আবু ইসহাকের অগ্রন্থিত আত্মজৈবনিক রচনা

রাজু আলাউদ্দিন | ২৬ এপ্রিল ২০১৫ ১:০১ পূর্বাহ্ন

_ishak-pic.jpgঅতি সম্প্রতি দিল্লী সফর করতে গিয়ে দৈবের বশে বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের আদিপর্বের প্রধান লেখকদের একজন কথাসাহিত্যিক আবু ইসহাকের অগ্রন্থিত এই লেখাটি নজরে আসে। হাফিংটন পোস্ট (ভারত)-এর বার্তা সম্পাদক ইন্দ্রানি বসু, তার বাবা লেখক অধ্যাপক দিলীপ কুমার বসু এবং লেখিকা ও শিক্ষিকা নন্দিতা বসুর ব্যক্তিগত পাঠাগার দেখার সুযোগ করে না দিলে এই আবিষ্কার আদৌ সম্ভব হতো কিনা সন্দেহ। তাদের উদার আতিথেয়তার সুযোগ নিয়ে ফাঁকে ফাঁকে চোখ বুলিয়ে নিয়েছিলাম লোভনীয় পাঠাগারের ঘুমিয়ে পড়া বইগুলোর দিকে। নিতান্ত কৌতূহলবশত–পুরোনো বইয়ের প্রতি যা আমার সদাজাগ্রত–শ্রীশৌরীন্দ্রকুমার ঘোষ এবং শ্রীপরেশ সাহার সম্পাদনায় কথাশিল্পী শীর্ষক ঘুমের অভিশাপে নিথর রাজকুমারীর গায়ে সোনারকাঠি ও রূপোরকাঠিসদৃশ প্রেমপ্রবণ আমার আঙুলের স্পর্শ মাত্র সে চোখ মেলে তাকালো। আমিও চোখ রাখলাম বইটির বারান্দায় (সূচীপত্রে)। দেখলাম সেখানে বসে অাছেন পশ্চিমবঙ্গের খ্যাতিমান লেখকদের পাশাপাশি বাংলাদেশের লেখক আবুল ফজল, আবু ইসহাক, মহীউদ্দীন চৌধুরী, মবিন উদদিন আহমদ এবং শামসুদদীন আবুল কালাম। এই গ্রন্থের জন্য লিখিত আত্মজৈবনিক এই লেখাগুলো এখনও পর্যন্ত তাদের কোনো গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বলে জানা যায় না। আমরা এই পর্বে লেখক আবু ইসহাকের লেখাটি প্রকাশ করছি।

শ্রীশৌরীন্দ্রকুমার ঘোষ এবং শ্রীপরেশ সাহা সম্পাদিত কথাশিল্পী গ্রন্থ সম্পর্কে জ্ঞাতব্য তথ্য হচ্ছে এই যে এটি প্রকাশ করেছিল কলকাতার ভারতী লাইব্রেরী, প্রকাশক ছিলেন জে. সি. সাহা রায়। কলকাতার লোয়ার সাকুর্লার রোডস্থ শতাব্দী প্রেস প্রাইভেট লি:-এর পক্ষে শ্রীমুরারিমোহন কুমারের তত্ত্বাবধানে মুদ্রিত হয়েছিল। এর প্রথম প্রকাশকাল ছিল পৌষ ১৩৬৪, আজ থেকে প্রায় সাতান্ন বছর আগে। ১৭০ পৃষ্ঠার সুমুদ্রিত এই বইটির দাম ছিল পাঁচ টাকা।

border=0কথাসাহিত্যিক আবু ইসহাককে আজকের দিনের পাঠকদের কাছে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয়ার কিছু নেই। তিনি অল্প লিখলেও, সে সব লেখা সুপরিচিত এবং পাঠকপ্রিয়। তিনি সর্বাধিক খ্যাতি পেয়েছেন তার সূর্য দীঘল বাড়ি উপন্যাসের জন্য। তবে এটি ছাড়াও তার আরও দুটি উপন্যাস আছে।
তার আত্মজৈবনিক লেখাটিতে প্রবেশের আগে আজকের পাঠকদেরকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে আবু ইসহাকের জন্ম: ১ নভেম্বর, ১৯২৬ সালে শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া থানাধীন শিরঙ্গল গ্রামে। তিনি ১৯৪৬ সালে, মাত্র বিশ বছর বয়সে রচনা করেন বিখ্যাত উপন্যাস সূর্য দীঘল বাড়ী, যদিও এটি প্রকাশিত হয় ১৯৫৫ সালে কলকাতা থেকে। পরে এই উপন্যাসের ভিত্তিতে মসিহউদ্দিন শাকের ও শেখ নিয়ামত আলীর যৌথ পরিচালনায় একটি শিল্পসফল চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছিল।
আবু ইসহাক ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন ১৯৪২ সালে, স্কলারশিপ নিয়ে। ১৯৬০ সালে পাকিস্তানের করাচি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেন। তিনি আমলা পর্যায়ে বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৮৪ সালে তিনি সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তিনি মৃত্যু বরণ করেন ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০০৩ সালে ঢাকায়।

প্রকাশিত গ্রন্থ
উপন্যাস
• সূর্য দীঘল বাড়ি (১৯৫৫) – চলচ্চিত্ররূপ – ১৯৭৯
• পদ্মার পলিদ্বীপ (১৯৮৬)
• জাল (১৯৮৮)

গল্প
• হারেম (১৯৬২)
• মহাপতঙ্গ (১৯৬৩)

পুরস্কার
• বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬৩)
• সুন্দরবন সাহিত্যপদক (১৯৮১)
• একুশে পদক (১৯৯৭)

আবু ইসহাক

“আমার জন্ম ফরিদপুর জেলার শিরঙ্গল” গ্রামে ১৩৩৩ সালের (১৯২৬, নভেম্বর) ১৫ই কার্তিক। ঝিঝারী-উপসী উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয় থেকে ১৯৪২ সালে ম্যাট্রিক পাশ করি। একটি ‘স্কলারশিপ’ও পাই। এই ‘স্কলারশিপ’ নিয়ে পড়তে যাই ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজে। ১৯৪৩ সালে দেখা দেয় দেশ জোড়া দুর্ভিক্ষ। শতে শতে হাজারে হাজারে নয়– লাখে লাখে দুর্গত মানুষ পথে বেরিয়ে পড়ে। সমাজ সংসার ভেঙে যায়। সেই সময় ‘স্বেচ্ছাসেবক’ হয়ে দুর্গত মানুষদের সেবায় ‘লঙ্গরখানায়’ কাজ করি। দেশের– দেশের মানুষের চেহারাটা সেদিন থেকেই আমার সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আই এ পাস করি ১৯৪৪ সালে। এই সময় আমাদের সংসারে ঘটে বিপদ। বাবা মারা যান। সঙ্গে সঙ্গে আমার পড়াশোনারও ইতি ঘটে। চাকুরী নি’ বেসামরিক সরবরাহ বিভাগে। চাকুরী জীবন কলকাতা, পাবনা, ঢাকা ও অধিকাংশ সময়ই নারায়ণগঞ্জে অতিবাহিত হয়। ১৯৪৯ সাল থেকে পুলিশ বিভাগে আছি।

ছোটবেলা থেকেই কবিতা ও গল্প নিয়ে চলে সাহিত্য সৃষ্টির প্রয়াস। প্রথম মুদ্রিত গল্প ‘অভিশাপ’ প্রকাশিত হয় ১৯৪০ সালে–কবি নজরুল ইসলাম সম্পাদিত ‘নবযুগে’। আমার প্রথম উপন্যাস, সূর্য-দীঘল-বাড়ী’ ১৯৫০-৫১ সালে ‘নও বাহার’ মাসিক পত্রে ধারাবাহিকভাবে বেরোয়। ১৯৫৫ সালে উহা পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়। কাজের ফাঁকে ফাঁকে যা কিছু লিখতে পারি পূর্ব বাঙলার নানা কাগজে মাঝে মাঝে তা পত্রস্থ হয়।

আধুনিক বাঙলা উপন্যাসের প্রগতিশীল ধারার ক্রমবর্ধমান স্রোতোবেগ লক্ষণীয়। ইতিহাসের ধারা এবং সমাজের গতিশীলতার প্রতি এ ধারার ঔপন্যাসিকদের দৃষ্টি সজাগ। বস্তুবাদ এ ধারার কোন কোন ঔপন্যাসিকের নিয়ন্তা। আর একদল আছেন সত্য শুভ ও সুন্দরের প্রতিষ্ঠাই তাদের মূলমন্ত্র।….

border=0সাহিত্য সমাজ-জীবনের ‘আয়না’ই শুধু নয়–‘এক্স-রে’ ফিল্মও বটে, কিন্তু লেখায় তাকে রূপ দিতে হ’লে লেখকের থাকা চাই গভীর অনুভূতি, জীবন-নিষ্ঠা, সত্য-সন্ধানী মন, অনাচ্ছন্ন ও অবাধ দৃষ্টি। বাঙলা সাহিত্যে আজ উপন্যাসের কমতি নেই। কিন্তু ক্রটিহীন সার্থক উপন্যাস খুব বেশী সৃষ্টি হয়নি বলেই আমার ধারণা। সাহিত্যের ধারা সমাজের গতি-প্রকৃতি লক্ষ্য করে চলে। সমাজের স্বাভাবিক গতি যখন ব্যাহত বা বিপথগামী হয় তখন তাকে কল্যাণকর পথে চালিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব সাহিত্যের অনেকখানি। এদিক দিয়ে বাঙলা উপন্যাস একেবারে উদাসীন বলা চলে না। উপন্যাসের ধারা আজ কৈলাস ছেড়ে দুঃখী মানুষের সমতল ভূমিতে নামতে শুরু করেছে–এই যা আশার কথা।”
(লেখকের বানানরীতি অনুসরণ করা হয়েছে।)
Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (9) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন dilruba shahana — এপ্রিল ২৬, ২০১৫ @ ৭:৩১ পূর্বাহ্ন

      এই লেখাটি আবিষ্কারের জন্য রাজু আলাউদ্দিনের ধন্যবাদ প্রাপ্য, সেইসাথে প্রকাশের জন্য বিডিনিউজকেও ধন্যবাদ। ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ বইটি যখন পড়েছিলাম তখন বোঝার বয়স হয়ি ন। শেখ নিয়ামত আলির চলচ্চিত্র ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ বহুল আলোচিত ও পুরষ্কৃত। ‘পথের পাঁচালী’র জন্য যেমন সাহিত্যিক বিভুতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের নাম সমান আবেগে ও মর্যাদায় উচ্চারিত হয় তেমনি ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’র জন্য একই সাথে আবু ইসহাক ও শেখ নিয়ামত আলির নাম উচ্চারিত হয়। লেখকও চলচ্চিত্রের কথাটি উল্লেখ করতে ভোলেননি। ঐ ছবিতে অভিনয়ের জন্য ডলি ইব্রাহিম শ্রেষ্ট অভিনেত্রীর স্বীকৃতি জিতে নেন। ওটাও ডলি ইব্রাহিমের প্রথম চলচ্চিত্রে অভিনয়।
      দিলরুবা শাহানা

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Muhammad Mahfuz — এপ্রিল ২৬, ২০১৫ @ ১২:৩০ অপরাহ্ন

      আবু ইসহাকের যতটুকু পড়েছি, মুগ্ধ হয়েছি। আত্মজীবনীটা গ্রন্থ হিসাবে পেলে খুব ভাল লাগতো।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Syed Kamrul Hasan — এপ্রিল ২৬, ২০১৫ @ ২:৪৪ অপরাহ্ন

      লেখক হিসাবে আবু ইসহাকের বিশিষ্টতা নিয়ে নতুন করে কিছু বলবার নেই । তাঁর কিছু রচনা যে এখনও অগ্রন্থিত থাকতে পারে তাও অস্বাভাবিক নয় । পুরনো ঐতিহ্যের প্রতি আদর/অনুরাগ এবং তা যে সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য তাও নতুন কিছু নয় । তবে চমৎকারিত্ব মনে হচ্ছে রাজু ভাইয়ের দিল্লী যাওয়া-সম্পাদক পরিবারের সাথে যোগাযোগ এবংসর্বোপরি তাদের “ঘুমিয়ে থাকা” পাঠাগারের দুষ্প্রাপ্য সংকলনে আবু ইসহাকের হারানো রচনা আবিষ্কার — এই যোগাযোগের গল্প অকপটে পাঠকের সংগে ভাগ করে নেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Hasan Mahmud — এপ্রিল ২৬, ২০১৫ @ ৬:৩১ অপরাহ্ন

      রাজু ভাই, কবির চোখের দেখা বলেই এটি সম্ভব হয়েছে। বিস্মৃতপ্রায় না হলেও আবু ইসহাক হালে খুব আলোচিত নন। এটি পরিতাপ এবং বেদনার বিষয়। অথচ আমাদের হাতে গোনা কথাশিল্পীদের অন্যতম জন আবু ইসহাক। তাঁর জোক গল্পটি এখনো আমাদের তাড়িয়ে বেড়ায়। আপনি অনুজের দায়িত্ব পালন করছেন। প্রকৃত সম্পাদক একেই বলে। অভিনন্দন জানিয়ে বিব্রত করব না। সম্ভব হলে তাঁর ভিটে বাড়িতে একটি আয়োজন যদি করেন, আমি পাশে থাকব স্বজনের মতো। আপনিতো ওই পলিমাটিরই মানুষ, তাই না?

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল — এপ্রিল ২৬, ২০১৫ @ ৭:৫৮ অপরাহ্ন

      পড়ে মুগ্ধ হলাম।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন গৌতম চৌধুরী — এপ্রিল ২৭, ২০১৫ @ ২:০৪ অপরাহ্ন

      সূর্য-দীঘল বাড়ী, ভালোলাগার স্বপ্নময়তায় জড়িয়ে থাকা এক রচনা। প্রণম্য তার রূপকার, আবু ইসহাক। হারিয়ে যাওয়া পৃষ্ঠা থেকে তাঁর লেখা খুঁজে এনে উপহার দেওয়ার জন্য, রাজু আলাউদ্দিন-কে অভিনন্দন।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Tazmul islam Tazu — অক্টোবর ২২, ২০১৫ @ ৫:২৬ অপরাহ্ন

      অনেক অনেক ধন্যবাদ কবি রাজু ভাইকে

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Tazmul islam Tazu — অক্টোবর ২২, ২০১৫ @ ৫:২৮ অপরাহ্ন

      সূর্য দীঘল বইটি পড়ার জন্য সব সময়ই মুখিয়ে থাকি।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com