গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:

নিঃসঙ্গতার একশ বছর

আনিসুজ্জামান | ১৯ মার্চ ২০১৫ ২:৫৯ অপরাহ্ন

garcia_marquez.jpgবিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে নিঃসঙ্গতার একশ বছর-এর মতো আর কোনো উপন্যাস প্রকাশের পরপরই এতটা পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে কিনা সন্দেহ। জনপ্রিয়তার বিচারে যেমন, তেমনি শিল্পকুশলতা আর শিল্পমুক্তির ক্ষেত্রেও এটি হয়ে উঠেছে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। কেবল স্প্যানিশ সাহিত্যেই নয়, গোটা বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসেই একটি মাত্র উপন্যাসে ইতিহাস, আখ্যান, সংস্কার, কুসংস্কার, জনশ্রুতি, বাস্তব, অবাস্তব, কল্পনা, ফ্যান্টাসি, যৌন-অযাচার ও স্বপ্ন– সবকিছুর এমন স্বাভাবিক ও অবিশ্বাস্য সহাবস্থান আগে কখনও দেখা যায়নি।
ঠিক এই কারণে মারিও বার্গাস যোসা এটিকে বলেছিলেন এক সামগ্রিক উপন্যাস (Novela Total), আর পাবলো নেরুদা একে বলেছিলেন, “সের্বান্তেসের ডন কিহোতের পর স্প্যানিশ ভাষায় সম্ভবত মহত্তম উন্মোচন (“perhaps the greatest revelation in the Spanish language since Don Quixote of Cervantes.”)
বাংলাদেশে এখনও পর্যন্ত কিংবদন্তিতুল্য এই উপন্যাসটি মূলভাষা থেকে অনূদিত হয়নি। এই প্রথম এটি আনিসুজ্জামানের অনুবাদে মূল থেকে ধারাবাহিক অনূদিত হচ্ছে। বি. স.

অনুবাদ: আনিসুজ্জামান

———————————————————————————
ধারাবাহিক উপন্যাস । কিস্তি ১৮
কর্ণেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া বত্রিশটি সশস্ত্র বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেয় আর পরাজিত হয় সবকটিতেই। সতেরজন ভিন্ন রমনীর গর্ভে জন্ম দেয় সতেরজন পুত্র সন্তানের আর পুত্রদের মধ্যে সবচেয়ে বড়জনের পয়ত্রিশ বছর পূর্ন হবার আগে এক রাতেই একের পর এক মেরে ফেলা হয় তাদের। পালিয়ে বাঁচে প্রাণের উপর চৌদ্দটি হামলা, তেষট্টিটা অ্যামবুশ আর একটি ফায়ারিং স্কোয়াড থেকে। একটি ঘোড়াকে মেরে ফেলার পরিমান স্ট্রিকনাইন (বিষ) মিশিয়ে দেয়া কফি পান করেও বেঁচে যায় সে। প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্টের প্রদত্ত অর্ডার অফ মেরিট প্রত্যাখ্যান করে এক সীমান্ত হতে অন্য সীমান্ত পর্যন্ত বৈধ কর্তৃত্ব বজায় রেখে, সরকারের চোখে সবচেয়ে বিপজ্জনক লোক হিসেবে গণ্য হয়ে বিদ্রোহী বাহিনীর সেনাপ্রধানের পদ পেলেও সে কখনও তার ছবি তোলার অনুমতি দেয় না। যুদ্ধের পরে প্রস্তাবিত আমরণ পেনশন নিতে অস্বীকার করে আর বেঁচে থাকে বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত মাকন্দোতে নিজের কর্মশালায় সোনার ছোট ছোট মাছ বানিয়ে। যদিও সে সবসময় সম্মুখভাগে যুদ্ধ করত তবুও একমাত্র যে আঘাতটা পায়, সেটা বিশ বছরের গৃহযুদ্ধের ইতি টানানো নিরলান্দিয়ার চুক্তি স্বাক্ষরের পরে, যেটা করেছিল সে নিজের হাতেই। এক পিস্তল দিয়ে নিজের বুকে গুলি করে সে আর বুলেট বেরিয়ে যায় বেঁচে থাকার জন্য অত্যাবশ্যক কোন অঙ্গের ক্ষতি না করেই। এত কিছু অর্জনের পরেও একমাত্র যা বেঁচে থাকে তা হচ্ছে মাকন্দোতে তার নামে নামকরন করা এক রাস্তা। যদিও বার্ধক্য জনিত মৃত্যুর অল্প কয়েক বছর আগে তার কথা অনুযায়ী জানা যায় যে সেই সকালে, যখন সে একুশ জন ছেলে নিয়ে রওয়ানা হয় জেনারেল বিক্তর মেদিনার বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেয়ার উদ্দেশ্যে তখন সে এটুকুও প্রত্যাশা করে নি।
“তোর হাতে রেখে গেলাম মাকন্দোকে” যাবার আগে এটাই ছিল আর্কাদিওকে বলা তার সব কথা- “ভাল অবস্থায়ই রেখে যাচ্ছি। চেষ্টা করিস যাতে ফিরে এসে আরও ভাল অবস্থায় পাই।”

আর্কাদিও তার এই নির্দেশকে নিতান্তই নিজের মত করে ব্যাখ্যা করে। মেলকিয়াদেছের এক বইয়ের পাতায় দেখা ছবির দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে শোভাবর্ধক বুনুনী ও মার্শালদের স্কন্ধভূষন দিয়ে এক ইউনিফরম বানায় সে। আর নিহত ক্যাপ্টেনের সোনার ঝালরবিশিষ্ট তরবারি কোমড় বন্ধনীর সঙ্গে ঝুলিয়ে কামান দুটো বসায় গাঁয়ের প্রবেশপথে। ইউনিফর্ম পরায় সাবেক ছাত্রদের আর আগুন ঝরানো ঘোষনায় খেপিয়ে তুলে অস্ত্রসহ নামিয়ে দেয় তাদের রাস্তায় যাতে করে বাইরের লোকজন বুঝতে পারে যে শহরটা দুর্ভেদ্য। ধোঁকাটা দুরকম ফল নিয়ে আসে ওদের জন্য। কারণ দশমাস যাবৎ সরকার প্লাজা আক্রমণের সাহস করে না। কিন্তু যখন করে তখন ওদের তুলনায় এতই বড় এক বাহিনী পাঠায় যে আধঘন্টার মধ্যে ধংস করে ফেলে প্রতিরোধটা। কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রথমদিন থেকেই আদেশ করার প্রতি টান দেখা যায় আর্কাদিওর ভিতরে। মাথার মধ্যে কোনো আদেশের চিন্তা খেলে গেলে দিনে চারবার করে পড়ে শোনাতো সেটা। আঠারো বছর বয়সের বেশী বয়স্ক লোকদের জন্য সামরিক বাহিনীতে যোগদান বাধ্যতামূলক করা হয়, সন্ধ্যা ছটার পর রাস্তায় জীবজন্তু ঘুরে বেড়ালে সেটাকে জনসাধারনের সম্পত্তি বলে গন্য হবে বলে জানায় আর বৃদ্ধদের বাধ্য করে বাহুতে লাল ফিতে বাঁধতে। মৃত্যুদন্ডের ভয় দেখিয়ে ফাদার নিকানোরকে পাত্রীদের ঘড় থেকে বের হতে, আর কোনো রকমের উপদেশ দেওয়া নিষিদ্ধ করে। অবৈধ করা হয় উদারপন্থিদের বিজয় উৎসব ছাড়া অন্য কোনো কারণে গির্জার ঘন্টা বাজানোও। যাতে করে কারও মনে তার আদেশের গুরুত্ব নিয়ে সন্দেহ না জাগে। সে ফায়ারিং স্কোয়াডের সৈন্যদের আদেশ করে প্লাজায় এক কাকতাড়ুয়া বানিয়ে ওতে গুলি করার জন্য। প্রথম দিকে কেউ ওর আদেশের তেমন গুরুত্ব দেয় না। ওরা ভাবছিল, আসলে এরা হচ্ছে স্কুলের বাচ্চা, বড়দের খেলা খেলছে। কিন্তু এক রাতে আর্কাদিও কাতারিনোর দোকানে ঢোকার সময় ঢোলবাদক আনুষ্ঠানিক বাজনা বাজিয়ে তাকে অভ্যর্থনা জানালে খরিদ্দারদের মধ্যে হাসির রোল ওঠে, আর কর্তৃপক্ষের প্রতি অসম্মান দেখানোর অপরাধে আর্কাদিওর আদেশে গুলি করে মেরে ফেলা হয় তাকে। যারা এর প্রতিবাদ করে তাদের গোড়ালিতে বেড়ি পরিয়ে রুটি আর পানি দিয়ে স্কুলের এক কামরায় আটক করা হয়। “তুই এক খুনী” উরসুলা চেঁচাত, যখন নতুন কোনো বিচারের কথা তার কানে যেত- “যখন আউরেলিয়ানো জানতে পারবে তখন তোকে গুলি করে মারবে আর তাতে সকলের আগে আমিই খুশী হব।” কিন্তু এসব কিছুই বৃথা যায়। আর্কাদিও অকারণেই শাষনযন্ত্রের সমস্ত স্ক্রুগুলোকে এমনভাবে টাইট করতে থাকে যে সে হয়ে ওঠে মাকন্দোর শাষকদের মধ্যে নিষ্ঠুরতম। “এখন উপভোগ কর তফাতটা”- দন আপলিনার মসকতে এক সময় বলে। “এই হচ্ছে উদারপন্থিদের স্বর্গ।” আর্কাদিও জানতে পারে কথাটা। পাহারাদারদের সামনেই হামলা চালায় দন আপলিনারের বাড়িতে। ধ্বংস করে সমস্ত আসবাবপত্র। মেয়েদের ধরে পেটায় আর টানা-হেঁচড়ার দাগ রেখে যায় দন আপলিনার মসকতের শরীরে। যখন আর্কাদিও নিজে দাড়িয়ে ফায়ারিং স্কোয়াডকে গুলির হুকুম দিচ্ছে তখন লজ্জায় কাঁদতে কাঁদতে আর ক্রোধে গালাগালি করতে করতে হাতে পিচ্ মাখানো চাবুক নিয়ে সমস্ত গ্রাম পার হয়ে ব্যারাকের উঠানে ফেঁটে পরে উরসুলা। “গুলির হুকুম কর, দেখি তোর কত সাহস, বেজন্মা।” – চিৎকার করে। আর্কাদিওর কোনো প্রতিক্রিয়ার আগেই প্রথম চাবুক গিয়ে পরে ওর উপর। “সাহস করে দেখ, -খুনি”-চিৎকার করে-“ আর আমাকেও মেরে ফেল, নষ্টা মায়ের ছেলে- মেরে ফেল আমাকে যাতে করে এমন এক দানবকে লালন করে বড় করার লজ্জায় কাঁদার চোখ না থাকে” দয়াহীন ভাবে চাবুক মেরে তাকে, অনুসরণ করে উঠানের শেষ মাথা পর্যন্ত, যেখানে আর্কাদিও গুটিয়ে যায় এক শামুখের মত। দন আপলিনার মসকতে জ্ঞানশূন্য হয়ে আটকানো ছিল এক খুঁটির সঙ্গে যেখানে বাধা ছিল ফায়ারিং স্কোয়াডের প্রশিক্ষণের সময়ে গুলি করে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে ফেলা কাকতাড়ুয়াটা। উরসুলা ওদের উপরও রাগ ডেলে দেবে এই ভয়ে ফায়ারিং স্কোয়াডের ছেলেগুলো উধাও হয়ে যায়। কিন্তু উরসুলা ওদের দিকে ফিরেও তাকায় না। ছোঁড়া ইউনিফর্ম, ব্যাথা আর ক্রোধে গোঙানো আর্কাদিওকে রেখে দন আপলিনার মসকতের বাঁধন খুলে দেয় বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য । ব্যারাক পরিত্যাগের আগেই ব্যারাকের বেড়ির বন্দীদেরও মুক্তি দেয় সে।

সেই সময় থেকে সেই ছিল, যে গ্রামটাকে চালাতো। রোববারের ধর্মোপাসনা আবার প্রতিষ্ঠিত হল, বাজুতে লাল ফিতে বাধার নিয়ম তুলে ফেলা হল, আর পরিহার করা হল খামখেয়ালিপূর্ণ আদেশগুলো। কিন্তু তার এই শক্তিমত্তা সত্ত্বেও খারাপ নিয়তির কারণে কাঁদত সবসময়ই । সে এতই নিঃসঙ্গ বোধ করত যে চেষ্টনাটের সঙ্গে বাঁধা সকলের ভুলে যাওয়া স্বামীর কাছে নিস্ফল সান্নিধ্য খুঁজে বেড়াত। “দেখ আমাদের কি অবস্থা হয়েছে”- স্বামীকে বলে যখন জুন মাসের বৃষ্টিপাত ছাউনিটাকে ধ্বংস করার হুমকি দিচ্ছে। “শূন্য বাড়িটা দেখ, ছেলেমেয়েরা ছড়িয়ে পরেছে সাড়া দুনিয়া জুড়ে আর আমরা দুজন আবার একা হয়ে গেছি সেই প্রথম দিককার মত।” চেতনাহীন গভীরে ডুবে থাকা হোসে আর্কাদিওর কানে এই বিলাপের কিছুই পৌঁছুতো না যে তার পাগলামীর প্রথমদিকে হঠাৎ উচ্চারিত লাতিন শব্দে নিত্য জরুরী প্রয়োজনীয় কিছু জিনিষের কথা জানাতো। সাময়িকভাবে উদ্ভ্রান্তির অবস্থায় যখন আমারান্তা খাবার নিয়ে আসত তথন তাকে জানাতো সবচেয়ে যন্ত্রনাদায়ক মনস্তাপের কথা আর পরে সুবোধ ছেলের মত তাকে সরষের পুলটিপ মাখাতে আর শোষন পাম্পের সাহায্যে পরিচর্যার সুযোগ দিত। কিন্তু উরসুলা যখন তার কাছে বিলাপ করার জন্য গিয়েছে সে তখন বাস্তবের সঙ্গে সমস্ত সংসর্গ হারিয়ে ফেলেছে। উরসুলা তাকে গোছল করাত টুলের উপর বসিয়ে দেহের এক একটা অংশ আলাদা করে ধোয়ার মাধ্যমে। “চারমাসের বেশী হল আউরেলিয়ানো যুদ্ধে গিয়েছে। আর এখনও ওর ব্যাপারে আমরা আর কিছুই জানতে পারিনি। বলত সাবান মাখানো এক ছোবা দিয়ে পিঠ ডলতে ডলতে। “হোসে আর্কাদিও ফিরে এসেছে, তোর চেয়ে লম্বা এক পুরুষ হয়ে, তার সাড়া দেহ উল্কি দিয়ে ঢাকা, কিন্তু শুধুই এসেছে বাড়ির জন্য লজ্জা বয়ে আনতে”। তার মনে হয় খারাপ সংবাদ শুনে তার স্বামী বিষন্ন বোধ করে। সুতরাং সে মিথ্যা বলে “আমার কথা বিশ্বেস করো না।” আর এগুলো বলতে বলতে কোদাল দিয়ে তুলে ফেলার জন্য স্বামীর বিষ্ঠা ছাই চাপা দেয়। “ঈশ্বর চেয়েছেন যে হোসে আর্কাদিওর আর রেবেকার বিয়ে হোক। এখন তারা খুব সুখী” এতই অকৃত্রিমতার সাথে সে এই প্রবঞ্চনাগুলো করতে থাকে যে শেষ পর্যন্ত নিজেই নিজেকে এই মিথ্যের মাধ্যমে স্বান্তনা দিত। “আর্কাদিও এখন খুব নিষ্ঠাবান, আর সাহসী । তলোয়ার আর ইউনিফর্মসহ তাকে খুব সুপুরষ দেখায়।” এগুলো ছিল এক মৃতকে কথা বলার মত। হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া তখন সবধরনের উৎকন্ঠার নাগালের বাইরে ছিল। কিন্তু উরসুলা অনঢ় থাকে আর তার সঙ্গে কথা বলেই চলে। তাকে এতই শাশ্বত, সবকিছু সমন্ধে এতই নিরাশক্ত মনে হত যে উরসুলা বাধন খুলে দেবার সিদ্ধান্ত নেয়। সে এমনকি টুল থেকে নড়েও না। রোদ আর বৃষ্টি থেকে অরক্ষিত অবস্থায় বসে থাকে যেন দড়িগুলোর কোন প্রয়োজনই ছিল না। কারণ দৃশ্যমান যে কোনো বাধনের থেকেও এক অমোঘ কর্তৃত্ব যেন তাকে বেধে দিয়েছে চেষ্টনাট গাছের সঙ্গে। আগষ্ট মাসের দিকে শীত চিরস্থায়ী হতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত উরসুলা ওকে এক খবর দিতে পারে, যেটাকে মনে হয় বিশ্বাস্য । “দেখ, সৌভাগ্য এখনও আমাদের সঙ্গে আছে” – বলে- “আমারান্তা আর পিয়ানোলার ইতালীয় বিয়ে করতে যাচ্ছে।”
——————————-

আর্হেন্তিনার বুয়েনোস আইরেস-এর
এদিতোরিয়াল সুদামেরিকানা প্রকাশনী থেকে
প্রকাশিত ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’ উপন্যাসের
প্রথম সংস্করণের প্রচ্ছদ

——————————-
border=0

সত্যিই উরসুলার ছত্রছায়ায় পিয়েত্র ক্রেসপি আর আমারান্তার বন্ধুত্বের গভীরত্ব বেড়েছে, আর এখন সে আর সাক্ষাতের সময় পাহারার প্রয়োজন মনে করে না। এটা ছিল এক গোধুলিবেলার মিলন। ইতালীয় চলে আসত বিকেলে, বাটনহোলে এক গার্ডেনিয়া নিয়ে। আর আমারান্তা পেত্রার্কের সনেটের অনুবাদ করত। অরেগানো (এক ধরনের সুগন্ধিযুক্ত রান্নায় ব্যবহৃত পাতা) আর গোলাপের দমবন্ধ করা বারান্দায় বসে পিয়েত্র বই পড়ত, আর আমারান্তা উল বুনে চলত যুদ্ধের উল্লেখযোগ্য এবং খারাপ খবরে বিচলিত না হয়ে যতক্ষণ পর্যন্ত না মশারা বাধ্য করত বসার ঘড়ে গিয়ে আশ্রয় নিতে। আমারান্তার সংবেদনশীলতা, তার গোপন কিন্তু বাধনে জড়ানোর কোমলতা প্রেমিককে ঘিড়ে ফেলত এক অদৃশ্য মাকড়শার জাল দিয়ে আর প্রায় আক্ষরিক অর্থেই সেই জাল পাণ্ডুর আংটিবিহীন হাত দিয়ে সরিয়ে আটটার সময় বাড়ি ত্যাগ করতে হত ইতালিয়কে। ইতালি থেকে যে সব পোষ্টকার্ড পিয়েত্র ক্রেসপি পেত সেগুলি দিয়ে সে তৈরী করেছিল চমৎকার এক এ্যালবাম। ওগুলো ছিল নির্জন পাকে দয়িতাযুগলের ছবি, তীরবিদ্ধ আঁকা হৃদয় আর কবুতরের ঠোঁটে ঝোলা সোনালী ফিতে।

“আমি ফ্লোরেন্সের এই পার্কে গিয়েছি”- পোস্টকার্ডের পাতা উল্টাতে উল্টাতে বলত পিয়েত্র ক্রেসপি । “যে কেউ হাত বাড়িয়ে দিলেই পাখিরা নেমে আসে খাবার খেতে” । মাঝে মাঝে ভেনিসের এক জলরঙা ছবির সামনে স্মৃতিকাতরতা বদলে দিত কাদা আর পচা সামুদ্রিক মাছের গন্ধকে এক কোমল ফুলের সুবাসে । আমারান্তা দীর্ঘশ্বাস ফেলত, হাসত আর স্বপ্ন দেখত সুন্দর সব নরনারীর, দ্বিতীয় জন্মভুমির, যেখানে সকলেই শিশুর মত কথা বলে আর স্বপ্ন দেখত প্রাচীন শহরের যে শহরের প্রাচীন বিপুলতার মধ্যে অবশিষ্ট আছে ধংসস্তুপের মাঝে শুধুমাত্র কিছু বিড়াল । মহাসাগর পেরিয়ে রেবেকার তীব্র আবেগমথিত হাতের আদরে বিভ্রান্ত পিয়েত্র ক্রেসপি খুঁজে পায় সত্যিকার ভালবাসা । ভালবাসা নিয়ে আসে সমৃদ্ধিকে তার সঙ্গে করে । তার গুদামঘরের আয়তন ছিল প্রায় এক ব্লক আর সেটা যেন ছিল উদ্ভট উদ্ভাবনার গ্রীন হাউস । সেখানে ছিল ফ্লোরেন্সের ঘন্টা ঘরের প্রতিরূপ, যেটায় প্রতি ঘন্টায় বাজে কী-বোর্ডের ঐকতান, সরেন্টোর মিউজিক্যাল বক্স, চাইনীজ পাউডারের বাক্স যার ঢাকনা খুললেই পাঁচটি স্বরের বাজনা বেজে ওঠে । কল্পনা করা যায় এমন সব বাদ্যযন্ত্র যা প্যাঁচ দিয়ে চালানো যায়। জোগার করা যায় এমন সব যান্ত্রিক জিনিসপত্রে ভরা ছিল সেটা। ছোট ভাই ব্রুনো ক্রেসপি বসতো গুদামঘরে, কারণ গানের স্কুলটাকে দেখাশোনা করার পর সে আর সময় করে উঠতে পারত না । ওর বদৌলতেই তুর্কদের রাস্তাটা আর্কাদিওর স্বেচ্ছাচারিতা আর যুদ্ধের দূরবর্তী দুঃস্বপ্ন ভুলে গিয়ে রূপান্তরিত হয় এক চোখধাঁধানো নানা জিনিসের প্রদর্শনী আর শান্ত সুরেলা জায়গায় ।

উরসুলা যখন রোববারের উপাসনাকে পুনর্বার আরম্ভ করে, পিয়েত্র ক্রেসপি তখন গীর্জায় দান করে জার্মানীর তৈরী এক হারমোনিয়াম । গড়ে তোলে শিশুদের দিয়ে এক কোরাসের দল, আয়োজন করে এক গ্রেগরিয়ান রেপাটরি যেটার সুর ফাদার নিকানোরের নিরস ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এনে দেয় উজ্জলতা । আমারান্তা যে এক সুখী স্ত্রী হবে এ ব্যাপারে কারোরই কোন সন্দেহ থাকে না । আবেগকে তাড়া না দিয়ে হৃদয়ের স্বাভাবিক স্রোতে যেতে যেতে ওরা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে শুধুমাত্র বিয়ের দিনটা স্থির করা বাকি থাকে । কোন বাঁধারই সম্মুখীন হয় না তারা । উরসুলা গোপনে নিজেকে দোষী ভাবত বার বার রেবেকার বিয়ে বিলম্বিত করে ওর নিয়তিকে বিগরে দেবার জন্য। আর তাই নিজের অনুশোচনাকে সে আর বাড়াতে চায় না । যুদ্ধের নিগ্রহ, আউরেলিয়ানোর অনুপস্থিতি, আর্কাদিওর বর্বরতা, হোসে আর্কাদিও আর রেবেকার বিতারন এ সবই রেমেদিওসের মৃত্যুশোককে এক গৌণ অবস্থানে সরিয়ে দেয় । বিয়ের দিন ঘনিয়ে আসার সম্ভাবনায় পিয়েত্র ক্রেসপি নিজেই আভাস দেয় যে আউরেলিয়ানো হোসেকে, যার প্রতি তার পিতৃসুলভ ভালবাসা জন্মেছে, তাকে নিজের বড় সন্তানরুপে গন্য করবে । সমস্ত কিছুই আমারান্তার জীবনে এক বাধাহীন সুখের নির্দেশনা দেয় । রেবেকার চেয়ে আমারান্তা হচ্ছে একেবারেই উল্টো। সে বিয়ের ব্যাপারে কোন উৎকণ্ঠাই দেখায় না । যেরকম ধৈর্য সহকারে সে টেবিল ক্লথে রঙ ছাপাতো, করত লেসের কাজ বা এম্ব্রয়ডারী করত ময়ুরের, ঠিক একই ধৈর্য নিয়ে অপেক্ষা করে সেই মুহূর্তের জন্য যখন পিয়েত্র ক্রেসপি তার হৃদয়ের তীব্র আবেগ আর সহ্য করতে পারবে না । সেই মুহূর্ত এল অক্টোবরের কুলুক্ষুণে বৃষ্টির সঙ্গে । পিয়েত্র ক্রেসপি কোল থেকে সেলাইয়ের ঝুড়িটা সরিয়ে দিয়ে আমারান্তার হাত নিজের হাতে নিয়ে চাপ দেয় । “এই অপেক্ষা আর সহ্য করতে পারছি না”।– ওকে বলে “আমরা আসছে মাসেই বিয়ে করছি” আমারান্তা ওর বরফশীতল হাতের স্পর্শে কেপে ওঠে না । এক পলায়নপর জন্তুর মত হাতটা সরিয়ে নেয় আর আবার যা করছিল তা আরম্ভ করে । “ছেলেমানুষি করো না ক্রেসপি” হাসে সে- “মরে গেলেও আমি তোমাকে বিয়ে করছি না”
(চলবে)

কিস্তি-১ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৩ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৪ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৫ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৬ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৭ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৮ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৯ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১০ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১১ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১২ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৩ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৪ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৫ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৬ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৭ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com