাই , ওখানে বিদ্যুতসহ প্রবাসী লোকজন গিজগিজ করে। কথা বলার আগে টেলিভিশন -কম্পিউটার -মোবাইল ফোন সব বেরিয়ে পড়ে। ওটাকে আমি শহরই বলি। তাই , গ্রামের সত্যিকার মজাটা সে আমার বাড়ি বেড়াতে এলেই পায়। ছেলের সঙ্গে মাছ নিয়ে সেও মেতে থাকে।
যে কদিন গ্রামে থাকি মানুষ চেনার এ তৃষ্ণা মোটেই আমার পিছু নেয় না। কাউকে দেখলে মনেই হয়না ওকে আমি চিনিনা। মানুষ তো মানুষ ; এমনকি, গাছ-গাছালি-পাখ-পাখালি, পোষা গরু-ছাগল-ভেড়া সবাইকেই আমার পরিচিত বলে মনে হয়। একটা নেড়ী কুকুর ঘেঁউ-ঘেঁউ করতে থাকলেও আমার প্রয়োজন হয়না ওটার দিকে তাকাবার। কারণ, আমি জানি ও আমায় কামড়াবে না। একটা সময় ও ঠিক কুঁই কুঁই করতে করতে আমার রাস্তা থেকে সরে দাঁড়াবে।
পাতিকাক-দাঁড়কাকগুলোও আমার চেনা। একটা চোখকানা দাঁড়কাককে অনেকদিন ধরে এ গ্রামে দেখছি। আমাকে দেখতে পেলেই সে আমার সামনে গ্রামের মেঠো রাস্তায় লাফিয়ে লাফিয়ে কা-কা করে আমার প্রতি ওর অনুরাগ প্রকাশ করে। এগুলোয় আমি এতই অভ্যস্ত যে আমার সেদিকে তাকাবার দরকার হয়না।
অথচ ঢাকায় এলেই আমার যে কী হয় , প্রতি পদে আমার ভেতর একধরনের উৎকন্ঠা আর শঙ্কাবোধ তাড়া করে ফেরে। যাকে দেখি তার দিকেই তাকাতে চাই। প্রতিটি চেহারার দিকে তাকিয়ে কেবলই জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছা করে, ব্যাটা তোর মতলবটা কি ?
প্রতিটি সকালে অফিসের উদ্দেশে বের হবার আগে প্রস্তুত হয়ে নিই। সদা সতর্ক থেকে নিজেকে রক্ষা করতে করতে চলি। কারণ একটুখানি অসতর্কতা হলে আপনি বাসের তলায় চলে যেতে পারেন। ছিনতাইকারী আপনার মানিব্যগটি হাতিয়ে নিয়ে আপনাকে নিঃস্ব করে ছেড়ে দিতে পারে। ঠগ-বাটপার-চোর-বদমাশ প্রতিক্ষণে আপনার চোখের উপর চোখ ফেলে রেখেছে। চাইলেও এক সেকেন্ডের জন্য আপনি উদাসীন হতে পারেন না।
আমি তো আরো পারি না। বরবারই আমি ভীত-সন্ত্রস্ত এক কেরাণী। সবক্ষেত্রে আমার ভয়। এই বুঝি একটুখানি অসতর্কতার কারণে আমার ভুল হয়ে গেল। অফিসে হিসবা বিভাগে যোগ-বিয়োগ করতে গিয়ে বারবার করে এক কাজ করি। যদি সামান্য ভুলের কারণে পস্তাতে হয়। পাড়া -প্রতিবেশী -অফিস-সহকর্মী সবার সম্পর্কেই আমার এই সন্দেহ ঘুচতে চায় না। ঘুরে ফিরে এক প্রশ্ন , মতলবটা কি ?
এভাবেই যখন আমার নিত্য পথ চলা তখনি হঠাৎ চোখ পড়ল লোকটার উপর।
শ্রাবণ মাস। একনাগাড়ে বৃষ্টি হয়ে ঢাকা শহর বলতে গেলে অচল। যেখানে সেখানে ডোবা আর খানাখন্দ। চেনাই দায় এটি একটি দেশের তিলোত্তমা রাজধানী। এর ফিটফাট ঝলমলে চেহারা কদিনের মেঘ আর বৃষ্টিতে একেবারেই ম্লান আর বিষণœ দেখাচ্ছে। পত্রিকা আর নিউজ চ্যানেলগুলো সমানে দোষারূপ করে চলেছে সরকারের অদক্ষতাকে। আর সরকার নানারকম অজুহাত দিয়ে নিজেকে বাঁচাবার চেষ্টা করছে। মাঝখান থেকে আমাদের মতো বিশাল ছাপোষা গোষ্ঠী নাকাল হচ্ছি পদে পদে আর যেখানেই একটুখানি সুযোগ মিলছে সরকারকে একহাত দেখে নিচ্ছি। আমি যে এসব কত বুঝি তা বুঝাতে চাইছি বাস -ট্রেন আর গণ-বাহনের অন্য যাত্রীদের।
বাসা থেকে বেরিয়ে সেদিন হনহন করে পথ চলছি। গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। মাথার উপর ছাতা আর বাঁহাতে খাওয়ার ব্যাগ। অফিসে যেতে হবে নির্দিষ্ট সময়ে। নইলে মাসশেষে চিঠি ধরিয়ে দিয়ে বলে ফেলবে, এই কদিন লেট করে অফিসে এসেছেন । বেতন থেকে এই কটা টাকা কেটে রাখা হল। ভবিষ্যতে সতর্ক থাকবেন।
এরকম দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে যখন আমার পথ চলা, তার উপর বৃষ্টির দিন–কাদাজলে একাকার সব–তখনি চোখ পড়ল লোকটার উপর। মোড়ের বাটার বন্ধ শাটারের নীচে টাইল করা প্রথম সিঁড়ির উপর শুয়ে রয়েছে। ।
লোকটার শুয়ে থাকাটাই অদ্ভুতরকম। বাঁহাতের কনুইকে পিলার বানিয়ে ঘন কোঁকড়ানো চুল ভরা মাথাখানা তালুর উপর রেখে এক পায়ের উপর অন্য পাটি এলিয়ে দিয়ে লম্বালম্বি হয়ে শোয়া লোকটি।
এরকম রাজকীয় শোয়ার ভঙ্গি আমার মরহুম আব্বাজানের ছিল। গ্রামের প্রাইমারী বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সম্ভ্রান্ত কৃষক হলেও হাবেভাবে খুবই শৌখিন আর আরামপ্রিয় মানুষ ছিলেন তিনি।
আমি চলেই যাচ্ছিলাম লোকটিকে পাশ কাটিয়ে ; কিন্তু কিছুদূর গিয়েই মনে হল , এ তো আমার আব্বার সুখী সময়ের শোয়ার মুদ্রা !
আমার আব্বার মতো লোকটিরও উঁচু-লম্বা শরীর। সিঁড়ির এক মাথা থেকে আরেক মাথা পর্যন্ত বিস্তৃত তার দেহকান্ড।
ভরাট মুখ , ফর্সা গায়ের রং। মুখাবয়ব জুড়ে আভিজাত্যের ছাপ। পরনে সাদা পাঞ্জাবী আর লুঙ্গি।
কিন্তু চোখের ভাষাটা একেবারেই নির্বিকার। সবার দিকে তাকিয়ে থাকলেও মনে হচ্ছে কোনকিছুই লোকটির মনোযোগ কাড়ছে না।
আমি কয়েক ধাপ পিছিয়ে লোকটিকে দেখলাম। আমার দৃষ্টি স্থির। অবিকল আমার আব্বাজানের মুখের আদল। একইরকম শোয়ার ভঙ্গি।
লোকটি আমার দিকে তাকিয়ে হাসল। এরকম হাসি সচরাচর দেখা যায় না। সবটুকুই লুকানো। শুধু একটুখানি হাসির রং মোটা পুরু ঠোঁটের ফাঁকে উঁকি দিয়েই মিলিয়ে গেল।
আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো লোকটির কাছে এগিয়ে গেলাম।
‘আপনারে আমার খুব চেনা চেনা ঠেকতেছে ?’
‘আমারে দেইখা এইরহম সবারই মনে অয়। আসলে সব মিছা। আমি কারো না।’ বলে লোকটি মেঘলা আকাশের দিকে তাকাল। ঘোর লাগা চোখের দৃষ্টি।
‘আমি কি আপনের কাজে লাগতে পারি?’ এভাবে কখনো কাউকে আমার বলা হয় না। কিন্তু এই দীর্ঘদেহী মানুষটিকে আমি এভাবেই বললাম। নিজের কথা বলবার ধরনে নিজেই কেমন আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি।
‘একটা বেনসন লাইট সিগারেট খাওয়াতে পারবি ? ’
‘পারুম।’ বলে রাস্তার ওপারে গিয়ে লোকটির জন্য একটা সিগারেট নিয়ে এলাম। আমি মদ-সিগারেট খাওয়া পাবলিক নই। নিয়মিত নামাজ-রোজা রাখা মানুষ। প্রতি পদে দোয়া দুরূদ পড়ে নিজেকে সমস্ত বিপদ-আপদ মুক্ত রাখবার চেষ্টা করি নিয়ত ; সেই মানুষটি নিজ হাতে লোকটির সিগারেটে আগুন ধরিয়ে দিলাম।
লোকটি সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে মুখ দিয়ে ধোঁয়া বের করতে করতে বলল ,‘ অফিসের দেরি হয়ে যাইতাছে না ? কাইল দেহা করিস। যাঃ। ’
আমি দেরি না করে চলে এলাম সত্যি । কিন্তু লোকটি সম্পর্কে আমার কৌতূহল একেবারেই কাটেনি। যে লোকটি অবিকল আমার মৃত আব্বার মতো দেখতে, সেই লোকটির প্রতি আমার কি মায়া পড়বে না?
আমি পরদিন সকালে ছুটে গেলাম বন্ধ বাটাবাজারের সিঁড়ির কাছে। কিন্তু সেখানে লোকটি নেই।
যেখানটায় লোকটি শুয়েছিল সেখানে ষোল-সতেরো বছরের একটি মেয়েকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম।
আমি ভাবলাম হয়তো ব্যাংক বা কোনো প্রতিষ্ঠানের স্টাফ বাসের জন্য অপেক্ষা করছে। বেশ সম্ভ্রান্ত ঘরের মেয়ে ; তাকালে যে কেউ বুঝতে পারবে।
লোকটিকে না পেয়ে একটুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম সেখানে। পরক্ষণে অফিসের দেরি হচ্ছে ভেবে যেইমাত্র ঘুরেছি ওমনি মেয়েটি ডেকে উঠল ,‘ শুনুন। ’
আমি ভ্যাবাচেকা। প্রথমেই যেকথাটা মাথায় এল তা হল কোন ঠকবাজ মহিলার হাতে পড়তে যাচ্ছি না তো। মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে সব হাতিয়ে নেবার চেষ্টা; এ শহরে এসব তো আকছার ঘটছে। আমার কেরাণী-মন ভেতর থেকে বলে উঠল , মতলবটা কি ?
কিন্তু ভদ্রতা বলে তো একটা ব্যাপার আছে। মিনমিন করে বললাম,‘ আমারে কইতেছেন ?’
‘জ্বি। ’ স্মার্ট মেয়েটি সিঁড়ি থেকে ফুটপাথে নেমে এল ,‘ আপনি কি আমার বাবাকে সিগারেট খেতে দিয়েছিলেন ?’
‘জ্বে।’ কিছু না বুঝে আন্দাজে উত্তর দিয়ে ফেললাম।
‘এই নিন টাকা।’ বলেই মেয়েটি হনহন করে হেঁটে রাস্তা পার হয়ে ভিড়ের ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেল।
আমার হাতে ধরা টাকাটা। হঠাৎ কী এক অদ্ভুত শঙ্কা পেয়ে বসল হাতে ধরা টাকার নোটটার উপর। এই টাকার উছিলায় যদি কোন অঘটন ঘটে যায় আমার জীবনে ?
এ রহস্যময় শহরে কে কোথায় আমাকে ঘায়েল করার জন্য বসে রয়েছে কে জানে?
এসব ভাবতে ভাবতে হাতে ধরা টাকাটা একটা ভিক্ষুকের থালায় আলগোছে ফেলে দিলাম। সঙ্গে সঙ্গে মনে হল আশু বিপদ থেকে কোনরকমে যেন এই জীবনটাকে বাঁচাতে পারলাম।
বাসায় ফিরে স্ত্রী ফিরোজাকে বলতেই সে চোখ বড় বড় করে বলে উঠল,‘ তুমার ফিছে কুন জিন লাগছে। বড় মজিদের হুজুরের কাছ থেইক্যা পড়া নিয়া আও। ইসব বালা লক্ষণ না। ’
স্ত্রীর কথা মেনে বড় হুজুরের কাছ থেকে তাবিজ নিলাম। বালা মুসিবত থেকে দূরে থাকতে গিয়ে দোয়াপড়া পানির বোতল নিয়ে এসে প্রতিদিন পবিত্র পানি পান করতে লাগলাম। যতবার হুজুরের কাছে গেছি ততবার হুজুর আমায় ভয় দেখিয়ে বলেছেন ,‘ আল্লা রাব্বুল আল আমীনের বহুত রহম তর উপর। নইলে অদ্দিনে সাইড অইয়া যাইতি রে বাপ। খবর্দার ওই রাস্তায় ভুলেও মাড়াবি না একমাস নদিন। ’
‘হেরপর কি যাইতে পারুম ?’
‘তা পারবি। তবে খুব হুঁশিয়ার। সাবধান।’ হুজুরের চোখ বড় হবার সঙ্গে সঙ্গে আমার ভেতর চিরস্থায়ী শঙ্কা দানা বাধতে শুরু করে।
কদিন বেশ সতর্ক ছিলাম চলাফেরায়। কেবলি মনে হত কেউ আমার উপর নজর রাখছে। বাসের ভেতর কেউ আমার সঙ্গে বাড়তি কথা বললেই আমি ভয় পেতে শুরু করতাম। চোখের উপর কারো চোখ পড়লেই আঁতকে উঠে ভাবতাম, মানুষের ছদ্মবেশে এ কার রূপ ? পড়িমরি করে সে বাস থেকে আমি নেমে পড়তাম। পারলে লাফ দেবার মতো অবস্থা আমার।
এমনিতেই আমি চোখকান খোলা রাখা মানুষ। গ্রামের পরিচিত জন ছাড়া কাউকে আমি বিশ্বাস করি না। তবু এই একমাস নদিন আমি নিজের ঘরকেও অবিশ্বাসীর চোখে দেখেছি। একবারের জায়গায় দুবার প্রশ্ন করলেই আমি আমার স্ত্রী ছেলেমেয়ের দিকে পর্যন্ত চোখ ট্যারা করে তাকিয়েছি। খিলগাঁর সেই বাটাবাজার তো দূরে থাক, এর আশেপাশের রাস্তায় পর্যন্ত পা দিতাম না। পাছে আমার উপর ফের দুষ্ট জিনের আছর পড়ে, এই ভয়ে।
একমাস নদিন পর আমি বড় হুজুরের পা জড়িয়ে বসে রইলাম। তিনি চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে কারো সঙ্গে কথা বললেন কিছুক্ষণ। তারপর পদ্মকুসুম সমান চোখ খুলে বলে উঠলেন , ‘এই যাত্রায় বেচে গেলি। এইবার তুই মুক্ত। যেখানে খুশি যাইতে আর বাধা নাই। যাঃ’ ।
আমি বুঝতে পারি না কী আমার অপরাধ আর কেনইবা পৃথিবীর এত গুরুত্বপূর্ণ কাজ রেখে আমার মত ছাপোষা সহায় সম্বলহীন লোকের উপর জিনবাবা তার কুনজর ফেললেন।
আমার হাত আর কোমরভর্তি কবজ তাবিজ। খালি গা হলে ঝনঝন করে বাজতে শুরু করে সেগুলো। সেই শব্দের অর্কেষ্ট্রার ভেতর আমি নির্ভরতা খুঁজে পাই। আত্মবিশ্বাস ফিরে পাই।
একমাস নদিন পর যেদিন আমি বাসা থেকে বের হই সেদিন স্ত্রী ফিরোজা বলল ,‘ তুমি কি বাটাবাজার দিয়া মতিঝিল যাইবা ?’
‘আর ডর কি? এক মাস নদিন তো খতম। কোন ভয় নাই । বড় হুজুরের দোয়া আছে না ?’
‘তবু সজাগ থাইক। ’ বলে ও চোখ উল্টে দিয়ে পরওয়ারদিগারের করুণা চায় স্বামীর জন্য।
একমাস নদিন পর পরিচিত রাস্তায় নেমে আমি খুব ধীর আর সতর্ক পা ফেলে এগোচ্ছি সামনের দিকে। শীতের কুয়াশা মাখানো নরম মাখনের মতো সকালবেলাকার আবছায়া পরিবেশ।
ঢাকার রাস্তা ব্যস্ত হতে শুরু করলেও জুবুথুবু ভাবটুকু কাটেনি। মোড়ে মোড়ে কাঁথা-চাদর আর গরম কাপড়ে মোড়ানো খেটে খাওয়া মানুষের জটলা। পিঠাওলির দোকান থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী এঁকেবেঁকে শীতের কুয়াশার সাথে মিশে যাচ্ছে। বাস-টেম্পো-প্রাইভেটকার-রিক্সা-ঠেলাগাড়িগুলোর ভেতর এখনো হুড়োহুড়ি শুরু হয়নি। কুয়াশার হিম মেখে সবাই যেন একরকম নির্জন নিস্তরঙ্গ ভাবালুতার ভেতর ঢুকে রয়েছে। আমি সেই নাগরিক মগ্নতার ভেতর ধীরে সুস্থে পা ফেলে বাটাবাজারের জায়গাটা অতিক্রম করছি।
সিঁড়ির দিকে ইচ্ছে করেই তাকাচ্ছি না। বুক দুরু দুরু করছে।
সহসা মনে হল কে যেন আমায় ডাকছে। ত্রস্তে বাটাবজারের সিঁড়িটার উপর চোখ পড়ে গেল।
স্পষ্ট দেখলাম আমার আব্বার মত দেখতে সেই লোকটা ইশারায় আমায় ডাকছে। আমি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছি না। যে মানুষের অস্তিত্ব থেকে মুক্তি পেতে আমি এ রাস্তা পর্যন্ত মাড়াইনি একমাস নদিন, আজ জলজ্যান্ত সেই লোকটাই আমার দৃষ্টিসীমানায়!
আগের মতই হাতের উপর মাথা দিয়ে সারা গায়ে একটা চাদর জড়িয়ে শুয়ে রয়েছে। মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রয়েছে রাস্তার দিকে। মনে হচ্ছে নিজের বিছানায় শুয়ে টেলিভিশন দেখছে লোকটি। চোখভরা একই রকম স্নিগ্ধ মুগ্ধতা।
আমি মন্ত্রমুগ্ধের মত তার কাছে যেতেই লোকটা বলে উঠল,‘ আমায় একটা সিগারেট খাওয়াবি ?’
কথাটা বলতে না বলতেই টাকা ফেরত দেয়া সেই মেয়েটি কোত্থেকে ছুটে এসে খনখন করে বলে উঠল ,‘ আপনি আবার এখানে ?’
অসহায়ের মত আমি ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকি। আমার মাথা থেকে সব উধাও হয়ে গেছে অনেক আগে। এখন যা ঘটছে তাতে শরীক হচ্ছি কেবল।
মেয়েটির ফর্সা মুখ রাগে জ্বলতে থাকে। আমি তবু কিছুই বুঝতে পারছি না। মেয়েটি কেন এরকমভাবে রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে আমাকে শাসাচ্ছে তা কিছুতেই যখন মাথায় ঢুকছে না তখনি মহিলা আমার কাছে এসে চাপা আর্তনাদের মতো করে বলে উঠল,‘আমি এই মানুষটার একমাত্র মেয়ে। এই যে বাটাবাজারের বাড়িটা দেখছেন এটা আমাদেরই। ওই যে রাস্তার ওপারে একটা সুন্দর ছয়তলা দেখছেন , ওটাও আমাদের। আমরা ওখানেই থাকি। ফুসফুসের ক্যান্সারের রোগী আমার বাবা। ডাক্তার তাকে সময় বেধে দিয়েছে। উনিও বুঝতে পারেন সব। তাই বাতিকগ্রস্তের মতো যা খুশি ইচ্ছা করে বেড়াচ্ছেন ছ মাস ধরে। মাঝে মাঝে এখানে শুয়ে থাকেন আর আপনার মত অপরিচিত বোকাসোকা পথচারী পেলে তাদের কাছ থেকে চেয়ে সিগারেট খান। তাতে খুব অসুবিধা হয় আমাদের। কাশিটা বেড়ে যায়। কাশির সঙ্গে রক্ত যায়। হাসপাতালে দৌড়াতে হয় সঙ্গে সঙ্গে। প্লিজ এরকম করবেন না। আব্বার কষ্ট আমি সহ্য করতে পারি না। প্লিজ।’ মেয়েটি মুখ লুকায় হাতের তালুয়। সেই তালু বেয়ে কষ্ট মেশানো ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু গড়ায় ।
আমি আর সহ্য করতে পারি না। দ্রুত ছুটে চলে আসি সেখান থেকে। অফিসে না গিয়ে বাসায় এসে স্ত্রীকে যখন সব কথা খুলে বলি , ফিরোজা সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে,‘ অহনই বড় হুজুরের কাছে চল। ’
আমি চুপচাপ বিছানার উপর বসে থাকি। চোখের সামনে আব্বাকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। অন্তিম দিনগুলোয় একদিন কাতরাতে কাতরাতে আমাকে বলল,‘ আমারে একটা বিড়ি দিবি ? খুব শখ। দে না আইনা। ’
মরণাপন্ন রোগীর এই আব্দার মেটানোর বিপক্ষে তখন ঘরের সবাই। কিন্তু আমি লুকিয়ে আব্বাকে একটা বিড়ি খেতে দিয়েছিলাম। কেউ জানে না। কাউকে বলিও নি।
সেই বিড়িটা আমদের বাড়ির পিছনে আড়াজঙ্গলের ভেতর ঢুকে আব্বা কী যে সুখসুখ চোখমুখ করে টেনেছিল , এখনো চোখ বুঁজলে সেই চেহারাটা আমি স্পষ্ট দেখতে পাই ।
ওই মেয়েটির মত আমারও চোখ বেয়ে জল গড়ায়। ফিরোজা বুঝতে পারে না।
আমার আর বড় হুজুরের কাছে যাওয়া হয় না।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কে এম রাকিব — সেপ্টেম্বর ২৭, ২০১৫ @ ১২:১৯ পূর্বাহ্ন

      শহরের যান্ত্রিকতার, আত্মসর্বস্বতার এই টানটান সময়ের ইঁদুর দৌড়ে রত মানুষের কাহিনী খুব সাবলীল ভাবে উঠে এসেছে গল্পে। বাটাবাজারের মালিক ‘সিগারেট খাওয়াবি’ বলে যে লোকটার গল্পের প্রধান চরিত্র ছাপোষা কেরানি লোকটির জীবনে আবির্ভাব, তা এক কথায় লেখক অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। শেষপর্যন্ত গতানুগতিকতার গ্রামের প্রতি নস্টালজিয়া আর শহুরে জীবনের প্রতি গৎবাঁধা বিতৃষ্ণার গল্প হয়ে ওঠেনি। দারুণ একটা গল্প। লেখককে অভিনন্দন। ধন্যবাদ।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com