অনিল বাগচীর একদিন: মোনোক্রোম সময়ে বর্ণিল বেদনার গাথা

মাহমুদুল হোসেন | ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৫ ৯:৩৮ অপরাহ্ন

anil-bagchi.jpgঅনিল বাগচীর একদিন একটি লিরিক্যাল দৃশ্যমান প্রবাহ যা আবেগের উঁচু তার ছুঁয়ে চলে। যখন শুনি ছবির চরিত্রের মুখে যে, “প্রকৃতির মাঝে এমন কিছু সৌন্দর্য লুকানো থাকে যা শুধু হৃদয়ে ধারণ করতে হয়, অন্য কোনোভাবেই ধরে রাখা যায় না”, তখনই যেন এই ছবির ভবিতব্য নির্ধারিত হয়ে যায়। জ্যোৎসনা রাতে স্থির জলের সৌন্দর্য, বর্ষার মেদুরতা অথবা ভীষণ সবুজের অবারিত ল্যান্ডস্কেপ—মুক্তিযুদ্ধের দুষ্কালের দিবানিশিতে প্রেরিত করেছিল আমাদের অথবা পিপাসিত করেছিল সেই মোনোক্রোম, ডেজোলেট সময়ে ওই সৌন্দর্যকে পুনরাবিষ্কারের। এই ছবি, তার গল্প ও ইমেজ, সেই সুন্দরের প্রতি এক আবেগ থরথর নিবেদন।

মোরশেদুল ইসলামকে অনেকদিন আগে জাতীয় চলচ্চিত্রবিষয়ক এক লেখায় বাংলাদেশের জন ফোর্ড বলে আখ্যায়িত করা গিয়েছিল। এদেশের মানুষ, তাদের জীবন, সংগ্রাম, আনন্দ-বেদনাকে তিনদশক ধরে তিনি এক ঘোর লাগা চোখে আমাদের দেখিয়ে চলেছেন তার সিনেমায়। সেখানে যুক্তির চেয়ে বড়ো হয়ে উঠেছে আবেগ, বুদ্ধির মাপ হেরে গেছে ভালোবাসার উচ্ছ্বাসে। তার এই নতুন ছবি নিয়ে তিনি নিজেই বলছেন, একটি সহজ, সরল গল্প তিনি বলতে চেয়েছেন, কোনো কায়দা বা মারপ্যাঁচ দেখানো তার উদ্দেশ্য ছিল না। আর এই সহজ, সরল গল্পটি লিখেছেন হুমায়ূন আহমেদ—যার চরিত্ররা জীবনের নিস্তরঙ্গ পুকুরে ঢিল ছুঁড়ে যে কাঁপন তোলে তারা সঞ্চারিত হয় জন থেকে জনে; ক্রমান্বয়ে জনমনে। সেই মেজাজেই এগিয়েছে চলচ্চিত্র অনিল বাগচীর একদিন। কিন্তু যেমনটি বলেছেন মোরশেদ ঠিক ততখানি সরল একরৈখিক ভঙ্গিতে এগোয় নি সিনেমার গল্প। সময়ের ভাঙচুর আছে, জীবন ও স্বপ্নের মধ্যে যাতায়াত আছে, বর্ণ ও বর্ণহীনতার বৈপরীত্য আছে, বলা না বলার লুকোচুরি আছে। আর আশ্চর্য যে, এ এমন এক গল্প যা সরল কিন্তু ধ্রুপদী ন্যারেটিভের ধার ধারে না সে। গল্পের, এখানে সিনেমার, শুরুতেই অনিল বাগচীর এই একটি দিন কীভাবে শেষ হবে, তা আমরা, দর্শকেরা যেন জানি। ক্লাইমেক্স আমাদের উজ্জীবিত, আতঙ্কিত, হতাশ করে না—একটি বিষন্ন, বেদনাহত নিয়তি নির্দিষ্ট সময়ের যাপন এই চলচ্চিত্র; একই সাথে প্রিয় স্বদেশের প্রকৃতির উদযাপন এবং কিছু ঐশ্বর্যময় পংক্তিমালার উপভোগ। চলচ্চিত্র হিসেবে বেশ কিছু ঋণাত্বক বৈশিষ্ট্য নিয়েও এভাবেই অনিল বাগচীর একদিন একটি নতুন সিনেমা, একটি উল্লেখযোগ্য যোগ আমাদের চলচ্চিত্রের সীমিত ভাণ্ডারে।

অনিল বাগচী এক ভীরু বাঙালি যুবক ১৯৭১ সালে। অবরুদ্ধ ঢাকা শহরে সে টিকে থাকে সেপ্টেম্বরের ১১ তারিখ (পাকিস্তানের জনক মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ্-র মৃত্যুদিবস) পর্যন্ত। কিন্তু এই দুষ্কাল সে যাপন করে চূড়ান্ত আতঙ্কে। দুঃস্বপ্ন এবং ফেলে আসা শৈশব আর কৈশোরের নানা আনন্দ-বেদনায় মাখা স্মৃতির ঘোরে তার কেটে যায় দিন এবং রাত্রি। অন্তত চার মাস পিতা এবং বোনের কোনো সংবাদ তার জানা নেই। সেদিন ভোরে গ্রামের স্কুলের প্রধান শিক্ষকের চিঠিতে সে জানতে পারে তার বাবাকে হত্যা করেছে পাকসেনারা। বোনটি আছে প্রধান শিক্ষকের আশ্রয়ে। চিঠিতে তাকে গ্রামে ফিরে যেতে নিষেধ করেছেন প্রধান শিক্ষক। কিন্তু অনিল, ভীরু অনিল, ব্যাগ গুছিয়ে গ্রামের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে। ঢাকা শহরের জনহীন রাস্তায় পাকবাহিনীর উপস্থিতিতে সে বিদেশী সাংবাদিককে জানায় দেশের অবস্থা মোটেই ভালো নয়, কেউ এখন হাসে না, পার্কগুলোকে মনে হয় গোরস্থান, তার বাবাকে মেরে ফেলেছে পাকসেনারা। অনিল কি বীর হয়ে উঠছে, তার কি ক্যাথারসিস হচ্ছে? সম্ভবত নয়। পথে অনিল তার অফিসে যায়, যেখানে তার বিহারি বস উদ্বিঘ্ন তার ব্যবসার ভবিষ্যৎ নিয়ে, যেমন সে উদ্বিঘ্ন গ্রামে যেতে প্রতিজ্ঞ অনিলের নিরাপত্তা নিয়েও। এখানে আমরা জানি, এই চাকরির শুরুতে অনিলের বাবা এক চিঠিতে তার বসকে জানিয়েছিলেন, আসলে একটি চরিত্র-সনদ দিয়েছিলেন অনিলকে এই বলে যে, তার পুত্রের একমাত্র গুণ হচ্ছে সততা। এর বাইরে তার আর কোনো গুণ নেই। স্বপ্ন ও ভয়তাড়িত অনিলের চরিত্রের আরো একটি মাত্রা উন্মোচিত হয়। অনিল টাঙ্গাইলের বাসে চেপে বসে। কিন্তু বাস ছাড়ে না। বাসে তার সহযাত্রী হন আইযুব আলি সাহেব, যিনি তার স্ত্রী এবং চার ছেলেমেয়ে নিয়ে টাঙ্গাইল যাচ্ছেন শ্যালকের বিয়েতে। বাচাল ভদ্রলোক এই তথ্য বের করে ফেলেন যে অনিল হিন্দু এবং তৎক্ষণাৎ তাকে মহসীন নামটি ধারণ করতে পরামর্শ দেন। একদল আতঙ্কিত, উৎকণ্ঠিত যাত্রী নিয়ে বাস ছাড়ে। চেক পোস্ট, চাকা বদলানো, বৃষ্টি সব মিলে এই অনিশ্চিত যাত্রা চলতে থাকে। অনিল এবং আইয়ুব আলি সাহেব ও তার পরিবারের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হতে থাকে। অনিলের স্বপ্ন যাপনও চলতে থাকে একই সাথে। আরেকটি চেকপোস্ট… এবার সকলকে নামতে হয়। অনিল হিন্দু হিসেবে নিজের পরিচয় দেয়। সে মুক্তিবাহিনী নয়, আওয়ামী লীগের সমর্থক নয় তাও জানায়। আইয়ুব আলি তাকে মুসলমান বলে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়। একজন নারী অপহৃত হন এবং তার বৃদ্ধ পিতা পাকিস্তানী অফিসারের পিস্তলের গুলিতে নিহত হন। নিহত হন আরেক যাত্রী, পাক-অফিসারের খামখেয়ালিতে। আইয়ুব আলিকে অনিলের নিকট থেকে টেনে-হিঁচড়ে বিচ্ছিন্ন করে পাকসেনারা। তিনি বাসের দিকে চলে যেতে যেতে চিৎকার করে জানান অনিলের বোনকে তিনি জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত রক্ষা করবেন। অনিল চিৎকার করে বলে, তার বোনকে যেন জানানো হয় যে সে ভয় পায় নি, সে যেন যাকে ভালোবাসে তাকেই বিয়ে করে, সমাজের কথা না ভাবে। অবশেষে রাত হয়। পিছমোড়া করে হাত বাঁধা, অথচ মুক্ত মানুষ অনিল নদীর ধারের বদ্ধভূমিতে বাংলার রূপ দেখতে থাকে এবং পিতার কাছে শোনা সেই আশ্চর্য কথামালা আওড়াতে থাকে। যখন রাইফেলের গুলিটি বিদ্ধ করে অনিলকে তখন তার চোখে সেই অপরুপ বাংলা। সেই অনির্বচনীয় ফ্রেম ক্রমশ হেলে পড়ে, ফোকাস হারায় এবং অন্ধকার নেমে এলে অনিল বাগচীর একদিন শেষ হয়ে যায়। শেষ হয়ে যাওয়া এই দিনটি যাপনের যে বাস্তবতা তার ভেতরই অনিল বারবার হারিয়ে যায় তার স্মৃতির গ্রামে। জ্যোৎস্না রাতে পুকুরের ধারে বোনের গলায় “আজ জ্যোৎস্না রাতে সবাই গেছে বনে”, বাবার সাথে বিরামপুরের দিঘী দেখতে যাওয়া আর বৃষ্টিতে ভিজে একাকার হওয়া, অভিমান করে গ্রামের মন্দিরের কোণে নদীর ধারে লুকিয়ে থাকা আর বাবার হাত ধরে হারিকেনের আলোয় বাড়ি ফেরা, বোনের বারবার বিয়ে ভেঙে যাওয়া, বরুণ কাকার একদিন রাত এগারটায় দেশ ছেড়ে যাওয়া এসব ক্রমাগত চলতে থাকে। আবার এ স্বপ্ন নিশ্চয়ই, আসলে অবচেতনের আকাঙ্ক্ষাই তো যে, অনিল দেখতে পায় সে ছোট্ট শিশুটি মায়ের কোলে গান শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ছে আর তার খুকি দিদি একটু দূরে বসে হাসছে। এইসব সুখ অথবা সুখের কামনা, এইসব স্বপ্ন অথবা ফেলে আসা বাস্তবতার ভেতর দিয়ে অনিলের এই শেষ দিনটি ত্রিমাত্রিক হয়ে উঠতে থাকে। অনিল মরে যাবে এতো আমাদের জানা কথাই; আসলে এই কাহিনীর আর কোনো শেষ হতে পারে না; এই জানা আমাদের বেদনাহত করে রাখে কিন্তু একটি আশ্চর্য পূর্ণতায়যেন শেষ হয় অনিল বাগচী নামের এক সামান্য ভীরু মানুষের জীবন। এক ব্যাখ্যাতীত আনন্দে আমরা পুলকিত হই যখন শেষ ক্রেডিটস চলছে আর উচ্চারিত হচ্ছে, “আবার আসিব ফিরে… জলাঙ্গীর ঢেউয়ে ভেজা বাংলার এ সবুজ, করুণ ডাঙায়।”

রং এবং মোনোক্রোম এই দুইভাগে ছবির কাল বিভক্তি। অনিলের দিনটি, যেটি ১৯৭১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর, সেই দিনটির সকল ছবি সাদা-কালো। আর স্মৃতি এবং স্বপ্নের সকল ছবি রঙিন। এই বিভাজন সরল এবং একটি পর্যায় পর্যন্ত নিশ্চয়ই কাজ করে দর্শকের মধ্যে। তবে তা যে অনেক বিশেষ কিছু যোগ করে দৃশ্যমানতায় অথবা বোধে তা নয়। বরং, সাদা-কালোর মধ্যে একটি আনুষ্ঠানিক ইতিহাসময়তা সৃষ্টি হয়েছে হয়তো এখনকার দর্শক-চোখে। আর সেটি কিন্তু কাজ করে এভাবে যে, যেন বাস্তবের দিনটি, যার ইল্যুশন আমরা পর্দায় দেখছি সেটিই আসলে অতীত আর তারো যা অতীত তা যেন ধরা ছোঁয়ার মধ্যেই, বাস্তব। আর ঢাকা শহরের বিরান পথ ঘাটে মধ্যম দূরত্বে বসানো ক্যামেরা সাদা-কালোতে সৃষ্টি করেছে ক্রূর বিচ্ছিন্নতার ইমেজ। আর বর্ণহীনতার ভেতর অনিলের যাপিত দিনটি কেবল আলো আর অন্ধকারের বৈপরীত্যে বিশেষ হয়ে উঠেছে। রঙের মন্তব্যের অনুপস্থিতি এক ধরনের বোবা কান্নার মতো কাজ করেছে আমাদের মধ্যে। কিন্তু যা স্পষ্ট হয় নি তা হচ্ছে রঙিন দৃশ্যগুলোতে অতখানি হাই-কি গ্রেডিং। বিপদজনকভাবে পঞ্জিকাসুলভ সস্তা সৌন্দর্যের দিকে যেন যাত্রা করে ফেলেছে প্রায় অনেক দৃশ্য। অথচ, এসব স্বপ্ন এবং স্মৃতিময়তার ইমেজগুলো নানাভাবে মাত্রায়িত করা সুযোগ ছিল। নাটকীয় কোণ, চলমান ক্যামেরা এসব দৃশ্যকে একটি পর্যায় পর্যন্ত নিশ্চয়ই ধনী করেছে কিন্তু ফোকাসের নানা কারুকাজ এবং আলোর বৈপরীত্য আরো মাত্রা তৈরি করতে পারত। প্রথম স্বপ্ন-দৃশ্যটিতে হ্যান্ডহেল্ড ক্যামেরার কাজ স্বতঃস্ফূর্ত এবং ছবির মুডের সাথে সংগতিপূর্ণ, লিরিক্যাল। সাদা-কালোতেবাসযাত্রা দৃশ্যের বেশ কিছু অংশ আবার হ্যান্ডহেল্ড ক্যামেরাতেই তোলা; কিন্তু সে ইমেজ অনেক সাদামাটা, কখনো প্রায় ডকুমেন্টারি ইমেজের মতো। এই ছবির প্রধান ইমেজ মোটিফ হচ্ছে হাই বা লো অ্যাঙ্গেল শট। এই শটগুলো দুইভাবে কাজ করেছে। সাদা-কালো দৃশ্যগুলিতে হাই অ্যাঙ্গেল শটগুলো চরিত্রদের অসহায়ত্ব এবং একাকীত্বকে ধারণ করেছে। গ্রামের ভেতরে যে বাড়িটিতে আইয়ুব আলি সাহেবের স্ত্রী এবং ছেলেমেয়েরা বাথরুমে যায় সে দৃশ্যে বেশ খানিকটা ওয়াইড অ্যাঙ্গেলে উঁচুতে বসানো ক্যামেরা বাড়িটির শূন্যতাকে অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। অন্যদিকে, খোলা প্রকৃতির মধ্যে উঁচুতে বা নিচুতে বসানো ক্যামেরা দৃশ্যগুলোতে গভীরতা দিয়েছে, প্রকৃতিকে প্রধান, বিস্তৃতও নাটকীয় করে তুলেছে। শেষ দৃশ্যের লো কন্ট্রাস্ট সাদা-কালো সিনেমাটোগ্রাফি এক পবিত্র শোকের জন্যে আমাদের অপেক্ষাকেই স্বাগত জানায় যেন। আর অনিলের চোখে দেখা বাংলার রঙিন প্রকৃতি ফ্রেমের বাইরে গুলি খেয়ে পড়ে যাওয়া অনিলের পয়েন্ট অব ভিউকে বজায় রেখে একদিকে হেলে পড়ে যায়, সে মোনোক্রোম হয়ে যায়, তারপর আবার তার বর্ণায়ন ঘটে, এবং তারপর নিকষ কালো হয়ে যায়; অনিল বুঝি চোখ বোজে!

ছবিটির গোড়ায় এক ধরনের যত্নময়, ইঙ্গিতপূর্ণ সম্পাদনা চোখে পড়ে। প্রথম দৃশ্যেই ছোট ছোট ক্লোজ আপে অনিলের কেঁপে ওঠা হাত, ঘড়িতে রাতের সময়, বিবেকানন্দের ছবি আর সাহসী উক্তি, ক্যালেন্ডারে ১৯৭১-এর তারিখ… এবং ওপরে রূপসী বাংলার ছবি… এসব কাটা কাটা শট অনিল বাগচীর দিন যাপন সম্পর্কে অনেক কিছু উ্ন্মেচিত করে। সম্পাদনার এই ভঙ্গিটি পরে আর বজায় থাকে নি, যদিও অীভব্যক্তিময় ক্লোজ আপ আছে ছবিটি জুড়েই। কিন্তু পাকিস্তানী সেনাদের হাতে অনিলের ধরা পড়ার দৃশ্যটির প্রায় রিয়েল টাইম সম্পাদনা মিজ-অঁ-সীনের চমৎকার উদাহরণ। এই দৃশ্যটির গুরুত্ব এবং দৈর্ঘ্য সমস্ত ছবির প্রেক্ষাপটে সময়ের প্লাস্টিসিটিকে গুরুত্ব দিয়েছে।

অনিল বাগচীর একদিন ছবির সবচেয়ে বড়ো সম্পদ হচ্ছে অনিলের ভূমিকায় আরেফ সৈয়্যদ এবং আইয়ূব আলি সাহেবের ভূমিকায় গাজী রাকায়েতের অভিনয়। আরেফের স্বল্পাভিনয় দেখে আমাদের বারবার ব্রেসোঁর চরিত্রদের কথা মনে পড়েছে। তিনি, আরেফ, যেন তার সকল বৈশিষ্ট্য এবং অভিব্যক্তিকে ঝেড়ে ফেলে অনিল বাগচীর একদিন নামক চলচ্চিত্রিক প্রজেক্টের এক প্রধান অনুঘটকে পরিণত হয়েছেন। আর লক্ষ করি, গাজী রাকায়েত তার বিপরীতে অত্যন্ত উঁচু গ্রামের এক অভিনয়রীতি অনুসরণ করে চরিত্রটিকে বাস্তবাতিক্রান্ত এক উপস্থাপনার পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। বরং ঝামেলা হয়েছে অনিলের পিতার চরিত্রে অভিনয় করেছেন যিনি তার সংলাপ উচ্চারণ নিয়ে। যে ধরনের সংলাপ তাকে বলতে হয়েছে তাতে কণ্ঠের আরো সূক্ষ্ম কাজ প্রয়োজন ছিল। কিন্তু একধরনের একঘেঁয়ে এবং হালকা উপরিতলের বাকরীতি আমাদের কিছুটা হতাশ করেছে। স্কুলের প্রধান শিক্ষকের চিঠিটি সম্ভবত পাঠ করেছেন মোরশেদুল ইসলাম নিজেই। সেই পাঠটি কণ্ঠস্বরের ছোট ছোট কাজে অনেক বিশিষ্ট হয়ে উঠেছে। পাকিস্তানী সেনাদের অভিনয় আমাদের চলচ্চিত্রে একটি বড়ো মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছে। এই ছবিতে হত্যা দৃশ্যের পাকিস্তানী অফিসার অতি অভিনয় অন্তত করেন নি; যদিও কাঁচা তার দেহ এবং বাচন ভঙ্গি। কিন্তু কর্নেলের চরিত্রে মিশা সওদাগর একেবারে যাচ্ছেতাই অভিনয় করেছেন।

ছবিতে বাদ্যযন্ত্রসহ দুটি গান প্রায় কিছুই যুক্ত করে নি। অনিলের বাস-যাত্রার সময় প্রকৃতি প্রেমের গানটি একেবারে টেলিভিশনের দেশের গানের মতো ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর তার বোনের একাকী গানটিও সার্বিক ছবির মুডে ছেদই টেনে এনেছে। বিশেষত পুরো ছবির ঘটনাবলি অনিলের দৃষ্টি এবং জ্ঞাতির ভেতরকার ব্যাপার বলে যদি ধরে নেই তাহলে এই গানটি আরো মারাত্মক বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে।

দুটি দৃশ্য আকারে ছোট হতে পারত। একটি হচ্ছে অনিলের অফিসের এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে বরুণের দেশ ছেড়ে যাওয়া নিয়ে অনিলের বাবার সাথে কথপোকথনের দৃশ্য। আরো কম সময়ে, আরো ধনী সংলাপে দৃশ্য দুটি ভাবতে পারলে ভালো হতো; অন্তত আমরা অনিল বাগচীর একদিন থেকে বিযুক্ত হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থায় পড়ে যেতাম না।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত যা গুরুত্বপূর্ণ তা এরকম কাটা কাটা বিশ্লেষণ নয়। এ ছবির শেষ ফ্রেম পার হলে আমরা একটি বিষয়ীগত প্রাপ্তির বোধে নিমজ্জিত হই। অনিল কি সাবলাইমকে স্পর্শ করে? একি সাধারণ এক মানুষের মহত্ব অর্জন? আমরা নিশ্চিত হতে পারি না; কিন্তু বেদনার পূর্ণতা, একবুক দেশপ্রেম আর প্রায় শিশুর মতো অভিমান আমাদের আচ্ছন্ন করে রাখে; কিছুক্ষণ। যে লিরিক্যাল অভিজ্ঞতার কথা বলেছি শুরুতেই সেই অভিজ্ঞতারই এই পরিণাম!

আর যা বলার তা হলো এই যে, অবশেষে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক আমাদের চলচ্চিত্র যেন যাত্রা করেছে তার অনিবার্য ম্যাচিউরিটির দিকে। গত বছরের মেঘমল্লার, এ বছরের অনিল বাগচীর একদিন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের নতুন ছবির সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। এসব ছবি মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখ ইমেজ থেকে দূরবর্তী মানুষের জীবন নিয়ে কাজ করে।মুক্তিযুদ্ধের কালে সামান্য আটপৌরে জীবনের আখ্যান আমাদের সামনে উপস্থাপিত হচ্ছে এখন। এইসব নতুন ছবিকে সাদরে স্বাগত জানাই।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আনোয়ার চৌধুরী — সেপ্টেম্বর ২০, ২০১৫ @ ১০:৫৭ অপরাহ্ন

      ভেবেছিলাম লেখাটি পাঠ করবো না। ছবি দেখার আগে আমি পারতঃপক্ষে রিভিউ এড়িয়ে চলি, যাতে ছবি দেখতে বসে ওটি দ্বারা তাড়িত হয়ে সে মতো বিচার-বিশ্লেষণ করতে না বসে যাই আর ছবি কে বোঝা, বিবেচনা করা আর তার রস আস্বাদনে নিজের উপর প্রথমতঃ নির্ভর করতে চাই বলেই।

      কিন্তু সেটি এক্ষেত্রে ঘটলো না দুটি কারণে, তার একটি, ছবি মুক্তির দূরবর্তী সময়টিকে জেনে, অন্যটি, লেখকের লেখার রস থেকে নিজেকে এতটা সময় বঞ্চিত না করে রাখার ভাবনা ও সিদ্ধান্ত থেকে।

      লেখাটি পাঠ করার পর, ভাষার দ্যোতনা, ডিটেইলিং আর গভীর বিশ্লেষণধর্মীতার অপূর্ব মিশেলে অনিবার্য ভাবে মুগ্ধতায় আছন্ন হয়ে গেলো মন, যেটি প্রায় সকল সময়েই হয় এ লেখকের লেখা পড়ে! প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ও নির্মাতার প্রতি একেবারে নির্মোহ ও নিরপেক্ষ থেকে এবং একই সাথে গঠনমূলক ভঙ্গিতে লেখা বিশেষ করে এই লেখাটি, আমাদের দেশে চলচ্চিত্র সমালোচনায় একটি নতুন মাত্রা যোগ করল বলেই আমার কাছে (চলচ্চিত্রটি বাক্তিগতভাবে না দেখা হলেও) মনে হয়েছে। আর অনেকের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেও এটি বলতে পারি যে, চলচ্চিত্র আর তার ভাষাকে না বুঝেই, তাকে বিশ্লেষণ করার ক্ষমতাকে আয়ত্ত না করেই আমরা যেসব রিভিউ/সমালোচনা লিখছি, পড়ছি আমাদের সবার জন্যই এটি হতে পারে একটি শিক্ষণীয় পাঠ।

      এ লেখার মধ্য দিয়ে লেখক তাঁর ম্যাচিউরিটি দেখিয়েছেন সেটি বলার ধৃষ্টতা আমার নেই (লেখক অনেক আগেই তা দেখিয়েছেন), তবে যেটি মনে হয়েছে এবং যেমনটি লেখক শেষে বলেছেন যে, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক আমাদের চলচ্চিত্র যেন যাত্রা করেছে তার অনিবার্য ম্যাচিউরিটির দিকে, তেমনি ভাবে বলা যায় যে, এরকম লেখার চর্চা যদি আমরা অব্যাহত রাখতে পারি, তবে হয়তো আমাদের দেশের চলচ্চিত্র সমালোচনার ক্ষেত্রটিও সামগ্রিকভাবে যাত্রা শুরু করবে অনিবার্য ম্যাচিউরিটির দিকেই।

      অশেষ ধন্যবাদ রইলো মাহমুদুল হোসেন-এর প্রতি লেখাটি উপহার দেয়ায়, শুভকামনা রইল নির্মাতা মোরশেদুল ইসলামের প্রতিও, আর দেখার অপেক্ষায় রইলাম, ‘অনিল বাগচীর একদিন’।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com