অভিজ্ঞানশকুন্তলম থেকে শুক্লা শকুন্তলা

মোস্তফা তোফায়েল | ২০ জানুয়ারি ২০১৫ ৬:৩২ অপরাহ্ন

huda.gifমহাকবি কালিদাসের অভিজ্ঞানশকুন্তলম নাটকের কাহিনি অবলম্বনে একটি পুনর্সৃষ্টিকর্ম মুহম্মদ নূরুল হুদার শুক্লা শকুন্তলাশুক্লা শকুন্তলা কাব্যটি বত্রিশটি সনেট আঙ্গিকে চতুর্দশপদী কবিতার সংকলন, যে সনেটগুলোর প্রতিটির শেষ দুই পংক্তি শেকস্পিয়রীয় পয়ারবদ্ধ যুগল এবং নীতিবাক্যমূলক।

তবে সনেট আঙ্গিকের চতুর্দশপদীসমূহ বিচ্ছিন্ন সত্তাবিশিষ্ট কবিতা নয়, কাব্যনাটকীয় চরিত্রায়নের সমষ্টি এবং সব কটি সনেটের সমাহার একটি পূর্ণাঙ্গ কাব্য। মহাকবি কালিদাসের শকুন্তলাকাহিনির উৎস মহাভারত। মুহম্মদ নূরুল হুদার শুক্লা শকুন্তলার উৎস ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর অনূদিত কালিদাসের অভিজ্ঞানশকুন্তলম। যেমন মার্লোর নাটক ডক্টর ফস্টাস-এর উৎস গ্যেটের ফাউস্ট কিংবা শেকস্পিয়রের জুলিয়াস সিজার-এর উৎস প্লুটার্কের রোমান ইতিহাস।

অভিজ্ঞানশকুন্তলম্ নাটকের সারসংক্ষেপ

মহাকবি কালিদাস রচিত অভিজ্ঞানশকুন্তলম নাটকে সাতটি অংক আছে। রাজা দুষ্মন্তের সঙ্গে কম্বমুনির আশ্রমপালিত কন্যা শকুন্তলার প্রেম, বিরহ ও মিলন এ নাটকের বিষয়বস্তু। মৃগয়ায় গিয়ে দুষ্মন্ত কণ¦^মুনির আশ্রমে পালিত কন্যা শকুন্তলাকে দেখেন এবং তার রূপে মুগ্ধ হয়ে গান্ধর্বমতে তাকে বিবাহ করেন। কম্বমুনি সেই সময়ে আশ্রমের বাইরে ছিলেন। তখন আশ্রমে আগত অতিথিদের সেবার ভার শকুন্তলার উপর ন্যস্ত ছিল। এদিকে দুষ্মন্তের রাজধানীতে প্রত্যাবর্তনের পর থেকে তার কোনো খবর না পেয়ে শকুন্তলা চিন্তিত থাকায় আশ্রমে আগত অতিথি দুর্বাশার সেবা করতে অক্ষম হলেন। এতে মুনি দুর্বাশা ক্রুদ্ধ হয়ে কর্তব্যভ্রষ্ট শকুন্তলাকে অভিশাপ দিলেন, “যার চিন্তায় বিভোর হয়ে তুমি আমাকে অবহেলা করলে, স্মরণ করে দিলেও তিনি তোমাকে স্মরণ করতে পারবেন না।”

শকুন্তলার সখীদ্বয় অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা দ্রুতগতিতে গিয়ে দুর্বাশার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলে তিনি আশ্বাস দিলেন যে, শকুন্তলা যদি দুষ্মন্তকে কোনো স্মারকচিহ্ন দেখাতে পারে, তাহলে এই অভিশাপ খণ্ডন হবে। যথাসময়ে কম্বমুনি আশ্রমে ফিরে এলেন এবং শকুন্তলাকে পতিগৃহে পাঠিয়ে দিলেন। কিন্তু দুষ্মন্ত শকুন্তলাকে চিনতে পারলেন না। প্রত্যাখ্যাত শকুন্তলা রাজসভা থেকে বিদায় নিলেন। পরে এক জেলের জালে আটকে পড়া রুই মাছের পেট থেকে নগররক্ষীরা দুষ্মন্তের নামাঙ্কিত অঙ্গুরীয়টি উদ্ধার করে। অঙ্গুরীয়টি দেখে রাজা দুষ্মন্তের পূর্বস্মৃতি জেগে ওঠে। তিনি শকুন্তলার জন্য অনুশোচনা করেন। এমন সময় দুষ্মন্ত ইন্দ্রের আদেশে কালনেমি নামের দানবের সন্তানদের বধ করার জন্য স্বর্গে গমন করেন। ফেরার পথে মারীচ মুনির আশ্রমে প্রবেশ করেন এবং সেখানে প্রথমে পুত্র সর্বদমনভরত এবং পরে পত্নী শকুন্তলার সঙ্গে মিলিত হন। আর এ মিলনের মাধ্যমে নাটকের পরিসমাপ্তি ঘটে।

মহাভারতের আদিপর্ব ও পদ্মপুরাণ হতে যদিও কালিদাস তার শকুন্তলা নাটকের বিষয়বস্তু গ্রহণ করেছেন, তথাপি নাটকের প্রতিটি অঙ্কে স্বীয় প্রতিভার স্পষ্ট স্বাক্ষর রেখেছেন। দুষ্মন্ত ও শকুন্তলার প্রণয়কাহিনী বর্ণনাই কালিদাসের আসল উদ্দেশ্য ছিল না। যে প্রেমে সংযম নাই, যে প্রেম শুধু স্বাধিকার প্রতিষ্ঠায় ব্যস্ত, সেই প্রেম চিরস্থায়ী হয় না তাতে অভিশাপ আসে। কালিদাস তার অভিজ্ঞানশকুন্তলম নাটকের মাধ্যমে এটাই বলতে চেয়েছেন।

পিতা উপযুক্ত পাত্রে কন্যা সম্প্রদান করবেন, সেটাই সকল মুনির মত। কিন্তু কন্যাকাল উত্তীর্ণ হলে যদি পিতা বিবাহ দেওয়ার কোনো উদ্যোগ না নেন, তাহলে কন্যা ইচ্ছামতো পাত্র মনোনীত করতে পারবে। উপযুক্ত পাত্রে কন্যাদান করলে অক্ষয় স্বর্গলাভ হয়, নচেৎ নরকে যেতে হয়। এই নিয়ম থাকায় অনুপযুক্ত পাত্রে কন্যা সম্প্রদান প্রায়ই ঘটত না। বিশেষত বরের গুণাগুণ সম্বদ্ধে যাজ্ঞবল্ক্য যে কঠিন নিয়ম সংস্থাপন করেছেন, তাতেও অপাত্রে কন্যাদান প্রায়ই ঘটত না। তিনি বলেছেন, নানা গুণবিশিষ্ট বেদবিৎ সমান বর্ণের পুরুষ বর হবে। তাকে যত্নপূর্বক গুণাগুণ পরীক্ষা করতে হবে– তিনি যেন যুবা, ধীমান ও লোকপ্রিয় হন।

মহাকবি কালিদাসের অভিজ্ঞানশকুন্তলম্ নাটকে ক্ষত্রিয় রাজা দুষ্মন্ত শকুন্তলাকে প্রথমে ব্রাহ্মণকন্যা ভেবে তাকে স্ত্রী রূপে গ্রহণ করতে সাহস পাননি। তবে সমাজে অসবর্ণবিবাহ প্রচলিত ছিল। তিনি মহর্ষি কন্বের অব্রাহ্মণী গর্ভসম্ভূতা হতে পারেন (দুষ্মন্তের উক্তি, ১ম অঙ্ক)।
কিন্তু সেকালে সমাজে গান্ধর্ব-বিবাহের প্রচলন ছিল। গান্ধর্বমতে বিবাহিত দম্পতি গুরুজনদের দ্বারা অভিনন্দিত হত। গুরুজনেরা সানন্দে এ বিবাহ সমর্থন করতেন। তাই দুষ্মন্ত ও শকুন্তলা গান্ধর্ববিবাহে আবদ্ধ হয়েছেন। সে সময়ে বহু বিবাহপ্রথাও চালু ছিল। দুষ্মন্তের হংসপদিকা প্রভৃতি একাধিক পত্নী এবং মৃত ব্যবসায়ী ধনমিত্রের একাধিক পত্নী থাকার সম্ভাবনা থেকে সমাজে বহুবিবাহের প্রমাণ মেলে। তবে এটা রাজা এবং বিত্তশালীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল বলে।
বিবাহের পরবর্তী পর্যায় হল কনের পতিগৃহে যাত্রা। মহাকবি কালিদাস শকুন্তলার পতিগৃহে যাত্রার মধ্য দিয়ে নায়িকা শকুন্তলার বিদায়ের ক্ষণটি শিল্পশৈলীতে এঁকেছেন। নাট্যকার এখানে শকুন্তলার মাঝে আবহমান বাংলার সমগ্র নারী সমাজেরই এক শোকাবহ করুণচিত্র তুলে ধরেছেন। শকুন্তলার বিদায়ে আশ্রমের লতাপাতা, গাছগাছালি, হরিণ-হরিণী, ময়ূর-ময়ূরী, মানুষজন– সবাই কেঁদেছে। নিরাসক্ত সংসারবিবাগী মানুষ কন্বও কেঁদেছেন। শ্রাবণের দুচোখের দুই জলের ধারায় পিতৃ-অন্তরের বোবা কান্নায় নীরব নিথর হয়ে উঠেছে সমগ্র বনভূমি। এ অংকে ফুটে উঠেছে বাংলার আপামর সনাতন পারিবারিক জীবনের এক নিখুঁত ছবি।

অভিজ্ঞানশকুন্তলম নাটকে সমাজজীবনের যে দিকটি প্রথমেই ধরা পড়ে, তা হল– তপোবনে মুনি-ঋষিদের জীবনধারা। সেকালে মুনি-ঋষিদের একটা আলাদা সমাজজীবন গড়ে উঠেছিল। তপস্বীরা ছিলেন সর্বোচ্চ সম্মানের অধিকারী ও শ্রদ্ধার পাত্র। পঞ্চমাঙ্কে রাজা দুষ্মন্তের সঙ্গে শার্ঙ্গরবের বাক্বিনিময়ের মধ্য দিয়ে ঋষিদের অখ- প্রতাপের প্রমাণ মেলে। ব্রাহ্মণেরা মোষযজ্ঞ করতেন, রোজ তিনবার সেবন করতেন। তারা উড়িধান খেতেন। পশুকেও তা বিতরণ করতেন। শিকারের সময়ে শিকারিরা প্রায়ই পাহাড়ি নদীর জল পান করত।

মুহম্মদ নূরুল হুদা রচিত শুক্লা শকুন্তলা কাব্যনাটকে সনেট ১ একটি প্রস্তাবনা বা এপিলগ, যা আহ্বান আঙ্গিকে উচ্চারিত। কবি এই সনেট কবিতায় উপস্থাপন করেন কাব্যনাটকের নায়ক দুষ্মন্ত ও নায়িকা শকুন্তলাকে; ক্ষণিক পরিচয়ে উম্মোচন করেন তপোবন ও তপোবনের অধিবাসী মুনিঋষিবৃন্দ এবং কম্বমুনিকে, সেই সঙ্গে উপস্থাপিত হয় রজনীগন্ধা, পূজা-উপচার, কুন্তলারমণী শকুন্তলার রহস্যাবৃত জীবনযৌবন এবং সেই উদ্ভিন্নযৌবনাকুল রমণীর হৃদয়রাজ্যে হস্তিনাপুরের রাজা দুষ্মন্তের মদনসুলভ শরনিক্ষেপণ। অমর্ত্যলোকের দেবতা দৃষ্টিবান নিক্ষেপ করে মর্ত্যকুটিরবাসী রমণীর প্রতি। মিলন ঘটে অমর্ত্যরে সঙ্গে মর্ত্যরে।

শুক্লা শকুন্তলা কাব্যনাটকটির ঘটনা ক্রমশ অগ্রগতি ও উন্নতি লাভ করতে থাকে চরিত্রায়ণের মধ্য দিয়ে। নাটকীয়তায় অংশগ্রহণ থাকে দুষ্মন্তের ও নায়িকা শকুন্তলার (সনেট ৫); দুর্বাশা মুনির (সনেট ১২); ইডেনরূপে স্বর্গের (সনেট ১৬); কোরাসের (সনেট ২৫,২৮,২৯); ভাষ্যকার ও দার্শনিকের (সনেট ১৫,৩০,৩১)। উৎকর্ষ অর্জিত হয় ভাষ্যকারের আলোকপ্রক্ষেপণীয় ভাষ্যে (সনেট ১৫)। যেখানে শুনি–
স্বর্গের সাথে মর্ত্য যখন মেলে
প্রাক-অনুমতি করে না তো প্রয়োজন।
মিলন মধুর মিলনেই উপাসনা
মিলিত মানুষে অমিত সম্ভাবনা।

কাব্যনাটক শুক্লা শকুন্তলার কাঠামো বিন্যাসে এভাবে শুরু বা সূচনাপর্ব, উন্নতি, উৎকর্ষ, অভিকর্ষ ও মোক্ষম অবস্থার সৃষ্টি হয়। নাট্যপরিকল্পনায় কবি তাঁর কাহিনিকে একটি সুনির্দিষ্ট অভীষ্টে এগিয়ে নিয়ে যান– নিজস্ব শৈলী, স্বকীয়তা ও সৃজনপ্রতিভায় বলীয়ান হয়ে।
মূল নাটকেও জৈবিক তাড়না আছে, তা শুধু দৃশ্যকল্পের ইঙ্গিতময় প্রকাশভঙ্গিতে। বৃক্ষবল্কল পরিহিত শকুন্তলার নবযৌবন, দৃঢ়পিনদ্ধ থাকতে অনিচ্ছুক হয়ে, তার বুকের চারদিকে ধাক্কা মেরে মেরে বহিঃপ্রকাশে অস্থির। বনের মধ্যে শিকারির বেশে প্রবেশকারী দুষ্মন্ত অন্তরাল থেকে সেই জাজ্বল্যমান যৌবদৃশ্য উপভোগ করেন আর তাকান বনের নবমল্লিকাঋদ্ধপল্লবদলের প্রতি, যে পল্লবদল আলিঙ্গন করছিল অন্য বৃক্ষের কা-গুলোকে। মুহম্মদ নূরুল হুদা বহির্লোকের এই দৃশ্যকল্পকে তাঁর কাব্যে রূপায়ন করেন অন্তর্লোকের আবেগানুভূতিতে। কালিদাসের চক্ষুষ্মানতা এক ধাপ এগিয়ে প্রকাশ লাভ করে মানব-আকাক্সক্ষার জৈবিক ও মানসিক অভিজ্ঞতাপুষ্ট উচ্চারণে–
দেবতারা সদাশয়; তাদের চরণে
দেবে যত হৃষ্টপুষ্ট উষ্ণ বলিদান
তুষ্ট তত দেবগণ, তত পুণ্যবান
হে শীর্ণ মানব তুমি অনন্ত অঙ্গনে।
…………………………………
আদিষ্ট মুদ্রায় জ্বেলে ভোগের আগুন
দগ্ধীভূত পশুপাখি শাল ও সেগুন,
ঋষির মানবপলি গলে যায় ধীরে।
মানবপলিতে গড়া বিশ্বমিত্র পিতা,
দেবতার ক্রুর খেলা, চক্রান্ত দুহিতা।
(সনেট ২)
দেবতা ও রাজা দুষ্মন্ত যেমন আকৃষ্ট হয় দেবী শকুন্তলার রূপ ও লাবণ্যে, শকুন্তলাও প্রতি-উত্তরে আবিষ্ট হয় দুষ্মন্তের শিকারিসুলভ বীরত্বব্যঞ্জনায়। বান্ধবী অনুসূয়া ও প্রিয়ংবদাকে অনুরোধ করে শকুন্তলা তার মনের আকুতি জানায় ও সমর্থন চায়:
জল, সখি, চারদিকে জল আর জল;
তপোবন গ্রাস করে জলের প্লাবন;
সে জলে হয় না যদি পিপাসা বারণ
নিজে আমি স্রোতস্বিনী, মালিনী তরল।
মাধবীলতার বুকে জেগেছে মুুকুল,
তুমি জল তুমি জ্বালা তুমিই কি হুল?
(সনেট ৫)

পক্ষান্তরে, দুষ্মন্তও বিগলিত শকুন্তলার রূপের অনলে–
যে রূপে আগুন জ্বলে কামারশালায়
লৌহপি- গলে যায়; যে রূপে জ্বালায়,
যে রূপে পুরুষমাত্র হয় অন্ধকূপ।
………………………………..
………………………………..
মাধব্য দেখিনি শুধু এমন প্রতিমা,
স্পর্শে যার খানখান রাজার মহিমা।
(সনেট ৬)
দুজোড়া ভঙ্গুর হাত তখন নীরবে
দুজোড়া বৃক্ষের শাখা তখন সচল
দুজোড়া অটল চোখে নেমে এলো জল
তপোবনে আজ বুঝি তপোভঙ্গ হবে!
(সনেট ৭)
সনেট ৬এ রৌদ্ররস ও সনেট ৭এ বাক্যালংকার অ্যানাফোরার ব্যবহারের মধ্য দিয়ে কবি দুষ্মন্তের আবেগজারিত প্রেমোচ্ছ্বাসকে বইয়ে দেন ক্রম উন্মাদনার দিকে–
প্রমত্ত ঝড়ের পরে পূর্ণ পরিণয়
একের হৃদয় কেনে অন্যের হৃদয়।
(সনেট ৭)
অমর্ত্যরে বন্ধনে আবদ্ধ হয় মর্ত্য, দেবতার ক্রোড়ে সমর্পণ করে মানবী। শুক্লা শকুন্তলার দেবতা তার দেবত্বের আবরণ সরিয়ে ফেলে মানব-কাতারে অবতরণ করেন; মিলিত হন সমতলে। অভিজ্ঞানশকুন্তলমের দুষ্মন্ত শকুন্তলার সঙ্গে প্রেমালিঙ্গনে ও পরিণয়ে আবদ্ধ হয়ে পড়ার পরেও ছিল দেবতার অভিব্যক্তি নিয়ে স্বউচ্চতায় উন্নীত; কিন্তু শুক্লা শকুন্তলায় দুষ্মন্ত পুনর্সৃষ্ট হন। তিনি রূপান্তরিত হন মানবসত্তায়। কামনা করেন সন্তান ও বংশ পরম্পরা।
শুধু সন্তান কামনা করেই অপার মানবিকতার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শনে ক্ষান্ত নন শুক্লা শকুন্তলার রাজা দুষ্মন্ত, তিনি তার দীর্ঘ ও প্রশস্ত বক্ষ অধিকতর প্রসারিত করেন তার প্রজাদের জন্য। সে বক্ষ কালক্রমে হস্তিনাপুর রাজ্যের সমগ্র ভূখণ্ডের সমপরিমাণ হয়ে যায়; রাজা তার উদার বক্ষতলে সমমর্যাদায় উপলব্ধি করেন প্রজাদের সার্বিক অস্তিত্ব। রাজা হয়ে পড়েন প্রজাদের সমকক্ষ মানব–
ধর্মরাজ্যে ডর ভয় নেই কোনদিন
রাজা-প্রজা একপক্ষ, ভেদাভেদহীন।
(সনেট ৮)
শুক্লপক্ষ আলোকউদ্ভাসিত শকুন্তলার চৌম্ব্যকস্পর্শেই রাজা দুষ্মন্তের এই মানবিক বিবর্তন, ‘শুকা¬ শকুন্তলা’ কাব্যনাট্যে। পৌরাণিক কাহিনি এখানে পুনর্সৃজন ভূমিতে বিবর্তিত পরিবর্তিত। মানবসৌন্দর্য্যরে অগ্নিপ্রভায় রাজহৃদয় স্বর্ণে পরিণত।
শুক্লা শকুন্তলার রাজা নিশ্চিত যে তপোবনের প্রভাবেই তিনি আজ সাম্যজ্ঞানে দীক্ষিত। রাজা উচ্চারণ করেন যে শকুন্তলার রূপচ্ছটাদীপ্ত শুভ্র তপোবনই সেই স্বর্গ বা ইডেন যে স্বর্গে উচ্চ-নীচ ভেদাভেদ অনুপস্থিত–
অতিথিপ্রবণ এই বন; যারা আছে
রাজাপ্রজা উচ্চাবচ ঋষি বা সন্ন্যাসী
সবাই স্বনিষ্ট মনে শোনে সেই বাঁশি,
উদার তরুর শীর্ষে শকুন্তেরা হাসে।
এই বনে আগন্তুক আসেন নির্ভয়ে
সৎকারের প্রশ্ন নিয়ে নেই কোনো তর্ক।
(সনেট ১০)
পারলৌকিক পুনর্জন্মের পরিবর্তে ইহজাগতিক পুনর্সৃজনে আস্থা স্থাপন করেন তিনি। অতঃপর শকুন্তলার আকর্ষণে আবিষ্ট রাজা দুষ্মন্তের অন্তরে সন্দেহ সহসাই শরাঘাত হানে। অন্তর্গত দ্বিধায় দ্বিধান্বিত হয়ে দুষ্মন্ত ভারাক্রান্ত হন–
না কি তুমি আসবে না? দ্বিধা হানে ছেনি
পত্রহীন বৃক্ষ হয়ে দাঁড়ায় প্রশ্নেরা।

ফলশ্রুতিতে তার অগ্রাধিকার স্থাপিত হয় মর্ত্যলোকের দিকে, যা ইহজাগতিক শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক। দুষ্মন্তের বরাত দিয়ে শুক্লা শকুন্তলার কবি বিশ্বাস ও আস্থা ঘোষণা করেন সেকুলারিজমে। দুর্বাশা মুনির অভিশাপে ছন্দপতন ঘটে, যা ছিল তপোবনচ্ছায়াসুরভিত, তা হয়ে পড়ে চন্দ্রাহত। দুর্বাশা অভিশাপ দেয় যে শকুন্তলার স্বামী দুষ্মন্তের স্মৃতিভ্রংশ ঘটবে; স্ত্রী-স্মৃতি তার অন্তরে থাকবে না। এই সংকটের প্রকাশে কবি সনেট ১৪তে নতুন ছন্দ উপহার দেন। চর্তুদশপদী সনেটের পরিবর্তে তিনি উপহার দেন দ্বাদশপদী ট্রকায়িক কবিতা, চার মাত্রার তালবিশিষ্ট। পূর্ববর্তী ছন্দের কবিতাগুলোর লালিত্য ও স্বাচ্ছন্দ্য সহসাই ভিন্ন তালে পা ফেলে; নির্দেশ দেয় সন্দিগ্ধতা ও দোলাচলের।
শংকায় কাঁপে, বাতাস বিরহাকুল
মেঘে মেঘে তবু কাটে না কেবল বেলা।
(সনেট ১৭)
রাজা দুষ্মন্তের রাজ্যেও বিপ্রতীপ সংকট। নিউটনের তৃতীয় সূত্রে ক্রিয়ার বিপরীতে প্রতিক্রিয়া–
প্রজাপতি সুখে দোলে না প্রজারা আর
শ্মশানের ছায়া ছড়ায় তামাম দেশ
নিখিল-নিলয়ে নিহত অভিনিবেশ
ছিন্নবৃন্ত সূর্য অন্ধকার;
(সনেট ১৮)
ডিক্যাডেন্স বা ছন্দশৈথিল্য প্রকাশার্থে কবি এখানে প্রয়োগ করেন দীর্ঘ স্বরবর্ণ ধ্বনি: ‘নিখিল-নিলয়ে নিহত অভিনিবেশে’, সেই সঙ্গে ‘ন’-সূচক তরলধ্বনির অনুপ্রাস। এই আবহ কবিতাটির ভাবে নিয়ে আসে দুঃখবোধ ও বিরহযাতনার প্যাথোজ।

তপোবন নন্দনকানন থেকে শকুন্তলা তার পতিগৃহ গমনকালে তার বিচ্ছেদ বেদনায় তপোবনে এক হাহাকার দৃশ্যের অবতারণা ঘটে। ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবনের নিমগ্নতা নয় তপোবনজীবন। সমগ্রের সমবায়ী জীবন থেকে একটি তরতাজা সহমর্মী সত্তা শকুন্তলা; তার চলে যাবার মুহূর্তে কান্নায় আর্তনাদ করে ওঠে সেখানকার সমস্ত সৃষ্টিকুল। মানুষ, প্রাণী, উদ্ভিদ প্রত্যেকেই বিচ্ছেদব্যথায় ভারাক্রান্ত হয়। বাঙালি নারীর পিতৃগৃহ ছেড়ে পতিগৃহে যাত্রার বেদনা ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয় শকুন্তলার বিদায়দৃশ্যে। শুক্লা শকুন্তলা কাব্যনাট্যে এই বিদায়দৃশ্য বর্ণনা অনেকটাই সংক্ষিপ্তাকারে পরিবেশিত এ জন্য যে, বাংলাদেশে এখন পুলিশ অফিসার-সাবরেজিস্ট্রার-কাস্টমস্ অফিসার হলেই তবে পতিদেবতা দুষ্মন্ত হতে পারেন। সে ক্ষেত্রে পতিগৃহযাত্রাকালের কণকাঞ্জলি সংক্ষিপ্ততম হতে বাধ্য।

কাব্যনাট্য শুক্লা শকুন্তলার দ্বন্দ্ব চরম উৎকর্ষ লাভ করে সনেট ২০ দুষ্মন্তের অনাস্থাবাক্য উচ্চারণের মধ্য দিয়ে। পতিগৃহে শকুন্তলা হন প্রত্যাখ্যাত। তাকে আখ্যা দেওয়া হয় ছলনাময়ী ও অসতী। অতঃপর শকুন্তলার জন্য অগ্নিপরীক্ষা অনিবার্য হয়ে হঠে। অগ্নিপরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়ে শকুন্তলা শিক্ষালাভ করে যে তার আবেগপ্রবণ মানসিকতা ভ্রান্তির প্রমাদে আকীর্ণ ছিল, যা অতিক্রম করে দিব্যজ্যোতি জ্ঞানালোকে উত্তীর্ণ হওয়ার মধ্যেই তার মুক্তি। এটাই শুক্লা শকুন্তলা নাটকের প্রকৃত অর্জন, এটাই Disillusionment।
শকুন্তলার শাস্তিভোগ, তার ত্যাগ ও তিতীক্ষা, তার একাগ্রতা, সততা ও সাধনা তাকে মোক্ষলাভ ও নির্বাণের পথে নিয়ে যায়। শকুন্তলা সে মুহূর্তে শুক্লা শকুন্তলায় পরিণত হয়–
এই গৃহ ছেড়ে আমি অন্য গৃহে যাই,
এসেছেন সম্মানিত দিব্যজ্যোতির্ময়;
প্রেমের প্রাসাদ তাও ছেড়ে চলে যাই;
এসেছেন সম্মানিত দিব্যজ্যোতির্ময়;
(সনেট ২১)
কাব্যনাট্যটিতে তৃতীয়পক্ষ কথক অথবা ভাষ্যকার চরিত্র খুঁজে পাওয়া সম্ভব সনেট ২২ ও ২৩-এ। কবি এ দুটি কবিতায় বলেন, শ্রম ও ত্যাগের যোগফলেই সাধনার সৃষ্টি, যে সাধনা শেষাবধি তপস্যাতুল্য। বিনাশ্রমে ধন আর বিনাসাধনায় বিদ্যা। উভয়েই চৌর্যবৃত্তি। সনেট ২৫-এ পাই গ্রিক নাটকের আদলে কোরাস চরিত্র। সংশয়াকুল দর্শক-পাঠকের উৎকণ্ঠা উপশমের উদ্দেশে কোরাস উচ্চারণ করে প্রোটাগোনিস্টের বর্তমান অবস্থা–
একটি চাবুক শুধু করে ফেরে তাড়া;
বাহু আছে, কিন্তু নেই বাহুর বাঁধন।
প্রতিক্ষণে জন্ম তার, মৃত্যু প্রতিক্ষণ
দুষ্মন্ত নিজেই আজ নিজের দুষ্মন।
(সনেট- ২৫)
শকুন্তলা সান্ত¡নায় এগিয়ে আসে তার পিতা কণ¦মুনি। শকুন্তলার হারিয়ে ফেলা অঙ্গুরীয় উদ্ধার হয় মৎস্যশিকারিদের মাধ্যমে। দুষ্মন্তের বিস্মৃতি অতিক্রান্ত হলে তার হৃদয়ের দর্পণে ভেসে ওঠে তারই ঔরসজাত নিষ্পাপ-নির্দোষ সন্তানের কান্নার দৃশ্য–
অথচ মোহান্ত আমি, আমার অন্তর,
মাধব্য, হৃদয় জুড়ে কাঁদে কে মাসুম?
(সনেট ২৭)
অতঃপর রাজা দুষ্মন্তকে কোরাস শোনায় জীবনের রূঢ় অভিজ্ঞতার কথা, উত্থান ও পতনের কথা এবং বিপর্যয় ও জয়ের কথা–
দাঁড়াতে দাঁড়াতে কেউ দাঁড়াবে না আর
কেবলি পিছলে যাবে, পিছলে কেবলি
কামক্রোধহিংসাদ্বেষ মত্ত দলাদলি,
পথে পথে ভাঙা সেতু আর পারাপার।
(সনেট ২৯)
অশেষ কান্নার শেষে অতঃপর আসে মিলন মুহূর্ত, কিন্তু তা একই সঙ্গে রচনা করে জীবনেরও অন্তিম লগ্নের শয়ন-শয্যাঃ
বিরহ বিব্রত করে বিরহীর মন
শুকায় মাংসপেশী শুকায় হৃদয়
কৃশকায় হয়ে ওঠে প্রফুল্ল সময়–
না, হয় না শেষ কখনও মিলন।

রবীন্দ্রনাথও বোধ করি এমনই এক মানব-পরিণতির বাণী উচ্চারণ করে গেছেন তার এক ভক্তিমূলক গানে–
দিনের শেষে রৌদ্র জ্বালায়,
শুকায় মালা ফুলের মালায়
সেই ম্লানতা ক্ষমা করো, ক্ষমা করো, প্রভু।

রাজা দুষ্মন্ত ও শুক্লা শকুন্তলা বরণ করে নেয় তৃতীয় প্রজন্মের ধারাবাহিকতা, যার নাম ঐতিহ্যের স্মারকচিহ্ন। কারণ, সেটা কালিদাসের কাল। কিন্তু “হায় রে, কবে কেটে গেছে কালিদাসের কাল” আধুনিক কালের ঐতিহ্য-উদাসীন, ছিন্নশেখর, উদ্বাস্তু ও স্বার্থমগ্ন মানুষ আমরা–
আমরা পছন্দ করি মাপসিদ্ধ তনুর তনিমা,
পা-ুর অতীতলিপি আমাদের পরম ঘৃণার।
(সনেট ৩২)
এই লব্ধ উচ্চারণের এপিলগ দিয়ে শেষ হয় কাব্যনাটক শুক্লা শুকুন্তলা।
মহৎ সাহিত্য, উন্নত সাহিত্যের মধ্যে অন্যতম স্থান কাব্যনাটকের।
কোনো কাব্যনাটকে যখন গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যরসসমূহ উপভোগ্যরূপে প্রয়োগ হয় এবং গ্রন্থটির কাব্যদেহে অলংকারের সজ্জা হয়ে তার শোভা বর্ধন করে, তখন সে কাব্যনাটকের সাহিত্যসুধা সভামঞ্চ আমোদিত করে তোলে। পৌরাণিক কাহিনির শক্তি সম্পর্কে সচেতন কবি যখন মহাভারতের শকুন্তলা কাহিনিকে আধুনিক সাহিত্যের চারিত্র্যগুণে নবসৃজন করেন, তখন উপভোগ্য সেই সাহিত্যরসগুলো সিঞ্চন করতে থাকে নবজলধারা। শুক্লা শকুন্তলা কাব্যনাটকে আমরা উপভোগ করি এমনই অনেকগুলো সাহিত্যরস, যথাÑ শৃঙ্গাররস, করুণরস, বীররস, ভয়ানকরস, বাৎসল্যরস প্রভৃতি।
শৃঙ্গাররস–
বৃক্ষের বাকলে বাজে শর্মিন্দা ঠোকর
ক্ষত্রিয়ের ডান হাতে প্রণয় সুন্দর।
(সনেট ৪)

দুজোড়া ভঙ্গুর হাত তখন নীরবে
দুজোড়া বৃক্ষের শাখা তখন সচল।
(সনেট ৪)

করুণরস–
বিদায় সখী গো, বিদায় বনতোষিণী
বিদায় আমার তপোবনতরু বোন
দূরবর্তিনী হবে না আমার মন
বিদায় বনের স্বর্ণগর্ভা হরিণী।
(সনেট ১৬)

অনন্তর নত হবে দুই জোড়া চোখ
তাকাতে তাকাতে আর কেউ তাকাবে না।
(সনেট ৩০)

বীররস :
আমাকে সম্মান করে তবুও সবাই
(ধর্ম রাজ্যে রাজমান নির্দিষ্ট যেহেতু);
অকথ্য মহাকাশে যদি ধূমকেতু
ওড়ায় অশুভ পুচ্ছ, আমি কি ডরাই?
(সনেট ৮)

ভয়ানকরস :
দুয়ারে দাঁড়িয়ে আমি স্বয়ং দুর্বাশা
তবু তুমি দেখলে না; তবু দেখলে না?
অতিথির চেয়ে বড় কোন সর্বনাশ
তোমাকে করছে গ্রাস; ….
(সনেট ১২)
বাৎসল্যরস:
আমার হৃদয় জুড়ে কাঁদে এক পিতা
হেমকুট পর্বতের নিষিদ্ধ সংসারে;
(সনেট ২৬)

সুখে-দুখে আজ তোমরাই সহমর্মী
বিদায় বিরহে মৃগশিশু সন্নত।
(সনেট ১৬)

শুক্লা শকুন্তলা কাব্যানাটকের চরিত্র চিত্রায়ণে কবি মুহাম্মদ নূরুল হুদা কালিদাসের নাটক অভিজ্ঞানশকুন্তলার কাহিনিটুকুই শুধু গ্রহণ করেছেন, কিন্তু উপস্থাপনের ক্ষেত্রে ঘটিয়েছেন রূপান্তর ও পুনঃসৃজন। সর্বশেষ সনেট এপিলগে কবি বাঙালি জাতিসত্তাজনিত ঐতিহ্যবিপন্নতার প্রতি ইঙ্গিত করে বিরূপ প্রভাবের প্রতি অঙ্গুলিসংকেত দান করেছেন। তিনি বলেন, ব্যক্তিক নর-নারী সম্পর্ক গৌণ বিষয়। মুখ্য ও শাশ্বত বিষয় হচ্ছে হৃদয়জারিত প্রেম ও প্রেমের স্মারকচিহ্ন সন্তান, যা অতীত ও বর্তমানের সঙ্গে ভবিষ্যতের সেতুবন্ধন রচনা করবে–
মিলন মুহূর্ত এলে কাঁপে তবু বাহু
নারী সত্য, সত্য নয় রমণীর রাহু
(সনেট ২৭)
নাগরিকজীবনের ব্যক্তিক স্বার্থমগ্নতা ও শেকড়শূন্যতা কবিহৃদয়কে পীড়িত করেছে বলে তিনি এপিলগে এ প্রসঙ্গের অবতারণা করেছেন। শ্রমহীন উপার্জন ও সাধনাহীন বিদ্যাবাগীশদের উপপ্লব তাঁকে ব্যথিত করেছে। কালিদাসের শকুন্তলা নাটকেও নগর মানুষের বিড়ম্বিত জীবনযাপনচিত্র প্রতিফলিত রয়েছে। রাজা দুষ্মন্তর বাড়িতে পৌঁছে শার্ঙ্গরব বলে, বাড়িটাতে বুঝি আগুন লেগেছে। সঙ্গী শারদ্বত তাকে বলে, রাজবাড়ির লোকের মুখ দেখে মনে হয় তেলামাথায় অপবিত্র ও অশুচি; জেগে থাকা লোকদের তুলনায় মূল্যবোধ বিষয়ে তারা ঘুমন্ত। আপাতঃদৃষ্টে ওরা সুখী কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ওরা কয়েদিজীবন যাপন করছেন। উল্লেখ্য, শেক্সপিয়রের টেম্পেস্ট নাটকের চক্রান্তকারীপক্ষের লোকদের চোখে ঘুম নেই, কারণ তারা পাপী। উন্মূল নগরজীবনের এই অভিশাপের বিপরীতে বর্তমান কবি যে শাশ্বত প্রেম, শাশ্বত মানুষ সন্ধান করেছেন, শুক্লা শকুন্তলা কাব্যনাট্যে, তা বৃহত্তর পাঠক সমাজের মনোযোগ আকর্ষণ করবে, প্রত্যাশা রইল।

অভিজ্ঞানশকুন্তলম-এর অভিজ্ঞান Illumination-এর ব্যুৎপত্তিতে যে বাইবেলীয় Illume ধাতুমূল আছে, তার অর্থ আলো। এই আলো প্রতীকায়িত হয়েছে মুহম্মদ নূরুল হুদার হাতে ‘শুক্লা’ শব্দটির সাহায্যে। Illume থেকেই আরবি ‘ইলেম’ শব্দের উৎপত্তি হয়েছে, যাকে আমরা বলি জ্ঞানবিদ্যা। বাইবেলের উৎপত্তিস্থল ও আরবি ভাষার উৎপত্তিস্থল অভিন্ন নয়। অভিজ্ঞানশকুন্তলমে যে পৌরাণিক কাহিনি বা মিথ আছে, তাকে প্রতীকী উপায়ে ব্যবহার করে বহুগুণে গুণান্বিত অর্থসম্পদ দান করেছেন শুক্লা শকুন্তলার কবি। যেমন, ধনপতি সদাগরের উদ্বৃত্ত উপার্জনের অর্থ শ্রমিক জনগণের প্রাপ্য বলেছেন তিনি। শ্রম যার, বিত্ত তারÑ এ কথাও এসেছে, অর্থাৎ সাম্যবাদী চেতনা প্রয়োগ করা হয়েছে শুক্লা শকুন্তলায়–
মানুষ পরেছে এই জ্ঞানের অঙ্গুরি
বিনা শ্রমে লব্ধ ধন আসলেই চুরি।
(সনেট ২৩)
পাশ্চাত্যবাদীরা ভারতবর্ষীর্য়দের বলে ওরিয়েন্টাল ও পশ্চাৎপদ; কিন্তু শুক্লা শকুন্তলায় যখন জড়জগৎ, উদ্ভিদজগৎ, প্রাণিজগৎ, মানবজগৎ এবং রাজা-প্রজা-শ্রমিক-মালিক সমাহারে সর্বজনীন ও মহাজাগতিক সমন্বয় স্থাপন করা হয়, তখন তা শেক্সপিয়রের টেম্পেস্ট নাটকের বিশৃঙ্খলাকে নিশ্চিতভাবেই পশ্চাতে নিক্ষেপ করে। ইংরেজি Tempest শব্দের অর্থও ঝড়বৃষ্টি বিশৃঙ্খলা, পক্ষান্তরে অভিজ্ঞান ও শুক্লা শব্দদ্বয়ের ব্যঞ্জনায় আছে মহাজাগতিক আলোকধারায় স্নাতকরণ। এডওয়ার্ড সাঈদের ওরিয়েন্টালিজমেও পশ্চিমিদের চিন্তা চেতনার বিকট দূরাবস্থার চিত্র আছে। অতি সম্প্রতি Orientalism বিষয়ে একটি জোরালো প্রবন্ধ উপহার দিয়েছেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।
সুতরাং শুক্লা শকুন্তলার পাঠ নিশ্চিতভাবেই দাবি করে অধিকতর অভিনিবেশ।

তথ্যসূত্র :
১। অভিজ্ঞানশকুন্তলম নাটকের অনুবাদ : ঈশ্বরচন্দ বিদ্যাসাগর
২। রবীন্দ্রপ্রবন্ধ: কুমারসম্ভব ও শকুন্তলা
৩। রবীন্দ্রপ্রবন্ধ: শকুন্তলা
৪। টেম্পেস্ট : উইলিয়াম শেক্সপিয়ার
৫। সুস্নিগ্ধা বড়ুয়া : জাতক সাহিত্যে চিত্রিত সমাজ ও শ্রেণিসম্পর্ক: একটি সমাজতাত্ত্বিক অধ্যয়ন;
৬। ড. ফয়জুন্নেছা বেগম, সংস্কৃত সাহিত্যের ইতিহাস (দ্বিতীয় প্রকাশ, ঢাবি) ২০১২ পৃ-৪২
৭। নরেন বিশ্বাস প্রদত্ত ভূমিকা, তারিখ ৭ মাঘ ১৩৮৯.

শুক্লা শকুন্তলা
মুহম্মদ নূরুল হুদা
প্রথম প্রকাশ: ১৯৮৩;
দ্বিতীয় প্রকাশ: বিভাস, কাঁটাবন, এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা: ২০১০;
পৃষ্ঠা সংখ্যা ৪৮।
Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (4) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন matin bairagi — জানুয়ারি ২৫, ২০১৫ @ ৭:৫২ অপরাহ্ন

      কবি মুহম্মদ নূরুল হুদার কাব্য-কৃতি ‘শুক্লা শকুন্তলা’ নিয়ে নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধ মোস্তফা তোফায়েল-এর পড়লাম। প্রবন্ধটি সুলিখিত বটে এবং নূরুল হুদার এই কাব্য অন্য মেজাজের যেমন তার অন্য কাব্য আমরা তামাটে জাতি যা তাঁকে খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছিয়েছে এবং ‘জাতি সত্তার’ কবি বলে বাংলা কাব্যাঙ্গনে পরিচিতি এনে দিয়েছে। মুহম্মদ নূরুল হুদা কেবল কবি নন, বহুমাত্রিক লেখকও বটে। তার রয়েছে কথা সাহিত্য,প্রবন্ধ সাহিত্য, অনুবাদ এবং গান। প্রত্যেকটি শাখায় তাঁর বিচরণ অনুধাবন করার মতো। নূরুল হুদা সমকালে আমাদের কাব্যজগতে উল্লেখ করার মতো একজন কাব্য ব্যক্তিত্ব, ভালো বক্তা এবং ভালো কবিতা বোদ্ধা। মোস্তফা তোফায়েল তাঁর একটি কাব্য নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত করলেও এই কবির কাব্যশক্তি প্রসংগে খুব সহজে অনুমান করে নেয়া যায়। আমি তাঁর বন্ধু হিসেবে তাঁর সান্নিধ্য পেয়ে আসছি এবং নানা সময়ে কাব্য নিয়ে আলোচনা কালে তাঁর কাছ থেকে কাব্যতত্ত্ব এবং নির্মাণ এবং নান্দনিকতা নিয়ে তাঁর মনোজ্ঞ আলোচনা শুনেছি। আমার বিশ্বাস থেকে বলছি যে বর্তমান সময়ে তিনি আমাদের ‘কবিতা-শিক্ষক’ যার মেধা অতুলনীয় এবং তাঁর কাছ থেকে কবিতার পরিমিতি ভালভাবে জেনে নেয়া যায়। নূরুল হুদা তাঁর বিপুল কাব্যসম্ভারে নানা রকম পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছেন নানা তত্ত্বের সংযোজন করেছেন, নিজের ভাবনা সংশ্লিষ্ট করেছেন, কবিতাকে ভেঙেছেন, কবিতা গড়েছেন, বিনির্মাণ করেছেন অনেক, কিন্তু নিজস্বতা বজায় রেখেছেন মাত্রা মতো। মোস্তফা তোফায়েল এর প্রবন্ধটি মনযোগ সহকারে পড়লে তার ঠিকানা মেলে আর প্রকারন্তে তিনি তাই আলোকিত করার চেষ্টা করেছেন সার্থকভাবে। প্রবন্ধকারকে অশেষ ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Dr. Binoy Barman — জানুয়ারি ২৬, ২০১৫ @ ৩:৫২ অপরাহ্ন

      মোস্তফা তোফায়েলের “অভিজ্ঞানশকুন্তলম থেকে শুক্লা শকুন্তলা” লেখাটি পড়ে বেশ ভালো লাগলো। লেখাটি দীর্ঘ কিন্তু সমৃদ্ধ। মুহম্মদ নূরুল হুদার “শুক্লা শকুন্তলা” বইটির ওপর লেখক সবিস্তারে আলোচনা করেছেন। হুদার শকুন্তলার কাহিনীর সঙ্গে কালিদাসের শকুন্তলাকাহিনির তুলনা করেছেন। কবিতাগুলোর ফর্ম ও বিষয় বিশ্লেষণ করেছেন। নানারকমের রসের দৃষ্টান্ত দিয়েছেন। সর্বোপরি, প্রাচ্যসাহিত্যের জয়জয়কার ধ্বনিত হয়েছে। “শুক্লা শকুন্তলা”র কবি এবং এর বর্তমান আলোচক উভয়কেই আন্তরিক ধন্যবাদ তাদের নিজস্ব প্রয়াসের জন্য।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন tanjina sultana — জানুয়ারি ২৬, ২০১৫ @ ১০:৩১ অপরাহ্ন

      I must appreciate the critic for the worthy selection of literary topic he has chosen for his discussion. Meanwhile his way and style of highlighting his topic is praise worthy too.The tradition needs to be upheld.Thanks.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন mostafa tofayel — ফেব্রুয়ারি ৪, ২০১৫ @ ১১:০১ অপরাহ্ন

      I think I should give an addendum to my essay so as to attempt to give it a justice of some sort because the original article falls short of. while postmodernism attempts to push back modernist lliterature and raise a Berlin wall between the two, Mohammad nurul Huda attempts to offer a bridge by way of a new idea called meta-modernism. In his epic drama entitled “shukla shokuntala” Huda has presented his idea of communism bor।n of the Indian soil brought up by the citizens of a native nation of Indian origin as against the harsh and merciless materialism doctrined by karl Marx and his post-colonialist friend Jean Paul Sartre. Huda is after harmonic growth of newer ideas as off-shoots from the mother-plant in a metabolistic biological pattern rather than in an arid, abortive & atavistic manner. In his treatment of the theme of social reformation in shukla shokuntala, the theme of feminism & nativitism in sycorax 1999, Huda sticks to his poetic theory of meta-modernism on his own rather than what little has ‘so far been done about it.

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com