বোর্হেস নিয়ে মান্নান সৈয়দের একটি অপ্রকাশিত লেখা

রাজু আলাউদ্দিন | ৫ আগস্ট ২০১৫ ১:৪৪ অপরাহ্ন

with-mannan-bhai_n.jpgবিদেশের পাঠ চুকিয়ে আমি দেশে ফিরেছিলাম ২০০৯ সালের নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে। বহু প্রতীক্ষিত আমার ‘বোর্হেস’ প্রকল্পের অপ্রকাশের ভারে যতটা না নুব্জ ছিলাম, তার চেয়ে বেশি লজ্জিত ও কুণ্ঠিত ছিলাম অন্তর্ভুক্ত নবীন প্রবীণ অনুবাদকদের পাশাপাশি বোর্হেস-প্রেমিক শুভানুধ্যায়ী বন্ধুদের প্রশ্নে: বইটি কবে বেরুবে? কী করে বুঝাই যে প্রবাসে থেকে বইটির প্রকাশনার তদারকি করা প্রায় অসম্ভব ছিল। তদারকির প্রশ্নটাও পরের কথা, আমিতো তখন কোনো যুৎসই প্রকাশকই পাচ্ছিলাম না ওখান থেকে। প্রকাশক পাওয়া না পাওয়া নিয়ে সে এক অন্য কাহন, বাঘা বাঘা কত মগাদের অবহেলা আর অজ্ঞতা পোহাতে হয়েছে, সেখানেও যে আমার কত সময় পুড়ে ছাই হয়ে গেছে সেসব আলাদা করে অন্য কোথাও বলা যাবে।

যাইহোক, দেশে ফিরে আসার পরপরই বোর্হেস প্রকাশে উৎসাহী ঐতিহ্য প্রকাশনীর কর্ণধার আরিফুর রহমান নাঈমের সাথে আমার যোগাযোগ হলো। নাঈমের খুব উৎসাহ আর আগ্রহ দেখে আমি সত্যি সত্যিই খুব মুগ্ধ হয়ে গেলাম। এদিকে নরম্যান টমাস ডি জিওভান্নির সঙ্গে পাণ্ডুলিপি নিয়ে আলাপের ফলে আমার পরিকল্পনাও খানিকটা বদলে যায়। প্রথমে আমার ইচ্ছা ছিল এক খন্ডে বের করার, কিন্তু তিনি বললেন পাঁচ খন্ডে আলাদা আলাদাভাবে বের করার জন্য। ফলে আমার কাজ গেল বেড়ে। নাঈমের ঘাড়েও এই বাড়তি চাপ পরলো। সে যেমন তার লোকজনকে খাটিয়েছে তেমনি আমাকেও খুব খাটিয়ে ছিল এই কারণে যে প্রায় আটশ পৃষ্ঠার পান্ডুলিপিটি ছিল নানান জনের হাতে লেখা। সুতরাং পাঠোদ্ধার, কম্পোজ এবং সবশেষে প্রুফ– থাক সেসব কাহিনী। মান্নান ভাই কিভাবে বোর্হেসের সাথে যুক্ত হলেন সে কথাই বরং স্মৃতি থেকে উদ্ধারের চেষ্টা করি।

আমি দেশে ফেরা মাত্রই মান্নান ভাইকে বললাম, “মান্নান ভাই, ‘বোর্হেস’ এই সামনের মেলায় বেরিয়ে যাবে। মান্নান ভাই তার আন্তরিকতা ও উৎসাহের ডানায় আমাকে তুলে নিয়ে বললেন, “খুব ভালো একটা সংবাদ জানালেন। এটাতো আপনি বাইরে যাওয়ার আগেই বেরুনোর কথা ছিল।”
আমি কোনো সদুত্তর না দিয়ে কুণ্ঠিত হয়ে বললাম, “আসলে নানান ঝামেলায় অনেক দেরি হয়ে গেল।”
আমার উত্তরে হতাশা উপলব্ধি করেই হয়তো তিনি আমাকে চাঙা করার জন্য বললেন, “যাক, শেষ পর্যন্ত বেরুচ্ছে এটাই বড় কথা।”

এর পর প্রায় নিয়মিতই তার সঙ্গে হয় ফোনে আলাপ হতো, অথবা আজিজ মার্কেটে দেখা হতো। ২০০৯-এর ডিসেম্বর থেকে ২০১০-এর জানুয়ারি ফেব্রুয়ারি সময়কার ঘটনা এসব। হঠাৎ আমার খেয়াল হলো মান্নান ভাইকে কিভাবে সরাসরি যুক্ত করা যায় পাঁচ খন্ডের যে কোনো একটির সাথে। বোর্হেস নিয়ে এরকম বই বেরুবে তাতে মান্নান ভাই থাকবেন না, তা কী করে হয়। কিন্তু ঘটনা হলো, পাঁচ খণ্ডের সবগুলোই অনুবাদের বই আর মুশকিল হলো মান্নান ভাই এখন তো আর অনুবাদ করেন না। মাতাল মানচিত্র বা বিদেশি প্রেমের কবিতা–এরকম একটি দুটি বই তাঁর আছে বটে কিন্তু সে সব কবেকার কথা। তারপরেও মান্নান ভাইয়ের প্রিয় লেখক বোর্হেসের বই বেরুবে, সেখানে মান্নান ভাইকে যে কোনোভাবে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে মনে মনে বদ্ধপরিকর হয়েছিলাম।

dic09-janu2010-022.JPGএকদিন আজিজ মার্কেটে পাঠকসমাবেশের দোতলার অফিসে গিয়ে দেখি মান্নান ভাই কিছু একটা লিখছিলেন বা প্রুফ দেখছিলেন। সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই স্বভাবসুলভ মিষ্টতা দিয়ে বসার আমন্ত্রণ জানালেন। চা খেতে খেতে এক ফাঁকে বললাম, “মান্নান ভাই, আপনি যে পরিমাণ ব্যস্ত থাকেন তাতে করে দীর্ঘ কোনো লেখার আবদার করাটা খুবই অন্যায় হবে, অতএব খুব ছোট্ট আকারের হলেও একটা লেখা আপনাকে দিতেই হবে। আপনি বোর্হেসের একটা কবিতা অনুবাদ করে দেবেন।”

মান্নান ভাইয়ের সাথে ভালোবাসার এমন একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল যে তার সাধ্যের মধ্যে থাকা-যে-কোনো জিনিস আবদার করলে সেটা পাওয়ার নিশ্চয়তা ছিল আমার কাছে শতভাগ। আমি জানি তিনি অন্তত তিরিশ বছর হবে নতুন কোনো কিছুই আর অনুবাদ করছেন না। আর তিনি তো সেই অর্থে পেশাদার অনুবাদক ননও। তিনি ছিলেন সৌখিন অনুবাদক। সুতরাং তার কাছে অনুবাদ চাওয়াই বা কেন। তারপরও এই অবাস্তব আবদারটিকে তিনি মেনে নিয়েছিলেন মিষ্টি হেসে। আমি Selected poems of Jorge Luis Borges নামক একটি ইংরেজি অনুবাদ গ্রন্থ সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলাম। সেখান থেকে তাকে নিজের পছন্দ মতো একটি কবিতা বেছে নিতে বললাম। তিনি ‘সমুদ্র’ বলে একটি কবিতা বেছে নিয়ে বললেন, “খালবিল নদী নালার চেয়ে সমুদ্রে অবগাহন করাই ভালো। এটা আমাকে ফটোকপি করে দিয়ে যান।” যুৎসই রসিকতায় নিজেই হাসতে থাকলেন। কবিতাটি দেয়ার দুদিনের মাথায় আমাকে ফোন করে বললেন, “আজকে বিকেলে চলে আসতে পারবেন?” বুঝলাম তিনি অনুবাদটা তৈরি করে ফেলেছেন। আমি একটু আশংকায় ছিলাম এই জন্য যে মান্নান ভাই লেখালেখির প্রবল ব্যস্ততার মধ্যে আমাকে হয়তো দেবেন, কিন্তু কতদিন সময় নেন কে জানে। এদিকে বইয়ের কাজ চলছে। আমি তার ফোন পেয়ে স্বস্তি বোধ করেছিলাম খুব। সেদিন বিকেলে তাঁর কাছে গিয়ে বসতেই অনুবাদটি বের করে আমার হাতে দিয়ে বললেন, “দেখেন, আপনার পছন্দ হয় কিনা।”
আমি লজ্জিতভাবেই বললাম, “কী বলেন মান্নানভাই, পছন্দ হবে না কেন।”
“আপনি তো জানেন, সেই কবে এক সময় পাগলের মতো উত্তেজনা নিয়ে কিছু কবিতা অনুবাদ করেছিলাম।”
আমি একটু রসিকতা করে বললাম, “পাগলের মতো নাকি ‘মাতাল’-এর মতো?”
তিনি সঙ্গে সঙ্গে আমার পরোক্ষ উল্লেখ (Allusion) বুঝতে পেরে হো হো করে হেসে উঠে বললেন, “ঠিকই বলেছেন, আজকাল তো আর কাউকে ‘মাতাল’ হতে দেখি না। সবাই দেখি সাহিত্যের বাজারে তলে তলে হিসেবের খাতা নিয়ে এত ব্যস্ত থাকে যে মাতাল হওয়া ভুলেই গেছে। বাঙালি মুসলমানদেরকে দিয়ে কিছ্ছু হবে না, বুঝলেন।” আবারও সেই হাসির কল্লোলে ডুবে গিয়ে সীলমাছের মতো ঢেউ ফুঁড়ে ফের পরবর্তী কথায় ফিরে এলেন।

এর কয়েকদিন পর তার বাসা থেকে একসাথে আজিজ মার্কেটের দিকে যাচ্ছিলাম রিকসায়। সেদিন বোর্হেস নিয়ে তার সঙ্গে অনেক কথা হলো। তিনি জানালেন পেঙ্গুইন থেকে প্রকাশিত কালেক্টেড ফিকশন, কালেক্টেড ননফিকশন এবং কালেক্টেড পোয়েমস কিনেছেন। বললেন তাকে আগে এমনভাবে পড়া হয়নি। একসঙ্গে এত লেখা পড়ার সুযোগ পেয়ে তার বিস্তার ও গভীরতায় তিনি মুগ্ধতার কথা জানালেন খুব আবেগ আর মান্নানীয় ভাষার দীপ্তিসহ। আমি নিজেও খুব আবেগাপ্লুত হয়ে যাচ্ছিলাম তার উপলব্ধির ক্ষমতায়। দেশি কিংবা বিদেশি যেকোনো লেখকের শক্তিকে চিনে নেয়ার অসামান্য ক্ষমতা আমি দেখেছি তাঁর মধ্যে। হঠাৎ করেই তিনি বোর্হেস সম্পর্কে আমার মতামত জানতে চাইলেন। আমি প্রথমে বুঝতে পারছিলাম না কী বললো। তবে অনুমান করছিলাম তিনি বাজারি ধারণার বাইরে বোধহয় এমন কিছু জানতে চাইছেন যা হয়তো বৃহত্তর পাঠক বা পত্রিকার হুল্লোড়ে তেমন একটা দেখা যায় না। আর তিনি হয়তো এও ভেবে থাকতে পারেন যে স্প্যানিষভাষী দেশে যেহেতু দীর্ঘদিন থেকেছি ফলে সেখানকার পরিপ্রেক্ষিতে বোর্হেসকে অন্তরঙ্গভাবে বুঝবার বা উপলব্ধি করার একটা ব্যাপার থাকতে পারে। তিনি যদি সেভাবে ভেবে থাকেন তাহলে আমি মনে করি সে রকম ভাবাটা যে কত যৌক্তিক ও সঙ্গত তার কয়েকটি উদাহরণ আমরা দেখতে পাবো বোর্হেস সম্পর্কে অক্তাবিও পাস, কার্লোস ফুয়েন্তেস এবং মারিও বার্গাস যোসার অসামান্য লেখাগুলোর মধ্যে। আমি ঠিক ওই লেখাগুলোর আলোকেই মান্নান ভাইকে বললাম, “পশ্চিমের লেখকরা বোর্হেসকে আবিস্কার করেছেন বটে, এবং তাকে অতুলনীয় লেখক হিসেবে মেনেও নেন, কিন্তু পাস, ফুয়েন্তেস বা বার্গাস যোসার দেখার মধ্যে সত্যি সত্যি চমকে দেয়া এমন সব ব্যাপার আছে যা মার্কিন বা ইউরোপীয় বোর্হেস-প্রেমীদের লেখায় আমি কমই দেখেছি।”
তিনি খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন কথাগুলো।
“আপনি দেখবেন তার প্রবন্ধ নিয়ে খুব একটা আলোচনা হয় না। অথচ গল্পের মতো প্রবন্ধেও তিনি অসামান্য এবং অদ্ভুত বৈশিষ্টের।” উদাহরণ স্বরূপ তার কাফকা সম্পর্কিত একটি প্রবন্ধের কথা বললাম যেখানে তার ভিন্ন রকম পর্যবেক্ষণ ও ব্যাখ্যাকে তিনি হাজির করেছেন। আক্তাবিও পাসের প্রতিধ্বনি করেই বললাম, “তার প্রবন্ধগুলো অবিস্মরণীয় প্রধানত তাদের মৌলিকত্ব, বৈচিত্রময়তা ও ভঙ্গির জন্য। কৌতুকবোধ, গাম্ভীর্য, তীক্ষ্মতা এবং হঠাৎ করেই অসামান্য বাঁক। স্প্যানিশ ভাষায় আর কেউ ওরকমটি লেখেননি।” আমি মান্নান ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললাম “আপনি তো একই সঙ্গে আমাদের প্রধান সমালোচক। বিশ্বসাহিত্যের প্রথম সারির কোনো প্রাবন্ধিকের মধ্যেই কি এই অদ্ভুত কিন্তু অভাবনীয় স্বচ্ছতা ও তীক্ষ্ণতার মিহি সুতোয় বোনা প্রবন্ধের নমুনা আছে?”
travel-with-nizar-205.JPGমান্নান ভাই একটুও দ্বিধা না করে বললেন, “সত্যিই অভিভূত করার মতো। একেবারেই কারো সঙ্গে মেলে না। গল্প এবং প্রবন্ধ দু জায়গাতেই এতো প্রবলভাবে আলাদা যে সঙ্গে সঙ্গে তাকে শনাক্ত করা যায়।”
মান্নান ভাইয়ের আস্কারা পেয়ে আমি ফুয়েন্তেসের দু’একটি পর্যবেক্ষণের কথাও জানালাম তাকে বোর্হেসের গল্প সম্পর্কে। বললাম, “আমাদের এখানে, এমনকি লাতিন আমেরিকায়ও কেউ কেউ বোর্হেসকে ইউরোপীয় ঘরানার লেখক বলে তার গুরুত্ব ও বৈশিষ্ট্যকে গায়েব করার ভুলটুকু করেন। কিন্তু একটু যদি খেয়াল করা যায় তাহলে ফুয়েন্তেসের চোখ দিয়ে তাকালেই আমাদের নজরে পড়বে বোর্হেসের নিপুন হাতেবোনা বিভ্রান্তিকর কিন্তু আরামদায়ক ফাঁদগুলোর লক্ষ্য: “হয়ত তার পক্ষেই সম্ভব পাশ্চাত্যের সামগ্রিকতা ধারণ করে ইউরোকেন্দ্রিকতার সীমাবদ্ধতা দেখানো।” আমি এই বক্তব্যের সাথে ফুয়েন্তেসের সাক্ষাৎকারে বলা আরেকটি কথাও উল্লেখ করার সুযোগ নিয়েছিলাম “ঘটনা হচ্ছে তিনি তীব্র ইউরোপীয় হওয়ার মাধ্যমে কেবল আর্হেন্তিনীয় হওয়ারই ইঙ্গিত দেন।”
আমি সব সময়ই লক্ষ্য করেছি, মান্নান ভাই যে-কোনো লেখকের সত্যিকারের গুণগুলোর মুখোমুখি হলে যেন নিজের গোপন সম্পদ আবিস্কারের আনন্দে প্রগলভ হয়ে উঠতেন। যেন প্রেমিকার নগ্ন শরীরের নীল শিখায় তার ঘুমন্ত আত্মাকে উজ্জীবিত করার দুর্লভ আনন্দ পেয়ে যেতেন। উচ্ছ্বাসের সঙ্গেই তিনি প্রশংসা করে বললেন, “বাহ চমৎকার বলেছেন।”
“না, না, মান্নান ভাই, আমি বলিনি, এসব ফুয়েন্তেসের কথা।” আমি নিজের শরীর থেকে প্রশংসার আলখেল্লা সরিয়ে ফুয়েন্তেসের গায়ে চড়িয়ে নির্ভার হওয়ার চেষ্টা করলাম।
“আপনি একদিন বলেছিলেন, রবীন্দ্রনাথের সাথে তার দেখা হয়েছিল, রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তিনি লিখেছেনও।”
“হ্যাঁ, তবে সেই দেখা অনেকটা তর্কে বিতর্কে ভরা ছিল। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে তাঁর উক্তিও খুব একটা প্রশংসাপূর্ণ ছিল না। তবে এর পেছনে–আমার মনে হয়–সাহিত্যিক এবং মনস্তাত্ত্বিক কিছু ব্যাপার থাকতে পারে।”
সেদিন আরও অনেক কিছু বলেছিলাম। পরে লক্ষ্য করেছি এত কথা বলায় সেদিন একটা লাভ হয়েছিল এই যে আমার সম্পাদনায় বোর্হেসের যে পাঁচটি খন্ড বেরিয়েছিল সেগুলোর জন্য বোর্হেস-সম্পর্কিত একটি ছোট্ট লেখা তাঁর কাছ থেকে পাওয়া সহজ হয়েছিল। সেই ব্যাপারটা ঘটেছিল প্রকাশকের আইডিয়ার কারণে অবশ্য। নাঈম কয়েকদিন আগেই বলেছিল, “এই পাঁচটা খন্ডের জন্য একটা বক্স বানালে কেমন হয়, রাজু ভাই?”
“তাহলে তো খুবই ভালো হয়।”
“বক্সের এক দিকে বইগুলোর ছবি আর অন্যদিকে বোর্হেস সম্পর্কে আমাদের কোনো বিখ্যাত লেখকের অভিমত থাকলে কি ভালো হয় না?”
নাঈমের আইডিয়া আমার মাথায় ঢুকার পর থেকেই কুটকুট করে কামড়াচিছল। ভাবছিলাম কাকে দিয়ে লেখানো যায়। সঙ্গে সঙ্গে মান্নান ভাইয়ের কথাই মাথায় এলো।

এদিকে একটা মজার ঘটনা ঘটে গেল। মান্নান ভাইয়ের সাথে ঐ আলাপের পর হঠাৎ একদিন ফোন করলেন বিকেলের দিকে। তিনি ফোন করলে কমপক্ষে আধাঘন্টা আলাপ হতো। সেদিন তিনি বোর্হেসের বিভিন্ন লেখা ধরে ধরে আমাকে প্রশ্ন করছিলেন একেবারে শিক্ষক যেমন করে ছাত্রদেরকে প্রশ্ন করে। মান্নান ভাইয়ের সাথে এই দীর্ঘ সম্পর্কের কোনদিনই এমনটা করতে দেখিনি আমি। তিনি সেই পরিচয়ের প্রথম থেকেই আমাদের মতো অনুজদের সাথে সমজ্ঞানের মর্যাদা দিয়ে আলাপ করতেন। এটা ছিল তার সুবিদিত সৌজন্যবোধ ও উদারতা। আমার ধারণা এটা তিনি সবার সাথেই করতেন। কোনোদিনই কাউকে খাট বা অপণ্ডিত ধরে নিয়ে কথা বলতেন না। মনে আছে আমি একবার সেই কাঁচা বয়সে চর্যাপদের কবিতায় অবাস্তব দৃশ্যকল্প দেখে নির্বোধের মতো বলেছিলাম, “মান্নান ভাই, চর্যাপদের মধ্যে কিন্তু সুররিয়ালিজম ছিল।” কী হাস্যকর দাবীই না করেছিলাম। আমি তাকে দুএকটি উদাহরণ দিয়ে বুঝাবার চেষ্টাও করলাম, যেমন কামলির একটি কবিতায় আছে, “বাহতু কামরি গঅণ উবেসেঁ( কামলি, তুমি গগন উদ্দেশে নৌকা বেয়ে চল।)”। কিংবা “দুলি দুহি পিটা ধরণ ন জাই।/ রুখের তেন্তলি কুম্ভীরে খাঅ।।(কাছিম দুইয়ে কেঁড়েয় ধরা যাচ্ছে না। গাছের তেঁতুল সব কুমিরেই খায়।)”
মান্নান ভাই খুবই ধৈর্য ধরে আমার কথা শুনলেন, কিন্তু আমার অপার অজ্ঞতাকে একটুও তাচ্ছিল্য না করে কেবল বললেন, “তাই কি?” তো সেই মান্নান ভাই আমাকে এমনভাবে প্রশ্ন করছেন দেখে একটু অবাকই হচ্ছিলাম। যেমন আমাকে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “‘বোর্হেস এন্ড আই’ আসলে কী? এটি প্রবন্ধ নাকি গল্প।” আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম, “এটা তার এক দেড় পৃষ্টার একটি প্যারাবল।” আমি এর দুএকটি লাইন তাকে মুখস্থ শুনিয়ে দিলাম। স্মৃতিতে থাকার কারণ এটি আমার প্রিয় একটি প্যারাবল। অনুবাদও করেছিলাম। ফলে অনেক কিছু মনে আছে। তারপর উনি জিজ্ঞেস করলেন, “‘পিয়ের ম্যানার্ড, অথর অব দন কিহোতে’–এটা গল্প না প্রবন্ধ?” আমি বললাম, এটাকে গল্পও বলতে পারেন, আবার প্রবন্ধও বলতে পারেন। বোর্হেস নিজেই কোনো কোনো গল্পকে তার প্রবন্ধের বইয়ে নিয়েছেন, আবার যেগুলো আমাদের কাছে প্রবন্ধ হিসেবে পরিচিতি তাকে গল্পের বইয়ে নিয়েছেন। ঘটনা হলো প্রবন্ধ এবং গল্পের বৈশিষ্টের মধ্যে তিনি বহুবার পরস্পরের বিনিময় ঘটিয়েছেন। ফলে গনিতবিদের অকাট্য যুক্তি দিয়ে বোর্হেসকে বিচার করতে গেলে ঝুঁকি অনেক। তবে শেষ বিচারে আমার মতে, গল্পের মধ্যে তো বটেই, এমনকি তিনি প্রবন্ধের মধ্যেও গল্পই বলতে চেয়েছেন। আর চূড়ান্ত বিচারে তার সমস্ত খেলাধুলা শেষ হয়েছে গিয়ে কাব্যিক সুষমা ও সাফল্যে। আরও কী কী যেন জিজ্ঞেস করেছিলেন, আজ আর সবটুকু মনেও নেই। কিন্তু সবগুলোরই যথাযথ উত্তর দিয়েছিলাম বলে মনে পড়ে। এর কারণও ছিল। তার সঙ্গে এই ছাত্র-শিক্ষক আলাপের আগে গত প্রায় পনের বছর বোর্হেস নিয়ে ছিলাম। ফলে বোর্হেসের তখন প্রায় সব লেখাই আমার বহুপাঠের কারণে প্রতিটি লেখার শিরোনাম, তার বৈশিষ্ট, চরিত্রসমূহ মুখস্থ ছিল। এর জন্য মেধাবী বা প্রতিভাবান হওয়ার দরকার নেই। এটি একেবারেই সাধারণ গুণ। মান্নান ভাই আমার এই বোর্হেস-পরীক্ষার ফলাফলে খুব খুশী হয়েছিলেন। একেবারে কোনো রকম রাখঢাক না করেই হাসতে হাসতে বললেন, “আপনি পাস করেছেন, একেবারে একশ’তে একশ’।” আমি তার এই অকপট সারল্যে হাসতে হাসতে মরে যাচ্ছিলাম। মান্নান ভাইকে বললাম, “মান্নান ভাই, বোর্হেসকে তিন ভাষায় পড়েছি–বাংলা, স্প্যানিশ এবং ইংরেজিতে। একটা লেখা তিনবার পড়লে এমনিতেই মনে থাকে। আর সম্পাদনার কারণে আরও বাড়তি মনোযোগ দিয়ে পড়তে হয়েছে। সুতরাং এতে আমার কোনো কৃতিত্ব নেই, মান্নান ভাই। কাজের ধরনই আমাকে এ রকম বানিয়েছে।” বোর্হেস প্রসঙ্গ থেকে এর পর মান্নান ভাইয়ের সাথে আমাদের লেখকদের নিয়ে অনেক মুখরোচক কথাবার্তা হলো। তার শ্রোতা হওয়া এক স্মরণীয় এবং মধুর অভিজ্ঞতা। বোর্হেস নিয়ে কথা বলার সময়ই নাঈমের আইডিয়াটা আমার মাথায় ঘুরঘুর করছিল। কিন্তু সদ্য ‘পরীক্ষা’ শেষেই বলাটা স্বার্থপরতার নির্লজ্জ প্রকাশ হয়ে যায় বলে তাকে আর সেদিন বলা হয়নি। সেই কথাটা বললাম এর দুদিন পর। আইডিয়াটা তাকে জানানো মাত্রই সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলেন। বুঝলাম বোর্হেস নিয়ে তার আসক্তি আর আমার প্রতি তার প্রীতি ও আস্থা–এই দুয়ের মিলনকে তার মন স্বাগত জানাতে কোনো দ্বিধা করেনি।
কিন্তু প্রস্তাবের পর দু’তিন দিন পার হলেও মান্নান ভাইয়ের কোনো সাড়াশব্দ পাচ্ছি না। পরে আমি নিজেই উদ্যোগী হয়ে মান্নান ভাইকে ফোন করলাম, কারণ নাঈমকে ইতিমধ্যে বলে ফেলেছি যে মান্নান ভাই বক্সের জন্য লিখতে রাজি হয়েছেন। এখন লেখাটা না পেলে আমি একটা অস্বস্তিকর অবস্থায় পরে যাবো।
“মান্নান ভাই, প্রকাশক বলছে লেখাটা দু এক দিনের মধ্যেই লাগবে।”
“ঠিক আছে, আজকে বিকেলে চলে আসুন পাঠক সমাবেশে।” বিকেলবেলা যথারীতি পাঠক সমাবেশের দ্বিতীয় তলার অফিসে গিয়ে আমি হাজির হলাম। মান্নান ভাই চা খাচ্ছিলেন। একপাশে বসা মিলটনকে বললেন আমাকে চা দেয়ার জন্য। চা খেতে খেতে গল্প হচ্ছে সাহিত্যের নানান বিষয়ে। তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যের এক জীবন্ত বিশ্বকোষ। যে কোনো লেখক সম্পর্কে মূল্যায়ন করার ক্ষমতাতো ছিলোই, পাশাপাশি এমন সব খুঁটিনাটি তথ্য জানতেন যে তা আমার কাছে বিস্ময়কর মনে হতো। কখন তিনি এত পড়েন আর কখনই বা তিনি এত লেখার সময় পান। অখন্ড বাংলার সাহিত্যের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস যদি কেউ লিখতে পারতেন তাহলে এই মান্নান সৈয়দই হতে পারতেন যোগ্যতম ব্যক্তি। উভয় বাংলার আর কেউ নয়। তাঁর মতো কে আর একই সঙ্গে হিন্দু এবং মুসলিম লেখকদের খুঁটিনাটি তথ্যসহ যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারতেন? আর সেসব মূল্যায়ন নিছক ফেনায়িত বাক্যপুঞ্জের অসার বাচলতা নয়, তাকে তিনি চারিদিক থেকে আসা রেফারেন্স ও ক্রস-রেফারেন্সে কন্টকিত করার পরেও মনে হতো এর চেয়ে পূর্ণ আর কিছু হয় না। আমরা জানি এটা তার পাণ্ডিত্যের দিক, কিন্তু পাণ্ডিত্যকে তিনি দাসানুদাসের মতো ব্যবহার করতেন রূপ ও মর্মাথের বিশাল সব অট্টালিকা তৈরির কাজে। পাণ্ডিত্যকে তিনি মাধুর্যে রূপান্তরিত করতে জানতেন তার ভাষার গুণে। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হলো সেই ইতিহাসটা তো আর হলো না। আড্ডায় লেখকদের সম্পর্কে তার পান্ডিত্য ও রসবোধের মিশেল এতই উপভোগ্য ছিল যে আমরা তরুণরা মুগ্ধ শ্রোতা হয়ে তা শুনতাম। যে কোনো লেখক সম্পর্কে মূল্যায়নের ব্যাপারে–তা সে যে কোনো রাজনৈতিক বা আদর্শের অনুসারীই হোক না কেন–তিনি ছিলেন বিস্ময়কর রকমের সৎ। বিদেশি লেখকদেরকে পছন্দের ব্যাপারেও তাই দেখা যাবে। তিনি লরেন্সের যেমন প্রশংসা করছেন আবার ঐদিকে ব্রেখটেরও প্রশংসা করছেন। ফলে বোর্হেসকেও তিনি পছন্দ করেছিলেন নিছক সাহিত্যিক গুণের কারণেই। অনেকক্ষণ আড্ডা দেয়ার পর মান্নান ভাইকে বোর্হেসের কথাটা স্মরণ করিয়ে দিলাম।
মান্নান ভাই ভুলে যাওয়ার ভান বা কপট বিস্ময়ের অভিব্যক্তি ছাড়াই বললেন, “শোনেন, লেখাটা আমি লিখতে পারিনি। তবে আমি আপনাকে এখনই লিখে দিচ্ছি।”
বুঝলাম, না লিখলেও বিষয়টা নিয়ে তিনি ভেবে রেখেছেন এবং মাথার মধ্যে গুছিয়ে নিয়েছেন। কারণ, বহুবার কেবল আমিই নই, নিশ্চিত আরও অনেকেই দেখেছেন, তৎক্ষনাত লিখে ফেলার এক অসাধারণ ক্ষমতা ছিল মান্নান ভাইয়ের। শুধু এক দুই পৃষ্ঠা না, পাতার পর পাতা তিনি এক বসায় লিখে ফেলতে পারতেন। আমি কেবল আশ্চর্য হতাম এই ভেবে যে মৃতদেহের মতো নিষ্প্রাণ শব্দগুচ্ছ হয়তো সাজিয়ে দেয়া যায়, কিন্তু মান্নান ভাই যে ভাষায়, যে বুননে প্রবন্ধকে অপরূপ বিন্যাসে দাঁড় করান তা অত দ্রুত কী করে সম্ভব! আর লেখার চরিত্রকে ফুটিয়ে তোলার জন্য সংবেদনশীলতার সর্বোচ্চ শিখরে অবস্থিত শব্দগুলোকে তিনি এত দ্রুত ও সহজভাবে শিকারই বা করেন কিভাবে! এছাড়া তার গদ্যের রয়েছে নিজস্ব এক শৈলী, তাও তিনি চাড়িয়ে দেন সেই লেখায়।

আমাকে চা খেতে দিয়ে তিনি বোর্হেস নিয়ে লেখাটিতে ডুবে গেলেন। লেখার মুহূর্তে তার নিমগ্নতা দেখলে মনে হয় যেন বিশ্ব চরাচরের কোনো কোলাহলই তার মধ্যে প্রবেশ করতে পারবে না–এমনই দুর্ভেদ্য আলোর প্রাচীরে ঘেরা থাকতো তার মনের চারপাশ। যেন অদৃশ্য ঝর্ণার জলে স্নান করছে তার কিশোরী-আত্মা, যে-আত্মা বস্তুর বিরুদ্ধে অফুরান প্রজাপতি উড়িয়ে এই সৃষ্টির বেদীতে চুল ছেড়ে বসেছে।
সত্যি সত্যি অবিশ্বাস্য দ্রুততায় তিনি মাত্রই মিনিট দশেকের মধ্যে বোর্হেস সম্পর্কে লেখাটি শেষ করে আমার হাতে তুলে দিয়ে বললেন,
“দেখেন, আপনার পছন্দ মতো হলো কিনা। বোর্হেস সম্পর্কে আপনি যতটা জানেন, আমিতো সেভাবে জানি না।”

তিনি আরও কিছু বলার আগেই আমি মান্নান ভাইকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, “মান্নান ভাই, যে কোনো বড় লেখক শিল্পীকে বুঝবার জন্য বিশেষজ্ঞ হতে হয় না। এ কথা আপনার চেয়ে আর কে ভালো বুঝবে।”
মান্নান ভাই আমার কথায় মৃদু হাসলেন।
razu-by-mannan.jpg

…………………………………

বোর্হেস প্রসঙ্গে

আবদুল মান্নান সৈয়দ

বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক আর্জেটিনার হোর্হে লুইস্ বোর্হেস (১৮৯৯-১৯৮৬)। লিখেছেন মূলত কবিতা, কথাসাহিত্য আর প্রবন্ধ। লিখেছেন গল্প আর প্যারাবল। শুধু প্রবন্ধধর্মী রচনা তাঁর বারশ’র মতো। আর কী-নিয়েই-না তাঁর ভাবনা-বেদনা অক্ষরায়িত করেছেন– রচনা, বইরিভিয়্যু, চলচ্চিত্র রিভিয়্যু, ভাষণ, জীবনী-সারাৎসার, রাজনীতি ইতিহাস সংস্কৃতি প্রভৃতি বিষয় নিয়ে টুকরো মন্তব্য ইত্যাদি। তাঁর পান্ডিত্য ছিল বিশাল, সন্ধিৎসা ছিল অসংখ্য বিষয়ে। লিখতেন স্পেনীয় ভাষায়, কিন্তু ভাষা জানতেন অনেকগুলি– ইংরেজি, লাতিন, ফরাশি, ইতালিয়ান, জর্মান। ১৯৬২ সালে, তাঁর ৬৪- বছর বয়সে, ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়ে তাঁর রচনা সারা বিশ্বে এক বিদ্যুচ্চমক জাগিয়ে দিয়েছিল। কেউ তাঁকে মনে করেন অপ্রতিম গল্পকার ও প্যারাবলপ্রণেতা, কেউ বা গুরুত্বপূর্ণ প্রাবন্ধিক। শেষ জীবনে অন্ধ হয়ে যান, কিন্তু অসামান্য শ্রুতিস্মৃতিধরের রচনাধারা থামেনি শেষ পর্যন্ত। লেখক হিসেবে সারা পৃথিবীতে সম্মানিত তাঁর কবিতা -গল্প-প্যারাবল– সবই যেন কি রকম পরস্পরপ্রবিষ্ট।
পরমাশ্চর্য এই লেখককে বাংলা ভাষায় ব্যাপকভাবে উপস্থিত করেছেন রাজু আলাউদ্দিন। বোর্হেসের কবিতা, গল্প, প্যারাবল, গদ্যরচনা, সাক্ষাৎকার, তাঁর সংপৃক্ত একগুচ্ছ সমীক্ষণ বাংলায় যে-ব্যাপকতায় অনূদিত-উপস্থাপিত হলো, ইংরেজি এবং কিছু কিছু সরাসরি স্প্যানিশ থেকে, তাকে বিপুল-বিস্ময়কর সাহিত্যকর্ম বলেই মনে করি। রাজু আলাউদ্দিন সুপরিচিত অনুবাদক, কবি ও প্রাবন্ধিক। এরকম বড়ো কাজের জন্যে বাঙালি মাত্রেরই কৃতজ্ঞভাজন হবেন তিনি।

…………………………………

আমি লেখাটা পড়ে সত্যিই মুগ্ধ হয়ে গেলাম মান্নান ভাইয়ের দক্ষতায় ও দ্রুততায়। এত ছোট্ট পরিসরে বোর্হেসের চরিত্র ও বিস্তারকে তিনি অতুলনীয় সংক্ষিপ্ততা ও যথাযথতায় বয়ান করেছেন। এই একই লেখক(অর্থাৎ মান্নান ভাই) বিস্তারে যেমন স্বচ্ছন্দ্য, তেমনি পরিমিতিতেও। আমি পড়া শেষে তাঁকে আমার মুগ্ধতার কথা জানাতেই বললেন, “যাক, আপনার পছন্দ হয়েছে– আমি সার্থক। লোক তো চিনলেন না ভাই …” বলেই মান্নান ভাই তাঁর স্বভাবশুভ্র কপট আত্মশ্লাঘায় হাসতে লাগলেন। “লোকতো চিনলেন না ভাই” – এই কথাটা মান্নান ভাই গানের অন্তরার মতো ব্যবহার করতেন ঘনিষ্টজনদের সঙ্গে আলাপে-আড্ডায়। এখন বুঝি তার ঐ কপট আত্মশ্লাঘা কত সত্য হয়ে উঠেছে আমাদের গোটা সাহিত্যিক সমাজের প্রতি।

লেখাটায় একটা ছোট্ট ভুল বা তথ্যগত ঘাটতি রয়ে গিয়েছিল, মান্নান ভাইকে আমি সেটা সঙ্গে সঙ্গে জানিয়ে বললাম, “মান্নান ভাই অনুবাদগুলোর বেশির ভাগই মূলত ইংরেজি থেকে করা, বরং অল্প কিছু স্প্যানিশ থেকে করা। আপনি কি একটু ঠিক করে দেবেন এই জায়গাটা?”
মিষ্টি এক তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে বললেন, “ আরে, ওটা আপনি ঠিক করে নেন। ” তার সামনেই আমার হাতে লেখা ঐ বাড়তি অংশটুকু যুক্ত করে তাকে দেখিয়ে নিলাম।

দুঃখজনক ঘটনা হলো মান্নান ভাইয়ের এই লেখাটি আমি শেষ পর্যন্ত ব্যবহার করতে পারিনি এই জন্যে যে পরিকল্পিত সেই বক্স আর কখনোই তৈরি হয়নি। আশা আছে বোর্হেসের বইগুলোর পরবর্তী সংস্করণে ব্যবহার করার।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সাবিদিন ইব্রাহিম — আগস্ট ৬, ২০১৫ @ ২:৪৬ অপরাহ্ন

      অসাধারণ লেখনি! খুব ভালো লাগলো দুজন প্রিয় ব্যক্তিকে এক ফ্রেমে পেলাম!

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Shahidul Hasan — জুলাই ১৫, ২০১৬ @ ১২:২৮ পূর্বাহ্ন

      সত্যিই, আব্দুল মান্নান সৈয়দকে নিয়ে রাজু আলাউদ্দিনের বোর্হেসসম্পর্কিত লেখায় মনঃসলিলা স্মৃতিচারণ করায়,অগ্রজ ও অনুজের পারস্পরিক সৌহার্দে পাঠককে জারিত করায় অবশ্যই শত ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। মান্নান সৈয়দকে শুধু লেখক হিসাবে দেখলে তাকে শুধু খাটো করাই হবেনা, অবমাননার পর্য়ায়েও পরে বটে; তিনি ছিলেন বাংলাদেশের সাহিত্য গবেষকের পুরোহিত, বিশেষ করে জীবনানন্দকে নিয়ে তিনি যে গবেষক মূল্যায়ন করেছেন তা অক্সফোর্ডিয় মূল্যায়নের মাণের সমার্থিক। তাই রাজু আলাউদ্দিনকে অনুরোধ রাখবো একজন বোর্হেস-গবেযষক আর একজন জীবনানন্দ-গবেষকের দুই প্রিয় লেখকের সাযুজ্য,পার্থক্য,অন্তমিল নিয়ে একখানি বই লেখার। হয়ে যাক তাহলে বাহাস জীবনানন্দ ও বোর্হেস এর মধ্যে,মন্দ হয় না কি্ন্তু।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com