তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনির স্মরণে

আলম খোরশেদ | ১৪ আগস্ট ২০১৫ ১২:০৮ পূর্বাহ্ন

তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনির-এর অপঘাতে মৃত্যুর অল্প ক’দিন পর, ২৫ আগস্ট, ২০১১ সালে, ব্রিটিশ কাউন্সিল মিলনায়তনে ক্যাথরিন মাসুদ আয়োজিত ‘তারেক মাসুদ স্মরণসভায়’ আলম খোরশেদ যে স্মৃতিচারণমূলক বক্তৃতা দেন ইংরেজিতে, লেখক কর্তৃক তার বাংলা তর্জমা এখানে এই প্রথমবারের মতো প্রকাশ করা হলো।

tariqmishukcopy.jpgআমার দুই মেধাবী বন্ধু তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনির, যাঁরা ’জীবন মরণের সিমানা ছাড়ায়ে’ আচমকাই আজ ছবি হয়ে গেছে, তাঁদের প্রতি আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। আমার আরেক বন্ধু চিত্রশিল্পী ঢালি আল মামুন এখন ব্যাংককের হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে লড়ছে। তাঁর জন্য আমার সমস্ত শুভ কামনা। তারেক ও মিশুকের জীবনসঙ্গিনী ক্যাথরিন এবং মঞ্জুলী কাজী, যে আমার প্রায় বাল্যবন্ধু, তারা বেঁচে থেকেও আজ প্রায় জীবন্মৃত। কিন্তু তাদের অদম্য প্রাণশক্তিতে তারা আজকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এক নতুন আন্দোলন, এক নতুন লড়াইয়ের ডাক দিচ্ছে এই বীভৎস ঘটনার প্রতিকার চেয়ে। তাদের জন্য আমার সর্বাত্মক শুভ কামনা, সমবেদনা এব সহমর্মিতা জানিয়ে আমি আমার স্মৃতিচারণ শুরু করছি।

আমি থাকি অনেক দূরে রাজধানী থেকে, চাঁটগায়। অনেকটা প্রায় আত্মগোপনেই। তারপরও ছুটে এসেছি ঢাকায়, ক্যাথরিনের ফোন পেয়ে। শুধু তার এই কথাটির জন্য যে এটি কোনো গতানুগতিক শোকসভা হবে না। সে বলেছিল ’উই উইল সেলিব্রেট তারেক্স লাইফ’। তার এই ‘সেলিব্রেট’ কথাটি আমার ভিতরে অন্যরকম অনুরণন তুলেছিল। আমিও এই উদযাপন অনুষ্ঠানের অংশ হতে চাইলাম, তাই ছুটে এলাম। তারেকের জীবন সত্যিই উদযাপন করার মত জীবন। এক বহুমাত্রিক, বহুবর্ণিল, ব্যাতিক্রমী জীবন তার! এই বঙ্গদেশের মাটিতে সেই তারেকের সাহচর্য আমি পেয়েছি, তার বন্ধুত্ব লাভ করেছি, সেটাকে আমার জীবনের এক বড় প্রাপ্তি বলে আমি মনে করি।

আমি মুক্তির গান প্রসঙ্গে যাবার আগে তারেকের সাথে আমার শেষ সাক্ষাতের স্মৃতিটুকু বর্ণনা করছি। কয়েক মাস আগে চট্টগ্রামের এশিয়ান ইউনির্ভাসিটি ফর উইমেনের এক মার্কিন অধ্যাপিকা একদিন আমাকে এসে বলল, “আমি একটি কোর্স পড়াচ্ছি ব্যান্ড ফিল্মস-এর ওপরে। আমি শুনেছি বাংলাদেশের একটা ছবি, মাটির ময়না নিয়ে নাকি সেন্সর বোর্ডে খুব সমস্যা হয়েছিল, অনেক কষ্ট করে ছাড়পত্র পেয়েছিল সেটি। তার পরিচালক তো তোমার বন্ধু। তুমি কি তাঁকে আমাদের এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আনানোর ব্যাপারে সাহায্য করতে পারবে। আমার কোর্সটার ছাত্রীদেরকে তিনি যদি তাঁর অভিজ্ঞতার কথা শোনাতেন তাহলে আমরা খুব উপকৃত হতাম।” আমার কাছ থেকে ইতিবাচক উত্তর পেয়ে সে তখন তার এক ছাত্রীকে পাঠালো তারেকের নম্বর নিয়ে যাবার জন্য। এর পরদিন আবার এসে আনন্দিত ও উত্তেজিত কন্ঠে জানালো যে তারেক এই দেশের সবচাইতে নামী চিত্রনির্মাতা হয়েও এককথায়, তাও একজন সাধারণ ছাত্রীর কথায়, এখানে আসতে রাজি হয়েছে যা তার নিজের দেশে কখনো কল্পনাও করা যায় না। আমি বললাম এখানেই সে সবার চেয়ে আলাদা। তারেকের ধ্যান-জ্ঞান-স্বপ্ন হচ্ছে ছবি। ছবি নিয়ে কথা বলতে পারাটা, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে, ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্যাশন।
পরের সপ্তাহে তারেক চট্টগ্রাম এলো। সারাদিন সে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদেরকে তার ছবি দেখাল, তার ছবি নিয়ে কথা বলল। আমি আমার প্রতিষ্ঠান বিশদ বাঙলা নিয়ে খুব ব্যস্ত ছিলাম বলে তখন যেতে পারিনি। কিন্তু সন্ধ্যায় ঠিকই গেলাম। আমি, আমার স্ত্রী মাহীয়া, তারেক মাসুদ আমরা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাফেতে এক টেবিলে বসে ছাত্রী ও শিক্ষকদের সাথে ডিনার করলাম। সেই নৈশভোজে সেদিন আমি তারেকের অন্য মূর্তি দেখলাম। তারেক অর্নগল কথা বলছিল, মূলত তার পরবর্তী ছবি কাগজের ফুল নিয়ে। সেদিন কেন জানি সে তার বাবার কথাও খুব বলছিল, বিশেষ করে তাদের সম্পর্কের জটিলতা বিষয়ে। এর কয়দিন পরই যে তার বাবা মারা যাবেন তারই কোন একটা ইঙ্গিত হয়ত সে পেয়েছিল। আরো একটি ছবির কথা সে বলেছিল যার কথা হয়ত আমরা অনেকেই জানিনা। বাংলা সংস্কৃতির তিন দিকপাল আব্বাস উদ্দিন, জসিম উদ্দিন ও জয়নুল আবেদিন-কে নিয়ে একটি ছবির গবেষণা কাজও সে অনেকদূর এগিয়ে রেখেছিল। তার সেই সহাস্য মুখ, সেই স্বপ্নময় চেহারাটুকু আমার মনে চিরদিনের জন্য গাঁথা হয়ে রয়েছে। তার সঙ্গে আমার এই শেষ স্মৃতিটুকু আমি আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নিলাম।
এবারে আমি আমাদের নিউইয়র্কের জীবন নিয়ে আলোচনা করব। আমরা প্রায় একই সময়ে নিউইয়র্ক যাই। আমি ১৯৮৮ সালে মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ উচ্চ শিক্ষা নেওয়ার জন্য সেখানে যাই। তারেক তারও বছর খানেক পরে সেখানে আসে, ক্যাথরিনসহ। আমার বছর খানেক আগে যান লেখক সলিমুল্লাহ খান এবং আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুন। তাঁরা আজ এখানে উপস্থিত রয়েছেন। আমরা চারজন দেশে থাকতেই পূর্ব পরিচিত ছিলাম নানারকম কাজ, যেমন লেখালেখি, চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন, নাটকের সূত্রে। আমি তখন নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলাম, সেখানেই তারেককে দেখি প্রথম। কিন্তু নিউইয়র্কে গিয়ে প্রবাসজীবনের যৌথ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে অচিরেই আমরা যেন আত্মার-আত্মীয় হয়ে উঠলাম।

আপনারা প্রামাণ্যচিত্রটিতে দেখেছেন তারেক দাঁড়িয়ে আছে স্ট্রান্ড বুকস নামে একটি বইয়ের দোকানের সামনে। এটাতে সে কাজ করত। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পুরনো বইয়ের দোকান যার বইগুলোকে পাশাপাশি রাখলে আট মাইল লম্বা হবে, এই কথাটি তারা গর্বভরে লিখে রেখেছে তাদের দেয়ালে। এটি ছিল লোয়ার ম্যানহাটানের টুয়েলফ্থ স্ট্রিটে, পাশেই ফোর্টিনথ স্ট্রিটের নিউ স্কুল ফর সোসাল রিসার্চে পড়ত সলিমুল্লাহ খান। আমি ছিলাম টুয়েন্টি থার্ড স্ট্রিটে বারুখ কলেজ ক্যাম্পাসে। নিচে ফোর্থ স্ট্রিটে নিউয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে ছিল নাট্যকর্মী সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায় ও সালেক খান। পাশেই মিডটাউনে ছিল নাসির আলী মামুন। আমাদের কাজই ছিল ক্লাস কিংবা কাজের শেষে বইয়ের দোকানগুলেতে ঘুরে বেড়ানো, গ্রীনিচ ভিলেজের আর্ট হাউস থিয়েটারে গিয়ে বিদেশী ছবি দেখা। আমরা দলবেঁধে টম্পকিন্স স্কোয়ার পার্কের স্ট্রীট ফেস্টিভ্যাল, কুপার ইউনিয়ন থিয়েটারে অ্যালেন গিন্সবাগের্র অনুষ্ঠানের মত কত জায়গাতেই না গেছি। আমরা যারা পড়াশুনা করতাম, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সামান্য কিছু ভাতা পেতাম। ওই ভাতা বই কেনা আর ছবি দেখায় দ্রুত উড়িয়ে দিয়ে ভবঘুরের মত ঘুরে বেড়াতাম। ফিফটি সেন্টের বেগেল দিয়ে হয়ত লাঞ্চ সারতাম। সন্ধ্যায় এক ডলারের একটা হটডগ দিয়ে আমাদের ডিনার হয়ে যেত। কিন্তু রাত্রে বাড়ি ফিরে যেতাম অপার ঐশ্বর্য হাতে নিয়ে। চমৎকার কিছু দুর্লভ বই, আর ভালো কোনো ছবি দেখার স্মৃতি নিয়ে। সেইসব মুহূর্তগুলোকে প্রায়শই ক্যামেরাবন্দি করে রাখতো আমাদের বন্ধু নাসির আলী মামুন। আমি নিশ্চিত তার পুরনো ছবির সংগ্রহ খুঁজে দেখলে সে এরকম অনেক ছবিই সেখানে পাবে।
সেই নিউইয়র্কবাসের একপর্বে আমি সাময়িকভাবে গৃহহীন হয়ে পড়লে তারেক, সম্ভবত ঢাকায় তার নিজের ভাসমান জীবনের অভিজ্ঞতার কথা মনে করে, সানন্দে তার স্ট্যাটেন আইল্যান্ডের বাড়ির দরজা খুলে দেয় আমার জন্য। আমি তার সে প্রস্তাব সানন্দে গ্রহণ করি, সে শুধু আশ্রয় হিসাবে নয়, তারেক, ক্যাথরিনের সঙ্গে থাকা, তাদের সৃষ্টিশীল জীবনের শরিক হওয়াটাও আমার কাছে খুব লোভনীয় মনে হয়েছিল। সেই বাড়িটির ছবি এখানে দেখছিলাম আর অনেক কথা মনে হচ্ছিল। তারেক পরে মুক্তির গান ছবির খরচ জোগানোর জন্য এই বাড়ী মেরামতের কাজ পর্যন্ত করেছে নিজের হাতে। প্রামাণ্যচিত্রটিতে একটা বিড়ালের ছবিও দেখেছেন আপনারা। আমাদের একজন জাপানি সহবাসিন্দা ছিল ইউমিকো নামে, তার বিড়ালটির নাম ছিল নিকোচি। আমরা মজা করে সেটিকে ‘নিকুচি’ বলে ডাকতাম। সেখানে থাকাাটা আমার জন্য একটা বিশাল আশীর্বাদের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল, কারণ তার কিছুদিনের মধ্যেই তারেক আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ওপর লীয়ার লেভিনের তোলা ১০০ ঘন্টার মত ছবির রিল উদ্ধার করে নিয়ে আসে ব্রুকলিনের এক অখ্যাত বেইসমেন্ট থেকে, যার ওপর ভিত্তি করেই সে তার মহান চলচ্চিত্র মুক্তির গান-এর কাজ শুরু করে। তার সেই মহাযজ্ঞ শুরু হয় এই বাড়ীটি থেকেই। ক্যাথরিন একটু আগে বলেছিল যে জীবনে প্রথমবারের মত ঢাকার ডিএফপি অফিসে গিয়ে যত্রতত্র এলোপাথাড়িভাবে সেলুলয়েডের ফিতা ঝুলতে দেখে সে আঁতকে উঠেছিল। কিন্তু সে জানেনা কিছুদিনের মধ্যে সে নিজেই তার স্ট্যাটেন আইল্যান্ডের বাড়িটিকে ছোট খাটো একটা ডিএফপি-তে পরিণত করেছিল। সারা বাড়ি জুড়ে নানারকম যন্ত্রপাতি আর এখানে-সেখানে নম্বরদাগা হাজারটা ছোট ছোট ছবির ফিতা ঝোলানো। আমাদের বাড়ীওয়ালা ছিল এক মার্কিন যুবক, যার নাম জনাথন হলেও আমরা তাকে দুষ্টুমি করে ডাকতাম জনার্দন বলে। তার ছিল অসম্ভব ভারতপ্রীতি যে-কারনে সে আমাদের সকল অত্যাচার হাসিমুখে সহ্য করেছিল।

সত্যি বলতে কি আপনারা মুক্তির গান ছবিটিতে এর একেবারে চূড়ান্ত ও সমাপ্ত চেহারাখানি দেখেছেন। লীয়ার লেভিন কিন্তু আদৌ এভাবে ছবিটির পরিকল্পনা ও চিত্রগ্রহণ করেননি। এটি আদতে সেই ছবিই নয়, এটা পরিপূর্ণভাবে তারেক-ক্যাথরিনের সৃষ্টি। একথা আমি হলফ করে বলতে পারি, কারণ আমি একেবারে গোড়া থেকে শেষ পর্যন্ত যুক্ত ছিলাম এর সঙ্গে। যে কষ্ট করে তারা এই ছবিটি তৈরি করেছে তার চাইতে একটা আনকোরা নতুন ছবি তৈরী করা অনেক সহজ। এটির কোন কাঠামো ছিলনা, কোন গল্প ছিলনা। তারা প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত আদ্যোপান্ত বারবার করে দেখে সেখান থেকে একটা পূর্ণাঙ্গ ছবি বের করে আনার চেষ্টা করেছে। একটা গল্পের কাঠামো দাঁড় করিয়েছে। তারপর গল্পের সাথে সংগতিপূর্ণ এক ইঞ্চি, দুই ইঞ্চি করে যখন যেখানে যতটুকু ফুটেজ পেয়েছে কেটে রেখেছে, তারপর সেই টুকরোগুলো জোড়া দিয়ে একটু একটু করে গল্পকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। যখন গল্পের বা দৃশ্যের মাঝখানের সংযোগসূত্র খুঁজে পাচ্ছিল না তখন তার খোঁজে তারেক কোথায় কোথায় না গেছে; বিবিসিতে, চ্যানেল ফোর-এ, গ্রানাডা টিভিতে, ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্কাইভে। গীতা মেহতা একটা ছবি করেছিলেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের উপর। সে তাঁকেও খুজে বের করল। একইভাবে তারেক সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড-এর লেখক অ্যালেন গিন্সবার্গ এবং তাঁর মত আরো অনেকের সাথেও যোগাযোগ করেছে এই ছবিটির প্রয়োজনে।

আর একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এখানে জানাতে চাই যে এই ছবিটি বানাতে গিয়ে তারেক একটি ঐতিহাসিক দায়িত্বও পালন করেছিল। সেটি হচ্ছে ১৯৭১ সালে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান যে ঘোষণাটি দিয়েছিলেন তাঁর মূল রূপটি সে উদ্ধার করে এনেছিল জার্মানি থেকে ডয়েচে ভেলে-তে কর্মরত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক আব্দুলাহ আল ফারুকের সহায়তায়। এই মূল্যবান দলিলটিই নিঃসন্দেহভাবে প্রমাণ ও প্রতিষ্ঠা করে যে ২৬-শে মার্চে নয়, বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণাটি পাঠ করেছিলেন জিয়াউর রহমান ২৭ মার্চ। তারেকের এ ধরনের আরো অনেক মূল্যবান গবেষণার ফলে এই ছবিটি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের একটি নির্ভরযোগ্য দলিল হয়ে ওঠে।
আমি তারেকের কাছে আমার ঋণ শোধ করার প্রয়াস পেয়েছিলাম এই ছবিটি নির্মাণের কাজে সাধ্যমত সাহায্য করে। প্রথমত আমি টুকটাক ফুট ফরমায়েসই খাটতাম। এটা সেটা দেখা, গুছিয়ে দেয়া, এর ওর সঙ্গে যোগাযোগ করা ইত্যাদি। পরে একসময় তারেক বলল, ছবিটার ধারাবর্ণনা অংশটুকু ইংরেজিতে লেখা, সেটির একটি বাংলা সংস্করণ যেন আমি তৈরি করে দিই। আমি তখন লেখালিখি, অনুবাদের কাজ করতাম। আমি সঙ্গে সঙ্গে বসে গেলাম সে-কাজে এবং আপনারা আজ মুক্তির গান ছবিতে যে বাংলা ধারাভাষ্যটুকু শোনেন সেটি আমারই লেখা। এছাড়া ছবিটির নির্মাণের জন্য যে বিপুল অর্থের দরকার হয়েছিল তার সংগ্রহের কাজেও নানাভাবে যুক্ত ছিলাম আমি। ছবিটির চূড়ান্ত মুক্তির আগে ন্যুয়র্ক শহরে আমরা তহবিল সংগ্রহের উদ্দেশ্যে এর একটি প্রদর্শনী করি। সে উপলক্ষে একটি স্মরণিকা বের করেছিলাম আমরা। তার পরিকল্পনা, লেখা যোগাড় করা ও সম্পাদনার দায়িত্বও ছিল আমার। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রাখার সংগ্রামে এসবই ছিল আমার যৎসামান্য ব্যক্তিগত অবদান।

এখানে কেউ একজন তাঁর বক্তৃতায় উল্লেখ করেছেন যে তারেকরা একটি আস্ত এডিটিং মেশিন ভাড়া করে তাদের বাড়িতে বসিয়ে দিয়েছিল। এ-কথায় আমার মনে পড়ছে যে সেই মেশিনটি আনার জন্য বিশাল একটি ট্রাক ভাড়া করতে হয়েছিল তাদের! আর সেই ট্রাকটিও চালিয়েছিল ক্যাথরিন নিজে, সেটি আনতে যাওয়ার সময় আমি তাদের সঙ্গে ছিলাম। ট্রাকটি যখন টানেলের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল তখন আচমকা রোড ডিভাইডারের গায়ে লেগে উল্টে যেতে বসেছিল। কিন্তু ক্যাথরিনের সাহস ও বুদ্ধিমত্তায় আমরা তখন অল্পের জন্য বেঁচে গিয়েছিলাম। তা নাহলে হয়ত আজকে মুক্তির গান ছবিটি নিয়ে কথা বলার সুযোগ হতোনা আমাদের এখানে।
একথা স্বীকার করতেই হবে যে এক পর্যায়ে বাংলাদেশের মাটি থেকে, বাংলাদেশের গণমানুষের চেতনা থেকে মুক্তিযুদ্ধ প্রায় বিস্মৃত হতে বসেছিল। খুব সচেতনভাবেই এটাকে ভুলিয়ে দেবার চেষ্টা করা হচ্ছিল তখন। তেমন একটি সময়ে কোন একজন মানুষ, এককভাবে যদি সেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বাংলাদেশের মানসভূমিতে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে, প্রবলভাবে ছড়িয়ে দিয়ে থাকে সে মানুষটি তারেক মাসুদ। তারেক ও ক্যাথরিন মাসুদ মুক্তির গান ছবিটির মধ্য দিয়ে সেই অসামান্য কাজটি করেছে। এর জন্য গোটা জাতি তাদের কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকবে। আর সেই মুক্তির গান-এর সাথে আমার সামান্যতম অংশগ্রহণের জন্য আমি আজও গর্ববোধ করি।

ক্যাথরিনকে আমি একটি কথা বলতে চাই যে তারেকের জীবন শুধু উদযাপনের নয়, তার জীবন অধ্যয়নেরও বটে। আমার মনে হয় তারেকের জীবন সম্পর্কে আমাদের সবারই আরো জানা দরকার। তারেক কোথা থেকে কীভাবে উঠে এসছে, কীভাবে নিজেকে নির্মাণ করেছে, এসব, কেননা এটি বাংলাদেশের জন্য একটি বিষ্ময়কর ঘটনা। এবং এই কাজে যদি তরুণেরা উৎসাহিত হয় তারা অনেক কিছু শিখতে পারবে। আমি মনে করি এই ঘটনা থেকে অনেক বেশী অনুপ্রেরণা পেতে পারে তরুণ প্রজন্ম। তারা যদি কখনও আগ্রহী হয় আমি তাদের সাথে বসব, শোনাব তাদের তারেকের জীবনের আরো অসংখ্য উজ্জ্বল দিকের কথা, তার স্বপ্ন, সংগ্রাম, আদর্শ ও আত্মত্যাগের কথা।

আমি আমার বক্তব্য শেষ করব একটু হালকা চালে। অবশ্য তার সূত্র ধরিয়ে দিয়ে গেছে আলফ্রেড। আলফ্রেড তারেক-ক্যাথরিনের একটি প্যাশন, গ্যারাজ সেলের কথা বলেছেন। তাদের মত আমার নিজেরও কিছুটা দুর্বলতা ছিল এই গ্যারাজ সেলের প্রতি, কারণ সেখানে আমরা সস্তায় অনেক দুর্লভ বই ও পুরানো রেকর্ড খুঁজে পেতাম। এই গল্প তেমনি এক গ্যারাজ সেলের যেখানে আমরা একসঙ্গে গিয়েছিলাম। একবার আমি, ক্যাথরিন, তারেক, সলিমুল্লাহ খান ও নাসির আলী মামুন বেড়াতে গিয়েছিলাম কানেকটিকাটে ক্যাথরিনের দাদার বাড়ীতে। সেখান থেকে আমরা রোড আইল্যান্ড যাচ্ছিলাম ক্যাথরিন যেখানে পড়াশোনা করেছে সেই ব্রাউন কলেজ ক্যাম্পাস দেখার জন্য। যাওয়ার পথে তারেক হঠাৎ দেখতে পেল দূরে কোথাও একটা গ্যারাজ সেল হচ্ছে। ক্যাথরিনকে অবশ্যম্ভাবীভাবেই সেখানে তার গাড়ী থামাতে হয়েছিল। আমরা সেখানে থেমে বইপত্র দেখি ও টুকটাক কিছু সংগ্রহ করি। এক কোণায় বিষন্ন এক যুবককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। আমি তার কাছে এই গ্যারাজ সেলের উপলক্ষ জানতে চাই। সে আমাকে জানায়, ’ইটস্ বিকজ মাই মাদার মেড ট্রানজিশন রিসেন্টলি’। আমি এই বাক্যবন্ধটির অর্থ না বুঝতে পেরে ক্যাথরিনের দ্বারস্থ হলে সে আমাকে জানায় যে যুবকটির মা মারা গেছে সম্প্রতি, কিন্তু সে মৃত্যু শব্দটি উচ্চারণ করতে চায়নি। আজ যখন আমরা সবাই মৃত্যুর কথা বলছি এখানে তখন আমিও তা অস্বীকার করে বলতে চাই যে তারেকের মৃত্যু হয় নি, সেটা হতে পারে না, হি জাস্ট মেড এ ট্রানজিশন, সেই ট্রানজিশণের জগতে বসে তার কাজ সে ঠিকই করে যাচ্ছে। তারেক কাজ ছাড়া থাকতে পারে না। তার সৃষ্টির কাজ, তার নির্মাণের কাজ সে করে যাচ্ছে নীরবে। আমরাও যেন যোগ দিই তার সেই কাজে ক্যাথরিনকে নিয়ে, মঞ্জুলীকে নিয়ে, আপনাদের সবাইকে নিয়ে।
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন নূরিতা নূসরাত খন্দকার — আগস্ট ১৪, ২০১৫ @ ৩:২৭ পূর্বাহ্ন

      ‘ তারেকের জীবন শুধু উদযাপনের নয়, তার জীবন অধ্যয়নেরও বটে।’———– সত্যি আমরা অধ্যয়ন করতে চাই। খুব ভাল লাগলো।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Monirul Islam — আগস্ট ১৬, ২০১৫ @ ১১:৪৮ পূর্বাহ্ন

      অনেক কথা বলেননি আলম সাহেব। তারেক মাসুদ এবং ক‌্যাথেরিন জামাইকাতে থাকার সময় অনেক কাজ করেছে সে সব আলোচনায় আসলে লেখাটি পুর্নাঙ্গ হতে পারতো ।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com