সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সাক্ষাতকার: “গান্ধী কিন্তু ভীষণভাবে সমাজতন্ত্রবিরোধী ছিলেন”

রাজু আলাউদ্দিন | ১৬ মে ২০১৫ ১০:২৭ অপরাহ্ন

razu-siraj.jpg১৯৩৬ সালের ২৩ জুন জন্মগ্রহণকারী সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী আমাদের প্রথম সারির সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের একজন। বাকস্বাধীনতা, মানবিক অধিকার, পরিবেশ সুরক্ষা, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং সামাজিক ন্যায়বিচার বিষয়ক আন্দোলনের পুরোধা। এসবের পাশাপাশি তিনি লেখক হিসেবেও সুপরিচিত।

সম্পাদনা, প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাস ও অনুবাদ মিলিয়ে তার গ্রন্থের সংখ্যা আশির মতো। দীর্ঘকাল তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজী ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্য যাদের নিরলস অবদানে সমৃদ্ধ তিনি তাদের অন্যতম। মার্ক্সিস্ট চিন্তা-চেতনায় উদ্বুদ্ধ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ‘নতুন দিগন্ত’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। তার বাসভবনে কবি ও প্রাবন্ধিক রাজু আলাউদ্দিনের সাথে তার দীর্ঘ আলাপ হয়েছিল ২০১০ সালের শেষের দিকে। মুস্তাফিজ মামুনের ধারণ করা সেই দীর্ঘ আলাপচারিতার অনুলিখন ভিডিওসহ উপস্থাপন করা হলো। বি. স.

রাজু আলাউদ্দিন :প্রথমেই শুরু করা যাক এইভাবে যে, আপনি তো দীর্ঘ দিন শিক্ষকতা পেশার সাথে যুক্ত এবং এখনও আছেন। তো এইটা হয় কিনা–মনস্তাত্বিকভাবে– যে যখন কেউ সাক্ষাতকার নিতে আসে তখন সাক্ষাতকার গ্রহণকারী প্রশ্ন করে এবং আপনি উত্তর দেন। কিন্তু শিক্ষকতার জীবনে আপনি প্রশ্ন করেন এবং ছাত্ররা উত্তর দেয়– এতে কোনো অস্বস্তিবোধ হয় কিনা?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : না ঐ রকম কোন অস্বস্তিবোধ হয় না। আসলে আমি আবার লেখার কাজও করি, লিখতে পছন্দ করি, লেখাও আমার অভ্যাস। কাজেই লেখাটাও এক ধরনের যোগাযোগ বটে, মানে সেটা হচ্ছে এই যে আপনি বলছেন, প্রশ্ন করছি উত্তর দিচ্ছি। লেখার মধ্য দিয়েও আমরা কল্পনা করি যে একজন পাঠককে বলছি এবং সেই পাঠকের উদ্দেশে আমার কথাগুলো সাজাচ্ছি। তো সেদিক থেকে আমার কোনো অস্বস্তি লাগে না বা অসুবিধা হয় না।
রাজু আলাউদ্দিন : আপনার বেকনের মৌমাছি, উপরকাঠামোর ভিতরেই, তাকিয়ে দেখি, তারপরে আমার পিতার মুখ– এই প্রবন্ধগ্রন্থগুলোর মধ্যে আপনার গদ্যের যে প্রসাদগুণ সেটা হচেছ স্বচ্ছতা এবং সাবলীলতা–এই গুণের পেছনে আপনার পূর্ব কোনো আদর্শ ছিল কিনা?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : হ্যাঁ, আদর্শ ছিল, মানে লেখার জগতে আমরা সকলেই –লেখক যারা হই বা হইনি– তারা তো রবীন্দ্রনাথ পড়েই প্রভাবিত হয়েছি। রবীন্দ্রনাথের লেখার মধ্যে, আশ্চর্য এই যে, আপনি স্বচ্ছতা বলেন সাবলীলতা বলেন–সেটা রয়েছে। আমি আমার প্রথম জীবনে কয়েকজন লেখকের রচনারীতিকে খুব পছন্দ করতাম। একজন হচ্ছেন প্রমথ চৌধুরী যার লেখার মধ্যে এক ধরনের বৈদগ্ধ আছে আর একজন হচ্ছেন শিবরাম চক্রবর্তী যার লেখার মধ্যে খুব কৌতুক আছে, মানে কৌতুকের সাথে কথা বলেন। আর একজন হচ্ছেন বুদ্ধদেব বসু যার লেখার মধ্যে এক ধরনের কবিতা আছে। তো এই লেখকদের প্রভাব আমার উপরে পড়েছে। সর্বোপরি, রবীন্দ্রনাথকেই আমরা মনে করি যে শেখার ব্যাপারগুলো তার কাছেই যেতে হয় শেখার জন্য।


রাজু আলাউদ্দিন: মানে গদ্যের যে সাবলীলতা…
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: হ্যাঁ, সেটা রবীন্দ্রনাথের ভেতর যেরকম আছে সে রকম আর কোথাও নেই। কিন্তু আমরা অন্যভাবে যে প্রমথ চৌধুরী, শিবরাম চক্রবর্তী, বুদ্ধদেব বসুর কথা বললাম, এদের লেখার মধ্যেও নিজস্ব গুণ আছে কতগুলো। সেই গুণগুলো আমাকে প্রভাবিত করেছে।
রাজু আলাউদ্দিন: এদের মধ্যে ঐ সময় বাঙালি মুসলমান লেখক যেমন আবদুল ওদুদ বা হুমায়ুন কবিরও লিখেছেন– তিনি বোধ হয় প্রধানত ইংরেজিতে লিখেছেন । তো এই মুসলমান লেখকদের প্রবন্ধ, মানে ওদুদ সাহেবের যে প্রবন্ধ, ওটার মধ্যে স্বচ্ছতা আছে সাবলীলতা আছে। ওইটা আপনার কী রকম মনে হয়?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : না, আমি আবার প্রবন্ধগুলোকে অনেকটা, আপনি যে বইগুলোর উল্লেখ করলেন, ঐ বইগুলো আমার প্রথম জীবনের লেখা এবং ঐ বইগুলোর মধ্যে একটা ব্যক্তিগত কথোপকথনের ভঙ্গি আছে। তো আমি প্রবন্ধগুলো যখন গভীর বিষয় নিয়ে লিখি তখনও একটা ব্যক্তিগত, কথোপকথনের ভঙ্গিতে বলি। সে জন্য যেমন কাজী ওদুদের কথা বললেন, এরা বেশ গম্ভীরভাবে লেখেন; আমি ঠিক ঐভাবে লিখিনি। আমাকে অনেকে বলতো আমার প্রবন্ধগুলো রম্যরচনা হয়ে যাচ্ছে। তো রম্যরচনা আমি একে মনে করি না। আমি মনে করি যে এইগুলো পাঠকের কাছে পৌঁছানো দরকার এবং হৃদয়গ্রাহী করা দরকার। সেই হৃদয়গ্রাহী করার জন্য প্রকাশের ব্যপারটা জটিল না করে স্বচ্ছতার মধ্যে দিয়ে, উপমার মধ্য দিয়ে বা বাগ্বিধি তৈরি করে পৌঁছানো দরকার। পৌঁছানোটা খুব জরুরী। এজন্য বিষয় এবং পৌঁছাবার রীতি– এই দুটোকে আমি এক সাথে করি। বিষয়টা তখন স্বচ্ছ হয়ে যায় বলে আমার ধারণা।
রাজু আলাউদ্দিন: হ্যাঁ, সেটা আপনার একেবারে সর্বশেষ প্রবন্ধের মধ্যেও আছে। কথোপকথনের, এক ধরনের স্বগত ভঙ্গী, সেটা আপনার একদম সর্বশেষ কলামটার মধ্যে আমরা পাই। কিন্তু এতে আপনি কোনো সমস্যা বোধ করেন কি না? যেমন ধরেন, এই ধরনের কথা বলার ভঙ্গীর কারণে আপনি যে-বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে বলতে চান সেই জায়গাটায় আপনি খুব দ্রুত পৌঁছাতে পারেন কি না? ভঙ্গীটা আপনাকে বাধাগ্রস্ত করে কিনা?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : না, আমি কোনো ভঙ্গী দিয়ে ভোলাতে চাই না মানুষকে। আমার মধ্যে বক্তব্যটাই আসে, বক্তব্যটাকেই আমি উপস্থাপন করার সময় ঐ সমস্ত সহজগ্রাহ্য, হৃদয়গ্রাহী, স্বচ্ছ অথবা সাবলীল যাই বলেন, এইগুলো এর মধ্যে আনতে চাই, তখন কিন্তু বিষয়টা ঠিকই থাকে এবং আমি দেখেছি যে লিখতে লিখতে বিষয়টা আরো পরিষ্কার হয়ে আসে। মানে যেহেতু আমি আর একজনের কাছে, একজন কল্পিত শ্রোতার কাছে আমার বক্তব্যটা পৌঁছাতে চাচ্ছি, যেন তার সঙ্গে আমার কথোপকথন চলছে এবং তখন আমার ঐ বিষয়বস্তটা ওর মধ্যে দিয়ে আরো পরিষ্কার হয়ে ওঠে। ব্যাপারটা এমন: আমার বক্তব্যটা আগে যতটা ছিল তার তুলনায় লেখার প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে তা আরো পরিষ্কার হয়ে ওঠে– এটা আমার মনে হয়।
রাজু আলাউদ্দিন: সেই অর্থে তো আমার মনে হয় আপনার প্রিয় লেখক হওয়া উচিত প্লেটো ।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: হ্যাঁ, প্লেটোতো বটেই। প্লেটোর কথা আনলাম না কারণ প্লেটোতো কথোপকথনের মধ্য দিয়ে সুন্দরভাবে, উপমা দিয়ে বলেছেন। তিনি অনেক বড় মাপের লেখক তো! আমি অতো বড় মাপের লেখকের কথা আনলাম না। আমার অভিজ্ঞতার মধ্যে যারা আছেন তাদেরকেই আনলাম।
রাজু আলাউদ্দিন : না, তারপরও, তাদের কাজের সাথে তো আপনি বিশেষভাবে পরিচিত এবং তাদেরই একজন যেমন এরিস্টটলের কাব্যতত্ত্ব আপনি অনুবাদও করেছেন। এটি আমার অসম্ভব প্রিয় একটি বই। আর প্রিয় প্রধানত দুটি কারণে, একটি হচ্ছে অনুবাদের প্রসাদগুণ আর একটি আপনার এই যে ভূমিকা, এত চমৎকার ভূমিকা! আমার মনে হয় এটি আপনার শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধের একটি।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : ধন্যবাদ, হ্যাঁ আমি এরিস্টটল এর কাব্যতত্ত্বটাকে অনুধাবন করেছি। ওইটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বই এবং কঠিন বই, কঠিন বিষয়। কাব্য খুব সহজ জিনিশ কিন্তু কাব্যতত্ত্ব জিনিশটা,–বিশেষ করে নাটকের ক্ষেত্রে উনি নির্দিষ্ট করে ট্রাজেডির বিষয় আলোচনা করেছেন– সেটা অত্যন্ত কঠিন বিষয়। উনি কিন্তুু লিখিতভাবে বলেন নি। উনি বলেছেন অন্যরা, ছাত্ররা সেগুলো লিখে নিয়েছেন। সেইগুলো থেকে এটা আমরা পেয়েছি। তো এখন যেমন ধরেন শেক্সপিয়ারের কথা, আমরা তো শেক্সপিয়ার পড়াই বা শেক্সপিয়ার পড়েছি। কিন্তু তার কাছ থেকেও আমাদের শেখার ব্যাপার অনেক আছে। অল্প কথায় বেশি কথা বলা বা আমায় যদি আরও লেখকের কথা বলেন, বিদেশি সাহিত্যের কথা বলেন যেগুলো আমি পড়াই বা পড়িয়েছি–নিজেতো অবশ্যই পড়েছি, যেমন ফ্রান্সিস বেকন, তার যে প্রবন্ধগুলো, সেই প্রবন্ধগুলোর মধ্যে অল্প কথায় অনেক কথা বলা হয়ে যায় এবং এই অল্প কথায় অনেক কথা বলাটাও একটা গুন বটে। আমি অবশ্য কথা অল্প বলি না, কিন্তু ঐ ধরনের একটি উক্তি যদি করতে পারি যে উক্তি মানুষের মনের মধ্যে স্পর্শ করবে। লিখে কোনো অর্থ হয় না যদি মানুষকে স্পর্শ করতে না পারি। দায়সারা গোছের লেখা লিখতে গেলে সেটা লেখা হয় কিন্তু মানুষের মনের মধ্যে এটা কোনো প্রভাব ফেলে না। আর আপনি যে বলছিলেন ধ্রুপদী সাহিত্য, এই ধ্রুপদী সাহিত্যের উপরেও লিখেছি। আমি শেক্সপিয়ারের মেয়েরা, তাদের উপরে একটা বই লিখেছি। বিভিন্ন দেশের ভাষায় ধ্রুপদী সাহিত্যের নারী চরিত্রগুলো যে আছে তাদেরকে নিয়েও লিখেছি। তবে সেই সমস্ত বিষয় পড়তে গিয়েই আমার উপলব্ধিটা অনেক বেড়েছে কিন্তু আমি প্রকাশ করতে চেয়েছি খুব সহজভাবে।
রাজু আলাউদ্দিন: শেক্সপিয়ার আপনাকে পড়াতে হয় এবং শেক্সপিয়ারের নারী চরিত্রগুলো নিয়ে আপনি বইও লিখেছেন। শেক্সপিয়ার সম্পর্কে আপনার নতুন কোনো অবজারভেশন আছে কিনা। মানে, আমি একটু পরিস্কার করার চেষ্টা করি, আপনি জানেন যে তলস্তয় শেক্সপিয়ারের বিপক্ষে ছিলেন। উনি মনে করেছেন যে, শেক্সপিয়ারের চরিত্রগুলো এত গুছিয়ে কথা বলে যে এটা কৃত্রিম মনে হয়। বাস্তবে আমরা সেভাবে কথা বলি না আসলে বা বাস্তবে আমরা সেরকমভাবে আচরণ করি না। এই একটি প্রধান যুক্তি দিয়ে–আরো কতোগুলি যুক্তি আছে– তিনি শেক্সপিয়ারকে এক রকম বর্জণ করছেন। আপনার কী মনে হয়?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: প্রত্যেক সাহিত্যিকেরই নিজস্বতা আছে। তলস্তয় এক ধরনের সাহিত্যিক, শেক্সপিয়ার আরেক ধরনের সাহিত্যিক। তলস্তয় কিন্তু জীবনকে ট্রাজেডি হিসাবে দেখতে প্রস্তুত ছিলেন না। যদিও তার শ্রেষ্ঠ কীর্তি আনা কারেনিনা একটা ট্রাজেডি। তিনি মহাকাব্যের লোক, শেক্সপিয়ার হচ্ছেন নাটকের লোক। মহাকাব্যের মধ্যে যখন ট্রাজেডি থাকে তখন একটি প্রবাহের মধ্যে ট্রাজেডিটা আসে। আর যেমন ধরেন কিং লিয়ার-এর মতো ট্রাজেডি, সেটাকে অনেকেই পছন্দ করতে পারতেন না। আমাদের রবীন্দ্রনাথও এই ধরনের ট্রাজেডি পছন্দ করতেন না। তো একেকজন লেখকের একেক ধরনের মানসিকতা, দৃষ্টিভঙ্গী থাকে এবং তারা নিজস্ব কারণে পছন্দ অপছন্দগুলোকে গড়ে তোলেন। আমি তলস্তয়ও পছন্দ করি, শেক্সপিয়ারও পছন্দ করি। এবং এটা ঠিক নয় বা এটা ভুলই বলবো যে দুই বিপরীত ধরনের লেখকের একজনকে যদি আপনি পছন্দ করেন তা হলে তার উল্টো দিকে অন্যজনকে আপনি পছন্দ করতে পারবেন না। সেটা ঠিক নয়। আপনি সকল লেখককেই পছন্দ করবেন এবং প্রত্যেকের নিজস্বতাটাকে বুঝে নিবেন। এইটা হচ্ছে আমার নিজের উপলব্ধি।
রাজু আলাউদ্দিন: সেটা ঠিক, আপনি যেটা বললেন যে প্রত্যেক লেখকেরই নিজস্ব রুচি থাকে, ধরন থাকে পছন্দ করবার কিন্তু যেই যুক্তিতে শেক্সপিয়ারকে ইয়ে করতে যাচ্ছে সেই যুক্তিটি আপনার কাছে সঠিক কিনা?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: না, ঐ যুক্তিটা সঠিক মনে হয় না। শেক্সপিয়ারতো গুছিয়ে বলবেনই এবং দ্বিতীয়ত শেক্সপিয়ারের বিরুদ্ধে তলস্তয়ের আর একটা আপত্তি ছিল যে শেক্সপিয়ার বড় বেশী দেশপ্রেমিক মানে স্বদেশী, নিজের দেশের কথা বড় বেশী করে তুলে ধরেন।
রাজু আলাউদ্দিন: এটা তো আমার কাছে ঠিক মনে হয় না কারণ শেক্সপিয়ারের বেশীর ভাগ কাহিনীতো…
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: না, ইংরেজদের ইতিহাস নিয়ে নাটক ছিল, সেগুলো নিয়ে সে এরকম একটা কথা বলেছিল।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনার একটা বই আছে। আমি জানি না সেটা এখন আবার নতুন করে বেরিয়েছে কিনা, অনেক আগে পড়েছিলাম। এই প্রসঙ্গেই আমার মনে পড়ছে ইংরেজি সাহিত্যে প্রতিক্রিয়াশীলতার ধারা। ঐখানে আপনি যেমন ডি এইচ লরেন্স কিংবা জেমস জয়েস–এই রকম ধারার যারা লেখক তাদেরকে আপনি প্রতিক্রিয়াশীল বলেই আখ্যায়িত করেছেন। তো আপনার মতামত কি এখনো ঠিক ঐ জায়গাতে আছে নাকি বদলেছে আপনার মতামত?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: ঐটি ছিল প্রতিক্রিয়াশীলতা আধুনিক ইংরেজি সাহিত্যে এবং এই লেখকদের মধ্যে যে প্রতিক্রিয়াশীল ধারণাগুলো সেগুলোকে কিন্তু আমি এখনও প্রতিক্রিয়াশীল ধারণাই মনে করি। বিশ্বযুদ্ধের পরে পৃথিবীটাকে তারা যেভাবে দেখছিলেন সেই দেখার মধ্যেই একটা আধুনিকতা ছিল, তারা খুবই আধুনিক, কিন্তু তারা আবার চিন্তার দিক থেকে ভয় পেয়ে গেছেন। পেছনের দিকে যাচ্ছেন কেউ, কারও প্রবণতা ধর্মের দিকে, কারো প্রবণতা ফ্যাসিবাদের দিকে। তো এই বড় বড় লেখকরা এই জিনিশগুলো করছেন তখন, যেহেতু তারা পুঁজিবাদকে গ্রহণ করতে পারছেন না। প্রতিক্রিয়াটা হচ্ছে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে। পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়ে তারা পিছিয়ে যাচ্ছে। তখন প্রয়োজন যেটা ছিল এখনও মনে হয় যে পুঁজিবাদকে অতিক্রম করে আরো সামনে যেতে হবে, যেটা তলস্তয় করেছেন। তলস্তয় লেখার মধ্যে; তলস্তয় তো বিশ্বযুদ্ধ দেখেননি, তার আগেই লিখেছেন। তার লেখার মধ্যে আমরা রুশ বিপ্লবের পদধ্বনি শুনতে পাই। এই অর্থে যে তলস্তয় ঐ যে রুশ সমাজ, সেই সমাজের যে দ্বন্দ্বগুলো চলছে, যে অন্তসারশূণ্যতা তৈরি হয়েছে, মানুষের সঙ্গে মানুষের নিঃসঙ্গতা দেখা দিয়েছে– এইগুলোকে তলস্তয় তুলে ধরেছেন। তুলে ধরে এই যে উপস্থাপনা, এই যে সামনে নিয়ে আসা– এর মধ্য দিয়ে বিপ্লবকে সহায়তা দিয়েছেন যাতে করে মানুষ বুঝতে পারে যে এই সভ্যতা অন্তসারশূণ্য হয়ে গেছে। কেবল অন্তসারশূণ্য নয়, এই সভ্যতা নিষ্ঠুর, এখানে সংবেদনশীল মানুষরা খুব কষ্টের মধ্যে থাকে এবং তাদের উপরে এই গোটা রাজ্যটা চেপে বসে আছে। পুঁজিবাদের ঐ বিকাশটাকে তলস্তয় মেনে নিতে পারেন নি। সেই জন্য আমি তলস্তয়কে একজন পুঁজিবাদবিরোধী লেখক মনে করি। তলস্তয় অনেক আগে এসেও অনেক বেশী আধুনিক। তিনি তার সমাজকে যেভাবে উন্মোচিত করেছেন সেই উন্মোচন অত্যন্ত গভীর। ঐ সমাজের যে সীমা সেই সীমাকে লঙ্ঘন করার জন্য মানুষের মধ্যে একটা আগ্রহ তৈরী করেছেন এইভাবে যে এটা তো নিষ্ঠুর, এটাকে মেনে নেয়া যায় না, এটাকে বদলাতে হবে।
রাজু আলাউদ্দিন: তো এখন ধরা যাক, কোনো লেখকের মধ্যে যদি পুঁজিবাদের বিরোধিতা না থাকে বা সমাজ থেকে এগিয়ে নেয়ার কোনো দায়িত্ব তার লেখায় যদি না থাকে সে ক্ষেত্রে ঐ লেখককে অন্য কোনোভাবে মূল্যায়নের সুযোগ থাকবে কি না?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : হ্যাঁ, আমি তো এক ধরনের বক্তব্যের মূল্যায়ন করেছি। তারা বড় লেখক বলেই আলোচনায় এসেছেন। যাদের কথা আমি ওখানে আলোচনা করেছি ডি এইচ লরেন্স, টি এস এলিয়ট, ডব্লু বি ইয়েটস — এরা কিন্তু বড় মাপের লেখক। তো সেই লেখকদেরকে বড় মাপের বলেই তাদের চিন্তাগুলো কী, সেই চিন্তাগুলোকে আমি অনুধাবন করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু তাতে করে যে তারা লেখক হিসাবে ম্লান হয়ে গেছেন সেটা ঠিক না। তারা লেখক হিসাবে বড়ই আছেন। কিন্তু তাদের বক্তব্যটা কী সেটা আমাদের জানা দরকার, তারা কী বলেছেন, কেন বলেছেন এবং কেন তারা ভয় পেলেন।


রাজু আলাউদ্দিন: আর একটা প্রশ্ন, সেটা হচ্ছে যে মার্কসবাদের আবির্ভাবের পর একটা সাহিত্য বিচার শুরু হয়েছিল আমরা যাকে বলি মার্কসবাদী সাহিত্যতত্ত্ব এবং সেই মানদণ্ডে সাহিত্য বিচার শুরু হয়েছে, এখনও আছে সেটা। এখনও মনে করা হয় যে, যদি কোনো লেখক মার্কসবাদী মানদণ্ডে বিপ্লবের পক্ষে লেখার মধ্যে কোনো রকমের প্রণোদনা না থাকে তাকে মহৎ লেখক হিসাবে গণ্য করা হয় না। এই বিচারটাকে আপনি কী ভাবে দেখেন?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : না, এটা ঠিক বিচার নয়। আমি মনে করি যে বিপ্লবের পক্ষে সাহায্য করা– একজন প্রতিক্রিয়াশীল লেখকও করতে পারেন। তিনি তার দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে উন্মোচিত করছেন একটা বাস্তবতাকে, সেই বাস্তবতার উন্মোচনের মধ্য দিয়ে পাঠক বিচার করবেন এটাকে তিনি কীভাবে নেবেন। বিচারের দায়িত্ব পাঠকের উপরে, কিন্তু লেখকের উন্মোচনের কাজটি খুব জরুরী এবং সেটা বিপ্লবের জন্য খুবই জরুরী। কাজেই মার্কসবাদীর ঐ যান্ত্রিক বিচারটা ঠিক নয়। ওভাবে বিচার করা যাবে না। শেক্সপিয়ারের সময় তো মার্কসবাদ ছিল না কিন্তু শেক্সপিয়ার ধরেন, হ্যামলেট নাটকে রাজতন্ত্র জিনিশটা যে কত হৃদয়হীন, কেমন অমানবিক এবং সেখানে মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক যে কেমন নিষ্ঠুর, রাজ পরিবারের একটা ছবি দিয়ে সেটাকে তুলে ধরেছে। এখন অতো আগে শেক্সপিয়ার তো ঐটা তুলে ধরলেন যে রাজতন্ত্র অত্যন্ত নিষ্ঠুর হৃদয়হীন এবং যেখানে তরুণ সংবেদনশীল হ্যামলেটের মতো একজন মানুষ বাঁচতে পারে না। তো তার উপর যে নির্মম অন্যায় হলো, অত্যাচার হলো এবং সে যে শেষ পর্যন্ত প্রাণ দিতে বাধ্য হলেন তার মধ্যে দিয়ে প্রমাণ হলো যে ঐ রাজতন্ত্র প্রাণঘাতী এবং ঐটা মানুষের সহায়ক নয়। কালজয়ী সাহিত্য কিন্তু ঐভাবে উন্মোচিত করে দেয়।
রাজু আলাউদ্দিন: যদিও লেখকের সেটা উদ্দেশ্য ছিল না।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : হ্যাঁ, লেখকের উদ্দেশ্য ছিল না। লেখক বাস্তবতাটাকে যেভাবে বোঝেন সেইভাবে তিনি ওইটা তুলে ধরেন।
রাজু আলাউদ্দিন: তাহলে এই মানদণ্ডটাকে আমরা আসলে কোনো ভাবেই সঠিক বলে মনে করতে পারি না?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : না, সাহিত্যের বিচারে নানান রকম নিরিখ থাকে এবং কেউ এইভাবে যদি দেখেন তিনি দেখবেন, তাতে আমার কোনো আপত্তি নাই।
রাজু আলাউদ্দিন: এরকমভাবে দেখার ফলে কোনো খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে কিনা?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: বোঝার ক্ষেত্রে কিন্ত একটা নিরিখ দরকার হয় এবং আপনি যদি একভাবে দেখেন তাহলে সাহিত্য, মহৎ সাহিত্য হচ্ছে সেরকমই একটা ব্যাপার . . . যে কোনো দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখেন না কেন, যেমন মোনালিসার ছবি সম্পর্কে বলা হয় যে আপনি যেখান থেকেই দেখেন না কেন মনে হবে মোনালিসা আপনার দিকে তাকিয়ে হাসছে। তো সেই রকমভাবে মহৎ সাহিত্য কিন্তু আপনার প্রয়োজন মেটাবে।
রাজু আলাউদ্দিন: এটা তো যেকোনো ছবি সম্পর্কেই সত্য।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী:হ্যাঁ, কিন্তু, অত্যাশ্চর্য বিষয় হচ্ছে এই যে মনে হবে যেন আপনার দিকে তাকিয়ে হাসছে। এটা মহৎ শিল্প সম্পর্কে সত্য। যেন এটা আমার জন্যই লেখা হয়েছে। যেন আমি এই লেখার জন্য প্রতীক্ষা করছিলাম।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা, আপনার এরিস্টটলের অনুবাদের পিছনে উদ্দীপনা হিসাবে কী কাজ করেছিল?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : এরিস্টটল তো পাঠ্য এবং এরিস্টটল একটা খুব প্রয়োজনীয় বই, আমি বাংলায় যার নাম দিয়েছি কাব্যতত্ত্ব। আমাদের পাঠকরা, বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা যাতে, সাহিত্যের শিক্ষার্থীরা যাতে ভালোভাবে বুঝতে পারে সেইটাই ছিলো আমার অনুপ্রেরণা। আমার মনে হয়েছিল এই বইটা যদি তারা ইংরেজিতে পড়ে, ইংরেজিতে উনি লেখেননি, ইংরেজী অনুবাদটা তো এক কঠিন অনুবাদ।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনিতো দুটো অনুবাদের সহায়তা নিয়েছেন।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : হ্যাঁ, দুটো ইংরেজী সংস্করণের সাহায্য নিয়েছিলাম। আমাকে প্রকাশক বলেছে যে আমি সঙ্গে ইংরেজী সংস্করণটাও যদি দিয়ে দেই তাহলে মিলিয়ে পড়তে সুবিধা হবে। তো আমি ভাবছি যে নতুন সংস্করণে ইংরেজী ভার্সনটাও দিয়ে দেব। যাতে করে ইংরেজী ভার্সনের সাহায্যে বাংলা পড়লে ইংরেজীটা আরো ভালো করে বোঝা যাবে।
রাজু আলাউদ্দিন: কেউ একজন, আমার এই মুহূর্তে ঠিক মনে নেই, আপনার নিশ্চয়ই মনে থাকবে ড্রাইডেন অথবা জনসন বলেছিলেন যে যেকোনো অনুবাদের আয়ু হচ্ছে একটা জেনারেশন। আচ্ছা, এইশেটা যদি সত্যি হয় তাহলে ধরেন আপনার এই অনুবাদের বয়সতো অনেক দিন হয়ে গেল। এর পরে আপনি কী আরো কোন ঘষামাজা বা এরকম কোনো কিছু করবেন?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: হ্যাঁ, এটা ঠিক বলেছেন, এটার তো অনেক সংস্করণ হয়েছে। আমি প্রত্যেকটি সংস্করণ পড়ি এবং সেটা করতে গিয়ে একটু বদলাই যাতে একটু ভালো হয়। ঐ যে আপনি বললেন, একটু দীর্ঘ জীবন পাওয়ার সম্ভাবনা হয়তো একটু বাড়ে।
রাজু আলাউদ্দিন: শেক্সপিয়ারের যে ভাষা, ঐ ভাষায় তো আর ইংরেজরা কথা বলে না। আজকে ইংরেজরা শেক্সপিয়ারকে পড়ার জন্য আধুনিক ইংরেজী ভাষায় অনুবাদ করে নিচ্ছে, এতে করে শেক্সপিয়ারের বলবার যে ধরন এবং ঐ প্রাচীন ভাষার মাধ্যমে প্রাচীন একটি শব্দ যে দ্যোতনা তৈরি করতো, সেগুলো হারিয়ে যায় কিনা ?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: শেক্সপিয়ারকে মূলেই পড়তে হবে, শেক্সপিয়ারকে শেক্সপিয়ারের ভাষাতেই পড়তে হবে। যদি আপনি অনুবাদ করতে যান তা হলে তো আর শেক্সপিয়ার থাকে না। ইংরেজী ভাষায় অনুবাদ করলেও সেটা আর একটা ভাষা হয়ে যায়। শেক্সপিয়ারকে মূল ভাষাতেই পড়তে হবে। অনুবাদ আমাদেরকে বুঝতে সাহায্য করবে। দ্বিতীয় একটা কাজ হচ্ছে শেক্সপিয়ার একটা চ্যালেঞ্জ, মস্ত বড় চ্যালেঞ্জ, সেই চ্যালেঞ্জটাকে যদি আমরা গ্রহণ করি, মানে যেই ভাষা এই চ্যালেঞ্জটাকে গ্রহণ করে, সেই ভাষা নিজেকে অনেক উন্নত করে ফেলে, নিজের শক্তি বৃদ্ধি করে। এই কারণে শেক্সপিয়ার সবসময়ই একটা মস্ত বড় চ্যালেঞ্জ । আমরা ঐভাবে শেক্সপিয়ারের নাটক বাংলায় অনুবাদ করতে পারিনি।
রাজু আলাউদ্দিন: কিন্তু অনেকেই তো অনুবাদ করেছেন।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী :না, করেছে. . .অন্য ভাষাতে যেরকম হয়েছে, সেভাবে আমাদের এখানে হয়নি। রবীন্দ্রনাথ যেমন করতে আরম্ভ করেছিলেন, উনি ম্যাকবেথ-এর একটা দৃশ্য করেই ছেড়ে দিয়েছিলেন…
রাজু আলাউদ্দিন: ওটা তো খুব ভালো অনুবাদ ছিলো, সিমপ্লি ব্রিলিয়ান্ট।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: ঠিকই বলেছেন।
রাজু আলাউদ্দিন: আর একটা বিষয়, অনুবাদ সম্পর্কে প্রচলিত একটা ধারণা যে অনুবাদ সৃজনশীল কাজ নয়। আপনার কি মনে হয়?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: অনুবাদ অবশ্যই সৃজনশীল কাজ। এটা এক ধরনের সৃষ্টি, ভালো অনুবাদ মানেই তো নতুন সৃষ্টি।
রাজু আলাউদ্দিন: ছোটবেলা কাদের বই আপনাকে প্রথম উদ্বুদ্ধ করতো?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী :আমরা সকলেই কিশোর বয়সে রবীন্দ্রনাথের গল্প পড়েছি। কিন্তু শরৎচন্দ্র আমাদের খুব প্রিয় লেখক ছিলেন । আমাদের অল্প বয়সে এই যে কিশোরদের নিয়ে লেখা শরৎচন্দ্রের রামের সুমতি, বিন্দুর ছেলে এইগুলো বেশ আমাদের আকর্ষণ করতো।
রাজু আলাউদ্দিন: আর বাম চিন্তার দিকে কিভাবে ঝুঁকলেন?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : স্বাভাবিকভাবেই ঘটেছিলো। আমরা এই ব্যবস্থা নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলাম না, এই ব্যবস্থার বিকল্প কী সেটা খুঁজছিলাম।
রাজু আলাউদ্দিন: এটা কি ছাত্র জীবনে?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : ছাত্র জীবনেই খুঁজেছি কিন্তু এখন ঘটনা কি হয়েছে যে ছাত্র জীবনে আমরা বইপত্র পেতাম না। আমরা যে যুগে পড়াশুনা করেছি…
রাজু আলাউদ্দিন: এটা কতো সালে?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : আমি এমএ পাস করলাম ৫৬ সালে, আমি ৫২ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে ৫৬ সাল পাস করে বের হলাম। তখন ঐ সমস্ত বই, মার্ক্সবাদের বই বা মূল বইগুলো– এগুলো পাওয়া যেতো না। বই পাওয়া যেত না আর এগুলো নিয়ে আলোচনাও হতো না। মানে এই যে কমিউনিষ্ট পার্টি নিষিদ্ধ ছিল, তাতে সাহিত্য প্রসার ভাল করতো না। এরপরে একসময় চীনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক যখন একটা হলো তখন পিকিং থেকে অনুবাদ করা বই প্রচুর আসতে থাকলো, এগুলোই প্রথম আমরা পড়তে পারলাম। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে যে ঘটনাটা ঘটলো সেটা হলো এই যে আমি ১৯৫৯ সালে ইংল্যান্ডে গেলাম, দশ মাসের জন্য গিয়েছিলাম। তখন ওখানে গিয়ে একটা নতুন আবহাওয়ার মধ্যে পড়লাম। লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি গিয়েছিলাম। সেখানে কিছু বামপন্থীদের একটা কেন্দ্র ছিল, সেখানে নানান ধরনের আলোচনা বক্তৃতা হতো। তো ঐখানেই আমার জগৎটা অনেক বড় হয়ে গেলো। তখন শুধু যে বই ব্যাপারটা– তা না। গোটা সংস্কৃতিটাই উন্মোচিত হলো যেটা আমাদের দেশে ছিল না। আমরা সাহিত্য পাঠকে আমাদের কালে সাহিত্য হিসেবেই পড়তাম শুধু, কাজেই অন্য রকম ব্যাখ্যা হতে পারে– এই ধারণা আমাদের ছিল না। সেই ব্যাখ্যার ধারণাটা আমি ঐ ইংল্যান্ডে পেলাম প্রথম। আমি যোগ দিয়েছিলাম আর্নল্ড কেটলের কোর্সে, তিনি আবার মার্কসবাদী ছিলেন। ইংরেজী উপন্যাসগুলোর উপরে মার্কসবাদী ব্যাখ্যা দিয়ে বই লিখেছেন দুই খন্ডে। তো তার বক্তৃতাও শুনেছি। আমার দৃষ্টিভঙ্গীর একটা ভয়ঙ্কর পরিবর্তন হলো। অনেকটা একটা বড় জগতে চলে গেলাম। আমরা তো তখন আইয়ুব খানের রাজত্বে ছিলাম। আমার পক্ষে ১৯৫৯ সালে ইংল্যান্ডে যাওয়াটা সাংস্কৃতিকভাবে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিলো ।

রাজু আলাউদ্দিন: আমাদের দেশে তখন, মানে ভারত উপমহাদেশের যারা রাজনৈতিক নেতা ছিলেন যেমন এম এন রায় বা সুভাষ বসু– এদের কারো কারো আদর্শে আপনি কখনো অনুপ্রাণিত বোধ করেছেন?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : হ্যাঁ, এদের প্রভাব অবশ্যই আমাদের উপরে পড়েছে কিন্তু এম এন রায় সম্পর্কে আমরা খুব ক্রিটিকাল হয়ে গিয়েছিলাম। কেননা এম এন রায় তখন, তিনি আর মার্কসবাদী নেই। আমাদের যখন বয়স বাড়ছে তখন তিনি নতুন মানবতাবাদ প্রচার করছেন এবং তখন ঐটা তো অতটা আমাদের আকর্ষণ করছে না। সুভাষ বসুতো আগেই চলে গেছেন। তো সুভাষ বসুর যে তারুণ্য সেটা আমাদেরকে প্রভাবিত করেছে, কিন্তু আমরা তো বড় হয়েছি পাকিস্তান আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এবং পাকিস্তানে যে দ্বিজাতিতত্ত্ব, সে যে ভুল তত্ত্ব ছিল, সেই তত্ত্বের মধ্যেই আমাদের থাকতে হয়েছে। পাকিস্তান যখন প্রতিষ্ঠিত হলো তখন আমি ক্লাস এইটে পড়ি, এইট-এর পরীক্ষা দিচ্ছি, এদিকে পাকিস্তান হচ্ছে, লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান হচ্ছে । আমরা আবার কোলকাতা থেকে এসেছি। আমরা আজাদ পত্রিকা পড়ি, মোহাম্মদি পত্রিকা পড়ি, তখন নতুন বেরুলো ইত্তেহাদ সেটাও ওই মুসলিম লীগেরই পত্রিকা। তো ঐ বলয়ের বাইরে তো যাওয়ার সুযোগ নেই।
রাজু আলাউদ্দিন: তাহলে আপনার মনে হচ্ছে এম এন রায় যে পথে গেলেন সেটা আসলে ভুল পথ ছিল?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : হ্যাঁ, অবশ্যই। এম এন রায় তো নব্য মানবতাবাদী–এগুলোতো সব হচ্ছে গিয়ে; এরা এক পর্যায়ে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবকে কী করে প্রতিহত করা যায়– এই কাজ এই দায়িত্বের মধ্যে চলে গেলেন তারা।
রাজু আলাউদ্দিন: মানে উনি বিপক্ষে চলে গেলেন, মার্কসবাদের বিপক্ষে, কিন্তু উনি তো সারা জীবন মার্কসবাদীই ছিলেন?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : হ্যাঁ, মার্কসবাদী ছিলেন কিন্তু উনি যে মানবতাবাদ নিয়ে এলেন, এগুলো হচ্ছে মার্কসবাদকে মোকাবেলা করা।
রাজু আলাউদ্দিন: তাই মনে হচ্ছে আপনার?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: হ্যাঁ, এগুলো তো মার্কসবাদ না, আপনি যেভাবেই ব্যাখ্যা করেন শ্রেণী সংগ্রাম ছাড়া তো আর মার্কসবাদ হবে না। এম এন রায় তো মার্কসবাদ বিশ্বাস করতেন না। তিনি তো শেষ পর্যন্ত শ্রেণী সংগ্রামে বিশ্বাস করতেন না। যাই হোক তিনি মনে করতেন যে মানুষকে শিক্ষা দিয়ে মানুষের মধ্যে গণতান্ত্রিক চেতনা সৃষ্টি করে পরিবর্তন আনতে পারবেন এবং সেটা করতে গিয়ে তিনি এমনকি বৃটিশ গভর্মেন্টের সঙ্গে সহযোগিতা করেছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনি গান্ধী নিয়ে লিখেছেন। আমরা সবাই জানি গান্ধী অহিংস আন্দোলনের নেতা কিন্তু রবীন্দ্রনাথের একটি ক্রিটিকাল অবজারভেশন আছে। রবীন্দ্রনাথের এক ইন্টার্ভিউ-এর একটা অংশ এরকম: ”গান্ধী হচ্ছে গিয়ে হিংসা আমি মনে করি মানুষের পক্ষে কেবল মিলন ও প্রেমই সংগত”— এটা রবীন্দ্রনাথের কথা। তিনি আর এক জায়গায় বলেছেন ঐ একই ইন্টার্ভিউতে ”দেখলাম যে গান্ধীর বানী দ্বারা আন্দোলিত জনগণ ইউরোপের যাবতীয় প্রতীককে পোড়াচ্ছে। যা কিছু ইউরোপীয় সভ্যতা বা রীতিনীতির সঙ্গে কোনো না কোনো সম্পর্ক রয়েছে তাকে পোড়ানো হচ্ছে। দেখলাম যে তাদের প্রাণিত করছে হিংসায়।” তো রবীন্দ্রনাথের এই ব্যাখ্যা যদি আমরা মেনে নেই তা হলে দেখা যাবে আসলে অহিংস নয় হিংস আন্দোলনেরই নেতা মহাত্মা গান্ধী।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: হিংস অহিংসতা রবীন্দ্রনাথের কাছে প্রধান ছিল এবং রবীন্দ্রনাথ গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের সময় এ কথাটা বলছেন, যখন বস্ত্র পোড়ানো হচ্ছে, ইংরেজদের সমস্ত কিছু বর্জন করা হচ্ছে। তো বিষয়টা রবীন্দ্রনাথ একভাবে দেখলেন। আমরা রবীন্দ্রনাথের কাছে গিয়েই বলবো যে গান্ধী যেটা করছিলেন সেটা হচ্ছে ইউরোপকে বর্জনের চাইতেও বড় ব্যাপার হচ্ছে যে গান্ধী মানুষকে পিছিয়ে দিচ্ছিলেন। যেমন ধর্মকে রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করা– এটা হচ্ছে আধুনিক জগতের প্রথম পদক্ষেপ এবং গণতান্ত্রিক চেতনার প্রথম পদক্ষেপ। রেনেসাঁর প্রথম পদক্ষেপটাই ছিল ইহজাগতিকতা এবং রাজনীতির ক্ষেত্রে ধর্মনিরপেক্ষতা। রাষ্ট্র এবং ধর্ম একসাথে যাবে না। কিন্তু গান্ধী ঐ ধর্মকে নিয়ে আসছেন। গান্ধী অসাম্প্রদায়িক ছিলেন, সকল ধর্মকে সমান মর্যাদা দিতেন, কিন্তু এটাতো ধর্মনিরপেক্ষতা হলো না।
রাজু আলাউদ্দিন: উনিতো ব্যক্তিগত জীবনে প্রাকটিস করতেন হিন্দুবাদ।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : হ্যাঁ, তার যে ভাব ছিল সেটা হিন্দু ভাবমূর্তি ছিল এবং সেই হিন্দু ভাবমূর্তিটাই আবার পাকিস্তান আন্দোলনকে সাহায্য করলো। তো মূল বিষয়টা হচ্ছে যে রাজনীতির সাথে ধর্মকে মিলিয়ে ফেলা। এইটা খুব ক্ষতিকর কাজ গান্ধী করেছেন। এখানেই, এক ফাঁক দিয়ে বিদ্যমান যে অন্যায় সমাজ ব্যবস্থা সেটা রয়ে গেছে। বৃটিশের সঙ্গে তার একটা দ্বন্দ্ব ছিল কিন্তু তিনি সমাজে বিপ্লব আনতে চান নাই। সমাজ বিপ্লবী ছিলেন না তিনি, সমাজে মৌলিক পরিবর্তন আনতে চাননি। সে জন্য পুঁজিবাদীরা খুব সুবিধা পেয়ে গেছেন তার সময়। তারা তাকে গরীব রাখতে সাহায্য করেছে। তাদের ভয়টা ছিল সমাজতন্ত্র। গান্ধী রাজনীতিতে এসেছেন ১৯১৭-এর পরে, ১৯২০ সালে আসলে আনুষ্ঠানিকভাবে কংগ্রেসের দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। তারা কি সমাজতান্ত্রিক হয়ে যাবে? তখন চীনে তৎপরতা শুরু হয়েছে, রুশ দেশে বিপ্লব শুরু হয়ে গেছে। ভারত এত বড় উপমহাদেশ, এখানে কি সমাজতন্ত্র চলে আসবে–এই ভয়টা ইংরেজদের যেমন তেমনি এখানকার বিত্তবানদেরও বটে এবং গান্ধীও বটে। গান্ধী কিন্তু ভীষনভাবে সমাজতন্ত্রবিরোধী ছিলেন। সমাজতন্ত্রকে উনি ভয় করতেন। এই যে যারা সমাজতন্ত্রের দিকে ঝুঁকছিল, যেমন নেহেরু, নেহেরুকে উনি করতলগত করে ফেললেন কংগ্রেসের সভাপতি করে। সুভাষ বসু ঝুঁকছিলেন, সুভাষ বসুকে বিতাড়িত করে দিলেন। তো তিনি অহিংসার নামে হিংসারই চর্চা করেছেন যেমনটা রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন। ধর্ম যে আমাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার, এটা রাজনৈতিক ব্যাপার না এর সঙ্গে যে রাষ্ট্রের সম্পর্ক থাকবে না– এই জিনিশটা কিন্তু তিনি গ্রহণ করলেন না। বরং ইংরেজ কিন্তু ঐ দিকে থেকে ধর্মনিরপেক্ষ, সে কিন্তু তার ধর্মকে আমাদের উপরে চাপাতে চায় নি। এখানে সে ধর্মনিরপেক্ষতাকে উৎসাহিত করেছে।
রাজু আলাউদ্দিন: তবে মিশনারীরা তো আসছে।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: খুব অল্প, ওদের কোন প্রভাব নাই।
রাজু আলাউদ্দিন : রাজনীতিতে না হলেও সংস্কৃতির ভেতরে তো প্রভাবটা ফেলেছে।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী :কিন্তু ওরা জানতো যে মিশনারীদের দিয়ে সাম্রাজ্যবাদ হবে না। মধ্যবিত্ত শ্রেণী লাগবে সাম্রাজ্যবাদকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। মধ্যবিত্ত শ্রেণী তারা তৈরী করেছিল যাদের অধিকাংশই অনুগত বৃটিশের, একাংশ সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা করেছে।
রাজু আলাউদ্দিন: এবার বাংলদেশের প্রসঙ্গে আসি। আপনি তো বাংলাদেশকে জন্মের আগে থেকেই দেখে আসছেন। বাংলাদেশকে পাকিস্তান আমলে, তারপরে বাংলাদেশ দেখছেন। ৭১-এর সময় আপনি কোথায় ছিলেন?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : ৭১-এ আমি খুব বিপদের মধ্যে ছিলাম। ৭১-এ আমরা জানতাম যে যাদেরকে খুঁজছে তাদের মধ্যে আমি একজন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একটা তালিকা চেয়ে পাঠিয়েছিল সামরিক শাসকরা। প্রথমে এসেই যে কয়জনের তালিকা চেয়েছিল তা বাঙালিদের কাছেই চেয়েছিল। তখন গোয়েন্দা বিভাগে বাঙালিরা ছিল। তো আমার এক আত্মীয় বললেন, সে দেখলো আমার নামটা উপরেই ছিল। তো তখন আমি বুঝলাম যে এখানে আমার থাকা নিরাপদ নয়। প্রথমত আমরা ২৫ মার্চ রাতে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ছিলাম। তো সমস্ত ঘটনা দেখলাম। ২৬ মার্চ আটক অবস্থায় থাকলাম, ২৭ তারিখে যখন কারফিউ উঠলো তখন বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে বেরিয়ে এলাম। এসেই যে বেরিয়ে এলাম আর ঢুকি নাই। বাসা-টাসা সব ফেলে দিয়ে বেরিয়ে এলাম। কারণ আমরা জানি যে আর এখানে থাকাটা নিরাপদ নয়। সাধারণভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নিরাপদ নয়। দ্বিতীয়ত আমি ব্যক্তিগতভাবে নিরাপদ নই, কেননা আমার নাম তাদের তালিকায় আছে। সেই জন্য আমি নানা জায়গায় থাকতাম, আমার কোনো নির্দিষ্ট থাকার জায়গা ছিল না। রাজাকাররা যাদের ধরে নিয়ে গেল সেই তালিকার মধ্যে আমার নামও ছিল কিন্তু আমার নামের সঙ্গে কোনো ঠিকানা নেই। যাদের ঠিকানা ছিল, তাদেরকে ঠিকই ধরে নিয়ে গেছে।
রাজু আলাউদ্দিন: মুনীর চৌধুরী কি আপনার শিক্ষক ছিলেন? ওনার সম্পর্কে কি আপনার কোনো…
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: উনি তো শিক্ষক এবং বন্ধুও ছিলেন। আমরা তাঁকে মুনীর ভাই বলতাম। তো এইটা খুব অসাধারণ ব্যাপার ছিল যে শিক্ষক এবং বন্ধু একই সঙ্গে। আমাদের বয়সী যারা তাদের সকলের সঙ্গে তার এই সম্পর্ক ছিল। তিনি তো অসাধারণ একজন মেধাসম্পন্ন মানুষ ছিলেন। তিনি বক্তৃতাও অসাধারণ করতেন। তিনি উদ্বুদ্ধ করতেন অনুপ্রাণিত করতেন; তাঁর মধ্যে অনেক গুণের সমাহার ছিল।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনার অনেক ছাত্রই এখন তারকাখ্যাতি অর্জন করেছেন আবার এমন অনেক ছাত্রও আছে যারা খ্যাতিতে পৌঁছাননি। কিন্তু এমন কি হয় যে আপনার তখন খুব মেধাবী মনে হয়েছিল কিন্তু শেষে গিয়ে সে তারকা হয়ে উঠতে পারেন নি। এ রকম কারো কথা মনে পরে আপনার ?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: হারিয়ে গেছে?
রাজু আলাউদ্দিন: হারিয়ে গেছে।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : আমি যাদের উপরে আস্থা রেখেছিলাম তারা শুধু তারকা নয়, শিক্ষকতা বা লেখক হিসেবে বলেন বা অভিনয়ের কথা যদি আপনি বলেন তারা তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছেন।
রাজু আলাউদ্দিন: আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ তো আপনার ছাত্র ছিলেন।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী :হ্যাঁ, আমার প্রথম জীবনের ছাত্র। আমি যখন লেকচারার হই, তখন ও ঢোকে।
রাজু আলাউদ্দিন: ওনার একটা লেখা আছে, আপনি কি দেখেছেন কখনো?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : হ্যাঁ, দেখিয়েছে আমাকে একজন।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনার সম্পর্কে অনেক গুণের কথাও আছে, সঙ্গে কিছু সমালোচনাও আছে।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী :কী সমালোচনা, আপনার মনে পড়ছে, বলেন তো?
রাজু আলাউদ্দিন: সমালোচনা এই রকম– হুবহু আমার মনে পড়ছে না, তবে এটার সারাংশটা হচ্ছে এই রকম– যে মতের দিক থেকে আদর্শের দিক থেকে একটু গোঁড়ামি আছে বলে মনে হচ্ছে ওনার দিক থেকে।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : হ্যাঁ, গোঁড়ামি আমার আছে, আমি ওসব ব্যাপারে আপোষ করতে পারি না। মত আদর্শের ব্যাপারে আমি আপোষ করতে পারি না।
রাজু আলাউদ্দিন: এটাও কি এক ধরনের মৌলবাদ না যে আপনি গোঁড়ামি যদি করেন? তাই না?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : না, গোঁড়ামি মৌলবাদ না। আপোষহীনতা আপনি জানেন যে এটা বিকশিত হচ্ছে, মৌলবাদ তো বিকশিত হয় না, এটাতো অন্ধ । আমি সমাজ পরিবর্তনে বিশ্বাস করি তার পক্ষে কাজ করায় বিশ্বাস করি, এটাতে অন্ধত্ব নাই। এটা মৌলবাদী মোটেই নয়, এটা বিকশিত হচ্ছে, যত বয়স বেড়েছে ততই আমার কাছে পরিষ্কার হয়েছে যে এই কাজটা খুব জরুরী কাজ এবং এখানে এই জন্য মতাদর্শগত ব্যাপারে আপোষ করেত চাইনি। আমি খুব উগ্র না, আমি খুব নরমভাবে লিখি।
রাজু আলাউদ্দিন : হুমায়ুন আজাদের মতো উগ্র আপনি নন।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : হুমায়ুন আজাদের জন্য ওই কারণেই খুব দুঃখ লাগে। হুমায়ুনের একটি অসাধারণ গুন ছিল, হুমায়ুন ছিল অসাধারণ পরিশ্রমী, এই রকম পরিশ্রমী খুব কম দেখেছি। আমার সাথে তার খুবই অন্তরঙ্গতা ছিল, তবে আমার খুব দুঃখ লাগে এই যে তার বিপদগুলো ডেকে আনলো, আমি ওই রকম বিপদ ডেকে আনতে চাই না। হয়তো আমার মধ্যে অতটা বীরত্ব নেই, আমি অতটা সাহসী নই। কেউ কেউ বলবে আমি হয়তো কাপুরুষ। যাই বলুক, আমি মনে করি যে ভিতরে থেকে জিনিশটাকে করতে হবে এবং এটা দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রাম, এই সংগ্রামে কোনো নাটকীয় সাফল্য আমরা অর্জন করতে পারবো না এবং দ্রুত করতে গেলে উল্টো ফল হবে। এই জন্য হুমায়ুনের জন্য আমার খুব দুঃখ লাগে, তাকে আমি একেবারে আমার সাবসিডিয়ারি ক্লাসের ছাত্রাবস্থা থেকেই চিনি এবং পরে সে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল, সে একাকী হয়ে গিয়েছিল।

রাজু আলাউদ্দিন: সবাইকে তীব্রভাবে সমালোচনা, নিন্দা করে করে নিজের একাকীত্বকে নিশ্চিত করছিলো আর কি।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : এবং যেমন ধরেন, হুমায়ুনের প্রসঙ্গে কথাটা বলি, ফররুখ আহমেদ যখন মারা গেলেন তখন একটা লেখা লিখেছিলাম ’চলে গেলেন অপরাজেয়’। মানে ফররুখ আহমেদের কবিতা ভালো, আমরা তা প্রশংসা করেছি। তাকে আমরা জানতাম, তিনি বাংলাদেশ বিরোধী ছিলেন কিন্তু আমি লিখেছিলাম ঐ লেখাটার মধ্যে যে তিনি অপরাজেয় ছিলেন অর্থাৎ তিনি যা বিশ্বাস করতেন সেই জায়গাটাতেই তিনি রয়ে গেছেন। তিনি ওখান থেকে নড়েননি। তো হুমায়ূন আমার খুব তীব্র সমালোচনা করে একটা লেখা লিখেছিলো যে আমি নাকি ওই জায়গাটাতেই রয়ে গেছি যেখানে কিশোর বয়সে ছিলাম। তো আমি খুবই কৌতুক অনুভব করেছি এবং তাতে আমার সাথে হুমায়ূনের সম্পর্ক মোটেই অবনতি হয় নি। তো আমি বলছি যে হুমায়ূন, এটা তোমাকে পরিপ্রেক্ষিতে স্থাপন করতে হবে এবং ফররুখ আহমেদের কাছ থেকে আমি তো আমার মতাদর্শিক সমর্থন আশা করি না। আমি মনে করি যে একটা লোক লিখছেন, বৈষয়িক কারণে লিখছেন না। তিনি টাকা পয়সা করার জন্য বা বিত্ত ব্যাসাত করার জন্য লিখছেন না। তার একটা পথ আছে, সে পথটা ভ্রান্ত হয়তো। ঐ ভ্রান্তপথে তিনি সাহিত্যেরই চর্চা করেছেন।
রাজু আলাউদ্দিন: সাহিত্যের জায়গাটা তো প্রতিক্রিয়াশীল না।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : হ্যাঁ –প্রতিক্রিয়াশীল না — সেটা তো ঠিকই। কিন্তু তার ওঠা বসা ছিল সমাজের অনগ্রসর মানুষদের সঙ্গে।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনার যে কারণে ভালো লাগে আমারো ঠিক একই কারণে তাকে ভালো লাগে। ঐটাকে আসলে কোনোভাবে প্রতিক্রিয়াশীল বলা যাবে না। তার যে প্রচণ্ড কল্পনাশক্তি, তার ভাষাভঙ্গি, এতই আলাদা। অসম্ভব শক্তিশালী কবি তিনি আমাদের। আর ওনার সময় আর অন্য কোনো কবি কি আপনার মনে পড়ে যিনি এখন খুব একটা আলোচিত না কিন্তু সত্যিই শক্তিশালী
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : এখন আলোচিত নন?
রাজু আলাউদ্দিন: হ্যাঁ, এখন আলোচিত নন রাজনৈতিক কারণে।


সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : না, ফররুখ আহমেদের তুলনা আর আমি দেখি না। ফররুখ আহমেদ নিজের ক্ষেত্রে আলাদা ছিলেন, তার সাথে আরো অনেকে ছিলেন, তারা হয়তো পাকিস্তানী আদর্শে বিশ্বাস করতেন। তো ঐ তুলনায় মেধাবান লেখক ছিলেন না।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা, এবার আমি একটু রাজনৈতিক প্রশ্নের দিকে আসি। একটা হলো মার্কসবাদী আদর্শের ব্যাপারটা আমি যদ্দুর জানি–আমি নিজে চর্চা করি না, তবে বুঝতে পারি, তা হলো এই আদর্শের একটা স্পষ্টতা থাকবে। স্পষ্টতা মানে যে বিষয়ে বলবেন, লিখবেন সেখানে স্পষ্টতা আদর্শেরই একটা অংশ। আমাদের এই সময়ের যারা বুদ্ধিজীবী, হোক তারা বামপন্থী বা ডানপন্থী, যেটাই হোক, তাদের অনেক ভূমিকা নিয়েই আমাদের প্রশ্ন আছে। আমরা অনেক কথাই তাদের কাছ থেকে স্পষ্টভাবে শুনতে পাই না–জাতির, দেশের সংকটময় মুহূর্তে। আপনি এদের মধ্যে নিঃসন্দেহে আলাদা। আপনি সাড়া দিয়েছেন স্পষ্টভাবে। আমি জানতে চাইবো বর্তমান সরকার আমাদের খনিজ সম্পদ নিয়ে যে চুক্তিগুলোতে যাচ্ছে বিদেশি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে এই চুক্তিগুলো আসলে আমাদের জাতীয় স্বার্থের কতটা পক্ষে বা বিপক্ষে যাবে? আপনি কি একটু পরিষ্কার করে বলবেন?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : হ্যাঁ, পরিষ্কার করে তো বলার প্রয়োজন নেই। খুবই পরিষ্কার বিষয়টা। এটার পক্ষে যাওয়ার কোনো কারণ নেই। প্রথমত হচ্ছে যে একটা দেশের জাতীয় সম্পদ হচ্ছে নিজের সম্পদ, সেটাকে দ্বিতীয়বার পাওয়া যাবে না। শেষ হয়ে গেলে শেষই হয়ে গেল। তো সেটার অনুসন্ধান, সেটার উত্তোলন, সেটার ব্যবহার– এটা আমাদের স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হবে। স্থানীয় প্রতিষ্ঠানকে বড় করতে হবে, সেই প্রতিষ্ঠান বিদেশীদের সাহায্য নেবে।
রাজু আলাউদ্দিন: কিন্তু আমাদের কি তেমন কোন প্রতিষ্ঠান আছে?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : না, প্রতিষ্ঠান শুরু থেকেই তৈরী করা ছিল, যেমন বাপেক্সের কথা বলি, তাকে যদি শুরু থেকে তৈরী করা হতো। আমাদের অনেক প্রকৌশলী বিদেশে কাজ করেন এই খনিজ সম্পদ নিয়ে। তাদেরকে ব্যবহার করা যেত। আমাদের ব্যাংকগুলোতে বিনিয়োগের অভাবে অর্থ পড়ে আছে। বিদেশীরা বিনিয়োগ করতে চায়। এইগুলো যদি আকর্ষণ করা যেত তা হলে আমরা ঐভাবে গড়ে তুলতে পারতাম। দুই হচ্ছে যে আমরা অন্যদেরকে সাথে আনতে পারি, অন্যদেরকে নিয়োগ করতে পারি তবে মালিকানা আমাদের কাছে থাকবে।
রাজু আলাউদ্দিন: আমি তো শুনলাম বিদেশী কোম্পানীগুলোর সাথে যে চুক্তিতে হয়েছে তাতে ৬% পাব আমরা আর ৯৪% ওই চলে যাচ্ছে ওদের হাতে।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : তার পরে ওদের কাছ থেকেই আবার আমাদের কিনতে হবে।
রাজু আলাউদ্দিন: আমি বুঝতে পারি না এটা কিভাবে হয়।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : এটা হলো দেশপ্রেমের অভাব এবং এটা কোথাও বলা হয়নি চুক্তিগুলোতে কী কী আছে। জাতীয় সংসদ হচ্ছে একটি সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান, যে কোনো জাতির রাষ্ট্রীয় চুক্তিগুলো সেখানে আলোচিত হওয়া দরকার। সেখানে সেগুলো না করে বরং গোপনে করা হয় এবং এই গোপনীয়তাই প্রমাণ করে যে এটা গোষ্ঠিস্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে। আমাদের দেশের স্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে না।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনার কি মনে হয় বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে একই কাজ করতো?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : একই। একই শ্রেনী, মানে শাসক শ্রেণী একই।
রাজু আলাউদ্দিন: কিন্তু এখন যদি ধরেন বিএনপি এই ইস্যু নিয়ে আন্দোলনে যায় আপনি কি বিএনপিকে সমর্থন করবেন?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : না, না, বিএনপি তো এ ইস্যু নিয়ে আন্দোলনে যাবে না।
রাজু আলাউদ্দিন: যদি যায়।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : না, যাবেই না। গেলে বিএনপির পেছনে আমি যাব কেন, আমার পেছনে বিএনপি আসবে। আন্দোলন জনগণকে করতে হবে।
রাজু আলাউদ্দিন: পেছনে, মানে আগে পেছনে আমি বললাম এই কারণে যে ওদের যেহেতু একটা বিশাল জনগোষ্ঠীর সমর্থন আছে।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : ওরাই তো করেছে। ওদের সময় এই যে কয়লা নিয়ে মানুষ খুন হয়নি ?
রাজু আলাউদ্দিন: হ্যাঁ, হয়েছে।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : সেখানে যে আমাদের মানুষ খুন করলো, তখন আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তো বিরোধী দলীয় নেত্রী ছিলেন। তিনি যে অবস্থান নিয়েছেন আজকে কি সেই অবস্থানে আছেন?
রাজু আলাউদ্দিন: তো আপনার পরামর্শ কি? আসলে আমাদের কী করা উচিৎ?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: এইটা হচ্ছে জনগণের আন্দোলন। ৭১ সালে কী হয়েছিল? ৭১ সালে কি আমরা অপেক্ষা করেছিলাম কারো জন্য যে কে কখন আসবে কে কখন নেতৃত্ব দিবে? স্বতঃস্ফূর্তভাবে মানুষ বেরিয়ে পড়েছে, তারপরে একটা যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছে নেতৃত্বহীন অবস্থায়। নেতাদের কাউকে তো আমরা দেখিনি এবং খুঁজেও পাইনি, তাই না? ঐ যে আন্দোলন, জনগণের আন্দোলন, সেটা ছিল দেশকে স্বাধীন করার আন্দোলন। সম্পদ রক্ষার আন্দোলন জনগণকেই করতে হবে।
রাজু আলাউদ্দিন: তো এখন ধরেন বুদ্ধিজীবীদের দায়িত্বটা কী হবে?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : খুব বড় দায়িত্ব। বুদ্ধিজীবীদের দায়িত্ব ছিল এটা বলা। আমাদের দেশের তথাকথিত সুশীল সমাজ, তারা এগুলি বলেন না। তারা কেমন করে, ভালো করে ভোট দেওয়া যায় কিভাবে যোগ্য লোক খুঁজে পাওয়া যাবে এইসব নানান কথা বলেন।
রাজু আলাউদ্দিন: কারা বলেন?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : সুশীল সমাজের লোকরা। না, নাম দরকার নাই, আপনি চিনেন তাদেরকে।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনি তো নাম বলতে পারেন।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : না, না, তাদের সাথে আমার কোনো শত্রুতা নেই তো। প্রকাশ্যে বলেছেন তারা। কিন্তু তারা কি দেশে গ্যাস ফিল্ড সম্মন্ধে কিছু বলেন? এমন কি টিপাইমুখে বাঁধ হচ্ছে, সেই বিষয়েও কি তারা বলেন? আমাদের পানির ন্যায্য হিস্যা দরকার– এইগুলো নিয়ে কিছু বলেন? আমরা তো বাঁচতেই পারবো না এগুলো না হলে।
রাজু আলাউদ্দিন: আমি সেই জন্যই তো বললাম যে স্পষ্টতা এবং সততার অভাব।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : না, স্পষ্টতার দরকার নেই। মানুষ খুব পরিষ্কারভাবে জানে এবং মানুষ এদের কাছে কিছু আশা করে না। সুশীল সমাজ কেবল যোগ্য প্রার্থী, জাতীয় সরকার– এইসব আওয়াজ তোলে, এগুলো হচ্ছে মূল সংকট থেকে চোখ অন্য দিকে নিয়ে যাওয়া। মূল সংকট হচ্ছে কে লুণ্ঠন করবে আমাদের সম্পদগুলো। আমাদের সম্পদগুলো কি রাজনীতির নামে কথিত লোকগুলো করবে না ব্যবসায়ীরা করবে নাকি আমরা যারা বুদ্ধিজীবী টিবি সেজে বসে আছি তারা করবো। মানে আমরা কিছু একটা অংশ পাবো কিনা। জনগণের সম্পত্তি জনগণই রক্ষা করবে।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনি যেহেতু জনস্বার্থের পক্ষে বলছেন এবং আপনার গ্রহণযোগ্যতা আছে, সুতরাং আপনি যদি ঐ লোকগুলোকে চিহ্নিত না করেন তাহলে জনগণকে সব সময় একটা বিভ্রান্তির মধ্যে থাকতে হবে।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : না, এগুলো চিহ্নিত করার দরকার নেই তো। আমার কাজ হচ্ছে বিকল্প শক্তি দাঁড় করানো।
রাজু আলাউদ্দিন: বিকল্প শক্তি দাঁড় করাতে গেলেই তো আপনাকে চিহ্নিত করতে হবে কে আপনার শত্রু।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : না, সেটা লোকে বুঝবে। আমি একটা আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলাম ওসমানী উদ্যানে তখন আমরা অল্প কয়েকজন লোক দাঁড়িয়েছি। সারা দেশ আমাদের পেছনে এবং তখন জানতো যে কারা এর পক্ষে আর কারা বিপক্ষে। এটাতে কোন অসুবিধা থাকে না।
রাজু আলাউদ্দিন: কিন্তু আপনি বললেও তো অসুবিধা নাই।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : না, আমি কেন বলতে যাবো খামাখা? তাকে নিন্দা করার চাইতে, তাকে চিহ্নিত করার চাইতে আমার শক্তিকে আমি বিকশিত করবো।
রাজু আলাউদ্দিন: মানে আপনার শক্তিকে বিকশিত করার জন্যই কি সেটা দরকার হবে না?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : না। দরকার হবে যদি আমি বিকশিত হই, যদি আলো জ্বলে ওঠে, অন্ধকার পালিয়ে যাবে। এটাই হচ্ছে নিয়ম।
রাজু আলাউদ্দিন: আলো তো আপনার আছে ।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : না, আলো আমরা জ্বালাতে পারছি না ঐভাবে।
রাজু আলাউদ্দিন: এই যে চারিদিকে, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে, আলোকিত মানুষ তৈরী হচ্ছে।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : কি হচ্ছে জানি না, কিন্তু আলো তো দেখছি না।
রাজু আলাউদ্দিন: তারপরে গ্রামীণ ফোনের আলো আসছে।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: এই সব আলো দিয়ে তো কোনো কাজ হচ্ছে না। আলো হচ্ছে রাজনৈতিক আলো। আপনি তো বোঝেনই যে-আলো আমরা চাই সেটা হচ্ছে অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন চাই। আমরা সমাজ ব্যবস্থায় পরিবর্তন চাই। আমরা অন্যায় সমাজ ব্যবস্থা মানতে প্রস্তুত না।
রাজু আলাউদ্দিন: আমি একটা জিনিশ বুঝতে পারছি না। আপনার বিপক্ষের আদর্শে যারা তারাও কিন্তু কখনো এই নামগুলো স্পষ্ট করে বলেন না এবং আপনার কাছে আমি যখন জানতে চাইছি আপনিও বলছেন না। এই একটা জায়গায় আপনারা কিন্তু একই রকম।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : না, এইগুলো ব্যক্তিগত ইস্যুর পর‌্যায়ে চলে যাবে, বুঝছেন না? ব্যক্তি এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়।
রাজু আলাউদ্দিন: ব্যক্তি তো একটি আদর্শের প্রতিনিধিত্ব করে।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : না, ব্যক্তি আসবে যাবে। এখন আমাদের দেশে যে-শাসক শ্রেণী তারাই হচ্ছে দেশের প্রধান শত্রু, তারাই চুক্তি-টুক্তি করছে, প্রতিদিন মানুষ মারা যাচ্ছে, প্রতিদিন মানুষ সন্ত্রাসের শিকার হচ্ছে। তাদের মাথা ব্যাথা নেই। সরকার বদল হবে, এই সরকারের জায়গায় ঐ সরকার আসবে, ঐ সরকারের জায়গায় এই সরকার আসবে। একটা যাবে আরেকটা আসবে। আমার কাজ হচ্ছে বা আমাদের কাজ হচ্ছে এর বিকল্প একটা শক্তি তৈরী করা। সেই শক্তি যদি না তৈরী করতে পারি তাহলে যতই আমি তাদের নিন্দা করি তাতে করে আমার পরিবেশ নষ্ট হবে, গালাগালির পরিবেশ তৈরী হবে।
রাজু আলাউদ্দিন: না, স্যার, আমার মনে হয় না যে এটা গালাগালি।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : না, না, দরকার নেই তো। ওর মধ্যে আমার যাওয়ার দরকার নেই তো। আমার কাজ হচ্ছে ইতিবাচক কাজ করা।
রাজু আলাউদ্দিন: তত্ত্বাবধায়ক সময়টাকে আপনি কেমন মনে করেন?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: ওটা খুবই খারাপ সময়, ওটা খুবই খারাপ সময় ছিল। ওটা তো ছদ্মবেশী সামরিক শাসন ছিল এবং আমরা তো শিক্ষকদের মুক্তির জন্য মানব বন্ধন করেছি। আমরা এগুলো তো ঐ সময়ই করেছি ।
রাজু আলাউদ্দিন: একটা ওপেন সিক্রেট এই যে আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা শিক্ষকতার পাশাপাশি অন্য কিছুর সাথে জড়িত আছে, অনেক এনজিওর সাথে জড়িত। এগুলোর সাথে জড়িয়ে গেলে আদর্শের জায়গাটা ঠিক রাখা সম্ভব কিনা শিক্ষক হিসাবে?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : আমি জানি না। এটা ব্যক্তির উপরে নির্ভর করে। আমি সাধারনীকরণ করতে চাইবো না এবং আমি এইগুলোকে খুব জরুরীও মনে করি না, মানে গুরুত্বপূর্ণও মনে করি না।
razu-siraj-1.jpg
রাজু আলাউদ্দিন: যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পর্কে আপনার কি মতামত?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : যুদ্ধাপরাধীর বিচার তো আমরা করতে পারিনি, সে জন্যে তো আমরা নিজেরাই অপরাধী হয়ে আছি। কেননা যারা এত বড় একটা অপরাধ করেছে তাদেরকে কাঠগড়াতেই দাঁড় করাতে পারলাম না। তাদের তদন্তই করতে পারলাম না। এটা তো খুবই প্রয়োজন। ভেতরের দলিলপত্র, তথ্য কীভাবে সংগ্রহ করা হচ্ছে, আইনী লড়াইটা কীভাবে হবে–এইগুলো হচ্ছে জরুরী। এই নিয়ে বাইরে কথাবার্তা বলার চেয়ে ভেতরের কাজটা হচ্ছে জরুরী।
রাজু আলাউদ্দিন: কিন্তু আওয়ামী লীগ তো এর আগেও ক্ষমতায় এসেছিল দু’বার, তারা কিন্তু আগে কখনও উদ্যোগ নেন নি। উদ্যোগটা নিচ্ছে এ বছর এসে।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : হ্যাঁ, এখন পরিবেশ বদল হয়েছে, এখন নতুন প্রজন্ম যারা তারা কিন্তু যুদ্ধাপরাধীর বিচার চায়। এই দাবীটা নতুন প্রজন্মের কাছ থেকে বিশেষভাবে উঠেছে।

রাজু আলাউদ্দিন: কিন্তু স্যার, নতুন প্রজন্ম এসে দাবীটা যদি না করতো, এই দাবীটা কি উঠতে পারতো না আগে?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : আগে উঠতে পারতো। তারা করেনি বা তার দ্বারা এইটা প্রমাণিত হবে না যে এইটার প্রয়োজনীয়তা নেই।
রাজু আলাউদ্দিন: না আমি সেটার বিপক্ষে যাচ্ছি না।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : আর তারা কেন করেনি তা আমরা জানি না। আমরা এটাকে কখনও কম গুরুত্বপূর্ণ মনে করি না।
রাজু আলাউদ্দিন: ইদানিং ভাষার ক্ষেত্রে অনেক রকম প্রশ্ন তৈরী হচ্ছে। আপনি হয়তো এগুলো জানেন না। ফেইসবুক যারা ব্যবহার করছে ঐখানে একটা ভাষা আছে, ঐ ভাষাটা হচ্ছে মিশ্র ভাষা। বানানরীতির ক্ষেত্রেও একটা নৈরাজ্য আছে বাংলা ভাষায়। আর একটা জিনিশ হচ্ছে যে টেলিভিশনের মাধ্যমে, চ্যানেলের মাধ্যমে বিদেশী হিন্দি অনুষ্ঠানগুলো এবং ইংরেজী ভাষার অনুষ্ঠান– এগুলোর প্রভাব সামাজের ভিতরে পড়ছে। এই প্রভাবের ফলে বাংলা ভাষার ভবিষ্যত আসলে কতটা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ছে?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : বাংলা ভাষা থাকবে এবং বাংলা ভাষার চর্চা চলতে থাকবে। এইগুলো উপ-ভাষার মতো তৈরি হচ্ছে। কিন্তু এই উপ-ভাষাতো আছেই, এখনও আছে, আঞ্চলিক ভাষা আছে, উপভাষা আছে। ওটার দ্বারা বাংলা ভাষার কোনো ক্ষতি হবে না। কিন্তু যেটা হচ্ছে তাহলো আমাদের সমাজে যারা বিত্তবান তাদের ছেলেমেয়েরা এর দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। বিপদটা হচ্ছে সেখানে। তারাতো ঠিক মতো বাংলা ভাষা শিখতে পারছে না বা তারা বাংলা সংস্কৃতিকে ঠিকভাবে ধারণ করতে পারছে না। সে জন্য মিডিয়ার খুব বড় একটা ভূমিকা থাকা উচিৎ যে বাংলা ভাষার সঠিক চর্চা, বাংলা ভাষার সংস্কৃতি, বাংলার ইতিহাস– এইগুলি তুলে ধরার দায়িত্বটা মিডিয়াকে নিতে হবে। কেননা মিডিয়াই এই কাজটা করছে বাণিজ্যিক স্বার্থে। তারা যদি এটা তুলে ধরে দেখায় যে এটা অন্যায়, এটা ক্ষতিকর, তাহলে কিন্তু মানুষ সচেতন হবে।
রাজু আলাউদ্দিন: ওরা একটা দাবী করতে পারে ফেইসবুকের মাধ্যমে যে ভাষা তৈরি হচ্ছে– ইভেন নতুন কিছু নাটক বা সিনেমাতেও এই ভাষাটা এসেছে– তারা এটা বলতে পারে যে এই ভাষা যেহেতু মানুষের মুখের, মুখের ভাষা এই অর্থে যে আমি এখন আপনার ইন্টার্ভিউ নিচ্ছি, আমি হয়তো গুছিয়ে বলার চেষ্টা করছি, বইয়ের ভাষায় কথা বলতে চেষ্টা করছি। কিন্তু আমি আমার নিজের বাসায় ভাই বোনের সঙ্গে অন্য ভাষাতে কথা বলছি। ফলে তারা এইটা বলতে চায় যে এটাই তো বাস্তব।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: না, এটা কোন কথাই হলো না। প্রমিত ভাষা বলে একটি জিনিশ সবসময় আছে এবং সেই ভাষাটাই শিক্ষিত ভাষা এবং ধরেন আগের দিনেও এই রকম ছিল। যেমন ধরেন আগের দিনে বাঙালদের এক ধরনের ভাষা ছিল, তা নিয়ে হাসিঠাট্টা করা হতো। তখনকার দিনে যারা ইংরেজী মিশিয়ে বাংলা বলতো তাদেরকে নিয়ে হাসি ঠাট্টা করতাম আমরা। চলচ্চিত্রে ঐ ধরনের লোক দেখলে হাস্যরসের সৃষ্টি হতো যে এরা ঠিক বাংলা বলতে পারে না, ইংরেজি মিশিয়ে বলে। তো কাজগুলো চলে, কিন্তু এই কাজগুলো যদি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে বা এইগুলোই প্রধান হয়ে ওঠে তাহলে সেটা বিপদজনক। আমরা যারা বুঝি জিনিশটা তাদের দায়িত্ব হচ্ছে সঠিক বাংলা ভাষার চর্চা, সঠিক সাংস্কৃতিক চর্চা তুলে ধরা। এটাকে ব্যতিক্রম হিসেবে বা বিচ্যুতি হিসাবেই দেখতে হবে এবং সেভাবেই আসবে। আমি সবসময়ই বলি আসছিলাম আমাদের ইতিবাচক কাজ দরকার। এইগুলোর নিন্দা না করে আমরা ভালো নাটক, ভালো চলচ্চিত্র, ভালো সংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ভালো বিনোদনের ব্যবস্থা–যেগুলো নাই, সেগুলো করা দরকার। সাংস্কৃতিক আন্দোলন দরকার, পাঠাগার দরকার। দেয়াল পত্রিকা দরকার, নাটক দরকার, গান দরকার, খেলাধুলার জায়গা দরকার। এইগুলো না করলে মানুষ তো ঐ গুলোতে যাবেই, মানে খারাপ দিকে যাবেই কিন্তু আমি বিকল্পটাকে দিতে হবে এই বিকল্প দেওয়ার দায়িত্বটা দেশের সংস্কৃতিসেবীদের, কেবল বুদ্ধিজীবীদের না। বুদ্ধিজিবীদের উপর নির্ভর করা যাবে না। নির্ভর করতে হবে সংস্কৃতিসেবীদের উপরে। গ্রন্থাগার থেকে শুরু করে, বিতর্ক পর্যন্ত, প্রদর্শনী পর্যন্ত, সর্বত্র একে নিয়ে যান এই সুস্থ ধারাকে, সারা দেশে একটা আন্দোলন গড়ে তোলেন যেটা সমাজ পরিবর্তনের সাথে যুক্ত। মূল শক্র–আমি এতক্ষণ বলেছি কি না জানি না–মূল শক্র হচ্ছে পুঁজিবাদ। পুঁজিবাদ এই খেলাগুলো খেলছে। পণ্যে পরিণত করছে সমস্ত কিছুকে। পুঁজিবাদবিরোধী যে সাংস্কৃতিক পর্যায়, সেটাকে শক্তিশালী করতে হবে। এই যে সাংস্কৃতিক কাজ, সেটা হবে পুঁজিবাদবিরোধী।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনি মানে আপনার সমকালের বন্ধু বা লেখক এদের লেখা পড়েন, পড়ার সময় পান?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : হ্যাঁ, যতটা পারি করি। এদের সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে বলবেন? মূল্যায়ন আমি করতে চাইবো না। যাদের লেখা ভালো লেখা তাদের লেখা পড়ি। মূল্যায়নের দরকার নেই।


রাজু আলাউদ্দিন: বহুদিন আগে একটা ইন্টার্ভিউ আমি পড়েছিলাম আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের। ওনাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল সমকালীন, এমনকি তার চেয়েও পরবর্তী জেনারেশনের লেখকদের লেখা সম্পর্কে। উনি মন্তব্য করেছিলেন। উনি স্পষ্ট নাম বলতে পারলেন। আর নাম বললে ক্ষতিটা কী?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: না, আমি ক্ষতি বা আপত্তির কথা বলছি না। আমি ঠিক ওই অর্থে পুরোপুরি সাহিত্য চর্চা করছি না। আমি একজন সংস্কৃতি কর্মী হিসেবে নিজেকে দেখি।
রাজু আলাউদ্দিন : কিন্তু যদি উপন্যাস বা গল্প, কবিতা …
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : না, আমি ঐভাবে করে পারবো না। আমি ঐভাবে সাজাতে পারবো না জিনিশগুলোকে। আখতারুজ্জামান একজন পুরোপুরি লেখক এবং তার এই আগ্রহগুলো তার নিজস্বভাবে তৈরী হয়েছিল। আমার ক্ষেত্রে ঐটা হয়নি। আমি পুরোপুরি লেখক এখনো হতে পারিনি বা হতো পারবো না।
রাজু আলাউদ্দিন: না না, আপনি তো লেখক…
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: লেখক, এক ধরনের লেখক যার লেখাতে সব কিছু আসে ।
রাজু আলাউদ্দিন: কিন্তু অনেক সময় কি দায় থাকে না?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : না, এগুলো থাকে কি না আলাদা কথা, কিন্তু একটা ইন্টার্ভিউর মধ্যে আমি গুছিয়ে বলতে পারবো না। এখন চট করে আমার মনেও আসবে না বা ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হবে; তার চেয়ে দরকার নেই।
রাজু আলাউদ্দিন: আখতারুজ্জামান ইলিয়াস পড়েছেন?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : হ্যাঁ।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ লেখক মনে হয়েছে ?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : অবশ্যই, প্রথম থেকেই মনে হয়েছে।
রাজু আলাউদ্দিন : আপনার কি মনে হয় তিনি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বা ঐ সমমানের …
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: হ্যাঁ, এখানে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের লেখা, আমাদের বাংলাদেশে স্বাধীনতার পরে উপন্যাস যারা লিখেছেন, তাদের মধ্যে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ লিখেছেন আগে। শওকত ওসমানও লিখেছেন নিজের মতো করে। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসেরও নিজস্বতা আছে, খুবই নিজস্বতা আছে। একটা জনজীবনকে নিয়ে আসা এবং উপন্যাসের মধ্যে প্রতীকের ব্যবহার করা এবং নাটকীয়তা সৃষ্টি করা এবং একটা অঙ্গীকার তুলে ধরা– এগুলো তার মধ্যে খুব সুন্দরভাবে ছিল।
রাজু আলাউদ্দিন: এর বাইরে যদি অন্য কিছু থাকে সাহিত্যে, তাহলে কি আপনি তাকে ইতিবাচক বলে মনে করবেন?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: কোনটা ?
রাজু আলাউদ্দিন: মানে অঙ্গীকার যদি না থাকে. . .
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: অঙ্গীকার তার ছিল। অঙ্গীকার যদি না থাকে… গরীব মানুষ নিয়ে লিখেছে, মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সাথে তার যোগাযোগ ছিল না। অথচ আমরা মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে উপজীব্য করেই লিখতে চাই। কাকে নিয়ে লিখছি সেটা জরুরী না। বালজাকের কথা বলা হয়, বালজাককে তো প্রতিক্রিয়াশীল বলা হতো.. .
রাজু আলাউদ্দিন: মার্কসের তো প্রিয় লেখক ছিল.. .
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: রাজতন্ত্রের সমর্থক ছিলেন বলা হয়ে থাকে। কিন্তু মার্কসের প্রিয় লেখক . . . কেননা উনি উন্মোচিত করে দিয়েছিলেন রাজতন্ত্র জিনিসটা কী।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনিতো নতুন করে আবার পত্রিকা সম্পাদনা করছেন ‘নতুন দিগন্ত’। তো এর আগে আপনি বোধহয় মুক্তধারার ‘সাহিত্যপত্র’ সম্পাদনার সাথে ছিলেন।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: হ্যাঁ, করেছিলাম।
রাজু আলাউদ্দিন: ঐ পত্রিকাগুলো সম্পাদনা করার ফলে আপনি কি মনে করেন ইতিবাচক কোন প্রভাব পড়েছে?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: প্রভাব অবশ্যই পড়েছে। কেননা নতুন লেখক তৈরী হয়েছে। অনেক লেখকের প্রথম লেখা আমাদের পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। আর আমরা একটা পাঠকের রুচি তৈরী করার ক্ষেত্রে একটা ভূমিকা পালন করতে পেরেছি।
রাজু আলাউদ্দিন: বিপ্লবের পক্ষে কোন না কোনভাবে?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : না, বিপ্লব তো একটা স্থুল ব্যাপার হয়ে যাবে। এটা হলো যে সমাজে একটা পরিবর্তন আনা। মানুষের রুচিতে, মানুষের চেতনায়, মানুষের অনুভবে প্রভাব ফেলা। তার মধ্যেই একটা বিপ্লব আসবে।
রাজু আলাউদ্দিন: মানে একটা রুচি তৈরী করা।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : রুচিই তো ধারন করবে মানুষের চেতনাকে, মানুষের বিচক্ষণতা এবং মানুষের বিচার ক্ষমতাকে। এইটা তৈরী করা তো জরুরী।
রাজু আলাউদ্দিন: এজন্য বহু পত্রিকা আছে বাংলাদেশে।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: না, তারাও করছে। আমি মনে করছি আমাদের একটা ভূমিকা থাকা উচিত। এখন আমি যে পত্রিকাটি সম্পাদনা করছি ‘নতুন দিগন্ত’ এটা নির্দিষ্টভাবেই সমাজ রূপান্তরের জন্য। এর প্রতি প্রকাশনা হচ্ছে সমাজের রূপান্তর অধ্যয়ন কেন্দ্র থেকে। একটা সামাজিক পরিবর্তন আনার লক্ষ্য আমাদের সামনে আছে।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনি ইদানিং কী করছেন?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : অনেক কিছু করছি, আপনি এখন সংক্ষিপ্ত করেন, অনেক হয়ে গেল তো। এত বড় ইন্টার্ভিউ নেবেন আপনি? আমি এখন যেটা লিখছি সেটা হচ্ছে যে একটা বড় ধারাবাহিক লিখছি আমাদের পত্রিকাতে। সেটা হচ্ছে জাতীয়তাবাদ সাম্প্রদায়িকতা ও জনগণের মুক্তি। এই প্রসঙ্গে এই যে দেশ ভাগ হলো পাকিস্তান হলো ১৯০৫ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত– এই ইতিহাসটা আমি নতুন ভাবে বোঝার চেষ্টা করছি। এবং এ সংক্রান্ত যত বইপত্র পাচ্ছি, সব পড়ছি।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা, অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (12) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Minhajur Rahman — মে ১৭, ২০১৫ @ ৮:৩১ অপরাহ্ন

      A great interview of a great man.I have come to know him when I was 12 years old.He has a great speaking power-that’s what I thought at the time when I was little and still I think he is one of the greatest speaker.I was not sure he was alive.May Almighty give him over 100 years.I thank Razu Alauddin for this great interview.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শিমুল সালাহ্উদ্দিন — মে ১৮, ২০১৫ @ ১:৫০ পূর্বাহ্ন

      খুবই দারুন সাক্ষাৎকার। সাক্ষাৎকারগ্রহীতাকে অভিনন্দন। ঈর্ষা হচ্ছে তাকে। আরো এমন সাক্ষাৎকার চাই আর্টসের কাছে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ড. মোঃ আনোয়ার হোসেন — মে ১৮, ২০১৫ @ ৮:১৬ পূর্বাহ্ন

      প্রিয় রাজু আলাউদ্দিন,
      আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সাথে আপনার দীর্ঘ আলাপচারিতা ভাল লেগেছে। আপন বিশ্বাসে নিরবিচ্ছিন্ন ও অটলভাবে নিষ্ঠ থাকেন এমন মহাপ্রাণ কয়েকজন আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। এই মুহূর্তে সরদার ফজলুল করিম ও অধ্যাপক সালাউদ্দিন আহমেদের কথা খুব মনে পড়ছে। এখন এই সময়ে জীবিতদের মধ্যে যে নামটি উজ্জ্বল হয়ে আছে, তিনি অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। নানা বিষয়ে আলোচ্য মানুষটির ভাবনা কালি কলমে আনতে যেমন আলাপচারিতার প্রয়োজন হয়, তার সূত্রপাত আপনি করতে পেরেছেন। তাই দীর্ঘ হলেও সাক্ষাৎকারটি উপভোগ্য হয়েছে। শুধু সাহিত্য নয়, রাজনীতি ও সমাজ পরিবর্তন বিষয়ে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর এখনকার ভাবনা এই আলাপচারিতায় উঠে এসেছে। পরিবর্তনের প্রশ্নে মূল অঙ্গীকারে তিনি যে দৃঢ়চিত্ত ও একাগ্র আছেন, তা সবার জন্য প্রেরণার বিষয় বটে। আপনার আরও দুটো আলাপচারিতা আমি পড়েছি। সেগুলোও দীর্ঘ ছিল। তার জন্যই নানা বিষয়ে জেনেছি। তারপরও একটি বিষয় মনে হয়েছে, তা হলো আলাপচারিতাকে একটু ঋজু, টানটান করা। ভেবে দেখতে পারেন। স্যারের জন্য শুভেচ্ছা। আপনাকে ধন্যবাদ উদ্যোগটির জন্য।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Tapan Chakraborty — মে ১৮, ২০১৫ @ ৫:৪৯ অপরাহ্ন

      অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সমসাময়িককালের সংস্কৃতি, রাজনীতি ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে সমগ্র বাংলা ভাষাভাষী জনগণের দৃষ্টিতে অসীম আকাশের ধ্রুবতারা এবং দিশাহীন সাগরের বাতিঘর। তাঁর দীর্ঘ পরমায়ু কামনা করি। রাজু আলাউদ্দিন সাক্ষাৎকার গ্রহণের এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করায় আমি ব্যক্তিগতভাবে এবং প্রগতিশীল জনগণের পক্ষ থেকে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।
      তপন চক্রবর্তী,
      লেখক, শিক্ষাবিদ ও চিকিৎসক
      মাগুরা

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Badol Shah Alom — মে ১৮, ২০১৫ @ ৯:৫৮ অপরাহ্ন

      Really a great interview of a great man with rare,important and essential informations . We want more interview to Razu Alauddin like this.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন mostafa tofayel — মে ১৯, ২০১৫ @ ১১:১৭ পূর্বাহ্ন

      Dr Sirajul Islam Chowdhury is my teacher in that he took my M.A. final viva test at R.U. in 1975.I used to contribute in his Sachitro Shomoy during 1990-95. One of my such poems was popular enough to be recited in the D.U. TSC area. I have been closely associated with his writings for about quarter of a century. He is a socialist and a moderately advanced political thinker.So far as I can recollect, he has a book of translation of Najrul’s poetry, including Rebel. I still own a copy of it. In his interview with Razu Alauddin, he has opined that D H Lawrence was a reactionary novelist. But one with warm support for the working class, his deep love for art and nature and profound secular notions about animism and pantheism can hardly be termed reactionary. T.S.Eliot was a lover of religions and traditions, but not D.H.Lawrence. He was a liberal artist, a humanist, animist and a secular. In Sons and Lovers he describes Nature as his supreme God. In his Women in Love his idea of the emancipation of women and gender equality is in line with Rokeya philosophy. Thanks to Razu Alauddin. I would request him rather for a follow up.Time is passing out so fast, please gear up your pursuit of discoveries.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আনিস মামুন — মে ১৯, ২০১৫ @ ১১:৩৭ পূর্বাহ্ন

      স্যার কে সালাম জানাই , ধন্যবাদ জানাই রাজু আলাউদ্দিন –আপনাকেও । সিরাজ স্যার-এর দৃষ্টিভঙ্গী সব ক্ষেত্রে ভালো লাগেনি । ব্যক্তি সমালোচনা তিনি করেননি কাউকেই–আমার কেন যেনো মনে হলো এর মাধ্যমে তিনি বিতর্ক এড়িয়ে চলতে পছন্দ করেন । তবে স্যার যেমন বলেছেন -নিজেকে বিকশিত ও আলোকিত করেই বিরুদ্ধ অন্ধকার দূর করতে হবে–সে চেষ্টাই করবো ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মিঠুন চাকমা — মে ২০, ২০১৫ @ ৯:১২ পূর্বাহ্ন

      তাঁর সাক্ষাতকারে তিনি হুমায়ুন আজাদ সম্পর্কে বলছেন,

      “হুমায়ুনের একটি অসাধারণ গুন ছিল, হুমায়ুন ছিল অসাধারণ পরিশ্রমী, এই রকম পরিশ্রমী খুব কম দেখেছি। আমার সাথে তার খুবই অন্তরঙ্গতা ছিল, তবে আমার খুব দুঃখ লাগে এই যে তার বিপদগুলো ডেকে আনলো, আমি ওই রকম বিপদ ডেকে আনতে চাই না।”
      হুমায়ুন আজাদ যা বলতেন তা খুব জোর দিয়ে রূঢ় ভাষায় না হলেও তীক্ষ্ণ ভাষায় বলতেন। তাঁর এই বলার কারণেই আজ তিনি নেই!! হুমায়ুন আজাদ নিজের বিপদ ডেকে আনলেন। যেমন ডেকে আনলেন অনেকেই।
      আর প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, তিনি নিজের সম্পর্কে বলছেন,
      “হয়তো আমার মধ্যে অতটা বীরত্ব নেই, আমি অতটা সাহসী নই। কেউ কেউ বলবে আমি হয়তো কাপুরুষ।”
      সহজ স্বীকারোক্তি।
      মৌলবাদী ঘাতকের দ্বারা হত্যার শিকার এক বুদ্ধিজীবী হুমায়ুন আজাদ, যিনি দুঃসাহসী এবং অন্যদিকে ‘সাহসী নই’ জীবনদর্শনে আক্রান্ত বর্তমান প্রথিতযশা বুদ্ধিজীবী, এই দুইয়ের মাঝে যেন নিঃসীম ক্লীবতা, সৎসাহসের খরা! এই-ই যেন দেশের চলমান বেঘোর চেতনার যাপিত জীবন!
      রাজু আলাউদ্দিনকে ধন্যবাদ শ্রদ্ধেয় শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সুন্দর সাক্ষাতকারটির জন্য।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আকতার হোসেন — মে ২০, ২০১৫ @ ১১:১২ পূর্বাহ্ন

      অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন ‘একটা দেশের জাতীয় সম্পদ নিজের সম্পদ, সেটাকে দ্বিতীয়বার পাওয়া যাবে না, শেষ হয়ে গেলে শেষই হয়ে গেল’। তিনি নিজেও আমাদের জাতীয় সম্পদ এবং সেই সম্পদকে আমাদের কাছে পৌঁছে দেবার জন্য রাজু ভাইকে অশেষ ধন্যবাদ। ইংরেজির শিক্ষক হয়েও তিন এই দীর্ঘ সাক্ষাতকারে সম্ভবত দশটি ইংরেজি শব্দের বেশি ব্যবহার করেন নি। যেমন tragedy, Fascism, version, course, critical, British, government, class, eight interview এই একটি মাপকাঠি দিয়ে আমরা সত্যিকার আদর্শ ও জ্ঞানী মানুষ চিনে নিতে পারি। আজ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মত জ্ঞানী মানুষের বড়ই অভাব। তাঁর দীর্ঘজীবন কামনা করি।
      এই সাক্ষাতকারের ভাল লাগা অংশগুলোর মধ্যে আপোষহীনতা আর মৌলবাদের মধ্যে টানা তাঁর বক্তব্য সবচাইতে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ‘আপোষহীনতা বিকশিত হচ্ছে, মৌলবাদ তো বিকশিত হয় না, এটাতো অন্ধ’। আর যে কথাটির সাথে দ্বিমত করি তাহলো তিনি বলেছেন ‘৭১ সালে কি আমরা অপেক্ষা করেছিলাম কারো জন্য যে কে কখন আসবে, কে কখন নেতৃত্ব দেবে? তারপর একটা যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছে নেতৃত্বহীন অবস্থায়। নেতাদের কাউকে তো আমরা দেখিনি এবং খুঁজেও পাইনি’। দ্বিমত এইজন্য করছি যে, স্বাধীনতার মত এত বড় একটা অর্জন নেতৃত্ব ছাড়া সম্ভব হয়েছে সেটা মেনে নিলে সত্যকে অস্বীকার করা হবে। সুবিধাবাদী কিছু নেতা-কর্মী সব সময়ই থাকবে। বিপদের দিনে সুবিধাবাদী নেতা-কর্মীদের দেখা না পেলেও অন্য যারা সাথে থেকেছেন তাদের অবদানের কথা ভুলে গেলে তাঁদের ছোট করে দেখা হবে। প্রবাসী সরকার, যুদ্ধক্ষেত্র, বিদেশে প্রচার, বন্ধু যোগার, সাহায্য সহযোগিতা পাওয়া, বড়বড় দেশগুলোর সরকারে বিরুদ্ধে সেই সমস্ত দেশের জনগণের ভূমিকা, ভারত সরকার ও জনগণের সমর্থনের সফলতা, ছাত্র কৃষক শ্রমিক সাধারণ মানুষকে প্রশিক্ষণ দিয়ে একটি দেশের চৌকস সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করানো। দশকোটি শরণার্থীর জন্য অন্য একটি দেশের মাটিতে বসে খাদ্য স্বাস্থ্য বাসস্থানের ব্যবস্থা সহ শতশত কাজ নেতৃত্ব ছাড়া হয়েছে বললে ভুল বলা হবে। জনগণ যদি সঠিক পথে হাটতে সক্ষম হয় তখনই বুঝতে হবে সঠিক নেতৃত্বের ছোঁয়া লেগেছে। আমার মনে হয় ৭১ এ জনগণের বৃহত্তর অংশের বিচ্যুতি না হবার পেছনে বড় ধরনের নেতৃত্বের আভাস পাওয়া যায়। পাকিস্তানীদের আক্রমণের তীব্রতার কারণে জনগণের কাতারে কাতারে হয়তো সব নেতারা থাকতে পারে নি তাই বলে নেতৃত্বহীন অবস্থায় দেশ ও জাতি ছিল একথা বিশ্বাস করি না। সঠিক নেতৃত্ব কি তাকেই বলে না যে, নেতার অবর্তমানে আন্দোলন সংগ্রাম এগিয়ে চলবে। এমন প্রস্তুতি না থাকলেতো তাকে দুর্বল নেতৃত্ব বলতে হবে। জনতার আশা আকাঙ্ক্ষা ও চেতনার মধ্যে নেতার বিচারণ তাকেই আমি বলি সঠিক নেতৃত্ব। নেতা দৃশ্যমান হবার আবশ্যকতা খুব বেশি জরুরী নয়। তাহলে বাংলাদেশে বসে মার্ক্সবাদী হবার সম্ভাবনা কি করে সম্ভব। ব্যক্তি কখনো নেতা হতে পারে না। ব্যক্তির ভেতর জাগরণী শক্তিই সেই ব্যক্তিটিকে নেতা বানিয়ে দেয়।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন mostafa tofayel — মে ২০, ২০১৫ @ ৯:১৯ অপরাহ্ন

      In course of his long iinterview, our respected sir Dr Chowdhury has pronounced his deep concern that for the promotion of enlightenment we ought to launch cultural programs, enact new dramas,edit wall magazines and increase the number of libraries. But I would like to draw attention of all concerned to the fact that Dhaka city at present is running short of book shops to make available original books of English literature. Almost all the erstwhile bookshops at Newmarket and stadium market are either closed or are running with other items. The situation is alarming about the fate of English in Bangladesh. It’s a crisis which needs to be addressed. on a priority basis.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন poliar wahid — মে ২৭, ২০১৫ @ ৬:৪৯ অপরাহ্ন

      সামনাসামনি বসেছেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর, কিন্তু আলোচনা পেড়েছেন সমগ্র বাংলাদশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সাহিত্য, ভূগোল, বাণিজ্য ; সবকিছু একাকার। রাজু ভাই আপনার সাক্ষাতকার মানে বুদ্ধিবৃত্তিক মহড়া। অসাধারণ লাগলো। কথা আদায় করাতে আপনি উস্তাদ বটে। দুজনকে ভালোবাসা এবং শুভকামনা। আপনার আরো সাক্ষাতকার পড়ার অপেক্ষায় থাকলাম।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তাপস গায়েন — মে ৩০, ২০১৫ @ ৯:৪১ পূর্বাহ্ন

      বাংলাদেশ কোন্‌ দিকে এগুচ্ছে, তা জানতে এই সাক্ষাৎকারটি একটি জরুরি কাজ হয়ে রইল । সামাজিক পরিবর্তনের জন্য রাজনৈতিক সংগঠন, মনীষা, ইত্যাদির অভাব বাংলাদেশে আছেই । বর্তমান বাংলাদেশের প্রধান ভাবুকদের ভাবনাগুলো লিপিবদ্ধ থাকা জরুরি, যদিও দেশের মৌলিক কোনও পরিবর্তনের কোনও ইঙ্গিত নেই । কবি রাজু আলাউদ্দিন এবং অধ্যাপক সিরাজুল ইসলামকে অনেক ধন্যবাদ এই যৌথ কাজটি আমাদের কাছে উপস্থিত করার জন্য !

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com