গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:

নিঃসঙ্গতার একশ বছর

আনিসুজ্জামান | ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৫ ৭:৪৪ অপরাহ্ন

combo.jpgবিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে নিঃসঙ্গতার একশ বছর-এর মতো আর কোনো উপন্যাস প্রকাশের পরপরই এতটা পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে কিনা সন্দেহ। জনপ্রিয়তার বিচারে যেমন, তেমনি শিল্পকুশলতা আর শিল্পমুক্তির ক্ষেত্রেও এটি হয়ে উঠেছে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। কেবল স্প্যানিশ সাহিত্যেই নয়, গোটা বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসেই একটি মাত্র উপন্যাসে ইতিহাস, আখ্যান, সংস্কার, কুসংস্কার, জনশ্রুতি, বাস্তব, অবাস্তব, কল্পনা, ফ্যান্টাসি, যৌন-অযাচার ও স্বপ্ন– সবকিছুর এমন স্বাভাবিক ও অবিশ্বাস্য সহাবস্থান আগে কখনও দেখা যায়নি।
ঠিক এই কারণে মারিও বার্গাস যোসা এটিকে বলেছিলেন এক সামগ্রিক উপন্যাস (Novela Total), আর পাবলো নেরুদা একে বলেছিলেন, “সের্বান্তেসের ডন কিহোতের পর স্প্যানিশ ভাষায় সম্ভবত মহত্তম উন্মোচন (“perhaps the greatest revelation in the Spanish language since Don Quixote of Cervantes.”)
বাংলাদেশে এখনও পর্যন্ত কিংবদন্তিতুল্য এই উপন্যাসটি মূলভাষা থেকে অনূদিত হয়নি। এই প্রথম এটি আনিসুজ্জামানের অনুবাদে মূল থেকে ধারাবাহিক অনূদিত হচ্ছে। বি. স.

অনুবাদ: আনিসুজ্জামান

———————————————————————————
ধারাবাহিক উপন্যাস । কিস্তি ২৮

বহু বছর পর মৃত্যুশয্যায় আউরেলিয়ানো সেগুন্দোর মনে পরে যাবে জুন মাসের সেই বৃষ্টি ঝড়া বিকেলের কথা যখন সে শোবার ঘড়ে ঢুকেছিল তার প্রথম পুত্র সন্তানের মুখ দেখতে । যদিও ছেলেটা ছিল দুর্বল আর শুধুই কাঁদছিল আর চেহারায় বুয়েন্দিয়াদের কোনো বৈশিষ্টই ছিল না, তবুও তার নাম রাখার জন্য দ্বিতীয়বার ভাবতে হয়নি তাকে। “ওর নাম হবে হোসে আর্কাদিও”- বলে ।
এক বছর আগে ফের্নান্দা দেল কার্পিও নামের যে সুন্দরী মেয়ের সঙ্গে তার বিয়ে হয়, সেও একমত হয় এতে। অপর দিকে এতে করে নিজের মৃদু উদ্বেগের আবছা অনুভূতি সে লুকাতো পারেনি। পরিবারের দীর্ঘ ইতিহাসে নামগুলোর গো ধরা পুনরাবৃত্তি তাকে আপাতদৃষ্টিতে অভ্রান্ত উপসংহার টানতে সাহায্য করে। যখন আউরেলিয়ানোরা হচ্ছে নিরাসক্ত ও নির্মল, হোসে আর্কাদিওরা তখন হচ্ছে মাথা গরম, দুঃসাহসী, কিন্তু ওরা চিহ্নিত ছিল হৃদয়বিদারক ঘটনার দ্বারা। শুধুমাত্র হোসে আর্কাদিও সেগুন্দো আর আউরেলিয়ানো সেগুন্দোর ব্যাপরটাকেই একই শ্রেণীতে ফেলা অসম্ভব হয়। শৈশবে দুজনের চেহারায় এতই মিল ছিল আর ওরা এতই দুরন্ত ছিল যে এমনকি সান্তা সোফিয়া দে লা পিয়েদাদের পক্ষেও ওদেরকে আলাদা করে চেনা সম্ভব হোত না। ব্যাপটাইজের দিনে ওদের হাতে নামাংকিত ব্রেসলেট লাগিয়ে, নামের আদ্যাক্ষরসহ ভিন্ন রঙের কাপড় পড়িয়ে দেয়া হয়, কিন্তু যখন স্কুলে যেতে আরম্ভ করে তখন নিজেরাই ঠিক করে নিজেদের ভিতরে কাপড় বদলাতে, ব্রেসলেট বদলাতে আর একে অপরকে উল্টো নাম ধরে ডাকতে। সবুজ জামায় হোসে আর্কাদিও সেগুন্দোকে দেখতে অভ্যস্ত শিক্ষক মেলচোর এসকালোনা খেই হারিয়ে ফেলে যখন আবিস্কার করে যে সে আউরেলিয়ানো সেগুন্দোর ব্রেসলেট পড়ে আছে, আর তার নাম হচ্ছে অন্য আর অপর দিকে যদিও আউরেলিয়ানো সেগুন্দোর গায়ে সাদা জামাপড়া ছিল তবুও সে পড়েছিল হোসে আর্কাদিও সেগুন্দোর নামাংকিত ব্রেসলেট। তখন থেকে কার নাম যে কি তা কেউই নিশ্চিত করতে সক্ষম হয় না। ওরা যখন বেড়ে ওঠে, জীবন ওদের আলাদা করে ফেলে, এমনকি তখনও উরসুলা নিজেকেই প্রশ্ন করত ওরা কোনো সময়ে ভুল করে বিভ্রান্তির কোনো জটিল খেলায় নিজেরাই চিরতরে বদলে গিয়েছে কিনা। বয়োসন্ধির প্রারম্ভ পর্যন্ত ওরা ছিল যুগপৎ বয়ে চলা যন্ত্র বিশেষ। একই সময় ঘুম থেকে জাগত, একই সাথে ওদের পায়খানার বেগ পেত, স্বাস্থ্যজনিত সমস্যাগুলো হতো একই রকমের, এমনকি দুজনেই দেখত একই স্বপ্ন। বাড়ির সকলে যখন ভাবত ওরা একই সাথে কাজগুলো করে শুধুমাত্রই বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার জন্য তখন সত্যিকার অর্থে কেউই বুঝতে পারে না আসল ব্যাপারটা যতক্ষণ পর্যন্ত না একদিন সান্তা সোফিয়া দে লা পিয়েদাদ ওদের একজনকে লেবুর সরবত দেয়ায় সে কেবলমাত্র চেখে দেখতেই অন্যজন বলে ওঠে চিনি নাই সরবতে। সত্যিকার অর্থেই চিনি দিতে ভুলে গিয়েছিল সান্তা সোফিয়া দে লা পিয়েদাদ, আর ঘটনাটা উরসুলাকে বলে সে। “এ রকমই সবাই”- আশ্চর্য না হয়ে বলে সে- “জন্ম থেকেই ওরা উম্মাদ”। সময়ই এই বিশৃঙ্খল অবস্থার ইতি টানতে থাকে। বিভ্রান্তির খেলায় যে আউরেলিয়ানো সেগুন্দো নাম নিয়ে থাকে, সে হয়ে ওঠে পিতামহের মত বিশাল বপুধারী, আর যে ছিল হোসে আর্কাদিও সেগুন্দো, হয়ে ওঠে কর্নেলের মত চওড়া হাড়ের অধিকারী। শুধুমাত্র একটি মাত্র মিলই ওদের অবশিষ্ট থাকে সেটা হচ্ছে বংশগত নিঃসঙ্গতা। খুব সম্ভবত দৈহিক উচ্চতা- নিজেদের ভিতরে নাম, আর চরিত্রের অদলবদলের কারণেই উরসুলার মনে সন্দেহ জাগে যে শৈশব থেকেই তাসের মত ওরা ওলটপালট হয়ে গেছে।

চরম পার্থক্যটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যুদ্ধের মধ্যে যখন হোসে আর্কাদিও সেগুন্দো কর্নেল হেরিনাল্দো মার্কেসকে অনুরোধ করে মৃত্যুদন্ড দেখাতে নিয়ে যাওয়ার জন্য। উরসুলার আপত্তি সত্ত্বেও তার আকাঙ্ক্ষা পূরণ করা হয়, আর অন্য দিকে আউরেলিয়ানো সেগুন্দো শুধুমাত্র মৃত্যুদন্ডের সময় উপস্থিত থাকার কথা কল্পনা করেই কাঁপতে থাকে । বাড়িতে থাকাটাই বেশী পছন্দ ছিল তার, বারো বছর বয়সে উরসুলাকে সে জিজ্ঞেস করে নিষিদ্ধ বদ্ধ ঘরটাতে কী আছে । “কাগজপত্র”- ওকে উত্তর দেয় উরসুলা- “ওগুলো হচ্ছে মেলকিয়াদেসের বইপত্র, আর শেষের বছরগুলোতে যে সব অস্বাভাবিক জিনিসপত্র লিখত তাই-ই”। এই উত্তর ওকে শান্ত করার বদলে বাড়িয়ে দেয় ঔৎসুক্য। ফলে সে এত ব্শেী পিড়াপীড়ি করে আর প্রতিজ্ঞা করে কোনো জিনিষ নষ্ট না করার, যে উরসুলা ঘড়ের চাবি দিয়ে দেয় ওকে । মেলকিয়াদেসের শবদেহ বের করার পর ওই ঘড়ে কেউই আর ঢোকেনি, আর যে তালা তাতে দেওয়া হয় তার বিভিন্ন অংশ মরিচা ধরে একটার সাথে আর একটা জোড়া লেগে যায়। কিন্তু যখন আউরেলিয়ানো সেগুন্দো জানালাগুলো খোলে তখন এমন এক পরিচিত আলো ঢোকে যে মনে হচ্ছিল প্রতিদিনই সেটা ঢুকে ঘরটাকে আলোকিত করতে অভ্যস্ত, ছিল না ধুলাবালি বা মাকড়সার ন্যূনতম কোনো চিহ্ন বরঞ্চ ছিল ঝাড়–দেয়া পরিচ্ছন্নতা। ওর লাশ দাফনের দিনের চাইতেও বেশী ঝাট দেয়া, বেশী পরিচ্ছন্ন, কালির দোয়াতের কালিও শুকিয়ে যায় নি, মরিচা পড়ে ধাতব পদার্থের উজ্জলতা নষ্ট করেনি, এমনকি হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া যেখানে পারদ গরম করত সেই অঙ্গার পর্যন্ত নেভেনি। তাকগুলোতে বইপত্র বাধানো ছিল এক ধরনের কাডবোর্ড জাতীয় জিনিস দিয়ে যার রং ছিল রোদে পোড়া মানুষের ত্বকের মত পান্ডুর। আর পান্ডুলিপিগুলো ছিল অক্ষত। সবই এতই সাম্প্রতিক ছিল যে কয়েক সপ্তাহ পর যখন উরসুলা এক বালতি পানি আর এক ঝাড়ু নিয়ে মেঝে ধোয়ার জন্য ঢোকে তখন তাকে কিছুই করতে হয় না। একটা বইয়ের লেখাগুলোর মধ্যে ডুবে ছিল আউরেলিয়ানো সেগুন্দো। বইটার কোন বাধাই ছিল না, এমনকি নামও লেখা ছিল না কোথাও, কিন্তু শিশুটা উপভোগ করছিল এক মেয়ের গল্প, যে নাকি টেবিলে বসে শুধুমাত্র আলপিন দিয়ে বিধিয়ে ভাতের দানা খেত আর সেই গল্প করতো, যেখানে ছেলে তার প্রতিবেশীর কাছে জালে বাধার জন্য সীসে ধার চায় আর পরে প্রতিদান হিসেবে দেওয়া মাছটার পেটে ছিল হিরক খন্ড। আর যখন সাধ পূরণ করা চেরাগ ও উড়ন্ত গালিচার গল্প বিস্ময়াভূত হয়ে উরসুলাকে প্রশ্ন করে ওগুলোর সবই সত্য কিনা আর উরসুলা ইতিবাচক উত্তর দেয় আর বলে জিপসীরা অনেক বছর আগে মাকন্দোতে নিয়ে যেত আশ্চর্য প্রদীপ ও উড়ন্ত গালিচা।
– “আসল ব্যাপার হচ্ছে”- দীর্ঘশ্বাস ফেলে- “ধীরে ধীরে পৃথিবীটা শেষ হয়ে যাচ্ছে, ফলে ঐসব জিনিস আর আমাদের এখানে আসে না”।

যখন বইটা শেষ করে, তখন অনেকগুলো গল্পই অসমাপ্ত থেকে যায় কারণ বইটার সবগুলো পৃষ্ঠা ছিল না, আর আউরেলিয়ানো সেগুন্দো পান্ডুলিপির অর্থোদ্ধারের চেষ্টা করে। অসম্ভব হয়ে পড়ে সেটা। অক্ষরগুলো দেখতে ছিল দড়ির উপর শুকোতে দেয়া কাপড়ের মত, আর সেগুলোর সাহিত্যের অক্ষরের চাইতে সঙ্গীতের স্বরলিপির সাথেই ছিল বেশী মিল। এক জ্বলন্ত দুপুরে, যখন সে পান্ডুলিপিটাকে পরীক্ষা করছিল তখন ওর মনে হল ঘরের মধ্যে সে একা নেই। জানালা দিয়ে আসা প্রতিফলনের উল্টো দিকে, হাটুর উপর হাত রেখে বসা, সে ছিল মেলকিয়াদেস। বয়স চল্লিশের বেশি ছিল না ওর, পরনে ছিল তার সেই মান্ধাতা আমলের কুর্তা, আর কাকের পাখার টুপি, আর গরমে তার কপাল থেকে ঝরে পরছিল চুল বেয়ে গলে পরা তেল, যে রূপটি ছেলেবেলায় দেখেছিল আউরেলিয়ানো ও হোসে আর্কাদিও। আউরেলিয়ানো সেগুন্দো ওকে চিনতে পারে সাথে সাথেই কারন এই স্মৃতি ওর কাছে এসেছে বংশ পরম্পরায়, আর এসেছে ওর দাদার স্মৃতি থেকে। “সালুদ (হ্যালো)” আউরেলিয়ানো সেগুন্দো বলে। “সালুদ (হে) যুবক” মেলকিয়াদেস বলে।

তখন থেকে পরের অনেক বছর, ওদের দেখা হয়েছে প্রায় প্রতি বিকেলেই। মেলকিয়াদেস ওকে পৃথিবীর কথা বলত, চেষ্টা করত ওর ভিতরে তার প্রাচীন প্রজ্ঞা রোপনের, কিন্তু পান্ডুলিপি অনুবাদ করতে সে অনীহা প্রকাশ করে । “একশ বছর বয়স না হওয়া পর্যন্ত এটার অর্থ জানা উচিত নয়”- ব্যাখ্যা দেয়। আউরেলিয়ানো সেগুন্দো চিরকালই গোপন রাখে ঐ সাক্ষাৎগুলো। একবার প্রায় তার ব্যক্তিগত বিশ্বটা ধূলিসাৎ হবার উপক্রম হয়, কারন যখন উরসুলা ঘড়ে ঢোকে মেলকিয়াদেস তখন ওখানেই ছিল। কিন্তু উরসুলা তাকে দেখতে পায় না ।
– “কার সাথে কথা বলছিস।” ওকে জিজ্ঞেস করে।
– “কারও সঙ্গেই না”- বলে আউরেলিয়ানো সেগুন্দো
– “এমনটিই ছিল তোর প্রপিতামহ”- বলে উরসুলা- “সেও একা একা কথা বলত”।
এই সময়েই হোসে আর্কাদিওর গুলিবিদ্ধ করে মৃত্যুদন্ড দেখার ইচ্ছে পূরণ হয়েছে। সারা জীবন ভর সে মনে রাখবে ছয়টি এক সঙ্গে করা গুলির নীলচে বিচ্ছুরণ, পাহাড়ের সাথে ওগুলোর প্রতিধ্বনির খান খান হয়ে ভেঙে পরা, মুখের করুণ হাসি, দন্ডিত ব্যক্তির হতভম্ব চোখ রক্তে ভিজে যাওয়ার পরও সোজা হয়ে দাড়িয়ে থাকা, আর খুটি থেকে বাঁধন খুলে এক চুনের বাক্সে ঢোকানোর সময়ও তার মুখে লেগে থাকা হাসি । “ও জ্যান্ত” ভাবছিল সে “ওকে জ্যান্ত কবর দেবে ওরা”। ব্যাপারটা তাকে এতই বিহ্বল করে ফেলে যে তখন থেকে ঘৃণা করতে শুরু করে যুদ্ধ আর মিলিটারি কার্যক্রম, অবশ্য মৃত্যুদন্ড দেবার ব্যাপারটার জন্য নয়, বরঞ্চ জ্যান্ত কবর দেবার মত ভীতিকর প্রথাটার জন্য, তারপর থেকে কেউই জানত না ফাদার এল কাচোররো-র উত্তরাধিকারী ফাদার অান্তোনিও ইসাবেলকে কোন মুহূর্ত থেকে উপাসনায় সাহায্যের লক্ষ্যে ও গীর্জার ঘন্টা বাজাতে ও ফাদারের বাড়ির উঠানের লড়াইয়ের মোরগগুলোর যত্ন নিতে আরম্ভ করে সে। যখন কর্নেল হেরিনোল্দো মার্কেস জানতে পারে ওকে কঠিনভাবে ভর্ৎসনা করে উদারপন্থিদের নিষিদ্ধ কাজগুলো শেখার জন্য। “ব্যাপারটা হচ্ছে”- জবাব দেয় সে- “মনে হচ্ছে আমি রক্ষনশীল হয়েই জন্মেছি”- সে বিশ্বাস করত ব্যাপারটা যেন অদৃষ্টের লিখন। মর্মাহত কর্নেল হেরিনোল্দো মার্কেস উরসুলাকে বলে ব্যাপারটা ।
cien-anos-de-soledad.jpg
-“সেই ভালো – সমর্থন করে উরসুলা। “ও যেন পাদ্রী হবার জন্য চেষ্টা করে যাতে করে শেষ পর্যন্ত ঈশ্বর এই বাড়িতে ঢুকে”।
অনতি বিলম্বেই জানা যায় যে, ফাদার আন্তোনিও ইসাবেল ওকে প্রথম কমুনিয়নের (ব্যাপটাইজের পর ক্যাথলিকদের পালিত প্রথম ধর্মপ্রথা যাতে ছেলে মেয়েরা খ্রীস্ট ধর্মকে শরীর ও মনে ধারন করে) জন্য প্রস্তুত করছে আর মোরগের গলার ফোড় চেছে ফেলার সময় তাকে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে ধর্মীয় শিক্ষা দিচ্ছে । “ওম দেয়া মুরগী খোপে ঢোকানোর সময়” সরল উদাহরন দিয়ে বুঝিয়ে দিত কিভাবে সৃষ্টির দ্বিতীয় দিনে ইশ্বরের মাথায় খেলে যে ডিমে মুরগীর বাচ্চা তৈরি হবে। তখন থেকেই তার ভীমরতী ধরা পাগলামির প্রথম চিহ্ন ফুটে ওঠে, যে কয়েক বছর পরে বলবে “খুব সমম্ভত শয়তান ঈশ্বরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে জিতে গিয়ে স্বর্গের সিংহাসনে বসে আছে, আর সরল লোকদের ফাঁদে ফেলার জন্য তার সত্যিকারের আত্মপরিচয় ফাঁস করছে না” । তার শিক্ষকের নির্ভীক দীক্ষায় দীক্ষিত হোসে আর্কাদিও সেগুন্দো কয়েক মাসের মধ্যে শয়তানকে বিভ্রান্ত করার ব্যাপারে ঐশ্বরিক মারপ্যাচ যতটা আয়ত্ত করে, ততটাই আয়ত্ত করে মোরগ লড়াইয়ের সব কৌশল । আমরান্তা ওকে বানিয়ে দেয় এক কলার টাইসহ লিনেনের কোট, কিনে দেয় একজোড়া সাদা জুতো আর সোনালী অক্ষর দিয়ে সিরিওর (গীর্জার সবচেয়ে বড় মোমবাতি) ফিতের উপর লিখে দেয় ওর নাম।

প্রথম কমুনিয়নের দু রাত আগে ফাদার আন্তোনিও ইসাবেল ওকে সঙ্গে নিয়ে নিজেদের বন্ধ করেন গীর্জার পোশাক বদলাবার ঘড়ে এক পাপের অভিধান নিয়ে। তালিকাটা ছিল এতই দীর্ঘ যে সন্ধ্যে ছটায় ঘুমোতে অভ্যস্ত প্রৌড় ফাদার তালিকা শেষ হবার আগেই চেয়ারে ঘুমিয়ে পড়েন। এই জেরাটা হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার জন্য হয়ে ওঠে ব্যাপারটার এক বিস্ময়কর উন্মোচন। ফাদারের করা, মেয়েদের সাথে খারাপ কিছু করেছে কিনা এ প্রশ্ন তাকে আশ্চর্যান্বিত করে না, আর আন্তরিকতার সাথে সে নেতিবাচক উত্তর দেয়। কিন্তু পশুদের সাথে করেছে কিনা প্রশ্ন করা হলে সে বিপর্যস্ত হয়ে পরে। মে’র প্রথম শুক্রবার কৌতুহলে জর্জরিত হোসে আর্কাদিও সেগুন্দো প্রথম কমুনিয়ন গ্রহণ করে । আরও পরে অসুস্থ পেত্রনিওকে, (পাথরের ঘড়ের বাসিন্দা গীর্জার চুড়ায় বাস করত বলে নাম ছিল) যে বাস করত গীর্জার চুড়ায়, আর সকলে মনে করত সে বাদুর খেয়ে বাঁচে, তাকে হোসে আর্কাদিও সেগুন্দো ব্যাপারটা নিয়ে প্রশ্ন করে, আর পেত্রনিও উত্তর দেয় “কিছু পাপী খীষ্টান আছে যারা মাদী গাধার সাথে ব্যাপারটা করে”। হোসে আর্কাদিও প্রচন্ড কৌতুহল দেখিয়ে এতই ব্যাখ্যা চায় যে পেত্রনিওর ধৈর্যচ্যুতি ঘটে।
-“আমি মঙ্গলবার রাতে যাই”- স্বীকার করে- “যদি কাউকে কিছু না বলার প্রতিজ্ঞা করিস তাহলে পরের মঙ্গলবার তোকে নিয়ে যাব”।
সত্যিই সত্যিই পরের মঙ্গলবার চুড়া থেকে এক কাঠের টুল নিয়ে নামে সে, সেটা যে কি কাজে লাগে তখন পর্যন্ত কারুরই তা জানা ছিল না। আর হোসে আর্কাদিওকে সঙ্গে করে নিয়ে যায় নিকটবর্তী এক খামারে। সেই নৈশচারনে ছেলেটা এতই উৎসাহী হয় যে সে কাতারিনোর দোকানে যাওয়ার আগে অনেক সময় ব্যয় করে এই নৈশ অভিযানে। সে হয়ে উঠে মোরগ লড়াইয়ে পুরুষ। “এই সব জীবগুলো অন্য জায়গায় নিয়ে যাবি”। প্রথম বার উচু স্তরের এই লড়াইয়ে জীবগুলোসহ ওকে ঢুকতে দেখে বলে উরসুলা, “মোরগ এই বাড়িতে যথেষ্ট তিক্ততা নিয়ে এসেছে, তোকে আর আনতে হবে না”। কোন বির্তকে না গিয়ে হোসে আর্কাদিও সেগুন্দো সেগুলো নিয়ে যায় তার দাদী পিলার তেরেনেরার কাছে আর পালন করতে থাকে ওখানে। দাদী ওকে বাড়ীতে পাবার জন্য ওর যখন যা কিছু দরকার তা দেবার ইচ্ছে প্রকাশ করে। শীিঘ্রই ফাদার আন্তোনিও ইসাবেল থেকে পাওয়া প্রজ্ঞা দিয়ে সে মোরগ লড়াইয়ে এতই ভাল করে যে সেটা থেকে আয় হওয়া অর্থ শুধুমাত্র যে মোরগের দল বৃদ্ধি করতে যথেষ্ট পরিমাণে ব্যয় করে তাই নয়, পুরুষ হিসেবেও তার যথেষ্ট সন্তুষ্টি আসে। উরসুলা ওকে তার যমজ ভাইর সঙ্গে তুলনা কোরে বুঝতে পারত না কিভাবে দুই যমজ ভাই যারা ছোটবেলা সব কিছু করত একটি মাত্র মানুষের মত তা কি করে শেষ পর্যন্ত এত ভিন্ন হয়ে পরে। কিন্তু তার এই বিহ্বলতা বেশীদিন থাকে না, কারন অল্প সময়ের মধ্যেই আউরেলিয়ানো সেগুন্দো আলস্য আর উশৃঙ্খলতার নিদর্শন দিতে থাকে। যতদিন সে মেলকিয়াদেসের সঙ্গে ছিল ততদিন সে ছিল আত্মমগ্ন, যেমনটি ছিল আউরেলিয়ানো যুবক অবস্থায়, কিন্তু নীরলান্ডের চুক্তির কিছু আগে এক আকস্মিক ঘটনা তাকে আত্মমগ্নতা থেকে বের করে আনে আর সে পৃথিবীর সত্যতার মুখোমুখি হয়। এক যুবতী মেয়ে যখন একটা একর্ডিওন বিক্রির লটারীর টিকিট বিক্রি করছিল তখন খুব পরিচিত লোকের মত অভিবাদন জানায়। আউরেলিয়ানো সেগুন্দো অবাক হয় না কারন তার ভাইয়ের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলায় প্রায়ই এমন ঘটনা ঘটত। আউরেলিয়ানো তার ভুল ভাঙায় না, এমনকি যখন সে কান্নাকাটি করে তার মনকে নরম করানোর চেষ্টা করছে তখনও নয়, আর শেষমেশ নিয়ে যায় নিজের ঘরে। প্রথম সাক্ষাতের দিন থেকে ওকে এতই ভাল লাগে মেয়েটার যে সে আউরেলিয়ানোকে একর্ডিয়ানটা জেতানোর জন্য কারসাজি করে, দুই সপ্তাহ পর আউরেলিয়ানো সেগুন্দো বুঝতে পারে যে একই ব্যক্তি মনে করে মেয়েটা তার সঙ্গে আর তার ভাইয়ের সঙ্গে পালা করে শুচ্ছে, আর তার এই ভূল ভাঙানোর বদলে ঘটনাটা তাকে আরও বেশী আনন্দ দেয়। ব্যাপারটাকে দীর্ঘায়িত করার জন্য আর মেলকিয়াদেসের ঘড়ে ফিরে যায় না সে। সেই সময়ে বাড়িতে দুটি শোকপর্ব থাকায় উরসুলার আপত্তি সত্ত্বেও বিকেলটা কাটিয়ে দিত সে শুনে শুনে একর্ডিয়ান বাজানো শিখে, আর তখন উরসুলার কাছে একর্ডিয়ন ছিল ফ্রান্সিস্কো এল অমব্রের মত নিচূ স্তরের ভবঘুড়ের জন্য মানানসই বাদ্যযন্ত্র। তা সত্ত্বেও আউরেলিয়ানো সেগুন্দো হয়ে ওঠে একর্ডিয়ান বাদনে ভীষনভাবে পটু , বিয়ে করে ছেলে মেয়ে হবার পরও বাজাতে থাকে সে ওটা, আর ভবিষ্যতে হয়ে ওঠে মাকন্দোতে সম্মানিত লোকদের মধ্যে একজন।
দুইমাস তার ভাইর সঙ্গে ভাগ করে ভোগ করা যুবতীকে সে নজর রাখতো চলা ফেরায়, ওদের পরিকল্পনা ভঙ্গ করায়, যখন নিশ্চিত হত যে হোসে আর্কাদিও সেগুন্দো সেই রাতে দুজনের রক্ষিতার সঙ্গে সাক্ষাত করছে না তখন সে ওর সঙ্গে শুতে যেত। এক সকালে সে বুঝতে পারে যে সে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। দুদিন পরে ভাইকে সে পায় ঘামে ভিজে গোছলখানার থাম ধরে অঝোরে কান্নারত অবস্থায়, আর সে বুঝতে পারে ব্যাপারটা। ভাই স্বীকার করে যে মেয়েটা তাকে তাড়িয়ে দিয়েছে কারণ সে নিয়ে গিয়েছে, মেয়েটার ভাষায়, খারাপ জীবন যাপনের এক অসুখ। পিলার তেরনেরা রোগ সারানোর যে ব্যবস্থাটা দিয়েছে, তাও বলে দেয় সে আউরেলিয়ানো সেগুন্দোকে । আউরেলিয়ানো নিজেকে লুকিয়ে লুকিয়ে ডোবায় গা জ্বালিয়ে দেয়া পারম্যাঙানেট ও মুত্রবর্ধক পানির ভিতরে, আর তিন মাস পর আলাদা আলাদাভাবে দুজনেই গোপনে সেরে ওঠে। হোসে আর্কাদিও সেগুন্দো কখনই আর মেয়েটার কাছে ফেরে না, আর আউরেলিয়ানো সেগুন্দো মেয়েটার ক্ষমা পেয়ে ওর সাথেই আমৃত্যু থেকে যায়।

ওর নাম ছিল পেত্রা কতেস । মাকন্দোতে এসেছিল ঘোর যুদ্ধের মাসে, ঘটনাচক্রে বিবাহিত এক লটারি করে জীবন চালানো স্বামীর সঙ্গে, আর স্বামী মারা গেলে সে চালিয়ে যায় ব্যবসাটা । সে ছিল পরিচ্ছন্ন এবং কম বয়সী এক মুলাতো, যার হলুদ রঙের বাদামের মত চোখদুটো তার মুখে এনে দিত এক প্যান্থারের হিংস্রতা, কিন্তু মনটা ছিল তার উদার আর বিছানায় ছিল সে অসাধারণ পটু। যখন উরসুলা জানতে পারে হোসে আর্কাদিও সেগুন্দো মোরগলড়াই করে বেড়ায় আর আউরেলিয়ানো সেগুন্দো তার রক্ষিতার কোলাহলপূর্ণ পার্টিগুলোতে একর্ডিয়ান বাজায়, তখন তার বিশৃংঙ্খলায় পাগল হবার জোগাড়। যেন ওদের দুজনের মধ্যেই বংশগত সমস্ত দোষ এসে জমা হয়েছে, যেন বংশের কোনও গুণই তারা পায়নি। ফলে ঠিক করে কেউই আর ওদেরকে আউরেলিয়ানো ও হোসে আর্কাদিও বলে ডাকবে না। কিন্তু যখন আউরেলিয়ানো সেগুন্দোর প্রথম পুত্রসন্তান জন্ম নেয় তখন সে তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধাচারন করতে সাহস পায় না।
– “ঠিক আছে”- বলে উরসুলা- “কিন্তু এক শর্তে, আমি ওকে লালন করে বড় করব”।
যদিও বয়স শতবর্ষে পরেছে, ছানি পড়ে চোখ প্রায় অন্ধ তবুও শারীরিক সক্রিয়তা, চারিত্রিক দৃঢ়তা আর মানসিক ভারসাম্য ছিল তার অটুট। তার মত কেউই ছিল না যে নাকি সৎগুণ সম্পন্ন সেই লোককে গড়ে তুলতে পারবে যে নাকি কখনই যুদ্ধের কথা শোনে নি, শোনেনি মোরগ লড়াইয়ের কথা, মন্দ মেয়ে মানুষের কথা, বেপরোয়া অভিযানের কথা— যে চারটে সমস্যা উরসুলার মতে ডেকে এনেছে বংশের অধঃপতন, আর সেই লোকটাই আবার ফিরিয়ে আনবে বংশের হারানো সম্মান। “ও হবে পাদ্রী”- গাম্ভীর্য নিয়ে প্রতিজ্ঞা করে- “যদি ইশ্বর আমাকে আয়ু দান করেন তা হলে ও হবে পোপ”। সকলে হেসে ওঠে ওর কথা শুনে, শুধুমাত্র যারা শোবার ঘড়ে ছিল তারাই নয় বরঞ্চ সাড়া বাড়িতেই, যেখানে আউরেলিয়ানো সেগুন্দো জুটেছিল হল্লাবাজ বন্ধুদের সাথে, বিলিয়ে দেয়া যুদ্ধটার খারাপ স্মৃতিকে শ্যাম্পেনের ছিপির সাথে ক্ষণস্থায়ীভাবে স্মরণ করার জন্য।
– “পোপের সুস্বাস্থ্য কামনায়” টোষ্ট করে আউরেলিয়ানো সেগুন্দো।
আমন্ত্রিতরাও টোষ্ট করে একই সাথে। পরে বাড়ির মালিক বাজায় একর্ডিওন, পোড়ে বাজি আর সাড়া গ্রামে আনন্দোৎসবের জন্য ড্রামের ফরমাশ দেয়া হয়। ভোররাতে শ্যাম্পেনে ভিজে জবজবে আমন্ত্রিতরা ছয়টি গরু জবাই করে রাস্তায় ভীড় করা লোকের জন্য রেখে দেয়। কেউই মর্মাহত হয় না এতে। যেদিন থেকে আউরেলিয়ানো সেগুন্দো বাড়ির ভার নেয়, পোপের জন্মগ্রহণের মত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা না থাকলেও, এই ধরনের পার্টি ছিল নিত্যনৈমিত্তিক। কয়েক বছরের মধ্যে বিনা প্রচেষ্টায়, শুধু মাত্র অন্য গুণে, জলাধারের সবচেয়ে বেশি সম্পদের মালিক বনে যায় সে তার পালিত জীবজন্তুগুলোর অলৌকিকভাবে সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে। ওর ঘোটকী জন্ম দেয় তিনটি বাচ্চা একই সময়ে, মুরগীগুলো ডিম দেয় দিনে দুবার, শুকরগুলো মোটা তাজা হয়ে ওঠে বেপরোয়াভাবে আর কেউ বুঝতে পারে না এই অস্বাভাবিক বংশবৃদ্ধির কারন। যেন কোন যাদুবলে ঘটে চলেছে। “এখনি জমাতে থাক”- উরসুলা বলে তার অপরিণামদর্শী নাতির ছেলেকে “এই সৌভাগ্য তোর সবসময়ের জন্য থাকবে না।” কিন্তু আউরেলিয়ানো তার কথায় কান দেয় না। বন্ধুদের ভেজানোর জন্য সে যতই শ্যাম্পেনের ছিপি খুলত ততই পাগলের মত বাচ্চা দিত তার জন্তগুলো, আর ততই তার বিশ্বাস দৃঢ় হত যে কাজকর্মের সাথে এই সৌভাগ্যের কোনো সম্পর্ক নেই বরঞ্চ এসবের পিছনে কাজ করছে তার রক্ষিতা পেত্রা কতেসের প্রেম, যা কিনা প্রাকৃতিক ক্ষমতাকে উত্তেজিত করে তোলে। তার এই সম্পদের উৎসের ব্যাপারে সে এতই নিশ্চিত ছিল যে কখনো পেত্রা কতেসকে জীবজন্তুর থেকে দূরে সরাতো না, এমনকি বিয়ের পর সন্তান জন্মের পরও ফের্নান্দার সম্মতি নিয়ে তার সঙ্গে বাস করতে থাকে। দাদা পরদাদাদের মত শক্ত সমর্থ বিশাল শরীরের অধিকারী আউরেলিয়ানো সেগুন্দোর ছিল জীবনকে ভোগ করার প্রচন্ড ক্ষমতা ও এক অপ্রতিরোধ্য সৌহার্দ্য, যা নাকি আর কারও ছিল না। কিন্তু সে পালিত পশুপাখির দেখাশুনার জন্য সময় পেত না বললেই চলে। শুধুমাত্র পেত্রা কতেসকে পশুপাখীদের কাছ নিয়ে ঘোড়ায় তুলে সমস্ত খামার জুড়ে চড়িয়ে বেড়াতো যাতে করে তার মার্কাওয়ালা লোহার ছাপ মারা সমস্ত জানোয়ারই এক নীরারোগ্য সংখ্যাবৃদ্ধি রোগে আক্রান্ত হয়।
——————————-

আর্হেন্তিনার বুয়েনোস আইরেস-এর
এদিতোরিয়াল সুদামেরিকানা প্রকাশনী থেকে
প্রকাশিত ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’ উপন্যাসের
প্রথম সংস্করণের প্রচ্ছদ

——————————-
border=0
তার দীর্ঘ জীবনে যেমনটি ঘটেছিল অন্যান্য সমস্ত শুভ ঘটনার বেলায়, তেমনি এই বিশাল সৌভাগ্যেরও সুত্রপাত ঘটে হঠাৎ করেই। যুদ্ধ শেষের দিন পর্যন্ত পেত্রা কতেসের জীবিকা ছিল লটারি আর আউরেলিয়ানো সেগুন্দো মাঝে মাঝে উরসুলার সঞ্চয় হাতিয়ে নিত। আমুদে এক জুটি ছিল ওরা যারা প্রতিরাতে বিছানায় যাওয়া ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে দুশ্চিন্তা করত না। এমনকি পেত্রা কতেসের নিষিদ্ধ দিনগুলোতেও বিছানায় হুটোপুটি করত ওরা সকাল পর্যন্ত। “এই মেয়েটাই তোকে শেষ করে দিচ্ছে”- উরসুলা চিৎকার করত নাতির ছেলের উদ্দেশ্যে, যখন ঘুমের মধ্যে হাঁটা লোকদের মত তাকে বাড়ি ঢুকতে দেখত- “তোকে এমনভাবে বশ করেছে যে একদিন দেখবি পেটের মধ্যে এক ব্যাঙ নিয়ে পেটের ব্যথায় কাৎরাচ্ছিস।” তার স্থান পূরণের জন্য যে একজন কেউ আছে তা বুঝতে হোসে আর্কাদিও সেগুন্দোর অনেক সময় লেগে যায় কিন্তু সে বুঝতে পারে না তার ভাইর প্রবল কামাসক্তির ব্যাপারটা। তার মনে হত পেত্রা কতেস হচ্ছে অন্যসব সাধারণ মেয়েদের মতই, সে ভাল করে বলতে গেলে বিছানায় একেবারেই নিরুত্তাপ, আর ভালবাসার ব্যাপারে সম্পূর্ণভাবে অনভিজ্ঞ। উরসুলার চেঁচামেচিতে বধির, আর ভাইর উপহাসের তোয়াক্কা না করা আউরেলিয়ানো শুধুমাত্র ভাবত একটা কিছু বের করার যাতে করে পেত্রা কতেসের সঙ্গে ঘর বেধে তার ভরনপোষনের ব্যবস্থা হয়, আর ভাবত সে মরতে পারে পেত্রার সঙ্গে, মরতে পারে তার উপরে, তার নীচে, এক জ্বরাতপ্ত তান্ডবময় রাতে। এক শান্তিময়ী শেষ জীবনের প্রতি আকৃষ্ট কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া যখন আবার রোপ্যশালাটা খোলে, আউরেলিয়ানো সেগুন্দো ভাবে সোনার ছোট ছোট মাছ তৈরী করাটা হবে ভাল এক ব্যবসা। ধাতুর শক্ত পাত, কোন রকম ছাট-না-দেয়া অকল্পনীয় ধৈর্যের সাথে কর্নেল কিভাবে ধীর ধীরে সোনালী আঁশটেতে পরিণত করে তা দেখে গরম ছোট ঘড়টিতে কাটিয়ে দেয় ঘন্টার পর ঘন্টা সে। কাজটাকে তার মনে হয় ভীষন কষ্টকর, প্রচন্ড যত্নের প্রয়োজন, আর পেত্রা কতেসের আকর্ষণ তার কাছে এতই লোভনীয় যে তিন সপ্তাহের পর রৌপশালা থেকে উধাও হয়ে যায়। ব্যাপারটা ঘটেছিল যখন পেত্রা কতেস খরগোশ লটারী করছিল। খরখোশগুলো এত দ্রুত প্রজননক্ষম হত আর এত দ্রুত সংখ্যা বৃদ্ধি হত ওদের, প্রথমদিকে কোনো রকমে লটারীর টিকিট বিক্রির সময়ে আউরেলিয়ানো সেগুন্দো এই ভীতিপ্রদ বংশবৃদ্ধির ব্যাপারটা খেয়াল করেনি। কিন্তু এক রাতে যখন গ্রামের কেউই আর খরগোশের লটারীর কথা শুনতে রাজী নয় তখন উঠানের দেয়ালে এক গর্জন অনুভব করে। “ভয় পেও না”- বলে পেত্রা কতেস- “ওগুলো হচ্ছে খরগোশ।” জন্তুদের শোরগোলে সে রাতে ঘুম হয় না তাদের, আর ভোর হলে আউরেলিয়ানো সেগুন্দো দরজা খুলে দেখতে পায় উঠানে গিজগিজ করছে প্রভাতের উজ্জলতায় নীলাভ খরগোশ। হাসতে হাসতে মারা যাবার জোগার পেত্রা কতেসের, ওর সঙ্গে রসিকতা করার লোভ সামলাতে পারে না।
– “সবগুলোই জন্ম নিয়েছে গত রাতে”- বলে।
– “কি ভয়ংকর “- বলে সে- “গরু দিয়ে চেষ্টা করিস না কেন?”
কিছুদন পর পেত্রা কতেস উঠানটা খানিক খালি করার উদ্দেশ্যে খরগোশগুলোর বদলে এক গরু আনে যেটা দুইমাস পর একসঙ্গে তিনটি বাচ্চা দেয়। এভাবেই শুরু হয় সব। রাতারাতিই আউরেলিয়ানো সেগুন্দো মালিক হয়ে যায় প্রচুর জমাজমির ও গবাদিপশুর, আর ওগুলোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে কোনো রকমে সময় করে উঠতে পারে উপচেপরাড়া আস্তাবল ও শুকরের খোয়াড়গুলোকে বড় করার। উম্মত্ততাপূর্ণ এই সৌভাগ্যটা একই সাথে তার জন্য হাসিরও উদ্রেক করত আর এই আনন্দের ভার নামাতে লাগামছাড়া আচরণে বাধ্য হত সে। “অ্যাই গরুর পাল ভাগ, জীবন বড়ই ছোট”- চিৎকার করত। উরসুলা নিজেকে প্রশ্ন করত সে কিসের মধ্যে ঢুকে পরেছে। সেকি চুরি করছে নাকি গরু চোর বনে গেছে। আর যখন প্রতিবার ফেনা মাথায় ঢেলে মজা পাওয়ার উদ্দেশ্যে শ্যাম্পেনের ছিপি খুলত, তখন সে চিৎকার করত এই অপচয়ের জন্য। ব্যাপারটা আউরেলিয়ানো সেগুন্দোকে এতই বিরক্ত করত যে একদিন খোশমেজাজে ঘুম থেকে উঠে এক বাক্স টাকা, এক ক্যান আঠা ও একটা বুরুশ নিয়ে সে বাড়িতে হাজির হয় আর ফ্রান্সিস্কো এল অম্ব্র্রের পুরোনো গানগুলো গলা ছেড়ে গাইতে গাইতে বাড়িটা মুড়ে দেয় ভিতর-বাহির, উপর-নীচ, আগাপাশ তলা এক পেসোর নোট দিয়ে। যখন পিয়ানোটা ঢুকানো হয় তখনকার সেই প্রাচীন সাদা রং করা ম্যানশনটা রহস্যময় মসজিদের রূপ ধারন করে। এই অপচয়ের মহিমা দেখতে পরিবারের সকলের হৈচৈয়ের মধ্যে উরসুলার চেঁচামেচির মধ্যে সাড়া গ্রাম ভেঙ্গে পড়া আনন্দোচ্ছাসপূর্ণ লোক দিয়ে উপচে পরে রাস্তা, আর এরই মধ্যে আউরেলিয়ানো শেষ করে প্রবেশ পথ থেকে গোসলখানা ও শোবার ঘরসহ উঠান পর্যন্ত টাকা লাগানো, আর পরে উঠোনে ছুড়ে দেয় বারতি টাকাগুলো।
“এখন”- শেষমেষ বলে “আশা করি এ বাড়ির কেউই আর আমাকে টাকা নিয়ে কথা বলবে না।”
এ রকমই ঘটে। উরসুলা চুনকামের বড় বড় চাপড়ার সাথে সেঁটে থাকা নোটগুলোকে খুলে নিয়ে আবার সাদা রং করায় বাড়িটা। “হায় ইশ্বর”- অনুনয় করে “আমাদের আবার গরীব করে দে, যেমনটি ছিলাম মাকন্দো পত্তনের সময় যাতে অন্য জীবনে আমাদেরকে এই অপচয়ের মাশুল না গুনতে হয়”। ওর অনুনয় শোনা হয় উল্টো ভাবে। নোটগুলো আলাদা করতে থাকা মজুরদের একজন অসাবধানতাবশত হোঁচট খায় সেন্ট জোসেফের প্লাস্টার দিয়ে বানানো এক পেল্লায় মূর্তির সাথে, যেটাকে কেউ যুদ্ধের শেষের বছরগুলোতে রেখে গিয়েছিল, আর মেঝেতে পড়ে ফাপা মূর্তিটা ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়। সেটা ছিল সোনার মোহর দিয়ে ঠাসা আর বিশাল এই মূর্তিটা যে কে নিয়ে এসেছিল তা কেউই মনে করতে পারে না। “তিনজন লোক নিয়ে এসেছে এটাকে”- বর্ণনা দেয় আমারান্তা, “ওরা আমাকে বলে বৃষ্টি থামা পর্যন্ত রেখে দিতে আর আমি বলেছিলাম ঐখানে রাখতে, কোনাটাতে, যেখানে কেউই হোঁচট খাবে না ওটার সাথে। সাবধানতার সাথে ওখানেই রাখে তারা আর তখন থেকেই ওখানেই থাকে কারন ওটা নিতে কখনই তারা ফেরেনি।” শেষের দিকে উরসুলা মোমবাতি জ্বালিয়ে হাটুমুড়ে আরাধনা করত সেখানে কিন্তু কখনই সন্দেহ করেনি যে সেন্টের বদলে সে বন্দনা করছে দুশ কিলোগ্রাম স্বর্নকে। অনিচ্ছাকৃত মূর্তিপূজা তার মনস্তাপকে করে আরও গভীর। থু থু দেয় স্বর্নমুদ্রার ঐ দর্শনীয় স্তুপের উপর, আগে অথবা পরে ঐ তিন লোক ফিরে আসবে দাবী করতে, এই ভেবে ক্যানভাসের তিনটি বস্তার মধ্যে সেগুলো ঢুকিয়ে গোপন এক জায়গায় পুতে ফেলে। অনেকদিন পর তার বাধ্যর্ক্যের কঠিন দিনগুলোতে বাড়ির সামনে দিয়ে যাতায়াত করা ভ্রমনকারীদের আলাপে বাগড়া দিয়ে সে জিজ্ঞেস করত,যে যুদ্ধের সময় প্লাস্টার দিয়ে বানানো এক মূর্তি তারা বৃষ্টি থামার অপেক্ষায় জমা রেখেছিল কিনা।
এই সমস্ত ব্যাপারগুলো, যেগুলো উরসুলাকে হতাশ করত, তখনকার দিনে এগুলো ছিল একেবারেই সাধারণ ব্যাপার। মাকন্দো ডুবে ছিল এক অলৌকিক বৈভবে। পত্তনকারীদের কাদা আর গোল পাতার ছাউনিগুলোর বদলে তখন এসেছে ইটের দালান, কাঠের জানালার পর্দা আর সিমেন্টের মেঝে, যা কিনা বেলা দুটোর গরমকে করত আরও সহনীয়, হোসে আর্কাদিওর সেই প্রাচীন গ্রামের শুধুমাত্র অবশিষ্ট ছিল, ধুলো ভরা দৃঢ়তম অবস্থায়ও টিকে থাকার নিয়তি নিয়ে জন্মানো সেই আলমন্ড গাছগুলো, আর স্ফটিক জলের সেই নদী যেটার প্রাগৈতিহাসিক পাথরগুলো ধুলো হয়ে যায় হোসে আর্কাদিও সেগুন্দোর উন্মত্ত হ্যামারের আঘাতে, যখন সে একটা নৌপথ স্থাপনের চেষ্টা করে। সেটা ছিল তার পরদাদার স্বপ্নের মতই এক অলীক স্বপ্ন, কারন নীচের পাথুরে তলদেশ আর স্রোতের অসংখ্য বাধাগুলোর ফলে সমুদ্র পর্যন্ত নৌ চালনা ছিল অসম্ভব। কিন্তু অদৃষ্টপূর্ব অপরিণামদর্শিতার তাড়ায় হোসে আর্কাদিও সেগুন্দো একগুঁয়ের মত লেগে থাকে পরিকল্পনাটাতে। তার আগ পর্যন্ত সে এ ধরনের কোনো কল্পনার বিন্দুমাত্র লক্ষনও দেখায়নি। পেত্রা কতেসের সাথে তার অনিশ্চিত রোমাঞ্চকর সম্পর্কটা ছাড়া সে আর কোনো মেয়ের সঙ্গেই পরিচিত হয়নি। উরসুলা ওকে মনে করত এ পর্যন্ত বংশের ইতিহাসে সবচেয়ে শান্তশিষ্ট ব্যক্তির জলন্ত উদাহরণ হিসেবে, যে নাকি এমনকি মোরগের লড়াইয়ের মত ব্যাপারেও নাম করতে সক্ষম হয়নি। কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া ওকে সমুদ্র থেকে বারো কিলোমিটার দূরের আটকে পড়া স্প্যানীয় জাহাজের গল্প বলে যেটার কয়লায় পরিণত হওয়াটা সে নিজেই দেখেছিল যুদ্ধের সময়। সেই গল্পটা, যেটা বহু মানুষের কাছে অনেকদিন যাবৎ ছিল কল্পনাপ্রসূত, সেটাই ছিল হোসে আর্কাদিও সেগুন্দোর কাছে বিরাট এক উদঘাটন।

সবচেয়ে বেশী দাম হাকানো ক্রেতার কাছে নিলামেমোরগগুলো বিক্রি করে সে, লোক নিয়োগ করে, যন্ত্রপাতি কিনে সে লেগে যায় পাথর ভাঙ্গা ও খাল কাটার সমস্ত বাঁধা পরিস্কারে, এমনকি জলপ্রপাত সমতল করার মত বিশাল অভিযানে। “এসবের সবকিছুই আমার মাথার মধ্যে গেথে আছে”- চিৎকার করত উরসুলা- “সময় যেন গোল হয়ে আবার ফিরে এসেছে প্রারম্ভে।” যখন সে মনে করে নদীটা নৌ চালানোর উপযুক্ত তখন হোসে আর্কাদিও সেগুন্দো তার অভিযানের কথাটা পুংখানুপুংখরূপে জানায়, আর অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় টাকা দেয় আউরেলিয়ানো সেগুন্দো। উধাও হয়ে যায় সে বহুদিনের জন্য। যখন সকলে বলাবলি করে যে জাহাজ কেনার পরিকল্পনাটা আসলে ভাইয়ের জমানো টাকা হাতিয়ে নেবার ফন্দি ছাড়া কিছুই নয় তখনই গ্রামের দিকে এগিয়ে আসা এক অদ্ভুত জাহাজের কথা শোনা যায়। হোসে আর্কাদিও সেগুন্দোর পরিকল্পনার কথা ভুলে যাওয়া মাকন্দোবাসীরা নদী পাড়ে ছুটে গিয়ে অবিশ্বাসভরে হতবাক হয়ে দেখে মাকন্দোতে ভেরা প্রথম আর শেষ জাহাজটাকে। ওটা আসলে বিশ জন লোক গুন টেনে চালানো গাছের গুড়ি দিয়ে বানানো ভেলা ছাড়া আর কিছুই ছিল না, ভেলার সামনের দিকে দাড়িয়ে চোখে এক সন্তুষ্টির উজ্বলতা নিয়ে হোসে আর্কাদিও সেগুন্দো সেই ব্যয়বহুল কাজের তদারকি করছে। তার সঙ্গে ছিল চোখ ধাঁধানো একদল সম্ভ্রান্ত মহিলা যারা রোদ প্রতিরোধ করতে মাথায় চড়িয়েছে মনোহর টুপি, তাদের স্কন্ধে ছিল দামী সিল্কের ওড়না, মুখে রংচঙ্গে ক্রীম, চুলে প্রাকৃতিক ফুল হাতে সোনার সাপাকৃতির বাজুবন্ধ আর ছিল হীরে দিয়ে বাধানো দাত। গাছের গুড়ির ভেলটাই ছিল একমাত্র যানবাহন যেটাকে হোসে আর্কাদিও সেগুন্দো মাকন্দো পর্যন্ত নিতে পারে, আর সফল হয় শুধুমাত্র একবারই, কিন্তু কখনই সে তার অভিযানের ব্যর্থতা স্বীকার করেনি বরং উল্টো অভিযানটাকে তার অভিপ্রায়ের বিজয়ের প্রমাণ হিসেবে ঘোষণা করে। ভাইয়ের কাছে সমস্ত বিস্তারিত হিসেব বুঝিয়ে দিয়ে শীঘ্রই আবার মোরগলোড়াইয়ের গৎবাঁধা জীবনে ডুবে যায়। একমাত্র যেটা বেঁচে থাকে সেই দুভার্গজনক উদ্যোগ থেকে, তা হচ্ছে ফ্রান্সের মহিলাদের মাকন্দোয় নিয়ে আসা এক ঝলক পরিবর্তনের হাওয়া, যাদের অসাধারন শিল্পকৌশল পাল্টে দেয় প্রণয়ের গতানুগতিক ধারা, যাদের সমাজে ভালভাবে বাচার অনুভূতি কাতারিনোর প্রাচীন দোকানটাকে শেষ করে দিয়ে রাস্তাটাকে রূপান্তর করে জাপানি লন্ঠন আর স্মৃতিকাতর ছোট ছোট অর্গানের বাজারে, ওরাই ছিল মাকন্দোতে রক্তক্ষয়ী সেই উৎসবের উদ্যোক্তা যেটাতে মাকন্দো ডুবে ছিল তিন দিনব্যাপি এক উন্মত্ততায় আর যার একমাত্র দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব হচ্ছে আউরেলিয়ানো সেগুন্দোর সাথে ফের্নান্দা দেল কার্পিওর পরিচয়ের সুযোগ।

রেমেদিওস লা বেইয়াকে ঘোষণা করা হয় (উৎসবের) রানী হিসেবে। ওর উদ্বিগ্ন করার মত সৌন্দর্যে ভীত উরসুলা, নাতির মেয়ের রানী নির্বাচনে বাধা দিতে পারে না। তখন পর্যন্ত সে সফল হয়েছিল যাতে রেমিদিওস রাস্তায় না বেরয়। আমারান্তার সাথে মাস-এ যেতে বাধা দিতে না পেরে ওকে বাধ্য করে কালো এক কাপড় দিয়ে মুখ ঢাকতে। ধর্মে অল্প নিষ্ঠ লোকেরা যারা যাজকের ছদ্মবেশে কাতারিনোর দোকানে ধর্মবিরুদ্ধ মাস গাইত, তারা গীর্জায় যেত যদি শুধু মাত্র এক পলকের জন্যও রেমেদিওস লা বেইয়ার, যার কিংবদন্তীর মত রূপের কথা সাড়া জলভূমি জুড়ে আলোচিত হত আবেগতপ্ততা নিয়ে, তার মুখ যদি এক পলকের জন্যও দেখা যায় সেই আশায়। অনেক দিন পার হবার পর তারা শেষ পর্যন্ত সেটা দেখতে পায় যদিও ওদের জন্য এই দেখাটা না হওয়াই ভাল ছিল, কারন ওদের মধ্যে অধিকাংশই আর কখনই শান্তিপুূর্ন ঘুমকে পুনরুদ্ধার করতে পারেনি। যে এই দেখাটাকে সম্ভব করে সে ছিল এক ভিনদেশী, যে সবসময়ের জন্য হারিয়ে ফেলে তার মানসিক স্থিরতা, যে জড়িয়ে যায় দুর্দশা আর হতাশার জালে, আর অনেক বছর পর এক রাতের ট্রেনের নিচে পড়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়, যখন সে রেললাইনের উপর ঘুমিয়ে পরে। সবুজ কর্ডের জামা ও এমব্রয়ডারিযুক্ত জ্যাকেট পড়া যুবককে যে মুহূর্তে গীর্জায় প্রথম দেখা যায়, কারো মনে কোন সন্দেহ ছিল না যে সে এসেছে অনেক দূর থেকে, হয়তবা বাইরের কোনো বিক্ষিপ্ত শহর থেকে, রেমেদিওস লা বেইয়ার যাদুকরী মোহে আকৃষ্ট হয়ে। সে ছিল এতই সুন্দর এতই মার্জিত ও শান্তশিষ্ট যে ভালভাবে তুলনা করা হলে পিয়েত্র ক্রেসপিকে মনে হবে নেহায়েত এক অকালপরিণত, আর অনেক মেয়েই ঈর্ষাজনিত ফিসফিসায় যে আসলে যুবকটারই মুখ কালো কাপর দিয়ে ঢাকা উচিৎ ছিল। সে মাকন্দোর কারও সঙ্গেই বাকবিনিময় করত না। রোববার ভোরে রূপার রেকাব আর মখমলের কম্বল চড়ানো এক ঘোড়ায় চড়ে রূপকথার রাজকুমারের মত সে আবির্ভূত হত আর মাস শেষ হলেই গ্রাম পরিত্যাগ করত।

তার উপস্থিতির এতই ক্ষমতা ছিল যে যখন প্রথমবার তাকে গীর্জায় দেখা যায় সবাই ধরে নেয় যে ওর এবং রেমেদিওস লা বেইয়ার মধ্যে স্থাপিত হল এক নীরব উত্তেজনাপূর্ণ দ্বৈরথের, এক অপ্রত্যাহার্য প্রতিযোগিতার, যার চূড়ান্ত পরিণতি হবে শুধুমাত্র হয় ভালোবাসা নয়তোবা মৃত্যুতে। আবির্ভূত হবার ষষ্ট রোববারে যুবকটি হাজির হয় এক হলুদ গোলাপ হাতে নিয়ে। সব সময়ের মতই দাড়িয়ে মাস শুনে শেষ হবার পর রেমেদিওস লা বেইয়ার পথ আগলায়, আর নিঃসঙ্গ গোলাপটাকে অর্পন করে। স্বাভাবিক ভঙ্গিতে গোলাপটা নেয় রেমেদিওস, যেন এই স্তুতির জন্য সে প্রস্তুুত হয়েই ছিল আর মুহূর্তের জন্য নেকাব সড়িয়ে মৃদু হাসির সাথে ধন্যবাদ দেয়। ও টুকুই ছিল সমস্ত ঘটনা। কিন্তু শুধুমাত্র যুবকের জন্যই নয়, যেসমস্ত পুরুষদের এই দুর্ভাগ্যজনক অভিজ্ঞতার সুযোগ হয়েছিল, তাদের জন্য সেটা ছিল এক অনন্ত মুহূর্ত।

তখন থেকেই সেই যুবক রেমেদিওস লা বেইয়ার জানালার কাছে এক গানের দল নিয়ে সন্ধ্যে থেকে সকাল পর্যন্ত বাজিয়ে যেত। আউরেলিয়ানো সেগুন্দোই ছিল একমাত্র বাক্তি যে নাকি ওর জন্য আন্তরিক সহানুভূতি অনুভব করে, আর তার এই উপর্যুপরি প্রচেষ্টাতে ভাঙন ধরানোর চেষ্টা চালায়। “আর সময় নষ্ট করো না”- এক রাতে ওকে বলে -“এ বাড়ির মেয়েগুলো খচ্চরের (হাবা অর্থে) চেয়েও অধম”। ওকে বন্ধুত্বের আমন্ত্রণ জানায় শ্যাম্পেন দিয়ে গোসলের, তাকে বোঝানোর চেষ্টা করে যে এ পরিবারের মেয়েদের রয়েছে পাথর দিয়ে বানানো হৃদয়, কিন্তু সে তার একগুয়েমিতে চিড় ধরাতে বিফল হয়। অন্তহীন রাতগুলোর গান বাজনায় উত্তেজিত হয়ে কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া পিস্তল দিয়ে তার এই মনস্তাপ সমাপ্তি ঘটানোর হুমকি দেয়। লোকটাকে বিরত করতে পারে না সে, শুধুমাত্র নিজের দুঃখজনক মনোবলহীনতা রক্ষা করে কোনো মতে। মার্জিত ত্রুটিহীন লোকটা হয়ে ওঠে কুৎসিত জরাজীর্ন এক মানুষে। গুজব ছিল সে ত্যাগ করে এসেছে ক্ষমতা আর সম্পদের পাহাড়, যদিও কেউই কখনই তার আবাসস্থল সম্মন্ধে জানতে পারে নি। সে হয়ে পরে ঝগড়াটে, মারামারি করে পান শালায়, আর ভোরবেলা জেগে ওঠে কাতারিনোর দোকানে নিজের করা নোংরা দিয়ে মাখামাখি অবস্থায়, আর তার নাটকের সবচেয়ে করুন ব্যাপারটা হচ্ছে রেমিদিওস লা বেইয়া ওর দিকে মুখ তুলেও তাকায়নি, এমনকি সে যখন রাজকুমারের বেশে গীর্জায় গিয়ে হাজির হত তখনও না। রেমেদিওস গোলাপটা গ্রহণ করেছিল কোনো খারাপ মনভাব না নিয়েই, ভাল করে বলতে গেলে ব্যাপারটার আতিশয্যে আনন্দ পেয়ে, আর নেকাবটা সড়ায় যুবককে ভাল করে দেখতে, নিজেরটাকে দেখাতে নয়।
সত্যিকার অর্থে রেমেদিওস লা বেইয়া এই বিশ্বের কেউ ছিল না। বয়োসন্ধির অনেক পরেও সান্তা সোফিয়া দে লা পিয়েদাদকে ওর গোসলের এবং কাপড় পরানোর মত কাজ করতে হত, এমনকি যখন নিজে নিজেই কাজগুলো করতে পারত তখন তাকে পাহারা দিতে হত যেন নিজের মলমাখানো কাঠি দিয়ে দেয়ালে জীবজন্তু আঁকতে না পারে। বিশ বছরে পা দেয় সে পড়তে ও লিখতে না শিখে, খাবার টেবিল ছুড়ি কাটা চামচ ব্যবহার না করে নগ্ন অবস্থায় সাড়া বাড়িতে ঘুড়ে, কারন তার প্রকৃতিই ছিল যে কোনো ধরনের গতানুগতিকতার বাইরে। যখন যুবক কমান্ডার ওকে প্রেম নিবেদন করে, সরলতার সাথে সে প্রত্যাখান করে, কারন সে তার ছেলেমানুষি দেখে আশ্চর্য হয়। আমারান্তাকে বলে “দেখ, লোকটা বলে যে, আমার কারনে সে মারা যাচ্ছে, যেন আমি তার পেটের ব্যাথ্যা।” যখন সত্যিই সত্যিই তাকে জানালার পাশে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় রেমেদিওস লা বেইয়া নিশ্চিত হয় লোকটিকে নিয়ে তার প্রথম ধরনার ব্যাপারে।
– “দেখলে”- মন্তব্য করে- “সে ছিল সত্যিই বোকা।”
মনে হত যেন যে কোনো গতানুগতিকতার বাইরের বাস্তবতাকে দেখবার ক্ষমতা ছিল তার। অন্তত কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া তাই মনে করত। ওর কাছে রেমেদিওস লা বেইয়া কোন মানসিক প্রতিবন্ধি ছিল না, সে বিশ্বাস করত ঠিক তার উল্টো “এটা যেন ও বিশ বছরের যুদ্ধ শেষে ফিরেছে”- কর্নেল বলত। এদিকে উরসুলা ইশ্বরকে ধন্যবাদ দিত পরিবারে ওর মত অনন্যসাধারণ খাঁটি একজন মানুষকে পুরস্কার স্বরূপ পাঠানোর জন্য, আবার একই সাথে ওর সৌন্দর্য্য করত তাকে চিন্তিত, এটাকে তার মনে হত পরস্পরবিরোধী গুণ যা কিনা সারল্যের কেন্দ্রবিন্দুতে এক শয়তানি ফাঁদ। এই কারনেই সে ওকে সমস্ত পৃথিবী থেকে আড়ালে রাখার সিদ্ধান্ত নেয়, রক্ষা করতে চায় যে কোন জাগতিক প্রলোভন থেকে। কিন্তু তার জানা ছিল না যে মাতৃগর্ভ থেকেই রেমেদিওস লা বেইয়া মুক্ত ছিল যে কোন ধরনের সংক্রমন থেকে, উরসুলার চিন্তা ভাবনার আশপাশ দিয়েও যায়নি যে কার্নিভালের মত তুলকালাম কান্ডে তাকে রানী মনোনীত করা। কিন্তু বাঘের ছদ্মবেশ নেবার মত উদ্ভট চিন্তায় উত্তেজিত আউরেলিয়ানো সেগুন্দো ফাদার আন্তোনিও ইসাবেলকে বাড়িতে নিয়ে যায় উরসুলাকে বোঝাতে যে যেমন উরসুলা বলে কার্নিভাল কোন মূর্তিপূজকদের উৎসব নয় বরং এটা একটা ক্যাথলিক প্রথা। শেষ পর্যন্ত বুঝতে পেরে অনিচ্ছাসত্ত্বেও মুকুট পরানোর অনুমতি দেয়।

রেমেদিওস বুয়েন্দিয়ার রানী হবার খবর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জলাভুমির সীমানা পার হয়ে এমন সব জায়গাতে পৌঁছায় যেখানে তখন পর্যন্ত তার প্রচন্ড রূপের কথা কেউ জানত না। কিন্তু তার নামের পদবীটাকে তারা মনে করত বিধ্বংসীমূলক কার্যক্রমের প্রতীক আর তারা একারণে অস্বস্তি বোধ করে। কিন্তু অস্বস্তিটা ছিল অমূলক। সেই সময় নিরীহ ব্যক্তি বলে যদি কাউকে বোঝাতো সে ছিল বৃদ্ধ মোহভ্রষ্ট কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া, যে নাকি ক্রমে ক্রমে জাতির বাস্তবতার সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক হারিয়ে ফেলছে। রৌপশালায় আবদ্ধ থেকে বাইরের পৃথিবীর সাথে তার একমাত্র সংযোগ ছিল সোনার মাছগুলোর ব্যবসা। শান্তি স্থাপনের প্রথম দিকটায় তার বাড়ির পাহারাদার এক সৈন্য জলভূমির গ্রামগুলোতে চলে যেত আর ফিরে আসতো অর্থ আর খাবারের বোঝা নিয়ে। সে বলত রক্ষনশীল সরকার উদারপন্থি দলের সমর্থন নিয়ে এমন এক আইন বানাচ্ছে যেখানে প্রতি প্রেসিডেন্ট একশত বছর ক্ষমতায় থাকতে পারবে। বলত, শেষ পর্যন্ত পবিত্র সী-র চুক্তিটা স্বাক্ষরিত হয়েছে, রোম থেকে হীরের মুকুট-খচিত খাঁটি সোনা দিয়ে বানানো সিংহাসন নিয়ে এক কার্ডিনাল এসেছেন, আর উদারপন্থি মন্ত্রীরা হাঁটু গেড়ে অঙ্গুরীয় চুম্বনের ছবি তুলেছে তার সঙ্গে। বলত যে এক স্প্যানিয় কোম্পানির মূল মহিলাশিল্পীকে রাজধানীতে অনুষ্ঠানের সময় একদল মুখশধারী ব্যক্তি তার ড্রেসিং রুম থেকে অপহরন করে, আর পরের রোববারে তাকে নগ্ন অবস্থায় নাচতে দেখা যায় প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্টের গ্রীষ্মকালীণ বাড়ীতে। “রাজনীতির কথা আর আমাকে বলিসনে”- ওকে বলত কর্নেল ” আমাদের কাজ হচ্ছে মাছ বিক্রি”। সে কর্মশালায় কাজ করে ধনী বনে যাচ্ছে বলে দেশের ব্যাপারে মাধা ঘামাতে চায় না–এই গুজব উরসুলার কানে এলে সেটা তার হাসির উদ্রেক করে। তার প্রখর বাস্তববুদ্ধি দিয়েও সে কর্নেলের ব্যাবসাটাকে বুঝতে পারত না, কারন সোনার মাছগুলোর বিনিময় হত স্বর্নমুদ্রাগুলোর বদলে, পরে স্বর্ণমুদ্রাগুলোকে রূপান্তর করত কর্নেল ছোট ছোট সোনার মাছে, আর এভাবেই যতো বেশী সে বিক্রি করত তাকে তত বেশী কাজ করতে হত এক ক্লান্তিকর দুষ্টচক্রকে সন্তুষ্টি করতে। সত্যি বলতে কি, যে ব্যাপারটা তাকে অকৃষ্ট করত তা ব্যবসাটা নয়, তা হচ্ছে কাজ। আশগুলোকে জোড়া দিতে, চোখ গুলোতে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র রুবি লাগাতে, কানকো বানাতে আর ডানা লাগাতে এত মনোযোগের প্রয়োজন পড়ত যে সে এক মুহূর্ত সময় পেত না যুদ্ধের মোহভঙ্গ নিয়ে চিন্তা করার। হাতের কাজটার সুক্ষ্ণতার প্রয়োজনে এতই মনোযোগের প্রয়োজন হোত যে অল্প সময়ের মধ্যেই যুদ্ধের সমস্ত সময়ের চাইতেও বেশী বৃদ্ধ হয়ে গিয়েছিল একনাগাড়ে একই ভঙ্গিতে বসে থাকার ফলে, তার শিরদাঁড়া বাকা হয়ে গিয়েছিল আর সুক্ষ্ণ কাজের ফলে তার চোখের জ্যোতি গিয়েছিল কমে। কিন্তু গভীর মনসংযোগ তাকে উপহার দিয়েছিল আত্মার শান্তিই। শেষ বার তাকে যুদ্ধের সাথে সম্পর্কযুক্ত কিছু করতে দেখা গিয়েছিল যখন দুই দলেরই পুরাতন যোদ্ধারা সবসময় আশ্বাস দেয়া আজীবন অবসর ভাতা না পেয়ে তার সমর্থন চাইতে যায়। “ভুলে যান আপনারা এগুলো”- ওদেরকে বলে সে- “দেখছেন যে আজীবন ওটার জন্য অপেক্ষা করার চাইতে আমি পেনসন প্রত্যাখান করেছি।” প্রথম দিকে কর্নেল হেরিনোল্দো মার্কেস বিকেলের দিকে ওর সঙ্গে কথা বলতে যেত আর স্মৃতিচারণ করতে দুজনেই রাস্তার কাছের দরজায় বসত। কিন্তু ক্লান্ত সেই লোক যার টাক তার অকাল বার্ধক্য দ্রুততর করছে, সে যে স্মৃতির উদ্রেক করত আমরান্তা তা সহ্য করতে না পেরে জ্বালাতন করত তিরস্কারের মাধ্যমে, যতদিন পর্যন্ত না এক বিশেষ দিনে পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে সম্পূর্ণরূপে উধাও হয়ে যায় লোকটা। অল্পভাষী নীরব নতুন জীবনের বাতাসের ঝাপটা লাগা বাড়ির ব্যাপারে ভ্রুক্ষেপ না করা কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া শুধুমাত্র বুঝতে পারে যে একটা চমৎকার বার্ধ্যকের গূঢ় রহস্য হচ্ছে নিঃসঙ্গতার সঙ্গে এক সম্মানজনক চুক্তি করা, ওটা ছাড়া আর কিছুই নয়। একটা হাল্কা ঘুম দেবার পর ভোর পাঁচটায় ওঠে রান্না ঘড়ে তার চিরাচরিত তেতো কফি পান করে নিজেকে সে আবদ্ধ করত কামারশালায়, আর বিকেল চারটের সময় বারান্দা দিয়ে একটা টুল টেনে প্রজ্বলিত গোলাপগুলোর দিকে এক পলকও না তাকিয়ে, এমনকি দিনের উজ্জলতার দিকেও না তাকিয়ে অথবা আমারান্তার অনুভূতিহীন অবস্থার দিকে না তাকিয়ে, যে নিরাবেগ বিষন্নতার পাত্রে বাষ্প বের হওয়ার মত শব্দ করত, আর সন্ধ্যেবেলা সেটা পরিস্কার বোঝা যেত- সে দিকেও মনযোগ না দিয়ে কর্নেল রাস্তার পাশের দরজাটায় বসে থাকত যতক্ষণ মশারা অনুমতি দিত। মাঝে মাঝে কেউ কেউ তার নিঃসঙ্গতাকে বিরক্ত করার সাহস পেত।
“কর্নেল কেমন আছেন”- যেতে যেতে বলত।
“এই তো আছি” উত্তর দিত সে – “অপেক্ষা করছি আমার শবযাত্রার জন্য”
ফলে রেমেদিওস লা বেইয়ার রানী হওয়া নিয়ে যে অস্বস্তির সৃষ্টি হয়েছিল তার সত্যিকার কোন ভিত্তি ছিল না। কিন্তু অনেকেই এমনটি বিশ্বাস করে না। আসন্ন মর্মান্তিক অবস্থার কথা টের না পেয়ে সাড়া গ্রাম ভেঙে পরে প্লাজার উপর, আনন্দের এক কোলাহলমুখর বিস্ফোরণে।

কার্নিভাল তার উন্মত্ততার চূড়ান্তে পৌঁছায়, আর শেষ পর্যন্ত বাঘের ছদ্মবেশ নেয়ার স্বপ্ন পূরণ হওয়ায় যখন প্রচন্ড চিৎকারে গলা ভেঙে বল্গাহীন ভীরের মধ্যে আউরেলিয়ানো সেগুন্দো দেখে জলাভূমির রাস্তা ধরে বহন করা যায় এমন সোনালী চেয়ারে বসিয়ে তার কল্পনার সবচেয়ে মোহনীয় রমনীকে নিয়ে অগনিত লোকের মিছিলকে এগিয়ে আসতে। কয়েক মুহূর্তের জন্য মাকন্দোর শান্তিপূর্ণ বাসিন্দারা নিজেদের মুখোশ খোলে, পান্নার মুকুট, আরমিন্যোর (বেজীর মত প্রানী) শাল পরিহিত চোখ ধাধানো সৃষ্টিকে দেখতে, আর তাদের মনে হয় যে তার রাজত্ব শুধু ঢেউ খেলানো পাতলা কাগজ ও জড়ি দিয়ে গড়া নয়, বরং তার রয়েছে সত্যিকার কর্তৃত্ব। অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে এর ভিতরে একটা উস্কানিমূলক ঘটনার সন্দেহ করার মত লোকের অভাব ছিল না ওখানে। কিন্তু আউরেলিয়ানো সেগুন্দো তার বিহ্বলতা ঝেড়ে ফেলে তাদেরকে নিজের সম্মানীয় অতিথী বলে ঘোষণা করে, আর রাজা সোলায়মানের মত বুদ্ধি দিয়ে রেমেদিওস লা বেইয়া ও অনুপ্রবেশকারী রানীকে একই মঞ্চে বসিয়ে দেয়। মধ্যরাত পর্যন্ত বেদুইনের ছদ্মবেশধারী বিদেশীরা উম্মওতায় মেতে থাকে, এমনকি তাক লাগানো আতসাবাজী আর দড়াবাজি নানান কসরত দেখিয়ে জিপসীদের কথা মনে করিয়ে দেয়। ঠিক ঐ সময়, উন্মত্ততার মাঝে কেউ একজন উৎসবের সুক্ষ্ণ ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়।
“উদারপন্থীদল দীর্ঘজীবী হোক” চিৎকার করে- “কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া দীর্ঘজীবী হোক।”
রাইফেলের গুলি ডুবিয়ে দেয় আতশবাজির জেল্লা। ভয়ার্ত চিৎকারে চাপা পড়ে বাজনার শব্দ, আর আনন্দের আসর রূপান্তরিত হয় আতংকের আসরে। অনেক বছর পর পর্যন্ত লোকে নিশ্চিত করে বলবে যে অনুপ্রবেশকারী রাজার রাজকীয় রক্ষীদের মধ্যে ছিল এক স্কোয়াড্রন সামরিক বাহিনী আর তাদের দামী আলখাল্লার নীচে লুকোন ছিল সরকার প্রদত্ত রাইফেল। সরকার এক বিশেষ ইস্তেহারে সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে, অঙ্গীকার করে এই রক্তাক্ত ঘটনার চূড়ান্ত তদন্তের। কিন্তু সত্য ঘটনা কখনই উদঘাটিত হয় না। কিন্তু সবসময়ই যা রটনা হিসেবে রয়ে যায় তা হচ্ছে রাজরক্ষীর একটি দল কোন রকমের উস্কানী ছাড়াই তাদের কমান্ডারের ইঙ্গিতে যুদ্ধের পজিশন নেয় এবং দয়ামায়া ছাড়াই ভীড়ের উপর গুলি চালায়। পরিস্থিতি শান্ত হলে যখন মিথ্যে বেদুইনের একজনকেও গ্রামে দেখা যায় না, তখন প্লাজায় হতাহতদের মধ্যে পড়ে থাকে নয়জন, তার চারজন কলম্বিনা (কলম্বিয়ার নারী), সতের জন তাসের রাজা, এক শয়তান, তিনজন যন্ত্রশিল্পী, দুই জোড়া ফ্রান্সিয়া (নৃত্যনাট্যের চরিত্র), আর তিন জাপানী সম্রাজ্ঞী। আতংকের সেই বিশৃঙ্খলার মধ্যে হোসে আর্কাদিও সেগুন্দো রেমেদিওস লা বেইয়াকে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যায়, আর আউরেলিয়ানো সেগুন্দো অনুপবেশকারী সম্রাজ্ঞীকে ছেড়া পোশাকে রক্তে রাঙানো আরমিন্যের শালসহ কোলে তুলে বাড়িতে নিয়ে যায়। ওর নাম ছিল ফেরনান্দা দেল কার্পিও। সাড়া দেশের পাঁচ হাজার সেরা সুন্দরীর মধ্যে একজন ছিল সে, আর তাকে মাকন্দোয় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল মাদাগাস্কারের রানী বানানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে। উরসুলা ওর পরিচর্যার ভার নেয় নিজের মেয়ের মত করে। গ্রামে কেউ তার সরলতাকে সন্দেহের চোখে দেখে না বরং করুনা করে। বিভৎস এই হত্যাকান্ডের ছমাস পরে যখন সমস্ত আহতরা সেরে উঠেছে, গনকবরের শেষ ফুল যখন শুকিয়ে এসেছে,তখন আউরেলিয়ানো ওর খোঁজে যায় সেই দূর শহরে যেখানে ওর বাবা বাস করত, আর বিশ দিনব্যাপি হট্টোগোল পূর্ণ উৎসবের মধ্য দিয়ে ওকে বিয়ে করে মাকন্দোয়।

(চলবে)

কিস্তি-১ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৩ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৪ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৫ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৬ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৭ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৮ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৯ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১০ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১১ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১২ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৩ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৪ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৫ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৬ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৭ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৮ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৯ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২০ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২১ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২২ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২৩ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২৪ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২৫ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২৬ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২৭ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর
Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শিমুল সালাহ্উদ্দিন — সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৫ @ ১:০৮ পূর্বাহ্ন

      অনুবাদটা দুর্দান্ত হচ্ছে। মার্কেজের দীর্ঘবাক্যের মজা লুটে নেয়া যাচ্ছে পুরোটাই। প্রুফ দেখায় আরো সাবধানী হওয়া দরকার। কিছু বাক্যে শব্দ একসাথে লেগে গেছে, তাতে পড়তে অসুবিধা হচ্ছে।

      ‘ঘড়ে’ শব্দটি মনে হচ্ছে বানান ভুল। ঘরে হওয়া সমীচিন।

      অভিনন্দন পরিশ্রমী অনুবাদককে। এই ধারাবাহিক এর প্রতিটি কিস্তির জন্যই অপেক্ষায় থাকি।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন mostafa tofayel — সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৫ @ ১১:৩৮ অপরাহ্ন

      Expect to get the next chapter. Carry on as spontaneous as before.।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com