কবিতার দিকপালের চলে যাওয়া

আনিসুর রহমান | ২৮ মার্চ ২০১৫ ৫:৩১ অপরাহ্ন

poet-tomas-transtromer-at-nobel-award-ceremony-2011_photo-source_expressen.jpg
আমি খুব অসহায় বোধ করছি, স্বজন হারানোর কষ্ট অনুভব করছি। মানসিকভাবে কে কার কতটা আপন তা কেবল কারও চলে যাবার পর আরও স্পষ্ট হয়। সুইডিশ কবি টমাস ট্রান্সট্রয়মারের চলে যাওয়াটা এ রকম একটা বেদনাদায়ক ঘটনা আমার জন্য।

তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। জন্মেছিলেন ১৯৩১ সালে। তিনি কবি হিসেবে আমাদের শামসুর রাহমানের সমসাময়িক ছিলেন। রাহমান ভাই জন্মেছিলেন ১৯২৯ সালে। সুইডিশ একাডেমি ২০১১ সালে ট্রান্সট্রয়মারকে কবিতার জন্য নোবেল পুরস্কার দিয়ে সন্মানিত করে। এর আগেই তাঁর কবিতা বাংলাসহ ৬০-এর মতো ভাষায় অনূদিত হয়েছিল। তিনি সারা দুনিয়ার কবি ও কবিতার পাঠকের কাছে সমাদৃত ছিলেন। সুইডিশ একাডেমি ট্রান্সট্রয়মারকে পুরস্কৃত করে একাডেমিকেই সন্মানিত করেছিল।

এ রকম একজন বিরলপ্রজ কবিতার দিকপালের কাছাকাছি আসার সুযোগ হয়েছিল আমার। এমনিতেই বিদেশজীবনে একপা আমার বাংলাদেশে, আরেক পা সুইডেনে। আর এর নামই বুঝি নির্বাসন। এ রকম দ্বিধান্বিত সময়ে ট্রান্সট্রয়মারের সঙ্গে যোগাযোগ আমাকে কবিতার প্রতি বেশি বেশি অনুরাগী হতে প্রেরণা জুগিয়েছিল।

২০০৪ কি ২০০৫ সালে অনুবাদক লিয়াকত হোসেন স্টকহোমে একটা কবিতা সন্ধ্যার সূত্র ধরে ট্রান্সট্রয়মারের কবিতার প্রশংসা করে একটা মেইল করেছিলেন। আমি তখন ঢাকার নিউএজ পত্রিকায় সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করি। এরপর আমি যখন ২০০৬ সালে নরওয়ের কবি হেনরিক ইবসেনের কবিতা অনুবাদ করছিলাম, কবি বেলাল চৌধুরী আমাকে ট্রান্সট্রয়মারের কবিতার কথা বলেছিলেন| এই দুটি ঘটনা ট্রান্সট্রয়মারের প্রতি আমাকে আগ্রহী করেছিল। এরপর সেই সময়ে আমার বন্ধু ঢাকায় সুইডিশ কূটনীতিক আমাকে ট্রান্সট্রয়মারের কবিতার ইংরেজি অনুবাদ সমগ্র উপহার দেন। সেই সমগ্রের প্রথম কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতাটি পড়ে আমি সম্মোহিত হয়ে যাই।
tomas-transtromer-at-his-apartment-in-stockholm_photo-source-his-official-website_transtromernet.jpgtomas-transtromer_nobelpriset-2011_photo-source_aftonbladet.jpg

শিরোনামহীন
জেগে ওঠা তো স্বপ্নের ভেতর থেকে
সকালের সবুজ দেশে মুক্ত পর্যটকের
শ্বাসরুদ্ধকর উদ্দামে প্যারাসুটে
লাফ দেওয়া।
জিনিসেরা জ্বলে ওঠে।
শিহরিত ভরতপাখির মতে–
পর্যটক জানে বৃক্ষের ভূতলে ব্যাপক
শিকড় জংশন
আর দোলানো বাতিবৃত্তান্ত।
কিন্তু ভূস্তরের সবুজ দারু
মৌসুমি বন্যা
যেন তার উত্তোলিত বাহু
অদৃশ্য পাম্পের শব্দ চারু।
পর্যটক যেন গ্রীষ্মের দিকে পা মাড়ায়
দৃষ্টিসন্তাপক অগ্নিগিরির জ্বালামুখ নেমে যায়
যুগে যুগে সূর্যের সঞ্চালক চাকার
নিচে ভেজা সবুজ বৃক্ষের বাণের মাধ্যমে
পর্যটক নেমে আসে
এ যেন পরীক্ষিত, পতনমুখী ক্ষণিক যাত্রা
হুড়মুড়ে চলা জলের উপরে
বাতাসে ভেসে থাকা
বাজপাখির বাহাদুরি
পর্যটকের ব্রোঞ্জযুগের তুরী।
অচল নোট। অতল গভীর বাতাসে
ভেসে থাকা।
দিনের প্রথম প্রহরে স্মৃতিরা
দুনিয়াকে শক্ত করে আঁকড়ে টাকড়ে ধরে
যেমন করে রোদ তাজা পাথরকে হাতে করে
পর্যটক শেষতক বৃক্ষের নিচেই দাঁড়িয়ে পড়ে।
মৃত্যুর উদ্দামতার সংঘর্ষের পড়ে
বড় কোনো আলো কি তার মাথার উপর
আঁচড়ে টাচড়ে পড়ে?

২০০৮ সালে স্টকহোমে একটি আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনে তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম সামনাসামনি আলাপ হয়।
১৯৯০ সালে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের কারণে তিনি কর্মক্ষমতা ও বাকশক্তি অনেকটা হারিয়ে ফেললেও তাঁর স্ত্রী মনিকার মাধ্যমে আলাপচারিতা চালাতেন।
সব মিলিয়ে তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ১১ এবং আমেরিকান কবি রবার্ট ব্লাইয়ের সঙ্গে পত্রগুচ্ছ। তবে তাঁর অপ্রকাশিত কবিতার বিশাল এক ভাণ্ডার তিনি বাক্সবন্দি করে রেখেছেন।
২০০৯ সালে আমি সুইডিশ শহর উপসালায় আবাসিক লেখক বৃত্তি গ্রহণ করার ট্রান্সট্রয়মার দম্পতির আমন্ত্রণে ভেস্তেরস শহরে তাঁদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। এরপর তিনি ২০১০ সালে উপসালা নগর গ্রন্থাগারে আমার লেখালেখি কর্মশালায় অতিথি হিসেবে যোগ দিয়ে আমাকে সম্মানিত করেছিলেন।
নোবেল পুরস্কারের পরও টেলিফোনে এবং মেইলে যোগাযোগ ছিল। যদিও তাঁর স্বাস্থ্য ভালো যাচ্ছিল না।
tomas-transtromer-with-his-wife-monica-transtromer_photo-source_dagens-nyheter.jpg
১৯৬০ এর দশকে একটি চলচ্চিত্রে বাংলাদেশের সৌন্দর্য দেখ মুগ্ধ হয়েছিলেন এবং বাংলাদেশে আসতে চেয়েছিলেন| কিন্তু সুযোগ হয়ে ওঠেনি| আর যখন সুযোগ হল তখন স্বাস্থ্য তাঁর পক্ষে রইল না|
ট্রান্সট্রয়মার দম্পতির কাছ থেকে জীবন কবিতা সম্পর্কে অনেক কিছু শিখেছি| তবে সবচেয়ে সেরা জানলাম, কীভাবে নির্মোহ আর উদার হয়ে জীবনের সুন্দরের দেখা পাওয়া যায়| তাঁর কবিতায় সেই জয়গান তিনি গেয়ে গেলেন|
তিনি ২৬ মার্চ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন|
ট্রান্সট্রয়মার, স্বর্গেও আপনার কবিতা ও মেটাফরের জয় হোক|

[আনিসুর রহমান, উপসালা, সুইডেন। www.anisur.net]

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (5) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Dr. Binoy Barman — মার্চ ২৮, ২০১৫ @ ৬:৪৮ অপরাহ্ন

      নোবেল বিজয়ী কবি টমাস ট্রান্সট্রয়মারের প্রয়াণ সত্যি বেদনাদায়ক। তাঁর কবিতা বাংলা অনুবাদে পড়েছি। তাঁর ছোট ছোট কবিতাগুলো আমাদেরকে গভীর অনুধ্যানের জগতে নিয়ে যায়। অনুজ কবি আনিসুর রহমানকে ধন্যবাদ তাঁর সুন্দর লেখার জন্য।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শিমুল সালাহ্উদ্দিন — মার্চ ২৮, ২০১৫ @ ৮:৪৬ অপরাহ্ন

      শোকস্তব্ধতা…

      যেখানেই থাকুন, খুব শান্তিতে থাকুন প্রিয় কবি…আনত শ্রদ্ধা…

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কুতুব হিলালী — মার্চ ২৯, ২০১৫ @ ৭:৫৮ পূর্বাহ্ন

      স্বপ্নের মতো গুচ্ছ গুচ্ছ শব্দের কারুদালানের মালিক ছিলেন টমাস। তার কবিতার আধেয়ের ভেতর ডুবে থাকতে ভালো লাগে। তা রহস্যের অননুভব্য সুতোগুলোর রেশরাজিকে দীর্ঘায়িত করে। এই শব্দচরের জন্য শান্তি প্রার্থনা।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Maksudul Amin — মার্চ ২৯, ২০১৫ @ ৯:৫০ পূর্বাহ্ন

      কবি চলে যায় সত্য—–কিন্তু সত্যিই কি যায়? বরং চলে গিয়ে আরও প্রকটভাবেই তো আমাদের মাঝে আসন গ্রহন করেন। অনেক দিন পর আনিস ভাইয়ের লেখা পড়ে ভালো লাগলো।ধন্যবাদ আনিস ভাই।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Kabir Hossain — মার্চ ৩০, ২০১৫ @ ৪:১৭ অপরাহ্ন

      খুবই সুখপাঠ্য প্রবন্ধটি। প্রবন্ধকারকে ধন্যবাদ।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com