স্বাধীনতা সংগ্রামে চিত্রশিল্পীসমাজ

বীরেন সোম | ৩০ মার্চ ২০১৫ ৬:১২ অপরাহ্ন

zainul-abedin.jpg
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে চিত্রশিল্পীসমাজের গৌরবময় ভূমিকা নিয়ে লিখেছেন প্রখ্যাত শিল্পী বীরেন সোম।

আমাদের মুক্তিসংগ্রাম এক দীর্ঘ ধারাবাহিকতার গৌরবময় ঐতিহ্য ধারণ করে ধাপে ধাপে চূড়ান্ত পর্বে উপনীত হয়েছিল। এ দেশের শিল্পীসমাজ এই আন্দোলনের সঙ্গে পূর্বাপর গভীর অঙ্গীকার ও ঐকান্তিক দেশপ্রেমে নিজেদের যুক্ত করেছিলেন। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অব্যবহিত পর এই রাষ্ট্রের গণবিরোধী প্রতারক চরিত্র এ দেশবাসীর কাছে উন্মোচিত হয়ে যায়। মোহাম্মদ আলি জিন্নাহর রাষ্ট্রভাষাসংক্রান্ত বিতর্কিত বক্তব্য খুব সহজেই পাকিস্তানি ভাবাদর্শের প্রকৃত স্বরূপটিকে চিনিয়ে দেয়। উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার স্পর্ধিত ও স্বৈরাচারী ঘোষণা একটি সত্যকে উন্মোচিত করে, আর তা হল, পাকিস্তান বাঙালিদের জন্য আসেনি। পাকিস্তানি রাষ্ট্রশক্তি যে বাঙালি জাতিসত্তার শত্রুপক্ষ, সেই সত্যটি সমাজের অন্যান্য অংশের মতো শিল্পীসমাজও গভীরভাবে উপলব্ধি করে। ধীরে ধীরে সমাজের সর্বস্তরে এই উপলব্ধি গভীরভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত দেশজুড়ে নানা মাত্রায় শাসকশক্তির বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়েছিল। এ আন্দোলনের প্রতিটি ধাপেই শিল্পীরা অংশগ্রহণ করেন। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান বাঙালি জাতিসত্তার জাগরণের এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে আসেন। বিশেষ করে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন এতে অগ্রণী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। একটি বিষয় তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন, বাঙালির জাতিসত্তার প্রকৃত পরিচয় নিহিত রয়েছে তার লোকজ জীবনধারার মধ্যে। সুতরাং বাঙালিকে আত্মপরিচয় যদি খুঁজে পেতে হয়, তাহলে লোকশিল্পকলার মধ্য দিয়েই তার অনুসন্ধান করতে হবে। জয়নুল আবেদিন তাঁর অসাধারণ দূরদৃষ্টি দিয়ে বুঝতে পেরেছিলেন, পাকিস্তানবাদের বিরুদ্ধে আমাদের মূল লড়াইয়ের রসদ নিহিত আছে লোকজ জীবনধারায়। সেখান থেকেই তিনি চিত্রকরদের শক্তি আহরণ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। দেশভাগের আগে তেতালি­শের দুর্ভিক্ষের চিত্রমালা অঙ্কনের উজ্জ্বল উত্তরাধিকারকে বহন করে তিনি এ দেশের চিত্রকলার আন্দোলনে নতুন রণকৌশল গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে সেদিন এক ঝাঁক শিল্পী বেরিয়ে এসেছিলেন। তাঁদের কাছে চিত্রাঙ্কন শুধু শিল্পচর্চা ছিল না; বরং তাঁরা তাঁদের কাজকে দেশমুক্তির ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। জয়নুল আবেদিন চিত্রকলার আন্দোলন আর জাতিসত্তার আন্দোলনকে একই সূত্রে গেঁথে দিয়েছিলেন। তারই চূড়ান্ত রূপ আমরা দেখতে পাই একাত্তরে অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে চারুশিল্পী সংসদ আয়োজিত স্বা ধী ন তা–এই চারটি অক্ষরকে বুকে নিয়ে শিল্পীদের মিছিলের মধ্যে। ‘স্বাধীনতা’ শব্দটির চারটি অক্ষর সেদিন কী অসাধারণ উজ্জ্বলতায় বাংলাদেশের মুক্তির আকাক্সক্ষাকে মূর্ত করে তুলেছিল! ঢাকার রাজপথে সেদিন চার অক্ষরের এই প্রদর্শনী এক যুগান্তকারী ঘোষণা এনে হাজির করেছিল। এই মিছিলের ধারণা দিয়েছিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন। শুধু তাই নয়, সেই মিছিলে নেতৃত্বদানের অসমসাহসী দায়িত্বও পালন করেছিলেন তিনি।
kamrul-h02.jpg
পাকিস্তান-উত্তর সময়ে আমাদের শিল্পীসমাজ বহু দুস্তর পথ পাড়ি দিয়ে একাত্তরের লড়াইয়ে নিজেদের সম্পৃক্ত করেছিলেন। বস্তুত, চিত্রকলার ব্যাপারটাই ছিল পাকিস্তানি মতাদর্শের বিরুদ্ধে একটি সদাজাগ্রত চেতনা। সে জন্যই পাকিস্তানি চিন্তাধারার ধারকবাহকেরা সর্বদাই এর বিরোধিতা করেছে। এ দেশে চারুকলা কলেজ প্রতিষ্ঠায়ও তারা নানাভাবে বাধা দিয়েছে। কিন্তু শেষাবধি তারা জয়ী হতে পারেনি। নানা বাধা বিপত্তিকে এড়িয়ে অবশেষে চারুকলা কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং বাঙালির জাতিসত্তা প্রতিষ্ঠা ও আত্মপরিচয় লাভের সংগ্রামে প্রতিষ্ঠানটি অসাধারণ ভূমিকা পালন করেছে। প্রতিবছর দলে দলে এই কলেজ থেকে শিল্পীরা বেরিয়ে এসেছেন, আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে যে নানাবিধ তৎপরতা চলছিল, তাঁরা তাতে এসে যোগ দিয়েছেন এবং ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সাংস্কৃতিক সংগ্রামের প্রতিটি প্রবাহে নতুন স্রোত যুক্ত করে চিত্রশিল্পীরা তাকে আরও বেগবান করে তুলেছেন।

ফেব্রুয়ারি ৫২ থেকে মার্চ ৭১
আমরা একটু ইতিহাসে ফিরে যাই। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ছিল আর্ট কলেজের বার্ষিক প্রদর্শনী উদ্বোধনীর দিন। ছাত্র ও শিক্ষকরা সেদিন প্রদর্শনী বন্ধ করে ১৪৪ ধারা অমান্য করে মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন। এঁদের মধ্যে ছিলেন ইমদাদ হোসেন, মুর্তজা বশীর, আমিনুল ইসলাম, কাইয়ুম চৌধুরী, রশিদ চৌধুরী প্রমুখ। একুশের পোস্টার, ফেস্টুন এঁকে আন্দোলনকে তাঁরা আরও জোরদার করে তুলেছিলেন। পরবর্তীকালে একুশে ফেব্রুয়ারি আর শুধু ভাষা প্রশ্নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা বাঙালির আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির সমস্ত আন্দোলন ও সংগ্রামের উৎসমুখ হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। আটষট্টি-উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে বাঙালি সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ ঘটে। সমাজের অগ্রসর ও সংবেদনশীল অংশ হিসেবে আর্ট কলেজের ছাত্ররা ও শিল্পীসমাজ এই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। আটষট্টির ২১ ফেব্রুয়ারিতে তাঁরা রাজপথসহ বিভিন্ন স্থানে আলপনা আঁকার রীতি প্রবর্তন করেন। শহিদ মিনার থেকে আজিমপুর গোরস্তান পর্যন্ত পুরো রাস্তায় বাঙালি সংস্কৃতির নিদর্শনস্বরূপ অঙ্কিত আলপনা বাঙালির চেতনায় ভিন্ন একটি মাত্রা যুক্ত করে দিয়েছিল। শিল্পীদের একটি শক্তিশালী সাংগঠনিক দল তদানীন্তন ডাকসু নেতৃবৃন্দের সহযোগিতায় এই প্রদর্শনী ও আলপনা আঁকার কাজ সংগঠিত করেছিল। ইমদাদ হোসেন ছিলেন সব আন্দোলনের পুরোভাগে থাকা এক সাহসী শিল্পী। তিনি আমাদের আন্দোলনের নানা পর্যায়ে যথোচিত দিক নিদের্শনা দিয়ে সহযোগিতা করতেন। ৬৪-৬৫ সালে আমি ছিলাম আর্ট কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র। ওই সময় থেকেই আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সংগ্রাম ও আন্দোলনের সঙ্গে একাত্ম ছিলাম।
abdur-razzaq.jpg
ষাটের দশকের মধ্যভাগে দেশে যখন পাকিস্তানি স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ছাত্রজনতার সংগ্রাম চলছে সে সময় শিল্পীসমাজ এবং প্রগতিশীল ছাত্র ও সংস্কৃতিকর্মীদের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে। ১৯৬৬ সালে তদানীন্তন পূর্বপাকিস্তান জুড়ে স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। বাঙালির জাতিসত্তা তখন ধীরে ধীরে বিকশিত হচ্ছে। শেখ মুজিবুর রহমান ক্রমশ ‘বঙ্গবন্ধু’ হিসেবে আবিভর্‚ত হয়েছেন। বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের নেতা ও প্রবক্তা হিসেবে তিনি একক স্থান অধিকার করে নিয়েছেন এবং ছয়দফা কর্মসূচি প্রণয়ন করে আন্দোলনকে সুসংগঠিত রূপ দেওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন। এ পর্যায়ে আওয়ামী লীগের প্রচার বিভাগের কর্মকর্তা নূরুল ইসলাম একদিন শিল্পী হাশেম খানের কাছে আসেন। তিনি ছয়দফার ঘোষণাপত্রের একটি নকশা করে দেওয়ার জন্য শিল্পীকে অনুরোধ জানান। হাশেম খান ছয়রঙের সমন্বয়ে ছয়দফার একটি ডিজাইন তৈরি করে দেন। ‘ছয়দফা’ কথাটির লেটারিংও তিনিই করে দেন। হাশেম খান নূরুল ইসলামকে বলেন, ছয় দফার আরও একটি মর্মার্থ আছে। আমাদের দেশে ঋতুর সংখ্যা ছয়। ঋতুগুলো আমাদের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। ছয়দফাও ঠিক তেমনি করেই বাঙালির আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অস্তিত্বের প্রতীক হিসেবে গৃহীত হবে। ঘোষণাপত্রের নকশাটি বঙ্গবন্ধুর কাছে নিয়ে যাওয়া হলে তিনি ডিজাইনটি দেখে খুশি হলেন। নূরুল ইসলাম ছয়দফার বিষয়টি বঙ্গবন্ধুর কাছে ব্যাখ্যা করেছিলেন। ওই সময় সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দীন আহমদসহ জ্যেষ্ঠ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাঁদের বললেন, ছয়দফা ঘোষণার জন্য যে মঞ্চ তৈরি করা হবে, ঘোষণাপত্রের ডিজাইন অনুসারে সেই মঞ্চের ডিজাইন তৈরি করতে হবে। হাশেম খান মঞ্চের ডিজাইন সম্পন্ন করে আমাকে ডাকলেন। একটি লেআউট দিয়ে বললেন, ‘মঞ্চ তৈরি করবার কাজটি তোমাকে করতে হবে।’
shahabuddin.jpg
আমি, আবুল বারক্ আলভী ও মঞ্জুরুল হাই– এই তিনজন মিলে শিল্পী হাশেম খানের লেআউট অনুযায়ী ৬ দফার মঞ্চ বানাবার কাজ সম্পন্ন করি। ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমান সেই মঞ্চে দাঁড়িয়ে পূর্বপাকিস্তানের জনগণের বাঁচার দাবি হিসেবে ছয়দফা কর্মসূচিকে ব্যাখ্যা করেন। পরবর্তী সময়ে এই কর্মসূচি বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ হিসেবে অভিহিত হয়েছিল।
আমরা ছাত্রসংগঠনগুলোর নেতৃত্বে তৎকালীন পাকিস্তানি একনায়ক আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকলাম। উনসত্তরের ২১ ফেব্রুয়ারি চিত্রশিল্পীরা শুধু আলপনা অঙ্কনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং তাঁরা চিত্রকলাকে সাধারণ মানুষের সামনে নিয়ে এসেছিলেন। সেবারই প্রথম শহিদ মিনার চত্বরে বিশাল আকারের ক্যানভাসে ছবি এঁকে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। দশ-বার ফুট আকারের ক্যানভাসজুড়ে ছিল সাধারণ মানুষের বঞ্চনার চিত্র–স্বৈরাচারী শাসকের নিপীড়ন ও গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের কথা, শোষণ ও বঞ্চনার কথা, অসা¤প্রদায়িক বোধ ও মানবিক অধিকারের কথা। ছবি এঁকেছিলেন জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান, রশিদ চৌধুরী, আমিনুল ইসলাম, মুস্তাফা মনোয়ার, হাশেম খান, রফিকুন নবী এবং আরও অনেকে।
abdul-mannan.jpg
শহীদ মিনারে এই চিত্রপ্রদর্শনীর মাধ্যমে আমাদের শিল্পীরা জনসাধারণের কাছে পাকিস্তানি শাসকদের অত্যাচারের চিত্র তুলে ধরেছিলেন। এছাড়া ১৯৬৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত শিল্পীরা বিভিন্ন বার্তা বহনকারী ব্যানারের প্রদর্শনী করে এসেছেন। ১৯৬৮ সালে বার্তা বহনকারী ব্যানারের সিরিজ এবং ১৯৬৯ সালের শহিদ মিনারে স্বরবর্ণের ব্যানার প্রদর্শনীর মাধ্যমে আন্দোলনে নবতর শক্তি সঞ্চারিত হয়েছিল। এভাবে পুরো ষাটের দশকজুড়েই বাঙালির আত্মপ্রতিষ্ঠার আন্দোলন এক বিরাট বাঁক নিয়েছিল।

শিল্পীদের আন্দোলনে যাঁরা সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন ইমদাদ হোসেন, হাশেম খান, গোলাম সারোয়ার, আনোয়ার হোসেন, হাসান আহমেদ, প্রফুল্ল রায়, নাসির বিশ্বাস, শাহাদাত চৌধুরী, মঞ্জুরুল হাই, সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ, আবুল বারক্ আলভী, বিজয় সেন, রেজাউল করিম, এসএম খালেদ, মাহতাব, মতলুব আলী, লুৎফুল হক এবং আরও অসংখ্য ছাত্রছাত্রী। আমি নিজে এই শিল্পীদেরই অন্তর্ভুক্ত ছিলাম। শাহাদাত চৌধুরী আন্দোলনের পরিকল্পনা ও পরামর্শ দানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

ষাটের দশকের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতাযুদ্ধ পর্যন্ত শিল্পীরা তাঁদের নানা চিত্রকর্মে প্রতিবাদের শক্তি এবং জাগরণের প্রেরণা সঞ্চারিত করে দেন। শিল্পী কামরুল হাসান বিক্ষুব্ধ শিল্পীসমাজ-এর ব্যানারে উনসত্তর সালে বাংলা একাডেমিতে বক্তব্য প্রদান করেন। এই বছরেরই ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলা একাডেমির বটমূলে তিনি অক্ষরবৃত্তের প্রথম উদ্বোধন করেন।
qayyum-chowdhury.jpg
ঢাকার পাশাপাশি চট্টগ্রামের শিল্পীরা প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে পোস্টার, ব্যানার, ম্যুরাল ইত্যাদি অঙ্কন করেন এবং এ দেশের মুক্তি আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ‘অতি সা¤প্রতিক আমরা’ মহান শহিদ দিবস উপলক্ষে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ‘আবহমান বাঙলা, বাঙালি’ শীর্ষক ম্যুরাল প্রদর্শনীর আয়োজন করে। বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসভিত্তিক এই ম্যুরালটি নিঃসন্দেহে একটি মহৎ শিল্পকর্ম। এটি অঙ্কন করেন সবিহ্-উল-আলম, চন্দ্রশেখর দে, আবুল মনসুর, মোহাম্মদ শওকত হায়দার, তাজুল ইসলাম, এনায়েত হোসেন এবং শফিকুল ইসলাম।

যাঁরা উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা জোগাতেন তাঁরা হলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান, রশিদ চৌধুরী, মুর্তজা বশীর, দেবদাস চক্রবর্তী, নিতুন কুণ্ডু, ছড়াকার এখ্লাসউদ্দিন আহ্মদ, মতিউর রহমান (বর্তমানে প্রথম আলো সম্পাদক), আবুল হাসনাত (সম্পাদক–কালি ও কলম), মফিদুল হক (বর্তমানে ট্রাস্টি–মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, লেখক ও সংস্কৃতিকর্মী) এবং মাহফুজ আনাম (সম্পাদক–ডেইলি স্টার)। তাঁরা আমাদের জাতিসত্তাগত আত্মপরিচয়ের মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করতেন, আগামী দিনের বৃহত্তর লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হতে বলতেন।
rafiqun-nabi.jpg
প্রতিবছর ২১ ফেব্রুয়ারির দুইদিন আগে থেকে সারা রাত জেগে এই ব্যানারগুলো আঁকা হত, আঁকতেন মুস্তাফা মনোয়ার, রফিকুন নবী, হাশেম খানসহ আরও অনেকে। আমরা সহযোগিতা করতাম। ব্যানারের প্রায় সব হাতের লেখাই ছিল আমার। পরবর্তী বছরগুলোতে এ কাজে মাহাতাব ও লুৎফর ভাই এবং জি এম এ রাজ্জাক সহযোগিতা করতেন। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন এবং রশিদ চৌধুরী বাসায় বসে দুটো ব্যানার এঁকে দিয়েছিলেন। উনসত্তরে আমি ছিলাম ঢাকা আর্ট কলেজের শেষবর্ষের ছাত্র। রেজাউল করিম ছিলেন তৎকালীন ছাত্র সংসদের সভাপতি, সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ ছিলেন সাধারণ সম্পাদক। ডাকসুর সভাপতি ছিলেন সেকালের স্বনামখ্যাত ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ। ১১ দফা আন্দোলনের সঙ্গে আর্ট কলেজের ছাত্ররাও ওতপ্রোতভাবে যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন। এ আন্দোলনে চারুশিল্পীদের ভূমিকা কী হবে তা নিয়ে প্রথম মিটিং হয় তৎকালীন ইকবাল হলে (বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল)। এ মিটিংয়ে তোফায়েল আহমেদ, সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক, শাহজাহান সিরাজ, মঞ্জুরুল হাই, সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ, রেজাউল করিম এবং আমিসহ আরও অনেকে অংশ নিই। মিটিংয়ে চারুশিল্পীদের করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা হয় এবং ১১ দফায় চারুশিল্পীদের কিছু দাবিও সংযোজন করা হয়। সিদ্ধান্ত হয়, আন্দোলনের জন্য আমরা পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুন তৈরি করব। আমাদের সঙ্গে এ বিষয়ে সর্বদা যোগাযোগ রক্ষা করতেন এ সময়ের বিখ্যাত নাট্য ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব (সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী) আসাদুজ্জামান নূর। নূরভাই তখন ডাকসুর সাংস্কৃতিক সম্পাদক ছিলেন। আমরা প্রতিদিন আর্ট কলেজের হোস্টেলে রাত জেগে পোস্টার লিখতাম। আমাদের দায়িত্ব ছিল প্রতিদিন কমপক্ষে এক রিম কাগজে পোস্টার লেখা। অর্থাৎ সর্বনিম্ন পাঁচশ পোস্টার। এ কাজে আমি, শহীদ কবির, মঞ্জুরুল হাই, সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ, রেজাউল করিম, বিজয় সেন, স্বপন চৌধুরী, অলক রায়, হাসি চক্রবর্তী, ওয়াদুদ, মোফাজ্জল, মনসুরুল করিম, সিরাজ, আনসার আলী, নাসির বিশ্বাসসহ আর্ট কলেজের অনেক ছাত্র বিনিদ্র রাত্রি কাটিয়েছি। এছাড়াও শিল্পী রশিদ চৌধুরীর নেতৃত্বে চট্টগ্রামে সভাসমাবেশ ও প্রতিবাদী বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। তাঁরা তাঁদের বেশ কিছু চিত্রকর্মে পাকিস্তানি শাসকদের অত্যাচারের নানা চিত্র তুলে ধরেন। চিত্রকর্মগুলো ওই সময় বেশ আলোড়ন তুলেছিল। পরবর্তীকালে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ছবিগুলো দিয়ে ভিউকার্ড প্রকাশ করে।

বস্তুত গত শতকের ষাটের দশকের শেষভাগে ঢাকা আর্ট কলেজের হোস্টেল বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল। আমরা চিত্রশিল্পীরা হোস্টেলে রাত জেগে হাজার হাজার পোস্টার, কার্টুন, ব্যানার অঙ্কনের কাজ করতাম। দেশব্যাপী উত্তাল আন্দোলন তখন গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হয়েছে। স্বাধীনতা–এই চারটি অক্ষরের প­্যাকার্ড নিয়ে আর্ট কলেজের ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকবৃন্দ মিছিল বের করেছিলেন। ছাত্রছাত্রীরা উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের উপর রচিত ছড়ার বই ‘ঊনসত্তরের ছড়া’ প্রকাশ করে। বইটির প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন নিতুন কুণ্ডু ও বিনোদ মণ্ডল। কার্টুন এঁকেছিলেন রফিকুন নবী। সম্পাদনা ও পরিকল্পনায় ছিলেন শাহাদাত চৌধুরী ও রফিকুন নবী। সহযোগিতায় ছিলেন মঞ্জুরুল হাই, আবুল বারক্ আলভী, শিলাব্রত চৌধুরী ও মোহাম্মদ আকতার। সহযোগী হিসেবে আমিও কাজ করেছিলাম।

১৯৬৯ সালের ১৭ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সমাবেশ কর্মসূচি ছিল। এগারদফা প্রণয়নের পর এটাই ছিল প্রথম প্রত্যক্ষ কর্মসূচি। পুলিশের বর্বরতা ও গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে ২০ জানুয়ারি সোমবার বটতলায় পুনরায় সমাবেশের কর্মসূচি দেওয়া হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন তোফায়েল আহমেদ। সেদিন একটি জিনিস আমি অবাক হয়ে লক্ষ করেছিলাম, শুধু ছাত্র নয়, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষও বটতলার সমাবেশে এসে ভিড় করেছে। সভাপতির ভাষণ যখন চলছিল তখনও মানুষ আসছিল দলে দলে। গুঞ্জন শোনা গেল মিল-কারখানা, অফিস-আদালত থেকেও লোক আসছে। সভাপতির ভাষণে তোফায়েল আহমেদ ১৪৪ ধারা ভাঙার ঘোষণা করলেন। লক্ষ লক্ষ মানুষ নেমে এল রাজপথে। মিছিলের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত দেখা যাচ্ছে না, ছাত্রজনতা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে এগিয়ে চলল। সেদিনের ওই মিছিলে সকলের সঙ্গে আমিও যোগ দিয়েছিলাম। তখন ছিল গণঅভ্যুত্থানের মাহেন্দ্রক্ষণ। ২০ জানুয়ারি পুলিশের গুলিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা আসাদ শাহাদতবরণ করেন। ২৪ জানুয়ারি শহিদ হয় নবকুমার ইনস্টিটিউটের নবম শ্রেণির ছাত্র মতিউর। ঢাকা শহর তখন ফুঁসে ওঠা আগ্নেয়গিরি। মিটিং, মিছিল, ব্যানার, পোস্টার–এই তখন হয়ে দাঁড়িয়েছে মানুষের একমাত্র ভাষা। তার সঙ্গে এসে মিলেছে প্রাণদানের প্রতিজ্ঞা। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল দেশজুড়ে। উনসত্তরের ২৫ মার্চ প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের পতন হল। সামরিক আইন জারি করে ক্ষমতায় এলেন ইয়াহিয়া খান।
hamiduzzaman.jpg
এরই মধ্যে ঘটে যায় সত্তরের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়, অনুষ্ঠিত হয় নির্বাচন। নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু ক্ষমতা হস্তান্তরে শুরু হয় নানা টালবাহানা। দেশ আবার আন্দোলনমুখর হয়ে ওঠে।

আসে ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ। বঙ্গবন্ধু তাঁর বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ অতঃপর আসে ভয়ঙ্কর ২৫শে মার্চ। সেই রাতের হত্যাযজ্ঞ আমাদের ঠেলে দেয় মুক্তিযুদ্ধের দিকে।
chandra-shekhor.jpg
২৫ মার্চ কালরাত্রি
আর্ট কলেজের হোস্টেলের পাশেই ছিল ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের (ইপিআর) সদর দপ্তর। সেখান থেকে গোয়েন্দারা কলেজের হোস্টেলে আসা-যাওয়া করতেন। তারা কলেজের পিয়নদের কাছে জানতে চাইতেন, পোস্টারগুলো কে বা কারা লেখে?

সে সময় হোস্টেলের সুপার ছিলেন সমরজিৎ রায়চৌধুরী। ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় ৪১ নয়াপল্টনে সাপ্তাহিক এক্সপ্রেস পত্রিকার অফিসে বসে কাজ করছিলেন শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী। সন্ধ্যার পর কাইয়ুম চৌধুরীর বাড়ি থেকে এক্সপ্রেস অফিসে টেলিফোন আসছিল ঘনঘন। পত্রিকার সম্পাদক কাইয়ুম চৌধুরীকে বললেন, ‘ভাবি বারবার টেলিফোন করছেন, আপনি বাড়ি ফিরে যান।’
কাইয়ুম চৌধুরী অফিস থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নেমে হেঁটে এগোতে লাগলেন। রাস্তাঘাটে স্বল্প আলো। শান্তিনগর মোড়ে গলির ধারে এসে আবছা আলো-আঁধারিতে দেখলেন ছেলেরা রাস্তায় ব্যারিকেড তৈরি করছে। হঠাৎ কাইয়ুম চৌধুরীকে লক্ষ করে একজন বলে উঠলেন, ‘তুমি এখানে কী করছ? এই মুহূর্তে বাসায় চলে যাও। শহরের অবস্থা খারাপ।’

কাইয়ুম চৌধুরী বিস্মিত হয়ে মুখ ফিরিয়ে দেখলেন, আর কেউ নন, উচ্চকণ্ঠে কথা বলছেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন। ১২ নম্বর শান্তিনগর ছিল জয়নুল আবেদিনের বাসা। পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণের আশঙ্কার মুখে তিনিও ছেলেদের সঙ্গে সেই সন্ধ্যায় ব্যারিকেড তৈরি করছিলেন। কাইয়ুম চৌধুরী আর দেরি না করে একটি স্কুটার নিয়ে বাসার দিকে রওনা হলেন। শুধু শিল্পাচার্য আবেদিন নন, শিল্পী কামরুল হাসানকেও আমরা সেই রাতে রাজপথে ব্যারিকেড তৈরি করার কাজে অবতীর্ণ হতে দেখেছিলাম। কামরুল হাসান হাতিরপুল এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। তিনিও ওই এলাকার স্থানীয় তরুণদের সঙ্গে মিলে হানাদার বাহিনীকে প্রতিহত করার কাজে নেমে পড়েছিলেন।

হোস্টেলের দোতলায় ৭ নম্বর রুমে শিল্পী কিবরিয়া স্যার থাকতেন। দরজা বন্ধ করে লুকিয়ে ছিলেন তিনি। হানাদাররা দরজায় লাথি মারতে থাকে। নিরুপায় হয়ে দরজা খোলেন কিবরিয়া স্যার। সঙ্গে সঙ্গে উদ্যত স্টেনগান হাতে কয়েকজন সৈনিক ঢুকে পড়ে। ঘর তছনছ করার আগেই একজন মেজর কামরায় ঢুকে দেখলেন, চারদিকে আঁকা ছবি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। তখন তিনি তার সৈনিকদের ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে বললেন। তিনি কিবরিয়া স্যারকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপ ফনকার হ্যায়?’
abul-bark-alvi.jpg
কিবরিয়া ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বললেন।

মেজর সাহেব বললেন, ‘শেখ মুজিবকো তসবির বানায়া?’

কিবরিয়া বললেন, ‘নেহি, ম্যায় পোর্ট্রটে নেহি বানাতা।’

মেজর সাহেব ছবিগুলো উল্টেপাল্টে দেখলেন। যাবার সময় বললেন, ‘ডরো মাৎ। জো ভি আয়েগা দরওয়াজা মাৎ খোলনা।’

এ কথা বলেই চলে গেলেন মেজর সাহেব। বাইরে দুজন সেনা রয়ে গেল পাহারায়। অজানা আতঙ্ক, ত্রাস আর সর্বোপরি মৃত্যুভয় নিয়ে কিবরিয়া স্যার দুঃসহ রাত পার করলেন। পরদিন ২৭শে মার্চ ভোরবেলা কারফিউ তুলে নিলে তিনি সোজা শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীর বাসায় গিয়ে উঠলেন। কাইয়ুম চৌধুরী দরজা খুলেই দেখেন দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন কিবরিয়া স্যার। তাঁর মুখ মৃত মানুষের মতো সাদা। কাইয়ুম চৌধুরী তাঁকে তড়িঘড়ি করে ঘরে নিয়ে বসালেন। এভাবেই সেই ভয়ঙ্কর কালরাতে কিবরিয়া স্যার চরম বিপদ থেকে রেহাই পান।
হোস্টেলের ৯ নম্বর রুমে থাকতেন শাহনেওয়াজ আর নজরুল। এছাড়া ওই কক্ষে শেখ করিম-উল-আলম নামে একজন বহিরাগত ছিলেন। এঁদের সবাইকে লাইন ধরে দাঁড় করিয়ে গুলি করা হয়। সামনে ছিলেন শাহনেওয়াজ, নজরুল। গুলিবিদ্ধ হয়ে শাহনেওয়াজ ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করেন। নজরুলের বুকের পাঁজর ভেদ করে গুলি বেরিয়ে যায়। শেখ করিম-উল-আলম-এর পায়ে গুলি লাগে। আহতরা মড়ার মতো পড়ে থাকে। সকলেরই প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়। মৃত্যুর পূর্বে শাহনেওয়াজ ‘পানি পানি’ বলে মৃদুকণ্ঠে আকুতি জানাচ্ছিলেন। করিম-উল-আলম পাশে পড়ে থাকা গ্লাস থেকে দুই ফোঁটা পানি তাঁর মুখে দেন। একটু পরেই শাহনেওয়াজ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। আর্মি চলে গেলে আলমসাহেব উঠে বস্তির পেছন দিয়ে ঢাকা কলেজের দিকে চলে যান। নজরুল পড়ে থাকেন। তাঁর শরীর থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়। জব্বার নামে এক ছাত্র হোস্টেলের ডাইনিং হলে গিয়ে লুকিয়ে ছিলেন। আর্মি চলে গেলে তিনি এসে নজরুলকে ধরে বস্তির পেছন দিয়ে ঢাকা কলেজের হোস্টেলে নিয়ে যান। পরে নজরুলকে মেডিকেলে নিয়ে যাওয়া হয়। নজরুল দীর্ঘ চিকিৎসার পর বেঁচে যান। স্বাধীনতার পর কলেজের লেখাপড়া শেষ করে তিনি ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’য় কার্টুনিস্ট হিসেবে যোগদান করেন। ২৮ মার্চ সকালে লুৎফুল হক ৯ নম্বর রুমে গিয়ে দেখেন শাহনেওয়াজের লাশ তখনও ওখানে পড়ে আছে। সিরাজউদ্দিন গিয়েও দেখেন সেই একই মর্মান্তিক দৃশ্য। তারা দুজনই হতচকিত হয়ে হোস্টেল ত্যাগ করেন। শাহনেওয়াজের লাশের পরে কী পরিণাম হয়েছিল তা অজানাই থেকে গেছে। দেশের জন্য তাঁর এই আত্মদানকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য হোস্টেলটির নামকরণ করা হয় শহিদ শাহনেওয়াজ ছাত্রাবাস। এভাবেই বহু সংগ্রাম ও আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত আর্ট কলেজের হোস্টেলটি এক শহিদের আত্মদানের চিহ্ন বুকে ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে।
alakesh-ghosh.jpg
মুক্তিযুদ্ধ পর্ব
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরোচিত অপারেশন শুরু হওয়ার সময় আমি ছিলাম জামালপুরে। পরে নানা ঘটনা-দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে আমি সীমান্ত পাড়ি দিয়ে কলকাতা গিয়ে পৌঁছি। শিল্পী কামরুল হাসানের সঙ্গে সাক্ষাতের পর আমি তাঁর পরামর্শ মোতাবেক প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের ডিজাইনার হিসেবে যোগ দিই। সহকর্মীদের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করে দিনগুলো কাটতে থাকে। এরই মধ্যে একদিন খবর এল নাসির বিশ্বাসের মা এবং ভাইয়েরা সীমান্ত পার হয়ে নদীয়ার শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন। নাসিরভাই কামরুল ভাইয়ের কাছে পাঁচদিনের ছুটি নিয়ে তাদেরকে দেখতে গেলেন। পরদিন সকালে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা শরণার্থী শিবিরে এসে নাসিরভাইকে বললেন, ‘আমরা জানতে পেরেছি আপনি একজন শিল্পী এবং প্রবাসী সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ে কাজ করছেন। আমরা আপনার কাছে এসেছি খুব জরুরি একটা প্রয়োজনে। কাথুলি সীমান্তে— পাকিস্তানি সেনাদের একটা ক্যাম্প রয়েছে। আপনাকে ওই ক্যাম্পের একটা নকশা এঁকে দিতে হবে।’

নাসিরভাই বললেন, ‘কেন? নকশা এঁকে কী হবে?’

মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার বললেন, ‘আমরা ওই ক্যাম্প আক্রমণ করব। তার আগে ওখানকার খুঁটিনাটিসহ একটি ছবি আমাদের থাকা দরকার। আপনি সেই কাজটা করে দেবেন।’

মা আর ভাইদের কিছু না জানিয়ে নাসিরভাই মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশের মুক্ত এলাকায় প্রবেশ করলেন। কিছুটা পথ এগিয়ে গেলেই নাসিরভাইদের কুতুবপুর গ্রাম। গাঁয়ের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে খরস্রোতা নদী। পাকিস্তানি সেনারা নদী পার হয়ে কুতুবপুরে আসতে সাহস পেত না। নদীর ওপারে ঘাঁটি গেড়ে অবস্থান নিয়েছিল ওরা। নদীর এপারে কাঁঠালবাগান। মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের কথামতো একটি বাইনোকুলার, খাতা আর পেন্সিল নিয়ে নাসিরভাই একটি বড় কাঁঠালগাছে উঠে বসলেন। বাইনোকুলারে চোখ লাগিয়ে তিনি সবকিছু স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলেন। নদীর ওপারে তীর ঘেঁষে প্রায় বিশটি বাঙ্কার। কোনোটা ছোট, কোনোটা অনেক লম্বা। পাকিস্তানি সেনারা টহল দিচ্ছে। নাসিরভাই সঙ্গোপনে যথাসম্ভব নিখুঁতভাবে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ক্যাম্পের নকশা এঁকে নিলেন। কাজটি করতে তার ঘণ্টা দুয়েক সময় লেগেছিল। গাছ থেকে নেমে এসে নকশাটি কমান্ডারের হাতে দিয়ে তিনি নদীয়া চলে গেলেন। পরদিন চলে এলেন কলকাতা। কয়েকদিন পর নাসিরভাই অবাক হয়ে স্বাধীন বাংলা বেতারের খবরে শুনতে পেলেন: ‘কাথুলি সীমান্তে— প্রবল যুদ্ধ। প্রায় দেড়শ পাকিস্তানি সেনা নিহত। পাঁচ ঘণ্টা যুদ্ধের পর কাথুলি মুক্ত। কাথুলি ক্যাম্প এখন মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে। সেখানে এখন বাংলাদেশের পতাকা উড়ছে।’ সংবাদ শুনে নাসিরভাইয়ের বুকটা গর্বে ভরে গিয়েছিল। সেদিন অফিসে এসেই নাসিরভাই আগের রাতে শোনা স্বাধীন বাংলা বেতারের খবরটি গর্বভরে বলতে লাগলেন। একটি জাতির মুক্তিযুদ্ধে একজন শিল্পীর ভূমিকা যে কতটা সুদূরপ্রসারী হতে পারে, এই ঘটনাটি তারই সমুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে আমাদের আলোড়িত করেছিল।
debdas-chakravarti.jpg
১৯৭১ সালে মার্চ মাসের শুরুতে দেশে যখন অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তখন খুব স্বাভাবিকভাবে বিদেশের বিভিন্ন স্থানে বসবাসরত বাঙালিদের মধ্যে তীব্র রোষ ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় সরকারি কর্মকর্তা শিল্পী এ কে এম আবদুর রউফ লন্ডনে অবস্থান করছিলেন। ১৯৭০ সালে পাকিস্তান সরকারের কমনওয়েলথ স্কলারশিপ পেয়ে লন্ডন কলেজ অব প্রিন্টিংয়ে ডিজাইন, প্রিন্টিং ও প্রোডাকশন বিষয়ে কোর্স সম্পন্ন করার জন্য তিনি লন্ডনে গিয়েছিলেন। তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয়ের চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা শাখার উপপরিচালক ছিলেন তিনি। ২৮ মার্চ আওয়ামী লীগের উদ্যোগ লন্ডনের ট্রাফালগার স্কয়ারে কয়েক হাজার বাঙালির এক প্রতিবাদসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার পোস্টার, ব্যানার এবং বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত ব্যাজ তৈরির দায়িত্বও তিনি পালন করেছিলেন। এই সভায় আবদুর রউফের তৈরি করা স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়েছিল। এ সময় প্রবাসীদের আন্দোলনের প্রতিটি পর্বেই তিনি অংশ নিয়েছিলেন। ৪ঠা এপ্রিল হাইড পার্কে অনুষ্ঠিত জনসমাবেশের পোস্টার, ব্যানার অঙ্কনের দায়িত্বও তিনিই পালন করেছিলেন। জুলাই মাসে ব্রিটিশ কাউন্সিল থেকে তাঁকে পাকিস্তানে ফিরে যাবার জন্য চিঠি দেওয়া হয়। ইতিমধ্যে তাঁর বৃত্তির মেয়াদও শেষ হয়। তাঁকে দেশে ফেরার জন্য বারবার তাগিদ দেওয়া হতে থাকে। এ অবস্থায় তিনি পক্ষত্যাগ করে ব্রিটেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি লেখেন এবং রাজনৈতিক আশ্রয় চান। তাঁর আবেদন মঞ্জুর হয়। এই সংবাদটি সেই সময়কার ইউরোপীয় সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার লাভ করে। ২৭শে আগস্ট লন্ডনে বাংলাদেশ মিশনের উদ্বোধন হয়। শিল্পী এ কে এম আবদুর রউফ এই মিশনে সেকেন্ড সেক্রেটারি পদে যোগদান করেছিলেন। এভাবেই সুদূর লন্ডনেও আমাদের শিল্পীরা স্বাধীনতার সংগ্রামে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

বস্তুত, আমাদের শিল্পীসমাজ এ দেশের সকল আন্দোলন-সংগ্রামে এবং সর্বশেষে মুক্তিযুদ্ধে নানাভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধে তাঁদের রং আর তুলি মারণাস্ত্রের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল। অন্যদিকে যুদ্ধসংকুল সেই মুহূর্তে রং-তুলি-পেনসিল ফেলে কয়েকজন শিল্পী রাইফেল হাতে তুলে নিয়েছিলেন। এঁদের মধ্যে শিল্পী শাহাবুদ্দিনের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। একাত্তরের এপ্রিলে সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফের অধীনে দুই নম্বর সেক্টরে তিনি গেরিলা যুদ্ধের ট্রেনিং নিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন ক্রাক প্লাটুনের সদস্য। শালনা নদীতীরবর্তী কসবাতে অনেকগুলো যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেন। পরে ঢাকায় এসে গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে বেশকিছু অপারেশনে অংশ নেন। যুদ্ধে তাঁর একটি অসাধারণ কৃতিত্বের কথা স্মরণীয়। ষোলই ডিসেম্বর সকাল সাড়ে এগারটায় শিল্পী শাহাবুদ্দিন শাহবাগ রেডিও ভবনে ঢুকে পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। আরও যেসব শিল্পী একাত্তরে সশস্ত্র সৈনিক হিসেবে যুদ্ধ করেছিলেন, তাঁরা হলেন শাহাদাত চৌধুরী, জি এম এ রাজ্জাক, হরিহর সরকার, মইনুল হোসেন, সৈয়দ সালাহউদ্দিন চৌধুরী, এম.এ. খালেক, গোলাম কিবরিয়া চৌধুরী, জি.এম. খলিলুর রহমান, স্বপন আচার্য, ইয়াকুব খান, মজিবর রহমান, একে এম কাইয়ূম, সিরাজউদ্দিন, বনিজুল হকসহ আরও অনেকে।
hamidur-rahman.jpg
অস্ত্র হাতে লড়াই করবার প্রত্যয় নিয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ঢাকায় এসে ধরা পড়েন শিল্পী আবুল বারক্ আলভী। আর্ট কলেজের অধ্যয়ন সম্পন্ন করে আলভী তদানীন্তন পূর্বপাকিস্তানের চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা বিভাগে চাকরিরত ছিলেন। যুদ্ধের শুরু থেকেই আলভী অধিকৃত মাতৃভূমি থেকে অনেক মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী-সন্তানদের সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব পালন করেছিলেন। একাজে তিনি কুমিল্লা-আগরতলা রুটকে বেছে নিয়েছিলেন। এভাবে অনেকের পরিবারকে স্থানান্তরিত করার দায়িত্ব পালন করে আলভী মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দলের সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন। এই দলের অন্য যোদ্ধারা হলেন ফতেহ আলী, বাকের এবং কমল। আগস্ট মাসের শেষের দিকে অস্ত্রসম্ভারসহ তাঁরা সীমান্ত পাড়ি দেন। তারপর সুকৌশলে ঢাকায় প্রবেশ করেন। আলভীর সঙ্গে শিল্পী আলতাফ মাহমুদের স্ত্রী এবং শ্যালিকাদের আগে থেকেই নিবিড় জানাশোনা ছিল। আলভী আলতাফ মাহমুদের বাড়িতে এসে ওঠেন। ঢাকায় তাঁর বাড়িটা ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের একটি গোপন ঘাঁটি। বাড়ির আঙিনায় মাটিতে গর্ত করে মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্রশস্ত্র রাখা হত। ওই রাতে আলভীর পরিকল্পনা ছিল সকলের সঙ্গে কথাবার্তা বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবেন। কিন্তু আকস্মিকভাবে সান্ধ্য আইন জারি হওয়ার দরুণ আলভী আটকা পড়ে যান। আলতাফ মাহমুদের বাড়ির প্রতি পাকিস্তানি সেনাদের আগে থেকেই তীক্ষè নজর ছিল। তারা ভোররাতে বাড়িটি ঘিরে ফেলে। সেনারা আলতাফ মাহমুদ এবং আলভীকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। অস্ত্রশস্ত্র কোথায় আছে তা জানতে চায়। আলতাফ মাহমুদ অস্ত্র থাকার কথা অস্বীকার করেন। সেনারা বলে, তারা খবর পেয়েই এসেছে। আশেপাশের বাড়ি থেকেও তারা যুবকদের ধরে আনে। তাদের দিয়ে বাড়ির আঙিনার মাটি খুঁড়ে শেষে অস্ত্রের সন্ধান মেলে। আলভী আর আলতাফ মাহমুদকে সেনারা সোজা ক্যাম্পে নিয়ে যায়। পুরোনো সংসদ ভবনের পাশেই ছিল সেনাক্যাম্প। সেখানে উভয়ের উপর শুরু হয় নির্যাতন। অকল্পনীয়, অবর্ণনীয় নির্যাতন। আলভীর হাতের আঙুলগুলো পর্যন্ত থেঁতলে দেওয়া হয়েছিল। ‘আলভী’ তাঁর নামের তিনটি অংশের শেষ অংশটি গোপন করে গিয়েছিলেন। জিজ্ঞাসাবাদে সবসময়ই তিনি বলেছেন যে, আমার নাম আবুল বারক্। আমি সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ে চাকরি করি। সেনারা তথ্য মন্ত্রণালয়ে টেলিফোন করে আলভীর পরিচয় নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তাঁর সঠিক পরিচয় আর তাদের জানা হয় নি। শেষ পর্যন্ত আলভীর নিষ্পাপ চেহারার কারণেই সম্ভবত সেনারা তাঁকে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ধরা পড়ার তিনদিন পর আলভী ছাড়া পান। দীর্ঘ চিকিৎসার পরে তিনি আরোগ্য লাভ করেন।

একটি জাতির মুক্তিযুদ্ধ আসলে সর্বাত্মক যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে প্রয়োজন হয় নানা কিছুর। প্রয়োজন হয় অর্থের, কাপড়ের, ওষুধের। আমাদের শিল্পীদের অনেকে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অর্থ-কাপড় ওষুধ জোগাড় করেছেন। সেগুলো নানাভাবে তাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। এ কাজে যে শিল্পীরা জড়িত ছিলেন, তাঁরা হলেন, আনোয়ার হোসেন, আব্দুল মান্নান, রেজাউল করিম, সৈয়দ আব্দুল্লাহ খালিদ, মোখসেদ আলী ফরিদ, মোহাম্মদ ইউনুস প্রমুখ। আবার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্ববাসীর সমর্থন অর্জন এবং তহবিল সংগ্রহের জন্য ছবি এঁকে কেউ কেউ দেশের বাইরে প্রদর্শনী করেছেন।
monsoor-ul-karim.jpg
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আমাদের শিল্পীসমাজ চিত্রাঙ্কনের জন্য আরও একটি কর্মক্ষেত্র খুঁজে পেয়েছিলেন, সেটি স্বাধীন বাংলা সাহিত্য পরিষদ বা মুক্তধারা। আমাদের প্রকাশনা শিল্পের এক কিংবদন্তি পুরুষ চিত্তরঞ্জন সাহা মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছিলেন। একাত্তরে মুক্তধারা তেত্রিশটি বই প্রকাশ করেছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে: রক্তাক্ত বাংলা (সংকলন), প্রচ্ছদ: কামরুল হাসান; জাগ্রত বাংলাদেশ: আহমদ ছফা, প্রচ্ছদ: দেবদাস চক্রবর্তী; আমার জন্মভূমি: স্মৃতিময় বাংলাদেশ: ধনঞ্জয় দাস, প্রচ্ছদ: নিতুন কুণ্ডু; বাংলাদেশ কথা কয়: আবদুল গাফফার চৌধুরী, প্রচ্ছদ: দেবদাস চক্রবর্তী; বাংলাদেশের গেরিলা যুদ্ধ: যতীন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত (কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ সহায়ক সমিতির পক্ষে) প্রচ্ছদ: কামরুল হাসান; রক্তাক্ত মানচিত্র: আবদুল হাফিজ সম্পাদিত, প্রচ্ছদ: আশীষ চৌধুরী; প্রতিরোধ সংগ্রামে বাংলাদেশ: সত্যেন সেন, প্রচ্ছদ : দেবদাস চক্রবর্তী।

মুক্তিযুদ্ধকালে ভারতীয় পত্রিকায়ও আমাদের শিল্পীরা চিত্রাঙ্কনের কাজ করেছেন। ১৩৭৮ বঙ্গাব্দের (১৯৭১) শারদীয় দেশ পত্রিকায় একটি উপন্যাসের ছবি এঁকেছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। শারদীয় দেশে মুস্তাফা মনোয়ারের আঁকা ছবিগুলো স্বনামধন্য ভারতীয় চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। সত্যজিৎ এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, তিনি মুস্তাফা মনোয়ারকে তাঁর নিজের বাসায় ডেকে নেন এবং ছবিগুলোর ড্রইংয়ের উচ্ছ¡সিত প্রশংসা করেন।

প্রসঙ্গত মুস্তাফা মনোয়ারের অন্য একটি উদ্যোগ সম্পর্কে আলোকপাত করা যেতে পারে। একদিন তিনি বারাসাত শরণার্থী শিবিরে গিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে দেখেন, শরণার্থী জীবনের দুঃখদুর্দশা শিবিরবাসীদের একেবারেই বিমর্ষ এবং মলিন করে রেখেছে। তিনি ভাবলেন, শিবিরে যদি পাপেট শো-র আয়োজন করা যায়, তাহলে এই দুর্দশাগ্রস্ত জীবনে তারা একটু বিনোদন খুঁজে পাবে, তাদের মনোবলও চাঙা হবে। পরিকল্পনামতো পুতুল তৈরি হল। রাজা, সেনাপতি, মুক্তিযোদ্ধা প্রভৃতি নানা ধরনের পুতুলের পোশাক বানাতে মুস্তাফা মনোয়ার বারাসাতের এক দরজির দ্বারস্থ হলেন। দরজিকে পোশাকের ফরমাশ দিতেই সে রীতিমতো অবাক হল। সে বলল, ‘এ পোশাক তো বাচ্চাদের শরীরেও লাগবে না। এগুলো দিয়ে আপনি কী করবেন?’ মুস্তাফা মনোয়ার তখন দরজিকে সব কথা খুলে বললেন। দরজি সব কাজ বাদ দিয়ে তার দোকানের কাপড় দিয়ে খুব যতœসহকারে পুতুলের পোশাক বানিয়ে দিল। মুস্তাফা মনোয়ার যথারীতি দরজিকে তার পারিশ্রমিক দিতে চাইলেন। দরজি এবার হাতজোড় করে মাফ চেয়ে বলল, ‘এই কাজের জন্য আমি একটা পয়সাও নেব না। আমার দেশও বাংলাদেশ। আজ আমার খুশির দিন। আমার দেশের জন্য সামান্য হলেও এই কাজটুকু করতে পারলাম!’ আসলে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের একাত্মতাবোধ এভাবেই গভীরতর মাত্রায় উপনীত হয়েছিল। যা-ই হোক, এই শো-তে ঘাতক ইয়াহিয়া, পাকিস্তানি সেনা, মুক্তিযোদ্ধা প্রভৃতি চরিত্র সৃষ্টি করে পুতুল নাচের পালা দেখানো হত। এই পালায় ইয়াহিয়ার নাম ছিল স্যামচাচা। স্যামচাচার সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধার কথোপকথনপর্বটি ছিল খুবই রসাত্মক এবং হাস্যোজ্জ্বল। শরণার্থীরা এই শো দেখে আনন্দ পাওয়ার পাশাপাশি খুবই উদ্দীপিত হত। ওই সময়ে মার্কিন চিত্রগ্রাহক লিয়ার লেভিন মুক্তিসংগ্রামী শিল্পীসংস্থার গান গাওয়ার চিত্রগুলো ধারণ করার পাশাপাশি পাপেট শো-র ছবিও তুলেছিলেন। পরবর্তী সময়ে অকালপ্রয়াত চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদের বিখ্যাত ছবি ‘মুক্তির গান’-এ পাপেট শো-র কিছুটা অংশ সংযোজন করা হয়েছিল।
kalidas-karmakar.jpg
ইতিমধ্যে উল্লেখ করেছি যে, আমি শিল্পী কামরুল হাসানের নির্দেশে প্রবাসী সরকারের প্রকাশনা ও ডিজাইন বিভাগে যোগ দিয়েছি। কামরুল হাসান পরিচালক; নিতুন কুণ্ডু, দেবদাস চক্রবর্তী, নাসির বিশ্বাস ও প্রাণেশ মণ্ডল–এঁরা সবাই ডিজাইনার। আমরা নিয়মিত কাজ শুরু করলাম। মোট আটজন লোক নিয়ে শুরু হল তথ্য, প্রচার ও প্রকাশনা শাখা। ৮ নম্বর থিয়েটার রোডে ছিল আমাদের অফিস। সকাল দশটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত অফিস। কামরুল হাসান আমাদের সবাইকে নিয়ে বসতেন। কী ধরনের কাজ আমরা করব খোলামেলা আলোচনা করে তিনি তা বুঝিয়ে দিতেন। প্রথমদিকে মনোগ্রাম, পোস্টার, কার্টুন, লিফলেট, ব্যানার ডিজাইন ইত্যাদি করতে হত। কামরুল হাসান যে কোনো কাজেই একাধিক ডিজাইন করতে বলতেন। আমরা ডিজাইন করে কামরুল ভাইয়ের কাছে জমা দিতাম। তিনি সব ডিজাইন একত্র করে সবাইকে নিয়ে বসে ডিজাইন নির্বাচন করতেন। যে ডিজাইনগুলো ভালো হত সেগুলোকে পুনরায় ডেভেলপ করতে বলতেন। এভাবে কোনো কোনো পোস্টার কয়েকবার করে ডেভেলপ করার পর চূড়ান্ত হত। কামরুল হাসান তাঁর ‘এই জানোয়ারদের হত্যা করতে হবে’ শীর্ষক পোস্টারটি তিন-চারবার পরিবর্তন করে চূড়ান্ত করেছিলেন। এভাবেই আমরা সবাই মিলে ‘বাংলার হিন্দু, বাংলার খৃষ্টান, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার মুসলমান–আমরা সবাই বাঙালী’, ‘সদাজাগ্রত বাংলার মুক্তিবাহিনী’, ‘বাংলার মায়েরা মেয়েরা সকলেই মুক্তিযোদ্ধা’, ‘একেকটি বাংলা অক্ষর অ আ ক খ একেকটি বাঙালীর জীবন’, ‘বাংলাদেশের সম্পদ বৃদ্ধি করুন পাকিস্তানি পণ্য বর্জন করুন’, ‘বাংলাদেশের কৃষক শ্রমিক ছাত্র যুবক সকলেই আজ মুক্তিযোদ্ধা’, ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’, ‘রক্ত যখন দিয়েছি আরও রক্ত দেব’ শীর্ষক পোস্টারগুলো তৈরি করেছিলাম। ডিজাইন চূড়ান্ত করার পর যে শিল্পী ড্রইংয়ে ভালো তাঁকে ড্রইংপ্রধান কাজ দেওয়া হত, আর যিনি লেটারিংয়ে ভালো তাঁকে লেটারিংয়ের কাজ দেওয়া হত। বেশিরভাগ লেটারিং আমি ও প্রাণেশদা করতাম। ড্রইংপ্রধান ডিজাইনগুলো বেশিরভাগ করতেন প্রাণেশদা, নাসিরভাই ও নিতুনদা। তৎকালীন আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক নূরুল ইসলাম ১৯৭১ সালে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ওয়ার্কিং কমিটির অ্যাকটিং পাবলিসিটি কনভেনর ছিলেন। ছয়দফা শীর্ষক পুস্তিকাটির তিনিই ছিলেন প্রকাশক। তিনি আমাকে কিছু পোস্টার ও লোগোর কাজ দিয়েছিলেন। আমি ও শিল্পী দেবদাস চক্রবর্তী যৌথভাবে ওই কাজগুলো করেছিলাম। যেমন–‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো’, ‘রক্ত যখন দিয়েছি আরও রক্ত দেব’, ‘SHEIKH MUJIB’S TRIAL AN ACID TEST FOR WORLD CONSCIENCE’। নাসির বিশ্বাস কাজ করতেন বঙ্গবন্ধুর প্রেস সচিব আমিনুল ইসলাম বাদশা ও বাদল রহমানের সঙ্গে। নাসিরভাই তাঁদের অনুরোধে অনেক ড্রইং, পোস্টার, ব্যানার, লোগো করে দিয়েছিলেন।

একদিন অফিসে এলেন চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান। যেসব ফিল্ম তাঁরা তৈরি করছেন তার কিছু কাজ (যেমন টেলপ, ড্রইং, স্কেচ) আমাদের করে দিতে হবে। ডিজাইন শাখা থেকে এ ধরনের কিছু কাজ আমরা করে দিয়েছিলাম। জহির রায়হান প্রসঙ্গে আরেকটি কথা মনে পড়ছে। প্রবাসে আমাদের চিত্রশিল্পীদের নিয়ে তিনি বিশেষভাবে ভাবিত ছিলেন। কামরুল ভাইয়ের কাছে একদিন তাঁর লেখা একটি চিঠি এল। তাতে জানালেন, বাংলাদেশের যে শিল্পীরা ভারতে এসেছেন তাঁদের জন্য তিনি কিছু অর্থপ্রাপ্তির আয়োজন করেছেন। তিনি কামরুল হাসানের কাছে সব শিল্পীর ঠিকানা চেয়েছেন। এরকম আরও অনেক ঘটনার কথাই মনে পড়ে।

একদিন হঠাৎ সাহিত্যিক-সম্পাদক আবুল হাসনাত (বর্তমানে কালি ও কলমের সম্পাদক)-এর সঙ্গে দেখা। তখন মাত্রই কলকাতা গিয়েছি। তিনি বললেন, ‘বীরেন, কমিউনিস্ট পার্টির তরফ থেকে ‘মুক্তিযুদ্ধ’ নামে একটি পত্রিকা বের হচ্ছে। আপনাকে এর একটি লোগো করে দিতে হবে।’ আমি বললাম, ‘হাসনাতভাই, কালি-কলম-তুলি কিছুই নেই। কী করে করব?’ হাসনাতভাই আমাকে সাঙ্গুভ্যালি রেস্টুরেন্টে নিয়ে বসালেন ও দুই কাপ চায়ের অর্ডার দিলেন। চা খেতে খেতে একটি কলম বের করে বললেন, ‘এটা দিয়েই একটা কিছু করে দিন।’ তখন ঝরনা কলমের ব্যবহার ছিল। চা খাওয়া শেষ করে চায়ের পে­টে কলমের মুখ খুলে কালি ঢেলে একটি দেশলাইয়ের খোসা দিয়ে ঘষে ঘষে লিখলাম–মুক্তিযুদ্ধ। একেই বুঝি বলে যুদ্ধকাল। আজ ভাবতে অবাক লাগে, দেশলাইয়ের খোসাকেই সেদিন তুলি বানিয়ে নিয়েছিলাম।

কলকাতার বেশকিছু স্বনামধন্য লেখক ও সাংস্কৃতিক কর্মী, যেমন–তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রসূন বসু, দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, অপর্ণা সেন প্রমুখ মাঝেমধ্যে থিয়েটার রোডের অফিসে এসে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন দিক নিয়ে আমাদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করতেন এবং তাদের প্রভাবাধীন বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সহায়তা প্রদান করতেন।
ranjit-das.jpg
একাত্তরে বাংলাদেশের শিল্পীদের চিত্রপ্রদর্শনী
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পাকিস্তানি বর্বর বাহিনীর অত্যাচারে অতিষ্ঠ ও সর্বস্বান্ত হয়ে দলে দলে নারী-পুরুষ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে আশ্রয় নিতে শুরু করে। দেশের নানা জায়গায় অনেক শিল্পী উদ্বাস্তুতে পরিণত হন এবং সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করেন। শিল্পীদের সংখ্যা দিনে দিনে বাড়তে শুরু করল। প্রত্যেকেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করার জন্য দারুণভাবে আগ্রহী। এ সময় কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকায় এই মর্মে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয় যে, বাংলাদেশ থেকে আসা শিল্পীরা যেন কলকাতা আর্ট কলেজের অধ্যক্ষ চিন্তামণি করের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ওখানে গিয়ে আমি জানতে পারি, কামরুল হাসান, মুস্তাফা মনোয়ার, নিতুন কুণ্ডু, দেবদাস চক্রবর্তী, নাসির বিশ্বাস, প্রাণেশ মণ্ডল, রণজিত নিয়োগী, কাজী গিয়াসউদ্দিন, চন্দ্রশেখর দে, হাসি চক্রবর্তীসহ আরও অনেকে বাংলাদেশ থেকে এসেছেন। বাংলাদেশে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার বর্বর অত্যাচার ও গণহত্যার চিত্র বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরা এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গড়ে তোলার লক্ষ্যে চিন্তামণি কর ও কামরুল হাসানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের শিল্পীদের আঁকা ছবি নিয়ে প্রদর্শনী আয়োজনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। উদ্যোক্তা হিসেবে এগিয়ে এল বিভিন্ন শিল্পী সংস্থা ও কলকাতার বাংলাদেশ সহায়ক শিল্পী-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী সহায়ক সমিতি। শিল্পীরা যাতে স্বচ্ছন্দে ছবি আঁকতে পারেন সেজন্য উদ্যোক্তারা সাময়িকভাবে কোনো কোনো বাসায় শিল্পীদের আশ্রয়দান এবং ছুটির পর কলকাতা আর্ট কলেজের ক্যান্টিনে তাঁদের ছবি আঁকা ও থাকার ব্যবস্থা করলেন। রং-তুলি-কাগজ-ক্যানভাসসহ যাবতীয় আর্ট ম্যাটেরিয়াল সরবরাহ করা হল। এ জন্য যে প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছিল, সেগুলো হচ্ছে বিড়লা একাডেমি অব আর্ট অ্যান্ড কালচার, মেসার্স জিসি লাহা প্রাইভেট লিমিটেড, আদভানী প্রাইভেট লিমিটেড, ক্যামলিন প্রাইভেট লিমিটেড, কোরেস প্রাইভেট লিমিটেড এবং প্যাপিরাস প্রাইভেট লিমিটেড। প্রথমে কলকাতায়, পরে দিলি­ ও বোম্বাইয়ে এই একই প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

১৩ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ বিড়লা একাডেমিতে এই প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন প্রখ্যাত ভাস্কর শ্রীদেবীপ্রসাদ রায়চৌধুরী। সোমবার ছাড়া প্রতিদিন বিকেল তিনটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত প্রদর্শনী খোলা ছিল। প্রদর্শনীতে শিল্পী কামরুল হাসান, মুস্তাফা মনোয়ার, দেবদাস চক্রবর্তী, নিতুন কুণ্ডু, প্রাণেশ মণ্ডল, নাসির বিশ্বাস, বীরেন সোম, রণজিত নিয়োগী, আবুল বারক্ আলভী (ক্যাটালগে তাঁর নাম ছাপা হয়েছিল। কিন্তু তিনি শিল্পকর্ম জমা দিতে পারেননি। প্রদর্শনীর আগেই তিনি পাক হানাদার বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন এবং জুলুম-নির্যাতনের শিকার হন), গোলাম মোহাম্মদ, স্বপন চৌধুরী, কাজী গিয়াসউদ্দিন, চন্দ্রশেখর দে, হাসি চক্রবর্তী, বিজয় সেন, বরুণ মজুমদারসহ ১৭ শিল্পীর ৬৬টি ছবি স্থান পেয়েছিল। ছবিগুলো তেলরং, জলরং, কালি-কলম ও মিশ্র মাধ্যমে আঁকা হয়েছিল। প্রতিবাদী, বিমূর্ত, সমবিমূর্ত, রিয়েলেস্টিক ধাঁচে আঁকা এসব ছবিতে বর্বর পাকিস্তানি বাহিনীর অত্যাচার, গণহত্যা, নারীনির্যাতন এবং বিপুল ধ্বংসযজ্ঞের স্বাক্ষর ফুটে উঠেছিল। কিছু কিছু ছবি দৃষ্টিগতভাবে বীভৎস, কিন্তু সত্য ও বাস্তবতার উপজীব্য বিষয় ছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। দিনের পর দিন সংবাদপত্রে যে বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে বাংলাদেশের শিল্পীরা সেগুলোই যার যার দৃষ্টিকোণ থেকে নিজস্ব স্টাইল ও স্বকীয়তা বজায় রেখে রং ও রেখার মাধ্যমে প্রকাশ করেছিলেন।
abdus-shakoor.jpg
সবার আগে শিল্পী কামরুল হাসানের ছবি নিয়েই আলোচনা শুরু করি। তিনি বাংলাদেশের প্রথম প্রজন্মের খ্যাতিমান শিল্পী। প্রদর্শনীতে তাঁর পাঁচটি কাজ ছিল কম্পোজিশন, বাংলাদেশ বিফোর জেনোসাইড, গণহত্যা, বাংলাদেশ আফটার জেনোসাইড এবং ফুল মুন অব এপ্রিল শিরোনামে। কম্পোজিশন (১, ২)-এর মধ্য দিয়ে শিল্পী কামরুল হাসান বাংলাদেশে পাকিস্তানি বাহিনী পরিচালিত ব্যাপক গণহত্যা ও তাণ্ডবলীলা ফুটিয়ে তুলেছিলেন। এই ছবি দুটিতে গণহত্যার শিকার নরনারী নানা ভঙ্গিতে পড়ে আছে। শিল্পী তাঁর নিজস্ব ধাঁচের ড্রইং ও ফর্মের ব্যবহারে হালকা রং দিয়ে দ্বিমাত্রিকভাবে এই ছবি এঁকেছেন। বাংলার নিজস্ব প্রাচীন লোকজ পুতুলের ফর্মে আঁকা আর একটি ছবি (বাংলাদেশ বিফোর জেনোসাইড) বিশেষভাবে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বাংলার শাশ্বত চিরকল্যাণময়ী নারীর মহিমাময়ী মূর্তি সুনিপুণভাবে ছবিতে ফুটে উঠেছে। ‘ফুল মুন অব এপ্রিল’ এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। উপকরণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাঁর দক্ষতা এবং সচেতন ও প্রতিবাদী শিল্পী হিসেবে তাঁর শিল্পকর্ম সকলের প্রশংসা কুড়িয়েছে। মুস্তাফা মনোয়ার মূর্ত ঘরানার এক বলিষ্ঠ শিল্পী হিসেবে বাংলাদেশে পরিচিত। এ প্রদর্শনীতে তাঁর আটটি কাজ ছিল। বর্বর পাক বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ ও ধ্বংসলীলার বাস্তব চিত্র তাঁর কাজের মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে। এ প্রসঙ্গে তাঁর ‘উইম্যান অ্যান্ড বিস্ট’, বাংলাদেশ (১, ২)-এর কথা উল্লেখ করা যায়। ছবিগুলো জলরং, তেলরং ও কালি-কলমে আঁকা। দেবদাস চক্রবর্তী বিমূর্ত ঘরানার আরেকজন সফল শিল্পী। এই প্রদর্শনীতে তাঁর দুটি কাজ ছিল। একটি ‘হিউম্যানিটি ক্রুসিফায়েড’, অপরটি ‘লিবারেশন আর্মি’। হিউম্যানিটি ক্রুসিফায়েড ছবিটিতে কিছু নরনারীকে নির্যাতন ও হত্যা করে তাদের মৃতদেহ গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। ছবিটি দেখলে বোঝা যায়, কী নির্মম বীভৎসতায় মেতে উঠেছিল পাকিস্তানি বাহিনী। তেলরঙে আঁকা আধা বিমূর্ত জ্যামিতিক ফর্মে উজ্জ্বল রং ব্যবহার করে শিল্পী দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। বাংলাদেশের চিত্রকলায় বিমূর্ত অঙ্কনপদ্ধতি চর্চায় যাঁরা নিরলস শ্রম দিয়ে গেছেন, তাঁদের মধ্যে নিতুন কুণ্ডুর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর ছবি দুটির একটি ‘বাংলাদেশ ৭১’, অপরটি ‘ক্রাই ফর হেলপ’। ছবি দুটি শিল্পী আধা বিমূর্ত ধারায় রং ও টেক্সচারের প্রাধান্য দিয়ে দ্বিমাত্রিক প্রকাশশৈলীতে এঁকেছেন। প্রাণেশ মণ্ডলের চারটি ছবিতে গণহত্যা ও নির্যাতনের চিত্র ফুটে উঠেছে। তিনি সরাসরি বলিষ্ঠ রং ও রেখার মাধ্যমে গণহত্যার বর্বরতাকে প্রকাশ করেছেন। নাসির বিশ্বাসের একটি ছবি ‘রেপ’। এই ছবিটি পাকিস্তানি বর্বর বাহিনীর নির্মমতার কথা দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছিল। ছবিটিতে মা হাঁটু গেড়ে বসে তার ধর্ষিত কিশোরীকন্যাকে নিয়ে চিৎকার করে ক্রন্দন করছেন। দূরে পলায়নপর পাকিস্তানি সেনাকে দেখা যাচ্ছে। তেলরঙে আঁকা এই ছবিটির সামনের দিকে উজ্জ্বল রং ও রক্তে ভেজা মাটি এবং পশ্চাতে ধূসর হালকা স্ট্রোকে আবছা আলোর অন্ধকার। ছবিটির কম্পোজিশন সুন্দর। এতে শিল্পী তাঁর বাস্তব অভিজ্ঞতার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। আমারও চারটি ছবি ছিল প্রদর্শনীতে। ছবিগুলো তেলরং ও কালি-কলমে আঁকা। ‘ক্রাই’ ও ‘নাইটমেয়ার’ ছবি দুটি তেলরঙে, আধা বিমূর্তধারায় আঁকা। কোথাও ড্রইং, কোথাও একটু ফর্ম, আবার কোথাও ভাঙা ফর্মের মূর্ত ব্যবহার করে ছবি দুটি এঁকেছিলাম। বিশেষ করে ‘নাইটমেয়ার’ ছবিটিতে একটি ঘোড়ার মুখ উপরের দিকে ওঠানো, যেন সে চিৎকার করে গণহত্যার প্রতিবাদ জানাচ্ছে। বিশ্ববাসীকে বলছে, এই গণহত্যা বন্ধ করো। ‘ক্রাই’ ছবিটিতে আমি নিপীড়িত মানবতার তীব্র ক্রন্দন ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত করে তুলতে চেয়েছি। অন্যদিকে স্কেচ দুটিতে ধারণ করতে চেয়েছি প্রতিবাদী মানুষের আগুনঝরা অভিব্যক্তি। স্বপন চৌধুরী সবচেয়ে বেশি কাজ দিয়েছিলেন এই প্রদর্শনীতে। ‘বাংলাদেশ’ শিরোনামে তিনটি এবং ‘স্কেচ’ শিরোনামে ১০টি। স্বপন চৌধুরীর কাজগুলো ছিল বিমূর্ত ধারায় আঁকা, বিশেষ করে তাঁর প্রতীকী উপস্থাপনার কাজগুলো দর্শকসাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। যেমন–বাংলাদেশ (২) এবং স্কেচ (১, ৪, ৫, ৭)। স্বপন চৌধুরীর ছবি অন্যদের চেয়ে খানিকটা ব্যতিক্রমধর্মী ছিল। ছবির কম্পোজিশন পরিণত, কোথাও মুষ্টিবদ্ধ হাত, ফুল ও পাতা, পশুপাখি, মানুষের মুখ ইত্যাদি ব্যবহার করে রং, রেখা ও ড্রইংয়ের মাধ্যমে তিনি তাঁর কাজে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছিলেন।

চন্দ্রশেখর দে-র কাজ ছিল চারটি। ‘ইনোসেন্ট ভিক্টিম’, ‘ক্রেজি বার্ড’, ‘স্কেচ’ (১, ২)। চারটি কাজই পরিণত। তবে ‘ক্রেজি বার্ড’ সকলের চেতনাকে নাড়া দিয়েছিল। নীলাভ মিষ্টি রঙে দুটি পাখির কম্পোজিশনের মাধ্যমে শিল্পী বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের বৈষম্য বোঝাবার চেষ্টা করেছেন। ছবিটি দর্শকমনে আলোড়ন সৃষ্টি করে। অন্যান্য শিল্পীর মধ্যে রণজিত নিয়োগী (দি রাইজিং সান ইজ আওয়ার্স), হাসি চক্রবর্তী (বাংলাদেশ ১, ৫), বিজয় সেন (জেনোসাইড), কাজী গিয়াসউদ্দিন (ইভা কুইস ১, ৩), গোলাম মুহম্মদ (সান অব লিবারেটেড), বরুণ মজুমদার (বাংলাদেশ) এবং অঞ্জন বণিক (বাংলাদেশ)-এর নাম উল্লেখ করা যায়। প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণকারী শিল্পীদের মধ্যে প্রাজ্ঞ এবং প্রতিভাবান শিল্পী যেমন ছিলেন, তেমনি ছিলেন উদীয়মান ও নবীন শিল্পী। তাঁদের কাজগুলো ছিল বিক্ষুব্ধ, বিস্ফারিত বাংলাদেশের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আঁকা।

শোক, অপমান, হতাশায় এ দেশের শিল্পীসমাজ তখন মুহ্যমান। কিন্তু একইসঙ্গে স্বাধিকার অর্জনের ইস্পাতকঠিন প্রত্যয়ে তাঁরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠিত শিল্পীর কাজ এই প্রদর্শনীতে ছিল না। কারণ তাঁরা তখন বিচ্ছিন্ন অবস্থায় বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করছিলেন। সবদিক থেকে দেখলে উলি­খিত প্রদর্শনীটি সার্বিক অর্থেই সফল হয়েছিল। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক দর্শকের সমাগম হয়েছিল। শিল্পীদের আঁকা ছবি দেখে দর্শকদের মন আবেগে আপ্লুত হয়েছে। কারণ যুদ্ধতাড়িত ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ ওই শিল্পীদের কাজে বাংলাদেশের অগ্নিগর্ভ সময়ের অভিজ্ঞতা ও চিন্তাধারার আশ্চর্য প্রতিফলন ঘটেছিল।
rashid-chowdhury.jpg
বিজয়
আমাদের মুক্তিসংগ্রাম অনেক সঙ্কটসংকুল পথ অতিক্রম করে শেষে সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে— উপনীত হয়েছে। এসেছে বিজয়। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তানিরা ভারতীয় ভূখণ্ডে আক্রমণ চালাতেই জোর যুদ্ধ বেধে যায়। মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত হয় যৌথ কমান্ড। সংবাদ আসে, নতুন নতুন এলাকা মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে যাচ্ছে। আনন্দে আমরা আত্মহারা। স্বাধীন দেশে ফিরে যাব এই আশায় দিন গুনতে শুরু করলাম। যুদ্ধের শেষ ভাগে ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল মানেকশ পাকিস্তানি বাহিনীর উদ্দেশে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানালেন। সেই আহ্বান বারবার আকাশবাণী থেকে প্রচারিত হতে লাগল। শেষে ১৬ ডিসেম্বর সকালে পাকিস্তানি বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় অধিনায়ক জেনারেল নিয়াজি আত্মসমর্পণ করতে রাজি হলেন। সেদিন বেলা ৪টা ৩১ মিনিটে ঢাকায় তদানীন্তন রেসকোর্স ময়দানে নিয়াজি বাংলাদেশ ও ভারতীয় বাহিনীর যৌথ কমান্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন। যুদ্ধ থেমে গেল। বাংলাদেশ মুক্ত এবং স্বাধীন। সে কী জয়ধ্বনি! সে কী আনন্দ! সবাই আনন্দ-উল্লাস করছে, মিষ্টি বিতরণ করছে। স্লোগানে মুখরিত কলকাতা মহানগর। ‘জয় বাংলা’, ‘শেখ মুজিব জিন্দাবাদ’।

মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির জীবনের এক চিরস্থায়ী অহঙ্কার। সেই যুদ্ধে আমরা শিল্পীসমাজ যোগ দিয়েছিলাম প্রাণের তাগিদ থেকে। দেশমাতৃকার জন্য এক সুমহান অঙ্গীকার সেদিন আমাদের উদ্বুদ্ধ করেছিল। ইতিহাসের এক গৌরবময় কালপর্বের অংশী হতে পারার গৌরব আজও আমাদের রোমাঞ্চিত করে।

প্রাপ্ত ছবিগুলো শিল্পী বীরেন সোমের সৌজন্যে।



Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com