রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে সনজীদা খাতুন: “কোনটা দিয়ে কাকে ঠেকাতে হবে খুব ভাল বুঝতেন”

রাজু আলাউদ্দিন | ২৭ জুন ২০১৫ ৮:২৯ অপরাহ্ন

রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী, রবীন্দ্রবিশেষজ্ঞ এবং অধ্যাপিকা সনজীদা খাতুনের জন্ম ১৯৩৩ সালের ৪ এপ্রিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ অনার্স, ব্শ্বিভারতী, শান্তিনিকেতন থেকে এমএ এবং সেখান থেকেই রবীন্দ্রসংগীতের ভাবসম্পদ নিয়ে পিএইডি সম্পন্ন করেন ১৯৭৮ সালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করেছেন। বর্তমানে তিনি ছায়ানট-এর সভাপতি। ভারত থেকে দেশিকোত্তম অনারারী ডিলিট পেয়েছেন। এছাড়া নজরুল স্বর্ণপদক, রবীন্দ্রস্মৃতি পুরস্কার, রবীন্দ্র তত্ত্বাচার্য উপাধি, একুশে পদক, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারসহ বহু সম্মানে ভূষিত হয়েছেন তিনি।
তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হচ্ছে: রবীন্দ্রসংগীতের ভাবসম্পদ(১৯৮১), ধ্বনি থেকে কবিতা(১৯৮৮), রবীন্দ্রনাথ: বিবিধ সন্ধান (১৯৯৪), তোমারি ঝরনাতলার নির্জনে(১৯৯৪), আপনজনদের স্মৃতিকথা(১৯৯৭) ইত্যাদি।

কবি, প্রাবন্ধিক ও স্প্যানিশ সাহিত্যবিশেষজ্ঞ রাজু আলাউদ্দিন কর্তৃক সনজীদা খাতুনের এই সাক্ষাতকারটি নেয়া হয়েছিল ২০১২ সালের মে মাসে তার বাসায়। সাক্ষাতকারটি ভিডিওতে ধারণ করেন সহকর্মী ফারহানা মিলি। দীর্ঘ এই সাক্ষাতকারটির শ্রুতিলিখন তৈরি করেছেন প্রমা সঞ্চিতা অত্রি। ভিডিওসহ পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাতকারটি এখানে প্রকাশ করা হলো।

রাজু আলাউদ্দিন: আমরা সবাই জানি যে আপনি জন্মগ্রহণ করেছেন বিদ্যাচর্চার দিক থেকে সময়ের একটি অগ্রসর পরিবারে এবং শুধু বিদ্যা চর্চা নয়, আমরা বলব যে মননশীলতা ও সৃষ্টিশীলতার একটা চর্চা আপনাদের পরিবারে ছিল। স্বাভাবিকভাবেই এর একটা প্রভাব তো আপনার ওপরে আছেই। তো, ওই প্রভাবটা কিভাবে এসেছে বলে মনে করেন আপনি?

সনজীদা খাতুন: আমার বাবা কাজী মোতাহার হোসেন আমাদের সব সময় বুদ্ধি দিয়ে চলতে শেখাতেন।

রাজু আলাউদ্দিন
: আচ্ছা।

সনজীদা খাতুন: এবং একটা বাক্যও যদি আমরা একটু ভুল করে অন্যরকম করে বলতাম, যাতে ঠিক অর্থটা বোঝায় না, তিনি সংশোধন করে দিতেন সঙ্গে সঙ্গে। ঠাট্টা করেই। আমরা যদি বলতাম, ও আমার পেটের মধ্যে মেরেছে। আমরা তো কলকাতার দিকের ভাষা বলি।

রাজু আলাউদ্দিন: জি।
সনজীদা খাতুন: তো উনি বলতেন, দেখি দেখি, কোথায় পেটে মারল? অর্থাৎ পেটের মধ্যে ঢুকল কেমন করে। এসব ঠাট্টা করে বুঝতাম যে পেটের মধ্যে বলা যায় না, বলতে হয় মেরেছে।

রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা। আচ্ছা।

সনজীদা খাতুন: (হাসতে হাসতে) এইভাবেই। তাছাড়া তিনি নিজে গান করতে চেষ্টা করতেন। ভালো গাইতে পারতেন না। সেটা নিয়েও হাসতেন। নিজে নিজেই। আর আমার বড়দি . . .

রাজু আলাউদ্দিন
: কি গান গাইতেন উনি? মানে কি ধরনের গান?
সনজীদা খাতুন: উনি নানা ধরনের, আমরা তো শুনেছি তার প্রাচীন গান অনেক। “জেনেছি জেনেছি মা তারা, তুমি যেন ভোজের বাজি। যে তোমায় যা বলে তাতে তুমি হও মা রাজি।”
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: এই একটা গান ছিল। তাছাড়া ডি. এল রায়ের গানটান গাইতেন। “যেদিন সুনীল জলধি হইতে উঠিলে জননী ভারতবর্ষ” এই সব গান। তাছাড়া নজরুলের গান ছিল। নজরুলের গানের মধ্যে আমার মনে পড়ে, “ভুলি কেমনে/ আজো যে মনে বেদনা সনে/ রহিল আঁকা।” বা কি গান আছে আমি এখন মনে করতে পারছি না। নজরুলের গান গাইতেন আর রবীন্দ্রসঙ্গীতও গাইতেন, “যদি বারণ কর তবে গাহিব না।” তাছাড়া আরও ছিল . . .
রাজু আলাউদ্দিন: আপনারা কেউ বারণ করেননি তো তাকে? (হাসি)
সনজীদা খাতুন: (হাসতে হাসতে) আমরা তখনও বারণ করার বয়সে পৌঁছাইনি। ছোট থেকে শুনেছি। আর আমরা যখন বেশ বড় হলাম, ওঁর মনে বোধহয় একটা ক্ষোভ ছিল যে, আমরা কেবলি রবীন্দ্রনাথের গান গাইতাম। তো বলতেন, অবশ্য রবীন্দ্রনাথের গান বরাবর গাইতাম বলাও ভুল। আমি আবার সোহরাব হোসেন সাহেবের ছাত্রী।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা। আচ্ছা। তার মানে নজরুলগীতির শিক্ষক . . . শিল্পী এবং শিক্ষক।
সনজীদা খাতুন: হ্যাঁ, শিল্পী এবং শিক্ষক। তবে তখনও তিনি সব গানই শেখাতেন। এখনও যেমন আছে টিউশনি করতে গেলে সব গান শেখাতে হয়। তখনও তাই ছিল। উনি আমাকে আধুনিক, পল্লী গীতি, নানা ধরনের গান উনি আমাকে শিখিয়েছেন। তার সাথে নজরুলগীতিও শিখিয়েছেন, কেবল যেটা পারেননি সেটা হচ্ছে রবীন্দ্র-সংগীত।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: তো আমি যখন অনার্সে ভর্তি হলাম, ওই বাড়ির গন্ডিটা ছাড়ালাম বলা যায়। আমি অনার্সে ভর্তি হয়ে রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়ে খুব আকৃষ্ট হলাম রবীন্দ্রসংগীতের দিকে। বাড়িতে বড়দি রবীন্দ্রসংগীত প্রচুর গাইতেন। নানা রকমের গানই বাড়িতে চলেছে। তো আমি যখন বড় হয়ে নিজে নিজে বেছে নিলাম যে গান শিখব, তখন আমি সেগুনবাগিচা থেকে বাসে চেপে, সে আমলের টাউন সার্ভিস, মুড়ির টিন বলত যাকে সবাই।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: তো টাউন সার্ভিসে চেপে আমি গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের, না, আমি তখন ইউনিভার্সিটিও যেতাম সেই বাসেই, তারপর চলে যেতাম আজিমপুরে। আজিমপুর কোয়ার্টার্সের কলোনি।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনারা থাকতেন তখন কোথায়?
সনজীদা খাতুন: সেগুনবাগিচায়।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা, সেগুনবাগিচায়।
সনজীদা খাতুন: আমার বাবার বাড়ি। আচ্ছা, সেখান থেকে আজিমপুরে গিয়ে হোসনা বানু খানমের কাছে আমি রবীন্দ্রসংগীত নিয়মিত শিখতে শুরু করি।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: এই গান শিখে তার কাছে, মাঝে মাঝে আমার নানা সমস্যা আসত যেমন, হঠাৎ ঠিক হল “শাপমোচন” নাটক করতে হবে। তো সেই নাটক করতে গিয়ে দেখলাম অনেক গান তোলা দরকার।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: হোসনা বানু আপা কিছু তুলে দিলেন। কিন্তু দেখলাম এত গান তো উনি তুলে দিতে পারবেন না। একটু একটু জানা সুর, স্বরলিপি দেখে, হারমোনিয়ামের রিড টিপে টিপে তুলে ফেললাম। এমনি করেই কিন্তু স্বরলিপির পাঠ আমার হয়েছে, কারও কাছে শিখে নয় . . .
রাজু আলাউদ্দিন: নিজে নিজেই?
সনজীদা খাতুন: নিজে নিজেই। ওইভাবে তুলে তুলে বুঝেছি। আর বুঝেছি যে আগে ছন্দটা বুঝতে হয়, মাত্রাগুলো বুঝতে হয়, এভাবে গানগুলো তোলা। যাই হোক, তো গানে এটা ছিল। আর তাছাড়া বাবা আমাকে পছন্দ করতেন। তার বোধহয় মনে হত যে সাহিত্যের প্রতি আমার একটা বিশেষ আকর্ষণ আছে।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন
: ওঁর যে বই আছে “সঞ্চয়ন”–অনেক আগের। “সঞ্চরণ”, ভুল বলছিলাম। যেটা রবীন্দ্রনাথও পড়ে প্রশংসা করেছেন।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: সেই বইয়ের, মানে তিনি বাড়ির মধ্যে কেবল আমাকে আর সেজদিকে দিয়েছিলেন। আমার সেজ বোনকে ওইটা লিখে দিয়েছিলেন, “মিনু ও ভোটলাকে”। মিনু আমার ডাকনাম আর সেজদিকে বাড়িতে সবাই ভোটলা ডাকত (হাসতে হাসতে)।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: তো এই আর কি ব্যাপারটা তখনকার। তো . . .
রাজু আলাউদ্দিন: হ্যাঁ। আমার একটা প্রশ্ন ছিল সেটা হল যে, আমরা জানি যে কাজী মোতাহার হোসেন নজরুলের বন্ধু ছিলেন এবং নজরুল সাহিত্যের একজন অনুরাগীও ছিলেন। তো ওনার পছন্দের, আপনার আব্বার এই পছন্দের উত্তরাধিকার আপনি ওইভাবে বহন করেননি, এই অর্থে যে আপনি আকৃষ্ট হয়ে গেলেন রবীন্দ্রসঙ্গীতে।
সনজীদা খাতুন: হ্যাঁ। রবীন্দ্রসংগীতে।
রাজু আলাউদ্দিন: তো এর পেছনে, মানে প্রশ্নটা হল এই যে, নজরুলগীতিতে এমন কি ছিল না যা আপনাকে আকৃষ্ট করেনি এবং একই সঙ্গে এই প্রশ্নেরই আরেকটা রূপ এটা যে, রবীন্দ্রসংগীতে এমন কি আছে যা আপনাকে আকৃষ্ট করেছে?
সনজীদা খাতুন: নজরুলের গান সম্পর্কে কাজী আবদুল ওদুদের একটা চমৎকার উক্তি আছে।

রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: উনি বলেছেন, নজরুলের গানে মাঝে মাঝে ওই মালার মধ্যে এক আধটা মুক্তা থাকে। এক আধটি মুক্তা।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: অর্থাৎ তার বাণীতে মাঝে মাঝে খুব চমকপ্রদ কিছু থাকে যা আকর্ষণ করে।
রাজু আলাউদ্দিন: নজরুলের?
সনজীদা খাতুন: হ্যাঁ। আর রবীন্দ্রনাথের একেকটা গান একেকটা একক। এবং তার ভেতরে পুরো . . .
রাজু আলাউদ্দিন: পুরোটাই মুক্তা?
সনজীদা খাতুন: হ্যাঁ, পুরোটাই একটা উজ্জ্বল কোনো, কি বলব প্রস্তর যেটা আলো বিকীর্ণ করছে।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনার এই মন্তব্য শুনলে তো যারা নজরুল-অনুরাগী তারা নিশ্চয়ই খানিকটা ক্ষুব্ধ হবেন বা বিষন্ন হবেন।
সনজীদা খাতুন: না। নজরুলগীতি যারা গায়, আমাদেরই ভেতরে অনেকেই আছে, আমি তাদের কাউকে মাঝে মাঝে বলতে শুনেছি, অন্ধভক্ত না হলে তারা এই বিচার করতে পারেন। যখন আমাদের এখানে ধীরেন্দ্রচন্দ্র এসে ছায়ানটে নজরুলগীতি শিখিয়েছিলেন, একটা গান, “বেণুকা ও কে বাজায় মহুয়া, বনে,” শেখাচ্ছিলেন। উনি বলছিলেন, “কি আশ্চর্য কাব্য।” তো আমাদের তখনকার একজন ভালো গাইয়ে, আমাদের ছায়ানটেরই, সে আমাকে বলল, আচ্ছা এর মধ্যে কাব্যটা তো আমি কিছু বুঝলাম না। কাব্য এর মধ্যে কী এমন আছে? আসলে নজরুলের কবিতা এবং রবীন্দ্রনাথের কবিতাতে একটা পার্থক্য আছেই। গানেও সেই পার্থক্যটা বোঝা যায়। আমি কিন্তু নজরুলগীতিও খারাপ গাইতাম না।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: বাংলাদেশ টেলিভিশনে আমি কিন্তু প্রথম নজরুলগীতিই গেয়েছি। তখন টেলিভিশনে দু’বার গান গাইতে বলত। একবেলা, প্রথম বেলাতে আমি নজরুলগীতি গেয়েছিলাম। পরের বার আমি রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়েছিলাম এবং নজরুলগীতি আমি এত ভালবাসতাম, আমি অনেক গেয়েছি। আমি রবীন্দ্রসঙ্গীতের মত এত ভাবে বিভোর হই না হয়ত, কিন্তু নজরুলের গানের সুরের আকর্ষণ এবং কিছু কিছু গানের বাণীর আকর্ষণ আমার কাছে খুব বড়।
রাজু আলাউদ্দিন: এই জাগাটায় আমার যেটা প্রশ্ন সেটা হল যে, আপনি বললেন যে নজরুলের একটা মালার মধ্যে, মাঝখানে হয়ত একটা দু’টো মুক্তোর মত বাঁধতে থাকে আর রবীন্দ্রনাথের যেটা . . .
সনজীদা খাতুন: এটা আমি বললাম না। এ কথাটা কিন্তু কাজী আবদুল ওদুদের।
রাজু আলাউদ্দিন: হ্যাঁ, আপনি সেটা বিশ্বাস করলেন আর যখন সেটা বিশ্বাস করেন তখন সেটা আপনারও। একই সঙ্গে।


সনজীদা খাতুন: বিশ্বাস করি, না করি। হ্যাঁ, এটা একটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ উক্তি। এই আর কি।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা। এখন প্রশ্ন হল যে, গানের ক্ষেত্রে আসলে বাণীর ইয়েটা কতখানি? যেমন আমরা যখন উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শুনি এবং আমি নিজে আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি যে ওর মধ্যে কি বলা হচ্ছে সেটা আসলে আমরা জানিও না। অনেক সময় যে ভাষায় বলে হয়ত সেখানে বাণী খুব কমই থাকে। মূলত সে সুর, যদি সেই বিবেচনায় আমরা নজরুলগীতির দিকে তাকাই, তাহলে আপনার মূল্যায়ন কী হবে?
সনজীদা খাতুন: আমি এবারে একটা কথা বলি। শুদ্ধ সঙ্গীত আর কাব্যগীতি–দু’টো দু’ধরনের জিনিস। শুদ্ধ সঙ্গীতকে আমরা বলবো বিমূর্ত সঙ্গীত। অ্যাবস্ট্রাক্ট সেটা। তাতে বাণী আছে কি নেই– কিছু যায় আসে না।
রাজু আলাউদ্দিন: এটা উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত?
সনজীদা খাতুন: হ্যাঁ। আর যন্ত্র-সঙ্গীত যখন বাজায় তখন তো বাণীর প্রশ্নই ওঠে না। সুরেরও একটা ভাষা আছে। বাণীরও একটা ভাষা আছে। কাব্যগীতিগুলো হচ্ছে দু’টোর সম্মিলন। দু’টোর সম্মিলনে তৃতীয় একটা কিছু। আমরা যেটা বলে থাকি বাণী, সুর আর ছন্দ– এই তিনের সমন্বয়ে একেকটা কাব্যগীতি রূপ ধারণ করে। এবং এই তিন জিনিস এক সাথে হয়ে, বাণী হয়ত একটা কথা বলছে, সুর হয়ত একটা কথা বলছে, ছন্দ একটা কথা বলছে, কিন্তু যখন সবটা মিলিয়ে একটা কিছু প্রকাশ পায় সেটা তার মূল ব্যঞ্জনা। এইটাতেই আমার মনে হয়েছে যে ব্যঞ্জনার দিক থেকে তিনটে মিলিয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীতে যতটা আমি পাই, তিনটে মিলিয়ে নজরুলে সবসময় পাই না। কিন্তু একটি গানের কথা বলব, “মা, চিন্ময়ী রূপ ধরে আয়”। এ গানটার মধ্যে বলা হচ্ছে যে তুমি তো মৃন্ময়ী, তোমাকে সবাই সেইভাবে সম্মান করে। তোমাকে সবাই ভালোবাসে। মূর্তি তো মৃন্ময়ী বটেই। কিন্তু নজরুল আবেদন করছেন, “চিন্ময়ী রূপ ধরে আয়”। তুমি খালি মাটির পুতুলের মত থেকো না। তুমি . . .
রাজু আলাউদ্দিন: সপ্রাণ হও।
সনজীদা খাতুন: হ্যাঁ। সপ্রাণ হও, সচেতন হও। তোমার ভেতরে যে তোমার চিত্তময়তা আছে, চিন্ময়ী মানে তো চিত্তময়ী, সেই রূপে তুমি এসো। এই গানের বাণীকে আমি তো অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করি। সার্বিকভাবেই গানটির ভিতরে দেশের কথা বলছে। দেশের যে এত অন্যায়, অবিচার সেই সমস্ত দূর করবার জন্য কেবল মৃন্ময়ী রূপে তুমি পূজা পেলে হবে না। তুমি চিন্ময়ী রূপ ধরে এস, সব কিছুকে মঙ্গলময় কর। এই গানটাতো আমি কোনোভাবেই বলব না যে কাব্যে খাটো। নজরুলেও কাব্য আছে। নিঃসন্দেহে। কিন্তু যে করেই হোক আমার প্রধান চর্চা হয়ে উঠেছে রবীন্দ্রসঙ্গীত। তবে একথা বুঝতে হবে আমি কিন্তু জীবনে কেবল একটা গানে বাঁধা থাকিনি। আমি পুরনো বাংলা গানও গেয়েছি এবং আমাদের ছায়ানটে যেমন শুদ্ধ সঙ্গীত আছে তেমনি রবীন্দ্র সঙ্গীত আছে, নজরুলের গান আছে, ফোক আছে। লোকসঙ্গীত। তার সঙ্গে আলাদা আরও নানা জিনিস আছে। কিন্তু এই যে আমাদের চেষ্টাটা, এটা হচ্ছে সামগ্রিকভাবে বাঙালি সংস্কৃতিকে ধরার চেষ্টা।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: এবং বাঙালি সংস্কৃতি বিষয়ে আমি একটা কথা বলে নেই। অনেক জায়গাতেই বলি, বাংলার মাটির গান তো অবশ্যই লোকসঙ্গীত। এখন এই লোকসঙ্গীত থেকে কিন্তু রাগ সঙ্গীতগুলোর উদ্ভব। নামেই বোঝা যায়। বঙ্গাল রাগ, সিন্ধু, কানাড়া, এগুলো কি বোঝাচ্ছে?

রাজু আলাউদ্দিন: অঞ্চল।
সনজীদা খাতুন: অঞ্চলভিত্তিক সুরের থেকে তুলে নিয়ে, তার এসেন্সটা তুলে নিয়ে, নির্যাসটা নিয়ে রাগসঙ্গীতটা হচ্ছে। তার মানে লোকসঙ্গীত আর রাগসঙ্গীতে একটা মিল আছে। আমি আরেকভাবে বলি। একটা নদীর যদি দু’টো তীর থাকে, একটা তীরে আছে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত, আমরা বলি শুদ্ধ সঙ্গীত, বিমূর্ত বলে। আরেকটা তীরে আছে লোকসঙ্গীত। আর মাঝখান দিয়ে যে ধারাটা চলেছে সেটা কিন্তু আমাদের কাব্যসঙ্গীত। এই কাব্যসঙ্গীত কখনো কখনো একূল ঘেঁষে চলে, কখনো ও কূল। দেখা যাবে আমাদের গানের সুরে রাগসঙ্গীতের প্রভাব আছে। রবীন্দ্রনাথ তো বলেন রাগ সঙ্গীতটা আমাদের আকাশ এবং এই আকাশকে ছাড়িয়ে আমরা যেতে পারি না। যত দূরে যাই আকাশ আমাদের সঙ্গে আছে। তেমনি লোকসঙ্গীতটা হচ্ছে আমাদের পায়ের তলার মাটি। এটাকেও আমরা কখনো ছাড়তে পারব না। পা টা রাখব কোথায়? কাজেই এ দু’য়েরই গুরুত্ব আছে। এই হিসেবে আমরা সব কিছুর চর্চা করি। সেই সঙ্গে বাংলা গানের, কাব্যগীতির চর্চাটা আমাদের মধ্যে প্রধান। এই আর কি।

রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা, রবীন্দ্রসঙ্গীতে যেমন ফোক অনেক সুরের …. মানে আত্মীকরণ….
সনজীদা খাতুন: হ্যাঁ। নজরুলেও আছে।
রাজু আলাউদ্দিন: নজরুলেও আছে। তো অনেক সময় এসব আত্মীকরণ নিয়ে কেউ কেউ, যারা দুর্মুখ, তারা কেউ কেউ বলেন যে এটা সুর তসরূফ করেছেন।
সনজীদা খাতুন: সুর তসরুফ? হা হা হা ….
রাজু আলাউদ্দিন: তসরুফ (হাসতে হাসতে)। বলে আরকি। তো আসলে তো আমি মনে করি যে ওগুলো আসবেই। একজন বড় প্রতিভাবান, সৃষ্টিশীল মানুষের মধ্যে…
সনজীদা খাতুন: হ্যাঁ। চারদিক থেকে নেবেন।
রাজু আলাউদ্দিন: সে তার সংস্কৃতির…
সনজীদা খাতুন: পাশ্চাত্য সঙ্গীতের সুর আসেনি?
রাজু আলাউদ্দিন: হ্যাঁ।
সনজীদা খাতুন
: মধ্যপ্রাচ্যের সুর আসেনি? সবই এসেছে এবং প্রতিভাবান মানুষ মাত্রই চারদিক থেকে নেয়। নিয়ে তবে না নিজেরটা তৈরি করে।
রাজু আলাউদ্দিন: এবং সে যত বেশি নেয় তত সে বড়ই হয়।
সনজীদা খাতুন: সেও হতে পারে। কিংবা যা নিয়ে সে নিজের সৃষ্টিকে সমৃদ্ধ করতে পারে, সম্পন্ন করতে পারে, তার তো কোনো কথাই নেই।
রাজু আলাউদ্দিন: তাই। যেহেতু সে সৃষ্টিশীল …..
সনজীদা খাতুন: আর একেকটা গানে হয়ত একেকটা দিক প্রাধান্য পায়।
রাজু আলাউদ্দিন: জি।
সনজীদা খাতুন: আবার একই গানে যেমন শুদ্ধ সঙ্গীত থাকে, লোকসঙ্গীত থাকে তেমনি স্বকীয় সৃষ্টি থাকে।
রাজু আলাউদ্দিন: হ্যাঁ।
সনজীদা খাতুন: গানে তো নানারকমই আছে। কাব্যগীতিতে বহু কিছু আছে এ রকম। আমরা এগুলোকে বলি কাব্যসঙ্গীত এবং এইভাবেই এইগুলোকে মূল্যায়ন করি।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনি আমাদের সেই বিরলতম সঙ্গীত শিল্পীদের একজন, আবার সেই বিরল সাহিত্য সমালোচকদেরও একজন। এই অর্থে যে আপনি গান শাস্ত্রীয় অর্থেই জেনে তারপরে চর্চা করেছেন আবার আপনি রবীন্দ্রসঙ্গীত বিষয়ে আলোচনা লিখেছেন, সমালোচনা লিখেছেন। তো এই দুইয়ের সমন্বয় ঘটেছে খুব কম ব্যক্তিত্বের মধ্যে। আপনি তাদের একজন। এই দু’টোর সমন্বয় ঘটার কারণে আপনার নতুন উপলব্ধি কী? যেমন গান নিয়ে অনেকেই লিখেছেন, নজরুলগীতি বা রবীন্দ্রসংগীত। হয়ত গান সম্পর্কে তাদের শাস্ত্রীয় ধারণা ছাড়াই উনারা লেখেন। তা আপনি তো দু’টোই। আপনি একই সঙ্গে একজন সাহিত্য সমালোচক এবং সংগীত শিল্পী। এই দুইয়ের সমন্বয়ের ফলে আপনার নতুন উপলদ্ধি কী? মানে সাহিত্য সমালোচনার ক্ষেত্রে…?

সনজীদা খাতুন: এ প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে আমি একটি ঘটনা বলি। আমার তো সংগীতের প্রতি আকর্ষণ জন্মগত। সাহিত্যের প্রতিও। যখন আমাদের দেশে যুদ্ধ শুরু হয়েছে সেই সময়ে আমি একটি গ্রামে লুকিয়ে ছিলাম। প্রথম দিকটায়। সেখানে গিয়ে একদিন সন্ধ্যেবেলা আমার একটি গান নিয়ে মনে হল, গানটাকে অনেক গেয়েছি, অনেক শুনেছি, চর্চা করেছি, গানের অর্থটা যেন এমন করে ভাবিনি…

রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: গানটি হচ্ছে, “তোমারই ঝর্ণাতলার নির্জনে মাটির এই কলস আমার ছাপিয়ে গেল কোন ক্ষণে”। আমি গানটাকে লক্ষ করলাম তার ভিতরে কতগুলো তান আছে। এই তানগুলো আশ্চর্য একটা উচ্ছ্বাসের পরিচয় দিচ্ছে, আবার গানটির মাঝামাঝি যখন যাচ্ছে সঞ্চারী যাকে বলে, এ সঞ্চারীতে গিয়ে গানটির সুর একটু যেন বিষন্ন। একটু যেন উদাস হয়ে গেল। কথাগুলো এরকম, “দিনে মোর যা প্রয়োজন বেড়াই তারই খোঁজ করে। মেটে বা না-ই মেটে তা, ভাবব না আর তার তরে।” এই কথাটার মধ্যে ‘ভাবব না আর তার তরে’ বলার সময় যেন সেই সারাদিনের প্রয়োজনের পিছনে ছুটে বেড়িয়েছি, মেটেনি আমি যা করতে চাই তার সেই ক্ষেদটা আমার মেটেনি। ভাবব না আর তার তরে। সন্ধ্যাবেলায় সেটাকে স্থগিত রেখে আবার আনন্দ-উচ্ছ্বাসে প্রবৃত্ত হওয়া হচ্ছে। কাজেই সুরটা সেইভাবেই বদলে যাচ্ছে। আর গানটার মধ্যে সে তানগুলো এবং গানটার যা গতি, সেই গতিটাও এই উচ্ছ্বাসকে ধরছে আবার মাঝখানে এসে একটু স্তিমিত হচ্ছে আবার উচ্ছ্বসিত হচ্ছে। এই জিনিসটা আমাকে ভীষণ স্পর্শ করল। তারপরেই আমি যখন দেশ ছেড়ে চলে গেলাম বিদেশে, ভারতে এবং সেখান থেকে শান্তিনিকেতনে একটি ফেলোশিপ পেলাম, তখন আমি ভাবলাম আমি রবীন্দ্রসংগীতের ভাব-সম্পদ নিয়ে লিখব। আমি সেখানেই রিসার্চ শুরু করলাম।
রাজু আলাউদ্দিন: যেটা পরে আপনার বই আকারে বেরোলো।
সনজীদা খাতুন: হ্যাঁ। তো এটি আমি যখন খুব ভাবছি, সেই সময় আমি আবার আবু সায়ীদ আইয়ূবের খুব ভক্ত।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: তার কাছে চলে যেতাম। একদিন তাকে আমি বললাম, ‘আপনি এক জায়গায় আলোচনা করেছেন, “যায় দিন শ্রাবণও দিন যায়” এই গানের আলোচনা করেছেন, বলেছেন এ গানটা যেন একটা খাদের ধারে দাঁড়িয়ে থেকে ভয়ানক একটা বিপন্ন অবস্থার গান। আমি তাকে বললাম কিন্তু গানটার সুর শুনলে তো তা মনে হয় না।’ “যায় দিন শ্রাবণও দিন যায় আঠাঁরিল মন মোর আশংকায় মিলনের বৃথা প্রত্যাশার মায়াবিনী সন্ধ্যা ছলিছে।” এই ‘ছলিছে’ কথাটা বলার সময় সুরটা এরকম যাচ্ছে- (গানটা গেয়ে শোনান)। একটা কেমন চটুল ভাব চলে আসছে না ?
রাজু আলাউদ্দিন: হুম।
সনজীদা খাতুন: তারপরে, “আসন্ন নির্জন রাতি/হায় মোর পথ চাওয়া বাতি ব্যাকুলিছে শূন্যে রে কোন প্রশ্নে/দিকে দিকে কোথাও নাহি সাড়া/ফিরে ক্ষ্যাপা হওয়া গৃহহারা/নিবিড় তমিস্র বিলুপ্ত ব্যাথিতা যামিনী খোঁজে ভাষা/শূন্যে পথহারা পবনের ছন্দে সিক্ত মালতী গন্ধে।” আমি যখন গানটি তাকে শুনালাম উনি বললেন আমি তো কখনো ছন্দের কথা ভাবিনি। আর সুর বিষয়েও আমার এতটা মনে থাকে না যে আমি সেটা ধরে রেখে…. আমি কেবল বাণীর আলোচনা করি।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: তা আমি বললাম যে, তিনটে না মিললে
রাজু আলাউদ্দিন: আলোচনা সম্পন্ন হবে না।
সনজীদা খাতুন: হ্যাঁ। পূর্ণ হয় না।
রাজু আলাউদ্দিন: এবং সেটা সারবান আলোচনাও হবে না। কারণ অনেক কিছুই তো বাদ পড়ে যাবে।
সনজীদা খাতুন: বাদ পড়ে যাবে না ? তা আমি তো তখনও অত কথা বলতে পারি না তার সাথে, সামনে। তারপর এইটুকু শুধু উপস্থাপন করেছিলাম। উনি বললেন, আপনি খুব আশ্চর্য করলেন আমাকে যে ছন্দ বলে একটা ব্যাপার আছে গানে–আমি এভাবে ভাবিনি।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: তো এরকমই হয়। উনি গান নিয়ে তো কত লিখেছেন।
রাজু আলাউদ্দিন: জি।
সনজীদা খাতুন: ওঁর লেখাগুলো অত্যন্ত চমৎকার লেখা। দার্শনিক, গভীর কবিতারসে সমৃদ্ধ লেখা। কিন্তু তার মধ্যে এই যে এই দিকটা তিনি ভাবেননি। কিন্তু আমি যখন বললাম তখন উনি চুপ করে গেলেন। কিন্তু আমাদের এখানেও অনেকে গান নিয়ে অনেক কথা লেখে কিন্তু সম্পূর্ণটা না দেখে লেখে। এটা আমার দুঃখ। তবে আজকাল আমি দেখছি বন্যা মাঝে মাঝে বলে, লেখে। খুব সুন্দর লেখে। সুন্দর বলে। তাহলে এ চর্চাটা হচ্ছে আমাদের এখানে। সে এগুলো বলতে পারে এবং সেদিন আমাদের ওখানে একটা সমাপনী পরীক্ষায় বন্যা এসেছিল বিচারক হয়ে। প্রতিযোগিতা নয়। বিচারক নন, পরীক্ষক হয়ে। সেদিন একটি ছেলে একটি গান গাইল, “কোথা যে উধাও হল মোর প্রাণ”। বর্ষার গান। তখন বন্যা তার পরে আমাকে বলল, “সেই সময়টায় বৃষ্টি নামছিল”।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা
সনজীদা খাতুন: “আমি পর্দা সরিয়ে আকাশ দেখছিলাম। কিন্তু ওর গাওয়া গানটার সঙ্গে এই আকাশ-বাতাসের কোনো মিল আমি পেলাম না”।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: আমার খুব ভাল লেগেছে ওর কথাটা। এইভাবে ও ভাবে এবং লিখছে আজকাল। অল্প-স্বল্প বোধ হয় রির্সাচের কাজ করছে। মাঝে মাঝে দেখি মিতার মধ্যেও, মিতা হক, ওর মধ্যেও এইসব ভাব আসে। আরেকজনের মধ্যে দেখি সে হচ্ছে লাইসা আহমেদ লিসা। আমার পুত্রবধূ। সেও ভাবটাকে বুঝবার চেষ্টা করে। ছায়ানটে আসলে আমি শিক্ষকদের ক্লাস নিই মাঝে মাঝে। রবীন্দ্রসংগীতের শিক্ষক। সেখানে আমি দেখেছি আমার কথাগুলো ওরা খুব মন দিয়ে শোনে। আরেকটি ছেলের কথা বলব, তার নাম কেউ প্রায় জানে না। শাহেদ ইমাম। ছেলে বলছি, কিন্তু সে এখন পঞ্চান্ন পেরিয়ে গেছে সম্ভবত। আমার কাছে ছেলেই।
রাজু আলাউদ্দিন: বয়স্ক ছেলে।
সনজীদা খাতুন: হ্যাঁ, বয়স্ক ছেলে। আমার কাছে সব তো সন্তানের মত। শাহেদকে দেখেছি আমি গান বুঝে গায়, গান নিয়ে পড়াশোনা করে। একবার একটি গীতিআলেখ্য তৈরি করেছিল ছায়ানটের জন্যে। আমার তো বেজায় ভালো লেখেছে। কাজেই আমি বলব না যে এই ধারায় কেউ কাজ করে না। করছে। অনেকেই করছে। বন্যা তো আমার আওতার বাইরে এখন।
রাজু আলাউদ্দিন: তো আপনি এই সমন্বয়ের আগে, আপনার নতুন মাধ্যমে যেটা শুরু, এর আগে তো আসলে আর কেউ ছিল না। অন্তত আমাদের দেশে তো, বাংলাদেশে তো…
সনজীদা খাতুন: এদেশে। বাংলাদেশে ছিল না।
রাজু আলাউদ্দিন: বাংলাদেশে তো ছিল না। আর পশ্চিমবঙ্গে ঠিক মনে পড়ছে না কেউ আছেন কিনা।
সনজীদা খাতুন: অরুণ ভট্টাচার্য নামে একজন। মারা গেছেন।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা। অরুণ ভট্টাচার্য ?
সনজীদা খাতুন: হ্যাঁ। তিনি “রবীন্দ্রসংগীতের সুর সংগীত ও সুর-সুষমা” নামে একটি বই লিখেছেন।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: অত্যন্ত চমৎকার। আরেকজন ভদ্রলোক আছেন, গৌরিপ্রসন্ন ঘোষ।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: পারিবারিকভাবে উনি বোধহয় ঠাকুরবাড়ির সাথে যুক্ত। নিজে গানও করতেন। তার স্ত্রীও বোধহয় গান করতেন। তিনিও একটি বই লিখেছিলেন। বইটির নাম মনে পড়ছে না কিন্তু আমি একটি গানের বিশ্লেষণ করার পরে ওর বইতে দেখি একই ধরনের কথা। আমি খুব চমকে গিয়েছিলাম। গানটি হচ্ছে, “দিন শেষের রাঙা মুকুল জাগল চিতে”। আমি লেখার পরে যখন ওটা দেখলাম তখন আমাকে পাদটিকা দিতে হল যে, তিনিও এইভাবেই বিশ্লেষণ করেছেন, পড়ে আমার খুব ভাল লেগেছে। ‘আমি লিখবার পরেই’ ইত্যাদি হয়ত লিখেছি। কিন্তু গৌরিপ্রসন্ন ঘোষ ইনি যিনি, ইনিও অত্যন্ত চমৎকার আলোচনা করেছেন।
আমি তো মাঝে মাঝে এক আধটি ছুটকো প্রবন্ধে দেখি ভাল আলোচনা যেমন, এমনটি শাঁওলী মিত্র, অভিনয় করে। ওর একটি লেখা পড়ে আমি বিস্মিত হয়েছিলাম। ও গান জানে এবং তার উপলদ্ধিটা আছে সুরে, ছন্দে-সব মিলিয়ে। এইটা বোঝা গেছে সেই লেখা থেকে। এরকম ওপারে কিন্তু অনেকেই আছেন। এখন তো অনেকেই এসব নিয়ে ভাবেন। শঙ্খ ঘোষের কথা বলব। তিনিও কিন্তু সঙ্গীতের গীত রস যেটা সেটাতে খুবই মনোযোগী। তিনিও কিন্তু এসব নিয়ে ভাবেন এবং লেখেন।
রাজু আলাউদ্দিন: কিন্তু মানে এই সঙ্গীতের চর্চা বা শাস্ত্রীয় ধারণা ছাড়া ওইটা কতটুকু বোঝা সম্ভব ? যেমন শঙ্খ ঘোষ নিঃসন্দেহে ভাল সমালোচক কোনো সন্দেহ নাই। কিন্তু গান বিষয়ক আলোচনার ক্ষেত্রে কি আসলে ওই সম্পূর্ণতা পাওয়া সম্ভব ?
সনজীদা খাতুন: আমি একটা কথা বলব, সুরের কথা তিনি খুব একটা বলেন না। কিন্তু অনুভব করেন এটা বুঝি। আর উনি চলে যান ওইতো আবু সায়ীদ আইয়ূবের মতন, ফিলসফিক্যালি গভীরে চলে যান। এই আর কি।
রাজু আলাউদ্দিন: হ্যাঁ, সেইটাই। আচ্ছা, এই সূত্রেই আমি বলব ওই যে অসম্পূর্ণতার কথা যেটা আবু সয়ীদ আইয়ূবের মধ্যে ছিল, তাই না? একইভাবে নিশ্চয় বুদ্ধদেব বসুর মধ্যেও সেইটা ছিল।
সনজীদা খাতুন: উনি কি গান নিয়ে লিখেছেন ?
রাজু আলাউদ্দিন: আমি বলছি ওই অভাবটা ছিল। গান নিয়ে উনি লিখেছেন। রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে। এমনকি এও তো উনি বলেছেন যে, যদি কোনো কারণে রবীন্দ্রনাথের সমস্ত রচনাবলী বিলুপ্ত হয়ে যায় বা কোনো কারণে বিলুপ্ত হয়ে যায় আর যদি শুধু গানগুলো থাকে তাহলে শুধু ওই গান দিয়েই বোঝা যাবে এই মানুষটির উচ্চতা।
সনজীদা খাতুন: না, ঠিকই আছে। আমার মনে পড়ছে রবীন্দ্রনাথের গদ্য গান নিয়ে ওর একটা প্রবন্ধ আমি পড়েছিলাম।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: বুদ্ধদেব বসুর। এই যে চণ্ডালিকাতে কতগুলো গদ্য অংশ আছে, কাব্যময় গদ্য। সেটার যে সুর, সেই নিয়ে উনি মন্তব্য করেছিলেন।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা কিন্তু উনি কি জানতেন? সুর সম্পর্কে কি ধারণা ছিল আদৌ ?
সনজীদা খাতুন: ওর স্ত্রী তো অসামান্য গান গাইতেন।
রাজু আলাউদ্দিন: হ্যাঁ।
সনজীদা খাতুন: প্রতিভা বসু খুবই ভাল গাইতেন। এক কালে।
রাজু আলাউদ্দিন: তাইলে হয়ত উনার বউয়ের সঙ্গে আলাপ করে উনি লিখতেন।
সনজীদা খাতুন: না, তা বোধ হয় নয়। (হাসতে হাসতে)
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা। (হাসি)।
সনজীদা খাতুন: তার স্ত্রীও বেশ বুঝতেন। অনেক কিছু বুঝতেন। তার লেখাও আলাদা এবং তিনি তো একটু গৌরবভরে উল্লেখ করেই ফেলেছেন যে, বুদ্ধদেব সংসার চালাতে পারতেন না।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: বুদ্ধদেব বসুর গল্প নিয়ে, সিনেমা হয়ে, এটা হয়ে সেটা হয়ে, তবে সংসারে অর্থাগম হত। এটা প্রতিভা বসু লিখেই ফেলেছেন। আমি পড়েছি (হাসতে হাসতে)। কাজেই দু’জনে যে আলাপ করে করতেন– তা না। তার একটা জগৎ ছিল, এর আরেকটা আলাদা জগৎ ছিল। তবে প্রতিভা বসু অনেকটা জাগতিক বিষয়ে চেতন ছিলেন।
রাজু আলাউদ্দিন: সচেতন ছিলেন। (হাসি)
সনজীদা খাতুন: কিন্তু কাব্যসাহিত্য বা নাট্যসাহিত্য এসব বিষয়ে যখন বুদ্ধদেব বসুকে দেখি তখন তাকে দেখি অন্য গভীরতায়। তবে তিনিও যে জাগতিক ব্যাপারে খুব অসচেতন ছিলেন তা মনে হয় না। ডলার বিষয়ে তার খুব আগ্রহ ছিল।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা (হাসি)।
সনজীদা খাতুন: হ্যাঁ লিখেছেন। তার লেখার থেকেই পেয়েছি। ‘দেশ’-এ বেড়িয়েছিল একটা লেখা। কোথা থেকে কত ডলার দেবে-একি ছোট কথা ! কম কথা ! এরকম উচ্ছ্বাস তার। এটা ছিল। বুদ্ধদেব বসুর ওই, কি বলব, আমেরিকা-ঘেঁষা ওই ব্যাপারটা তো ছিলই।


রাজু আলাউদ্দিন: ওইটা ছিল ? হা..হা..হা।
সনজীদা খাতুন: যা মনে হয় লেখা পড়ে। আমি তো আর ব্যক্তিগতভাবে জানি না।
রাজু আলাউদ্দিন: হুম। বুঝতে পারছি। তো বিষয়বুদ্ধি তো রবীন্দ্রনাথেরও ছিল। মানে এটা আমি নিন্দার্থে বলছি না। মানে….
সনজীদা খাতুন: হ্যাঁ। না, না এটা সাংঘাতিক ছিল।
রাজু আলাউদ্দিন: হ্যাঁ, সেইটাই।
সনজীদা খাতুন: এবং আমি অনেক খারাপ খারাপ কথা শুনেছি (হাসি)। আমি আসলে…
রাজু আলাউদ্দিন: আপনারটা আগে শুনি। তারপরে আমি আমারটা বলব।

সনজীদা খাতুন: যেমন ধরুন দীনেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রসঙ্গটা। ঠাকুর বাড়ির একটা প্রথা ছিল জ্যেষ্ঠ পুত্রই সব কিছুর অধিকারী হয়।
রাজু আলাউদ্দিন: মানে সেই রাজতন্ত্রের মত আর কি…
সনজীদা খাতুন: ওদের মধ্যে ওটা আছে। যেমন দ্বারকানাথ ঠাকুরের ছেলে দেবেন্দ্রনাথ, দেবেন্দ্রনাথের বড় ছেলে দ্বিজেন্দ্রনাথ…
রাজু আলাউদ্দিন: দ্বিজেন্দ্রনাথ।
সনজীদা খাতুন: দ্বিজেন্দ্রনাথের বড় ছেলে দীপেন্দ্রনাথ, তার ছেলে দীনেন্দ্রনাথ। এই যে শান্তিনিকেতনের জমি-টমি, এগুলো কিন্তু ওদেরই ছিল।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: কিন্তু রবীন্দ্রনাথ যখন কাজ শুরু করলেন শান্তিনিকেতনে, ওঁর পরামর্শদাতা…এগুলো কিন্তুু একটু ইয়ে কথা আমি বলছি, আমি দেখেছি এগুলো, লক্ষ্য করেছি…পরামর্শদাতা ছিলেন প্রমথ চৌধুরী। ব্যারিস্টার প্রমথ চৌধুরী। তাঁরও তো বুদ্ধির কোনো খামতি ছিল না।
রাজু আলাউদ্দিন: না। (হাসি)
সনজীদা খাতুন: তো তিনি নানাভাবে তাকে পরামর্শ দিতেন।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: এই যে সম্পত্তিটা এটা হল দীনেন্দ্রনাথ ঠাকুরদের। কিন্তুু দীনেন্দ্রনাথ ঠাকুররা খ্যাপা টাইপের ছিলেন। যেমন, দিজেন্দ্রনাথ। তারা বিষয় সম্পত্তি রক্ষা করতে জানতেন না। বিশেষ সময়ে যে টাকা জমা দিতে হবে, ট্যাক্স দিতে হয় তো।
রাজু আলাউদ্দিন: জি।
সনজীদা খাতুন: দিয়ে অধিকার বজায় রাখতে হবে। নাইলে হাত ছাড়া হয়ে যায়। সেগুলো তারা পারতেন না। তো রবীন্দ্রনাথ, রথীন্দ্রনাথ এরা দেখলেন…রবীন্দ্রনাথের চেয়ে বোধহয় বেশি করে প্রমথ চৌধুরী দেখলেন…
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: দেখলেন যে জমি তো ওদের হাতছাড়া হয়ে যাবে। তখন প্রস্তাব দেয়া হল যে, আমরা দেখাশোনা করি। আমাদের এগুলোর পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দিয়ে দাও। তারপরে ক্রমে ক্রমে কি করে ওখানকার যে একটা ট্রাস্ট হয়েছিল তাতে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন না।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা। আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: এক কালে রবীন্দ্রনাথ প্রবেশ করলেন। আর দীনেন্দ্রনাথদের সম্পত্তিটা নিয়ে ওরা তাদেরকে কিছু কিছু টাকা দেবেন–এরকম কথা ছিল। তো দীনেন্দ্রনাথ মদ্যপায়ী ছিলেন, টাকা পয়সা রাখতে পারতেন না। রবীন্দ্রনাথের পুত্র রথীন্দ্রনাথ এই টাকা দিতে চাইতেন না সহজে।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: তো এখন যার প্রাপ্য সে টাকা নিয়ে মদ্যপান করে না কি করে সেটা তার ব্যাপার।
রাজু আলাউদ্দিন: জি।
সনজীদা খাতুন: এবং তার বয়স হয়েছিল যথেষ্ট। তো রথীন্দ্রনাথ এই যে টাকা দিতে চাইতেন না তার থেকে একটা সংঘাত তৈরি হয়েছিল। যার জন্য দীনেন্দ্রনাথ এক সময় শান্তিনিকেতন ছেড়ে কলকাতায় চলে যান। বড় আঘাত পেয়ে গিয়েছিলেন। তো এক রকমভাবে দীনেন্দ্রনাথের বিষয় থেকে তো তাকে বঞ্চিতই করা হয়েছিল।
রাজু আলাউদ্দিন: হ্যাঁ।
সনজীদা খাতুন: কাজেই বিষয় বুদ্ধিগুলো তো তাদের নানাভাবেই ছিল। আমি আরও শুনেছি রবীন্দ্রনাথের শ্বশুরবাড়ির এক ভদ্রলোক শান্তিনিকেতনে কাজ করতেন। তার নাম বলতে গেলে এখন অনেকক্ষণ ভাবতে হবে। তিনি বলেছেন, তাকে সবাই ‘মামাবাবু’ বলে ডাকত। মৃণালিনী দেবীর সম্পর্কে উনি হয়ত মামা হতেন বা ওরকম কিছু। তিনি আমাকে বলেছেন যে, রবীন্দ্রনাথের ক্ষুরধার বুদ্ধি ছিল…
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা ! (হাসি)
সনজীদা খাতুন: এবং জমিদারী পরিচালনার সময় কোনটা দিয়ে কাকে ঠেকাতে হবে খুব ভাল বুঝতেন।
রাজু আলাউদ্দিন: তাই নাকি? (হাসতে হাসতে)
সনজীদা খাতুন: হ্যাঁ। এমনিতে প্রজাদরদী। এবং প্রজাদরদী বলে তিনি একটা জিনিস আরও বুঝতেন, যদি প্রজারা যেসব কাজ চলে, উন্নয়নমূলক, তাতে তারা নিজেরা যদি কিছু টাকা না দেয় তো নিজেদের দরদ থাকবে না সে বিষয়ে। সেতু তৈরি, রাস্তা তৈরি, জলের কোনো ব্যবস্থা করা এবং শিক্ষা, সব ব্যাপারে উনি ট্যাক্স নিতেন ওদের কাছ থেকে। এটা কিন্তু বিষয়-বুদ্ধি না। এটা হচ্ছে অত্যন্ত স্বচ্ছ বুদ্ধি যে, এসব জিনিসে ওদের অংশীদারিত্ব থাকতে হবে। থাকলে পরে এসব ব্যাপারে ওদের আগ্রহ হবে।
রাজু আলাউদ্দিন: ওরা সক্রিয় হবে।
সনজীদা খাতুন: ওরা সক্রিয় হবে।
রাজু আলাউদ্দিন: এবং কাজের প্রতি ওদের আগ্রহ থাকবে।
সনজীদা খাতুন: আকর্ষণ থাকবে, আগ্রহ থাকবে। এইটা করে, রবীন্দ্রনাথ কিন্তু প্রজাদরদের পরিচয় দিয়েছেন। কিন্তু অন্য জমিদারদের সঙ্গে যে ব্যাপারগুলো, সে সবে তিনি তার ক্ষুরধার বুদ্ধিকে ব্যবহার করেছেন। কাকে কিভাবে মামলায় ঠেকাতে হবে, সেগুলো তিনি খুব ভাল বুঝতেন।
রাজু আলাউদ্দিন: তাই? এরকম মামলা-টামলাও ছিল?
সনজীদা খাতুন: হ্যাঁ, এরকম হতও। কাজেই বিষয়বুদ্ধিতে তিনি কিছু মাত্র হীন ছিলেন না। এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। আর রবীন্দ্রনাথের বুদ্ধিটা এমন ছিল, এমন যুক্তিবাদী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ যে তার লেখার মধ্যে, চিঠির মধ্যে, সর্বক্ষণ তো দেখি সেগুলো।
রাজু আলাউদ্দিন: জি।
সনজীদা খাতুন: কাজেই আমি মনে করি বিষয়বুদ্ধি তারও ছিল। আগে কার বিষয় বুদ্ধির কথা হয়েছিল?
রাজু আলাউদ্দিন: এর আগে ছিল … ইয়ে..বুদ্ধদেব বসুর। ডলার, ডলারের কথা…। (হাসতে হাসতে)
সনজীদা খাতুন: হ্যাঁ (হাসি)। বিষয়বুদ্ধি কার যে না থাকে।
রাজু আলাউদ্দিন: এবং বিষয়বুদ্ধি তো রবীন্দ্রনাথের ছিল বলেই..
সনজীদা খাতুন: হ্যাঁ, খুবই ছিল।
রাজু আলাউদ্দিন: তিনি আমেরিকাতে একেকটা লেকচারের জন্য কত…পাঁচশ না সাতশ ডলার করে উনি নিতেন।
সনজীদা খাতুন: এটা কিন্তু বিষয়বুদ্ধির জন্য না। এটা বিশ্বভারতীর উন্নয়নের জন্য।
রাজু আলাউদ্দিন: না, ঠিক আছে।
সনজীদা খাতুন: কোনো টাকা তো উনি নিজে রাখতেন না।
রাজু আলাউদ্দিন: না, বুঝতে পারছি।
সনজীদা খাতুন: ওই জন্যে সংগ্রহ করতেন। এটাকে আমি বিষয়বুদ্ধি বলব না। এটা হচ্ছে তার মঙ্গলচিন্তা, বিশ্বভারতীর জন্য। বিষয়বুদ্ধি আমি যেটা বললাম, জমিদারী সংক্রান্ত। সেটা ছিল। তবে তার মনে শেষ জীবনে একটা আক্ষেপ এসেছিল। তিনি বলেছিলেন যে, জমিদাররা তো প্যারাসাইটস, পরজীবী। ওই যে কৃষকদের রক্ত খেয়ে এরা বড় হচ্ছে। প্রজাদের খেয়ে তারা বড় হয়। তারা যে ট্যাক্সগুলো নেয় কিসের জন্য নেয়? কী এমন করে? তিনি বলেছিলেন, যদি আমার ক্ষমতা থাকত তবে ওদের কাছে সব ফিরিয়ে দিতাম। কিন্তু সেটা ফেরানো সম্ভব নয় সেটাও তিনি বুঝতেন। বলতেন যে, ফিরিয়ে দেবার সঙ্গে সঙ্গে প্রজারা যেটা করবে, মহাজনের কাছে গিয়ে বাঁধা দেবে। বাঁধা দিয়ে কিছু টাকা পেয়ে পেট পুরে আগে খাবে। খেতে তো পায় না। কাজেই এসব কিছুই থাকবে না। রবীন্দ্রনাথের এ সমস্ত অনেক বিবেচনা তার লেখায় পাওয়া যায়।
রাজু আলাউদ্দিন: মাঝে মধ্যেই কিছু ইয়ে শোনা যায়. . . অভিযোগ আকারে যে, রবীন্দ্রনাথ প্রজা নিপীড়কও ছিলেন। যেমন, এরকম একটা ছিল . . .
সনজীদা খাতুন: এটা মিথ্যে কথা।
রাজু আলাউদ্দিন: আহমদ শরীফ এরকম কিছু তথ্য সংগ্রহ করে. . .
সনজীদা খাতুন: কোথা থেকে পেয়েছেন আমি জানি।
রাজু আলাউদ্দিন: আবুল আহসান . . .
সনজীদা খাতুন: আবুল আহসান চৌধুরী। আবুল আহসান চৌধুরী বলে, বলত, এখন আবার অন্য কথা বলে, ও তো যখন যে সরকার আসে তার সাথে চলে. . .
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা। আবুল আহসান চৌধুরী?
সনজীদা খাতুন: হুম। আমার ভাই হয়।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা, তাই!
সনজীদা খাতুন: হুম। আমার ফুফাতো ভাই।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: আচ্ছা। ওর ব্যাপার হচ্ছে, সে তখন আবিষ্কার করল কোথা থেকে যে, ‘দুই বিঘা জমি’র জমিদার রবীন্দ্রনাথ নিজে।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা ! (হাসি)
সনজীদা খাতুন: (হাসতে হাসতে) তার থেকেই এই কথাগুলো উঠল এবং শরীফ সাহেব মেতে উঠলেন। উনি তো আবার চাঞ্চল্যকর কিছু করবার জন্য মুখিয়ে থাকতেন।
রাজু আলাউদ্দিন: শরীফ ভাই?
সনজীদা খাতুন: হ্যাঁ, খুব ছিল এটা ওর মধ্যে–আমি দেখেছি। তো তখন এইটা নিয়ে অনেক কথাবার্তা হয়েছে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ যে প্রজাদরদী ছিলেন তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ আছে আমাদের আবদুস শাকুরের লেখাতে। ওঁর একটা বই আছে বাংলা একাডেমীতে মহামহিম রবীন্দ্রনাথ। মহামহিম অমুক, মহামহিম তমুক . . . এভাবে করে করে লিখেছেন। তিনি কিভাবে জমিদারী চালিয়েছেন, জমিদারীতে কিভাবে প্রজাদের জন্য চিন্তা করে সব কিছু করেছেন, অত্যাচারীকে উনি শাসন করেছেন, সে সব কথা তাঁর লেখাতে পাওয়া যায়। এগুলো পড়ে আমি জানি যে যারা ওই সব কথা বলেছিল, মানে অন্ধ-ভক্তি থেকে আমি বলি না. . .
রাজু আলাউদ্দিন: জি।
সনজীদা খাতুন: আমি সব দিক থেকেই দেখেছি। এই যে আমি রবীন্দ্রনাথের বিষয়বুদ্ধির কথা বললাম, বড় খারাপ কথা বললাম। একথা আমি খুব ভাল করে জেনেছি। আমি পড়েছি শোভন সোমের একটি বইয়ে। রবীন্দ্রনাথ, মাঝখানে বোধহয় একটা ডট দেয়া, দীনেন্দ্রনাথ… এরকম কিছু একটা বইটার নাম। আমার কাছে আছে।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: সেই বইয়ে আমি এ কথাগুলো পেয়েছি। তবে সবটা উনি লেখেন নি। ওরা আবার করেন কি, একটু রেখে ঢেকে লেখেন। আমি আবার সব খুলে বলে দেই।
রাজু আলাউদ্দিন: হা হা হা ! আচ্ছা!
সনজীদা খাতুন: (হাসি)
রাজু আলাউদ্দিন: তবে তো সে অর্থে আপনাকে রবীন্দ্র-পূজারী বলা যাবে না।
সনজীদা খাতুন: আমি পূজা টুজা করি না।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা। না, যেটা আমাদের এখানে, মানে উভয় বাংলাতেই দুটো ধারা। একটা হচ্ছে রবীন্দ্র-পূজারী যাকে বলা হয় আর আরেকটা হল রবীন্দ্র-নিন্দুক। যেটা, আহমদ শরীফও ছিলেন যেখানে। পশ্চিমবঙ্গেও আছেন কেউ কেউ। আপনি এ দুটোর কোনোটাতেই নেই . . .?
সনজীদা খাতুন: আমি এ দুটোর কোনোটাতেই নেই। আমার বিচারে যা বলে…

রাজু আলাউদ্দিন: জি।
সনজীদা খাতুন: আমি সেই বিচার দিয়ে চলি। এবং শরীফ সাহেব খুব অবাক হয়েছিলেন, আমি ক্লাসে ‘বির্সজন’ নাটক পড়াতে গিয়ে অনেক কিছু দেখেছি এবং সেই সব নিয়ে আমি বলতাম ও লিখেছি। শরীফ সাহেব সেই লেখা পড়ে আমাকে বলছেন, ‘ও, তুমি রবীন্দ্রনাথের দোষও দেখতে পাও।’ আমি বললাম যে, ‘কেন দেখব না? সবটা জেনেই তো তাকে আমি ভালবাসব। না জেনে ভালবাসার তো কোনো মানে নেই।’ তো উনি তাকিয়ে ছিলেন আমার দিকে চুপ করে।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা। ভারতে মানে পশ্চিমবঙ্গে নীলাঞ্জন বলে এক ভদ্রলোক, উনি একবার কিছু তথ্য বের করেছিলেন মানে প্রকাশ করেছিলেন। সেগুলো বই আকারে বের হল এবং বের হবার পরে ওই বইটা নাকি ব্যান্ড করা হয়েছে বা ওই বইটা নিয়ে মামলা-টামলা চলছে। আপনার কি . . .
সনজীদা খাতুন: শুধু নীলাঞ্জন..? নামটা কি ?
রাজু আলাউদ্দিন: নীলাঞ্জন. . সামথিং। আমার নামটা ঠিক মনে নাই।
সনজীদা খাতুন: এই যে কিছু দিন আগে যে নীলাঞ্জন কাজ করত বিশ্বভারতীতে, তার কথা কি ?
রাজু আলাউদ্দিন: বোধ হয়। বোধ হয় উনিই . .
সনজীদা খাতুন: আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।
রাজু আলাউদ্দিন: উনি বোধ হয় ওখানে চাকরীও হারালেন।
সনজীদা খাতুন: সদ্য হারিয়েছে। উনি সদ্য চাকরী হারিয়েছেন।
রাজু আলাউদ্দিন: হ্যাঁ। জি। জানেন কি এ বিষয়ে কোনো কিছু?
সনজীদা খাতুন: আমি এ বিষয়টা একদম জানতাম না যেটা শুনলাম এখন। কিছু লিখেছে. . .
রাজু আলাউদ্দিন: জি।
সনজীদা খাতুন: নীলাঞ্জন এখন রবীন্দ্রভারতী, যা আমি এখন শুনে এলাম ওখান থেকে, রবীন্দ্রভবন থেকে প্রচুর তথ্য নিয়ে নিজে লিখত, আর কাউকে কাজ করতে দিত না।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: কুক্ষিগত করে রেখেছিল। ও ঢাকায় এসেছিল, ওকে আমি দেখেছি। আমি তাকে যথেষ্ট সমাদরও করেছি কিন্তু আবার তার প্রচণ্ড নিন্দা শুনেছি তখনই এবং ওখানে গিয়ে তো আরও শুনলাম।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: শান্তিনিকেতনে শুনলাম ও খুব অন্যায় করেছে। যাতে লোকে রবীন্দ্রভবন দেখতে না পায়, দর্শনার্থীরা, তার জন্য যাবার আগে সে হঠাৎ সমস্তটা রেনোভেশনের ব্যবস্থা করে সব আটকে রেখে দিল।
রাজু আলাউদ্দিন: তাই নাকি ?
সনজীদা খাতুন: হুম। আমি এগুলো ওখানে শুনেছি। কিন্তু এই নীলাঞ্জন সেই নীলাঞ্জন কি না, আমি খুব কিন্তু নিশ্চিত না।


রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা। আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: আমি খুব নিন্দা শুনলাম এবং আমার খুব খারাপ লাগল। ছেলেটিকে আমার খারাপ মনে হয় নি।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: আসলে কাউকে দেখে বা একটু সময়ের জন্য তার কথা শুনে কিছু তো বোঝা যায় না।
রাজু আলাউদ্দিন: না। সেইটাই।
সনজীদা খাতুন: আমি বলতে পারব না ঠিক।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনি বিশ্বভারতীতে যে সময় ছিলেন, ওটা কত সালের দিকে হবে?
সনজীদা খাতুন: আমি তো ৫৪ সালের শেষ দিকে চলে গিয়েছিলাম। এখানে অনার্স পরীক্ষা দিয়ে।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা। তো ওই সময় বুদ্ধদেব বসু বেঁচে আছেন . . .
সনজীদা খাতুন: তিনি হয়ত কলকাতায় আছেন বা আমেরিকায় আছেন। তার সঙ্গে আমার কখনও দেখা হয় নি। প্রতিভা বসুর সঙ্গে দেখা হয়েছে। ওঁর একটা যে বাড়ি ছিল, বুদ্ধদেব বসুর ‘স্বাগত বিদায়’ নামে, শান্তিনিকেতনে. . .
রাজু আলাউদ্দিন: একটা কবিতাও আছে।
সনজীদা খাতুন: হ্যাঁ, আমি জানি। সেই নামেই। তো সেখানে প্রতিভা বসুর সাথে আমার দেখা হয়েছে। কারণ, প্রতিভা বসু আমার বাবাকে খুব ভাল জানতেন।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: নজরুলকে নিয়ে আমার বাবা তাদের বাড়িতে গিয়েছিলেন। নজরুলের সাথে তার পরিচয় আমার বাবার সূত্রে। সে জন্যে তিনি আমাকে খুব সমাদর করেছিলেন।
রাজু আলাউদ্দিন: সেটা তো তাহলে ঢাকায়
সনজীদা খাতুন: ঢাকায়।
রাজু আলাউদ্দিন: ওয়ারীতে।
সনজীদা খাতুন: হ্যাঁ।
রাজু আলাউদ্দিন: ঠিক আছে।
সনজীদা খাতুন: এ সব ছিল সে সময়কার কথা। তার ফলে ওঁর সঙ্গে আমার মোটামুটি দেখা সাক্ষাৎ হয়েছে এবং উনি বড্ড কান পাতলা মানুষ। নানা মানুষের কাছে নানা কথা শোনেন। আর আমারও তো বুদ্ধি যেমন,
রাজু আলাউদ্দিন: জি।
সনজীদা খাতুন: আমি ওই যে সিসিসিপি, মানে ওই যে ইউ.এস.এস.আর লেখা একটা ব্যাগ, আমার মেয়ে মস্কোতে পড়ত তো, ওই ব্যাগে করে আমার জিনিসপত্র নিয়ে শান্তিনিকেতনে গেছি। অনেক সময় ধরে সবাই দেখছে, আমার নাম হয়ে গেল আমি কে.জি.বি’র এজেন্ট।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা। (হাসি)
সনজীদা খাতুন: এবং একজন প্রসিদ্ধ কবি নরেশ গুহ, তিনি গিয়ে প্রতিভা বসুকে জানালেন, আমি হলাম কে.জি.বি’র এজেন্ট।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: এবং আমার বন্ধু-বান্ধবরা ওরাও শুনল যে আমি কে.জি.বি’র এজেন্ট। তারা এসে আমার কাছে বলল, ‘শুনেছ? তোমার নামে এ সব কথা বলছে।’ আমি গিয়ে–গৌরী আইয়ূব–তার কাছে দুঃখ করেছিলাম যে, ‘দেখুন, আপনাদের বাড়ির এত ঘনিষ্ঠ নরেশ গুহ এবং বুদ্ধদেব বসুর স্ত্রী , তারা আমার নামে এসব কথা বলছে।’ উনি খুব দুঃখ পেলেন এবং চুপ করে থাকলেন। এগুলো হচ্ছে কি কান কথা শোনার অভ্যাস থেকে এগুলো হয় এবং অনুমানের অদ্ভুত ক্ষমতা থেকে। আমাকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করত, এই ব্যাগটা আপনাকে কে দিল? আমি বলতাম আমার কন্যা সেখানে পড়ত সে নিয়ে এসেছিল। আমার তো এত টাকা নেই যে ক্ষণে ক্ষণে বড় বড় ব্যাগ কিনব, স্যুটকেস কিনব। ছিল না। মোটেই ছিল না। এখন তো আমার একটু স্বচ্ছলতা আছে, তখন তা ছিল না। আমি মেয়ের ব্যাগখানা নিয়ে চলে গেছি এবং তার ফলে আমাকে নাম দেয়া হয়েছিল, আমি কে.জি.বি’র এজেন্ট।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা। (হাসি)
সনজীদা খাতুন: (হাসি দিয়ে) তো, কি বলব. . . এই ভাবেই প্রতিভা বসুর সাথে আমার সম্পর্কটা প্রায় কেঁচে গেছিল।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: আবার আরেকটা সূত্রে, তার বাড়িতে একজন মহিলা গেলেন যার ক্যান্সার হয়েছে। শেষ অবস্থা। তপতী মুখোপাধ্যায়। তিনি আমাকে ডাকলেন ওখানে গিয়ে গান শোনাতে। উনি আমার গান ভালবাসতেন।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: তো আমি যাব না, যাব না করেও শেষ পর্যন্ত আমি গেলাম। খুব শক্ত হয়ে গেলাম। তখন সেখানে বসে আছেন নিমাই চট্টোপাধ্যায়। সেটাতেও আমার একটা রিঅ্যাকশন হল। কারণ, নিমাই চট্টোপাধ্যায় কিছু লোকের কাছে বলেছিলেন শান্তিনিকেতনে যে, ‘সনজীদা খাতুন আবার কি গান গায়? গান গায় ফাহমিদা খাতুন।’
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: তো আমার এটা শুনতে ভাল লাগেনি। কষ্ট পেয়েছিলাম। তো আমি সেখানে গিয়ে, আমাকে যখন গান গাইতে বলা হল, ফাহমিদার রেকর্ড শুনেছে নিমাই, আমি সেখানে ফাহমিদার রেকর্ডের গানেরই কিছু শোনালাম।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা
সনজীদা খাতুন: তখন নিমাই বলছেন অবাক হয়ে, ‘আরে, ভাল তো!’ ফাহমিদা যেসব গান গাইত আমি সে সব গান গাইতাম না। আমি ওর সাথে হারমোনিয়াম বাজাতে সাহায্য করতাম। আর আমি তো কখনো মঞ্চ পরিবেশক না। আমি তো সব সময় কাজ করেছি, সংগঠন করেছি। আমি নিজে মঞ্চে খুব কম উঠেছি। তো যাই হোক, সেদিন আবার গিয়ে গান শোনানোর পরে প্রতিভা বসুও খুব আহা, আহা করলেন। এই পর্যন্তই। তার পরে তার সঙ্গে আমার আর দেখা হয় নি।
রাজু আলাউদ্দিন: এই সূত্রে একটা ইয়ে জানতে চাই। কারণ এগুলোর তো কোনো, লিখিত কোনো ইতিহাস নাই। শুধুমাত্র অ্যানেকডটস হিসেবে কোথাও কোথাও উল্লেখ দেখা যায়।
সনজীদা খাতুন: হ্যাঁ।
রাজু আলাউদ্দিন: ওই যে ওয়ারীর যে ঘটনা আর কি। নজরুল ইসলাম বা প্রতিভা বসুর একটা ঘটনার কথা আমরা জানি।
সনজীদা খাতুন: ওই যে গুন্ডারা নজরুলকে ঘিরে ধরেছিল–এলাকার।
রাজু আলাউদ্দিন: ঘিরে ধরেছিল বা শারীরিকভাবেও . . .
সনজীদা খাতুন: লাঞ্ছিত করেছিলও বোধ হয় খানিকটা।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: আর নজরুল ওদের হাতের লাঠি কেড়ে নিয়ে ওদের পিটিয়ে তাড়িয়েছিলেন। সেই লাঠিটা আমাদের বাড়িতে বহুদিন ছিল।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা, কি ঘটনাটা ছিল একটু বলেন না, শুনি . . .
সনজীদা খাতুন: মানে ওই তো, পাড়ার ছেলেরা মানে হিন্দুরা ভাবছে, এই মুসলমান ব্যাটারা এসে এই বাড়ির মেয়ের সাথে প্রেম করছে।
রাজু আলাউদ্দিন: এই বাড়ি মানে কি প্রতিভা বসুদের বাড়ি?
সনজীদা খাতুন: প্রতিভা বসুদের বাড়ি।
রাজু আলাউদ্দিন: তখনও তো তিনি অবিবাহিত?
সনজীদা খাতুন: হ্যাঁ, দুজনই। প্রতিভা বসুকে তিনি গান শেখাতেন। যাই হোক, গান শেখাতেন তো, তো সেটাও ওদের সহ্য হয় নি।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: মুসলমান। তার ওপরে আবার ওই বাড়ির মেয়ের সাথে তার এত ইয়ে।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: তো তারা একদিন দল বেঁধে তাকে মারতে আসে। তিনি তাদেরকে উল্টো পিটিয়ে দেন। তিনি তাদের হাতের লাঠি কেড়ে নেন।
রাজু আলাউদ্দিন: কেড়ে নেন?
সনজীদা খাতুন: হুম। ওই লাঠি আমাদের বাড়িতে বহুদিন ছিল। বড়দিরা বলতেন, নজরুল মারা লাঠি।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা (হাসতে হাসতে)।
সনজীদা খাতুন: (হাসি)। এটা আমাদের বাড়ির ঘটনা। বড়দিও লিখেছেন। আছে।
রাজু আলাউদ্দিন: তো নজরুলের প্রতিভার প্রতি আকর্ষণ ছিল তো ? না শুধু গান শেখানোই ছিল . . .
সনজীদা খাতুন: মানে এগুলো বলা বড় কঠিন। নজরুলের ‘অনামিকা’ কবিতা পড়া আছে?
রাজু আলাউদ্দিন: মনে নেই এ মুহূর্তে আমার।
সনজীদা খাতুন: ওই যে ইয়েতে আছে, চক্রবাক-এ।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: তিনি বলছেন যে, আমি পাত্রে পাত্রে মধু পান করব।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা! (হাসতে হাসতে)
সনজীদা খাতুন: (হাসি) এই তো ওঁর আদর্শ ছিল তো। কাজেই, উনার যে কার প্রতি আকর্ষণ ছিল, কার প্রতি ছিল না, বলা বড় কঠিন। আমার বাবার সঙ্গে যেটা নিয়ে ওঁর চিঠি লেখালেখি, মতিহার বলে তিনি বাবাকে লিখতেন। সেই যে ফজিলাতুন্নেসা, উনি তো কতবার প্রেমে পড়েছেন তার ঠিক নেই। কাজেই এই সম্পর্ক কি ছিল সেটা আমার জানা নেই। এই নিয়ে কথা না বলাই ভাল। (হাসি)
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা। ঠিক আছে। না, প্রতিভা বসুর দিক থেকে ওরকম কোনো . . .
সনজীদা খাতুন: আমি তাও বলতে পারব না।
রাজু আলাউদ্দিন: মানে এসব নিয়ে কখনও আলাপ হয় নি তাঁর সাথে।
সনজীদা খাতুন: না, না এসব তো ..
রাজু আলাউদ্দিন: আপনি তো তাকে চিনতেন … তার সঙ্গে …
সনজীদা খাতুন: না, চিনেছি তো ওইখানে এবং এই সব নিয়ে আলোচনা হয় নি কখনো।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা, ওই সময় আপনার, সুধীন দত্ত বেঁচে ছিলেন …
সনজীদা খাতুন: না, আমার কারও সঙ্গে, আমার একমাত্র কবি অমিয় চক্রবর্তীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছে।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: কারণ, আমার যে রবীন্দ্র সংগীতের ভাব-সম্পদ নামের বইটি, এই বইটির তিনি পরীক্ষক ছিলেন, গবেষণাপত্রের।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: এবং তাঁর নাকি এত ভাল লেগেছিল, আমি তখন ঢাকায় চলে এসেছি জমা দিয়ে, তিনি আমি যেখানে থাকতাম রতন কুঠির স্কলার্স ব্লকে, সেখানে চলে এসেছিলেন।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: যে কে এরকম লিখেছে আমি দেখব। আমি পরে যখন গিয়েছি শান্তিনিকেতনে তখন আমার যিনি গাইড ছিলেন, উপেন্দ্রকুমার দাশ, উনি আমাকে বললেন তুমি শিগগির গিয়ে দেখা কর। উনি আছেন এই পেছনের বাড়িতে, হৈমন্তীর বাড়িতে, তুমি গিয়ে দেখা কর। তারপরে আমি গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করি। উনি আমাকে বললেন যে, রাত আটটার পরে এসে তুমি আমাকে গান শোনাবে।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: তারপরে গিয়ে আমি উনাকে গান শুনিয়েছিলাম। উনি খুব প্রশংসা করে আমার গবেষণাপত্রের রিপোর্ট দিয়েছিলেন।


রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: তো তার সঙ্গে এইটুকুনই দেখা। আমি গান শুনিয়েছিলাম, তার ভাল লেগেছিল কি মন্দ লেগেছিল, কিছু জানি না। কিছুই বলেন নি। খাওয়া দাওয়ার পরে বসে গান শুনেছিলেন। তো, তার কন্যা নাকি কাউকে কাউকে বলেছে যে তাঁর খুব ভাল লেগেছিল সেদিন আমার গান। এই।
রাজু আলাউদ্দিন: সুধীন দত্তের কথা এই জন্য বললাম যে, উনার স্ত্রী রাজেশ্বরী দত্ত…
সনজীদা খাতুন: রাজেশ্বরী দত্ত।
রাজু আলাউদ্দিন: উনি তো রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতেন।
সনজীদা খাতুন: হুম।
রাজু আলাউদ্দিন: তো আপনি …
সনজীদা খাতুন: শান্তিনিকেতনের ছাত্রীও বটে।
রাজু আলাউদ্দিন: উনাকে দেখেন নি কখনো?
সনজীদা খাতুন: আমি দেখিনি। উনি বিলেতে থাকতেন তো শেষ দিকটায়। সোয়াশে( SOAS) চাকরীও করেছেন।
রাজু আলাউদ্দিন: সেটা তো বোধ হয় সুধীন দত্তের মৃত্যুর পরের…
সনজীদা খাতুন: পরের কথা এগুলো। হ্যাঁ।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা। মানে আপনি যখন ছিলেন তখন তো সুধীন দত্ত বেঁচে আছেন।
সনজীদা খাতুন: তখন আমার কারও সঙ্গেই দেখা হয় নি। আর আমি যখন কাজ করতে যাই তখন কেবল কাজই করি। এমনকি গানও ভুলে যাই। এই অবস্থা হয়।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা। আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: তবে লোকে ধরে গাইয়েছে। তখন আবার গান এসেছে।
রাজু আলাউদ্দিন: ওই সময় আরও মানে সংস্কৃতির অঙ্গনের …
সনজীদা খাতুন: হ্যাঁ। যেমন, প্রবোধচন্দ্র সেন। আমার শিক্ষক। তিনি তো ছন্দের মানে মস্ত বড় একজন, ছন্দের মূল সূত্রগুলো উনি চমৎকারভাবে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন।
রাজু আলাউদ্দিন: জি।
সনজীদা খাতুন: তিনি আমার শিক্ষক। তিনি আমাকে কন্যা মনে করতেন। ‘তনয়া প্রতিমাষু’ বলে চিঠি দিতেন। খুবই ভালবাসতেন আমাকে। তিনি আমার সত্যেন দত্তের উপরে আমার এম.এ ক্লাসের যে লেখা, সেটার উনি প্রদর্শক ছিলেন আর কি। গাইড।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: তাছাড়া সত্যেন রায় বলে একজন শান্তিনিকেতনে ছিলেন। রবীন্দ্র-অধ্যাপক হয়েছিলেন শেষে। সত্যেন রায়ের সঙ্গেও আমার ভাল যোগাযোগ ছিল। উনি আমাকে কেন জানি না, ভীষণ পছন্দ করতেন।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: এবং বলতেন যে, আপনার যোগ্য কাজ এটা নয়, আপনি ইতিহাস লিখছেন কেন? ইতিহাসের মধ্যে আপনি যাবেন না। আপনি ভেতরে প্রবেশ করবেন। উনি আমার রবীন্দ্র সঙ্গীতের ভাব-সম্পদ-এর লেখা নিয়ে একটা ইয়ে করেছিলেন, আমি বলেছিলাম আমি ছ’মাসের মধ্যে লেখাটা শেষ করব। উনি বলেছিলেন, ‘আপনি কক্ষনো পারবেন না’। আর আমি বললাম, আমি অবশ্যই পারব। উনি বললেন, ‘বেট ! ঠিক আছে আপনি যদি পারেন, আপনাকে আমি খাইয়ে দেব। আর আপনি যদি না পারেন, আপনি আমাকে খাওয়াবেন। তারপরে আমার শেষ হল আসলে সাত মাসে।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: তখন তার কাছে গিয়ে যখন আমি ঘোষণা দিলাম, আমি পেরেছি কিন্তু এক মাসের জন্য হেরে গেছি। (হাসি)।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা। (হাসি)
সনজীদা খাতুন: উনি তখন আমাকে বললেন যে, ‘শুনুন সাত মাসে লেখাটাও যে সে কথা নয়। আমি আপনাকে খাওয়াব। তারপরে কি বলব, যাকে বলে ষোড়শ উপাচারে আমাকে খাইয়েছেন। (হাসি)। আমার এক বান্ধবীশুদ্ধ। সুতপা ভট্টাচার্য। তিনিও লেখেন টেখেন। কবিও বটে।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: শান্তিনিকেতনে আমার সত্যেন রায় মহাশয়ের সাথে কথাগুলো এত ভাল লাগত, আর আমি একটা লেখা লিখেই তার কাছে চলে যেতাম শোনাতে।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: আরেকজন ছিলেন অসিত ভট্টাচার্য। তিনি হেল্ডেনের সেক্রেটারী ছিলেন এক সময়, কলকাতায়।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: উনিও একজন বেশ বড়সড় বুদ্ধিজীবী। মারা গেছেন এখন। তার স্ত্রী শান্তা ভট্টাচার্য। ইংরেজীর অধ্যাপিকা ওখানে। আমি হয়ত রাতে একটা কিছু লিখেছি বা একটা কিছু মাথায় এসেছে সেটা নিয়ে রাস্তা দিয়ে গান গাইতে গাইতে ওঁর বাড়ি চলে যেতাম। গিয়ে লেখাটা শুনাতাম। কিংবা আমার কথাগুলো, আলোচনার বিষয়গুলো তুলতাম, তর্ক হত। এরকম বহুজনের সাথে আমার সেখানে যোগাযোগ ছিল।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা, গান আপনার প্রধানতম এলাকার একটি, আপনি নানানরকম কাজ করেছেন, এখনও করছেন। তো, গানের ক্ষেত্রে মানে গায়কীর কারণে হোক বা অন্য, কন্ঠের নানান রকম ঐশ্বর্যের কারণে হোক মানে ঈর্ষা বোধ করেন কি না, যে…? ঈর্ষা এই অর্থে যে, পজিটিভ অর্থে, আমি নিন্দার্থে বলছি না।
সনজীদা খাতুন: না, আমি বুঝেছি।
রাজু আলাউদ্দিন: রবীন্দ্র সংগীতের কোন কোন শিল্পীর প্রতি আপনার …
সনজীদা খাতুন: আমার বিশেষ আকর্ষণ হচ্ছেন নীলিমা সেন।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: উনি আমাকে খুব স্নেহও করেছেন আর আমি ওঁকে অনেক শ্রদ্ধা করেছি। বহু গান শুনেছি যে সব গান আর কারো কন্ঠে আমার কানে প্রবেশ করে না। আরেক জন হলেন কণিকা বন্দোপাধ্যায়। এক নম্বর যদি বলি নীলিমা সেন, দু’নম্বর কণিকা বন্দোপাধ্যায়। যেমন কন্ঠ-সম্পদ এঁদের, তেমনি বিশেষ করে নীলিমা সেনের, উপলব্ধির গভীরতা।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: নীলিমা সেনের স্বামী অমিয়কুমার সেন। তিনিও একজন বড় বুদ্ধিজীবী ছিলেন। তার সঙ্গেও আমার ভাল সম্পর্ক ছিল। আর কণিকা বন্দোপাধ্যায়ের স্বামী বীরেন্দ্র বন্দোপাধ্যায় লাইব্রেরীর ডেপুটি লাইব্রেরীয়ান ছিলেন।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: তিনি তো আমার জন্যে যা করতেন সে বলবার নয়। ওভারনাইট ইস্যু করে দিতেন বই। সারারাত বাসায় নিয়ে গিয়ে পড়তাম। পড়ে সকাল বেলায় ফেরত দিয়ে যেতাম। আর বিশেষ করে ছুটির আগের দিন নিতাম। যাতে একটু বেশি সময় পাই। গিয়ে জমা দিতে পারি। খুব স্নেহ করতেন এবং তারা সাহায্য করেছেন আমাকে অনেক।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা। তো, সুচিত্রা মিত্রের নাম আপনি বললেন না।
সনজীদা খাতুন: সুচিত্রা মিত্রও আমার প্রিয়। বিশেষ করে তার প্রথম দিককার গানের, ‘জীবন যখন শুকায়ে যায়’, ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে’, ‘আগুনের পরশমণি’, তারপরে … ‘আজ তারায় তারায় দীপ্ত শিখার অগ্নি জ্বলে’। তার ওই সব গান আমার খুব ভাল লাগত।
রাজু আলাউদ্দিন: ভানু সিংহের যে কয়েকটি গান গাইলেন উনি, ওগুলো আপনার তেমন ভাল লাগে নি ?
সনজীদা খাতুন: মরণ রে তুঁহু মম…. হ্যাঁ, আমার ভীষণ প্রিয়।
রাজু আলাউদ্দিন: আমার কাছে তো মনে হয় যে এই গানটি উনি ছাড়া আর কারো কন্ঠেই মানে এত অ্যাপেলিং . .
সনজীদা খাতুন: হ্যাঁ, এমন লাগে নি। বিশেষ করে সেটা আমাদের অল্প বয়সের বলে। পরে কিন্তু কণিকা বন্দোপাধ্যায়ও গেয়েছেন কিন্তু কণিকা বন্দোপাধ্যায়ের গানে সুরে একটু তফাৎ আছে ওঁর সাথে।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: তো সেটা আমার নিতে একটু কষ্টই হয়। আসলে এ গানটার কথা বলা উচিৎ ছিল। সুচিত্রাদির গাওয়া, তার মধ্যে একটা যেন কী ছিল, আমি ঠিক বলতে পারব না যে ঠিক কী, কিন্তু খুবই ভাল লেগেছিল।
রাজু আলাউদ্দিন: উনি তো অসাধারণ গায়।
সনজীদা খাতুন: আর কণিকা বন্দোপাধ্যায়ের গাওয়ার মধ্যে একটা আছে, ওঁর সাঙ্গীতিক দক্ষতাটা বেশি। কণিকা বন্দোপাধ্যায় সাঙ্গীতিক দক্ষতায় অনন্য। কিন্তু সুচিত্রাদির গাওয়ার মধ্যে বিশেষ করে ওটা আমরা প্রথম শুনেছি তো তাঁরই কন্ঠে, ওটা আমার কাছে অবিস্মরণীয় লাগে। আর আমি ঠিক এটা গাইতে পারি না, নিজে গাইলে আমি সুচিত্রদিরটাই গাইব।
রাজু আলাউদ্দিন: আর কণিকার কিছু কিছু ওনার কন্ঠে গাওয়া, এটা কেন জানি হয় যে … যেমন দেবব্রত বিশ্বাসের কন্ঠে এমন কিছু গান আছে যেগুলো শুধুমাত্র ওনার কন্ঠেই ভাল লাগে। অন্য কেউ আরও বেশি কন্ঠমাধুর্য্যসহ বা সাঙ্গীতিক দক্ষতাসহ গাইলেও মনে হয় যেন এই গানটি ওনার মত করে কেউ গাইতে পারবেন না।
সনজীদা খাতুন: এগুলো হচ্ছে আমাদের দুর্বলতা হয়ে যায়।
রাজু আলাউদ্দিন: তাই না ?
সনজীদা খাতুন: হ্যাঁ, অবশ্যই। স্মৃতির সাথে জড়িয়ে যায়।
রাজু আলাউদ্দিন: এটা ভাল বলছেন। হয়ত …
সনজীদা খাতুন: হ্যাঁ, স্মৃতির সাথে খুব জড়িয়ে যায়।
রাজু আলাউদ্দিন: হয়ত প্রথমে শোনা এবং ওইটা মনে গেঁথে থাকে এবং ওইটা দিয়েই আসলে কমপেয়ার করতে চাই যে হচ্ছে …
সনজীদা খাতুন: হ্যাঁ, যেমন পঙ্কজ মল্লিকের গাওয়া ‘সঘন গহন রাত্রি’। কারো গলায় শুনে ভাল্লাগবে না। কিংবা ওই যে আরেকটা গান আছে না… ‘বর্ষণ মন্দ্রিত অন্ধকারে এসেছি’। পঙ্কজ মল্লিকের যে উপলব্ধির ক্ষমতা …
রাজু আলাউদ্দিন: হ্যাঁ।
সনজীদা খাতুন: সে তো বিস্ময়কর। আমি একটা… মানে তার জীবনীতে পড়েছি, খুব লম্বা হয়ে যাচ্ছে আমার কথাবার্তা …
রাজু আলাউদ্দিন: বলেন। কোনো সমস্যা নাই।
সনজীদা খাতুন: পঙ্কজ মল্লিক লিখেছেন, ‘উনি রবীন্দ্রনাথের একটা কবিতা পেলেন, ‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে’, উনি কবিতাটা দেখে দেখে গাইছেন।
রাজু আলাউদ্দিন: জি।

সনজীদা খাতুন
: এমন সময় পেছন থেকে একজন কে বলে উঠল, ‘এই এই জায়গাটা ভুল করেছ, এই জায়গাটা এরকম না’। তিনি চমকে উঠে বললেন, ‘আমি তো এ গানটা শিখিনি কারো কাছে। আমি নিজের মনে গাইছি’।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: কতটা ক্ষমতা ছিল যে রবীন্দ্রনাথ যে সুর দিয়েছেন তার কাছাকাছি উনি গেয়েছেন!
রাজু আলাউদ্দিন: না জেনেই?
সনজীদা খাতুন: না জেনেই। হ্যাঁ। এবং তার যে সুর দেওয়া রবীন্দ্রনাথের গান … ‘দিনের শেষে ঘুমের দেশে ঘোমটা পরা ওই ছায়া’, খুব ভালো লাগে। কিন্তু ওটা তো রবীন্দ্রসংগীত, ঠিক না?
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: ওটার সুরটা পঙ্কজের। পঙ্কজের দেয়া সুর। এবং রবীন্দ্রনাথ যখন এত প্রশংসা শুনছেন ওই গানের, তিনি পঙ্কজকে ডাকলেন ওই গান শোনার জন্য। দীনেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাকে নিয়ে গেছেন। একদিন তিনি সিঁড়ি পর্যন্ত গিয়ে একছুটে পালিয়ে গেছেন।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা। কেন?
সনজীদা খাতুন: ভয় পেয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের কাছে এটা তিনি শোনাবেন কেমন করে!
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: তারপর আরেক দিন আবার তাকে দীনু ঠাকুর ধরে টরে নিয়ে গেছেন। তখন রবীন্দ্রনাথ বললেন গাইতে। তিনি গাইলেন। তো রবীন্দ্রনাথ তার গানটা শুনলেন। শুনে বললেন, বেশ হয়েছে, ওহ না, রবীন্দ্রনাথ গানটা শুনে কিচ্ছু বলেন নি বলে পঙ্কজের প্রাণ একবারে উড়ে গিয়েছিল।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তখন সমস্তটাকে ভেতরে নিচ্ছেন।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা। আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: তারপরে ডেকে পাঠালেন। ডেকে পাঠিয়ে বললেন যে দেখ, কবিতাতে আছে, ‘ফুলের বার নাই কো যার, ফসল তার ফললো না বা ফসল যার ফললো না’। উনি বললেন, সুরে যদি তুমি এটাকে ‘ফুলের বাহার নাই কো যাহার, ফসল যাহার ফললো না’ করো তাহলে শুনতে অনেক ভালো হবে।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: পঙ্কজ কিন্তু সেরকম করে নিয়েছিলেন।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা। আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: এই সব ব্যাপার আছে। কিন্তু পঙ্কজের ক্ষমতা কতটা যে সুর দিয়ে রবীন্দ্রনাথকে আকৃষ্ট করতে পেরেছেন তিনি। রবীন্দ্রনাথ মেনে নিয়েছিলেন তাকে। এই ঘটনাগুলো এবং তার সাথে আমি বলছি, তার গলার গানগুলো এখন আর কারো গলায় শুনে ঠিক নেওয়া যায় না। আজকাল অবশ্য কিছু কিছু গান আমরা করাই একে ওকে দিয়ে। কণিকা বন্দোপাধ্যায়ের তেমনি, ‘আমি রূপে তোমায় ভোলাব না’ আর কারো গলায় ভালো লাগে না। কিংবা ‘বাজে করুণ সুরে’ অপূর্ব লাগে।
রাজু আলাউদ্দিন: মানে সেটা ওই স্মৃতির কারণেই আপনি বলতে চান?
সনজীদা খাতুন: আমার মনে হয় স্মৃতি। আমরা সেটাকে এমনভাবে ভেতরে নিয়ে ফেলি যে তার থেকে বেরোনো কঠিন হয়। আমার এর সঙ্গেও দেখা হয়েছে, সাবিত্রী কৃষ্ণান, শান্তিনিকেতনে এসেছিলেন, ওঁর সাউথ ইন্ডিয়ান গানগুলো শুনেই তো রবীন্দ্রনাথ এ সব গান লিখেছেন, সুরে বসিয়েছেন।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: তো সেই সাবিত্রী গোভিন্দকে বা সাবিত্রী কৃষ্ণান, ওটা কুমারী বয়সের নাম, গোভিন্দটা বিয়ের পরের নাম। তো তিনি, সাবিত্রীদি একদিন বাচ্চুদের বাসায় বসে বসে গল্প করছেন, ‘মোহর গেয়েছে ওটা না ?’ মোহর মানে কণিকা বন্দোপাধ্যায়। ও কিচ্ছু হয়নি। এটা নিয়ে মহা আপত্তি তার। আসলে যে যে গান থেকে রবীন্দ্রনাথের গানগুলো হয়েছে সে তার মত করে জানে। সে অন্যভাবে নিতে পারবে না। কিন্তু ওঁর কথা শুনে তাই বলে কি আমি ‘বাজে করুণ সুরে–এ গানটাকে ফেলনা ভাবব? ভাবতে পারব না। এরকম অনেক আছে। সাবিত্রী গোভিন্দের গান আমি শুনেছি। অসামান্য। তার নিবেদনও অসামান্য। কিন্তু তাই বলে কণিকা বন্দোপাধ্যায়ের গান তো আগে শুনেছি, সে আর আমি ফেলে দিতে পারি না।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা। নজরুল ও রবীন্দ্র সংগীতের একটা বড় পার্থক্য যেটা আমরা সবাই জানি মোটা দাগে সেটা হচ্ছে যে, রবীন্দ্রনাথের গানের সুর বদলানো যাবে না বা বদলানোর কোনো ইয়ে নাই, আর নজরুল সেই স্বাধীনতা দিতেন।
সনজীদা খাতুন: দিতেন না।
রাজু আলাউদ্দিন: দিতেন না ?
সনজীদা খাতুন: ওঁর প্রথম যে স্বরলিপি তার ভূমিকাতে দেখলে বোঝা যাবে উনি লিখেছেন যে, গানের একটা গঠন আছে। আমি যে সুর করছি তার একটা গঠন রয়েছে। রাগভিত্তিক হতে পারে কিন্তু তার মধ্যে ইচ্ছামত তান যদি প্রয়োগ করা হয় তাহলে গানের সেই সংহতি নষ্ট হবে। সেটা ঠিক না। অল্পস্বল্প করা যায়। কিন্তু অতিরিক্ত করলে সে গানের সৌন্দর্য্য মার খাবে।
রাজু আলাউদ্দিন: উনি বেঁচে থাকতে তো এই পরিবর্তন, মানে অতিরিক্ত পরিবর্তন যেটা, উনার জীবদ্দশায় ঘটেছিল অনেকখানি।
সনজীদা খাতুন: কিছু কিছু ঘটেছে।
রাজু আলাউদ্দিন: মানে উনার সচেতন অবস্থায় …
সনজীদা খাতুন: না, ওঁর আবার কিছু কিছু গান, যেগুলো ফেলে দিতেন, সে সময় কমল দাশগুপ্ত সুর করেছেন। কমল দাশগুপ্তের আরও ভাই ছিলেন কারা জানি, তারা সুর করেছেন।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: কিন্তু উনি সেগুলো অ্যাকসেপ্ট করেছেন। এত গান তো উনি তৈরি করে শেষ করতে পারতেন না। সমানে তো গান রেকর্ড করাতে হত বিভিন্ন জনকে দিয়ে। এমনও হয়েছে একটা সুর হয়ত উনি তৈরি করেছেন কিন্তু যাকে দিয়ে গাওয়াচ্ছেন সে ওটা গাইতে পারছেন না ভালভাবে।
রাজু আলাউদ্দিন: তখন আবার পরিবর্তন …
সনজীদা খাতুন: তখন তিনি ওটা সরল করে দিতেন। রবীন্দ্রনাথেরও এমন কাহিনী আছে। খুব আশ্চর্য। আমি পড়েছি। একবার খালি গলায় গাইতে হবে জোড়ে, মানে সমস্ত হলকে শোনাতে হবে। মাইক্রোফোন তো নেই তখন।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা। হ্যাঁ।
সনজীদা খাতুন: সেই সময়ে একটি গানের চড়ার দিকে… মানে বেশি দূর যায় না এমন অবস্থা ছিল। রবীন্দ্রনাথ তখন ওই থিয়েটার হলের জন্য সুরটাকে চড়িয়ে দিলেন যাতে ওই পর্যন্ত উঠলে সুরটাকে লোকের কান পর্যন্ত পৌঁছয়। এরকম ঘটনাও আছে। আর আমি যে কোথায় কি পড়ি তা তো মনে থাকে না। বিশেষ করে থিসিস করতে গিয়ে অনেক পড়েছি এবং অনেক স্মৃতিকথা। তার মধ্যে আমি বহু এ ধরনের কথা শুনেছি।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: আবার কেউ হয়ত অত উঁচুতে গাইতে পারছেন না, একটু নামিয়ে দিলেন। এমনও করতেন। এবং সবাই নিজের সুর বদলাবার তো অধিকার রাখেন। রবীন্দ্রনাথের যে স্বরলিপি দেখে আমরা এখন গান গাই ওঁর রেকর্ডে তো সেই সুর নেই সেইভাবে। উনি নিজের সুর যদি আরেকভাবে গান কে মানা করবে। এমনকি রবীন্দ্রনাথ যে ‘কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি’ এ গানটি সুর দিয়েছেন, কবিতা, উনি এই কবিতা আবৃত্তি করেছেন রেকর্ডে।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: শুনে দেখি একটা জায়গায় উল্টিয়ে দিয়েছেন। কে বলবে যে রবীন্দ্রনাথ ভুল করেছেন! (হাসি)। এটা তো বলা যাবে না। আমার থিসিসে আমি এসব উল্লেখ করেছিলাম কিছু কিছু।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনি তো নিশ্চয় রবীন্দ্রনাথের কন্ঠে গান শুনেছেন ?
সনজীদা খাতুন: ওই যে রেকর্ডে।
রাজু আলাউদ্দিন: রেকর্ডে। আচ্ছা। কেমন মনে হয় গান শুনে?
সনজীদা খাতুন: আবেগটাকে খুব নিতে পারি। এটাও জানি যে রবীন্দ্রনাথ যখন এই গানগুলো রেকর্ড করেছেন তখন তিনি ঈশ্বরকে বলেছিলেন ‘দত্তাপহারক’, দিয়ে অপহরণ করেছেন। রবীন্দ্রনাথের যে কণ্ঠ ছিল, সে কন্ঠ আর তখন ছিল না। রবীন্দ্রনাথের জার্মানিতে একটা রেকর্ড হয়েছিল ‘দে দোল দোল’ কবিতার।
রাজু আলাউদ্দিন:আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: সেই রেকর্ড আমি শুনেছি। অনেক বোল্ড ভয়েস। আর এখানে শুনি কিনকিনে স্বর।
রাজু আলাউদ্দিন:হ্যাঁ। হ্যাঁ।
সনজীদা খাতুন: তাই না ? কিন্তু গলাটা এইটা যে ছিল না …
রাজু আলাউদ্দিন: অনেকটা কণিকার মতই শোনায়।
সনজীদা খাতুন: কণিকার অল্প বয়সের মত।
রাজু আলাউদ্দিন:অল্প বয়সের কণিকার মত শোনায়।
সনজীদা খাতুন: কিন্তু তাঁর গলা যে এটা ছিল না, তিনি যে লিখেছিলেন ‘আমার কন্ঠ হতে গান কে নিল ভুলায়ে’, সে দুঃখটা তার ছিল। তাঁর আসল গলা এই ‘দে দোল দোল’ ,‘ঝুলন’ কবিতা- ‘আমি পরাণের সাথে খেলিব আজিকে ঝুলন খেলা..’।
রাজু আলাউদ্দিন: ‘মরণ খেলা’ ।
সনজীদা খাতুন: হ্যাঁ। অনেক লম্বা। অনেক বড়, আছে আরও। সেটার আবৃত্তি আমি শুনেছি এবং সে কন্ঠ আমি শুনেছি। কাজেই আমি জানি যে বেচারী তাঁর ঠিক গলায় গানগুলো রেকর্ড করতে পারেন নি। তাঁর ঠিক গলা পাওয়া যাবে যখন সেই পুরনো আমলের সিলিন্ড্রিক্যাল রেকর্ড ছিল তাতে। সেই রেকর্ড একখানা বোধ হয় ছিল আমাদের জয়দেবপুরের রাজাদের বাড়িতে।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা। আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: কিছুই পাই নাই আমরা। জানি না। সেটা তো শুনি নি। কিন্তু আমার মনে হয় এতদিনে বোধহয় রবীন্দ্রনাথের সে সব গান কিছু কিছু উদ্ধার করেছে, রবীন্দ্রভবনে হয়ত আছে। আমি তো এবারে বয়স হয়ে গেছে, তেমন কোথাও যেতে পারি নি। গেলে হয়ত খোঁজ করতাম। কাজেই রবীন্দ্রনাথের কি গলা ছিল আর কি দুর্গতি হয়েছিল যখন তিনি গেয়েছেন, এটা জানি। সেজন্য আবেগটার কথা বললাম। তবে সুর অনেক বদলেছেন, সেও দেখেছি। ‘তবু মনে রেখ’, ‘অন্ধজনে দেহ আলো’ , ‘শেষ পারানির কড়ি কন্ঠে নিলেম’। ‘শেষ পারানির কড়ি’ টা বিশেষ করে বুঝি, স্বরলিপিতে এক রকম আর উনি গাইছেন আরেক রকম।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: এখন স্বরলিপি তো উনি নিজে করতেন না। অন্যেরা করতেন।
রাজু আলাউদ্দিন: কিন্তু উনার নির্দেশে তো এটা হত, নাকি ?
সনজীদা খাতুন: রবীন্দ্রনাথ স্বরলিপির মাঝে ঢুকতেন না। একটা মাত্র কি দু’টো মাত্র স্বরলিপি রবীন্দ্রনাথের হাতে আমরা দেখি। একটা গান বোধ হয় ওই গানটা, ‘উড়েত বান্ধান নাভো’, একটা হিন্দি গান। পাওয়া যাবে গীতবিতানে ছাপা, ‘উড়েত বান্ধান নাভো’ এর নিচে লিখছেন তিনি ‘হৃদয় নন্দন বনে’। স্বরলিপির নিচে নিচে কথাগুলো বসিয়ে উনি বাংলা গানটা বানাচ্ছেন।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা। আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: এরকম আছে তো, কিন্তু উনি নিজে স্বরলিপির চর্চা করতেন না। গানটা গাওয়া হলেই, দীনুকে খবর দাও, দীনু দৌড়ে আসত। গানটা শুনে সুরটা শিখে নিত। ঠিক করে ফেলত। শৈলজারঞ্জনকে খবর দিত, তিনি করতেন। অনাদিকুমার দস্তিদারও এক সময় করতেন, তাকে আবার রবীন্দ্রনাথ পাঠিয়ে দিয়েছিলেন কলকাতায়। তাঁর গানকে আরেকটু ছড়িয়ে দেবার জন্য, ইত্যাদি। আমার কথার তো শেষ হবে না। অনেক কথা (হাসি)।
রাজু আলাউদ্দিন: না, ঠিক আছে। আমি আছি।
রাজু আলাউদ্দিন: গানের সম্পর্কে আরেকটা প্রশ্ন দিয়ে গানের ব্যাপারটা বলতে চাই। সেটা হল যে, গান নিয়ে আপনি নিজে লিখেছেন, অারও অনেকেই লিখেছেন, তারপরও কি আপনার মনে হয় না রবীন্দ্রনাথের সংগীত সম্পর্কে এখনও অনেক কিছু বলার আছে।


সনজীদা খাতুন: অবশ্যই। অনেক কথা বলার আছে। বিশেষ করে ওই যে কথাটা সবাই বলেন না যে, সব কিছু শেষ বা লুপ্ত হয়ে গেলেও শুধুমাত্র গান থাকলেই রবীন্দ্রনাথকে চেনা যাবে। আমি কিছুদিন আগে একটা প্রবন্ধ লিখেছিলাম রবীন্দ্রনাথের গানের দর্শন নিয়ে এবং আমি দেখলাম আমরা কবিতা পড়তে গিয়ে যে সব দর্শনের আলোচনা করেছিলাম সমস্ত আছে গানের মধ্যে।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।
সনজীদা খাতুন: কাজেই শুধু গান দিয়েই তাকে চেনা যায়। এটা আমি বুঝি এবং যেগুলো লেখার দরকার আছে। আমার স্বভাব হল আমি ছোট ছোট লিখি। বড় লিখতে পারি না। আমি সংক্ষেপে যা বলার লিখেছি এবং এই কথাগুলো নিয়ে আমি আমার শিক্ষকদেরকেও বলেছি। কিন্তু এই ধারাতে কাজ রবীন্দ্রসংগীত নিয়ে হচ্ছে বলে আমি দেখতে পাই না। মাঝে মাঝে ওরা আমাকে ধরে নিয়ে যায় মিউজিক কলেজে, সেখানেও আমি দেখতে পাই যে ওই দু’ঘন্টা এক ঘন্টায় কিছু বলা হয় না। প্রচুর কথা আছে। তো সেগুলো যদি বলা যেত বা লেখা যেত, আমার আজকাল লেখার ধৈয্য অনেক কমে গেছে। এত রকমের কাজ আমার ছায়ানটের করতে হয়। যত রকমের চিঠি দেখে দেয়া, পত্রিকা, হেন তেন- এই করতে করতে আমার সময় পার হয়ে যায়। সারাদিন কাজ করতে পারি না তো। দুপুরে বিশ্রাম করতে হয়, রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমাতে হয়। এই আর কি অসুবিধা। লেখা দরকার ছিল।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর প্রায় সত্তর বছর পার হল, তাই না?
সনজীদা খাতুন: বোধ হয়। অংক পারি না মোটামোটি।
রাজু আলাউদ্দিন: উনি তো মারা গেলেন ১৯৪১ সালে, না…
সনজীদা খাতুন: হ্যাঁ। ৪১ এ।
রাজু আলাউদ্দিন: তা হলে কত ? সত্তর হবে।
সনজীদা খাতুন: আচ্ছা।
রাজু আলাউদ্দিন: এবং জন্মের ১৫০ বছর। মানে আমি বলতে চাচ্ছি এটা যে একটা দূরত্ব আমাদের মাঝে তৈরি হয়ে গেছে সময়ের দিক থেকে।
সনজীদা খাতুন: হুঁ। নিশ্চয়ই।
রাজু আলাউদ্দিন: তাকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অামাদের এখন অনেক বেশি নিরাবেগ, অনেক বেশি ক্রিটিক্যাল জায়গা থেকে দেখার মত এক রকম দূরত্ব আমরা পেয়ে গেছি। তাই না ?
সনজীদা খাতুন: হু।
রাজু আলাউদ্দিন: তো এই দূরত্বে আসার পরে রবীন্দ্রনাথকে আসলে কতখানি প্রাসঙ্গিক মনে হয় এখন আমাদের কাছে?
সনজীদা খাতুন: আমাদের কথাটা তো খুব মুস্কিলের। আমরা যারা রবীন্দ্রসংগীতের সাথে যুক্ত এবং তার ভেতরটা খুঁজবার চেষ্টা করছি তাদের কাছে তিনি অবশ্যই প্রাসঙ্গিক। তার মত আধুনিক আমি তো আমার জীবনে খুঁজে পাই নি। আর সবার কথা বলতে গেলে এখন তো রবীন্দ্রনাথকে ভেঙে খাওয়ার খুবই চেষ্টা চলছে। রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে ফিউশন মিউজিক, রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে যে যার মতো গাওয়া, পাবলিক যেভাবে খাবে, সেভাবে তাকে উপস্থাপন করা। ভালো ভালো শিক্ষকের কাছে শিখেছেন গান অনেকে কলকাতাতে, কিন্তু তারা গান গাইবার সময় কোনটা পাবলিকের কাছে পৌঁছবে সেটা বুঝে গান গাইছেন। এখানে রবীন্দ্রনাথের গান কিন্তু পূর্ণভাবে পরিবেশিত হয় না। রবীন্দ্রনাথের গানটা রবীন্দ্রনাথের, কিন্তু আমি যখন গাইবো–সেই উপলব্ধিটা আমার ভেতরে আসবে, আমি আমার মতো করে সেটা প্রকাশ করবো। এটা তো হচ্ছে না। এই যে দিনকে দিন চটুল চাহিদা অনুযায়ী চলছে, যারা করছে তাদের কথা আর কী বলবো! অবশ্য আমি মনে করি এ সমস্ত সাময়িক, এগুলো কিন্তু থাকবে না। এগুলো ক্রমেই ঝরে যাবে। কারণ এখন রবীন্দ্রনাথের স্বত্ব নেই, কাজেই যে যার মতো ব্যবহার করছে এবং তাতে করে যে একটু হইচই হচ্ছে তাতে ওরা আনন্দ পাচ্ছে। ক্রমে এরা ঝিমিয়ে পড়বে। রবীন্দ্রনাথ দুঃখ করে বলেছিলেন, বাবা, তোমার যে সৃষ্টিক্ষমতা তা দিয়ে নতুন সৃষ্টি করনা! আমার গানের উপর নতুনত্ব আরোপ করার কী প্রয়োজন? সে কথাটা আমরাও বলি, এবং আমি মনে করি, এই যা কিছু হচ্ছে, এগুলো সব হুজুগে ব্যাপার। এ গুজুগ থেমে যাবে। রবীন্দ্রনাথ যা আছেন তাই থাকবেন এবং সেইভাবেই তাকে আমরা উপলব্ধি করার সুযোগ পাবো। কালতো নিরবধি। এই কাল তাকে আবিষ্কার করে নেবে—কোনো সন্দেহ নেই এতে।

রাজু আলাউদ্দিন: লেখালেখির পাশাপাশি আপনি অনেকগুলো সংগঠনের সাথে আছেন, একটা সময়ে ছিলেন যেমন ব্রতচারী আন্দোলন…
সনজীদা খাতুন: আমি অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে তার সাথে আছি…
রাজু আলাউদ্দিন: যেমন কাজী মোতাহার হোসেন ফাউন্ডেশন…
সনজীদা খাতুন: হ্যাঁ, আমার বাড়িতেই সব হয়।
রাজু আলাউদ্দিন: এবং এই ছায়ানট।
সনজীদা খাতুন: এবং জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মেলন পরিষদ। এবং এই চারটেই আমি অত্যন্ত মন দিয়ে করি। এবং ছায়ানটের অন্তর্ভুক্ত নালন্দা বিদ্যালয়ের সাথে্ও সব কাজে আমি আছি।

রাজু আলাউদ্দিন: নালন্দা, একেবারেই ভিন্ন ধরনের একটি স্কুল আপনি তৈরি করেছেন। তো এই সংগঠনগুলো পরিচালনা করতে গিয়ে আপনার লেখার সময় নিশ্চয়ই অনেক সংকুচিত হয়ে আসে…
সনজীদা খাতুন: খুব সংকুচিত হয়েছে…
রাজু আলাউদ্দিন: এজন্য আপনার কোনো অনুতাপ বোধ হয় কিনা?

সানজীদা খাতুন: কাল বা পরশু আমি কাউকে বলছিলাম যে আমি তো নিজে কিছুই করতে পারলাম না। তো একজন বলে উঠলেন—পবিত্র সরকার—কিন্তু আপনি যেটা করে গেলেন, তার মূল্য তো কিছুমাত্র কম না, এটাও তো একটা সৃষ্টি হয়ে গেছে। এই কথা বলছেন, তবে আমার মনে, মাঝেমাঝে হয় যে এত জড়িয়ে গেলাম… ভেবেছিলাম ছায়ানট ছাড়া কিছুই করবেন না। কিন্তু জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত পরিষদ আমাকে করতে হলো প্রথম থেকে। তারপর ব্রতচারীর জন্য একজন এসে আমাকে বললো, তখন মনে হল সত্যিই এই জিনিসটা হওয়া দরকার। স্কাউট হয় বিদেশি ধারার, তাহলে ব্রতচারী হবে না কেন? এটার সাথে খুব জড়িয়ে গেলাম। আর কাজী মোতাহার হোসেন ফাউন্ডেশন…এ ব্যাপারে আমি খুব আগ্রহী ছিলাম না। বাবাকে নিয়ে মেয়ে কিছু করবে-এটা আমার ভাবতে ভাললাগে না। কিন্তু এ কে মহসীন, ইতিহাসের অধ্যাপক, বেশ প্রবীন—আমার ছোট ভাইতো সম্পর্কে, কাজেই এরকম করে বলছি। মহসীনই সবচেয়ে আগ্রহ নিয়ে চেষ্টা করে গড়ে তুলেছিল। ওই প্রথম সেক্রেটারি, আমি তখন প্রেসিডেন্ট। এখন আস্তে আস্তে মহসীন অনেক কম পারছে, কারণ তার সাংসারিক নানা দুর্যোগ গেছে আর আমাদের পাঁচ বছর পর পর বদল হয়। তবে আমাকেই সবকিছু মনে রাখতে হয়। এখনকার আমাদের যে সম্পাদক, কাজী রওনাক হোসেন, আমার চাচতো ভাই, ও বেশ মন দিয়ে কাজটা করে।যত সভা, যা কিছু, সব কিন্তু আমার বাসায় হয়। এখানে জন্মদিন পালন করা হয় এবং মৃত্যুদিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্ট্যাটিকস ডিপার্টমেন্টের সাথে মিলে আমরা (কাজী মোতাহার হোসেন) ফাউন্ডেশন একসাথে একটা স্মারক বক্তৃতা এবং অনুষ্ঠান করি, অনুষ্ঠান বলতে ছাত্রদের সবাইকে বসিয়ে—অনার্সে প্রথম, এমএতে প্রথম—তাদেরকে কিছু উপহার দেই। এসব করে আমাদের কাজ চলছে, এসব করতে গিয়ে আমারতো খানিকটা সময় যায়-ই। কিছু করবার নেই। এগুলো ছাড়া আবার থাকতে্ও পারিনা।
রাজু আলাউদ্দিন: ফলে কোনো অনুতাপ আপনার নাই। কেননা…

সনজীদা খাতুন: কাজের আনন্দেও থাকি।
রাজু আলাউদ্দিন: কিছু না করে তো আর বসে নেই আপনি।
সনজীদা খাতুন: সেটা তো আমি পারবোই না।
রাজু আলাউদ্দিন: আমি ভেবেছিলাম রবীন্দ্রবিষয়ক আর কোনো প্রশ্ন আপনাকে করবো না। কিন্তু এখন দেখছি আমার দিক থেকে জরুরী দুয়েকটা প্রশ্ন রয়েই গেছে…
সনজীদা খাতুন: দু একটা? তাড়াতাড়ি তাড়াতাড়ি।
রাজু আলাউদ্দিন: ঠিক আছে । যেমন একটা হচ্ছে, আপনি আপনার এই বই রবীন্দ্রসংগীত মননে লালনে—এখানে একটা প্রবন্ধে বলেছেন, নিটশের উদ্ধৃতি দিয়ে যে মানুষের প্রবণতার দুটো দিক উনি উল্লেখ করেছেন বা দুটো দিককে উনি চিহ্নিত করেছেন। একটা হচ্ছে এপোলিনিয়ান ধারা, আরেকটা হচ্ছে ডাওনিসিয়ান ধারা। এপোলিনিয়ানটা হচ্ছে একটু শান্ত প্রশান্ত মেজাজের মানুষের যে বৈশিষ্ট। আরেকটা হচ্ছে উচ্ছ্বল। রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে আপনি বলেছেন যে রবীন্দ্রনাথে এই ‍দুয়ের সমন্বয় ঘটেছে। আমার কেন জানি মনে হয়, উনি যতটা না ডাওনিসিয়ান তার চেয়ে বেশি এপোলিনিয়ান।
সনজীদা খাতুন: ঠিকই।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনি সমন্বয়টা কোথায় দেখতে পান?
সনজীদা খাতুন: আমি সমন্বয়টা দেখি… রবীন্দ্রনাথের কিছু ছবি আছে, একসাথে খেতে বসেছেন, বোধহয় শ্রাদ্ধানুষ্ঠান বা কিছু ছিল, উনি অন্যের দিকে তাকিয়ে একটা কিছু কৌতুক করে গ্রাসটা মুখে তুলছেন। সেই যে কৌতুকের, চোখের ভাব, তার থেকে বুঝি ওর ভেতরে বেশ একটা উচ্ছ্বলতা এবং কৌতুক অনুধাবন করবার ক্ষমতা ছিল। এবং দেখি যে কিছু কিছু গান আছে অত্যন্ত উচ্ছ্বল। তিনি নিজে নাচতে ভালোবাসতেন, বাউলদের ঢঙে নাচতেন। এই যে সবকিছু মিলিয়ে তার মধ্যে, দুটো ধারাই আমরা তার গানের মধ্যে লক্ষ্য করি: উচ্ছ্বল এবং প্রশান্ত। এদুটো দেখি বলেই আমি বলেছি কথাটা এবং দেখবো উচ্ছ্বল গানের ভেতরে ভেতরে প্রশান্তি ছড়ানো থাকে। আবার যেগুলো প্রশান্ত, তার মধ্যে কোথায়্ও কোথায়্ও চঞ্চলতা চলে আসে। এজন্য আমার কাছে মনে হয়েছে দুটো মিলিয়ে রবীন্দ্রসংগীত। এবং দুটো দিকই বুঝা দরকার। আমার ছোটবেলায় একটা ব্যাপার ছিল, অল্প বয়সে আমি বড্ড টেনে টেনে গান গাইতাম, ভাবে বিভোর হয়ে যেতাম; এটা নিয়ে আমার বাবা খুব বিরক্ত হতেন এবং সৈয়দ মুজতবা আলী একবার আমার বাবাকে ভেঙিয়ে দেখিয়েছিলেন ও এরকম করে গায়। ‘সেই ভালো সেই ভালো / আমারে না হয় না জানো’—এটা কানন দেবীর গা্ওয়া আছে। গান আমি স্বরলিপি থেকে তুলিতো, ‍তুলে আমি আমার মতো ‘সেই ভালো সেই ভালো/ আমারে না হয় না জানো’—খুব গাইছি। টেলিভিশনে গেয়েছিলাম। উনি দেখে আমার বাবাকে বললেন, ও এরকম করে গায় কেন, টেনে টেনে? এর মধ্যে তো একটা আনন্দ আছে। এর মধ্যে এই ভাবটা আছে: তুমি না হয় না-ই জানলে আমায়—তাই ভালো এবং সেটা বলার মধ্যে একটা প্রিয়জনকে যে কথাটা বলছে, অনেকগুলো কথা আছে: দূরে গিয়ে নয় দুঃখ দেবে, কাছে কেন লাজে লাজারুণ। দুটো ‍দিকই আছে: দূরে গিয়ে দুঃখ দেবে, কাছে এসে তাকে লজ্জা দিয়ে লাজারুণ করবে। দু রকমের কথাতো এর মধ্যে। তো সেটার মধ্যে অত বিষাদ না রেখে, অত টেনে না গেয়ে…. এই যে ছন্দের কথা বলি, সেই ছন্দটা আমার বাড়ানো দরকার ছিল। আমি সেটা করতাম না। এই দুটো জিনিসকে উপলব্ধি করবার একটা ব্যাপার আছে। কথার মধ্যেই সুরে আমার কোনো কোনো গানকে মনে হতে পারে, যেমন একটা গানের কথা বলি—আমার তো কথা বড্ড বেশি—অসীম ধন তো আছে তোমার/ তাহে সাধ না মেটে/ নিতে চা্ও তা আমার হাতে কনায় কনায় বেধে/ দিয়ে রতন-মনি আমায় করলে ধনী/ এখন দাঁড়িয়ে এসে দেখ দাড় এটে—কৌতুক না ঈশ্বরের সঙ্গে? এখন তুমি আমার কাছে ভিক্ষা চাইতে এসছ? দেবো না। তারপরে আমায় তুমি করবে দাতা, আপনি ভিক্ষু হবে? বিশ্বভুবন হাসি মাতলো যে তাই হাসির কলরবে। তুমি রইবে না ঐ রথে/ নামবে ধুলা-পথে/ যুগ যুগান্ত আমার সাথে চলবে হেটে হেটে।–ঈশ্বরকে তিনি এইভাবে বলছেন। একটা কৌতুকের ভঙ্গি আছে।
রাজু আলাউদ্দিন:এটা ঠিক। কিন্তু আমার কাছে যেটা মনে হয়, অনেক বেশি প্রশান্ত বক্তব্য।
সনজীদা খাতুন: সুরে সেটা মনে হবে আরও।
রাজু আলাউদ্দিন: আমি যেটা বলবো, আমি কমপেয়ার করতে চাচ্ছি এইভাবে যে যদি তার বিপরীতে নজরুলকে আমরা দেখি, তাহলে নজরুল হচ্ছে একটা পারফেক্ট ডায়নিসিয়ান।
সনজীদা খাতুন: হ্যাঁ, এই ভাবটা আছে।
রাজু আলাউদ্দিন: আর হ্যাঁ, রবীন্দ্রনাথে আপনি যেটা বললেন, এই কৌতুকগুলো আছে। সেখানে আসলে শেষ পর্যন্ত ডমিনেটিং হচ্ছে…
সনজীদা খাতুন: প্রশান্তি…
রাজু আলাউদ্দিন: এপোলিনিয়ান। ঐ অর্থে আমার প্রশ্নটা এসেছিল।
সনজীদা খাতুন: কথাটা বোধহয় এক দিক থেকে বেঠিক না। আবার নজরুলে কি প্রশান্ত গান নেই? ‘শুভ্র সমুজ্জল হে চির নির্মল শান্ত অঞ্চল ধ্রুবজ্যোতি।’
রাজু আলাউদ্দিন: কিন্তু ঐটা তার প্রধান প্রবণতা না।
সনজীদা খাতুন: প্রবণতা না।
রাজু আলাউদ্দিন: ঐটা হচ্ছে দলছুট একটা প্রবণতা।
সনজীদা খাতুন: এ রকম ‍কিছু আছে।
রাজু আলাউদ্দিন: আমার তাই মনে হয়। সে জন্যই ঐ প্রসঙ্গটা এলো ।
সনজীদা খাতুন: ঠিকই। কথাটা আমি মানি।
রাজু আলাউদ্দিন: থাঙ্ক ইউ। আরেকটা জিনিস যেটা মনেহয় এই সূত্রে: যদি রবীন্দ্রনাথকে ডায়নিসিয়ান বলা যায় তাহলে সেটা সম্ভবত, আমার মনে হয়, চিত্রকলার ক্ষেত্রে ছিল অনেক প্রবল।
সনজীদা খাতুন: হ্যাঁ, ঠিক। খুব ঠিক কথা।
রাজু আলাউদ্দিন: কারণ ঐখানে উনি আর কিচ্ছু মানেন নি। ঐখানে উনি বাঁধ ভেঙে ফেলেছেন, কোনো লজিক, কোনো কিছু দিয়ে নিজেকে আর আটকে রাখেননি।
সনজীদা খাতুন: ছন্দ, খালি ছন্দের ভেতরে দিয়ে যেতে গিয়ে কখনো আনন্দ, কখনো উচ্ছ্বলতা—সবই আছে।
রাজু আলাউদ্দিন: এবং যে কারণে…রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে এখনতো ওই রকমভাবে আর উচ্ছাস নেই, যেটা একটা সময় ছিল…
সনজীদা খাতুন: উচ্ছাস আবার আসছে…
রাজু আলাউদ্দিন: যদি আসে, সেটাতো ভালো । রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে ষাটের দশকে লেখা একটি প্রবন্ধ যেটার কথা আপনি জানেন…
সনজীদা খাতুন: অক্টাভিও পাজ..
রাজু আলাউদ্দিন: হ্যাঁ, অক্টাভিও পাজের… রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলার উপর তিনি প্রধানত জোর দিয়েছিলেন। উনি বলেছেন রবীন্দ্রনাথের অনেক কবিতা আজকাল পড়লে হাসি আসে…
সনজীদা খাতুন: হাস্যকর মনে হয়…
রাজু আলাউদ্দিন: সেটা অনেকটাই সত্যি, কিন্তু চিত্রকলায় তার যে গুরুত্ব সেটাকে উনি…
সনজীদা খাতুন: আধুনিকতা…
রাজু আলাউদ্দিন: আধুনিকতা, অনেক বেশি সমকালীন মনে হচ্ছে আমাদের কাছে।
সনজীদা খাতুন: হ্যাঁ, চিত্রকলায় খুব বেশি আর কি। তবে আমি যে বলছিলাম না উচ্ছলতা… একটা গান আছে, শিবের তাণ্ডবের প্রতি ওনার একটা আকর্ষণ ছিল, ‘পিণাকেতে লাগে টঙ্কার, বসুন্ধার পঞ্জরতলে কম্পন জাগে শঙ্কার’। এইসব কিছু গান আছে যেগুলোতে… যেহেতু উনি বলছেন পিনাকের কথা, শিবের কথা—এরকম কিছু আছে। তবে এটা অপ্রধান—এটা ঠিক।
রাজু আলাউদ্দিন: খুবই নিহিত একটা জায়গা থেকে লেখা।
সনজীদা খাতুন: আসলে ছন্দ প্রসঙ্গে কিন্তু…তার মধ্যে তাণ্ডবও আছে, লাস্য্ও আছে। এই দুটো প্রসঙ্গ তার ছন্দের মধ্যে অনেক জায়গাতে খুঁজে পাব। ‘পারবি নাকি যোগ দিতে এই ছন্দেরে খসে যাবার ভেসে যাবার মরবার এ আনন্দেরে’ মৃত্যু আর জীবনতো তার কাছে প্রায় সমার্থক। সমার্থক । কাজেই এই ছন্দে তুমি মেতে ওঠ। ‘বিশ্ব বীনা রবে বিশ্বজন মজিছে’। এই যে কথাগুলো : স্থলে জলে নভতলে, বনে উপবনে নদী তীরে গিরিগুহা পারাবারে নিত্য জাগে নৃত্যরস ভঙ্গিমা’। নিত্য সংগীত এবং নৃত্য—এ দুটোর কথা উনি খুব্ বলেছেন অনেকগুলো গানে। একটা গান আছে, সেটা হচ্ছে—সুচিত্রাদির গা্ওয়া, এটা্ও অসামান্য গা্ওয়া তার—‘নৃত্যের তালে তালে হে নটরাজ/ ঘুচা্ও ঘুচা্ও সকল দ্বন্দ্ব’। নটরাজের নৃত্যকে তিনি এমনভাবে দেখেছেন, সেটা যেমন সুর জাগাচ্ছে, ছন্দ জাগাচ্ছে, তেমনি ধ্বংস নিয়ে আসছে। এই ধ্বংসকে তিনি কিন্তু সব সময় নিয়েছেন। এই শিবের কথাটা নজরুলেও খুব বেশি।

রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা, শেষ প্রশ্ন হল সানজীদা আপা, আপনি একটি বিরল সম্মানে ভূষিত হয়েছেন (দেশিকোত্তম..)। আমার ধারণা বাংলাদেশে আপনিই একমাত্র লেখক বা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব যিনি এই পুরস্কারটি পেয়েছেন এই প্রথমবারের মত। তো কেমন লাগছে আপনার এই পুরস্কার পেয়ে?
সনজীদা খাতুন: আমার তো, আমি সবাইকেই বলেছি এই পুরস্কারটা…

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (5) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বুলবুল সরওয়ার — জুন ২৮, ২০১৫ @ ২:০৪ পূর্বাহ্ন

      ভালো লাগলো। তবে অনেক ক্ষেত্রেই জটিলতা, অস্পষ্টতা ও স্ববিরোধীতা আছে। মোতাহার হোসেন চৌধুরীর পরিবারের মধ্যে এটা একটা অবাক ব্যাপার–আমি কাজী আনোয়ার হোসেনের মধ্যেও এটা দেখতে পাই–যদিও তাকেই আমি অন্যতম গুরু মানি। এঁরা সবাই ধৈর্যশীল এবং সৃষ্টিশীল। আমি মুগ্ধ, তবে যুক্তির পারম্পর্যহীনতা আমাকে ক্লান্ত করে। রাজু আলাউদ্দীন গুণী মানুষ- সেই আপ্লুততার জন্যই ওরিয়ানা ফালাচীর টেকনিকটা দেখা গেল না- থাকলে আরো আনন্দ হতো। আবশ্য তার জন্য পাত্রকেও ভুট্টো বা খোমেনী হতে হয়! আপনাদেরকে আন্তরিক ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তাপস গায়েন — জুন ২৮, ২০১৫ @ ৯:৩২ পূর্বাহ্ন

      এ কী বৈদগ্ধপূর্ণ সাক্ষাৎকার ! আমি দারুণভাবে আলোড়িত । যেহেতু সাক্ষাৎকার একটি যৌথ সাহিত্যকর্ম, তাই শিল্পী-অধ্যাপক সনজীদা খাতুন যেমন আমাকে অভিভূত করেছেন, একইভাবে কবি-অনুবাদক রাজু আলাউদ্দিন আমাকে মুগ্ধ করেছেন । ভালো সাক্ষাৎকার কী বস্তু, এই কাজটি তার একটি নমুনা হয়ে রইল !

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন প্রবীর বিকাশ সরকার — জুন ২৮, ২০১৫ @ ৮:০৪ অপরাহ্ন

      সাক্ষাৎকারটি ঋদ্ধ। খুব ভালো লাগলো। অনেক নতুন তথ্য জানা গেল।

      নীলাঞ্জনের প্রসঙ্গ এসেছে। তার পুরো নাম নীলাঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়। আমার অনুজপ্রতীম বন্ধু। মূলত শান্তিনিকেতনের ছেলে বিশ্বভারতী থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এমএ করেছে। কিছুদিন রবীন্দ্রভবনে কাজ করেছে। কিন্তু ওখানে কর্তৃত্ব করেছে বলে কখনো শুনিনি। বিশ্বভারতীতে রবীন্দ্রনাথের আমল থেকেই অনিয়ম, বিশঙ্খৃলা চলে আসছে, নীলাঞ্জন সেসবের প্রতিবাদ করতো বলেই কর্তৃপক্ষের বিরাগভাজন হয়ে চাকরি থেকে খারিজ হয়েছে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শিমুল সালাহ্উদ্দিন — জুলাই ১, ২০১৫ @ ১১:২২ পূর্বাহ্ন

      ঐতিহাসিক, দুর্দান্ত, অমূল্য এক সাক্ষাৎকার। অনিন্দ্যসুন্দর। স্যালুট সাক্ষাৎকার সম্রাট রাজু আলাউদ্দিন।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Shamsul Alam Mukul — জুলাই ৪, ২০১৬ @ ৪:২৫ পূর্বাহ্ন

      খুউব ভালো লেগেছে। বহু না জানা ঘটনা জানা গেল। ধন্যবাদ।
      শামসুল আলম মুকুল

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com