নন্দিতা বসুর সাক্ষাতকার: “তসলিমার মধ্যে অনেক মিথ্যা ভাষণ আছে”

রাজু আলাউদ্দিন | ১০ মে ২০১৫ ৯:৩৮ অপরাহ্ন

dsc01187.JPGনন্দিতা বসু মূলত অধ্যাপক ও লেখিকা। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনার সূত্রে শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন অধ্যাপক রবীন্দ্রকুমার দাশগুপ্ত এবং অধ্যাপক শিশিরকুমার দাশকে। পরবর্তীকালে ১৯৮১ সালে শিশিরকুমার দাশের তত্ত্বাবধানে বাংলা বিদ্যাচর্চা উনিশ শতক শিরোনামে পিএইচডি গবেষণা সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে তিনি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভারতীয় ভাষা ও সাহিত্য বিদ্যাচর্চা বিভাগের অধ্যাপক। গল্প, প্রবন্ধ লেখার পাশাপাশি ভারতীয় অন্যান্য ভাষা থেকে বাংলায় তিনি বেশ কিছু গল্প উপন্যাসও অনুবাদ করেছেন।

বাংলা ভাষায় গবেষণার ক্ষেত্রে বাংলা বিদ্যাচর্চা উনিশ শতক গ্রন্থটির গুরুত্ব এই যে বাংলাভাষা যে বিদ্যাচর্চা হিসেবে একটি স্বতন্ত্র মর্যাদা দাবী করতে পারে এই প্রথম বিপুল পরিমাণ তথ্যকে বিচার বিশ্লেষণের মাধ্যমে হাজির করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এই বইটিকে কেন্দ্র করেই গত দুই এপ্রিল দিল্লিস্থ তার বাসভবনে কবি ও প্রাবন্ধিক রাজু আলাউদ্দিনের সাথে তার একটি দীর্ঘ আলাপ হয়েছিল। ভিডিওতে ধারণকৃত সেই দীর্ঘ আলাপচারিতার অনুলিখন করেছেন তরুণ লেখক অলাত এহসান। লেখিকা কর্তৃক পরিমার্জিত অনুলিখনের চূড়ান্ত রূপটি এখানে ভিডিওসহ উপস্থাপন করা হলো। বি. স.

রাজু আলাউদ্দিন: আপনার গবেষণাকর্মের নাম ছিল বাংলা বিদ্যাচর্চায় উনিশ শতক। গবেষণার জন্য এ রকম একটা বিষয় বেছে নিলেন কেন?
নন্দিতা বসু: আমি যখন এমএ পড়তাম, তখন শিশিরকুমার দাশ, যিনি আমার শিক্ষক, তিনি একটা বিষয় প্রথম দিন থেকে আমাদের মাথায় ধরিয়ে দিয়েছিলেন। এই যে বাংলায় আমরা এমএ পড়ছি, এটার কিন্তু গভীর ভিত্তিভূমি নেই, সলিড ব্যাকগ্রাউন্ড কিন্তু নেই। উনি বলতেন, বিদ্যার জগতে ইতিহাস বা সমাজবিদ্যা, ইভেন ইংরেজি সাহিত্য যেভাবে পড়ানো হয়, আমাদের বাংলা সাহিত্য সেভাবে কিছুতেই পড়ানো হয় না। স্যার বললেন, এটা একটা নলেজ, এই নলেজের একটা দৃঢ় ভিত্তি চাই। উনি বললেন, বাংলা ভাষাকে সবসময়ই অন্য ভাষার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে বেঁচে থাকতে হয়েছে। যেমন কখনও সংস্কৃত, কখনও ফার্সি, কখনও ইংরেজি। সেই ভাষাগুলোর বাঙালি সমাজে যে কদর আছে, যে স্থান আছে, বাংলার কোনোদিনই সেটা ছিল না। এবং বাঙালিরাই বাংলা ভাষাকে সবচেয়ে বেশি অমর্যাদা করেছে। যেমন সংস্কৃতির পণ্ডিতরা করেছেন, ফার্সি জানা লোকেরা করেছেন। যেমন উনি অনেক সময় বলতেন, একেকটা উদাহরণ দিয়ে, মাইকেলের ‘বুড় সালিকের ঘাঁড়ে রোঁ’তে উনি যে ‘জহীন’ ব্যবহার করেছেন। ‘জহীন’ একটা ফার্সি শব্দ। একজন নব্য যুবক একটি ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করেছে, ভক্তপ্রসাদ সেটা পছন্দ করতেন না বলে বলল যে বিদ্যা হল ফার্সি। শিখতে হলে ফার্সি।

তারপর আমি যখন এমএ পাশ করলাম, তখন আমি ভাবলাম, আমায় যদি এখানে চাকরি-বাকরি পেতে হয় তাহলে আমাকে তো এবার পিএইডি করতে হবে। পড়তে আমার ভালো লাগত ঠিকই। কিন্তু জীবিকারও দরকার ছিল। তখন আমি বললাম যে, আমি সমালোচনা সাহিত্যের উপর কিছু কাজ করতে চাই। উনি শুনলেন-টুনলেন। পরে উনি বলেন, দেখো, বাংলাটা যে কীভাবে আমাদের পড়াবার ক্ষেত্রে এল তার কোনো ইতিহাস নেই। তার কারণ, যেমন উনি বলতেন—আগে স্কুলগুলোতে বাংলার আলাদা কোনো টিচার থাকতেন না। সবসময় সংস্কৃতর শিক্ষকরাই বাংলা পড়িয়েছেন।
আপনার মনে পড়েবে, বুদ্ধদেব বসুর একটি গল্প আছে, ‘একটি জীবন’। তাতে তিনি দেখিয়েছেন, সংস্কৃতের মাস্টার যে বাংলা পড়ান, পড়াতে পড়াতে উনি দেখছেন যে, সংস্কৃত দিয়ে আর বাংলা পড়ানো যাচ্ছে না।
“আমার প্রজাগণ আমার চেয়ে তাহারে বড় করি মানে।”– রবীন্দ্রনাথের এমন একটা কোটেশন আছে। এই ‘চেয়ে’ উনি দেখিয়েছিলেন ভার্ব (Verb) হিসেবে, ‘চেয়ে’ মানে চাওয়া। কিন্তু একটা ছাত্র ধরিয়ে দিল, চেয়ে মানে চাওয়া নয়, চেয়ে মানে একটা কোয়ালিফাইং(Qualifing), মানে তুলনা, কারও থেকে। সেটা থেকে সংস্কৃতের শিক্ষক একটু ধাক্কা খেয়ে গেলেন। উনি বললেন, ‘না, বাংলা ভাষা সংস্কৃতের থেকে অনেক বদলে গেছে।
সেই ইতিহাসটার জন্য উনি আমাকে বললেন যে, তুমি যদি আমার কাছে করতে চাও তাহলে আমি এইটাই করাব। আর অন্য কোনোকিছু করাব না। তখন আমি জানতাম, আমি গবেষণা করতে চাই এবং উনার কাছেই করতে চাই। কাজেই উনি যেটা বলছেন, আমাকে সেটাই করতে হবে।
তার কিছুদিন বাদে, অন্তত তিন মাস, আমি ঠিক ওটা ধরতে পারিনি। তখন উনি বলেছিলেন, তুমি এটা ছেড়ে দাও, তুমি এটা পারবে না। তুমি অন্যকিছু বেছে নাও। কিন্তু তখন আমার একটা জেদও চেপে গিয়েছিল। বললাম, পারব না কেন? আমাকে ওটার যোগ্য হতে হবে। তারপর অনেকদিন গেল। একদিন সকালে ইউনিভার্সিটিতে গেছি, কর্মচারীরা স্ট্রাইক করেছে, বসার কোনো জায়গা নেই। যেখানেই আমরা গেছি, কর্মচারীরা সকালে দরজা খোলেনি। তারপর অনেক জায়গা ঘুরে গিয়ে, একটা ফ্যাকাল্টি রুম ছিল, ওখানে গিয়ে বসি। আমি চিনতামও না অত জায়গা, ইউনিভার্সিটির আরও কোথায় কী আছে। কারণ আমার ডিপার্টমেন্টের জায়গাটাই কেবল চিনতাম। তো উনি সেদিন শুনলেন। শুনে খুব খুশি হলেন। বললেন, ঠিক আছে এটা চালিয়ে নাও। উনি খুব স্বল্পভাষী লোক ছিলেন। খুব কম কথা বলতেন। চটপট উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতেন না। তো, সেদিন আমারও ভালো লেগেছিল। মনে হয়েছিল, অনেকদিন পর একটা বন্ধ দরজা ধাক্কা দিয়ে নাড়ানো গেছে।



রাজু আলাউদ্দিন: আপনার এই বাংলা বিদ্যাচর্চাকে বিষয় হিসেবে নেওয়ার আগে কি ভেবেছিলেন, এইটার বিস্তার কতখানি? নাকি না ভেবেই নিয়েছিলেন। কারণ আপনার বইটা পড়তে গিয়ে লক্ষ করলাম, এর বিস্তারটা আসলে অনেক। এই বিদ্যাচর্চার নানাদিক আপনি দেখাবার চেষ্টা করছেন। এর ঐতিহাসিক, সামাজিক, সাহিত্যিক, বিভিন্ন প্রতিক্রিয়াগুলো; একই সঙ্গে ছন্দেরও প্রসঙ্গ আপনি এনেছেন। এগুলো কি আপনি আগে অনুমান করেছিলেন, না করতে গিয়ে আপনি দেখেছেন?
নন্দিতা বসু: করতে গিয়েও দেখেছি। উনিও আমাকে ধরিয়ে দিয়েছেন এই জিনিসটা। আসলে ইংরেজিতে একটা-দুটো বইয়ের কথা উনি বলেছিলেন। একটা হচ্ছে, ইএমডব্লিউ টিলিয়ার্ডের বই। ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটিতেও…, কী করে ইংরেজিটা একাডেমিক ওয়ার্ল্ডে জায়গা করে নিয়েছে, তার জন্য তাকে কত বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে, আমাদের তা পড়তে হয়েছে। আরও একটা বইয়ের কথা বলেছিলেন। যাই হোক, দুটো বই-ই আমি সংগ্রহ করে পড়েছিলাম। তা থেকে মোটামুটি ধারণা হয়েছিল, কীভাবে যাচ্ছি। তারপর পরের দিকে শিশির বাবু কিন্তু লেখাটা আমার উপর ছেড়ে দিয়েছিলেন। আমি এ কথাটা বলছি যে, প্রথম প্রথম আমি সব লেখাই তাকে পড়ে শোনাতাম, কিংবা উনি দেখতেন। পরের দিকে আমি কিন্তু উনার একটা কনফিডেন্স পেয়েছিলাম যে, আমি ঠিক পথেই এগুচ্ছি। সেইভাবে আস্তে আস্তে বিষয়টার ভেতরে প্রবেশ করতে করতে আমার নিজেরও কিছু ধারণা হয়েছিল। আমি ভাবিনি কোথায় কোনো মেটিরিয়াল পাব, কিন্তু আমি পেয়ে গেছি। যেটার কোনো কোনোটা হয়ত উনিও জানতেন না। সেভাবেই এগিয়েছিলাম।
রাজু আলাউদ্দিন: এই বিস্তারের প্রসঙ্গটা আমি বললাম এই জন্য যে, যেমন এর মধ্যে একইসঙ্গে বাল্যশিক্ষা পাঠ্যপুস্তক ও শিক্ষক; আরেকটা অধ্যায় আছে—বাংলাভাষা চিন্তা, ব্যাকরণ, অভিধান ও ভাষাতত্ত্ব। আরও তো অনেক বিষয় ছিল একই সঙ্গে। ফলে এর বিস্তারের কথা যদি বিবেচনা করি তাহলে কিন্তু কাজটা অত সহজ না। যথেষ্ট কঠিন। কঠিন এই অর্থে যে, এর পেছনে আপনার যে বিপুল পরিমাণ পাঠ, সেগুলোকে আবার সু-সংগঠিত করা, অধ্যায় অনুযায়ী এগুলোকে সাজানো। এই কাজটা আপনি কী করে সম্ভব করে তুললেন?
নন্দিতা বসু: একটা জিনিস, আমি যখন এমএ পড়তাম, তখনই দেখতাম শিশিরবাবু একটা জিনিস (বিষয়) কঠিন—এটা ভেবে পিছিয়ে যাওয়া উনি ভাবতেই পারতেন না। একজন যখন একটা বিষয় নিয়ে কিছু কাজ করবে, তখন তো তাকে এটার জন্য তৈরি থাকতে হবে। অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে, অনেক জায়গায় দৌড়াদৌড়ি করতে হবে, সহজভাবে পাওয়া যাবে না। গবেষণা করা মানে তা-ই। সহজভাবে একটা কিছু হয়ে যাবে, এটা উনার স্বভাবের মধ্যে ছিল না।
রাজু আলাউদ্দিন: মানে জ্ঞানের কোনো সংক্ষিপ্ত পথ নেই।
নন্দিতা বসু: হ্যাঁ, হ্যাঁ। সেটাই।

রাজু আলাউদ্দিন: আরেকটা জিনিস হচ্ছে, বিষয় হিসেবে এটা খুব ইন্টারেস্টিং যে, এই বিদ্যাচর্চার বয়স কম হলেও এর নানামুখিতা ছিল। তথ্যের বিষয়ে আপনি তো প্রস্তুত কোনো মডেল পাননি। মডেল ছিল না। ফলে একক প্রচেষ্টায় এটা আপনাকে তৈরি করেতে হয়েছে। এবং আমি বলব যে, গবেষণা কাজ হিসেবে এটি অত্যন্ত উঁচুমানের একটি গবেষণা। এটার পেছেনে শিশিরকুমার দাশের নির্দেশনা কাজ করেছে।
নন্দিতা বসু: হ্যাঁ, নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই। উনি এটা আমাকে ধরিয়ে দিয়েছিলেন। করতে করতে আমি দেখেছি যে, আমাদের ন্যাশনালিস্ট স্ট্রাগল যেটা চলছিল, সেটাও অতখানি সাহায্য করেছে। যেমন ধরুন রাজনারায়ন বসুরা একটা সভা তৈরি করেছিলেন, সেই সভায় ফতোয়া দেওয়া হয়েছিল–সভায় যতক্ষণ কাজ হবে, বক্তৃতা হবে কেউ ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করতে পারবে না। আরও তখন কলকাতা ও তার আশপাশে ‘জ্ঞানবর্তিকা সভা’ থেকে শুরু করে অনেক সভা তৈরি হয়েছিল যেখানে সাহিত্যবিষয়ক নানান ধরনের আলোচনা হত। এছাড়াও সংস্কৃতিবিষয়ক অনেক আলোচনা হত। যেটা আমিও খেয়াল করেছি যে, এত বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে সেখানে ভাষার ‘এরিয়া অফ অপারেশন’টা বেড়ে যায়। নতুন শব্দ তৈরি হয়েছিল সেখান থেকে। নতুন জিনিস নতুনভাবে বোঝার চেষ্টা হচ্ছে। ওখানে তো এই বিষয়ে আলোচনা হয়নি। ওখানে তো জানে না, কীভাবে আলোচনা হবে। আমাদের যেটা স্বাধীনতা আন্দোলন, সেটা ধরুন সেই হিন্দুমেলার সময় থেকে যেভাবে চলছিল। সেই জিনিসটা অনেক সাহায্য করেছে, বাংলা ভাষার প্রতি মানুষের একটা সম্মানজনক অনুভূতি তৈরি হয়েছে।
কারণ আমি শিশিরবাবুকে একটা লেখা দেখিয়েছিলাম যে, ‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকার একটা সংখ্যা পড়ে রামতনু লাহিড়ীকে কেউ এসে দেখিয়েছিলেন, মানে খুব উত্তেজিত হয়ে এসেছিলেন—রামতনু, রামতনু, বাংলায় কখনও দেখেছ এ রকম কঠিন বিষয় আলোচনা হতে! বলে ‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকাটা দেখিয়েছিলেন। তো সেভাবে একটা নতুন জিনিস হচ্ছে, নতুন একটা ঘটনা ঘটছে, সেই জিনিসটা ওই সময় তৈরি হয়েছিল।
আরেকটা জিনিসও আমি দেখেছি যে, যেমন স্কুলের পাঠ্যপুস্তক তৈরি হচ্ছে—স্কুল বুক সোসাইটি তৈরি করেছিল–স্কুলে নতুন কী পড়ানো হবে? তাতে যেমন ধরুন বাচ্চাদের, স্কুলের বাচ্চাদের নীতিশিক্ষার মধ্যে—‘পরনারী গমন নিষিদ্ধ।’
তাহলে একটা স্কুলের ছেলে, যার ধরুন দশ বছর বয়স, ও তো এসব বুঝতেই পারবে না কিছু। সেটা, এই ধরনের নতুন যে চিন্তাগুলো, যে সেনসিবিলিটিগুলো আসার কথা…।
আগে আমরা পূর্ববর্তী লোকদের দেখেছি, ওঁরা কিছু ভাবছেনই না যে, একটা শিশু, নয়-দশ বছরের ছেলে (ছেলেদের জন্যই তো বই হত সব) তারা এটা বুঝতে পারবে কি না। সেখানে এই সমস্ত ভ্যালুজগুলো থাকার কথা নয়। পরবর্তীতে বাংলা বইগুলোতে সে বিষয়গুলো আস্তে আস্তে আসছে। অর্থাৎ যে প্রাইমার তৈরি হচ্ছে, সে প্রাইমারগুলোর মধ্যেও বাংলাভাষায় প্রথম যেগুলো পড়ানো হত ‘দাতাকর্ণ’ বলে একটা ছিল—ধারাপাতগুলোর মতো একঘেয়ে। মানে ভালো লাগার কোনো জিনিসই নেই সেগুলোতে। আস্তে আস্তে আমরা দেখছি–অনুবাদক সমাজ—তারা বিদেশের অনেক বই অনুবাদ করতে শুরু করল। তার মধ্যে পরের দিকে বিজ্ঞানের বিষয়ও ছিল। ইংরেজি থেকেও অনেক ছিল—‘কুৎসিৎ রাজহংস’ ও ‘খর্বকায়ার বিবরণ’, ওই যে আগলি ডাকলিং অ্যান্ড থাম্বেলিনা।
রাজু আলাউদ্দিন: থাম্বেলিনার বাংলাটা কি হয়েছিল?
নন্দিতা বসু: খর্বকায়া।
রাজু আলাউদ্দিন: থাম্বেলিনার গল্পটা কিন্তু–আমার মনে পড়ছে—গ্রামে এটার আরেকটা ভার্সন ছিল। আমি ঠিক জানি না, ওই গল্প দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কি না, নাকি এটা আগে থেকেই ছিল। আমার ধারণা এটা আগে থেকেই ছিল। এই সাদৃশ্যটা কীভাবে তৈরি হল সেটা এখনও আমার কৌতূহল। আমি ছোটবেলা বন্ধুদের সঙ্গে ওই যে খেজুরবাগান—আপনি জানেন কি না জানি না, শরীয়তপুর-ফরিদপুর এলাকায়, যাদের খেজুরবাগান থাকে সেখানে তো গাছ কাটে রস নামানোর জন্য। (উনি তো বোধ হয় ওখানেরই লোক, নরেন্দ্রনাথ মিত্র, তার ‘রস’ গল্পটা-নন্দিতা বসু)। হ্যাঁ, নরেন্দ্রনাথ মিত্র ওখানকারই। তো সেই বাগানের মধ্যে টংয়ের মতো বানানো হয় খড়ের একটা ঘর। ওইখানে লোক থাকে। থাকে মানে পাহারা দেয়। আমার মনে আছে, আমি মাঝেমধ্যে যেতাম সেখানে বন্ধুদের সঙ্গে। তখন এদের মধ্যে আরেক বন্ধু মাঝেমধ্যে আসত। সে এসে নানারকম গল্প করত। আমি তখন শুনতাম, একাঙ্গুল্যার গল্প। এমন একজনের গল্প, যার আয়তন হচ্ছে এক-আঙুল, এক-আঙুলের সমান। পরে দেখলাম, থাম্বেলিনা ঠিক ওই রকমই, কাছাকাছি একটা গল্প আর কি। এবং এক-আঙুল-এর ওই লোক অসাধ্য সব কাণ্ড ঘটাচ্ছে। এই সাদৃশ্যের বিষয়ে আপনার কোনো পর্যবেক্ষণ আছে কি?
নন্দিতা বসু: না, সেটা আমি কিন্তু কখনও ভাবিনি।
রাজু আলাউদ্দিন: আরেকটা জিনিস, বাংলা বিদ্যাচর্চার ক্ষেত্রে, মানে বাংলাচর্চার ক্ষেত্রে সংস্কৃত পণ্ডিতদের একটা বড় ভূমিকা আছে। ওই পাশাপাশি সে সময় বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে মুসলমানদের কি ভূমিকা ছিল বলে আপনার মনে হয়?
নন্দিতা বসু: প্রথম যুগে গদ্য-টদ্য যারা লিখেছিলেন তাদের মধ্যে, মানে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে যারা গদ্য লিখছিলেন, তার মধ্যে মুন্সি যারা ছিলেন, তারা তো উর্দু বা ফার্সি পড়াতেন। বাংলা কোনো অনুবাদ করে ছিলেন কি? ‘তোতাকাহিনী’ তো অনুবাদ হয়েছিল। সেটা তো রামরাম বসুই করেছিলেন। সেটা বোঝা যায়, সেটা আরবি-ফার্সি গল্প থেকেই আসছে; ফার্সি তুতিনামার। কিন্তু…
রাজু আলাউদ্দিন: মুসলমান কাউকে তো পাওয়া যায় না সে সময়…
নন্দিতা বসু: না, একচ্যুয়ালি, যেমন ধরুন মীর মোশাররফ হোসেন। ওঁর গদ্যটা অনেকটাই সংস্কৃতঘেঁষা। তাঁর বিষাদ সিন্ধুর মধ্যে যেটা আছে। কিন্তু টেকচাঁদ ঠাকুর, মানে প্যারীচাঁদ মিত্র, তার লেখায় কিন্তু ফার্সি শব্দ অনেক ব্যবহার করেছিলেন।
রাজু আলাউদ্দিন: তবে সেখানে কলকাতার কথ্যরূপটা ছিল, বাংলার…
নন্দিতা বসু: হ্যাঁ, কথ্যরূপ। ঠকচাচার চরিত্রটার মধ্যে। যেমন ধরুন, মুসলমানি, মানে আরবি শব্দ ফার্সি শব্দ মিশিয়ে বলছে। বা এমনিও, হিন্দু বাড়ির মেয়েরাও, মানে কুলিন মেয়েরা, তাদের যে দুঃখটা স্বামীকে সন্তুষ্ট করার জন্য হুনুরি শব্দ ব্যবহার করছে। ‘হুনুরি কাজ করিয়া।’ এক কুলিন মেয়ে দুঃখ করে বলছে যে, স্বামী এসেই টাকা (মানে পয়সা) চায়। আমি টাকা কোথায় পাব? তখন আমি হুনুরি কাজ করিয়া কিছু পয়সা উপার্জন করিয়াছিলাম।
রাজু আলাউদ্দিন: এই ‘হুনুরি’টা কী?
নন্দিতা বসু: হুনুরি, মানে কোনো একটা স্কিল। পরে আমি দেখলাম যে, হুনার বলে ওটাকে। আপনি যদি কোনো একটা স্কিল অর্জন করেন তো–তু হুনার হ্যায়। তুমি এটাতে দক্ষ। সেলাইয়ের কোনো একটা কাজের দিকে সে একটা দক্ষতা অর্জন করেছিল। টেকচাঁদ ঠাকুর কথ্য ভাষার মধ্যে, সেই সময় নিশ্চয়ই, এমনিতেও এটা বাংলারও অঙ্গ ছিল যে, কিছু কিছু আরবি-ফার্সি শব্দ আছে তার মধ্যে।
রাজু আলাউদ্দিন: হ্যাঁ, এখন আরবি-ফার্সি শব্দ থাকবেই তার মধ্যে। কারণ, এটা এতদিনের মুসলিম শাসনের ফলাফল।
নন্দিতা বসু: হ্যাঁ। যে জিনিসগুলো ওদের কাছ থেকে আসছে। যেমন বিলাস দ্রব্য। যা ওদের কাছ থেকে এসেছে। যেমন টেইলারিং, সেলাই করার যে জিনিস, দর্জির যে কাজ সেটা তো আগে ছিল না। মুসলমানদের আসার আগে কোথাও ছিল না আমাদের। তো, সেই শব্দগুলো ওই ভাষারই রয়ে গেছে।
কিন্তু একটা দুঃখের কথা আরকি যে, একটা সময় সংস্কৃত ভাবাপন্ন, অর্থাৎ বাংলা গদ্যটা অনেক বেশি হিন্দুয়াইজড হয়ে গেল, যেটা বাংলা ভাষার একটা ক্ষতি। তখন এমনও কথা শোনা গেছে—যেটা আজকালকার দিনে খুবই আপত্তিকর মনে হয়, যে একজন মুসলমান লেখকের কথা বলা হয়েছে: তাঁর গদ্যে পেঁয়াজ-রসুনের গন্ধ নেই। মানে আরবি-ফার্সি শব্দ নেই।
কোনো একটা আলোচনা সভাতে, বাংলা ব্যাকরণ নিয়েই আলোচনা হচ্ছে তার মধ্যে একজন মুসলমান লেখকের নাম করা হচ্ছে, ওমুকের রচনায় পেঁয়াজ-রসুনের গন্ধ নেই। ও কী বলতে চাইছে? বোঝাই যায়, আরবি-ফার্সি শব্দ নিয়ে বলছে।
কিন্তু আরবি-ফার্সি বাদ দিয়ে বাংলা সাহিত্য তৈরি হবে, এটা বাংলা ভাষার পক্ষে তো খুব একটা ভালো জিনিস নয়। (না, তা তো বটেই-রাজু আলাউদ্দিন) আর যেখানে ভারতচন্দ্র রায় তো রয়েছেই। (প্রচুর আরবি-ফার্সি শব্দ সেখানে আসছে—রাজু আলাউদ্দিন।) তারা বাংলা ভাষার ঐশ্বর্যটাই বাড়িয়ে দিয়েছে।
রাজু আলাউদ্দিন: হ্যাঁ, কোনো সন্দেহ নাই। তো আবার আপনি যেটা বললেন যে, হিন্দু ভাবাপন্ন করে ফেলেছে ভাষাটাকে, তাই না? (হ্যাঁ—নন্দিতা বসু) সেটা কি আপনি সংস্কৃতায়ন করাকে বোঝাচ্ছেন, তাই তো!
নন্দিতা বসু: হ্যাঁ, হ্যাঁ। বাংলা ভাষাটাকে সংস্কৃত ভাষার আরও বেশি কাছে নিয়ে আসার চেষ্টা। কিন্তু টেকচাঁদ ঠাকুর সেটা করতে চাননি। কিন্তু অনেকে, যেমন মাইকেল মধুসূধন দত্তের কথাই ধরুন, ফিসারমেনস, মানে জেলেদের ভাষা।
রাজু আলাউদ্দিন: কিন্তু মাইকেল মধুসূদন দত্তের প্রহসনগুলোর ভাষা তো আবার অন্যরকম। সেগুলো অনেক বেশি কথ্য ভাষার কাছাকাছি, তাই না?
নন্দিতা বসু: হ্যাঁ, সেগুলো অনেক বেশি কথ্যভাষার কাছাকাছি। যে কারণে আরবি-ফার্সি ভাষার ব্যবহার আছে।
রাজু আলাউদ্দিন: মাইকেল মধুসূধনের ভাষার অগ্রগতির কথা যদি বলি, বা ভাষার শেকড়ের দিকে যাওয়ার কথা যদি বলি তাহলে প্রহসনগুলোর মূল্য অনেক বেশি।
নন্দিতা বসু: মধুসূধন প্রথম দিকে তো লিখেছেন তাই। প্রথম দিকে মাইকেল নাটক লিখলেন তো, না? (হ্যাঁ–রাজু আলাউদ্দিন)। ‘শর্মিষ্ঠা’ ১৮৫৭; ‘তিলোত্তমা সম্ভব’ ১৮৫৯। প্রথমে নাটক লিখেছেন তো তিনি।
রাজু আলাউদ্দিন: তারও আগে কবিতার মধ্যে তো সেই নিম্নবর্গের ভাষার যে কথ্য রূপ—সেটার চর্চা তো ছিল আগে থেকেই।
নন্দিতা বসু: বাংলা কবিতার মধ্যে?
রাজু আলাউদ্দিন: হ্যাঁ, বাংলা কবিতার মধ্যে। যেমন ধরা যাক শাহ মোহাম্মদ সগীর…
নন্দিতা বসু: হ্যাঁ, হ্যাঁ। তাদের আমরা মধ্যযুগের সাহিত্যিক বলি।
রাজু আলাউদ্দিন: কিংবা ধরুন সৈয়দ সুলতানের ভাষাও তো আসলে তাই। সেই যে কবিতা, ‘যারে যে ভাষে প্রভু করিল সৃজন, সেই ভাষা বোঝে প্রভু আপে নিরঞ্জন…’
নন্দিতা বসু: এটা মনে হয় আমি শাহ্ মুহাম্মদ সগীরের লেখাতেই পেয়েছি। আবার অন্যান্য লেখকরাও সেইম জিনিসটা লিখেছেন। সাহিত্যের ইতিহাসে নাকি অন্য লেখকের নামেই ওই লাইনগুলো পাওয়া যায়।
border=0রাজু আলাউদ্দিন: কবিতায় সেটা তো ছিল। কিন্তু তার পরে এসে, মানে আঠার শতকে বা উনিশ শতকের শেষের দিকে বাংলা গদ্য মানুষের মুখের ভাষার কাছে না গিয়ে সে চলে গেল একটা অবাস্তব শিষ্ট ভাষার দিকে বা সংস্কৃত ভাষার দিকে। এর কারণ কি আপনার এটা মনে হয় যে, তখনকার আমাদের শিক্ষিত সমাজ তারা আসলে ভুল সিদ্ধান্তের কারণে এই কাজগুলো করেছেন?
নন্দিতা বসু: হ্যাঁ, আমার তো তা-ই মনে হয়। একচুয়ালি বাঙালিরা যারা ফার্সি শিখেছিলেন, ভারতচন্দ্র তো খুবই ভালো ফার্সি জানতেন; ইভেন রবিবাবু আমাদের ক্লাসে বলেছিলেন (রবিবাবু মানে কি রবীন্দ্রকুমার দাশগুপ্ত?—রাজু আলাউদ্দিন)। হ্যাঁ, রবীন্দ্রকুমার দাশগুপ্ত। তিনি বলেছিলেন, এই যে ভারতচন্দ্র বললেন, ‘পড়িয়াছি যেই মত বর্ণিবারে পারি…/ না-রবে প্রসাদগুণ না হবে রসাল/ অতএব কহি ভাষা যাবনী মেশাল।/ মানসিংহ পাতশায় হইল যে বাণী/ উচিত সে আরবি ফার্সি হিন্দুস্তানি।’ কিন্তু সেটা লোকে বুঝতে পারবে না, না? ভবানন্দ মজুমদার–উনি কৃষ্ণচন্দ্রের পূর্বপুরুষ–উনি রাজা প্রতাপাদিত্যকে বন্দি করতে সাহায্য করেছিলেন, মোগলদের সাহায্য করেছিলেন। তখন মানসিংহ তাকে বলেন যে দিল্লিতে গিয়ে তাকে রাজাই পাইয়ে দেবেন। সেখানে মানসিংহের সঙ্গে জাহাঙ্গীর বাদশার যে কথা হল, সেটা বর্ণনা করার জন্য তো আরবি-ফার্সি-হিন্দুস্থানিতে করলেই ঠিক। কিন্তু লোকে তা বুঝতে পারবে না। অর্থাৎ কাব্যের ফর্মটা কী হবে সেটা নিয়ে যে একজন লেখক ভাবলেন, সেটা রবীন্দ্রবাবু সবসময়ই হিন্ট করতেন—অন্য সাহিত্য পড়েছিলেন বলে, ফার্সি সাহিত্য পড়েছিলেন বলে ভারতচন্দ্রে এই ফর্মের বোধটা এসেছিল। যারা অন্য সাহিত্য পড়েননি, তাদের মধ্যে ওই সেন্সটা ছিল না।
মানে অন্য ভাষা শিখেছি, সেই ভাষার সাহিত্য পড়েছি তার ফলে আমার মধ্যে যে অন্য বোধ আসবে, নতুন একটা বোধ, সে জিনিসটা…। আমাদের দেশে ফার্সি সাহিত্য অনেকে পড়েছেন কিন্তু তারা অত সাহিত্য চর্চার করেননি, যেটা ভারতচন্দ্র করেছেন। সে জন্য ফার্সি সাহিত্যের যে গুণ, বাংলা সাহিত্যে ঠিক সঞ্চারিত হতে পারেনি।

রাজু আলাউদ্দিন: মানে গদ্যকারদের হাত দিয়ে ঠিক সঞ্চারিত হতে পারেনি, তাই তো?
নন্দিতা বসু: হ্যাঁ, হ্যাঁ।
রাজু আলাউদ্দিন: আরেকটা যেটা বলা হচ্ছে, পরবর্তীতে, মানে তিরিশের কবিতা, আবার সেই গদ্যকারদের ভাষা, যে ভাষা জনগণের ভাষা থেকে দূরে গিয়ে কবিতা রচিত হল, তারা এক অর্থে আবার সেই পেছন দিকে চলে গেলেন। কিন্তু তারা, ওই নিম্নবর্গের নন্দনচেতনা যাকে বলে সেটা রূপায়নের চেষ্টা করেননি। (বা তারা কবিতার মধ্যে উঠিয়ে আনতে পারেননি।—নন্দিতা বসু)।
নন্দিতা বসু: দেখুন, ত্রিশের দশকে কবিদের মধ্যে যেমন ধরুন বুদ্ধদেব বসু, অমিয় চক্রবর্তী, বিষ্ণু দে যারা ইংরেজি সাহিত্য পড়েছিলেন তারা যে পাশ্চাত্য সাহিত্যের ধারাটাকে বাংলা সাহিত্যে আনবার চেষ্টার করলেন, সেটা অনেকেই—আপনার বইটার (আলাপচারিতা) মধ্যেই তো দেখলাম—আল মাহমুদ বলছেন, ‘ত্রিশের কবিরা বাঙালিই নয়’। সেটার (ত্রিশের দশক) মধ্যে অনেকের ধার করা জিনিস আছে সেটা বোঝা যায়। জীবনানন্দের মধ্যে নয় সেটা। জীবনানন্দ তো দেশের পরিস্থিতির সঙ্গে সেটা যেভাবে উন্নিত করতে পেরেছিলেন, সবাই তো সেটা পারেনি। বুদ্ধদেব বসুর কবিতার মধ্যে একটা ঝকঝকে ভাব আছে। কিন্তু এখন মনে হয় সেটা অনেক ফিকে। গভীরতা অনেক কম।
রাজু আলাউদ্দিন: সুধীন দত্তের ক্ষেত্রেও কি আপনার তাই মনে হয়?
নন্দিতা বসু: না, সুধীনদত্ত আমি সেভাবে বলতে পারব না।
রাজু আলাউদ্দিন: আর বিষ্ণু দে?
নন্দিতা বসু: বুদ্ধদেব বসুর তুলনায় সুধীনদত্ত, বিষ্ণু দে আমাদের দেশিয় পুরাণের গভীরে প্রবেশ করার চেষ্টা করেছে।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা, আচ্ছা। যদি ওই নন্দনতত্ত্বের কথা বলা হয়, ওই ভাষার কথা যদি বলা হয়, তাহলে তো সেই অর্থের সুধীন দত্ত কিংবা বিষ্ণু দে তারা সেই সংস্কৃত মনোভাবাপন্ন যে ভাষা (একটা এলিটিস্ট ভাষা বলতে যে ভাষা, সেই এলিটিস্ট ভাষা তারা তৈরি করে ছিলেন এবং খুব সচেতনভাবেই তৈরি করেছিলনে।—নন্দিতা বসু)। হ্যাঁ, সেটা করেছেন। এতে আমাদের যে সম্ভাবনা ছিল, নিজস্ব নন্দনতত্ত্ব তৈরি করার, সেটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে কি মনে হয় আপনার? বা সেই সম্ভাবনাটা বিলুপ্ত হয়েছে বলে মনে হয়? হতে তো পারে, না? এভাবে যদি ভাবা যায় যে, ইউরোপের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আমরা ওদের যে মডেলগুলো ব্যবহার করছি, ওদের যে ক্যানন (Canon)- এগুলো ব্যবহার করছি, সাহিত্যের যে মানদণ্ড, সেটা ব্যবহার করতে গিয়ে আমরা আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির মধ্যে যে সম্ভাবনাগুলো ছিল, সেই সম্ভাবনাগুলোকে আসলে অবহেলা করেছি কি না?
নন্দিতা বসু: নষ্ট করে দিয়েছে কিনা? মনে হয়। যদি পেছন ফিরি, বাই হাইন্ড সাইট এটা মনে হয়। কিন্তু দেখুন আমি ন্যারেটিভ যত পড়ি গল্প-উপন্যাস-গদ্য, কবিতার আমি কিন্তু অত ভালো পাঠক নই।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনার অবশ্য মূল ক্ষেত্র গদ্য। সেটা ঠিক আছে। কিন্তু আপনার ‘বিদ্যাচর্চা’র জন্য ছন্দের প্রসঙ্গ কেন অন্তর্ভুক্ত করলেন? মানে এটা না করলে তো কিছু হত না, করে আপনি সমৃদ্ধ করেছেন। কিন্তু আপনি কী ভেবে এটা অন্তর্ভুক্ত করলেন?
নন্দিতা বসু: ছন্দের যে ব্যাপারটা? (হ্যাঁ—রাজু আলাউদ্দিন)। আমি এইটা এই ভেবে করেছি, নতুন কী চিন্তাভাবনা আসছে। মানে বাংলা যে ঠিক সংস্কৃতের পুচ্ছ ধরে চলছে না, আলাদা হতে চাইছে, সেই জিনিসটার (বোঝানোর) জন্যই আমি করেছি। যেমন আমি সমালোচনার কথা বলছি, নতুন কোনো চিন্তা, নতুনভাবে দেখা হচ্ছে বাংলা সাহিত্যকে।
‘বিবিধার্থ সংগ্রহ’ নামক একটা ভালো পত্রিকা বের হত সে সময়। সাধারণ পাঠকের জন্য নানান বিষয়ের একটা পত্রিকা। যেটা দেখতেও খুব সুন্দর ছিল, ছবি-টবি আছে, সেই রকম একটা পত্রিকা বার করতে চেয়েছিল। কেউ বলছেন, বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস আলোচনা করতে গিয়ে, আমাদের পাড়ায় একজন মহিলা ছিলেন যিনি গল্প বলতেন। পাড়ায় তো অনেক মহিলা আছেন যারা গল্প বলতেন। প্রত্যেকদিনই তার গল্পে এক সুয়ো আর এক দুয়ো। এক সুয়োরানি আর এক দুয়োরানি। মানে এতবার বলেও তার কোনো ক্লান্তি আসত না। সব গল্পের সেই এক শুয়ো রানি এক দুয়ো রানি, এক শুয়োরানি এক দুয়োরানি।
বঙ্গিমচন্দ্রের সাহিত্য তার থেকে কত আলাদা। তিনি ওই ধারা থেকে সরে এসে সম্পূর্ণ অন্যধারা শুরু করলেন, গল্প বলার ধরন, এই যে অভিনবত্বগুলো আসছে, আমার দেখার বিষয়ই ছিল সেগুলো। কী কী নতুন জিনিস আসছে, সেইগুলো নিয়ে কী কী আলোচনা হচ্ছে। ছন্দটাকে সেইভাবেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
রাজু আলাউদ্দিন: যেহেতু এটা বাংলা ভাষা সম্পর্কিত একটি প্রসঙ্গ, সেই কারণে হয়ত আপনি অন্তর্ভুক্ত করেছেন। (হ্যাঁ—নন্দিতা বসু)। আচ্ছা। আপনার গবেষণার বিষয়টি মোটামুটি যেই সময়ের, সেই সময়ের নারী লেখকদের উত্থান সম্পর্কে আপনার এখনকার মূল্যায়নটা কী?
নন্দিতা বসু: প্রথম দিকে, অবশ্য আমি যখন কাজ করেছি রাসসুন্দরী তো তখন বেরিয়ে গেছে, বাংলায় প্রথম আত্মজীবনী একজন মহিলা লিখলেন, যিনি নিজে নিজেই পড়াশোনা শুরু করেছেন, নিজে নিজেই শিখেছিলেন। কারণ তার ধর্মীয় জীবনটা খুব প্রবল ছিল। এখন যেটা মনে হয় যে, সেই মহিলাটি নিজস্ব ধর্মীয় জীবনে যা-ই ছিলেন, সেটাও তার প্রতিবাদের ক্ষেত্র থেকেই চাইছিলেন। গৃহবধুর জীবনটা তার অত ভালো লাগছিল না। সে জন্য সরে এসেছিলেন। কিন্তু আমি যখন লিখছি গবেষণাটা, এখন হলে কিন্তু অন্যভাবে লিখতাম, যে মেয়েরাও তার (অবস্থা/সময়) মধ্যে থেকে নিজের মতো কি চেষ্টা করছিল। যেমন ধরুন, এই যে উনি জানতেনই না যে তিনি আত্মজীবনী লিখছেন, নতুন ধারার সৃষ্টি করছেন। এই জিনিসটাই তো কত বড় অভিনব সৃষ্টি। একজন মহিলা, একজন গৃহবধু যিনি ধর্মগ্রন্থ পড়ার তাড়নায় লুকিয়ে পড়া শিখেছিলেন। তিনিই বাংলা সাহিত্যে নতুন ধারার সূত্রপাত করছেন। এটা যে কত বড় একটা ঘটনা! এখন মনে হয়, আমি যখন লিখেছিলাম তখন সেভাবে ভাবিনি। এখন বলতে গিয়ে নিজেরও অদ্ভুত লাগছে যে, এই চিন্তাটা তো তখন এল না মাথায়!
রাজু আলাউদ্দিন: আপনি নিশ্চয়ই পরবর্তী সংস্করণে এটাকে…
নন্দিতা বসু: পরবর্তী সংস্করণ আর কবে হবে। শিশির বাবু বলছিলেন, তুমি এইটার একটা দ্বিতীয় পর্ব লিখবে আর আমি তোমায় অনেক মেটেরিয়াল দেব। যে গবেষণাগুলো হচ্ছে, বিশেষত সত্তর দশকের বাংলায় গবেষণাগুলোর প্রতি উনি খুবই বীতশ্রদ্ধ ছিলেন। ভীষণভাবে উনি বলতেন, এগুলো তো ডেরিভেটিভ সমালোচনা। কোনো সময় একটি ডিগ্রি পাওয়ার জন্য অনেক সময় পরীক্ষককে ক্যান্ডিডেটরা ভয়ও দেখাত যে আমার উপর অভিশাপ নেমে আসবে, এই হবে সেই হবে।
উনি তো খুব কৌতুকপ্রিয় লোক ছিলেন। অনেক সময় হয়ত বাড়িয়েও বলতেন জিনিসটা। কিন্তু উনার পছন্দ ছিল না, যেভাবে হচ্ছিল। এ জন্যই বলতেন, তুমি যখন এইটার দ্বিতীয় খণ্ড লিখবে তখন আমি তোমায় অনেক মেটারিয়াল দেব। যে কীভাবে লোকেরা জাস্ট একটা ডিগ্রি পাওয়ার জন্য গবেষণাগুলো করছে।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনার কি ওটা দ্বিতীয় খণ্ড লেখার পরিকল্পনা আছে?
নন্দিতা বসু: না, না। নেই।
রাজু আলাউদ্দিন: বা এটাকে আরেকটু সমৃদ্ধ করে বের করার কোনো ইচ্ছে আছে আপনার?
নন্দিতা বসু: এখন আর অত পরিশ্রমই করতে পারব না। তখন আমি যে সমস্ত জায়গায় যেভাবে ছুটে ছুটে বেরিয়েছি, সারা দিন ধরে লাইব্রেরিতে বসে কাজ করেছি, এখন কি আর পারব সেভাবে! মনের জোরটাই নেই আমার এখন আর। তাছাড়া এখন আমার না উৎসাহের জায়গাটাও অন্য, এটার ইম্পরটেন্সের জায়গাটাও আমি বুঝি, কিন্তু আমার নিজের উৎসাহ অন্য রকম জিনিস নিয়ে। নতুন এত এত জিনিস হয়েছে, সেগুলো নিয়ে পড়ার, একটু ভাবার। সেই দিকেই জোর এসে গেছে।
রাজু আলাউদ্দিন: নারী লেখকদের মধ্যে বেগম রোকেয়া সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী? মূলত গদ্যই, উনি তো আর সেইভাবে কবিতা লেখেননি।
নন্দিতা বসু: কবিতা আদৌও লিখেছিলেন উনি?
রাজু আলাউদ্দিন: না। ওই যে, তার উপন্যাসের মধ্যে একটা পদ্য আছে, তা আবার পাঠ্য ছিল একসময়। তখন মনে হত, বেগম রোকেয়া মূলত কবি-ই।
নন্দিতা বসু: না, আমি তার কবিতা আলাদা করে পড়িনি।

রাজু আলাউদ্দিন: তো গদ্যশিল্পী হিসেবে, বা গদ্যলেখিকা হিসেবে বা তার সমস্ত কিছু, তা গদ্যশৈলীই বলি বা তার বক্তব্য—সমস্ত কিছু মিলিয়ে আপনার কী অভিমত?
নন্দিতা বসু: বেগম রোকেয়া সম্পর্কে আমি যেটা প্রধানভাবে দেখি, উনি মেয়েদের অধিকারকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছিলেন বাঙালি সমাজে, মুসলমান সমাজে বলব না, বাঙালিসমাজে বলব–সেটা এমনই একটা আশ্চর্য ঘটনা আমাদের সমাজে যে, এই ঘটনা না ঘটলে বলত যে এটা হতে পারে, আমরা বিশ্বাস করতাম না। হয়ে গেছে বলে এটাকে আর অস্বীকার করা যায় না। যেভাবে উনি পড়াশোনা করেছিলেন এবং শেষ দিকে যখন স্কুল করলেন; স্কুলের সঙ্গে সেই সময় সমাজে ক্ষমতাশালী ব্যক্তি ছিলেন, নানাভাবে উনাকে আপস রফা করতে হয়েছে।
উনি কিন্তু অসম্ভব বড় সমাজকর্মী ছিলেন। যেটা মেয়েদের শিক্ষার জন্য, মেয়েদের মধ্যে নতুন চেতনা আনার জন্য। তার যে লেখাটা আমরা ক্লাসে পড়াই, ‘অলংকার না Badges of slavery’–ওই সময় তিনি এই জিনিসগুলো বলেছেন। যখন বয়স উনার কম যারা, যারা ক্রয় করতে পারে তারা তো গয়না অনেক পরবেই। মেয়েদের এই অলংকারকে উনি দেখাচ্ছেন যে, এটা হচ্ছে তার দাসত্বের চিহ্ন। তার স্বামীর বা তার ধনী পিতার গৌরব বাড়াবার জন্য সে এই গয়নাগুলো পরছে। (মানে, তিনি ওইটার সঙ্গে নারীর আত্মশক্তি, আত্ম-মর্যাদাকে যুক্ত করে দেখেছেন।—রাজু আলাউদ্দিন)। হ্যাঁ। তিনি দীর্ঘদিন ধরে করেছেন এটা। তাঁর যে সুলতানাস ড্রিম একটা কল্পকাহিনি আছে। কল্পকাহিনির মধ্যে উনি দেখাচ্ছেন যে, মেয়েরা কি-না করতে পারে। নতুন জগৎ গড়ে তুলেছে তারা। একটা নতুন সভ্যতা গড়েছে। সেখানে বিজ্ঞানের সাহায্য নিয়ে তারা কত কি নতুনভাবে করছে।
তার লেখা উপন্যাস, পদ্মরাগ আমার ভালো লাগে। তখনকার মুসলমান সমাজের মধ্যে যে মেয়েদের অবস্থান তুলে ধরেছেন, সেটা ঠিক। কিন্তু আমি উনাকে অনেক বড় মনে করি, শিক্ষা ক্ষেত্রে বা মেয়েদের মধ্যে সমান অধিকারের চেতনা জাগ্রত করার ক্ষেত্রে যে কাজ করছেন সেটার জন্য। লেখাটা আমার কাছে সেকেন্ডারি মনে হয়। ওইটা-ই উনার জীবনের লক্ষ্য ছিল। সেইটা করার জন্য উনি লিখেছেন। উনি একদিকে যেমন স্কুল করেছেন, নানান প্রবন্ধ লিখেছেন; উপন্যাসের মধ্যেও উনি ওই চেতনাটা তুলে ধরেছেন।
রাজু আলাউদ্দিন: সুলতানাস ড্রিম …একজন লেখকের, একজন শিল্পীর মূল শক্তিটা কী? সেটা হল ইমাজিনেশন। সমাজকর্ম, আপনি যেটা বলেছেন, সেটা তো অবশ্যই তার প্রধান পরিচয়, কোনো সন্দেহ নাই। তিনি যা করতে চেয়েছেন, তাঁর যে লক্ষ্য ছিল, সেটা বাস্তবায়ন করার জন্য সাহিত্য করতেন। কিন্তু সাহিত্য রচনা করতে গিয়েও তো দেখা গেছে যে, শিল্পীর কল্পনাশক্তি, সেটা আশ্চর্য রকম ব্যবহার আছে সুলতানাস ড্রিমস-এর মধ্যে। সুলতানাস ড্রিমসএর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আছে—নন্দিতা বসু)। এমনকি আজকে আমরা যেটাকে সম্ভব বলে দেখছি, শুধু সম্ভব নয় বাস্তবেই দেখতে পাচ্ছি আলোকে শক্তিতে রূপান্তরিত করা। সেটার স্বপ্ন উনি অনেক আগে দেখেছিলেন। এই দূরদর্শিতা, শিল্পী হিসেবে কি মনে হয় না, উনি কম গুরুত্বপূর্ণ নন?
নন্দিতা বসু: আমার আসলে নিজের যে রকম চিন্তা ছোটবেলা থেকেই, আমি মনে করতাম, মেয়েরা পড়াশোনার জগতে একটা জায়গা সে করতেই পারবে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, যদি সুযোগ পায় তারা কোনো অংশেই কারও থেকে কম পারবে না। আমি সবসময় বেগম রোকেয়াকে ওভাবেই দেখেছি যে, উনি এটা প্রমাণ করে ছেড়েছেন সম্ভাবনাটা। একটা মেয়ের মধ্যে যে সম্ভাবনা কতখানি আছে সুযোগ পেলে দেখাতে পারবে। নিজের জীবনেও যেটা উনি করে দেখিয়েছেন এবং অনেক মেয়ের মধ্যে সেটা সম্ভব। যে কারণে উনি স্কুল তৈরি করেছেন। আমি সেভাবেই উনাকে দেখেছি সবসময়।
রাজু আলাউদ্দিন: আরেকটা জিনিস কি মনে হয় না যে, যাকে বলে মৌলবাদ বা ধর্মীয় গোঁড়ামি, এগুলোর সঙ্গে লেখদের লড়াই করতে হচ্ছে। অনেকে লড়াই করছেন এগুলোর বিরুদ্ধে, তাই না? উনি সেই লড়াইটা সে সময় করেছিলেন। সেই সময় উনি যে লড়াইটা করেছেন, আজকে অনেক লেখক-লেখিকা সেই লড়াইটা করছেন। তার সঙ্গে আজকের এই লেখকদের পার্থক্য কোথায় বলে মনে করেন আপনি?
নন্দিতা বসু: উনি যে স্কুলটা করলেন কলকাতায়, সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুল, সেখানে তো মেনে নিলেন যে হ্যাঁ, মেয়েরা বোরখা পড়ে আসবে স্কুলে। বোরখাটা উনি মেনে নিয়েছিলেন। অনেকে বলতে চান, কোথায়! উনি তো আপস-রফা করেছিলেন। আমি কিন্তু নিজে মনে করি, সমাজে যদি তাকে কাজ করতে হয় কোন সমাজে বসে কাজ করছেন উনি– তাকে সেটা দেখতে হবে তো। (তাকে সেই সমাজটাকে বুঝতে হবে—রাজু আলাউদ্দিন)। হ্যাঁ, বুঝতে হবে। কারণ তাকে কখনও করতে দেবে না, যে কোনো সময় থামিয়ে দিতে পারে তার কাজকে। উনি থামতে চাননি। উনি স্কুলটা করতে চেয়েছিলেন। মেয়েরা পড়তে পারবে, পাবে স্কুলে যেতে। তার জন্য তাকে মানতে হয়েছিল, মুসলমান মেয়েরা বোরখা পড়ে আসবে।
আমার মনে হয়, তিনি সত্যিকারের যোদ্ধা নারী, যিনি তার রণকৌশলটা তৈরি করতে পেরেছিলেন। উনি যদি বলতেন—না, আমি তাহলে স্কুল চালাব না, কিন্তু আমি কোনো বোরখা অ্যালাও করব না। সেটা ঠিক হত না, সেটা ভীষণ ভুল হত।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনি কি মনে করেন, তসলিমা নাসরীন সে রকম ভুল করেছেন?
নন্দিতা বসু: আমাকে যদি বলতে দেওয়া হয়, তাহলে আমি বলব, হ্যাঁ।
রাজু আলাউদ্দিন: কী?
নন্দিতা বসু: আমি বলব যে, তসলিমা সরাসরি যেভাবে লড়াইটার মধ্যে গিয়ে পড়েছেন, তাতে সেই লড়াইটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

রাজু আলাউদ্দিন: আপনি কি মনে করেন, তসলিমার লড়াইয়ের…
নন্দিতা বসু: তাঁর লড়াইয়ের পদ্ধতিটা আমার ঠিক মনে হয়নি। যে লড়াইটা দেশ থেকে করতে গেলে অনেকটা আটকে যেত না? (হ্যাঁ—রাজু আলাউদ্দিন)। উনি দেশ ছাড়ার পর, একজন লেখককে লিখতে হলে তো তাকে একটা লেখার ইনভাইরনমেন্টের মধ্যে থাকতে হয়। সারাক্ষণই যদি মনে হয়, যে কোনো সময় আমি কতল হয়ে যাব, সে তো লেখার পরিবেশের মধ্যে নেই। ক্রিয়েটিভি তার হ্যাম্পার্ড হতে পারে।
আরেকটা জিনিস আমার মনে হয়, তসলিমা যেভাবে সমাজকে অ্যাটাক করেছে, এটা আমার ঠিক ভালো লাগেনি। তার কবিতা কিছু নিশ্চয়ই ভালো, কিন্তু তার যেটা উপন্যাস, যার জন্য তিনি দেশান্তরী, সেটা আমার নিজের সেটা ভালো লাগেনি।
রাজু আলাউদ্দিন: লজ্জা?
নন্দিতা বসু: হ্যাঁ, লজ্জা। লজ্জা উপন্যাসটা আমার ভালো লাগেনি। উপন্যাস হিসেবে এটা খুবই জোলো। এটা থেকে যে আমি ইন্সপায়ার হলাম বা এটা আমার একটা এক্সপেরিয়ান্স, আমার কাছে মনে হয়নি।
তাছাড়া আমি যদি, আমার কাছে নেই এখন পুরো তথ্য, আমি তার নির্বাচিত কলাম-এর মধ্যে অনেক কন্ট্রাডিকশন দেখাতে পারব। আমার মনে হয় অনেক মিথ্যা ভাষণ আছে তার মধ্যে। (কী বললেন?—রাজু আলাউদ্দিন)। মিথ্যে ভাষণ আছে। যেটা একটা সিরিজের রিলেশন দিয়েছেন। (অনেকেই তাই মনে করেন—রাজু আলাউদ্দিন)। এটার সঙ্গে মানে…, আমি যে লেখকদের শ্রদ্ধা করি তাদের সঙ্গে মেলাতে পারি না।
border=0রাজু আলাউদ্দিন: এখন ধরুন, পশ্চিমবঙ্গ এবং পূর্ববঙ্গে, নারী লেখকদের সংখ্যা তো কম না, তাই না? (হুম—নন্দিতা বসু)। এদের মধ্যে সত্যিকারের শক্তি কি আপনি দেখতে পান? মানে, যেই শক্তি আপনি একজন বেগম রোকেয়ার মধ্যে দেখতে পান, কিংবা মহাস্বেতা দেবীর মধ্যে দেখতে পান, সেটা আর কার মধ্যে দেখতে পান?
নন্দিতা বসু: পশ্চিমবঙ্গের একটা মুশকিল হচ্ছে, আমার মনে হয় যেটা—এই একটা ‘দেশ’ পত্রিকা, যেটা একজন বলেছিলেন অ্যাকচুয়ালি একটা বানান ভুলে সারা জীবন চলে গেল এই পত্রিকাটা, এটা হবে ‘দ-য় ব-ফলা এ-কার ষ’ (ভেঙে উচ্চারণ করেন তিনি)—‘দ্বেষ’। এটা একটা বাণিজ্যিক পত্রিকা। তারা কিছু লেখককে উঠাচ্ছে, নামাচ্ছে। তাদের ওখানে যারা লিখবে, আমি নাম করেই বলছি যেমন—সুচিত্রা ভট্টাচার্য্য বা বাণী বসু, যারা দেশ পত্রিকার পুজো সংখ্যায় লিখবেন, তারা কিন্তু অন্যকাগজে লিখতে পারবেন না। তারা এতই টাকা দেবে যে, অন্য কোথায় লিখে টাকা রোজগার করার দরকার নেই। এই একটা ক্রিয়েটিভিটিকে কন্ট্রোল করা, এটা একটা ভীষণ খারাপ জিনিস কিন্তু।

রাজু আলাউদ্দিন: এটা কি ফ্যাসিজম? একধরনের ফ্যাসিজম তো, না কি? আপনার কি…
নন্দিতা বসু: হ্যাঁ। এটা ফ্যাসিজমই। আটকে দেওয়া, কন্ট্রোল করা। এই লেখিকা বাণী বসু বা লেখিকা সুচিত্রা ভট্টাচার্য্য হচ্ছে আমাদের প্রোডাক্ট। এদের কপিরাইটটা সম্পূর্ণ আমাদের কাছে আছে। এর বাইরে তারা কোথাও যেতে পারবে না। এটা তো ঠিক না। সেই জন্য অনেক ছোট ছোট পত্রিকা, আমি তো আর সব পত্রিকা পাই না, এক একটা ভালো লেখা আসে।
যেমন আলপনা রায়, বা রায় নয় সিংহও নয়, আমি নামটা ভুলে গেছি, এইটিজে আমি কিন্তু তার বেশ কয়েকটা ভালো গল্প পড়েছি। সেগুলো ছোট ছোট পত্রিকায়। এরপর তাকে আর খুঁজে পাইনি।
আছে, এ রকম ভালো লেখক-লেখিকা আছে। তারা কিন্তু লিটল ম্যাগাজিনের নানান জায়গায় ছড়িয়ে আছে। এখনও জনচক্ষুর সম্মুখে আসেনি।
বাংলাদেশের কথাটা আমি অত বলতে পারব না, যদিও বাংলাদেশেও অনেক বেশি সংখ্যায় মেয়েরা লিখছেন। পশ্চিমবঙ্গে যত লিখছেন পূর্ববঙ্গে তার চেয়ে অনেক বেশি লিখছেন। পশ্চিমবঙ্গে এত রকম পুরস্কার হয়েছে যে, সরকারি পুরস্কার। অতএব অনেক লেখকেরই মনে হয়, আমি একজন বিখ্যাত হব, তো আমি দু-একটা পুরস্কার পেলাম; তারপর সরকারিভাবে সাহিত্য অ্যাকাদেমি আছে, তারা নানানভাবে পেট্রনাইজ করছে, বিদেশে নিয়ে যাচ্ছে। অনেকেই ভাবে লেখাটাকে একটা ক্যারিয়ার করে আমি একটু উপরে উঠতে চাই। তাই ভালো লেখাগুলো…
তখন লোকে জানে, সরকারি মদদে আমলাতন্ত্রকে খুশি করতে হলে কী জিনিস লিখলে ওদের চোখে পড়ব। অনেকে বলছে তুমি শিশুশ্রমিক নিয়ে লিখ, তুমি প্রতিবন্ধীদের নিয়ে লিখ। তখন লোকে বলবে, দেখ, এরা সমাজের একটা পিছিয়ে পরা অংশ নিয়ে লিখছে। কাজেই তাদের লেখার একটা আলাদা গুরুত্ব আছে। ভালো লেখা তো আর এভাবে হয় না। (ঠিকই বলেছেন আপনি—রাজু আলাউদ্দিন)। এই যে নানান পুরস্কার, আর নানান প্রকার আমলাতান্ত্রিক পৃষ্ঠপোষকতা এগুলো কিন্তু ভালো লেখার অনেক ক্ষতি করেছে। সেগুলো না থাকলে…
রাজু আলাউদ্দিন: সেটা তো ধরুন, আমাদের বাংলাদেশেও আছে। এটা তো শুধু পশ্চিমবঙ্গের ব্যাধি না, এই ব্যাধিটা ওপাশেও আছে।
নন্দিতা বসু: তারপরে গভমেন্টের অনেক রকম ইয়া আছে। যেমন সংস্কৃতি খাতে কেউ যদি কিছু টাকা দেয়, তাহলে ট্যাক্সের সে অনেক ছাড় পাবে। বিজনেস হাউজগুলো সেভাবে নানারকম প্রাইজ দিচ্ছে। এটাও তো এক রকম ইনভেস্টমেন্ট। ফলে এই ইনভেস্টমেন্ট যেখানে আছে, সেখানে অনেক বাজার আছে, সেখানে নানান ধরনের নিয়ন্ত্রণ আছে।

রাজু আলাউদ্দিন: ফলে এই পুরস্কারগুলোকে কোনোভাবেই ইনোসেন্ট পুরস্কার হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
নন্দিতা বসু: না, কিছুতেই না। লিটলম্যাগগুলো এসব করে না। যেমন ধরুন, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের নামে যে পুরস্কার দেয়, সেটায় টাকা এত কম, সেখানে মানটাই অনেক বেশি।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী, লেখালেখি বিষয়ে? কিংবা নতুন কী ভাবছেন বা প্রস্তুতি নিচ্ছেন?
নন্দিতা বসু: দেখুন অনেকদিন থেকে আমার ইচ্ছে যে, বাংলা সাহিত্যে যাকে মধ্যযুগ বলা হয়, বিশেষ করে অষ্টাদশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্য, সেটা নিয়ে কিন্তু আমার অনেক কিছু ভাবার আছে। অনেক লেখক নানাভাবে নতুন কথা বলবার চেষ্টা করেছেন। ততটা মেজর লেখক, বড় লেখক নন তারা। গৌণ লেখক হয়েও তারা অনেক জিনিস চেষ্টা করছেন। সেই জিনিসগুলো নিয়ে আমরা যদি একটা ইতিহাস তৈরি করতে পারতাম, সেটা আর আমার হবে না—তবে সেটা নিয়ে অনেক কিছু করার আছে।
ধরুন, ভারতচন্দ্রের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব যেটা, সমাজের যেটা ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। তখন যেটা হয়েছে, মোঘলদের ক্ষমতা স্তিমিত হয়ে গেছে, ইংরেজরা আসছে। ওই সময়ের মধ্যে ভারতচন্দ্রের মতো এত বড় কবি, তিনি প্রতি কথায়—প্রথমে কৃষ্ণচন্দ্র, তারপরে ভারতচন্দ্র। তিনি তার পৃষ্ঠপোষকে এতবার যে উল্লেখ করেছেন, এতেই তো বোঝা তার অবস্থা কত যে প্রিটেরিয়াস ছিল। যে জন্য তাকে তার পৃষ্ঠপোষকের নামটা এত করে বলতে হয়েছে। সেটাতে উনি প্রতিশোধও নিয়ে নিয়েছেন।
রাজু আলাউদ্দিন: কীভাবে?
নন্দিতা বসু: সেখানে একটা আছে মালিনী। বিদ্যাসুন্দরের গল্পে বিদ্যা যখন গোপন প্রণয়ের ফলে গর্ভবতী হয়ে পড়ল। রাজার তখন টনক নড়ল এবং মালিনীকে ধরা হল। তো মালিনীকে এসে কোটালরা ধরছে, বন্দি করছে তখন মালিনী ওদের গালাগাল দিচ্ছে যে, তোরা তো কেবল ঘুষ খাস বসে, তোরা তো কোনো কাজই করিস না।
আমার মনে হয়, ভারতচন্দ্রের সমসাময়িক কৃষ্ণচন্দ্রের রাজ্যচালনা নিয়ে তার প্রচণ্ড ক্রিটিসিজম প্রকাশ পেয়েছে তাতে। ইভেন পুরো বিদ্যাসুন্দরের গল্পটাই, এটা একটা গোপন প্রণয়ের গল্প, ফার্সি কেচ্ছা সাহিত্যের অংশ হিসেবে আগ্রহের বস্তু ছিল ওই সময়ে। এটা আছে ঠিকই। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে ভারতচন্দ্র কিন্তু সমাজকে একেবারে তুলোধুনা করে দিয়েছে যে, সমাজটা জ্বলছে। একটা প্রচণ্ড রকমের প্রতিবাদের সাহিত্য হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। সেই সুরটা আছে এইটার মধ্যে। এটা এস্টাবলিশ করা যায়।

রাজু আলাউদ্দিন: অনেক ধন্যবাদ আপনাকে সময় দেওয়ার জন্য। আমরা অপেক্ষা করব পরবর্তীতে আপনার এই বিষয়ক কাজ দেখার জন্য।
নন্দিতা বসু: ধন্যবাদ। জানি না, কতখানি করতে পারব।
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (14) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তাজ — মে ১১, ২০১৫ @ ৯:৩০ পূর্বাহ্ন

      রাজু আলাউদ্দিনের নেয়া সাক্ষাতকারগুলো সুপাঠ্য। প্রাসঙ্গিক আলাপচারিতা যথাযথ। জানার সুযোগ থাকে অনেক। অনুমান করতে কষ্ট হয় না, রাজুর নাম দেখেই লেখাটি পড়বেন এমন পাঠক প্রচুর। তাই শিরোনাম নির্বাচনে মূল আলোচ্যের বাইরে প্রায় আউট অফ ফোকাস থেকে কিছু একটা তুলে চমক দেখানোর কোন দরকার আছে বলে মনে হয় না। বিডিনিউজ আর্টসে কদিন আগে রাজুর নেয়া শঙ্খ ঘোষের সাক্ষাতকারের গদগদভাবযুক্ত লেখাটির শিরোনামও একই বৈশিষ্ট্য দেখিয়েছে।

      থাম্বেলিনার একেবারে অন্যরকম গল্প, বরং টম-থাম্বের সঙ্গে এক-আঙুলে-র মিল আছে। ঠাকুরমার ঝুলিতেও দেড়আঙুলে নামের ওরকম একটা গল্প আছে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন এহ্সান ইসলাম — মে ১১, ২০১৫ @ ১১:১৯ পূর্বাহ্ন

      মৃদু ভাষ্যে, খানিক নমিত স্বরে বললেও নন্দিতা বসুর কথাগুলো দারুণ শক্তিশালী। লক্ষ্য ভেদিও বটে। কখনো মনে হয়, আমাদের লেখক চরিত্র হারানো লেখকদের জন্য উদাহরণও বটে।
      রাজু আলাউদ্দিন: এখন ধরুন, পশ্চিমবঙ্গ এবং পূর্ববঙ্গে, নারী লেখকদের সংখ্যা তো কম না, তাই না? (হুম—নন্দিতা বসু)। এদের মধ্যে সত্যিকারের শক্তি কি আপনি দেখতে পান? মানে, যেই শক্তি আপনি একজন বেগম রোকেয়ার মধ্যে দেখতে পান, কিংবা মহাস্বেতা দেবীর মধ্যে দেখতে পান, সেটা আর কার মধ্যে দেখতে পান?
      নন্দিতা বসু: পশ্চিমবঙ্গের একটা মুশকিল হচ্ছে, আমার মনে হয় যেটা—এই একটা ‘দেশ’ পত্রিকা, যেটা একজন বলেছিলেন অ্যাকচুয়ালি একটা বানান ভুলে সারা জীবন চলে গেল এই পত্রিকাটা, এটা হবে ‘দ-য় ব-ফলা এ-কার ষ’ (ভেঙে উচ্চারণ করেন তিনি)—‘দ্বেষ’। এটা একটা বাণিজ্যিক পত্রিকা। তারা কিছু লেখককে উঠাচ্ছে, নামাচ্ছে। তাদের ওখানে যারা লিখবে, আমি নাম করেই বলছি যেমন—সুচিত্রা ভট্টাচার্য্য বা বাণী বসু, যারা দেশ পত্রিকার পুজো সংখ্যায় লিখবেন, তারা কিন্তু অন্যকাগজে লিখতে পারবেন না। তারা এতই টাকা দেবে যে, অন্য কোথায় লিখে টাকা রোজগার করার দরকার নেই। এই একটা ক্রিয়েটিভিটিকে কন্ট্রোল করা, এটা একটা ভীষণ খারাপ জিনিস কিন্তু।

      রাজু আলাউদ্দিন: এটা কি ফ্যাসিজম? একধরনের ফ্যাসিজম তো, না কি? আপনার কি…
      নন্দিতা বসু: হ্যাঁ। এটা ফ্যাসিজমই। আটকে দেওয়া, কন্ট্রোল করা। এই লেখিকা বাণী বসু বা লেখিকা সুচিত্রা ভট্টাচার্য্য হচ্ছে আমাদের প্রোডাক্ট। এদের কপিরাইটটা সম্পূর্ণ আমাদের কাছে আছে। এর বাইরে তারা কোথাও যেতে পারবে না। এটা তো ঠিক না। সেই জন্য অনেক ছোট ছোট পত্রিকা, আমি তো আর সব পত্রিকা পাই না, এক একটা ভালো লেখা আসে।
      যেমন আলপনা রায়, বা রায় নয় সিংহও নয়, আমি নামটা ভুলে গেছি, এইটিজে আমি কিন্তু তার বেশ কয়েকটা ভালো গল্প পড়েছি। সেগুলো ছোট ছোট পত্রিকায়। এরপর তাকে আর খুঁজে পাইনি।
      আছে, এ রকম ভালো লেখক-লেখিকা আছে। তারা কিন্তু লিটল ম্যাগাজিনের নানান জায়গায় ছড়িয়ে আছে। এখনও জনচক্ষুর সম্মুখে আসেনি।
      বাংলাদেশের কথাটা আমি অত বলতে পারব না, যদিও বাংলাদেশেও অনেক বেশি সংখ্যায় মেয়েরা লিখছেন। পশ্চিমবঙ্গে যত লিখছেন পূর্ববঙ্গে তার চেয়ে অনেক বেশি লিখছেন। পশ্চিমবঙ্গে এত রকম পুরস্কার হয়েছে যে, সরকারি পুরস্কার। অতএব অনেক লেখকেরই মনে হয়, আমি একজন বিখ্যাত হব, তো আমি দু-একটা পুরস্কার পেলাম; তারপর সরকারিভাবে সাহিত্য অ্যাকাদেমি আছে, তারা নানানভাবে পেট্রনাইজ করছে, বিদেশে নিয়ে যাচ্ছে। অনেকেই ভাবে লেখাটাকে একটা ক্যারিয়ার করে আমি একটু উপরে উঠতে চাই। তাই ভালো লেখাগুলো…
      তখন লোকে জানে, সরকারি মদদে আমলাতন্ত্রকে খুশি করতে হলে কী জিনিস লিখলে ওদের চোখে পড়ব। অনেকে বলছে তুমি শিশুশ্রমিক নিয়ে লিখ, তুমি প্রতিবন্ধীদের নিয়ে লিখ। তখন লোকে বলবে, দেখ, এরা সমাজের একটা পিছিয়ে পরা অংশ নিয়ে লিখছে। কাজেই তাদের লেখার একটা আলাদা গুরুত্ব আছে। ভালো লেখা তো আর এভাবে হয় না। (ঠিকই বলেছেন আপনি—রাজু আলাউদ্দিন)। এই যে নানান পুরস্কার, আর নানান প্রকার আমলাতান্ত্রিক পৃষ্ঠপোষকতা এগুলো কিন্তু ভালো লেখার অনেক ক্ষতি করেছে। সেগুলো না থাকলে…

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জ্ঞান তিলক ভট্টাচার্য — মে ১১, ২০১৫ @ ১:২৬ অপরাহ্ন

      রাজু ভাই, পুরো সাক্ষাতকারটা পড়লাম। নন্দিতা বসুকে ওনার পড়াশোনা ও সাহিত্যগত আলোচনার ভিতর দিয়ে অনেক কিচ্ছু জানলাম। ওনার গবেষণার বিষয়ও কিছুটা বোঝার চেষ্টা করলাম। এর ভিতর দিয়ে ভাষার বিন্যাস, শব্দ, ধ্বনি,নান্দনিকতা, অন্য ভাষার শব্দচয়ন যা কিনা কালের গতিতে বাংলারূপ পেয়েছে, এর বিস্তারও জানলাম। নন্দিতা বসুর সাক্ষাতকার খুবই প্রাণবন্ত ও আমাদের বোধগম্য। তসলিমার বিষয়টা অনেকাংশে সত্য। তবে এ এক বিষাদপূর্ণ মানুষ যে লেখক ও স্বদেশ থেকে ও তার জমি থেকে উৎপাটিত, ফলে তার প্রকাশ এমন হতে পারে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন harry — মে ১১, ২০১৫ @ ৯:০৯ অপরাহ্ন

      The title is pathetic and does not reflect the main story. the main story is about the interview with a great scholar. Make a title out her work. Somewhere she commented on Taslima should not take the light away from her own credentials. This is where immature journalism outshines quality.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন omar shams — মে ১১, ২০১৫ @ ১০:৩৮ অপরাহ্ন

      ভালো সাক্ষাৎকার। নন্দিতা বসু যে উদারপ্রাণ, পক্ষপাতহীন, সহজেই বোঝা যায়। এঁরা সেই রকম হৃদয় যাঁরা বাঙালিকে আর্থ-সামাজিক-কাল্ক্রমিক ভাবে ‘প্রোগ্রেস’-এর দিকে নিয়ে যেতে চান। রাজুকে ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন kowshik ahmed — মে ১২, ২০১৫ @ ১২:২৯ পূর্বাহ্ন

      ধন্যবাদ নন্দিতা বসুর সাক্ষাতকারের জন্য। পড়ে ভাল লাগলো।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মোশাররফ হায়দার — মে ১২, ২০১৫ @ ৮:৪৫ পূর্বাহ্ন

      ১) হেডলাইনে প্রতিবেদকের ইমম্যাচিওরিটি সুস্পষ্ট কেন না এই প্রতিবেদনে তসলিমা নাসরিন মূল প্রসঙ্গ নন। এমনিতে কেউ তার লেখা পড়বে না দেখে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হেডলাইনে তসলিমা নাসরিনের প্রসঙ্গ তুলে মানুষকে জোর করে এই লেখা পড়াতে চেয়েছেন।

      ২) নন্দিতা বসু থেকে তসলিমা নাসরিন অনেক বেশি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন। তাই নন্দিতা বসুর সমালোচনা দিয়ে কি আসে যায় ? এ যেন পিপীলিকা বলে – হাতি তুই কে ?

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ভজন সরকার — মে ১২, ২০১৫ @ ৯:০৫ পূর্বাহ্ন

      অপ্রাসঙ্গিকভাবে তসলিমা নাসরিনকে নিয়ে শিরোনাম।
      অথচ ভিতরে পড়ে দেখুন নন্দিতা বসু তাঁর দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তসলিমা নাসরিনকে নিয়ে খুব অল্প পরিসরে কোনরকম বিশ্লেষণ ছাড়াই কিছু মন্তব্য করেছেন। তসলিমা নাসরিন-এর নাসরিন বানানটাও ভুল। অথচ রাজু আলাউদ্দিন তাঁর বিরাট- বিশাল সাক্ষাৎকারটির শিরোনাম দিলেন “নন্দিতা বসুর সাক্ষাতকার: “তসলিমার মধ্যে অনেক মিথ্যা ভাষণ আছে”।
      তসলিমা নাসরিনকে বিদেশে নির্বাসনে পাঠানো যায়, তসলিমা নাসরিনকে সকাল-সন্ধ্যা অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করা যায়, পরোক্ষ প্রত্যক্ষভাবে ধর্মান্ধ নরঘাতকদের উস্কে দেয়া যায় তসলিমা নাসরিনকে হত্যা করতে কিংবা তসলিমা নাসরিনের সাহিত্য-কর্মকে বাংলা সাহিত্যে নগন্য-জঘন্য রূপে সংজ্ঞায়িতও করা যায়। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে একশ্রেণীর সাহিত্যবাগীশরা আপ্রাণ চেষ্টাও করছেন তসলিমাকে হেয় করতে।
      কিন্তু নিজের লেখার পাঠক সংখ্যা বাড়ানোর জন্য তসলিমা নাসরিনের নামে শিরোনাম অপ্রাসঙ্গিক হ’লেও করতে হবেই! খুবই অপ্রয়োজনীয় ও অপ্রাসঙ্গিক এ শিরোনাম। প্রতিবাদ জানাই এ মানসিকতার।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন dilruba shahana — মে ১২, ২০১৫ @ ৮:৩৩ অপরাহ্ন

      স্কুলের ‘যেমন খুুশী সাজো’ পর্বে রোকেয়া সাজা ছোট্ট মেয়েটির কাছে জানতে চাওয়া হল
      ‘বেগম রোকেয়াকে চেন তুমি?’
      ‘হ্যাঁ, চিনিতো।
      ‘কি জান তুমি তাঁর?’
      তড়িঘড়ি উত্তর
      ‘উঁনি মেয়েদেরকে লেখাপড়া শিখিয়েছিলেন’
      ‘রোকেয়ার কথা কে বলেছে তোমাকে?’
      ‘মা, মা’ইতো বলেছে’
      উপরোল্লিখিত অভিজ্ঞতাটি বেগম রোকেয়া সম্বন্ধে নন্দিতা বসুর বক্তব্যকেই জোরদার করে নিঃসন্দেহে।
      তবে সৌরতাপ ব্যবহার বিষয়ে বেগম রোকেয়ার অসাধারণ কল্পনাশক্তি বিষয়ে রাজু আলাউদ্দিনের উল্লেখ বিষয়ে আরও বলা যায় যে প্রকৃতির অকৃপণ দান সৌরশক্তিকে মানুষের উপকারে ব্যবহারের বিষয়ে পাশ্চাত্যের লেখক এইচ জি ওয়েলস্ ও বেগম রোকেয়ার চিন্তাভাবনার মিলের বিষয়ে উল্লেখ করেন বাংলাদেশের মেধাবী সন্তান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রবাসী সৌরশক্তি বিশেষজ্ঞ পরিবেশবাদী সাজেদ কামাল। সাজেদ কামালের ইংরেজীতে লিখিত দীর্ঘ প্রবন্ধের এক জায়গায় এইচ জি ওয়েলস্ ও রোকেয়ার সৌরশক্তির বিষয়ে চিন্তার কথা বলেছেন। বিস্ময়করভাবে এই দুই ব্যক্তিত্ব একই সময়ে একই চিন্তা করেছিলেন।
      সমসাময়িক রোকেয়া(১৮৮০-১৯৩২) ও এইচ জি ওয়েলস্ (১৮৬৬-১৯৪৬) মানুষের কল্যাণে সৌরশক্তি করায়ত্ত করে ব্যবহারের সম্পর্ক দেখেছিলেন।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Nila Ahmed — মে ১৩, ২০১৫ @ ৪:১০ অপরাহ্ন

      Thank you for presenting a wonderful interview of a great scholar. Also thank you Dilruba Shahana for providing further insight in to Begum R many contributions.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন রুপন্তি — মে ১৩, ২০১৫ @ ১০:৩৮ অপরাহ্ন

      একদিকে তসলিমা নাসরিনের প্রতি রাগ, হিংসা, অন্যদিকে পাঠক সংখ্যা বাড়াতে গেলে তসলিমাকে শিরোনাম করলে সুবিধা। সবই বুঝা গেলো।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন kutub hilali — মে ১৪, ২০১৫ @ ১২:৩০ অপরাহ্ন

      চিন্তার এই স্বচ্ছতার প্রসার প্রয়োজন। প্রয়োজন এমনতরো খাঁটি বাঙালি বিদ্যাব্রতীর আরো সংখ্যাধিক্যের। জয় বাংলা বিদ্যাবর্তিকা!

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সন্মাত্রানন্দ — মে ১৬, ২০১৫ @ ১২:২১ অপরাহ্ন

      ভীষণ ভালো লাগল । এই একটি আলোচনা , যেখানে সত্যকথনের সাহস ও প্রেরণা পেলাম । ধন্যবাদ ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন DINABANDHU SARKAR — মে ২৮, ২০১৫ @ ১০:১৩ পূর্বাহ্ন

      নন্দিতা বসুর সাক্ষাতকার: “তসলিমার মধ্যে অনেক মিথ্যা ভাষণ আছে”রাজু আলাউদ্দিন| ১০ মে ২০১৫ ৯:৩৮ অপরাহ্ন

      আমি খুব আশ্চর্য হয়ে যাই এই ভেবে যে ওনার মত একজন লেখিকা কি করে তসলিমা নাসরিন এর মত একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন লেখিকার দোষ গুণ বিচার করছেন? মৌলবাদীদের তোষামোদ করা বন্ধ করুন। আপনি চাইছেন তসলিমা সত্যের সাথে আপস করুক? আপনার সাক্ষাৎকার পড়ে আপনাকে স্বার্থপর ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারছি না। নিজের কলমের কালি ভালো কিছুর জন্য ব্যবহার করুন তাতে প্রচার বা পয়সার জন্য ঘন ঘন সাক্ষাৎকার দিতে হবে না।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com