গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:

নিঃসঙ্গতার একশ বছর

আনিসুজ্জামান | ২০ আগস্ট ২০১৫ ১২:১৩ পূর্বাহ্ন

combo.jpgবিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে নিঃসঙ্গতার একশ বছর-এর মতো আর কোনো উপন্যাস প্রকাশের পরপরই এতটা পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে কিনা সন্দেহ। জনপ্রিয়তার বিচারে যেমন, তেমনি শিল্পকুশলতা আর শিল্পমুক্তির ক্ষেত্রেও এটি হয়ে উঠেছে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। কেবল স্প্যানিশ সাহিত্যেই নয়, গোটা বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসেই একটি মাত্র উপন্যাসে ইতিহাস, আখ্যান, সংস্কার, কুসংস্কার, জনশ্রুতি, বাস্তব, অবাস্তব, কল্পনা, ফ্যান্টাসি, যৌন-অযাচার ও স্বপ্ন– সবকিছুর এমন স্বাভাবিক ও অবিশ্বাস্য সহাবস্থান আগে কখনও দেখা যায়নি।
ঠিক এই কারণে মারিও বার্গাস যোসা এটিকে বলেছিলেন এক সামগ্রিক উপন্যাস (Novela Total), আর পাবলো নেরুদা একে বলেছিলেন, “সের্বান্তেসের ডন কিহোতের পর স্প্যানিশ ভাষায় সম্ভবত মহত্তম উন্মোচন (“perhaps the greatest revelation in the Spanish language since Don Quixote of Cervantes.”)
বাংলাদেশে এখনও পর্যন্ত কিংবদন্তিতুল্য এই উপন্যাসটি মূলভাষা থেকে অনূদিত হয়নি। এই প্রথম এটি আনিসুজ্জামানের অনুবাদে মূল থেকে ধারাবাহিক অনূদিত হচ্ছে। বি. স.

অনুবাদ: আনিসুজ্জামান

———————————————————————————
ধারাবাহিক উপন্যাস । কিস্তি ২৭

কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার মুখাবয়বে কোন ক্রোধের চিহ্ন প্রকাশ না পেলেও তার আত্মা প্রশান্তি পায় যখন তার ব্যক্তিগত দেহরক্ষী বিধবার বাড়িটা লুট করে জ্বালিয়ে ছাই ভস্মে পরিণত করে । “মনটার যত্ন নে আউরেলিয়ানো” তখন কর্নেল হেরিনাল্দো মার্কেস ওকে বলত “জীবদ্দাশায়ই তোর পচন ধরেছে”। সেই সময়ে বিদ্রোহের প্রধান কমান্ডারদের দ্বিতীয় সমাবেশের আহবান জানায় সে । সব রকম লোকই পায় সে ওখানে; আদর্শবাদী, লোভী, দুঃসাহসী সমাজের উপর ক্ষুদ্ধ, এমনকি সাধারণ অপরাধী পর্যন্ত । এমনকি ছিল রক্ষনশীল দলের এক প্রাক্তন কর্মকর্তা যে নাকি তহবিলের টাকা আত্মসাতের অভিযোগের বিচার এড়াতে বিদ্রোহীদের কাছে আশ্রয় নিয়েছে । অনেকে এমনকি জানতও না কেন তারা যুদ্ধ করছে । এই বিভিন্ন রং-এর ভীরের মাঝে, যেখানে মূল্যবোধের পার্থক্যগুলো প্রায় এক অভ্যন্তরীণ বিস্ফোরন ঘটাতে উন্মুখ, সেখানে দৃষ্টি কাড়ে গাঢ় রং-এর এক কর্তৃত্ব: জেনারেল তেওফিলো ভারগাস। সে ছিল এক খাঁটি আদিবাসী, দুর্বিনীত, নিরক্ষর, স্বভাবগতভাবেই তার ছিল লুকায়িত ধূর্ততা, ত্রাণকর্তাসুলভ আচরণ যা নাকি তার লোকদের মধ্যে জাগিয়ে তুলত এক মৌলবাদী উম্মাদনা। কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া তাদের একত্রিত করে রাজনীতিবিদদের চক্রান্তের বিরুদ্ধে সকলকে ঐক্যবদ্ধ করার উদ্দেশ্য। জেনারেল তেওফিলো ভারগাস এগিয়ে যায় তার নিজস্ব লক্ষ্য নিয়ে; অল্প কয়েক ঘন্টার মধ্যে ভেঙে দেয় সবচেয়ে যোগ্য কমান্ডারদের জোট, আর দখল করে কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব । “লোকটার সর্তক হওয়া উচিৎ, এমন হিংস্র জানোয়ার” নিজের অফিসারদের উদ্দেশ্যে বলে কর্নেল আউরোলিয়ানো বুয়েন্দিয়া “আমাদের জন্য এই লোকটা যুদ্ধ মন্ত্রনালয়ের চাইতেও বেশী বিপজ্জনক”। এই সময় কম বয়সী এক যুবক ক্যাপ্টেন যে সবসময়ই তার মুখচোরা প্রকৃতির জন্য ছিল স্বতন্ত্র, সে সতর্কতার সাথে তর্জনী উচুঁ করে ।
-“এটা তো মামুলী ব্যাপার কর্নেল” প্রস্তাব করে “ওকে মেরে ফেলা উচিৎ”।
প্রস্তাবটার শীতলতার জন্য নয়, বরঞ্চ কিভাবে তার নিজস্ব চিন্তাধারা লোকটা সেকেন্ডের ভগ্নাংশ আগে ধরে ফেলেছে তা দেখে চমকে যায় কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়োন্দিয়া । “আমার থেকে এ আদেশের জন্য অপেক্ষা কোর না তোমরা”- বলে।

সত্যিই সেই আদেশ সে দেয় নি। কিন্তু পনের দিন পর এক গুপ্ত হামলায় কর্নেল তেওফিলো ভারগাসকে মাচেতে (লম্বা দা) দিয়ে ছিন্ন ভিন্ন করে ফেলা হয়, আর কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া দখল করে কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব। সেই একই রাতে, যেরাতে সকল বিদ্রোহী কমান্ডাররা তার কর্তৃত্বে স্বীকৃতি দেয়, সে ঘুম থেকে ভয়ে চমকে জেগে উঠে চিৎকার করে একটা কম্বল চায়। ভিতর থেকে একটা প্রচন্ড শীত তার হাড় কাপিয়ে দিচ্ছিল, এমনকি প্রখর সূর্যের নীচেও আর যেটা তাকে অনেক মাস ধরে ঘুমুতে দেয়নি; যতদিন পর্যন্ত না অনিদ্রাটা পরিণত হয় এক অভ্যাসে। অস্বস্তির চমকগুলো তার ক্ষমতার মাদকতায় পচন ধরাতে শুরু করে। শীত থেকে মুক্তি পেতে সেই তরুণ ক্যাপ্টেনের মৃত্যুদন্ডের ব্যবস্থা করে যে নাকি জেনারেল তেওফিলো ভারগাসকে খুনের প্রস্তাব করেছিল। ওর আদেশগুলো পালন করা হতো আদেশগুলো মুখ থেকে বের হবার আগেই, এমনকি সে নিজে সেগুলো ভাবার আগেই, আর ওরা সেগুলো নিয়ে এতদূর অতিক্রম করে ফেলত যে সে নিজেও তাদেরকে দিয়ে অতদূর অতিক্রম করাতে সাহস পেত না। প্রচন্ড ক্ষমতার অহংকারে হারিয়ে গিয়ে দিকভ্রষ্ট হতে শুরু করে কর্নেল। বিজিত গ্রামগুলোর লোকেরা হর্ষধ্বনি করলে একই হর্ষধ্বনি শত্রুরাও পায় মনে করে বিরক্ত হত সে। সব জায়গাতেই সে পেয়ে যেত শিশুদের, যারা তাকে নিজের চোখ দিয়ে দেখত, তাকে সম্ভাষন করত একই অবিশ্বাস নিয়ে, সে নিজে যেমনটি করত ওদের বেলায়, আর নিজেদেরকে তার সন্তান বলে দাবী করত। সে অনুভব করত বিক্ষিপ্ততা, মনে করত সে পুনরাবৃত্ত, আর অনুভব করত এযাবৎ কালের মধ্যে সবচেয়ে বেশী নিঃসঙ্গতা। এমনকি তার বিশ্বাস জন্মায় যে তার নিজের অফিসাররাও তাকে মিথ্যে বলে। সে মার্লবোরর ডিউকের সঙ্গে ঝগড়া করে। “মানুষের সবচেয়ে বড় বন্ধু হচ্ছে” তখন মাঝে মধ্যে বলত “যে এই মাত্র মারা গেছে”। অনিশ্চয়তার প্রাচুর্যে ক্লান্ত হয়ে পরে সে, অন্তহীন গোলকধাঁধার মধ্যে পরা সেই যুদ্ধ যেটা তাকে পেত সব সময় একই জায়গায়, প্রতিবারই তাকে করে তোলে আরও বৃদ্ধ, আরো বিধ্বস্ত, আরও, কারণ, কিভাবে ও কখন এর উত্তর না জানা অবস্থায়। সর্বক্ষণই কেউ না কেউ থাকত চকের বৃত্তের বাইরে। কেউ একজন যার টাকার দরকার, কেউ একজন যার ছেলের হুপিং কাশি হয়েছে অথবা কেউ একজন চিরদিনের তরে ঘুমুতে চাইছে কারণ মুখের ভিতর যুদ্ধের বিষ্ঠার মত গন্ধ আর সহ্য করতে পারছে না, আর তদুপরি মিলিটারি কায়দায় সোজা হয়ে দাড়িয়ে থাকত শরীরে সঞ্চিত শক্তির শেষ বিন্দু দিয়ে এই বলতে যে –“সবকিছুই ঠিক আছে, আমার কর্নেল”
আর সেই অন্তহীন যুদ্ধে স্বাভাবিকতাটাই হচ্ছে সবচেয়ে ভয়াবহ যেখানে কিছুই ঘটছে না। একাকী, পূর্ববোধগুলো দ্বারা পরিত্যাক্ত, আমরণ সঙ্গী শীত থেকে সর্বক্ষণ পলায়নপর, কর্নেল শেষ পর্যন্ত তার পূর্বের স্মৃতির উষ্ণতম জায়গা মাকন্দোতে আশ্রয় নেয়। তার ঔদাসিন্য এমন অবস্থায় পৌছায় যে যুদ্ধের অচলাবস্থা নিয়ে আলোচনার জন্য তার দল থেকে ভারপ্রাপ্ত কিছু লোকের আগমনি সংবাদ পাওয়ায় সে সম্পূর্ণরূপে না জেগে হ্যামকে পাশ ফিরে শোয় –“বেশ্যাদের কাছে নিয়ে যা ওদেরকে”- বলে। ওরা ছিল লম্বা কোট আর লম্বা হ্যাট পরিহিত ছয় উকিল; যারা নভেম্বরের প্রখর রোদ নির্বিকারে সহ্য করে । উরসুলা ওদেরকে বাড়িতেই থাকতে দেয় । ওরা দিনের অধিকাংশ সময় কাটিয়ে দিত শোবার ঘড়ে রুদ্ধদ্বার আলোচনা করে। আর রাত্রি আসন্ন হলে একজন পথপ্রদর্শক ও এক অ্যাকর্ডিয়ান বাদকদল নিয়ে কাতারিনোর দোকানে গিয়ে নিজের পয়সায় পান করে।
-“ওদেরকে বিরক্ত করো না”- আদেশ দিত কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া -“শত হলেও আমি তো জানিই ওরা কী চায়”।
দীর্ঘ প্রতিক্ষিত সেই আলোচনা যেটাকে অনেকেই ভেবেছিল আলোচনা হবে দীর্ঘ সময় ধরে, সেটা ডিসেম্বরের প্রথম দিকে এক ঘন্টারও কম সময়ে শেষ হয়ে যায়।

বৈঠকখানার গরমে সাদা চাদর দিয়ে ঢাকা পিয়ানোলাটার দিকে অপছায়ার পাশে বসা কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া এবার তার সহকারীদের আঁকা চকের বৃত্তের মাঝে বসে না। রাজনৈতিক উপদেষ্টাদের সাথে একটা চেয়ারে স্থান নেয় সে আর পশমের চাদরে আবৃত কর্নেল, প্রতিনিধিদের সংক্ষিপ্ত প্রস্তাবগুলো নীরবে শুনে যায়। প্রথম শর্তে তারা জানায় উদারপন্থী ভূস্বামীদের সমর্থন পেতে জমির স্বত্বাধিকার যাচাই করা বন্ধ করতে হবে। দ্বিতীয় শর্তে ছিল ক্যাথলিকদের সমর্থন আদায়ের জন্য চার্চের প্রতিপত্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করা । আর শেষ শর্ত হচ্ছে অবৈধ এবং বৈধ সন্তানদের সমান অধিকারের দাবী যেন সে ত্যাগ করে পরিবারের অখন্ডতা বজায় রাখার জন্য ।
-“বলতে চাচ্ছেন”- শর্ত দাখিলের পর হেসে বলে কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া, ”আমরা শুধু ক্ষমতা দখলের জন্য লড়ছি”-
“এটা হচ্ছে কৌশলগত পরিবর্তন”- উত্তর দেয় প্রতিনিধিদের একজন । “এখন গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে জনসমর্থন আদায় করা। পরের কথা পরে ভাবা যাবে”

কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার এক উপদেষ্টা দ্রুত হস্তক্ষেপ করে। “এটা হচ্ছে পরস্পরবিরোধী”- বলে “যদি এই পরিবর্তনগুলো ভালো হয়, তার অর্থ হচ্ছে রক্ষনশীল দলও ভালো। যেভাবে তোমরা বলছ, সেভাবে যদি এই পরিবর্তনগুলোর মাধ্যমে আমরা জনসমর্থন বৃদ্ধি করতে পারি তার অর্থ হচ্ছে সরকারের রয়েছে এক ব্যাপক জনসমর্থন। সারমর্ম হচ্ছে প্রায় বিশ বছর যাবৎ আমরা জাতির মতামতের বিপক্ষে যুদ্ধ করে আসছি”।

সে চালিয়ে যেতে উদ্যত ছিল কিন্তু ইশারায় কর্নেল আউরোলিয়ানো বুয়োন্দিয়া তাতে বিঘ্ন ঘটায়- “ সময় নষ্ট করো না, ডাক্তার”- বলে “ গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এই মুহূর্ত হতে আমরা লড়ছি ক্ষমতার জন্য”। মুখ থেকে হাসি বর্জন না করে প্রতিনিধিদল যে কাগজ দিয়েছিল তাকে সেটি নিয়ে সই করতে উদ্যত হয়।
-“এটাই যখন আসল ব্যাপার” ইতি টানে “আমাদের এটা মেনে নিতে কোনই অসুবিধে নেই”। তীব্র হতাশা নিয়ে পরস্পরের দিকে তাকায় তার লোকজন। “আমাকে ক্ষমা করবেন কর্নেল”- বিনম্র স্বরে বলে কর্নেল হেরিনান্দো মার্কেস “এটা কিন্তু সম্পূর্ণ বিশ্বাসঘাতকতা”। কালি চোবানো কলমটা শূন্যে থামিয়ে ওর উপর কর্তৃত্বের সম্পূর্ণ ভার নামিয়ে আনে কর্নেল আউরোলিয়ানো বুয়োন্দিয়া, “অস্ত্র সমর্পন কর আমার কাছে”- আদেশ দেয়। উঠে দাড়ায় কর্নেল হেরিনালদো মার্কেস আর অস্ত্র রাখে টেবিলের উপর।
“ব্যারাকে হাজির হও” আদেশ করে কর্নেল আউরোলিয়ানো বুয়োন্দিয়া, “তোমার ভাগ্য নির্ভর করবে বিপ্লবী আদালতের সিদ্ধান্তের উপর”। পরে বিবৃতিতে সই করে কাগজগুলো প্রতিনিধিদের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলতে থাকে:“মহোদয়গণ, এই যে কাগজগুলো, এগুলো থেকে সুযোগ ভোগ করবেন এই কামনা করছি”। দুদিন পর বড় বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয় কর্নেল হেরিনান্দো মার্কেসকে । ক্ষমা প্রদর্শনের জন্য অনুরোধগুলো, হ্যামকে পরে থাকা কর্নেল আউরোলিয়ানো বুয়োন্দিয়ার মনকে ছুঁতে পারে না। মৃত্যুদন্ডের আগের রাতে বিরক্ত করার আদেশ না মেনে উরসুলা ওর সঙ্গে দেখা করে শোবার ঘড়ে। কালো কাপড় পরিহিত উরসুলা এক দুর্লভ গাম্বীর্য নিয়ে দাড়িয়ে থাকে সাক্ষাতের পুরো তিন মিনিট। “জানি যে, গুলি করে মারতে যাচ্ছিস হেরিনালদোকে”- বলে শান্ত স্বরে –“আর আমি কিছুতেই তা রোধ করার জন্য কিছুই করতে পারব না। কিন্তু একটা ব্যাপারে তোকে সাবধান কর: যখনই আমি ওর লাশটা দেখতে পারব, আমার বাপমায়ের হাড্ডির কিরে, হোসে আর্কাদিও বুয়োন্দিয়ার স্মৃতির কিরে, ইশ্বরের কিরে, যেখানেই লুকোস না কেন, তোকে খুন করব নিজের হাতে”। শোবার ঘড় পরিত্যাগের আগে কোনো উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে ইতি টানে: “শুয়োরের লেজ নিয়ে জন্মালেও এই একই কাজ করতে হত আমাকে”।

সেই অনন্ত রাতে, যখন কর্নেল হেরিনালদো মার্কেস তার জীবনের মৃত বিকেলগুলোর কথা স্মরণ করছে আমারান্তার সেলাই ঘরে বসে, কর্নেল আউরোলিয়ানো বুয়েন্দিয়া তখন নিঃসঙ্গতার কঠোর খোলশটাকে ভাঙার জন্য অনেক ঘন্টা যাবত খামচা খামচি করে। সেই সুদূর বিকেল থেকে, যেদিন তার বাবা বরফ চেনাতে নিয়ে গিয়েছিল সেই দিন থেকে তার তাৎক্ষণিক সুখ এসেছিল রুপোর কামারশালায় যখন সে সময়গুলোকে পার করতো সোনার মাছ বানিয়ে। বত্রিশটি যুদ্ধ করে, মৃত্যুর সঙ্গে করা সবগুলো চুক্তি ভঙ্গ করে, গৌরবের পরে শুয়রের মত গড়াগড়ি করতে হয়েছে তাকে শুধুমাত্র সফলতার সুবিধাগুলো বুঝতে, যেটা তার চল্লিশ বছর আগেই বোঝা উচিৎ ছিল। ভোর বেলায় বিক্ষুব্ধ রাত জেগে কাটিয়ে মৃত্যুদন্ড কার্যকরের এক ঘন্টা আগে সে বন্দীর ঘড়ে গিয়ে হাজির হয়। “অভিনয় শেষ হয়েছে” কম্‌পাদরে বলে কর্নেল হেরিনেলদো মার্কেসকে। “মশাগুলো তোকে মেরে ফেলার আগেই চল এখান থেকে ভাগি”। তার এই ভাবভঙ্গীতে, তৈরি হওয়া অবজ্ঞাকে চেপে রাখতে পারে না কর্নেল হেরিনেলদো মার্কেস।
“না, আউরোলিয়ানো “ উত্তর দেয়- “তোকে স্বৈরাচারিতে পরিবর্তিত হতে দেখার চাইতে মরণও ভাল”। “আমাকে সেভাবে দেখবি না” বলে কর্নেল আউরোলিয়ানো বুয়েন্দিয়া- “জুতোটা পরে নে আর আমার সঙ্গে হাত লাগা এই বিশ্রী যুদ্ধটাকে শেষ করতে”।

যখন সে কথাটা বলে তখন সে কল্পনাও করেনি যে একটা যুদ্ধ শুরু করা সমাপ্তি টানার চাইতে অনেক সহজতর। বিপ্লবীদের কাছে গ্রহণযোগ্য শর্তাবলির প্রস্তাব দেয়াতে সরকারকে বাধ্য করার জন্য প্রায় এক বছর ব্যাপি রক্তক্ষয়ী চেষ্টা চালাতে হয়, আরও এক বছর লাগে তার শর্তগুলোর সুবিধাবলী তার নিজের দলের লোকদের বোঝাতে। তার নিজস্ব অফিসারদের বিদ্রোহ দমাতে চরম নিষ্ঠুরতার আশ্রয় নিতে হয় তাকে। বিজয়ের জন্য প্রতিরোধ গড়ে তোলা এইসব অফিসারদের বাগে আনতে শেষ পর্যন্ত শত্রুপক্ষের সাহায্য নিতে হয় তাকে।

এর আগে কখনই সে এতবড় যোদ্ধা ছিল না। শেষ পর্যন্ত সে নিশ্চিত হয় যে, লড়ছে নিজের মুক্তির জন্য কোনো বিমূর্ত আদর্শের জন্য বা অবস্থা মোতাবেক যে রাজনীতিবিদরা সবকিছুকে উল্টে ফেলে তাদের জন্য নয়। আর ফলে প্রচন্ড উদ্দীপনায় ভড়ে ওঠে সে। কর্নেল হেরিনাল্দো মার্কেস একই রকম বিশ্বাস আর আনুগত্য নিয়ে পরাজয় বরণের জন্য যুদ্ধ করে, যেমনটি করত আগে বিজয়ের জন্য, আর খামখেয়ালির কারণে অর্থহীন তিরস্কার করত কর্নেল আউরোলিয়ানো বুয়েন্দিয়াকে। “দুশ্চিন্তা করিস না” হেসে বলত সে “যেমনটি মনে করা হয় তার চাইতে মৃত্যু বরণ করা ঢের কঠিন”। ওর বেলায় কথাটা ছিল সত্যি। তার মৃত্যু দিন যে ঠিক করা আছে এই বিশ্বাস তাকে দেয় এক রহস্যময় নিরাপত্তা, যা নাকি যুদ্ধের সমস্ত ঝুঁকির ফলেও বলতে গেলে তাকে দেয় অমরত্ব আর শেষ পর্যন্ত অনুমতি দেয় এক পরাজয় বরণ করার যেটা নাকি ছিল বিজয়ের চাইতেও অনেক বেশী রক্তক্ষয়ী ও মূল্যবান।

যুদ্ধের প্রায় বিশ বছরে কর্নেল আউরোলিয়ানো বুয়েন্দিয়া অনেকবারই বাড়িতে গিয়েছিল। কিন্তু জরুরিভিত্তিতে যেভাবে সব সময়ে সে আসত, সব সময় যেভাবে মিলিটারি দল সর্বত্রই তাকে সঙ্গ দিত, তার উপস্থিতিতে যে কিংবদন্তীর জ্যোতি ছিল, তা এমনকি উরসুলাও অনুভব করত, আর সেটা তাকে পরিণত করেছিল এক আগন্তুকে। শেষ বার যখন মাকন্দোতে ছিল তখন তিন রক্ষিতার জন্য আলাদা বাড়ি নেয় আর তাকে নিজের বাড়িতে দু তিন বারের বেশী দেখা যায়নি। তাও শুধু মাত্র যখন সময় করতে পেরেছিল খাবারের নিমন্ত্রন রক্ষা করার। সুন্দরী রেমেদিওস ও প্রচণ্ড যুদ্ধকালীন সময়ে জন্ম নেয়া যমজ, ওকে কোন রকমে চিনত। যে ভাইকে আমরান্তা সোনার ছোট মাছ বানিয়ে বয়সন্ধি কাটাতে দেখেছে তার প্রতিচ্ছবির সঙ্গে, এখনকার এই কিংবদন্তীর যোদ্ধা, যে নাকি নিজের আর সমস্ত মানবতার মাঝে তিন মিটার দূরত্ব তৈরি করেছে, তাকে কিছুতেই এক করতে পারে না। কিন্তু যখন যুদ্ধ বিরতির সময় ঘনিয়ে আসার সংবাদ পায় আর ভাবে একজন মানুষরূপে সে আবার ফিরে আসছে, ফিরে আসছে শেষ পর্যন্ত তার হৃদয়টাকে উদ্ধার করে, তখন এই দীর্ঘ সময়ে ঘুমিয়ে থাকা পারিবারিক অনুভূতিগুলি সর্বকালের মধ্যে বেশী শক্তি নিয়ে পূনর্জন্ম লাভ করে।
“শেষ পর্যন্ত”- বলে উরসুলা-“ আবার বাড়িতে এক পুরুষ মানুষ পাব আমরা”।
cien-anos-de-soledad.jpg

আমারান্তাই প্রথমে সন্দেহ করে যে হয়তো চিরকালের জন্যই হারিয়ে ফেলেছে তাকে। যুদ্ধ বিরতির দুসপ্তাহ আগে, দেহরক্ষীহীন দুই খালি পায়ের আর্দালি তাকে অনুসরণ করে বাড়িতে এসে, খচ্চরের জিন ও তার পুরনো দিনের রাজকীয় সম্পদের একমাত্র অবশিষ্টাংশ কবিতা ভর্তি তোরঙ্গটা বারান্দায় নামিয়ে রাখে। আর আমরান্তা তাকে সেলাই ঘরের সামনে দিয়ে যেতে দেখে ডাকে। কর্নেল আউরোলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার কষ্ট হয় তাকে চিনে উঠতে। “আমি আমারান্তা” তার ফিরে আসায় খুশি হয়ে আনন্দের সাথে বলে আর কালো ব্যান্ডেজ বাধা হাতটা দেখায় –“দেখ”।
সেই সুন্দর সকালে মৃত্যুদন্ড নিয়ে মাকন্দোতে এসে প্রথমবার ব্যান্ডেজ পরা হাত দেখে যেমন হেসেছিল, সেই একই হাসি হাসে কর্নেল আউরোলিয়ানো বুয়েন্দিয়া। “কি ভয়ংকর” বলে সময় কিভাবে চলে যায়।

নিয়মিত বাহিনীকে বাড়ির নিরাপত্তার ভার নিতে হয়। বেশী দামে বিনিময়ের জন্য যুদ্ধটাকে আরও খারাপ অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার অভিযোগে গায়ে থু থু মেখে অপমানিত হয়ে ফিরে আসে সে। জ্বরে আর শীতে কাপছিল সে আর আবার দেখা দিয়েছিল বগল তলার গলন্দ্রিনা ঘাঁ-টা। ছয়মাস আগে যুদ্ধ বিরতির খবর শোনায়, কর্নেল আউরোলিয়ানো বুয়েন্দিয়া ফিরে এসে রেমেদিওসের স্যাতস্যাতে পুতুলগুলোর মাঝে আস্তে ধীরে বুড়ো হবে এই ভেবে উরসুলা বিয়ের ঘড়টা খুলে ঝাড়পোছ করে আর কোনায় কোনায় সুগন্ধি জালায়। কিন্তু সত্যিকার অর্থে শেষের দুই বছরে বার্ধক্যসহ জীবনের সর্বশেষ দেনা চুকিয়ে দিয়েছে সে। বিশেষ যত্ন নিয়ে ওর জন্য প্রস্তুত করে রাখা রৌপ্যশালার সামনে দিয়ে যাবার সময় সে এমনকি খেয়ালও করে না যে চাবিটা তালার সঙ্গে ঝুলছে। সময়ের সাথে সাথে হওয়া বাড়ির হৃদয়বিদারক সুক্ষ্ণ পরিবর্তনগুলোও তার চোখে পরে না, দীর্ঘদিনের অনুপস্থিতির পর যেগুলো নাকি স্মৃতিতে ধরে রাখা যে কোনো মানুষের চোখেই বিরাট পরিবর্তন হিসেবে দেখা দিত। দেয়াল থেকে খসে পড়া চুনকাম, কোনায় কোনায় জমে থাকা মাকড়শার নোংরা তুলো, উইয়ে খাওয়া করি কাঠের ফাটল, কব্জায় পরা শেওলা অথবা তার স্মৃতিকাতরতায় ভেতরে ভেতরে বেড়ে ওঠা ফাঁদ, এগুলোর কিছুই তাকে কষ্ট দেয় না। কম্বল জড়িয়ে পায়ের বুটজোড়া না খুলেই বারান্দায় বসে পরে সে, যেন বৃষ্টি শেষের অপেক্ষায় আছে। কিন্তু সাড়া বিকেল কাটিয়ে দিল সে বেগোনিয়ার উপর বৃষ্টি দেখে দেখে। উরসুলা তখন বুঝতে পারে যে বাড়িতে তাকে দীর্ঘদিনের জন্য পাবে না, “যদি যুদ্ধ না হয়” ভাবে সে “তাহলে সেটা হবে মরণ”। অনুমানটা ছিল এতই স্বচ্ছ, এতই বিশ্বাসযোগ্য যে সে সেটাকে দেখে পূর্ববোধ হিসেবে । সে রাতে, খাবার সময়, আউরেলিয়ানো সেগুন্দো নামের সম্ভাব্য ছেলেটি পাউরুটি ছেঁড়ে বাঁ হাত দিয়ে, আর সুপ খায় ডান হাত দিয়ে। আর তার যমজ সম্ভাব্য হোসে আর্কাদিও সেগুন্দো নামের ছেলেটি রুটি ছেঁড়ে বাঁ হাত দিয়ে আর সূপ খায় ডানটা দিয়ে। এই মহড়াটা এতই নিখুঁত সমন্বয়ে চলতে থাকে যে তাদেরকে মুখোমুখি বসে থাকা দুই ভাই বলে মনে হয় না, মনে হয় দর্পনের কারসাজী। যখন থেকে ওরা বুঝতে পারে যে ওরা দেখতে একই রকম, তখন থেকেই খেলাটা তাদের মাথায় আসে আর সদ্য আগতের সম্মানে খেলাটা পুনরাবৃত্তি হয় । কিন্তু কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া খেয়াল করে না সেটা । সব কিছু থেকে তাকে এতই দূরের মনে হয় যে, যখন রেমেদিওস, লা বেইয়া (সুন্দরি) নগ্ন অবস্থায় শোয়ার ঘড়ে যায়, এমনকি তখনও সে ব্যাপারটা খেয়াল করে না । একমাত্র উরসুলাই তার অন্য মনস্কতায় ভাঙ্গন ধরাতে সাহস করে । “যদি আবার তোকে চলে যেতেই হয়” খাবার মাঝপথে বলে সে, “অন্তত আজকের রাতে আমরা কেমন ছিলাম তা মনে করার চেষ্টা কর”।

ফলে কর্নেল আউরোলিয়ানো বুয়েন্দিয়া বুঝতে পারে উরসুলাই হচ্ছে একমাত্র মানুষ যে তার কষ্টের পাক খুলতে পেরেছে, আর বহু বছরের মধ্যে প্রথমবারের মত সে তার মুখের দিকে তাকাতে সাহস করে। তার চামড়া ছিল বলিরেখায় ভরা, দাঁতগুলো ছিল ক্ষয়ে যাওয়া, চুলগুলো ছিল রং বিহীন মলিন আর দৃষ্টি ছিল বিস্ময়াবিষ্ট। যে বিকেলে তার পূর্ববোধ হয় যে বলক দিতে থাকা স্যুপের পাত্র টেবিল থেকে পরে যাবে, সবচেয়ে পুরাতন এই স্মৃতি উরসুলার সঙ্গে মিলিয়ে, তাকে দেখতে পায় ক্ষতবিক্ষত । মুহূর্তের মধ্যেই সে আবিস্কার করে অর্ধ শতাব্দীর বেশী সময় জুড়ে দৈনন্দিন জীবন, উরসুলার উপর কেটে গিয়েছে নখের আঁচড়, রেখে গিয়েছে চাবুকের দাগ, দিয়েছে বিষন্নতা, করেছে ক্ষত বিক্ষত, আর রেখে গেছে ক্ষতচিহ্ন। আর প্রমাণ পায় যে এসব কিছু তার মনে এমনকি কোনো করুণার অনুভূতিরও উদ্রেক করে না। সুতরাং সে শেষ চেষ্টা করে তার হৃদয়ের মাঝের জায়গাটা খুঁজে পাওয়ার সেখানে তার অনুভূতিগুলো পচে গিয়েছে, কিন্তু খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয় সে । অন্য সময়ে নিজের চামড়ায় উরসুলার গন্ধ যখন তাকে চমকে দিত তখন অন্তত লজ্জা মাখানো এক বিচিত্র অনুভূতির সৃষ্টি হত, আর কয়েকবারই সে অনুভব করে তার চিন্তাধারায় বাধাঁর সৃষ্টি করছে উরসুলার প্রতি তার ভাবনা। কিন্তু যুদ্ধ এগুলোর সবই মুছে দিয়েছে। এমনকি রেমেদিওস, তার স্ত্রীর স্মৃতি পর্যন্ত এমন মলিন হয়ে গিয়েছে যে কিনা তার মেয়েও হতে পারত। ভালবাসার মরুতে যে অগুনতি মেয়ের সঙ্গে সে পরিচিত হয়েছে যারা তার বীজ সমস্ত উপকূল জুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছ, তারাও তার মনে কোনো অনুভূতির দাগ কাটেনি। তাদের বেশীর ভাগই অন্ধকারে ঘড়ে ঢুকে উষার আগেই ফিরে যেত, আর পরের দিন শুধু মাত্র ক্লান্তির সাথে তারা জড়িয়ে থাকত সামান্য শারীরিক স্মৃতিতে। সময়ের আর যুদ্ধের প্রতিকূলে একমাত্র যে অনুভূতি জীবিত ছিল তা হচ্ছে হোসে আর্কাদিওর প্রতি সে যা অনুভব করত, যখন তারা দুজনেই ছিল শিশু, যা ভালবাসার ভিত্তিতে গড়ে ওঠে নি, গড়ে উঠেছে দুষ্কর্মের যোগসাজসের ভিত্তিতে।
“ক্ষমা কর” উরসুলার চাহিদার ভিত্তিতে ক্ষমা চায় সে,-“এই যুদ্ধটা শেষ করে দিয়েছে সবকিছুই”।

পরের দিনগুলোতে ব্যস্ত থাকে সে, পৃথিবীতে তার ফেলা সমস্ত পদচিহ্ন ধংস করার কাজে। রৌপ্যশালাটা এমনভাবে কাটছাট করে ফেলে যে শুধুমাত্র পরে থাকে অ-ব্যক্তিগত জিনিসগুলো, বিলিয়ে দেয় নিজের জামাকাপড় আর্দালীদের মাঝে, পরে নিজের অস্ত্রগুলো উঠোনে পুঁতে ফেলে, তার বাবার মতো একই বোধ থেকে প্রুদেন্সিও আগিলারের মৃত্যু নিয়ে আসা বর্শাটাকে মাটিতে পুতেছিল। শুধুমাত্র রেখে দেয় একটা পিস্তল, সঙ্গে একটি মাত্র গুলি। উরসুলা বাধা দেয় না ওর কার্যকলাপে, শুধুমাত্র একবারই তাকে নিরস্ত্র করে যখন সে দিনরাত জলতে থাকা একটি বাতির আলোয় আলোকিত রেমেদিওসের দাগেরটাইপ ছবিটা ধ্বংস করতে উদ্যত হয়। “এই ছবিটা অনেক আগেই তোর নিজস্ব জিনিসের অন্তর্ভুক্তি থেকে বেরিয়ে গেছে”-বলে তাকে- “এটি হচ্ছে আমাদের পারিবারিক স্মৃতিচিহ্ন”। যুদ্ধবিরতির আগের দিন যখন আর বাড়িতে তার স্মৃতি ফিরিয়ে দেবার মত এমন কিছুই নেই তখন সে কবিতা ভরা তোরঙ্গটা রুটির কারুখানায় নিয়ে যায়। যখন সান্তা সোফিয়া দে লা পিয়েদাদ চুল্লি জালাতে উদ্যত।
-“এগুলো দিয়ে জ্বালা”- হলুদ হয়ে যাওয়া প্রথম কাগজের তোরাটা সোফিয়ার হাতে দিয়ে বলে “এগুলো ভালো জ্বলে কারণ এগুলো হচ্ছে অনেক পুরাতন”। সব সময়ই নীরব যে নাকি এমনকি নিজের সন্তানদেরও কোনো বিরুদ্ধাচরণ করেনি,এমনকি তারও মনে হয় কাজটা হচ্ছে নিষিদ্ধ ।
-“কাগজগুলো গুরুত্বপূর্ণ” বলে।
-“না না, ওসব কিছু না”- বলে কর্নেল “এগুলো হচ্ছে এমন কিছু যা কেউ একজন নিজের জন্যই লিখে”।
-“যদি তাই হয়” বলে সেফিয়া –“আপনি নিজেই পুড়িয়ে ফেলুন”।

সে শুধু যে কেবল তাই করে না তা না, একটি ছোট কুড়োল দিয়ে তোরঙ্গটা টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলে চলাগুলো আগুনে ফেলে। তারও কয়েকঘন্টা আগে পিলার তেরনেরা এসেছিল দেখা করতে। এত বছর দেখা না হওয়ায় ওকে দেখে আশ্চর্য হয় কর্নেল আউরোলিয়ানো বুয়েন্দিয়া: কতটা বুড়িয়ে গেছে, কত মোটা হয়েছে পিলার কিন্তু আরোও বেশি আশ্চর্য হল তার তাস পড়তে পারার ক্ষমতার গভীরতা দেখে। “যা বলিস সাবধানে বলিস” তাকে বলে পিলার। কর্নেল নিজেকে প্রশ্ন করে যখন সে গৌরবের শিখরে ছিল তখন এই একই কথা যে তাকে বলেছিল, সেটা তার নিয়তির ব্যাপারে চমকে দেওয়া কোনো আগাম আভাস দিয়েছিল কিনা । তারও কিছুক্ষণ পরে যখন তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক গলন্দ্রিনাটাকে উৎপাটন করা শেষ করেছে তখন সে সুনির্দিষ্ট কোনো ঔৎসুক্য না দেখিয়ে জানতে চায়, হৃদপিন্ডের সঠিক অবস্থান। ডাক্তার স্টেথো দিয়ে পরীক্ষা করে আয়োডিন ভেজা নোংরা তুলো দিয়ে বুকে এক বৃত্ত আঁকে।

যুদ্ধ বিরতির মঙ্গলবারটা ছিল বৃষ্টি ভেজা, মোলায়েম। কর্নেল আউরোলিয়ানো বুয়েন্দিয়া রান্নাঘড়ে হাজির হয় ভোর পাঁচটার আগেই, আর পান করে অভ্যেস মতই চিনি ছাড়া কফি । “এমনই একদিন পৃথিবীতে এসেছিস তুই” -বলে উরসুলা । “সবাই ভয় পেয়েছিল তোর খোলা চোখ দেখে”। কর্নেল মনোযোগ দেয় না ওর কথাতে, কারন তার মনোযোগ ছিল সৈন্য জমায়েত, শিঙ্গার ফুক, আর আদেশের আওয়াজে যা ভেঙে ফেলবে শান্তিময় প্রভাতকে। যদিও এত বছরের যুদ্ধের পর এসব কিছুই তার অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার কথা তবুও এবার যৌবনে এক নগ্ন মেয়ের কাছে যেমনটি তার চামড়ার ঢেউ অনুভব করেছিল সেই রকম একই অনুভূতি হয় তার । সে চিন্তা করে করে বিহ্বল হয়ে শেষ পর্যন্ত বন্দী হয় স্মৃতিকাতরতার কাছে, যদি মেয়েটাকে বিয়ে করত হয়তো বা সে পরিণত হত যুদ্ধ আর বিজয়বিহীন এক লোকে, নাম ধামহীন এক হস্তশিল্পী, এক সুখী জানোয়ারে। সকালের নাস্তাকে বিস্বাদ করে তোলা এই অপ্রত্যাশিত শিহরণে তার পূর্ববোধে ছিল না। সকাল সাতটায় যখন কর্নেল হেরিনাল্দো মার্কেস একদল বিপ্লবী অফিসার সঙ্গে করে তাকে নিতে আসে, তাকে পায় এ পর্যন্ত দেখা সময়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশী নির্বাক, চিন্তিত আর নিঃসঙ্গ রূপে। উরসুলা তার কাঁধে এক নতুন চাদর জড়িয়ে দিতে চেষ্টা করে। “সরকার কি মনে করবে” -বলে সে -“ওরা ভাববে তুই পরাজয় বরণ করেছিস কারণ তোর কাছে, এমনকি নতুন একটা চাদর কেনার পয়সাও নেই”। কিন্তু সে চাদরটা নেয় না। দরজায় গিয়ে যখন দেখে বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষন নেই তখন হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া পুরনো একটা ফেলটের হ্যাট পরাতে দেয় তার মাকে। -“আউরোলিয়ানো” ওকে বলে তখন উরসুলা –“প্রতিজ্ঞা কর ওখানে যদি প্রতিকূল অবস্থা দেখিস তাহলে তোর মাকে স্মরণ করবি”।
সে ক্ষীণ এক হাসি হেসে সবগুলো ছড়ানো আঙ্গুলসহ হাত তুলে, একটিও কথা না বলে গৃহত্যাগ করে আর মুখোমুখি হয় চিৎকারের, নিন্দার আর অপবাদের, যা কিনা গ্রামের প্রান্ত পর্যন্ত ওকে অনুসরণ করে। উরসুলা জীবনে কখনও খুলবে না এই চিন্তা করে দরজায় আগল দেয়। “আমরা এখানে ভিতরেই পচে মরব” -ভাবে –“পুরুষবিহীন এই বাড়িতে ছাই হয়ে যাব আমরা তবুও আমাদের কান্না দেখে আনন্দ করার সুযোগ, এই হতচ্ছাড়া গ্রামটাকে দেব না”। সারাটা সকাল জুড়ে ছেলের স্মৃতিচারণ করার মত এক জিনিস খুঁজে বেড়ায় সে, এমনকি বাড়ির সবচেয়ে গোপন কানিঘুপচি গুলোতেও, কিন্তু সে খুঁজে পায় না।

চুক্তিটা অনুষ্ঠিত হয় মাকন্দো থেকে কুড়ি কিলোমিটার দূরে, এক বিশাল সেইবা গাছের তলায়, পরে যে গাছকে ঘিরে পত্তন হবে নীরলান্দিয়া গ্রামের। সরকার এবং বিভিন্ন দলের প্রতিনিধি আর অস্ত্র সমর্পনকারী বিপ্লবীদেরকে আপ্যায়ন করে সাদা পোষাকপরা শিক্ষানবীশ এক কোলাহলপূর্ণ দল, যাদের দেখে মনে হবে বৃষ্টিতে ভীত একঝাক কবুতর। কর্নেল আউরেলিয়ানো আসে এক কাদামাখা খচ্চরের পিঠে চড়ে। দাড়ি না কামানো গলন্দ্রিনার ব্যাথার চাইতেও বেশী জর্জরিত তার বিশাল স্বপ্নভঙ্গে সে চলে এসেছে তার সকল প্রত্যাশার শেষ সীমানায়, পৌঁছেছে বিজয়ের চেয়েও দূরে, এমনকি বিজয়ের স্মৃতিকাতরতার চেয়েও দূরত্বে। তারই ইচ্ছেয় কোনো বাদ্যযন্ত্র বাজানো হলো না, পোড়ানো হোল না আতশবাজী, বাজল না বিজয়ের ঘন্টা ধবনি। হয়নি কোনো উল্লাসধ্বনি অথবা অন্য কোনো কিছু যা যুদ্ধবিরতির শোকাচ্ছন্ন অবস্থাটাকে ভেঙে দিতে পারে। এক ভ্রাম্যমান ক্যামেরাম্যান সংরক্ষন করার জন্য তার একমাত্র যে ছবিটি তুলতে পারে, তাকে বাধ্য করা হয় সেটিকে ডেভলপ না করেই প্লেটটা ধ্বংস করে ফেলতে।
অনুষ্ঠানটা স্থায়ী হয় শুধুমাত্র স্বাক্ষর করতে যতটুকু সময়ের প্রয়োজন ততক্ষণই। সার্কাসের তালি দেয়া তাঁবুর মাঝখানে হাতে বানানো এক টেবিলের ধারে, যেখানে প্রতিনিধি দল ছিল সেখানেই ছিল শেষ পর্যন্ত কর্নেল আউরোলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার প্রতি বিশ্বস্ত অফিসাররা। স্বাক্ষরের আগেই প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত প্রতিনিধি উচ্চস্বরে আত্মসমর্পনের শর্তগুলো পড়তে চেষ্টা করে কিন্তু বাধা দেয় কর্নেল আউরোলিযানো বুয়েন্দিয়া, “সময় নষ্ট করব না আমরা আনুষ্ঠানিক ব্যাপারগুলোতে” -বলে সে, আর উদ্যত হয় শর্তগুলোতে স্বাক্ষর করতে না পড়েই। তার এক অফিসার তাঁবুর নিদ্রাদায়ক নীরবতা ভঙ্গ করে। “কর্নেল” বলে “দয়া করুন যাতে আমরা প্রথম স্বাক্ষরকারী না হই”।
কর্নেল আউরোলিয়ানো বুয়েন্দিয়া মেনে নেয়। যখন কাগজে কলমের খসখসানি শোনা যাবে এমনতর নিখাদ নীরবতার মাঝে কাগজগুলো টেবিল ঘুরে আসে, তখনও প্রথম স্বাক্ষরকারীর জায়গাটা খালি থাকে। কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া জায়গাটা ব্যবহার করতে প্রস্তুত হয়।

-“কর্নেল” বলে অন্য অফিসার –“এখনও সময় আছে আমাদের সবকিছু সঠিকভাবে করার” মুখের অভিব্যক্তি না বদলিয়ে কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া প্রথম কপিতে স্বাক্ষর করেন। শেষ কপিটাতে স্বাক্ষর শেষের আগেই তাবুর দরজায় হাজির হয় দড়ি দিয়ে বাধা এক খচ্চরের পিঠে দুটো তোরঙ্গসহ এক বিপ্লবী কর্নেল । বয়সে প্রচন্ড যুবক হওয়া সত্তেও তার অভিব্যক্তিতে ছিল শুষ্কতা আর প্রসন্নতা। সে ছিল মাকন্দোর বিপ্লবী কোষাধ্যক্ষ। ক্ষুধায় কাতর খচ্চর টেনে ছয় দিনের এক কষ্টকর যাত্রা শেষ করতে হয়েছে তাকে যুদ্ধবিরতির অনুষ্ঠানে ঠিক সময়ে পৌঁছানোর জন্য। সময় নিয়ে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে তোরঙ্গ দুটি খালি করে সে; খুলে একটা একটা করে আর টেবিলের উপর রাখে একের পর এক বাহাত্তরটা সোনার ইট। এই সম্পদের অস্তিত্বের কথা কারুরই মনে ছিল না। বিপ্লবে শেষ বছরের বিশৃঙ্খলতায় যখন কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব খন্ড বিখন্ড, যখন বিদ্রোহ পরিণত হয়েছিল নেতাদের রক্তাক্ত প্রতিদ্বন্ধিতায়, তখন কার যে কী দায়িত্ব তা ঠিক করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। গলিয়ে ইটের আকৃতি দিয়ে তার উপর পোড়ানো কাঁদার প্রলেপ দেয়া বিপ্লবীদের ইটগুলো রয়ে গিয়েছিল সমস্ত নিয়ন্ত্রনের বাইরে। কর্নেল আউরোলিয়ানো বুয়েন্দিয়া বাহাত্তরটি ইট আত্মসমর্পনের তালিকায় ঢুকিয়ে কাউকে কোনো বক্তৃতার সুযোগ না দিয়ে অনুষ্ঠান শেষ করে। নোংরা সেই যুবক সিরাপ-রঙের শান্ত চোখ তার চোখে রেখে তার সামনে দাড়িয়ে থাকে। -“আর কিছু?” -ওকে জিজ্ঞেস করে কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া, যুবক কর্নেল দাঁতে দাত পিশে।
-“রশিদ” বলে।
নিজ হাতে রশিদ লিখে দেয় কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া। পরে শিক্ষানবীশদের পরিবেশিত একটা বিস্কুটের টুকরো মুখে দিয়ে এক গ্লাস লেমনেট পান করে, তার বিশ্রাম নেবার জন্য প্রস্তত তাবুর উদ্দেশ্যে যায়। সেখানে সে জামা খুলে ক্যাম্প খাটের কিনারে বসে আর বিকেল সোয়া তিনটের সময় তার ব্যক্তিগত ডাক্তার আয়োডিন দিয়ে বুকে যে বৃত্ত এঁকেছিল তার মাঝখানে গুলি করে। মাকন্দোতে সেই সময় দেরী হচ্ছে দেখে বলক দেয়ার জন্য আগুনে বসানো দুধের কড়াইর ঢাকনা খোলে উরসুলা আর দেখতে পায় তা কীটে ভরে গেছে।
-“আউরেলিয়ানোকে মেরে ফেলেছে ওরা” -চিৎকার করে।

——————————-

আর্হেন্তিনার বুয়েনোস আইরেস-এর
এদিতোরিয়াল সুদামেরিকানা প্রকাশনী থেকে
প্রকাশিত ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’ উপন্যাসের
প্রথম সংস্করণের প্রচ্ছদ

——————————-
border=0
উঠোনের দিকে তাকায় সে নিঃসঙ্গতার অভ্যাশবশত আর দেখতে পায় ভেজা হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়াকে, করুন চেহারা আর যখন মারা গিয়েছে তখনকার চাইতেও অনেক বেশী বৃদ্ধ । “ওকে মারা হয়েছে বিশ্বাসঘাতকতা করে”। -আরও বর্ণনা দেয় উরসুলা “এমনকি ওর চোখদুটো বুজিয়ে দেবার মত দয়াটুকুও দেখায়নি কেউ”। রাতেরবেলা অশ্রুভরা চোখে আকাশের এমাথা থেকে ওমাথা পর্যন্ত কমলা-উজ্জল এক গোলাকার বস্তুকে দ্রুত চলে যেতে দেখলে তার মনে হয় সেটা হচ্ছে মৃত্যুর ইশারা। সে তখনও চেষ্টনাটের নীচে স্বামীর হাঁটুর কাছে বসে ফোপাচ্ছে যখন শুকনো রক্ত দিয়ে শক্ত হওয়া চাদর মোড়া কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়াকে নিয়ে যাওয়া হলো; ওর চোখদুটো ছিল খোলা আর তাতে ছিল প্রচন্ড ক্রোধ।
সে ছিল সমস্ত বিপদমুক্ত। গুলিটা এমনি পরিস্কার রাস্তা ভেদ করেছে যে ডাক্তার আয়োডিন ভেজা দড়ি বুক দিয়ে ঢুকিয়ে পিঠ দিয়ে বের করে। “এটা হচ্ছে আমার জীবনের সেরা কাজ” সন্তুষ্ট হয়ে বলে সে। “এটাই ছিল একমাত্র জায়গা যেখান দিয়ে গুলি ঢুকে জীবনের জন্য অপরিহার্য কোনো অঙ্গের ক্ষতি না করে বেরিয়ে যেতে পারে”। কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া দেখতে পায় ওকে ঘিরে আছে শিক্ষানবিশরা আর তার আত্মার অসীম শান্তির জন্য উন্মত্তের মত মন্ত্র উচ্চারণ করছে আর তখনই তার অনুশোচনা হয় পিলার তেরনেরার ভবিষ্যৎবাণীকে বিদ্রুপ করার জন্য কেন সে টাকরায় গুলি করেনি যেমনটি ভেবে রেখেছিল।
-“যদি এখনও আমার হাতে কর্তৃত্ব থাকত” -বলে সে ডাক্তারকে-“ কোনো বিবেকদংশন ছাড়াই আপনাকে গুলির আদেশ দিতাম। আমার প্রাণ বাঁচানোর কারণে নয়, বরঞ্চ আমাকে বিদ্রুপের পাত্র বানানোর কারণে”।
অল্প কয়েকঘন্টার মধ্যেই তার মৃত্যুর ব্যর্থতা ফিরিয়ে আনে তার হারানো সম্মান। সেই একই লোকজন যারা গল্প ফেদেছিল যে যুদ্ধটাকে বিক্রি করে দিয়েছে সে এক ঘড়ের বিনিময়ে, যে ঘড়ের দেয়ালগুলো সোনার ইট দিয়ে তৈরি, তারাই আত্মহত্যার চেষ্টাকে এক বিরোচিত ব্যাপার ব্যাখ্যা দিয়ে তাকে শহীদ বলে ঘোষণা করে । পরে যখন প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্টের দেয়া “অর্ডার অফ মেরিট” প্রত্যাখ্যান করে, তখন তার সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দীরাও তার ঘড়ের কাছে সাড়ি বাধে, আর অনুরোধ করে যুদ্ধবিরতির শর্তাবলি অমান্য করে আরেকটা যুদ্ধ বাধাতে। ঘড় ভরে যায় ক্ষমা প্রার্থনামূলক উপহারে । প্রাক্তন সহোযোদ্ধাদের এই প্রচুর সমর্থনে দেরীতে হলেও আশ্চর্য হওয়া কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া ওদের খুশি করার সম্ভাবনাকে নাকচ করে না । বরঞ্চ তার উল্টো মাঝে মাঝে নতুন একটা যুদ্ধের সম্ভাবনায় তাকে এতই উৎসাহী মনে হত যে কর্নেল হেরিনাল্দো মার্কেস ভাবে যে সে শুধুমাত্র যুদ্ধ শুরু করার জন্য একটা অজুহাতের অপেক্ষায় আছে । আসলেই অজুহাতটা এসে যায় । যখন প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট রক্ষনশীল এবং উদারপন্থী উভয় দলের প্রাক্তন সেনাদের কাগজপত্রসহ যতক্ষণ পর্যন্ত না এক বিশেষ কমিশন পরীক্ষা করে আর কংগ্রেস তার অনুমোদন দেয় ততক্ষণ পর্যন্ত তাদেরকে অবসর ভাতা দিতে অস্বীকার করে। “এটা হচ্ছে ক্ষমতার অপব্যবহার” ক্রোধে ফেটে পরে কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া, “ওরা সকলেই বৃদ্ধ হয়ে মারা যাবে অনুমোদনের অপেক্ষায়”। সুস্থ হওয়ার জন্য কেনা দোল চেয়ারটা প্রথমবারের জন্য ত্যাগ করে ঘরময় পায়চারী করতে করতে প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্টের উদ্দেশ্যে শক্ত এক চিঠি ডিক্টেট করে । কখনই প্রচারিত না হওয়া এই টেলিগ্রামটিতে সে নীরলান্দা চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগ করে আর আমরণ যুদ্ধ করার হুমকি দেয় যদি না পনের দিনের মধ্যে অবসর ভাতার ব্যাপারটা সুরাহা না হয়। তার এই দাবী এতই সঙ্গত মনে হয় যে, প্রাক্তন রক্ষনশীল যোদ্ধাদের সমর্থনেরও আশা রাখে। কিন্তু তার একমাত্র যে জবাব সরকারের পক্ষ থেকে আসে তা হচ্ছে বাড়ির বাইরে সামরিক পাহাড়া আরও জোরদার করা, আর তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার অজুহাতে সব রকমের সাক্ষাতের নিষেধাজ্ঞা। একই রকমের ব্যবস্থা নেয়া হয় সারাদেশব্যাপি প্রহরাধীন অন্যান্য নেতাদের বেলায়ও। ব্যবস্থাটি এতই যুতসই, চূড়ান্ত আর ফলপ্রসু হয় যে দুই মাস পর যখন কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া সুস্থ হয়ে উঠে, তখন বিদ্রোহের সবচেয়ে অনুপ্রাণিত লোকগুলো হয় মৃত নতুবা নির্বাচিত বা প্রশাসনযন্ত্রের সঙ্গে চিরদিনের জন্য সম্পৃক্ত।

কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া সুস্থ হয়ে ঘড় থেকে বের হয় ডিসেম্বরে। বেরিয়ে বারান্দার দিকে এক লহমার দৃষ্টিই যথেষ্ট ছিল যুদ্ধের কথা পুনর্বার চিন্তা না করার। বয়সের কারণে আস্বাভাবিক জীবনীশক্তি দিয়ে উরসুলা বাড়িটাকে পুনঃযৌবন দান করে। “এখন সবাই বুঝবে আমি কে”, -বলে যখন বুঝতে পারে যে তার ছেলে বেঁচে যাবে। “এই উন্মত্তদের বাড়ির চাইতে সারা পৃথিবীতে কোনো সুন্দর বাড়ি থাকবে না, যেটা হবে সবার জন্য খোলা” । বাড়িটা ধোয়ামোছা করিয়ে রঙ চড়ায়, আসবাবপত্র বদল করায়, বাগানটাকে অন্যভাবে সাজিয়ে নতুন ফুল লাগায়, গ্রীষ্মের চোখধাধানো উজ্ঝলতা শোবার ঘড় পর্যন্ত ঢোকানোর জন্য সব দরজা জানালা খুলে দেয়। অসংখ্য চাপিয়ে দেয়া শোকপর্বের সমাপ্তি ঘোষণা করে, আর নিজে তার চিরাচরিত পুরনো পর্দাশীল কাপড়চোপড়ের বদলে যৌবনের উচ্ছলতাময় কাপড় পরে । পিয়ানোলার সুর আবার বাড়িটার আনন্দ ফিরিয়ে আনে। সুরটাকে শোনার পর আমারান্তার পিয়েত্র ক্রেসপির কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে তার গোধুলি পর্বের গার্ডেনিয়ার কথা, তার ল্যাভেন্ডারের সুগন্ধীর কথা আর তার জীর্ণ হৃদয়ে ফুটে ওঠে সময়ের সাথে সাথে পরিস্কার হয়ে যাওয়া তিক্ততা। এক বিকেলে যখন বৈঠকখানা ঠিক করছিল তখন প্রহরারত সৈন্যদেরকে তার সাথে হাত লাগাতে বলে উরসুলা। যুবক কমান্ডার অনুমতি দেয় ওদেরকে। ধীরে ধীরে ওদেরকে নতুন নতুন কাজের ভার দেয় । ওদের সে খাওয়ার আমন্ত্রণ জানাত, জামাকাপড় আর জুতো উপহার দিত, আর শেখাতো লিখতে ও পড়তে। যখন সরকার পাহারায় ইতি টানে, ওদের একজন থেকে যায় বাড়িতে আর অনেক বছর পর্যন্ত উরসুলার কাজ করে চলে।
নববর্ষের দিন, রেমেদিওস লা বেয়্যার অবজ্ঞায় প্রেমে পাগল তরুণ কমান্ডারকে ভোর বেলায় জানালার পাশে পাওয়া যায় মৃত।

(চলবে)

কিস্তি-১ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৩ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৪ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৫ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৬ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৭ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৮ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৯ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১০ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১১ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১২ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৩ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৪ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৫ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৬ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৭ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৮ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৯ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২০ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২১ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২২ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২৩ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২৪ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২৫ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২৬ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (4) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন mostafa tofayel — আগস্ট ২২, ২০১৫ @ ১২:৩৩ অপরাহ্ন

      So lovely and lively a Bengali translation the like of which never found earlier. The dramatic and objective areas of the source Text have also been given the required stroke of pen.I would request Anis to think of a Bengali drama form of this boom novel. In Bangladesh we have not yet got any drama or play acting of One Hundred Years of Solitude.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Anisuz Zaman — আগস্ট ২৫, ২০১৫ @ ১০:২৮ পূর্বাহ্ন

      thanks a lot Mostofa Vai. i dont know if it will be possible by me or not. i shall think.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Mostafa Tofayel — সেপ্টেম্বর ৫, ২০১৫ @ ১:৪২ অপরাহ্ন

      I am eagerly waiting for a call from you, Mr Anis, for discussion on how an assignment of the proposed dramatic version of the great boom novel could be undertaken. Nothing is impossible. Let us have a plan where and how to start from or with.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন mostafa tofayel — অক্টোবর ২, ২০১৫ @ ১১:৩১ অপরাহ্ন

      It’s a long time since the translator has submitted his last episode. Would request for the next issue. Thanks.

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com