মাতৃভাষায় দখল ও সুফল প্রসঙ্গে

শামীম সিদ্দিকী | ১৫ মার্চ ২০১৫ ১০:৫৩ অপরাহ্ন

সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে মানুষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ যোগ্যতা তার ভাষা। অন্যান্য জীবেরও ভাষা আছে, কিন্তু তার তুলনায় মানব-ভাষার বৈচিত্র্য, গভীরতা আর বহুমাত্রিক শ্রেষ্ঠত্ব অপরিমেয়। ভাষার মাধ্যমেই অনাদিকাল ধরে মানুষ তার অভিজ্ঞতা-জ্ঞান প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে দিতে পেরেছে; গড়ে তুলতে পেরেছে গৌরবময় সমুন্নত সভ্যতা। পারস্পরিক যোগাযোগ থেকে শুরু করে মানবজীবনের সর্বস্তরে ভাষা, প্রধানত মাতৃভাষার গুরুত্ব ও মহিমা তাই বর্ণনা করে শেষ করা যাবে না।

আমাদের অসামান্য গৌরব যে, আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। পৃথিবীর বিপুল সংখ্যক মানুষ আজ বাংলা ভাষাভাষী। অন্যতম আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার বিষয়টি বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে আজ আর কল্পনামাত্র নয়, বরং এর বাস্তব ও বিজ্ঞানসম্মত কার্যকারণ রয়েছে। জাতি-রাষ্ট্র-ভাষা এই তিনের মেলবন্ধনে বাংলাদেশই বিশ্বব্যাপী বাংলা ভাষা সুবিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠবে, ধারণা করা যায়। মাতৃভাষার অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার গৌরব যেমন ঐকান্তিকভাবে আমাদের, তেমনি সে গৌরবের সমগ্রপ্রসারী প্রতীক সুমহান একুশে ফেব্রুয়ারি আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসরূপে মানব সভ্যতার অহংকারেরও অংশ।

কাকতালীয় হলেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ যে, বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান কবি, আধুনিকতার স্থপতি মাইকেল মধুসূদন দত্ত ঊনবিংশ শতকে ভাষাপ্রেমের মাধ্যমেই স্বদেশপ্রেমের সূত্র এবং প্রেরণা পেয়েছিলেন; বিংশ শতকের মাঝামাঝি আমরাও এই ভাষা আন্দোলনের সূত্র ধরেই মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ অর্জন করতে পেরেছি। সঙ্গত কারণেই মাতৃভাষা বাংলার বিপুলমাত্রিক গুরুত্ব ও গভীরতা অনুধাবনের প্রচেষ্টা বজায় রাখা আমাদের কর্তব্য। হাজার বছরের সাহিত্য-সংস্কৃতি-ইতিহাস, কতো কাব্য-গাথা, সৃষ্টিশীল-মননশীল মনীষীদের অপরিমেয় সাধনার ঐশ্বর্যময় দানে-অবদানে কালের বিবর্তনে আমরা একটি গৌরবময় পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছি। যতো দিকে যতো চিন্তাই করি অনাগতকালের দাবী পুরণ করে বিশ্বসভায় বাংলাদেশের গৌরব সমুন্নত রাখতে, এমনকি আরও বেশি উচ্চকিত করতে বাংলাভাষার অমৃত-সূত্রটিকে হৃদয়ের মণিকোঠায় গভীরভাবে আঁকতে হবে আমাদের। জীবনের যে কোন ক্ষেত্রেই হোক, গভীর বিশ্লেষণী মন নিয়ে চিন্তা করলে সাফল্য ও উৎকর্ষ লাভের সোপান হিসেবে মাতৃভাষা বাংলার অপরিহার্য প্রয়োজনীয়তা ও সবিশেষ গুরুত্ব অনুধাবন করা সম্ভব। এমনকি জ্ঞান বিজ্ঞানের সকল শাখায় মাতৃভাষা চর্চার সুফল কি হতে পারে এ সংক্রান্ত সূত্রসমূহ চিহ্নিত করার চেষ্টা করা প্রয়োজন। নানামুখী উন্নতির বাতাবরণে জাতীয় জীবনে বাংলাভাষা আমাদের যে আরও বেশি সুদৃঢ়, আরও বেশি অবিচল ও শক্তিশালী সাফল্যের ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করতে পারে, এ বিষয়ক চিন্তা এবং তন্বিষ্ঠ গবেষণাকাজ পরিচালনা করা আজ অত্যন্ত জরুরী হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জ্ঞানের চূড়ান্ত ও মৌলিক প্রকাশ ঘটে ভাষায়। যে কোন ক্ষেত্রেই হোক জ্ঞান অর্জনের তাৎপর্যপূর্ণ বহিঃপ্রকাশ ভাষার মধ্যেই প্রতিফলিত হয়। আধুনিক ও সর্বসাম্প্রতিক জ্ঞানচর্চায় দেশে এবং দেশের বাইরে বাংলাদেশের অনেক অনেক মেধাবী মানুষ স্ব স্ব ক্ষেত্রে লব্ধপ্রতিষ্ঠ ও নিবেদিত রয়েছেন। এই ধারা আগামী দিনে আরও বিকশিত হবে, এমনটাই আশা করা কাম্য ও কাক্সিক্ষত। আমাদের আজ ভেবে দেখতে হবে নিজ নিজ ক্ষেত্রে অর্জিত যোগ্যতার পাশাপাশি বাংলাভাষায়ও আপন উৎকর্ষ সমুন্নত হলে একই ব্যক্তির জ্ঞান এবং মেধাবৃত্তিক অর্জন আরও বেশি শাণিত হওয়ার ধারণাটি প্রকৃত অর্থেই যুক্তিসঙ্গত ও বিজ্ঞানসম্মত কি-না। বিজ্ঞানসম্মত বিবেচিত হলে অনুসন্ধান এড়িয়ে না গিয়ে মাতৃভাষায় উপযুক্ত সামর্থ অর্জন করার বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। সে ক্ষেত্রে বিভিন্ন শাখায় নিবেদিতপ্রাণ আমাদের মেধাবী ও সৃষ্টিশীল মানুষদের নিজস্ব অর্জন ও অবদান আরও বেশি প্রখরতা পাওয়ার সুযোগ যেমন বেড়ে যায়, তেমনি তাদের গৌরবজনক অর্জন বাংলা ভাষার জ্ঞানভাণ্ডারকেও সমভাবে ঋদ্ধ করতে পারে। এ সংক্রান্ত উপযুক্ত অনুসন্ধান আগামী দিনে সর্বক্ষেত্রে বাংলাভাষার প্রয়োগ সংক্রান্ত বিবেচনার বিষয়ে যুগান্তকারী সম্ভাবনার সৃষ্টি করতে পারে।

প্রাত্যহিক যোগাযোগে যেমন, তেমনি জ্ঞানচর্চা, আত্ম-আবিস্কার, যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলা, ইতিহাস-সংস্কৃতি সম্পর্কে জানা সবকিছুরই অন্যতম মৌলিক মাধ্যম বস্তুত ভাষা। বিশেষ করে দেশপ্রেমের ধারণাটি ভাষার সাথে ওতপ্রোত বিজড়িত। বিভিন্ন শাখায় আমরা যে বিশেষায়িত দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করি, পেশাগত দিক থেকেও তার অনেক অনেক প্রকরণ রয়েছে। এ কথাও সত্যি যে আমাদের একজন বিজ্ঞানী বাংলাদেশের সম্পদ–একজন চিকিৎসক, প্রকৌশলী বা যে কোন বিশেষায়িত ক্ষেত্রেই হোন, তিনি দেশেরই সম্পদ। দেশ এবং মানুষের জন্যে তাদের নিরন্তর অবদান অসামান্য। মাতৃভাষায় সন্তোষজনক দখল থাকলে সমাজে গুরুত্বপূর্ণ সকল নাগরিকের দেশ এবং মানুষের প্রতি দরদ ও নিবেদনের মাত্রা আরও খানিক বেড়ে যাবে সন্দেহ নেই। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে লব্ধপ্রতিষ্ঠ ব্যক্তিবর্গের মধ্যে আপন ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে উপযুক্ত শ্রদ্ধাবোধ ও গভীর দখল থাকার নজির আমরা পর্যবেক্ষণ করতে পারি। আমাদেরও আজ সময় এসেছে সকল শাখার সকল মানুষের মধ্যে মাতৃভাষা, মাতৃভূমি এবং মানুষের প্রতি উপযুক্ত দরদ ও অঙ্গীকার যেন গড়ে তুলতে পারি। আর্থ-সামাজিক প্রতিপত্তি আমাদের কাউকে যেন এমন মূঢ়তায় তাড়িত না করে যে, আমরা মাতৃভাষার মহিমার প্রতি অবজ্ঞা করে বসি কিংবা আচরণে উন্নাসিকতা দেখাই। মাতৃভাষার প্রতি অবহেলা মানুষকে দেশপ্রেম এমনকি মানবপ্রেমের প্রেরণা থেকেও বিচলিত করে আত্মকেন্দ্রিক-স্বার্থপর করে তুলতে পারে। সকল ক্ষেত্রে বাংলাভাষা প্রয়োগের সুফল পেতে হলে সকল শ্রেণি-পেশার প্রতিষ্ঠিত মানুষদের মধ্যেই বাংলা ভাষায় প্রণিধানযোগ্য দখল থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। জ্ঞানচর্চার বিভিন্ন শাখায় মাতৃভাষায় দখল সৃষ্টির সম্পূরক প্রক্রিয়া ও উপায় সম্বন্ধে আজ ভেবে দেখা প্রয়োজন। বলা বাহুল্য, কোন ভাষা সম্পর্কে সন্তোষজনক ধারণা পাওয়ার ক্ষেত্রে সেই ভাষার প্রধান প্রধান লেখকদের রচনা সম্পর্কেও ন্যূনতম জ্ঞান অর্জন অত্যাবশ্যক।
Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (3) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মুন খান — মার্চ ১৬, ২০১৫ @ ১০:০৪ পূর্বাহ্ন

      “কোন ভাষা সম্পর্কে সন্তোষজনক ধারণা পাওয়ার ক্ষেত্রে সেই ভাষার প্রধান প্রধান লেখকদের রচনা সম্পর্কেও ন্যূনতম জ্ঞান অর্জন অত্যাবশ্যক।” . . . সহমত শামীম ভাই ।

      সমোপযোগী আর্টিকেল দেওয়ার জন্য কবি’কে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই ।।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Dr. Binoy Barman — মার্চ ১৬, ২০১৫ @ ৬:১০ অপরাহ্ন

      শামীম সিদ্দিকী “মাতৃভাষায় দখল ও সুফল প্রসঙ্গে” প্রবন্ধে সাধারণভাবে ভাষার মহিমা বর্ণনা করেছেন এবং বিশেষভাবে মাতৃভাষা চর্চার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। সূতরাং এর মর্যাদা রক্ষা ও বিস্তারে আমাদের সকলকে সচেতনভাবে কাজ করে যেতে হবে। বন্ধুবর কবি শামীম সিদ্দিকীকে অসংখ্য ধন্যবাদ তার সুন্দর গদ্যপ্রয়াসের জন্য।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com