প্যাসিফিকে পাঁচ রজনি (প্রথম কিস্তি)

ইকতিয়ার চৌধুরী | ৫ মে ২০১৫ ৯:৪৫ অপরাহ্ন

ম্যানিলায় নিনয় একুইনো আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের ভিভিআইপি লাউঞ্জে বসে আছি। ঘড়িতে নটার বেশি হবে। লাউঞ্জ হোস্টেল জিগ্যেস করল, ‘কফি দেব স্যার?’
‘না, গ্রিন-টি।’
‘গ্রিন-টি হবে না স্যার, রেড-টি পাওয়া যাবে।’
‘দুধ এবং চিনির দরকার নেই। শুধু চা।’
গ্রিন-টি কেন, পানীয় হিসেবে চা-ই তেমন জনপ্রিয় নয় ফিলিপাইনে। ফিলিপিনোরা পছন্দ করে কফি। কেন করে জিগ্যেস করা হলে অনেকেই বলবে, আমেরিকানরা পছন্দ করে তাই। মার্কিনিদের কাছে কফি প্রিয় হলে ফিলিপিনোদেরও যে তা ভালো লাগবে তার কোনো যুক্তি নেই। তা সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় ফিলিপিনোরা মার্কিনিদের অনুসরণ করে।
এক সময় যুক্তরাষ্ট্রের উপনিবেশ ছিল পিলিপাইন। ১৮৯৮ সাল থেকে ১৯৪৬ অবধি।
আমরা গন্তব্য পালাও। পালাও প্রশান্ত মহাসাগরের একটি দ্বীপরাষ্ট্র। প্রায় চারশ মাইল দীর্ঘ এই রাষ্ট্রের চারপাশে পাপুয়া নিউগিনি, গুয়াম ও ফিলিপাইন। প্রশান্ত মহাসাগরের নীল জল ফুঁড়ে বেরুনো আরও প্রতিবেশী রয়েছে দেশটির। মাইক্রোনেশিয়া, কিরিবাতি, মার্শাল আইল্যান্ডস, নাউরু, সলোমন দ্বীপপুঞ্জ ও টুভালু। মানচিত্রের দিকে তাকালে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র এই রাষ্ট্রগুলোকে লাগে বিন্দুর মতো। মনে হয়, মহাসাগরের উত্তাল জলরাশি এই বুঝি ওই বিন্দুগুলোকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। চারপাশে শুধু আদিগন্ত জলকল্লোল। ওই জলকল্লোলের বিপরীতে সাগরের বুকে উইয়ের টিবির মতো মাথা উঁচিয়ে থাকা প্যাসিফিকের এই দেশমালা। দেশগুলোর সঙ্গে পালাওয়ের কোনো ভূ-যোগাযোগ নেই। প্যাসিফিক মহাসাগরের মধ্যে ডুবুডুবু এই রাষ্ট্রটির সঙ্গে বহির্বিশ্বের যোগাযোগ আকাশ ও সমুদ্রপথে। আকাশপথে কন্টিনেন্টাল এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে পালাও যাবার জন্য লাউঞ্জে অপেক্ষা করছি। রাত দশটা দশ মিনিটে প্লেন ছাড়বে। পালাওয়ের এক সময়ের রাজধানী কোরোর পৌঁছুব রাত একটা ৫০ মিনিটে। ২২ জানুয়ারি ২০১০-এর রাত। লাউঞ্জের অধিকাংশ স্টাফই আমার পরিচিতি। রাষ্ট্রদূত হয়ে যেদিন ফিলিপাইনে এলাম, সেদিন থেকেই এই লাউঞ্জ আমি ব্যবহার করছি।
আমার চা এল। এশীয় আতিথেয়তা পাশ্চাত্যের মতো নয়। পাশ্চাত্যের চেয়ে অনেক উষ্ণ। পালাওয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো কূটনৈতিক যোগাযোগ নেই। কিন্তু দেশটিতে আমাদের ছ-সাতশ নাগরিক নানা পেশায় কর্মরত রয়েছেন। সেখানে তাদের সুবিধা-অসুবিধা রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেখার মতো কেউ নেই। শুধু তাই নয়, দেশটিতে আজ অবধি কোনো সরকারি প্রতিনিধি কার্যোপলক্ষে ভ্রমণ করেননি বা করার প্রয়োজন হয়নি। পালাওয়ের সবচেয়ে নিকটবর্তী রাষ্ট্র ফিলিপাইন। সেখানকার বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে পালাওয়ে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের কনস্যুলার সার্ভিসেসসহ অন্যান্য সেবা দেওয়া হয়। সেটিও সহজ হয় না। অপ্রতুল যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে। অভিবাসী বাংলাদেশিরা প্রধানত বাস করেন দেশটির প্রধান শহর কোরোরে। সম্প্রতি অভিবাসনজনিত নানা জটিলতায় সেখানে তারা তীব্র অসুবিধার মুখোমুখি। একটি বিশেষ মিশনে বাংলাদেশ সরকার আমাকে তাই সেখানে যাবার নির্দেশ দিয়েছে। দেশটির উঁচু পর্যায়ে আলোচনা করে সমস্যা সমাধানের উপায় বের করতে। পালাও ফিলিপাইন নিকটবর্তী দেশ হলেও আকাশপথে রাষ্ট্র দুটোর দূরত্ব সাড়ে তিন ঘণ্টারও বেশি। ম্যানিলা এবং কোরোরের মধ্যে একমাত্র কন্টিনেন্টাল এয়ারলাইনন্স ফ্লাইট পরিচালনা করে। তাও সপ্তাহে দুবার। নির্ধারিত রিটার্ন রুট ম্যানিলা-কোরোর-গুয়াম। পালাওয়ে প্রায় চার-পাঁচ হাজার ফিলিপিনো অভিবাসী শ্রমজীবী রয়েছে। এক সময় এশিয়া স্পিরিট ম্যানিলা-সেবু-কোরোর ফ্লাইট পরিচালনা করত।
সাড়ে নটার পর কন্টিনেন্টাল এয়ারলাইন্সের একজন স্টাফ এল ভিভিআইপি লাউঞ্জে। পরিচয় জানিয়ে বলল, সে আমাকে বোর্ডিংয়ের জন্য নিতে যেতে চায়। আমি প্রস্তুত হয়েছিলাম।
সে কথা জানাতেই উত্তর দিল, ‘বোর্ডিংয়ের আগে আপনাকে কন্টিনেন্টাল এয়ারের পলিসি অনুযায়ী সার্চ করতে চাই।’
এ হচ্ছে নাইন-ইলেভেনউত্তর পৃথিবীর বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলা। নিউ ইয়র্কের টুইন টাওয়ার সন্ত্রাসী হামলায় ২০১১-এ বিধ্বস্ত হবার আগে আকাশপথে ভ্রমণের সময় যাত্রীদের এত ব্যাপকহারে দেহ তল্লাশির মুখোমুখি হতে হয়নি। কিন্তু নাইন-ইলেভেন এশিয়া আফ্রিকার রাষ্ট্রগুলোর প্রতি পাশ্চাত্যের দেশগুলোর পূর্বেকার দৃষ্টিভঙ্গী পরিবর্তিত করেছে। বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলোর নাগরিকদের আমেরিকা-ইউরোপে ভ্রমণের বেলায় অনেক সময় হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। সে সারিতে যেমন আছেন ভারতের রাষ্ট্রপতি আবুল কালাম আজাদ, তেমনি আমার মতো কূটনীতিক হয়ে সাধারণ অভিবাসী শ্রমিকরাও।
লাউঞ্জে আমি ছাড়া আর কোনো যাত্রী নেই। সেবা প্রদানকারী স্টাফরা তাকিয়ে ছিল আমাদের দিকে। তাদের উৎসুক চোখ খেয়াল করে কন্টিনেন্টাল স্টাফকে বললাম, ‘একজন রাষ্ট্রদূতও কি তোমাদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি?’
‘অবশ্যই নয়। তবে এটি আমাদের এয়ারলাইন্সের পলিসি।’
‘এ পলিসি একটু স্ববিরোধী হয়ে গেল না!’
স্টাফটি কোনো জবাব দিল না। অবশ্য তাকে এ বিষয়ে বলা অর্থহীন। সামগ্রিক ও নিখুঁত নিরাপত্তার স্বার্থেই তারা এমন পদক্ষেপ নিয়েছে হয়ত। সে আমার দেহ তল্লাশির পর জুতো খুলতে বলল। জুতো খুলে স্টাফটিকে জিগ্যেস করলাম, ‘আমাকে কি এখন প্যান্টের বেল্ট খুলতে হবে?’
এমন জিজ্ঞাসার অবশ্য হেতু রয়েছে। কারণ, অধিকাংশ যাত্রবাহী বিমান সংস্থা তথাকথিত নিরাপত্তার স্বার্থে যাত্রীদের কোমরের বেল্ট পর্যন্ত খুলে তল্লাশি করে।
‘না স্যার, তার আর দরকার হবে না।’
‘আমাকে আর সবার মতো ইমিগ্রেশন চেক ইন-এর আগে তল্লাশি করা যেত।’
কথাটা আমি বললাম এ জন্য যে, শতশত যাত্রীর সঙ্গে নিরাপত্তার এ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হলে আমাকে আর একা এভাবে হেনস্থা হতে হত না।
‘না না, তা কী করে হয় স্যার। আপনি আমাদের একজন সম্মানিত যাত্রী। আপনার যাতে অসুবিধা না হয় সে জন্য এয়ারলাইন্সের পক্ষে থেকে এই বিশেষ ব্যবস্থা। আপনাকে সবার মতো লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হবে, তা হয় নাকি।’
আমি মনে মনে বলি, গরু মেরে জুতো দান।
palau-18.JPGআমাকে তুলে দিতে এসেছিল পার্সোনাল অফিসার মি. হরিপদ নাগ। হরিপদ ম্যানিলা মিশনে পোস্টিংয়ে আসার আগে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও আমার পার্সোনাল অফিসার ছিল। তখন আমি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং জাতীয় সংসদবিষয়ক ডেস্কের প্রধান। সে দাঁড়িয়েছিল ভাবলেসহীন। কারণ, হরিপদও সাম্প্রতিক পৃথিবীর একতরফা পরিবর্তনগুলো সম্পর্কে অনবহিত ছিল না। তবে রাষ্ট্রদূত হিসেবে আজ অবধি এমন দুর্দান্ত তল্লাশির অভিজ্ঞতা এই প্রথম। এ হচ্ছে মার্কিনিদের অতি মোড়লিপনার বিন্দুবত প্রকাশ।
ম্যানিলা থেকে প্লেন ছাড়ল সিডিউল মতো। কোরোর আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে পৌঁছুতে রাত দুটো।
সেখানে আমাকে অভ্যর্থনা জানাল প্রবাসী বাঙালিরা। অতল অসীম প্যাসিফিকে, দেশ থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে আমার একমাত্র স্বজন। এই প্রবাসী ভাইবোনরা যথার্থই স্বজন। কিন্তু সমস্যা হল, তাদের অমোচনীয় বিভক্তি। বিভক্তির কারণ তাদের ভাষায় বলা যাক।
‘স্যার মিল হয় কীভাবে? শুক্রবার এই দেশে যার আট দিন সেও নেতা হতে চায়। এটা কি মানার মতো?’
পালাওতে বাংলাদেশিদের দুটো দল। আশ্চর্যজনকভাবে তা আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি ঘরানার নয়। নির্দলীয়। বাঙালির সংখ্যা এখানে মাত্র ছ-সাতশ। সংখ্যা বাড়লে হয়ত দল উপদলের সংখ্যা বাড়বে। যুক্তরাজ্যে আমি এক সময় সহকারী হাইকমিশনার ছিলাম। আমার অধিক্ষেত্রাধীন এলাকা বার্মিংহাম ওয়েস্ট মিডল্যান্ডে বাঙালিদের শত শত সংগঠন ছিল। কাজ করতে হলে সংগঠনের প্রয়োজন। তার চেয়ে বেশি প্রয়োজন পদ-পদবী। প্রয়োজন নয় কি?
গভীর রাতে এই অভ্যর্থনায় উপস্থিত রয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশ অর্গানাইজেসন ইন পালাওয়ের নেতা জনাব আমিন নূরুল ও তার সমর্থকেরা। এই সফর আয়োজনে তিনি অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশ দূতাবাস ম্যানিলাকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিয়ে আসছিলেন। প্রধানত তিনিই এখানে কর্মরত প্রবাসী বাঙালিদের অসুবিধাগুলো আমাদের গোচরে এনে তা প্রতিকারে অনেক দিন ধরে সচেষ্ট আছেন।
বিমান বন্দরের বাইরে এসে বাঙালিদের আরেকটি গোষ্ঠীর মুখোমুখি হলাম।
বাংলাদেশ এসোসিয়েশনের নেতা আলাউদ্দিন আল আজাদ বললেন, ‘স্যার আপনি জার্নি করে এসেছেন। আপনাকে বিরক্তও করব না, সময়ও নেব না। আমার লোকজনেরা আপনাকে একটু ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানাবে।’
‘সে পর্ব তো বিমান বন্দরের ভেতরে হল একবার।’
আমীনেরা ইতোমধ্যেই আমাকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানিয়ে ছোট একটি ফটোসেশন করেছে। ছবি ওঠানোর কোনো দরকার ছিল না। কিন্তু সাংগঠনিক তৎপরতার দু-চারটে চিহ্ন এবং সেই চিহ্ন অবলম্বনে একটু প্রচার না থাকলে সংগঠনের গোড়াটা মজবুত হয় না।
‘আপনি তো সবই বুঝতে পারছেন স্যার।’
রওনা হবার আগে আজাদ ম্যানিলায় আমাকে ফোন করেছিল। বলল, ‘আপনি পালাও আসছেন জেনে খুব খুশি হয়েছি স্যার। আমরা আপনাকে নেবার জন্য এয়াপোর্টে থাকব।’
আমি প্রমাদ গুনি। তাদের থাকার অর্থ আমীন ও আজাদের সমর্থকদের মধ্যে বিরোধের কারণে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়া।
বললাম, ‘কোনোই দরকার নেই। আমীনেরা থাকবে। আপনি সকাল দশটায় হোটেলে দেখা করুন।’
‘তাই কি হয়, স্যার। আপনি আসছেন শুধু এই বলে নয়, এই প্রথম একজন সরকারি প্রতিনিধি আমাদের প্রয়োজনে পালাও আসছেন। আমরা তাকে রিসিভ করব না তাই হয় নাকি।’
‘আপনারা সবাই একত্রিত হয়ে আসুন না। তাতে যেমন নিজেদের একতা বাড়বে, দেশেরও সম্মান বৃদ্ধি পাবে। আমাদের দলাদলি বিদেশিরা ভালো চোখে দেখে না।’
‘আমরা তো চাই মিলেমিশে থাকতে কিন্তু কী যে স্বার্থ অনেকে তা চান না। আপনি আসুন সব বলব।’
‘না, না আমার শোনার দরকার নেই। আপনাদের গোলমাল মেটাতে তো আর আমার পালাও আসা নয়। এর চেয়ে অনেক জরুরি কাজ রয়েছে।’
‘আমি জানি স্যার।’
আজাদ কথায় নম্র। তাকে বললাম, ‘বিমান বন্দরে দেশের জন্য অপ্রীতিকর কিছু যেন না ঘটে।’
আমীন নূরুলকেও সতর্ক করা হয়েছিল এ বিষয়ে। বিমান বন্দরে তারা উভয়েই সংযত আচরণ করায় আজাদদের ফুলের শুভেচ্ছা জানানো নির্বিঘ্ন হল।
তখন রাত তিনটের মতো। মেঘাচ্ছন্ন পালাওয়ের আকাশ। মাঝেমধ্যে মেঘ কেটে বেরুচ্ছে অস্পষ্ট আসমান। এই মুহূর্তে প্রকৃতি বৃষ্টিভেজা। আমি ভাবছিলাম দেশের কথা। জন্মভূমি থেকে কতদূরে প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে একটি সবুজ বিন্দুতে ভেসে আছি। সেই সবুজ বিন্দুর পোশাকি নাম রিপাবলিক অব পালাও। সাগরের বুকচেরা দীঘল একটি ভূখণ্ড। পাহাড়ি। একে অনেকেই রক আইল্যান্ডসও বলে। আয়তন মোটে চারশ পঞ্চাশ বর্গকিলোমিটার। দেশটি উত্তর-দক্ষিণে প্রায় চারশ মাইল লম্বা আর লোকসংখ্যা মাত্র বিশ হাজার। এই জনসংখ্যার তুলনায় এখানে বাঙালিদের সংখ্যা নগন্য নয়। শতকরা প্রায় চারভাগ।
পালাওয়ের চারপাশে শুধুই আদিগন্ত জলরাশি। তার মধ্যে ছোট্ট একটি ভূখণ্ড। আর সেই ভূখণ্ডে একদল কর্মমুখর বাঙালি। আমার স্বদেশি। বৃষ্টিস্নাত গভীর রাতে খোলা আকাশের পানে তাকিয়ে আর চারপাশের সামুদ্রিক জলের লোনা উচ্ছাস অনুভব করে আমার অদ্ভুত লাগতে থাকে।
জনা পঁচিশেক বাংলাদেশি জড়ো হয়েছিল বিমান বন্দরে। তাদের কাছ থেকে বিদায় নিই। শুধু আমীনরা তিনজন আমার সঙ্গে এল। পালাও সরকারের গাড়িতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রটোকল কর্মকর্তা আমাকে হোটেল প্যালেশিয়াতে পৌঁছে দিল।

২.
প্যালেশিয়া ফোর স্টার হোটেল। কোরোরের কেন্দ্রস্থলে। তিন তলায় রুম পেলাম। সিঙ্গেল ডিলাক্স রুমের বুকিং ছিল। হোটেল ম্যানেজমেন্ট তা আপগ্রেড করে জুনিয়র সুইট করে দিল। স্যুইটের একরুমে সিটি ভিউ। অন্যরুম থেকে চোখে পড়ে প্রশান্ত মহাসাগরের বিশালতা। দূরত্ব এক কিলোমিটার হবে হয়ত; হোটেল থেকে হাঁটার দূরত্বেই রেস্টুরেন্ট, গ্রোসারি, ফাস্ট ফুড সপ। প্যালেশিয়া তাইওয়ানি বিনিয়োগ। তাইওয়ানিজ মালিকের বাসা হোটেলের কাছেই। সকালে আমীন তার ডেলিগেশন নিয়ে আমার সুইটে দেখা করতে এলে তাদের একজন পরিচয় দিল।
‘আমি প্যালেশিয়া হোটেল মালিকের কার্পেন্টার।’
‘ও তাই। তা আপনার কাজ কি এই হোটেলেই?’
না, মালিকের বাড়িতে। ওখানেই তার কারখানা। আমি ওই কারখানার প্রধান কাঠমিস্ত্রি।
সকালে ব্রেকফাস্টের সময় প্যালেশিয়ার মালিকের সঙ্গে দেখা হয়েছে। কথা হয়নি। অনেক রাতে ঘুমিয়েছি। ব্রেকফাস্টে যেতে দেরি হল। যখন নিচতলায় রেস্টুরেন্টে ঢুকলাম, তখন প্রাতঃরাশ প্রায় শেষ। ওয়েটার ওয়েট্রেসরা টেবিল সাজাচ্ছে লাঞ্চের জন্য। একটি টেবিলে কফি এবং পত্রিকা নিয়ে বসে ছিলেন মালিক ভদ্রলোক। বসার সঙ্গে একটু-আধটু কাজের তদারকিও চলছিল। এত বড় হোটেলের মালিক কিন্তু কাজের বেলায় ধনী মানুষসুলভ কোনো জড়তা নেই। তিনি আমাকে মাঝেমধ্যেই খেয়াল করছিলেন। আসলে হোটেলে কী ধরনের গেস্ট আসেন বা থাকেন তা সবসময়ই টপ ম্যানেজমেন্ট খেয়াল রাখে। প্রয়োজনে তারা শুভেচ্ছা কার্ড সঙ্গে ঝুরিতে কিছু ফল অথবা দু-এক বোতল ওয়াইন অতিথিদের রুমে পৌঁছে দেন। এ হচ্ছে সৌজন্য প্রকাশের উপলক্ষ ধরে হোটেলের সুনাম বৃদ্ধির প্রয়াস।

palau-hotel.jpgআমার ধারণা প্যালেশিয়ায় আমার অবস্থান মালিক ভদ্রলোকের অজানা নয়। কারণ, হোটেল ম্যানেজমেন্টকে আগেই জানিয়ে রাখা রয়েছে অনেক অভিবাসী বাঙালি আমার সঙ্গে সময়ে-অসময়ে দেখা করতে আসবে। তাদের নিয়ে প্যালেশিয়ার হলুমে একটি সভাও করব আমরা। এতে অন্য অতিথিদের একটু অসুবিধা হতে পারে তা যেন তারা খেয়াল রাখেন। হোটেলের সিংহভাগ বোর্ডার জাপানিজ এবং তাইওয়ানিজ ট্যুরিস্ট। তাদের অনেকেই ভ্রমণ করছেন। সপরিবারে। এদের মধ্যে অনেকে আবার বয়স্ক। আমরা বাঙালিরা চলাফেরায় সব সময় অন্যের সুবিধা অসুবিধার বিষয়ে খেয়াল রাখিনা। এতে করে প্যালেশিয়ায় কখনও বিব্রতকর পরিস্থিতি হতে পারে অনুমান করে ম্যানেজমেন্টকে আগাম সতর্ক রাখা।
তাইওয়ানিজ মালিকের সঙ্গে আমার চোখাচোখি হল। সে হয়ত তখন জানল এই আমি তার প্রধান কাঠমিস্ত্রির দেশের রাষ্ট্রদূত। তাতে অবশ্য কোনো অসুবিধা নেই। সারা বিশ্বে আমাদের বর্তমানে সত্তর লাখেরও বেশি অভিবাসী শ্রমিক। তাদের কষ্টার্জিত উর্পাজন নিয়ত ভারসাম্য রাখছে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে। সচল রেখেছে অর্থনীতির চাকা। উপসাগরীয় দেশগুলোয় আমাদের সবচেয়ে বেশি লোকজন কাজ করছেন। বলাই বাহুল্য, তাদের অধিকাংশই পছন্দমতো পেশায় কাজ পাননি। এদের বিশাল একটি অংশ সৌদি আরব, আমিরাত, কুয়েত, কাতার প্রভৃতি দেশে সুইপার। আর ওসব দেশে নিয়োজিত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতকে তাই রসিকতা করে বলা হয় অ্যাম্বাসেডর অব সুইপারস।
বাংলাদেশের এখন সময় এসেছে বিদেশে অদক্ষ শ্রমিক বা কর্মী না পাঠানোর। অ্যাম্বাসেডর অব সুইপারস গ্লানি থেকে কাউকে মুক্ত করবার জন্য নয়। বিদেশে কর্মী প্রেরণ করে আমরা যে উপার্জন করি তা বাড়াতে। অর্থাৎ ভ্যালু অ্যাডিসনের জন্য। দ্বিতীয়ত, শিক্ষিত দক্ষ জনশক্তি প্রেরণের মাধ্যম দেশের ইমেজ বাড়াতে। স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পর বাংলাদেশ এ ল্যান্ড অব সুইপারস হয়ে বিশ্ব সমাজে থাকতে পারে না।
আমাদের দক্ষ পরিশ্রমী হাতের অভাব নেই। আমাদের সামর্থ কেন বাইরের পৃথিবী জানবে না। ফিলিপাইন বাংলাদেশের মতোই একটি জনশক্তি রপ্তানিকারক দেশ। আমাদের তুলনায় সামান্য বেশি সংখ্যক ফিলিপিনো অভিবাসী দুনিয়ায় নানা দেশে ছড়িয়ে আছে। তাদের অধিকাংশই দক্ষ। যে কারণে জনশক্তি রপ্তানিতে বাংলাদেশের চেয়ে ভ্যালু অ্যাডিসন বেশি। বর্তমানে ফিলিপাইন এই সেক্টরে বছরে ১৭ বিলিয়ন ডলার আয় করে। সেখানে বাংলাদেশের উপার্জন মাত্র ১১ বিলিয়ন ডলার।
আমাকে চুপ করে ভাবতে দেখে প্রধান কাঠমিস্ত্রি বলল, ‘মালিককে আমি বলেছি আপনি কয়েকদিন এখানে থাকবেন। কোনো অসুবিধা হলে বলবেন স্যার।’
খুবই আন্তরিক একটি প্রস্তাব। প্রধান কাঠমিস্ত্রির বাড়ি নোয়াখালি। তিনি আমীন নূরুলদের সংগঠন বাংলাদেশের অর্গানাইজেসন ইন পালাওয়ের একজন নেতা।
উত্তর দেই, অসুবিধা হলে অবশ্যই বলব। তবে কোনো সমস্যা হবে বলে মনে হচ্ছে না। এ ধরনের হোটেলে সাধারণত কোনো অসুবিধা হয় না। আর প্যালেশিয়ায় স্টাফদের সহযোগী বলেই মনে হচ্ছে।
আমীন ও হেড কাঠমিস্ত্রির সঙ্গে শরীফ এসেছে। সে কাল রাতে বিমান বন্দরে ছিল। শুধু তাই নয় হোটেল অবধিও এসেছিল। তাদের জিগ্যেস করি, ‘আজাদরা এল না? একসঙ্গে কথা বললে আপনাদের অসুবিধাগুলো একবারে জেনে নিতে পারতাম।’
আজাদ এখানে একটি ভালো কোম্পানিতে সিকিউরিটি গার্ড। আমীনের পেশাও তাই। শরীফ কাজ করছে একটি জাপানিজ নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে।
আমীন জবাব দিল, ‘বলেছিলাম স্যার। তারা আপনার সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলতে চায়।’
আমার খারাপ লাগতে থাকে। বিশ্বে আজ বাঙালিরা যেখানেই আছে, সেখানেই অনৈক্য-নেতৃত্বের কোন্দল। আজাদ ও আমীনেরা একই সমস্যা নিয়ে কথা বলবে। কিন্তু একসঙ্গে বসবে না। একে অপারকে কিঞ্চিৎ সমালোচনার সুযোগ রাখা আর কি।
‘ঠিক আছে আপনারা আমাকে ব্রিফ করুন।’
আমীন আমাকে বাংলাদেশ কম্যুনিটির সমস্যাগুলো জানিয়ে বলে, ‘কাল বিকেলে হোটেলের হলরুমে সবাইকে ডেকেছি। আপনি তাদের মুখ থেকেও অনেক কিছু সরাসরি জানবেন স্যার।’
‘সবাইকে ডেকেছেন, সবাই আসবে তো?’
‘আজাদ সাহেবদের বলেছি। বলল তো আসবে।’
একটি ফোন এল। আজাদের । সে তার লোকজন নিয়ে প্যালেশিয়ার লবিতে। দেখা করতে চায়। বললাম, ‘আগামীকাল বিকেলে কম্যুনিটি মিটিং। জানেন তো মনে হয়। সেখানে আসুন। সবাই মিলে কথা বলা যাবে।’
‘জানি স্যার। কিন্তু আমি আসতে পারব না। কাল বিকেলের শিফটে আমার ডিউটি।’
‘রোববারও ডিউটি!’
‘সিকিউরিটির কাজ স্যার, ছুটির দিনও শিফট পড়ে।’
আমীনদের বিদায় করে আজাদদের ডাকি। বলি, ‘অল্প কয়েকজন মানুষ আমরা এখানে। কিসের এত সমস্যা?’
‘এক হিসেবে কোনো সমস্যাই নেই। আমাদের দিক হতে তো নাই-ই। ব্যক্তিগত সামাজিক সব ধরনের মেলামেশাই চলছে। তবে স্যার প্রবলেম ওই একটাই। বাঙালিদের দুটো সংগঠন।’
বাংলাদেশিরা পালাওয়ে যেসব সমস্যার সম্মুখীন হয়, সে সম্পর্কে আমি ম্যানিলা থাকতেই খোঁজ করেছি। আমীনও এ নিয়ে আমাকে ধারণা দিয়েছে। আজাদের কাজ থেকে তাই নতুন কিছু শুনতে পাই না। বেশকিছু সমস্যা নিয়ে এখানে আছে বাংলাদেশিরা। ১. ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে কালো তালিকা থেকে বাংলাদেশের নাম প্রত্যাহার; ২. নিয়মিত বেতন না পাওয়া; ৩. চুক্তি শেষে দেশে ফেরার সময় ফিরতি টিকেট না পাওয়া; ৪. ছুটিশেষে দেশ থেকে ফেরার সময় পালাওয়ে পুনরায় ঢুকতে না পারা। বিশেষ করে টিকেট থাকা সত্ত্বেও ম্যানিলাতে কন্টিনেন্টাল এয়ারলাইন্সের বোডিংয়ে অস্বীকৃতি; ৫. কাজ বদলের সুযোগ না থাকা; ৬. মিডিয়াতে বাংলাদেশিদের সম্পর্কে অপপ্রচার, যাতে করে তাদের দেশে ফেরত পাঠানো যায়; ৭. তাদের সম্পর্কে দুঃখজনকভাবে ব্যাপক মাত্রায় সুপারি চুরির অভিযোগ এবং ৮. ধর্মীয় আচার পালনে কোনো মসজিদ না থাকা।
পালাও সরকার সম্প্রতি বাংলাদেশিদের সে দেশে প্রবেশের বেলায় কোনো ভিসা দিচ্ছে না। বাংলাদেশ বর্তমানে কালো তালিকাভুক্ত একটি দেশ। যদিও কালো তালিকাভুক্তির কোনো যুক্তিসংগত কারণ নেই। কালো তালিকাভুক্ত একটি দেশের রাষ্ট্রদূত হয়ে পালাওয়ে আমার প্রবেশ সহজ হয়নি। সে সম্পর্কে আমি সুবিধামতো বয়ানের ইচ্ছে রাখি।
শনিবার থাকায় অনেকেরই ছুটি ছিল। প্রায় সারা দিন ধরে তাই প্রবাসী বাঙালিরা হোটেল প্যালেশিয়াতে আসতে থাকে। সবাই সমস্যা নিয়ে নয়। কেউ কেউ ব্যক্তিগত কৌতূহলে তাদের রাষ্ট্রদূতকে এক নজর দেখার ইচ্ছায়। কেউবা নিমন্ত্রণ জানাতে। দুপুরের পর এল দুজন। আমি সবে লাঞ্চ করে রুমে ফিরেছি। প্যালেশিয়ার আশপাশে অনেক রেস্টুরেন্ট, ফাস্ট ফুড সপ। আমীন-আজাদদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী আমি গেলাম তাজ-এ। তাজ ভারতীয় রেস্টুরেন্ট। এর অন্যতম কর্ণধার কেরালার উদ্যমী তরুণ রবার্ট স্কারিয়া। অপরাহ্ন হয়ে যাওয়ায় তাজ বন্ধ পেলাম। ফাস্ট ফুড খেয়ে ঘরে ফিরতেই ওই দুজন হাজির। পরনে হাফ প্যান্ট। মলিন। পায়ে স্যান্ডেল। রাবারের। তাও জীর্ণ। মনে হল কঠোর পরিশ্রমে শরীর তাদের তামাটে হয়ে গেছে।
দুচারটে কথা বিনিময়ের পর বলল, ‘ভাই, আপনাকে আমার দাওয়াত দিতে এসেছি। আজ সন্ধ্যায়, যদি আপনি রাজি থাকেন। বেশি কিছু না, এই কয়েকজন আমরা একসঙ্গে খাব।
আরও কিছু নিমন্ত্রণ, যেমন বাংলাদেশ অর্গানাইজেসন, বাংলাদেশ এসোসিয়েসনের পক্ষ থেকে থাকায় তাদের দাওয়াত কবুল করা সম্ভব হল না। আমীন-আজাদদের নিমন্ত্রণও আমি এখন অবধি গ্রহণ করিনি। বলেছিলাম, তারা দুগ্রুপ মিলে করলে সানন্দে অংশ নেব।
ছেলে দুজন বিদায়ের পর এল শরীফ। আমার খোঁজখবর নিতে এসেছে সে। শরীফ বেশ চৌকস। ভদ্র ছেলে। আমার কাছে ওর কোনো প্রয়োজন নেই। সে আমাকে তাদের অতিথি বিবেচনায় একটু সুবিধা-অসুবিধা দেখতে এসেছে। জিগ্যেস করল, ‘ছেলে দুটো বলল স্যার?’
‘কেন?’
‘লবিতে দেখা হয়েছিল আমাদের। জানাল, আপনার কাছে যাবে। আমি আগে থেকেই লবিতে ছিলাম। আপনি বিশ্রাম নিচ্ছেন ভেবে আসিনি।’
‘তুমি ওদের চেন?’
‘না স্যার।’
‘কী বলেছে তারা তোমাকে।’
‘বলল আপনাকে দাওয়াত করবে। নতুন জায়গায় আপনার খাওয়া দাওয়ার কষ্ট।’
‘ও।’
‘স্যার আপনি কিছু মনে নিয়েন না। কাল মিটিংয়ে আরও অনেকের সঙ্গে দেখা হবে আপনার। তখন দেখবেন, শিক্ষিত-অশিক্ষিত কত রকমের বাঙালি আমরা আছি এখানে। কত রকম তাদের কথা। এই দুটো তাদেরই মতো। ভাবছে বললেই আপনি ওদের পেছনে হাঁটা শুরু করবেন। স্যার মাইন্ড করেন নাই তো?’
‘আমি কিছু মনে করিনি। আর মাইন্ড করার কিছু নাইও তো।’
শনিবার বিকেলে আমার সর্বশেষ গেস্ট ছিলেন পালাওয়ের ওমবাডসম্যান মি. মোসেস উলুডং এবং প্রাক্তন সিনেটর মি. সান্তি আসানোমা। তারা উভয়েই বাংলাদেশিদের শুভাকাঙ্খী এবং কমিউনিটি নেতৃবৃন্দের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। যখনই কোনো সমস্যা হয়, তখুনি বাংলাদেশিরা সাহায্যের জন্য তাদের শরণাপন্ন হয়। আমি পালাও এসেছি জেনে তারা হোটেল স্যুইটে দেখা করতে এলেন। তারা আসবেন তা আমি আগে থেকেই জানতাম। নিজের রুমে তাই ফরমাল পোশাকে অপেক্ষা করছিলাম। তারা হাজির হলেন হাফ প্যান্ট পরে। মাথায় দুজনেরই হ্যাট। হ্যাটের আবশ্যকতা আমি দুপুরের পর খেতে বেরিয়েই বুঝেছি। এখানকার রোদ খুব চড়া। খুব তীব্রভাবে মুখে লাগে। সূর্যের এত তেজ এর আগে কোথাও আমি এভাবে অনুভব করিনি। প্রখর রোদে মনে হয় সারা কোরোর ঝাঁঝাঁ করছে।
আমাকে আনুষ্ঠানিক পোশাকে দেখে মি. উলুডং বললেন, ‘স্যরি, আজ তো ছুটির দিন। আমরা ভেবেছিলাম, তুমিও আমাদের মতো ক্যাজুয়াল পোশাকে থাকবে।’
‘হ্যাঁ, ঘরোয়া পোশাকে থাকতে পারলেই আরামদায়ক হত। কিন্তু তা আর পারছি কই। সারা দিনই কেউ না কেউ আসছে। সবার সঙ্গেই কথা বলতে হচ্ছে। তোমরাও আসছ জেনে আর পোশাক খুলিনি। যে পোশাকে আছ ফিল ফ্রি। আমার কোনো অসুবিধা নেই।’
তাদের সঙ্গে আলাপে বুঝতে পারি বহুদিন ধরেই তারা বাংলাদেশ কমিউিনিটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। বাংলাদেশিদের অসুবিধাগুলো সম্পর্কে তাদের ধারণা উলুডং বলল, ‘এসব সমস্যার জন্য আমি তোমার লোকজনদের দোষ দেখি না। নিয়মিত বেতন না পেলে তারা কাজ বদল করতে চাইবেই। ছুটিতে দেশে গিয়ে আর চাকরিতে ফিরতে পারবে না, তাই হয় নাকি! আর চুক্তিও যখন বলবৎ। কিছু অবৈধ বাংলাদেশি এখানে আছে। কিন্তু তারা তো দালালদের খপ্পরে পড়ে পরিস্থিতির শিকার। তাদের ভুল বুঝিয়ে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে।’
আমি বুঝতে পারি এই ভুল বোঝানোটা সহজ। পালাওয়ের মুদ্রা এখন অবধি ডলার। মাত্র আটশ মাইল দূরে গুয়াম ইউএস টেরিটরিজ। ক্যাপিটল ভবন সবখানেই যুক্তরাষ্ট্রকে অনুসরণ। ভাগ্যান্বেষী কোনো ইমিগ্রান্ট ওয়ার্কারের কাছে তা আমেরিকা বলে ভ্রম হতেই পারে। পালাও পৌঁছে যাওয়ার মানে এক প্রকার আমেরিকা পৌঁছে যাওয়া বৈ তো নয়।
‘ব্যক্তিগতভাবে তুমি যে সমস্যাগুলো অনুধাবন করতে পেরেছ, সে জন্য ধন্যবাদ। কিন্তু এর বাইরে আমার বড় প্রশ্ন হচ্ছে, তোমরা আমাদের ভিসার বেলায় এমবার্গো দিলে কেন। এর তো কোনো কারণ খুঁজে পাই না।’
‘আমাদের লোকসংখ্যা তো কম। সে তুলনায় মনে হচ্ছিল বাংলাদেশিদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। তাই এই নিষেধাজ্ঞা। আমার মনে হয় এটি সাময়িক।’
উত্তর দিল সিনেটর সান্তি আসানোমা। আমি কিছু বলার আগেই উলুডং বলল, ‘তুমি চাইলে এ নিয়ে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলতে পার।’
‘তা কি সম্ভব?’
‘আমি চেষ্টা করে দেখতে পারি। তিনি এখন দেশের বাইরে। ফিরলে তোমাকে অগ্রগতি জানাব।’
‘প্রেসিডেন্ট যদি সদয় সম্মতি দেন, আমি তাকে ডিনারে আমন্ত্রণ জানাতে চাই।’ উলুডংকে প্রস্তাব করি।
‘তোমার আমন্ত্রণ আমি প্রেসিডেন্টকে পৌঁছে দেব। গ্রহণ করা না-করা তার প্রিভিলেজ।’
‘আমি জানি মি. ওমবাডসম্যান।’
‘মি. ওমবাডসম্যান নয়, বলো উলুডং। উই আর ফ্রেন্ডস।’
‘অবশ্যই।’
আমি রুমের মিনি বার থেকে তাদের ঠান্ডা বিয়ার বের করে দেই। পালাওয়ে উৎপাদিত বিয়ার। রুস্টার। ক্যানের গায়ে লাল মোরগের ছবি। উলুডং এবং সান্তি তা সবিনয়ে সরিয়ে রেখে বলেন আজ সন্ধ্যার আগে তারা তা স্পর্শ করবে না। আমি জোর করি না। শুধু এশীয় আতিথেয়তা নিয়ে তাদের সামান্য বয়ান করি।
‘মাই ফ্রেন্ড, এবার একটি কাজের কথা বলি।’
অ‘বশ্যই এবং নিঃসঙ্কোচে।’
‘আমাদের ফ্রেন্ড সিনেটর সান্তি অনেক দিন ধরেই বাংলাদেশিদের কল্যাণে কাজ করছে। তোমাদের তো এখানে কোনো দূতাবাস নেই, অদূর ভবিষ্যতে তার সম্ভাবনাও দেখছি না। এ অবস্থায় সিনেটর সান্তি পালাওয়ে বাংলাদেশের অনরারি কনসাল হিসেবে কাজ করতে চায়।’
আমি অবশ্য এ ধরনের প্রস্তাবের জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। তবে তা আমার কাছে অবিবেচ্য মনে হল না। বললাম, ‘অবশ্যই, কেন নয়। কাগজপত্র দিলে আমি তা সুপারিশসহ বাংলাদেশ সরকারের বিবেচনার জন্য পেশ করব। তবে তোমরা তো জান, চূড়ান্ত সিন্ধান্ত তাদের।
সিনেটর সান্তি বললেন, তিনি তার বায়োডাটা অন্যান্য ক্রেডিনসিয়ালসহ আমার রুমে পৌঁছে দেবেন। উলুডং সাংবাদিকতার সঙ্গেও জড়িত। তার সম্পাদিত ’টায়ে বিলাউ’ সপ্তাহে দুদিন বেরোয়। ফটোগ্রাফার সঙ্গে এসেছিল। বলল, ‘অনুমতি পেলে ফটোগ্রাফারকে ডাকব, আমার পত্রিকার জন্য তোমার ছবি নিতে।’
সহাস্যে উত্তর দিলাম, ‘ইয়েস, উইথ প্লেজার।’
রোববার বিকেলে প্যালেশিয়ার হলরুমে কম্যুনিটির সঙ্গে যে বেঠক হল, তা ছিল সুশৃঙ্খল। প্রায় দেড়শর মতো বাংলাদেশি জামায়েত হয়েছিলেন সেখানে। পোশাক ও ব্যবহারে তারা ছিলেন মার্জিত। এদের অধিকাংশই কায়িক পরিশ্রম করেন, যা তাদের অবয়বে স্পষ্টই ফুটে ছিল। তারা বৈঠক পরিচালনায় আয়োজক বাংলাদেশ অর্গানাইজেসনকে সবরকম সহযোগিতা করল। আমি একে একে তাদের সবার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলাম। সবার একই কথা। অনেকেই তারা ম্যানপাওয়ার এজেন্টের প্রতারণার শিকার। এখন বৈধভাবে পালাওয়ে থাকতে চায়। কাজ করতে চায়।
কিন্তু আমি যা বুঝি, তাতে পালাওয়ে কোনো কাজ নেই। ছোট্ট একটি দেশ। নেই কোনো শিল্পকারখানা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে ট্রাস্ট টেরিটরি ছিল। তারও আগে স্পেন ও আমেরিকার মধ্যে যুদ্ধের প্রেক্ষিতে ১৮৯৯ সালে পালাওকে স্পেন জার্মানির কাছে বিক্রি করে দেয়। জার্মানির সঙ্গে মিত্রতার সূত্রে হাতবদল হয়ে এই দ্বীপ রাষ্ট্রটি ১৯১৪ সালে জাপানের হাতে এলেও ১৯৪৪-এ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র তা অধিকার করে। ১৯৪৭ সাল থেকে পালাও ছিল ট্রাস্ট টেরিটরি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দি কমপ্যাক্ট অব ফ্রি এসোসিয়েসন চুক্তির আওতায় ১৯৯৪ সাল থেকে দেশটি একপ্রকার স্বাধীন। ওই বছরের ডিসেম্বর থেকে পালাও জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র হয়। পুলিশ ফোর্স থাকলেও দেশটির নিজস্ব নিজস্ব কোনো সেনাবাহিনী নেই। প্রতিরক্ষা বিষয়ে তারা যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল। পালাওয়ের পররাষ্ট্রনীতিও মার্কিনিদের দ্বারা প্রভাবিত। যেমন চীনের সঙ্গে নয়। তাইওয়ানিজদের সংখ্যা অনেক। মার্কিনি প্রভাবের বড় আগ্রাসন পালাওয়ের অর্থনীতি ও মুদ্রা। এখানে মার্কিন ডলার পালাওয়ের নিজস্ব ও বৈধ মুদ্রা হিসেবে প্রচলিত।
প্যাসিফিকের পালাও যুক্তরাষ্ট্রের গেটওয়ে এ রকম একটি ভ্রান্ত বাংলাদেশিদের অনেকেই যে ম্যানপাওয়ার এজেন্টদের সহজ প্রতারণার শিকার তা বোঝা যায়। প্রশান্ত মহাসাগরে পালাওয়ের প্রতিবেশী ইউএস টেরিটরি গুয়াম। কোনোমতে সেখানে পৌঁছুতে পারলে তো এক প্রকার আমেরিকায়ই পৌঁছে যাওয়া হল। কিন্তু বাস্তব বলে ভিন্ন কথা। স্বপ্নের আমেরিকা নয়, বছরের পর বছর ধরে তারা এখন আটকে আছেন পালাওয়ে। ক্ষুদ্র একটি ভূখণ্ডে। অদ্ভুত সুন্দর একটি সবুজ সমুদ্রদেশ। বৃষ্টিস্নাত একটি রাষ্ট্র। সারা বছর এখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। গড় তাপমাত্রা ২৮০ সেলসিয়াস। বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ বাংলাদেশের মতোই। শতকরা ৮২ ভাগ। সমুদ্র পরিবেস্টিত হলেও পালাও টাইফুন জোনের বাইরে। ফলে টাইফুন আক্রান্ত হবার অভিজ্ঞতা পালাওবাসীর নেই বললেই চলে। তবে দেশটি ভূমিকম্পপ্রবণ। যে কোনো সময় সেখানে ঘটতে পারে অগ্ন্যুৎপাত এবং ঝড়-ঝঞ্ঝা।
পালাওয়ের অর্থনৈতিক অবস্থাও শক্তিশালী নয়। পর্যটন, মৎস্য আহরণ এবং প্রচলিত কৃষির উপর তা নির্ভরশীল। তবে সারা বছর ধরে জনসংখ্যার অনুপাতে চারগুণ বেশি পর্যটক পাওয়া বিরাট ব্যাপার। এসব ট্যুরিস্ট মূলত আসে জাপান, কোরিয়া, তাইওয়ান থেকে। আমেরিকানরাও আছে এই দলে। এখানে তাই সার্ভিস সেক্টর যতটুকু প্রসারিত সে তুলনায় অপরাপর ক্ষেত্রগুলো পিছিয়ে।
কিন্তু স্বপ্নভঙ্গ হলেই তো জীবন থেমে থাকে না। বাংলাদেশিদের জীবন সংগ্রামও তাই থেমে নেই। তারা এরমধ্যে নিজেরাই গড়ে তুলেছে ছোটখাটো কৃষিখামার। কোরোরে দশ থেকে বারোটি বড় গ্রোসারি সপের মালিক তারা। বিভিন্ন ব্যক্তি মালিকানাধীন কোম্পানিতে তারা যেমন কর্মরত, তেমনি তারা নিয়োজিত সরকারি প্রতিষ্ঠানেও। যেমন পালাও বিমান বন্দরে চাকরি করছেন কেউ কেউ। পালাওয়ানদের বাসা বাড়িতেও পাওয়া যাবে ‘মেনি ইন ওয়ান’ হিসেবে। কারণ তারা যেমন বাড়ির কাজে সাহায্য করছেন, তেমনি আবার পারঙ্গম কৃষিকাজে। তবে বাংলাদেশে প্রচলিত ফসল উৎপাদন নয়। আমাদের প্রধান খাবার ভাতের মতো এ দেশের মানুষের প্রধান খাদ্য কচু ও মিষ্টি আলু। কচুকে এরা বলে তাপিওকা আর মিষ্টি আলু হচ্ছে টারো। তাপিওকা আর টারো আবাদের জন্য ক্ষেত প্রস্তুত করা খুবই কষ্টকর কাজ। আর সেই কাজটি দিনের পর দিন করে যাচ্ছে অনেক বাংলাদেশি। বেতন তাদের দেড়-দুশ ডলার হবে হয়ত। তাও আবার অনেক সময় অনিয়মিত। টিকে থাকার সংগ্রামে অর্থের জোগান অনিয়মিত হলে চলবে কেন। তখন অন্য পথ খোঁজে তারা।
পালাওয়ে কাচা সুপারি একটি অর্থকরী প্রকৃতিজাত পণ্য। প্রকৃতিজাত বলছি এ জন্য যে বৃষ্টিস্নাত এই দেশে সুপারিবাগান পরিকল্পনা মাফিক করার দরকার পড়ে না। তার কলেবর বাড়ানোর জন্য প্রয়োজন পড়ে না পরিচর্চার। অলক্ষ্যে সুপারিগাছ এখানে গজিয়ে ওঠে। বাগানে। কৃষিজমিতে কাজ করতে করতে বাঙালি শ্রমিকভাই অলক্ষ্যে সে সুপারি আবার নিজের মনে করে সংগ্রহ করে। তাতে খুব একটা অসুবিধা ছিল না। যদি তারা তা মালিকের সঙ্গে শেয়ার করত। সুপারিগাছের মালিক পারিশ্রমিক হিসেবে এর একটি অংশ তাদের দিতেও রাজি।
কিন্তু সে প্রত্যাশা মালিকদের পূরণ না হওয়ায় কোরোরে বর্তমানে ‘সুপারি চুরি’ একটি বড় ইস্যু। তা এখন মিডিয়া পর্যন্ত গড়িয়েছে। হা ঈশ্বর, বেঁচে থাকার সংগ্রাম বলে কথা। বেঁচে থাকার এই নিরন্তর সংগ্রামে অনেকে নিজেদের গুছিয়েও নিয়েছেন। তারা পরিবার পরিজন নিয়ে ভালোই আছেন কোরোরে।
প্যালেশিয়ার হলরুমে তাদের আমি যত দখি তত বিমোহিত হই। এই সব মানুষেরা যারা ছিল বাংলাদেশের নানা প্রান্ত বিন্দুতে, সহস্র মাইল দূরে অজানা, অচেনা এক ঠিকানায় তারা আজ প্যাসিফিকের এক বিন্দু এক ঠিকানায়। গড়ে নিয়েছে আরেকটি বাংলাদেশ। দেশে যে ছিল শুধুই আমীন, আজাদ কিংবা শরীফ তাদের শ্রমে, ঘামে, রক্তে প্যাসিফিকের অসীমতাও আজ বাংলাদেশ চেনে। অনেকগুলো আইল্যান্ড স্টেটস এই প্যাসফিকে। মাইক্রোনেশিয়া, কিরিবাতি, মার্শাল আইল্যান্ডস, নাউরু, সলোমন দ্বীপপুঞ্জ ও টুভালো। গুয়াম তো রয়েছেই। ওই সমস্ত দ্বীপরাষ্ট্রেও বাঙালি যে পদধুলি ছড়ায়নি তা কে জানে। যেমন কেই-বা আগে জানতে পেরেছিল পালাওতে তারা তাদের আনন্দ, বেদনা, কষ্ট, ভালোবাসার মিশেলে সংগ্রামমুখর জীবনের পাথ ফাইন্ডার হয়ে আছে।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (6) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Chandan Podder — মে ৬, ২০১৫ @ ১০:১৭ পূর্বাহ্ন

      Wonderful. A diplomat should take care of the citizen of his country. Your description is also very interesting. Is Man power agencies more powerful than government?

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Tridip — মে ৭, ২০১৫ @ ২:০১ অপরাহ্ন

      Smooth & well written. Amazed about the writer’s profession as a diplomat. Hopefully he will be the right one to look after those poor fellows.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Faruk Kader — জুলাই ২৩, ২০১৫ @ ৩:৫৭ অপরাহ্ন

      Nice and well-written. Good to know Bangladeshis are making their presence felt far and wide into the world.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আহমেদ আনহার — এপ্রিল ২১, ২০১৬ @ ৩:০০ অপরাহ্ন

      লেখকের বর্ণনাভঙ্গি অসাধারণ!
      খুব ভালো লাগছে এটা জেনে, আনন্দ, বেদনা, কষ্ট,ভালোবাসার মিশেলে দূর প্রবাসে গড়ে উঠছে আরেক খন্ড লাল সবুজ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন razib — মে ৮, ২০১৬ @ ১২:০১ অপরাহ্ন

      সাবলীল, ঝরঝরে বর্ননা। খুব ভালো লাগলো আপনার বর্ননায় প্রশান্ত মহাসাগরের এক চিলতে দ্বীপে বাংলাদেশীদের জীবন সংগ্রামের কাহিনী পড়ে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অধ্যাপক ডাঃ রুহুল আমিন হাসান — জুলাই ৩০, ২০১৬ @ ৮:৪৪ অপরাহ্ন

      সুন্দর লেখা রাষ্ট্রদূত সাহেবের । এক নিঃশ্বাসে পড়লাম বলা চলে । তবে শেষ কথা নেই , যে কাজে গেলেন তার কি করলেন । জানতে আগ্রহী ছিলাম ।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com