মিশেল ফুকোর

শৃঙ্খলা ও শাস্তি: জেলখানার জন্ম (কিস্তি ২)

অদিতি ফাল্গুনী | ২৯ december ২০০৭ ৯:৫৬ পূর্বাহ্ন

কিস্তি:

fk.jpg
মিশেল ফুকো (১৯২৬-১৯৮৪)

অনুবাদ: অদিতি ফাল্গুনী

(গত সংখ্যার পর)

খণ্ড ১ : নির্যাতন

প্রথম অধ্যায়: অভিযুক্তের দেহ

গত দু’শো বছরে শাস্তির তীব্রতা কমে আসার সাথে আইনের ইতিহাসবিদরা ভাল ভাবেই পরিচিত। দীর্ঘ সময়ের জন্য এই বিষয়টি কম নিষ্ঠুরতা, কম যন্ত্রণা, অধিকতর দয়া, অধিকতর সম্মান, অধিকতর ‘মানবতা’ এমন পরিমাণগত প্রপঞ্চ হিসেবে থেকেছে। আসলে এই পরিবর্তনগুলো শাস্তি পরিচালনার উদ্দেশ্যর ক্ষেত্রে এক ধরনের স্থানচ্যুতির প্রভাবে প্রভাবিত। এভাবে শাস্তির তীব্রতা কমেছে কি? হয়তো কমেছে। যেহেতু উদ্দেশ্যের কিছু পরিবর্তন সেখানে ঘটেছে।

শাস্তি তার তীব্রতম রূপেও শরীরকে আর লক্ষ্য না করলে কীসের উপর সে তার প্রভাব রাখবে?

boi_f.jpgতাত্ত্বিকদের অত্যন্ত সরল ও প্রায় প্রত্যক্ষ উত্তর হলো, ১৭৬০ সালের দিকে এক নতুন যুগের সূচনা করা হয়েছিল যা আজো শেষ হয়নি। এ প্রশ্নের উত্তর অবশ্য প্রশ্নেই নিহিত: শাস্তির লক্ষ্য আজ আর কোনোক্রমেই অপরাধীর শরীর নয়। লক্ষ্য তার আত্মা। অতীতে শাস্তি অপরাধীর শরীরকে লক্ষ্য করে দেওয়া হতো, আজ তা হৃদয়ের গভীরতাকে উদ্দেশ্য করে দেওয়া হবে। চিন্তা, ইচ্ছা ও প্রবণতাকে উদ্দেশ্য করে এই নতুন যুগের শাস্তি দেওয়া হয়ে থাকে। মেবলি এই নীতিকে একদা সবার জন্য প্রণয়ন করেছিলেন: “ আমি শাস্তি প্রদান করলে তা’ দেহ নয় বরং আত্মাকে আঘাত করবে। (মেবলি, ৩২৬ পৃ.)।”

এ ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। দেহ ও রক্ত, শাস্তির বধ্যমঞ্চের দুই পুরনো অংশীদার, সেই পথ ছেড়ে দিয়েছে। মুখোশপরা এক নতুন চরিত্র দৃশ্যে প্রবেশ করেছে। যেন কোনো বিয়োগান্তক কাহিনীর শেষ। ছায়া অভিনয়, মুখহীন কণ্ঠস্বর, স্পর্শাতীত যত সত্তা নিয়ে কমেডি শুরু হলো। শাস্তিমূলক বিচারের যন্ত্রপাতি এই অশরীরী বাস্তবতায় এখন নির্ঘাত কামড় বসাবে।

এমনটি হয়তো নিছকই কোনো তাত্ত্বিক প্রতীতীর বেশি কিছু নয়, শাস্তির অনুশীলন যার বিরোধিতা করে? এমন কোনো উপসংহার টানাটা একটু তাড়াহুড়া হয়ে যাবে। একথা সত্য যে শাস্তি প্রদান আজ কেবলমাত্র আত্মাকে শুদ্ধ ও রূপান্তরিত করার বিষয় নয়। মেবলির নীতি ধার্মিক ইচ্ছা হয়েই শুধু থাকে নি; বরং এর প্রভাব আধুনিক শাস্তি ব্যবস্থায় অনুভব করা যায়।

van_gogh.jpg
ভিনসেন্ট ভ্যান গখের ‘কয়েদীদের চক্কর’

শুরুর কথা বলতে গেলে, উদ্দেশ্যের বিকল্প আছে। এর মাধ্যমে আমি বোঝাচ্ছি না কেউ কেউ হঠাৎ করেই অন্যান্য অপরাধের ক্ষেত্রে শাস্তি প্রদানের বিষয়টিকে আক্রমণ করেছেন। নিঃসন্দেহে গত ২০০ বছরে অপরাধের সংজ্ঞা, অপরাধের তীব্রতার উচ্চক্রম, অপরাধকে প্রশ্রয় দানের প্রান্ত, অতীতে অপরাধ কোনো মাত্রা পর্যন্ত এবং আইনগত ভাবে কতখানি সহ্য করা হতো…এ সবকিছুই লক্ষণযোগ্য ভাবে বদলে গেছে; অনেক অপরাধকেই আজ আর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয় না । একজাতীয় ধর্মীয় কর্তৃত্বের চর্চা বা কোনো বিশেষ ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে সংযোগের কারণেই আসলে এদের অতীতে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হতো। ঈশ্বরনিন্দা অপরাধ হিসেবে আগের মতো গুরুতর মাত্রা আর পায় না; চোরাচালান বা ছিঁচকে চুরি আগের মতো কর্ঠিন অপরাধ হিসেবে আর দেখা হয় না। কিন্তু, অপরাধের এই স্থানচ্যুতিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা নয়: সিদ্ধ ও নিষিদ্ধের ভেতরের বিভাজন এক শতাব্দী হতে অপর শতাব্দীতে ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। অন্যদিকে, ‘অপরাধ’, দণ্ডমূলক ব্যবহারের উদ্দেশ্য, গভীরভাবে বদলে গেছে। বদলে গেছে এর গুণ ও প্রকৃতি। এক অর্থে শাস্তির আনুষ্ঠানিক সংজ্ঞা যাই হোক, শাস্তির সারবস্তু বা যা দিয়ে শাস্তিযোগ্যতার উপকরণ তৈরি হয়, তা গভীর ভাবেই বদলে গেছে। আইনের আপেক্ষিক স্থিরতার গোপনীয়তার ভেতর দিয়েই সুতীক্ষ্ণ ও দ্রুত কিছু পরিবর্তন ঘটে গেছে। নিঃসন্দেহে ‘অপরাধ’ বা ‘অন্যায়’ বলতে আইনী পরিভাষায় সংজ্ঞায়িত বিচার সম্পর্কিত বিষয়াদিই বোঝানো হয়ে থাকে যাকে কেন্দ্র করে বিচারের রায় দেওয়া হয়। কিন্তু আবেগ, প্রবৃত্তি, অস্বাভাবিকতা, দুর্বলতা, অভিযোজনগত সমস্যা, পরিবেশের প্রভাব অথবা বংশগতি এসব বিষয় বিবেচনা করেও অনেক সময় বিচারের রায় প্রদান করা হয়; আগ্রাসনমূলক অপরাধের শাস্তির আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের শাস্তি হয়ে থাকে; ধর্ষণের শাস্তি একইসাথে বিকৃতির শাস্তি ; খুনের শাস্তি একইসাথে তাড়না ও বাসনার শাস্তি। কিন্তু, এই যুক্তি তোলা যেতে পারে বিচারের রায় বস্তুতঃ অপরাধের অন্তর্নিহিত কারণ বিবেচনা করে দেওয়া হয় না; অপরাধ সঙ্ঘটনের পেছনের কারণগুলো উল্লেখ করা হলে তা সাধারণতঃ যে বিষয় নিয়ে মামলাটি চলছে সেই বিষয়কে ব্যাখ্যা করার জন্যই করা হয়ে থাকে। পাশাপাশি, এই অপরাধ সঙ্ঘটনে অপরাধকর্তার ইচ্ছা কতটা জড়িত ছিল তা’ নির্ণয় করতেও অপরাধের কারণগুলো উল্লেখ করা হয়। অবশ্য এ কোনো উত্তর নয় বা উত্তর হতে পারে না। তা’ হলো মামলার পেছনে ওঁৎ পেতে থাকা সেই সব ছায়া যাদের বিচার করা হয় এবং শাস্তি দেওয়া হয়। পরোক্ষভাবে এই ছায়াগুলোকেই অপরাধের মাত্রা লাঘবকারী ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হয় যা বিচারের রায়ে শুধুমাত্র আনুষঙ্গিক সাক্ষ্যই উপস্থাপন করে না, বরং সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত করে, যা আইনগত ভাবে বিধিবদ্ধ করা সম্ভব নয়: অপরাধী সম্পর্কে জানাশোনা, কারো নিজের সম্পর্কে আন্দাজ, অপরাধী, অপরাধীর অতীত এবং তার কৃত অপরাধের ভেতর সম্পর্ক এবং ভবিষ্যতে তার কাছ থেকে কী প্রত্যাশা করা যেতে পারে ইত্যাদি। উনিশ শতক থেকে চিকিৎসাশাস্ত্র এবং মানবিক আইনবিজ্ঞান (জুরিসপ্র“ডেন্স)-এর ভেতর সঞ্চালিত বিভিন্ন ধারণার আন্তঃক্রিয়া (গর্গ্যের সময়ে অপরাধীদের ‘দৈত্য’ বলা হতো, শোমিয়ে অপরাধীদের ‘শারীরিক অসঙ্গতিসম্পন্ন’ মনে করতেন, আমাদের সময়ের বিশেষজ্ঞরা তাদের ‘বিকৃতমনষ্ক’ বা ‘অনভিযোজিত’ ইত্যাদি আখ্যায় ভূষিত করেছেন) অপরাধীদের সংজ্ঞায়িত করেছে। এ যেন কোনো আচরণকে ব্যাখ্যার ছদ্মবেশে আসলে কোনো ব্যক্তিকে সংজ্ঞায়িত করারই উপায়। অপরাধীকে সেই বিশেষ শাস্তিতে দণ্ডিত করা হয় যা অপরাধীকে শুধুমাত্র “কাঙ্ক্ষিতই করে না বরঞ্চ আইনের কাঠামোর মধ্যে বসবাস এবং নিজের চাহিদা পূরণেও সক্ষম করে;” শাস্তির অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিও অপরাধীদের দণ্ড দেয়। এর মূল উদ্দেশ্য অপরাধের শাস্তি হলেও উদ্দেশ্যর মাঝে মাঝে বদল ঘটে (শাস্তির মেয়াদ কখনো সংক্ষিপ্ত আবার কখনো দীর্ঘ হয়)। যেমন, অপরাধী কতদিন জেলখানায় থাকবে তা’ জেলখানায় তার আচরণ অনুযায়ী পরিবর্তনসাপেক্ষ ; প্রতিটি শাস্তির সাথে জড়িত আছে কিছু “নিরাপত্তা ব্যবস্থা” যা অপরাধীকে দণ্ড দেয় (কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় ঢুকতে বাধা-নিষেধ, অবেক্ষণ (প্রবেশন), বাধ্যতামূলক চিকিৎসা ব্যবস্থা ইত্যাদি)। এই ‘নিরাপত্তা ব্যবস্থাগুলো’ অপরাধকে শাস্তি দিতে প্রণীত হয় না। বরং ব্যক্তিকে পর্যবেক্ষণ, তার মনের বিপজ্জনক অবস্থা প্রশমন, তার অপরাধী প্রবণতা বদলানো এবং বদলানোর পরও শাস্তি অব্যাহত রাখা। বিচার প্রক্রিয়ায় অপরাধীর আত্মা শুধুমাত্র তার অপরাধকে ব্যাখ্যা এবং মামলার শুনানিতে অপরাধের পেছনে তার দায় কতটুকু তা’ হিসাবের জন্যই নির্দেশিত হয় না; আদালতের সামনে এমনি জাঁক-জমকপূর্ণ পরিস্থিতিতে অপরাধীর আত্মা বিশ্লেষণ করা হয়, অপরাধীর আত্মাকে বোঝার জন্য এমন গভীর উদ্বেগ ও ‘বৈজ্ঞানিক’ প্রয়োগবিধি উপস্থাপন করা হয় যেন বা অপরাধীর আত্মা এবং অপরাধকে বিচার করতে হবে এবং তার আত্মাকেও শাস্তির ভাগ পেতে হবে। শাস্তি প্রদানের এ যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতার ভেতর দিয়ে, প্রাথমিক তদন্ত হতে রায় ঘোষণা এবং শাস্তির শেষ প্রতিক্রিয়া অবধি এলাকাটি এমন সব বস্তু দ্বারা প্রবিষ্ট হয়েছে যে এই এলাকার কাজ এখন শুধুমাত্র প্রতিলিপি তৈরি করা নয় বরং মামলার শুনানিতে সংজ্ঞায়িত ও বিধিবদ্ধ বস্তুগুলোর সংযোগ ছিন্ন করাও তার কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মনস্তাত্ত্বিক দক্ষতা এবং আরো সাধারণ পরিসরে অপরাধ নৃ-তত্ত্ব এবং অপরাধবিজ্ঞানের পুনরাবৃত্তিমূলক ডিসকোর্স তাদের যথার্থ কার্যক্রম এখানে খুঁজে পেয়েছে: বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের প্রতি সংবেদনশীল বস্তুগুলোর রাজ্যে গম্ভীরভাবে অপরাধগুলোর নাম খোদাই করা ও আইনী শাস্তির কাঠামো গঠনের মাধ্যমে তারা শুধু অপরাধগুলোর উপর ন্যায্য দখল রাখে তা-ই নয়, ব্যক্তিবর্গের উপরও দখল রাখে। শুধুমাত্র তারা কী করে তা-ই নয়, বরং তারা কে, কে হবে, কে হতে পারে সেসব বিষয়ও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। অপরাধীর আত্মা নামক যে অতিরিক্ত বস্তুটির উপর আইনী ব্যবস্থা তার নিয়ন্ত্রণ রেখেছে, তা’ শুধুমাত্র আপাতঃগ্রাহ্যভাবে ব্যাখ্যাময় এবং সীমিত। আসলে বিষয়টি সম্প্রসারণবাদীও বটে। ১৫০ হতে ২০০ বছর ধরে যখন ইউরোপ তার নিজস্ব শাস্তি বা দণ্ড ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে, বিচারকরা ধীরে ধীরে বিচারের এমন এক পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করেন যাতে অপরাধ ব্যতীত বরং অন্য কিছু যেমন, অপরাধীর আত্মাকে বিচারের ব্যবস্থাই বরং প্রতিষ্ঠা করা হয়।

newgat5.jpg
১৭৮৩-র ৯ ডিসেম্বরে লন্ডনের নিউগেট-এ পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে ৯ পুরুষ ও ১ নারীকে ফাঁসীতে ঝুলিয়ে প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হচ্ছে।

এবং এই অপরাধীর আত্মা বিষয়ক কারণেই, বিচারকরা বিচারের রায় প্রদান ব্যতীত অন্য কাজ করা শুরু করেছেন। অথবা, আরো সংক্ষিপ্ত ভাবে বলতে গেলে, বিচারের এই বিচার সম্পর্কিত রীতিনীতির ভেতর অন্যান্য নানা প্রকৃতির মূল্যায়নও পদস্খলিত হয়ে ঢুকে পড়েছে এবং এর বিস্তৃতির নিয়মাবলী গভীরভাবে বদলে দিয়েছে। সেই মধ্যযুগ হতে ধীরে ধীরে এবং গভীর যন্ত্রণার সাথে তদন্তের বিশাল ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। বিচার করা হলো অপরাধের সত্যতাকে প্রতিষ্ঠিত করা, অপরাধের রচয়িতাকে খুঁজে বের করা এবং আইনী শাস্তি প্রদান করা। অপরাধ সম্পর্কে জ্ঞান, অপরাধী সম্পর্কে জ্ঞান, আইন সম্পর্কে জ্ঞান: এই তিনটি শর্ত কোনো বিচারকে সত্যকারের বিচার হতে সাহায্য করে। কিন্তু, দণ্ডমূলক বিচার প্রক্রিয়ায় সত্যের সম্পূর্ণ ভিন্ন এক প্রশ্ন নিহিত রয়েছে। প্রশ্নটি এখন আর শুধুমাত্র এমন নয়: “এই অপরাধটি কি অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি ও প্রতিষ্ঠা পেয়েছে এবং অপরাধটি দণ্ডযোগ্য কিনা?” বরং: “এই অপরাধটি কী? এই অপরাধটি কি কোনো সন্ত্রাসী তৎপরতা বা খুন?” ঠিক কোন স্তরের বা কোন ধরনের বাস্তবতার সাথে এই অপরাধ খাপ খায়? এ কি কোনো অলীক কল্পনা, কোনো মানসিক প্রতিক্রিয়া, কোনো মোহভঙ্গকারী পর্ব বা কোনো বিপথগামী কাজ? এ আর কোনোমতেই শুধুমাত্র ‘কে এই অপরাধ করেছে?’ বা ‘কীভাবে আমরা এ অপরাধের কারণ খুঁজে বের করার প্রক্রিয়াটি শুরু করতে পারি? অপরাধীর নিজের সত্তাতেই কি এই ঘটনা সূচীত হয়েছিল? প্রবৃত্তি, অচেতন, পরিবেশ বা বংশগতি? সবচেয়ে লাগসই পদক্ষেপ এখানে কী গ্রহণ করা যেতে পারে? আমরা অপরাধীর ভবিষ্যত উন্নতির ব্যাপারটাই বা কীভাবে দেখব? তাকে পুনর্বাসনের সেরা পন্থাটা কী?’ এজাতীয় প্রশ্নমালার সমাহার নয়। বরং, দণ্ডমূলক বিচারের রূপরেখায় অপরাধীকে কেন্দ্র করে মূল্যায়ণ, বিশ্লেষণ, কারণ নির্ণয়, পূর্বসূচক, মাননির্ধারক বা নিয়মাত্মক বিচারের সামগ্রিক দিকটি যথাযথ ভাবে জানানো হয়েছে।’ আইনী কাঠামোয় প্রয়োজনীয় এক ধরনের সত্যকে বিদ্ধ করেছে আর এক ধরনের সত্য: এক সত্য, যা প্রথম সত্যের সাথে জড়িত হয়ে, অপরাধের স্বীকৃতিকে কোনো অদ্ভুত বৈজ্ঞানিক-বিচার সম্বন্ধীয় জটিলতায় পরিণত করেছে। শাস্তিব্যবস্থার অনুশীলনে যেভাবে পাগলামির বিষয়টি দেখা হয়েছে তা’ যথেষ্ট উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ১৮১০ সালের আইন অনুসারে, শুধুমাত্র অনুচ্ছেদ ৬৪-’র আওতায় পাগলামির বিষয়টি দেখা হতো। এই অনুচ্ছেদ বর্ণনা করে অপরাধ সঙ্ঘটনের সময় অপরাধী মানসিক ভাবে অসুস্থ হয়ে থাকলে তাতে কোনো অপরাধ বা অন্যায় নেই। পাগলামি নির্ণয়ের সম্ভাবনা তাই অপরাধের সংজ্ঞা হতে সম্পূর্ণ পৃথক; অপরাধকারী পাগল বলে ঘটনা বদলে যাচ্ছে অথবা শাস্তির মাত্রা কমে যাবে শুধু তা-ই নয়, বরং খোদ অপরাধের ‘অস্তিত্ব’ই অবলুপ্ত হয়। তখন ঘোষণা করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায় যে একজন ব্যক্তি একইসাথে পাগল এবং অপরাধী; অপরাধীর পাগলামি নির্ণীত হলেই অপরাধকে আর মামলার আওতাভুক্ত করা হতো না; সাথে সাথে তা মামলার প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করতো এবং অপরাধীর উপর আইনের প্রভাব হাল্কা হয়ে যেত। অতীতে যখনই কোনো অপরাধীকে মানসিক ভাবে অসুস্থ বলে সন্দেহ করা হতো, তখনি সেই অপরাধীকে বাহ্যিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হতো। এই পরীক্ষা করতে হতো বিচারের রায় প্রদানের আগেই। কিন্তু, খুব দ্রুতই, উনবিংশ শতাব্দীর আদালতগুলো অনুচ্ছেদ ৬৪-’র অর্থকে ভুল বোঝা শুরু করলো। যদিও সুপ্রীম কোর্টের আপিলেট বিভাগের কতিপয় সিদ্ধান্তে নিশ্চিত করে বলা হয়েছে যে অপরাধীর পাগলামি মানেই শাস্তি লাঘব বা বেকসুর খালাস বোঝাবে না, তবু অপরাধী মানসিক ভাবে অসুস্থ হলে মামলাগুলো বাতিল হয়ে যেত এবং বিচারের রায় প্রদানের আগে সাধারণ আদালতগুলো মানসিক অসুস্থতার প্রসঙ্গটি সামনে নিয়ে আসতো। এই আদালতগুলো মেনে নিয়েছিল একজন ব্যক্তি একইসাথে অপরাধী এবং পাগল হতে পারে: একজন যত কম অপরাধী ততই বেশি সে পাগল; অপরাধী সে নিশ্চিত, কিন্তু একইসাথে সে এমন একজন ব্যক্তি যাকে শাস্তি প্রদানের পরিবর্তে বরং একপাশে সরিয়ে নিয়ে চিকিৎসা করা উচিত; সে শুধুমাত্র অপরাধী নয়, বরং বিপজ্জনক। যেহেতু সে অসুস্থ। দণ্ডবিধির দৃষ্টিকোণ হতে দেখলে, এর ফলাফল দাঁড়ালো বিচার সম্পর্কিত নানা উদ্ভটত্বের এক বিপুল দলা। কিন্তু, একইসাথে তা’ আইন ও জুরিসপ্রুডেন্সের বিবর্তনের সূচনা বিন্দু এবং এই বিন্দু হতে পরবর্তী ১৫০ বছরের নানা কার্যক্রম গৃহীত হবে: ইতোমধ্যেই ১৮৩২ সালের সংস্কার প্রচেষ্টা অসুস্থতার কিছু অনুমানযোগ্য মাত্রা বা আংশিক-উন্মাদনার প্রকরণ অনুযায়ী শাস্তিকে মার্জ্জনা করার পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল; এই পদক্ষেপ গৃহীত হয়েছিল কোন্ কোন্ ক্ষেত্রে দণ্ড লাঘব করা যায় এমন কোনো বিবেচনার আওতায়। এবং আসিজি কোর্ট বা আদালতে (বিচারক ও জুরিবর্গের সমন্বয়ে গঠিত আদালতে) মানসিক বিশেষজ্ঞকে ডাকার রেওয়াজটি কম কি বেশি দণ্ডই বোঝায়।| যা সংক্ষিপ্ত বিচারের আদালতেও প্রচলিত। আইনী পরিভাষায় বিন্যস্ত হলেও, এই দণ্ডগুলো স্বাভাবিকতার বিচার, কার্যকারণ প্রেক্ষিত, ভবিষ্যৎ পরিবর্তনের মূল্যায়ণ এবং অপরাধীর ভবিষ্যৎ প্রত্যাশার আলোকে প্রণীত। সুতরাং, এমনটি বলা ভুল হবে এই সমস্ত বিষয়ই বাইরে হতে মামলার রায়কে কোনো সারবত্তা যোগায়। অনুচ্ছেদ ৬৪-র প্রকৃত অর্থ অনুযায়ী মানসিক অসুস্থতা অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অপরাধ সঙ্ঘটনের অভিযোগের অবলুপ্তি বোঝালেও, যে কোনো ধরনের ব্যতিক্রমের ক্ষেত্রেই প্রতিটি অপরাধ এবং এমনকি প্রতিটি অন্যায় তার সাথে সাথে বৈধ সন্দেহ এবং দাবিযোগ্য অধিকার হিসেবে অপরাধীর মানসিক অসুস্থতার প্রস্তাবনাটিও বহন করে। এবং যে শাস্তি কাউকে নিন্দা করে বা বেকসুর খালাস করে তা’ শুধুই কোনো অপরাধের বিচার নয়। এ এক আইনী সিদ্ধান্ত যা শাস্তি বা দণ্ড প্রদান করে। সে তার নিজের ভেতরেই বহন করে স্বাভাবিকতার একধরনের মূল্যায়ন এবং সম্ভাব্য স্বাভাবিকীকরণের জন্য কৌশলগত ব্যবস্থাপত্র। আজকের দিনে ম্যাজিস্ট্রেট অথবা জুরিমণ্ডলীর সদস্য নিঃসন্দেহে বিচারকের চেয়ে বেশি কাজ করে থাকেন।

newgatcc.jpg
লন্ডনের নিউগেট জেলখানায় একাকী কয়েদীর নির্জন বাস। গড়পরতা দুটি সেল জোড়া দিয়ে নৈসঙ্গ বাড়ানোর চেষ্টা করা হতো। কয়েদী যাতে আত্মহত্যায় পার না পেতে পারে সেজন্য পাহারার ব্যবস্থা শুরু হয়েছিল ১৮৪৮ সাল থেকে।

এবং বিচারের কাজে বিচারক একাই কিন্তু নন। শাস্তি প্রক্রিয়া এবং দণ্ড ঘোষণা কার্যকর করতে এক ঝাঁক উপ-কর্তৃত্বমূলক ব্যবস্থা রয়েছে। ক্ষুদ্রায়তন আইনী ব্যবস্থা এবং সমান্তরাল বিচারকরা মূল বিচারকে কেন্দ্র করে সংখ্যায় বহুগুণে বেড়েছেন: মনস্তত্ত্ববিদ অথবা মানসিক বিশেষজ্ঞ, শাস্তি দণ্ড কার্যকর করার ক্ষেত্রে জড়িত ম্যাজিস্ট্রেট, শিক্ষাবিদ, কারাগার সেবা কর্তৃপক্ষের সদস্য বাহিনী। এককথায় শাস্তি প্রদানে আইনী ক্ষমতার যত ভগ্নাংশ। এক্ষেত্রে এই বলে আপত্তি করা যায় এদের কেউই প্রকৃত অর্থে দণ্ড প্রদানের ক্ষমতা ভোগ করেন না; এদের ভেতর কারো কারো দণ্ড ঘোষণা হবার পরে আদালতের রায় কার্যকর করা ছাড়া আর কোনো অধিকার নেই। এই বিশেষজ্ঞরা বিচারাদেশ প্রদানের আগে ঘটনায় প্রবেশ করেন বিচারকদের সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করার জন্য, রায় প্রদানের জন্য নয়। কিন্তু, আদালত সংজ্ঞায়িত শাস্তি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা যতক্ষণ পর্যন্ত না চূড়ান্তভাবে নির্ণীত হয়, যে মুহূর্ত থেকে রায় মার্জনা করা যায়, কিম্বা কেউ বিচারক ব্যতীত অন্যদের হাতে এ বিষয়ক সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা ছেড়ে দেয় যে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ‘আংশিক স্বাধীনতা’ বা ‘শর্তাধীন স্বাধীনতা’য় বিন্যস্ত করা হবে, তারা তাকে শাস্তির অভিভাবকত্বে রাখার মেয়াদ শেষ করে নিয়ে আসুক বা না, কেউ তাদের হাতে আইনী শাস্তির কলাকৌশল স্বেচ্ছায় ব্যবহারের ক্ষমতা হস্তান্তর করে। এই বিশেষজ্ঞরা উপ-বিচারক হলেও কমবেশি বিচারকও বটে। মামলার রায় কার্যকর করতে বছরের পর বছর ধরে এক কৃৎকৌশল গড়ে উঠেছে, এবং ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থার অভিযোজন মামলার সিদ্ধান্ত-গঠনে কর্তৃপক্ষের দ্রুত বিস্তার ঘটায় এবং শাস্তি পেরিয়ে তার সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতা বাড়ায়। মানসিক বিশেষজ্ঞরা, তাদের নিজ নিজ এলাকায়, বিচার করার কাজ হতে আত্মসম্বরণ করতে পারেন। ১৯৫৮ সালে আদালত কর্তৃক গৃহীত সিদ্ধান্ত হতে আমাদের তিনটি প্রশ্ন পরীক্ষা করতে দিন এবং এই প্রশ্নগুলোর উত্তর তাদের নিজেদেরই খুঁজতে হবে: অভিযুক্ত ব্যক্তি কি সমাজের জন্য বিপজ্জনক? সে কি দণ্ডমূলক শাস্তি পাবার উপযুক্ত? সে কি সংশোধনযোগ্য না কি পুনরায় অভিযোজনযোগ্য? অনুচ্ছেদ ৬৪-র সাথে এই প্রশ্নগুলোর কিছুই করার নেই। কিম্বা অপরাধ সঙ্ঘটনমুহূর্তে অভিযুক্তের সম্ভাব্য মানসিক অসুস্থতারও এ বিষয়ে কিছুই করার নেই। তাদের সাথে ‘দায়িত্ব’ বা ‘কর্তব্যবোধে’র কোনো সম্পর্ক নেই। শাস্তির প্রশাসন, এর গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা, সম্ভাব্য কার্যকারিতা ব্যতীত আর কোনো বিষয়েই তারা চিন্তা করে না; প্রায় স্বচ্ছ কোনো শব্দভাণ্ডারে তারা প্রদর্শন করাতে সক্ষম হয় যে অভিযুক্তের বন্দিত্বের জন্য মানসিক হাসপাতাল অথবা কারাগার অধিকতর ভাল স্থান হবে, এই বন্দিত্ব সংক্ষিপ্ত বা দীর্ঘ হবে, অথবা কেনই বা অভিযুক্তের জন্য চিকিৎসা বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা চাওয়া হবে। এমন সব ক্ষেত্রে, দণ্ড বিষয়ে, মানসিক বিশেষজ্ঞের ভূমিকাই বা কী? যদিও দায়িত্বের ক্ষেত্রে সে কোনো বিশেষজ্ঞ নয়, কিন্তু শাস্তি বিষয়ে সে একজন পরামর্শদাতা; একথা বলার ভার মুখ্যতঃ তার উপরেই যে অপরাধকারী ‘বিপজ্জনক’ কিনা, ঠিক কোন্ পন্থায় কাউকে এই অপরাধীর হাত হতে নিরাপদ রাখতে হবে বা কীভাবে কেউ তাকে বদলানোর জন্য ভূমিকা রাখতে পারে। মানসিক বিশেষজ্ঞই সঠিকভাবে বলতে পারেন অপরাধীকে বশ মানানোর জন্য জোর করাটা সঠিক হবে নাকি তাকে চিকিৎসা করাটা অধিকতর ফলদায়ী হবে। এ বিষয়ক ইতিহাসের একদম সূচনায়, মানসিক বিশেষজ্ঞদের ডাকা হতো অপরাধীর কৃত অন্যায়ে তার (অপরাধীর) মুক্তি বা স্বাধীনতা কতটুকু ভূমিকা রেখেছে সে বিষয়ক যথার্থ অনুমান গঠনের জন্য। বর্তমানে মানসিক বিশেষজ্ঞদের ডাকা হয় ব্যবস্থাপত্র নির্দেশের কাজে যাকে অপরাধীর চিকিৎসা-বিচার সম্পর্কিত শুশ্রুষা বলা হয়।

সংক্ষেপে বললে, আঠারো ও উনিশ শতকের বৃহৎ আইন গ্রন্থগুলো দ্বারা সংজ্ঞায়িত নতুন শাস্তি ব্যবস্থা যবে হতে কাজ শুরু করেছে, কোনো সাধারণ প্রক্রিয়া অপরাধ ব্যতীত অন্য কোনো কিছু বিচার করতে বিচারকদের চালিত করেছে। এই বিচারকরা তাদের প্রদত্ত মামলার নানা রায়ে একমাত্র বিচার ছাড়া আর সব কাজই করতে চেয়েছেন। এবং বিচার করার এই ক্ষমতাও বিচারক ব্যতীত অপরাপর কর্তৃপক্ষের নিকট আংশিকভাবে হস্তাস্তরিত হয়েছে। সমগ্র জুরিবোর্ডের কর্মকাণ্ডই অতিরিক্ত-বিচার বিভাগীয় উপাদান ও ব্যক্তিবর্গের উপর নির্ভর করেছে। হয়তো বলা হবে এতে কোনো অসাধারণত্ব নেই, আইনের নিয়তিই হলো অল্প অল্প করে এর বিরোধী যাবতীয় উপকরণকে আত্মস্থ করে নেওয়া। কিন্তু আধুনিক অপরাধ বিচারের খারাপ দিক হলো যদিও এই ব্যবস্থা নানা বিচার অতিরিক্ত উপকরণও গ্রহণ করেছে, এই উপকরণগুলো আইনী পরিভাষায় সংজ্ঞায়িত করা এবং শাস্তি দানের প্রকৃত ক্ষমতার সাথে একীভূত করার লক্ষ্যে করে নি। বরং শাস্তি পরিচালনার ভেতর বিচার-অতিরিক্ত উপকরণ হিসেবে এদের সক্রিয় করার উদ্দেশ্য থেকেই এমনটি করা হয়েছে। দণ্ড সঞ্চালন যেন শুধুমাত্র আইনী শাস্তি হিসেবে পরিণত না হয়। সেই সাথে বিচারককে নিছকই তেমন এক ব্যক্তি হওয়া থেকেও বাঁচাতে চেয়েছে যার কাজ হলো শুধুমাত্র শাস্তি দেওয়া। “নিঃসন্দেহে আমরা শাস্তি দেই, তবে এই শাস্তি অপরাধের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত নয়। আমাদের জন্য এ বিষয়টি বেশ পরিষ্কার যে শাস্তি অপরাধীর সাথে ব্যবহারের এক ধরনের পন্থা হিসেবে কাজ করে। আমরা শাস্তি দিই এমন এক কথা বলার প্রচেষ্টা হতে যে আমরা রোগ নিরাময়ের বা অপরাধীর চরিত্র সংশোধনের চেষ্টা করি।” আজ অপরাধ বিচার ব্যবস্থা নিজেকে ব্যতীত আর সব বিষয়ে সূত্র নির্দেশের মাধ্যমে সক্রিয়তা অর্জন করছে এবং নিজের বৈধতা দাবি করছে। বিচার অ-সম্পর্কিত ব্যবস্থায় (বা, মামলার শুনানি অ-সম্পর্কিত?) নিরন্তর অভিলিখনের মাধ্যমে এই আত্মপক্ষ সমর্থনের প্রচেষ্টাটি করা হয়। জ্ঞান কর্তৃক পুনরায় সংজ্ঞায়িত হওয়াই বিচার ব্যবস্থার নিয়তি।

শাস্তির তীব্রতা কমার পেছনে কেউ অবশ্য এর প্রয়োগ-বিন্দুর কোনো স্থানচ্যুতি খুঁজে পেতে পারেন; এবং এই স্থানচ্যুতির মাধ্যমে খুঁজে পাওয়া যেতে পারে সাম্প্রতিক নানা উদ্দেশ্যের সামগ্রিক এক ক্ষেত্র, সত্যের সম্পূর্ণ নতুন ব্যবস্থা এবং অপরাধ বিচার ব্যবস্থার অনুশীলনে বিভিন্ন ধরনের অজানা ভূমিকার স্তূপের দিকটি। জ্ঞান, প্রকৌশল, “বৈজ্ঞানিক” নানা ডিসকোর্সের এক বিপুল সমাহার এভাবেই গঠিত হয়ে থাকে এবং শাস্তি প্রদান ক্ষমতার প্রয়োগের সাথে জড়িত হয়ে পড়ে।

এই বই আধুনিক আত্মা এবং বিচার করার নতুন ক্ষমতার আন্তঃসম্পর্কিত ইতিহাস হিসেবে রচিত; এই গ্রন্থ বর্তমান বৈজ্ঞানিক-আইনী জটিলতার এক উদ্ভব বিজ্ঞান। যে প্রকৃতির জটিলতা হতে শাস্তি প্রদানের ক্ষমতা তার ভিত্তি, বৈধতা ও নিয়ম খুঁজে পায়। এই একই জটিলতা হতে শাস্তি প্রদানের ক্ষমতার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে এবং এভাবেই এই ক্ষমতা তার পরম অনন্যতা মুখোশে ঢেকে রাখে।

কিন্তু, ঠিক কোন্ বিন্দু হতে আধুনিক আত্মার বিচারের এমন ইতিহাস লেখা যেতে পারে? কেউ আইন বা দণ্ড প্রক্রিয়ার বিবর্তনে নিজেকে সীমায়িত রাখলে তাকে সম্মিলিত সংবেদনশীলতায় বদল আনার অনুমোদনের ঝুঁকি নিতে হবে। মানবিকীকরণে প্রসারতা অথবা বিপুল, প্রকাশ্য, জড়/অচেতন এবং প্রাথমিক ঘটনা হিসেবে মানবীয় বিজ্ঞানসমূহের উন্মেষের ঝুঁকিও নিতে হতে পারে। দুর্খাইম যেমন করেছেন (দেখুন গ্রন্থপঞ্জি), শুধুমাত্র সাধারণ সামাজিক কাঠামোগুলো অধ্যয়নের মাধ্যমে, একজন আসলে তর্কের খাতিরে সত্য হিসেবে ধরে নেবার ঝুঁকি হিসেবেও শাস্তির তীব্রতা হ্রাসকে ব্যক্তিকরণ প্রক্রিয়া হিসেবে দেখে থাকেন। এ বরং ক্ষমতার নয়া চাতুরীর অন্যতম প্রভাব, যার ভেতরে শাস্তির নতুন পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এই অধ্যয়ন শুধুমাত্র চারটি সাধারণ নিয়ম মান্য করে:

১) শাস্তির কৃৎকৌশলের অধ্যয়ন শুধুমাত্র তার “দমনমূলক” প্রভাবসমূহের মাঝে, শুধুমাত্র তাদের “শাস্তি”গত দিক বিষয়ে সীমিত রেখো না। বরং এই অধ্যয়নকে তাদের সম্ভাব্য ইতিবাচক প্রভাবগুলোর পরম্পরার ভেতর স্থাপিত করো, এমনকি যদি এই প্রচেষ্টাকে প্রথম দৃষ্টিতে খুব তুচ্ছ বা প্রান্তিকও মনে হয়। ফলাফলস্বরূপ, শাস্তিকে বরং জটিল সামাজিক ক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করো।

২) শাস্তির পদ্ধতিগুলোকে স্রেফ আইনের প্রতিক্রিয়া বা সামাজিক কাঠামোর সূচক হিসেবে বিশ্লেষণ না করে বরং কিছু কৌশল হিসেবে বিবেচনা করো। এই কৌশলগুলো ক্ষমতা অনুশীলনের অন্যান্য সাধারণতর ক্ষেত্রে নিজস্ব বিশেষত্ব ধারণ করে। শাস্তিকে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে সম্মান করো।

৩) দণ্ড আইনের ইতিহাস এবং মানবীয় বিজ্ঞানসমূহের ইতিহাসকে দুটো ভিন্ন পরম্পরা হিসেবে বিবেচনা করো না (যাদের যুগপৎ সঙ্ঘটন একে অপরের উপর অথবা উভয়ের উপর কারো দৃষ্টিকোণ হতে কোনো বিরক্তিকর কিম্বা গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে বলে প্রতীয়মান হয়)। বরং এভাবে বিবেচনা করো যে এই উভয় ইতিহাসের কোনো অভিন্ন উৎসগর্ভ নেই কি না অথবা তারা উভয়েই “জ্ঞানতাত্ত্বিক-বিচার” গঠনের কোনো একক প্রক্রিয়া হতে উদ্ভুত কিনা; সংক্ষেপে, ক্ষমতার প্রযুক্তিকে দণ্ড ব্যবস্থার মানবিকীকরণ এবং মানবের জ্ঞান, এই উভয় বিষয়ের নীতি হিসেবে তৈরি করো।

৪) খুঁজে বের করার চেষ্টা করো দণ্ডমূলক বিচার ব্যবস্থায় আত্মার এই প্রবেশ এবং সেই সাথে আইনী অনুশীলনে “বৈজ্ঞানিক” জ্ঞানের এক বিপুল সমাহারের অন্তর্ভুক্তি কোনো পন্থা পরিবর্তনের ফলাফল নয়, যে পন্থায় শরীর নিজেই ক্ষমতা সম্পর্কের দ্বারা অবরুদ্ধ।

সংক্ষেপে, শরীরের রাজনৈতিক প্রযুক্তির উপর ভিত্তি করে শাস্তিমূলক পদ্ধতিগুলোর রূপান্তর পাঠের চেষ্টা করো যেখানে ক্ষমতা সম্পর্ক এবং বস্তু সম্পর্কেও, কোনো অভিন্ন ইতিহাস পাঠ করা যেতে পারে। এভাবে, ক্ষমতার কৌশল হিসেবে শাস্তির তীব্রতা হ্রাসের বিশ্লেষণের মাধ্যমে একজন উভয়তঃ বুঝতে পারে কীভাবে মানুষ, আত্মা, স্বাভাবিক অথবা অস্বাভাবিক ব্যক্তি বা দণ্ডমূলক হস্তক্ষেপের বস্তু হিসেবে অপরাধকে নকল করতে এসেছে; এবং ঠিক কোন্ পথে পরাধীনতার কোনো বিশেষ পদ্ধতি ‘বৈজ্ঞানিক মর্যাদাপূর্ণ’ অভিভাষণের জন্য জ্ঞানের এক বস্তু হিসেবে মানুষকে জন্ম দিতে সক্ষম হয়েছিল।

কিন্তু এই গন্তব্যে কাজ করার লক্ষ্যে আমিই প্রথম দাবিদার নই।

রুশ্চে (Rusche) এবং কির্শহেইমারের (Kirchheimer) বৃহৎ কাজ শাস্তি এবং সামাজিক কাঠামো প্রচুর গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স বা তথ্য নির্দেশ প্রদান করেছে। প্রথমে আমাদের উচিত হবে নিজেদের সেই বিভ্রম হতে মুক্ত করা যে সর্বোপরি শাস্তি হলো (চূড়ান্তভাবে না হলেও) অপরাধ হ্রাস করার পন্থা। এবং এই ভূমিকায়, সামাজিক প্রকরণ ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা বা বিশ্বাসগুলোর হের-ফেরে শাস্তি তীব্র বা মৃদু হতে পারে, ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য দীর্ঘ আলোচনার দিকে মোড় নেয়; মোড় নেয় ব্যক্তিবর্গের অনুসন্ধান অথবা সামাজিক দায়িত্ববোধ আরোপের দিকে। আমরা বরং “শাস্তির সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থাগুলো” সুনিশ্চিতভাবে বিশ্লেষণ করবো। তাদের অধ্যয়ন করবো সামাজিক প্রপঞ্চ হিসেবে যা শুধুমাত্র সমাজের বিচার সম্বন্ধীয় কাঠামো দ্বারাই জবাবদিহিতার সম্মুখীন হয় না কিম্বা জবাবদিহিতার সম্মুখীন হয় না এর মৌলিক নৈতিক পছন্দগুলোর দ্বারা। আমরা অবশ্যই তাদের স্থাপন করবো তাদের সক্রিয়তার ক্ষেত্রে, যেখানে অপরাধের শাস্তিই একমাত্র উপকরণ নয়; আমরা তাদের দণ্ডমূলক পদক্ষেপগুলো প্রদর্শন করবো। এই পদক্ষেপগুলো “নেতিবাচক” কৃৎকৌশল নয় যা দমন করা, প্রতিরোধ করা, বর্জন করা বা ধবংস করাকে সম্ভবপর করে তোলে। কিšত্ত, তারা ইতিবাচক এবং গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রভাবের পরম্পরার সাথে জড়িত এবং এদের সাহায্য করাটাই তাদের কাজ (এবং, এই বিবেচনায় যদিও শাস্তি প্রয়োগ করা হয় অপরাধের দণ্ড প্রদান করতে, কেউ বলতে পারেন আসলে প্রচলিত শাস্তি ব্যবস্থা এবং তাদের কার্যবিধি অব্যাহত রাখার জন্য অপরাধের সংজ্ঞা প্রদান এবং মামলা পরিচালনা করা হয়ে থাকে)। এই দৃষ্টিকোণ হতে, রুশ্চে এবং কির্শহেইমার বিভিন্ন ধরনের শাস্তি ব্যবস্থাকে বিভিন্ন ধরনের উৎপাদন ব্যবস্থার সাথে সম্পর্কিত করেন: এভাবেই, দাস অর্থনীতিতে শাস্তিমূলক কৃৎকৌশল অতিরিক্ত শ্রমশক্তি মজুদ রাখতে সাহায্য করে এবং যুদ্ধ বা ব্যবসা ব্যতিরেকেও “সুশীল” ক্রিতদাসদের বাহিনী গঠন করা যায়। সামন্ত ব্যবস্থার উদ্ভবের সাথে সাথে, যেসময়ে অর্থ এবং উৎপাদন উন্নয়নের প্রাথমিক স্তরে ছিল, আমরা দৈহিক শাস্তির ক্ষেত্রে হঠাৎ বৃদ্ধি দেখতে পাই। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শরীরটি যেন অভিগম্য সম্পত্তি। বণিক অর্থনীতির উদ্ভবের সাথে সাথে কারাগার (সাধারণ হাসপাতাল, স্পিনুই অথবা রাসফুই), বাধ্যতামূলক শ্রম এবং জেল কারখানার আবির্ভাব। কিšত্ত, শিল্প ব্যবস্থার প্রয়োজন হলো শ্রমের স্বাধীন বাজার। উনিশ শতকে শাস্তির কৃৎকৌশলের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক শ্রমের ভূমিকা সাথে সাথে কমে এসেছে এবং “সংশোধনমূলক” বিনাবিচারে আটক সেই জায়গা দখল করেছে। অবশ্য এতটাই সোজাসাপটা আন্তঃসম্পর্কের ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে কিছু ভিন্নতর অবধারণও থাকতে পারে।

কিন্তু, নিঃসন্দেহে আমরা এই সাধারণ অনুমানটি গ্রহণ করতে পারি কীভাবে আমাদের সমাজে শাস্তির ব্যবস্থা শরীরের এক বিশেষ ধরনের “রাজনৈতিক অর্থনীতি”র আওতাধীন। এমনকি যখন কোনো ভয়ঙ্কর ধরনের বাজে বা নিষ্ঠুর শাস্তি প্রয়োগ করা হয় না, বা যখন অভিযুক্তের আটক বা সংশোধনীকে কেন্দ্র করে শাস্তির “নরম” পদ্ধতিগুলোই গ্রহণ করা হয়, তখনো শরীরই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। শরীর এবং এর শক্তি, তার উপযোগ এবং বশ্যতা, তার বন্টন এবং সমর্পণ। নৈতিক ধারণাবলী অথবা আইনী কাঠামোর প্রেক্ষাপটে শাস্তির ইতিহাস লেখা নিঃসন্দেহে বৈধ কাজ। কিন্তু শরীরের ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে কেউ কি এমন কোনো ইতিহাস লিখতে পারেন যখন শাস্তির এই ব্যবস্থা তার উদ্দেশ্য হিসেবে শুধুমাত্র অপরাধীদের গোপন আত্মা পাবার কথা দাবি করে?

ইতিহাসবিদরা বহু আগে থেকেই শরীরের ইতিহাস লেখা শুরু করেছেন। ঐতিহাসিক জনমিতি তত্ত্ব অথবা রোগনির্ণয় বিষয়ে তারা শরীর অধ্যয়ন করেছেন; তারা শরীরকে বিভিন্ন প্রয়োজন এবং রুচির আসন হিসেবে বিবেচনা করেছেন, বিবেচনা করেছেন শারীরবৃত্তীয় নানা প্রক্রিয়া এবং বিপাকক্রিয়ার সঠিক স্থান হিসেবে, জীবাণু অথবা ভাইরাসের আক্রমণের লক্ষ্যস্থল হিসেবে। তারা দেখিয়েছেন আপাতঃদৃষ্টে অস্তিত্বের বিশুদ্ধ জৈবিক স্তরের ঠিক কোন মাত্রায় ঐতিহাসিক প্রক্রিয়াগুলো যুক্ত হয়েছিল। এবং তারা আরো দেখিয়েছেন সমাজের ইতিহাসে জৈবিক ঘটনাবলীকে ঠিক কোন্ আসন দেওয়া উচিত, যেমন বাসিলির সঞ্চালন, অথবা জীবনচক্রের সম্প্রসারণ (লো রয় – লদ্যুরি)। শরীর অবশ্য রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও সরাসরি জড়িত; এর উপর ক্ষমতা সম্পর্কের তাৎক্ষণিক দখল রয়েছে; তারা শরীরকে বিনিয়োগ করে; চিহ্নিত করে, প্রশিক্ষিত করে, অত্যাচার করে, কাজগুলো সম্পন্ন করার জন্য একে জোর করে। পারষ্পরিক জটিল সম্পর্কের দায় মেনেই শরীরের এই রাজনৈতিক বিনিয়োগ তার অর্থনৈতিক বিনিয়োগের সাথে নিগড়বদ্ধ। বৃহত্তরভাবে কোনো উৎপাদন শক্তি হিসেবেই শরীরে ক্ষমতা এবং আধিপত্যের সম্পর্ক নিযুক্ত হয়। কিন্তু, অন্যদিকে, শ্রম ক্ষমতা হিসেবে শরীরের এই গঠন শুধুমাত্র তখনি সম্ভব যখন তা’ কোনো বশ্যতা বা পরাধীনতার ব্যবস্থায় বন্দি (এই ব্যবস্থায় প্রয়োজনও একটি রাজনৈতিক যন্ত্র যা অত্যন্ত যত্ন ও সতর্কতার সাথে প্রস্তুত করা হয়)। শরীর তখনি ব্যবহারোপযোগী শক্তি যখন তা’ একইসাথে উৎপাদনশীল এবং পরাধীন। এই পরাধীনতা শুধুমাত্র সহিংসতার যন্ত্র বা ভাবাদর্শ দিয়ে অর্জিত হয় না। এই বিষয়টি প্রত্যক্ষ, শারীরিক, শক্তির বিরুদ্ধে শক্তির ব্যবহার, বস্তুগত উপকরণসমূহের উপর নির্ভরশীল এবং তা’সত্ত্বেও সন্ত্রাসকে সম্পৃক্ত না করার ভিত্তিতে চলতে পারে। এটা গননা করা যেতে পারে, সংগঠন করা যেতে পারে, কৌশলগত ভাবে চিন্তা করা যেতে পারে। এটা খুব তীব্র হতে পারে, অস্ত্র বা সন্ত্রাসের কোনো ব্যবহার না করেই শারীরিক শৃঙ্খলাবিধির অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। সঠিকভাবে বলতে গেলে, শরীরের “জ্ঞান” বলতে এমন কিছু বিষয় আছে যা ঠিক এর সক্রিয়তার বিজ্ঞান নয়। এবং এই শক্তিগুলোর নিয়ন্ত্রণ এগুলোকে জয় করার ক্ষমতার থেকেও বেশি কিছু দাবি করে। এই জ্ঞান এবং এই নিয়ন্ত্রণ শরীরের রাজনৈতিক কৃৎকৌশল। নিঃসন্দেহে এই কৃৎকৌশল ছড়ানো-ছিটানো, খুব কমই কোনো ধারাবাহিক এবং নিয়মাবদ্ধ বিন্যাসে বিন্যস্ত; প্রায়ই টুকরো টুকরো নানা অনুষঙ্গ নিয়ে এ গঠিত এবং কার্যকর করে অসম নানা উপকরণ ও পদ্ধতি। এর ফলাফলের সামঞ্জস্য সত্ত্বেও সাধারণতঃ তা’ বহু আকার বিশিষ্ট ঐকতানের রূপ লাভ করে। সর্বোপরি, এটিকে কোনো বিশেষ প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রযন্ত্রে স্থানীকৃত করা যায় না। যেহেতু তারা এতে আশ্রয় নিতে পারে: তারা নিজস্ব কিছু পদ্ধতি ব্যবহার করে, নির্বাচন করে বা চাপিয়ে দেয়। কিন্তু এর কৃৎকৌশল এবং প্রভাবের ক্ষেত্রে, তা’ সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রায় অবস্থান করে। এক দিক হতে দেখলে যন্ত্রোপকরণ এবং প্রতিষ্ঠান ক্ষমতার পরমাণু পদার্থবিদ্যা সঞ্চালন করে। তার বৈধতার ক্ষেত্র হলো বিপুল সক্রিয়তা এবং যাবতীয় বস্তুতবাচকতা ও শক্তিসহ মানব শরীর।

এখন, পরমাণু পদার্থবিদ্যার পাঠ ধরে নেয় যে শরীরের উপর ক্ষমতার চর্চা সম্পত্তি হিসেবে দেখা হয় না, দেখা হয় কৌশল হিসেবে। এর আধিপত্যের প্রভাবসমূহ “আত্মসাৎ” হিসেবে নির্দেশিত হয় না, নির্দেশিত হয় বিন্যাস, কৌশলী পরিচালনা, কৌশল, পদ্ধতি, সক্রিয়তা হিসেবে। সম্পর্কের জালেই কেবল কেউ এর মর্মোদ্ধার করতে পারেন। কারো দখলে থাকা কোনো সুবিধার বদলে সদা অস্থিরতা এবং কাজের ভেতরে থেকেই কেবল কেউ এটা পেতে পারেন। প্রত্যেকের উচিত কোনো বিনিময় চুক্তি অথবা কোনো ভূখণ্ড দখলের পরিবর্তে একে চিরস্থায়ী যুদ্ধের আদর্শ হিসেবে ধরে নেওয়া। সংক্ষেপে, এই ক্ষমতা অধিকৃত হবার বদলে চর্চিত হয়। বিষয়টি কোনো “সুযোগ” নয়, নয় আধিপত্যশীল শ্রেণীর অর্জিত এবং সংরক্ষিত কোনো “সুবিধা।” এ বরং তার কৌশলগত অবস্থানের সামগ্রিক প্রভাব। আধিপত্যের অধীনস্থদের অবস্থান দ্বারা এই প্রভাবের প্রসার বোঝা যায়। সর্বোপরি, এই ক্ষমতা শুধুমাত্র কোনো দায় বা “যাদের নেই” তাদের উপর আরোপিত বিধি-নিষেধ হিসেবে দেখা হয় না। এ তাদের বিনিয়োগ করে, তাদের দ্বারা এবং তাদের মাধ্যমেই পরিবাহিত হয়; এই বিষয় তাদের উপর চাপ প্রয়োগ করে, যেন তারা নিজেরাই তাদের উপর সমগ্র ব্যবস্থার মুঠোকে প্রতিহত করছে। প্রতিহত করছে এর বিরুদ্ধে সংগ্রামরত অবস্থায় থেকে। এর অর্থ হলো এই সম্পর্কগুলো সমাজের গভীর অবধি সরাসরি অবগাহন করছে। যেহেতু তারা রাষ্ট্র এবং এর নাগরিকদের ভেতর সম্পর্কে অথবা বিভিন্ন শ্রেণীর সীমান্তে স্থানীভূত হয় নি। এবং তারা ব্যক্তি, শরীর, দেহভাষা ও আচরণ, আইন ও সরকারের সাধারণ কাঠামোর স্তরে শুধুই পুনরুৎপাদন করে না। যদিও সেখানে ধারাবাহিকতা আছে (জটিল কৃৎকৌশলের পরম্পরার মাধ্যমে ও কাঠামো গ্রন্থি অনুসারে তারা ব্যক্ত), সেখানে না আছে সদৃশতা না সদৃশবিজ্ঞান। বরং কিছু করণকৌশল ও ক্রিয়াপদ্ধতির সুনির্দিষ্টতা রয়েছে। সর্বোপরি, তারা একস্বরিক নয়। তারা সংঘর্ষ ও অস্থিরতার কেন্দ্রের অসংখ্য বিন্দুকে সংজ্ঞায়িত করে। এবং এই প্রতিটি বিন্দূর রয়েছে সংঘর্ষ ও লড়াইয়ের এবং অন্ততঃপক্ষে ক্ষমতাসম্পর্কের বিপরীতমুখিতার নিজস্ব ঝুঁকি। এই “ব্যষ্টি-ক্ষমতার” উৎখাত সেক্ষেত্রে কোনো আইন মানে না। বিষয়টি একবারেই অর্জন করা যায় না এবং সবার জন্য যন্ত্রোপকরণের নতুন দখলের মাধ্যমে বা প্রতিষ্ঠান ভেঙে ফেলার মাধ্যমেও অর্জিত হয় না। অন্য দিকে, ইতিহাসে কোনো স্থানীকৃত পর্বই খোদিত হয় না। খোদিত হয় শুধু সেই সব পর্ব যাদের প্রভাব পড়েছে আশপাশের নেটওয়ার্কে এবং এই নেটওয়ার্কে ক্ষমতার এই পরমাণু-পদার্থবিদ্যা নিজেই বন্দি।

সম্ভবতঃ আমাদের নিজেদেরও সেই সামগ্রিক ঐতিহ্য পরিত্যাগ করা উচিত যা আমাদের এমত কল্পনা করতে সাহায্য করে যে জ্ঞান শুধুমাত্র সেসব জায়গাতেই অবস্থান করে যেখানে ক্ষমতা সম্পর্ক অনুপস্থিত এবং জ্ঞান শুধুমাত্র ক্ষমতা সম্পর্কের নিষেধাজ্ঞা, চাহিদা ও স্বার্থের বাইরে বিকশিত হতে পারে। আমাদের এ ধরনের বিশ্বাস পরিত্যাগ করা উচিত যে ক্ষমতা কাউকে উন্মাদ করে তোলে এবং সেকারণেই ক্ষমতা ত্যাগ হলো জ্ঞানের অন্যতম শর্ত। বরং আমাদের স্বীকার করা উচিত যে ক্ষমতা জ্ঞানকে তৈরি করে। জ্ঞান ক্ষমতাকে সেবা করে বলে জ্ঞানকে উৎসাহিত করা বা বা জ্ঞানের প্রয়োগ গুরুত্বপূর্ণ বলে তাকে প্রয়োগ করাটাই বড় কথা নয়। ক্ষমতা এবং জ্ঞান একে অপরকে প্রয়োগ করে। কোনো নির্দিষ্ট জ্ঞানক্ষেত্রের পরষ্পর সম্পর্কযুক্ত সংগঠন ব্যতীত কোনো ক্ষমতা সম্পর্ক বিদ্যমান হতে পারে না। কিম্বা ক্ষমতা সম্পর্ককে পূর্বানুমান করে না এবং গঠন করে না এমন কোনো জ্ঞান নেই। এই “ক্ষমতা-জ্ঞান সম্পর্ক” বিশ্লেষিত হওয়া প্রয়োজন। এবং এই বিশ্লেষণটি হওয়া দরকার জ্ঞানের কোনো বিষয়ীর ভিত্তিতে নয় যে কিনা ক্ষমতা ব্যবস্থার সাথে তার সম্পর্কের জায়গায় মুক্ত অথবা বন্দি। বরং, উল্টো দিক হতে, বিষয়ী যে কিনা জানে, জ্ঞাতব্য বস্তুসমূহ এবং জ্ঞানের ক্রিয়াপদ্ধতিগুলোকে সম্মান করতে হবে যেহেতু ক্ষমতা-জ্ঞানের এই মৌল প্রয়োগ এবং তাদের ঐতিহাসিক রূপান্তরসমূহের রয়েছে অসংখ্য প্রভাব রয়েছে। সংক্ষেপে, তা’ জ্ঞানের বিষয়ীর কোনো সক্রিয়তা নয় যা জ্ঞানের বিপুল সমাহার উৎপন্ন করে, যা শক্তির জন্য উপযোগি অথবা প্রতিস্পর্ধী। কিন্তু, ক্ষমতা-জ্ঞান, প্রক্রিয়া এবং লড়াইসমূহ যা ক্ষমতা-সম্পর্কের ভেতর দিয়ে অতিক্রম করে যায় এবং যা দিয়ে এই ক্ষমতা-সম্পর্ক তৈরি, তাই জ্ঞানের রূপ এবং সম্ভাব্য এলাকাগুলো তৈরি করে।

শরীরের রাজনৈতিক বিনিয়োগ বিশ্লেষণে এই পদার্থবিদ্যা ধরে নেয় যে একজন ব্যক্তি সেসব ক্ষেত্রেই সন্ত্রাস-ভাবাদর্শ বিরোধিতা, সম্পত্তির রূপক, চুক্তির আদর্শ অথবা বিজয়ের মত অনুষঙ্গ ত্যাগ করে যেখানে ক্ষমতা জড়িত। আর, যেখানে জ্ঞান জড়িত, সেখানেই “আগ্রহী” এবং “অনাগ্রহী”র বিরোধিতাও কেউ পরিত্যাগ করে, পরিত্যাগ করে জ্ঞানের আদর্শ এবং বিষয়ীর মৌলিকতা। পেটি এবং তার সমসাময়িকদের কথা হতে ধার করে বললে কিন্তু সপ্তদশ শতকের সমসাময়িক কারো কথা হতে কোনো ভিন্নতর অর্থ তৈরি করতে চাইলে, যে কেউ, কোনো রাজনৈতিক “দেহ ব্যবচ্ছেদ” কল্পনা করতে পারেন। অবশ্য তা’ “শরীরে”র নিরিখে রাষ্ট্রের পাঠ হবে না (এর উপকরণ, সম্পদ এবং শক্তিসমূহ সহ)। না তা’ হবে কোনো ছোট রাষ্ট্রের নিরিখে শরীর এবং তার চারপাশের কোনো পাঠ। “বডি পলিটিক” বা রাষ্ট্র নিয়ে কেউ উদ্বিগ্ন হতে পারেন, যেহেতু নানা ধরনের বস্তুগত উপকরণ এবং কৌশল অস্ত্র হিসেবে, সম্প্রচার, যাতায়াত পথ এবং ক্ষমতা ও জ্ঞান সম্পর্কের জন্য নানা সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে, বিনিয়োগ করে মানব শরীরগুলো এবং মানুষের জ্ঞান বস্তুতে পরিণত করার মাধ্যমে পরাধীন করে।

“বডি পলিটিক” বা “রাষ্ট্রে”র ইতিহাসে এবিষয়টি শাস্তির নানা কৌশলকে স্থাপিত করার প্রশ্ন – তারা কি শরীরটাকে জনসমক্ষে নির্যাতন করা এবং মৃত্যুদণ্ড দেবার অনুষ্ঠানে পরিণত করতে চায় নাকি শাস্তিসমূহ আসলে আত্মার উদ্দেশ্যে সমর্পিত? দণ্ডমূলক অনুশীলনসমূহকে রাজনৈতিক শব ব্যবচ্ছেদের চেয়ে আইনী তত্ত্বের প্রতিক্রিয়া হিসেবে লঘুতর বিবেচনা করাটাও কাজ হয়ে দাঁড়ায়।

কান্তরোউইৎজ “দ্য কিংস বডি”-তে স্মরণযোগ্য বিশ্লেষণ প্রদান করেছেন: মধ্যযুগের বিচার সম্বন্ধীয় ধর্মতত্ত্ব অনুযায়ী রাজার শরীর একই দেহে দুটো দেহের উপস্থিতির কথা বলে। কারণ, এই বিশ্লেষণ অনুযায়ী শুধুমাত্র জন্ম-মৃত্যুর অধীন নশ্বর দেহই একমাত্র আলোচ্য বিষয় নয়। বরং সময়ের অভিঘাতে অপরিবর্তিত এবং রাজত্বের শারীরিক অথচ অপার্থিব সহায়তা হিসেবে বিবেচিত বস্তু হলো রাজার দেহ। খ্রিষ্টিয় ধর্মীয় আদর্শের খুব নিকটবর্তী এই দ্বৈততাকে কেন্দ্র করে সংগঠিত হয় এক প্রতিমা উপাসনা, রাজতন্ত্রের রাজনৈতিক তত্ত্ব এবং আইনী কৃৎকৌশল যা ব্যক্তি রাজা এবং রাজমুকুটের ভেতর পার্থক্যের সীমারেখা টানা আবার সংযোগ তৈরি করার দুটো কাজই করে। এবং রাজাকে কেন্দ্র করে সমগ্র আনুষ্ঠানিকতা পর্ব যা রাজ্যাভিষেকের সময়, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া এবং সমর্পণের সময় চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে। অভিযুক্ত ব্যক্তির দেহকে কোথায় রাখবেন সে বিষয়ে বিপরীত মেরুতে কেউ কল্পনা করুন। অপরাধীরও আইনী অবস্থান রয়েছে। সে নিজেই তার অনুষ্ঠানাদি সঙ্ঘটন করার জন্য দায়ী এবং তাকে ঘিরে যেন কোনো নাটক সম্পন্ন হয়। এহেন নাট্যক্রিয়া সম্পন্ন হয় সার্বভৌম শাসকের “উদ্বৃত্ত শক্তি”কে ধূলোয় মিশিয়ে দিতে নয়। বরং “শক্তির অভাব”-কে বিধিবদ্ধ করার প্রয়াস হতেই এমন নাটক অনুষ্ঠিত হয় যার সাথে দণ্ডিত হতে নিয়তিবদ্ধ মানুষেরা চিহ্নিত। রাজনৈতিক ক্ষেত্রের অন্ধকারতম কোণাতেও অভিযুক্ত ব্যক্তি রাজার বিন্যাস উল্টে দেওয়া কিন্তু ভারসাম্য সম্পন্ন দেহের প্রতিনিধিত্ব করে। কান্তরোউইৎজকে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানিয়ে আমাদের উচিত “অভিযুক্তের নূন্যতম শরীর” বাক্যবন্ধটিকে বিশ্লেষণ করা।

রাজার দখলে থাকা উদ্বৃত্ত শক্তি তার শরীরের প্রতিলিপি তৈরি করলে, অভিযুক্ত ব্যক্তির অধীনস্থ শরীরের উপর চর্চিত উদ্বৃত্ত শক্তি কি আর এক ধরনের প্রতিলিপি তৈরি করে না? মেবলি যেমনটি বলেছেন “অ-শাস্তিমূলক,” বা “আত্মা।” দণ্ড-প্রদান শক্তির “পরমাণু পদার্থবিদ্যা”র এই ইতিহাস তখন হবে আধুনিক “আত্মা”র বংশগতি বা বংশগতির উপকরণ। এই আত্মাকে ভাবাদর্শের বিক্রিয়া সম্পন্নীকৃত অবশিষ্ট হিসেবে না দেখে বরঞ্চ কেউ তাকে শরীরের উপর ক্ষমতার কিছু কৃৎকৌশলের বর্তমান পারষ্পরিক সম্পর্ক হিসেবে দেখে থাকবেন। একথা বলা অন্যায় হবে আত্মা কোনো ভ্রান্ত অধ্যাস অথবা কোনো ভাবাদর্শগত প্রতিক্রিয়া। বিপরীত দিকে, আত্মা হলো বিদ্যমান ও বাস্তব। তা’ চারপাশের শরীরের উপরে এবং অন্তর্নিহিত কোনো শক্তির সক্রিয়তা দ্বারা নিরন্তর উৎপন্ন হচ্ছে যা শাস্তিপ্রাপ্তের উপর চর্চা করা হয়। এবং, আরো সাধারণ পন্থায়, তা’ প্রদর্শনকারী, প্রশিক্ষক বা সংশোধনকারী কর্তৃক তেমন সব মানুষের উপর প্রয়োগ করা হয়… পাগলদের উপর, বাড়ি ও স্কুলে শিশুদের উপর! উপনিবেশিত যারা, যারা যন্ত্রের সাথে আটকা পড়ে গেছে এবং বাকি জীবনটা যাদের উপর খবরদারি করা হবে। এই হলো আত্মার ঐতিহাসিক পরিণতি যা খ্রিষ্টিয় ধর্মতত্ত্বে বর্ণিত আত্মার মতো পাপের ভেতর জন্ম নেয় না। বরং জন্ম নেয় শাস্তির নানা পদ্ধতি, পরিদর্শন এবং নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এই বাস্তব, অ-শাস্তিমূলক আত্মা কোনো সারবস্তু নয়। এ যেন কোনো উপকরণ যেখানে ক্ষমতার বিশেষ প্রকৃতি এবং জ্ঞানের বিশেষ প্রকৃতির নির্দেশ স্পষ্টভাবে উচ্চারিত। এ সেই কৃৎকৌশল যার মাধ্যমে ক্ষমতা সম্পর্ক জ্ঞানের কোনো সম্ভাব্য সমাহার অর্জনে সহায়তা করে এবং জ্ঞান ক্ষমতাকে বর্দ্ধিত ও পুনরুৎপাদিত করে। এই বাস্তব অভিসম্বন্ধ নির্দেশের প্রেক্ষিতে অনেক ধারণা গঠিত হয়েছে এবং বিশ্লেষণের এলাকাগুলোয় ঢেউ খেলেছে: মনস্তত্ত্ব, বিষয়ী কেন্দ্রিকতা, ব্যক্তিত্ব, সচেতনতা প্রভৃতি। এর উপর তৈরি করা হয়েছে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক কলাকৌশল এবং তর্ক-বিতর্ক ও মানবতাবাদের নৈতিক দাবিসমূহ। কিন্তু, ভুল বোঝাবুঝির কোনো অবকাশ না ঘটুক। এমন নয় যে আত্মার জন্য বা ধর্মতাত্ত্বিকদের অধ্যাসের জন্য বিকল্প হিসেবে কোনো বাস্তব মানুষ, জ্ঞানের বস্তু, দার্শনিক প্রতিফলন বা প্রযুক্তিগত হস্তক্ষেপ দেওয়া হয়েছে। আমাদের জন্য বর্ণিত মানুষ, যাকে মুক্ত করার জন্য আমরা আমন্ত্রিত, ইতোমধ্যেই তার নিজের ভেতরে রয়েছে সেই তুমূল বশ্যতা যা তার স্বীয় অস্তিত্বের চেয়ে জোরালো। আত্মা হলো রাজনৈতিক ব্যবচ্ছেদের প্রভাব এবং যন্ত্রোপকরণ; আত্মা হলো শরীরের কারাগার।

সাধারণভাবে শাস্তি এবং বিশেষভাবে কারাগার শরীরের বিশেষ রাজনৈতিক কৃৎকৌশলের অন্তর্গত এই শিক্ষা আমি ইতিহাস হতে ততটা শিখি নি যা বর্তমান সময় হতে শিখছি। সাম্প্রতিক বছরগুলোয়, সারা বিশ্ব জুড়ে কারাগার বিদ্রোহ ঘটেছে। নিঃসন্দেহে এই কারাগার বিদ্রোহগুলোর ভেতর উদ্দেশ্য, শ্লোগান এবং যত ধরনের পদ্ধতিতে তারা সঙ্ঘটিত হয়েছে সেসবের ভেতর কিছু স্ববিরোধিতা রয়েছে। কারাগারের শতাব্দী প্রাচীন ভৌত দুর্দশার বিরুদ্ধে এই বিদ্রোহগুলো সঙ্ঘটিত হয়েছে: ঠাণ্ডা, শ্বাসরোধ ও ঘিঞ্জি ঠাসাঠাসি, জরাজীর্ণ দেয়াল, ক্ষুধা, শারীরিক নিগ্রহ। পাশাপাশি আধুনিক আদর্শ কারাগার, ঘুমের বড়ি, বিচ্ছিন্নতা, চিকিৎসা বা শিক্ষা সেবার বিরুদ্ধেও বিদ্রোহ হয়েছে। এই বিদ্রোহগুলো পরষ্পরবিরোধী। বাধাবিপত্তির বিরুদ্ধে যেমন বিদ্রোহ হয়েছে, তেম্নি আরাম আয়েশের বিরুদ্ধেও বিদ্রোহ হয়েছে। কারারক্ষীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ যেমন হয়েছে, তেমন মনস্তত্ত্ববিদদের বিরুদ্ধেও? সত্যি বলতে, এই যাবতীয় আন্দোলন – এবং অসংখ্য বিতর্ক যা উনবিংশ শতকের শুরু হতে কারাগার জন্ম দিয়েছে – শরীর এবং বস্তুগত বিষয়কে কেন্দ্র করেই হয়েছে। এসব বিতর্ক, স্মৃতি এবং কটু-কাটব্যকে যা টিঁকিয়ে রেখেছে তা’ হলো মূলতঃ অনুপুঙ্খ নানা বস্তুগত বিবরণ। অবশ্য কেউ কেউ এতটা বিরূপ হতে পারেন যে এই জেল বিদ্রোহগুলোকে অন্ধ দাবি-দাওয়ার বেশি কিছু নাও ভাবতে পারেন বা এই জেল বিদ্রোহগুলোর পেছনে বিদেশী ষড়যন্ত্রের আভাস আবিষ্কার করতে পারেন। আসলে এই জেলবিদ্রোহগুলো ছিল শরীরের পর্যায়ে জেলখানার শরীরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। এই সব জেলবিদ্রোহ এমন কোনো ইস্যুতে সংগঠিত হয় নি যেমন জেলখানার পরিবেশ খুব কঠোর অথবা খুব রোগজীবাণুহীন। কিম্বা, জেলখানার পরিবেশ খুব আধুনিক কি খুব প্রাচীন এমন ইস্যুতেও বিদ্রোহ হয় নি। বিদ্রোহ সংগঠিত হয়েছে মূলতঃ ক্ষমতার যন্ত্র এবং বীজাণু হিসেবে জেলখানার বস্তুময়তার বিরুদ্ধে। তা’ শরীরের ওপর ক্ষমতার সামগ্রিক কৃৎকৌশল যা “আত্মা”র কৃৎকৌশলও বটে। শিক্ষাবিদ, মনস্তত্ববিদ এবং মনঃচিকিৎসকদের সৃষ্ট কৌশলগুলো ক্ষমতার কৌশলকে লুকিয়ে রাখতে বা ক্ষতিপূরণ করতে ব্যর্থ হয় যেহেতু তারাও ক্ষমতা কৌশলের অনেক উপকরণের অংশ বিশেষ। আমি শরীরের যাবতীয় রাজনৈতিক বিনিয়োগ সহ এই কারাগারের ইতিহাস লিখতে চাই যা কেউ জেলখানার বদ্ধ স্থাপত্যে একত্রে সংগ্রহ করেন। কেন? শুধুই কি এই কারণে যে আমি অতীতের ইতিহাসে আগ্রহী? না, যদি কেউ বোঝাতে চান যে বর্তমানের নিরিখে কেউ অতীতের ইতিহাস লিখতে চান। হ্যাঁ, বর্তমানের ইতিহাস বলতে কেউ যা বুঝে থাকেন।

কিস্তি ৩

তথ্যনির্দেশ


২. যেকোনো ভাবেই হোক, এই বই কতখানি গিলস দেল্যুজ এবং ফেলিক্স গুয়াত্তারির সাথে তাঁর মিলিত কাজ হতে গ্রহণ করেছে, রেফারেন্স নির্দেশ অথবা উদ্ধৃতি ব্যবহারের মাধ্যমে আমি সে বিষয়ে কোনো ধারণা দিতে পারিনি। আর. কাস্তেলের সাইকোএ্যানালিসমে গ্রন্থটি হতে প্রচুর সংখ্যক পৃষ্ঠা আমার উদ্ধৃত করা উচিত ছিলো এবং বলা উচিত ছিল আমি পিয়েরে নোরার প্রতি কতখানি কৃতজ্ঞ।

৩. আমি শুধুমাত্র ফরাসী শাস্তি ব্যবস্থায় জেলখানার জন্ম বিষয়টি অধ্যয়ন করবো। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রতিষ্ঠানসমূহ এবং ঐতিহাসিক বিকাশের পার্থক্যসমূহ আলোচনা করতে গেলে পুঙ্খানুপুঙ্খ ও তুলনামূলক পরীক্ষার নানা বিষয় বড়ই ক্লান্তিকর হয়ে উঠতে পারে এবং সমগ্র প্রপঞ্চটিকেই এমন সামগ্রিকভাবে বর্ণনা করার চেষ্টা করা হলে তা’ বড় বেশি ছকবদ্ধ ব্যপারে পরিণত হতে পারে।

a_falgun@yahoo.com

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

Sorry, the comment form is closed at this time.


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com