জনতা নামের কর্তা: `জীবন আমার বোন’ এবং মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাচরিত্র

নাজমুল সুলতান | ১৮ জানুয়ারি ২০১৫ ৯:১৬ অপরাহ্ন

border=0“মানুষের ভিড় কেটে বেরুতে পারছে না খোকা। বারবার ধাক্কা খাচ্ছে। আসন্ন ত্রাস তাড়া করছে তাকে; মুহূর্তের সামান্য ব্যবধানে একটা আবশ্যিক প্রতিক্রিয়ায় সবকিছু হুড়মুড় করে ভেঙে পড়বে, ভেঙে পড়বে বিচারালায়, ভেঙে পড়বে মিলনায়তন, ভেঙে পড়বে পানশালা, স্টেডিয়াম। এতোদিন তার চোখে যা ছিল সামান্য মানুষ, এখন তা সংগঠিত অবিচ্ছিন্ন মিছিলে। খোকা শিউরে উঠলো, এতোদিন তার কাছে যা ছিল দয়িতা যামিনী মদিরার মতো তিন অক্ষরের হালকা পালকে মোড়া পাখির মতো নিছক একটা রোগা শব্দ, এখন তা প্রচণ্ড বিস্ফোরণে ছড়িয়ে পড়ছে শহরময়, জনতা!” (জীবন আমার বোন, মাহমুদুল হক)


একাত্তর সাল একটা ঘটনা। তাকে জাতীয় মুক্তির আন্দোলন বলা হোক বা “গণ্ডগোলের বছর” বলা হোক, তার ঘটনাচরিত্র কেউ অস্বীকার করতে পারে না। কিন্তু ঘটনাচরিত্রকে অস্বীকার করা না গেলেও তাকে ঘটনা আকারে বুঝতে পারা সহজ নয়। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিদ্যমান যত বয়ান আছে, তাদের সবকয়টাই কমবেশি একাত্তর সালকে একটা যৌক্তিক ক্রমপরম্পরার পরিণতি আকারে সংজ্ঞায়িত করে। জাতীয়তাবাদীদের কাছে মুক্তিযুদ্ধ হাজার বছরের নিপীড়িত বাঙ্গালি জাতির স্বাধীনতার বাসনার বাস্তবায়ন। গোঁড়া মার্ক্সবাদীদের কাছে তা শ্রেণী সংগ্রামের জাতীয়তাবাদী স্তর। যারা মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ছিলেন, তাদের মধ্যে এইসব বয়ান নিশ্চয়ই ক্রিয়াশীল ছিল। সেই কারণে এইসব বয়ানের সংগঠন এবং কার্যপ্রণালি বোঝাপড়ার প্রয়োজন রয়েছে, যদিও এই লেখায় তা প্রান্তিকই হয়ে থাকবে। একটা ঘটনাকে যখন একান্তই ইতিহাসের যৌক্তিক ক্রমপরম্পরায় পর্যবসিত করা হয়, তখন সেই ঘটনাচরিত্রের আস্তিত্বিক এবং রাজনৈতিক মাত্রাটা জৌলুস হারায়, ঢাকা পড়ে যায়। ঘটনার কর্তার ভূমিকা ইতিহাসের গতির চাকার নিচে পড়ে যেন নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। ইতিহাসবাদী বয়ানের আলোকে মুক্তিযুদ্ধকে বোঝা মানে সেই ঘটনার কর্তা, তথা জনতার, রাজনৈতিক ভূমিকা খাটো হয়ে যাওয়া। মাহমুদুল হকের উপন্যাস জীবন আমার বোন এমন একটা বিরল প্রজাতির উপন্যাস যা ইতিহাস আর ঘটনার মাঝখানের দ্বিধাশঙ্কুল পারাবারে ক্রিয়াশীল। আর ঠিক এই কারণেই তা মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাচরিত্র আর কর্তাসত্তাকে তাদের বাঁধনহারা ঐতিহাসিকতায় স্থাপন করতে সমর্থ হয়েছিল। উপন্যাসটা দৃশ্যত একাত্তর সাল নিয়ে। কিন্তু একাত্তরের যুদ্ধকালীন ঘটনাপঞ্জিতে উপন্যাসের ব্যাপ্তি নয়। তা মূলত যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তগুলোকে কেন্দ্র করে—সাতই মার্চের ভাষণের দুইতিন আগ থেকে পঁচিশে মার্চ অব্দি। তারপর যুদ্ধের এক দুই মুহূর্ত–কিন্তু ঘটনার ঘনত্বের একদুই মুহূর্তই গোটা কাহিনির বিশেষায়ণকারী হয়ে ওঠে। সমাপ্তির ভণিতায় শেষমেষ ছোট করে আসে যুদ্ধ পরবর্তী পরিণতি। কাহিনির এই বিন্যাস যেন ঘটনার সংঘটনকেই অনুকরণ করছে। এই কাহিনিবিন্যাস কেন গুরুত্বপূর্ণ তা ক্রমে আরো বিস্তারিত করা হবে।

জীবন আমার বোন বহুল পঠিত বটে, কিন্তু পাঠের বাহুল্য উপন্যাসটা বোঝাপড়ার ঋদ্ধতা নির্মাণে বিশেষ অবদান রাখতে পারে নাই। বাজারচালু মূল্যায়নগুলো আজো উপরিতলের অবভাসে বন্দী। প্রায়ই শোনা যায় যে জীবন আমার বোন একাত্তর সালের যৌথচরিত্রের সঙ্গে বোদলেয়ার আর সার্ত্র আক্রান্ত বিচ্ছিন্ন এক তরুণের মোকাবিলার সমব্যথী দলিল। চরিত্র নির্ধারণের নিরিখে কথাটা হয়ত ঠিক। কিন্তু একটা উপন্যাসের গূঢ় মর্ম তার বৈশিষ্ট্য দেখে বোঝা নিতান্তই অসম্ভব। উপন্যাসের চরিত্রের চেহারা থেকে সিদ্ধান্ত টানার বদলে আমাদের বরং কাহিনির কাঠামোর দিকে তাকানো দরকার। খোকার বিচ্ছিন্নতা স্থবির নয়, আত্মতৃপ্তও নয়। তা বারবার মুখোমুখি হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের প্রাকমুহূর্তের সাথে—ব্যর্থ যুক্তিতে, রক্তমাংসের নিবিড়তায়, মুদ্রাদোষের প্রাবল্যে। তারপর ঘটনার উদগীরণের তোড়ে সে খড়কুটোর মত ভেসে গেছে। সেই ঘটনা তাকে আগাগোড়া পুনর্নির্মাণ করেছে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তিনি কেন লিখেন, এই প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে মাহমুদুল হক যে উত্তর দিয়েছিলেন তা দ্রষ্টব্যঃ “একটা জাতির জীবনে এত বড় একটা ঘটনা ঘটে গেলো, আমি সেই জাতির একজন লেখক হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের কথা লিখবো না?” এটা তাই নিছক দুর্ঘটনা নয় যে মুক্তিযুদ্ধকে মাহমুদুল হক একটা ঘটনা আকারে নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন জীবন আমার বোনে— ঘটনার আকস্মিকতা, জোর, বল্গাহীন প্লাবন ইত্যাদি উপাদানের তাই এত প্রাচুর্য উপন্যাসজুড়ে। জীবন আমার বোন কোন অর্থেই কেবল খোকার “বিচ্ছিন্নতার” বয়ান নয়— খোকার কাহিনির মধ্য দিয়ে তা একাত্তর সালের ঘটনাচরিত্র বোঝাপড়ার প্রচেষ্টা। সেই প্রচেষ্টার দার্শনিক গভীরতা উদঘাটন করাটাও এই লেখার একটা উদ্দেশ্য। সেই ঘটনাচরিত্র অবধারণ করার জন্য ঘটনার কর্তা, তথা জনতার ধারণাকে ঘাঁটিয়ে দেখার দরকার পড়বে। আমি দাবি করব খোকা কোনক্রমেই এই কাহিনির কর্তা নয়। মাহমুদুল হক বরং খোকার কাহিনি ফেঁদে, সেই কাহিনির সূত্রে, জনতার সদা-অন্তর্হিত সত্তাকে খানিকের জন্য সমান্তরালে দৃশ্যমান করেছেন।

এই উপন্যাস পুনর্পাঠ করার মধ্য দিয়ে আমি দুইটা রাজনৈতিক এবং দার্শনিক প্রশ্নকে খনন করতে চাইছি। কিন্তু আমার বিচারে এই প্রশ্নগুলো উপন্যাসের বহিরঙ্গের ব্যাপার নয়। অর্থাৎ এই প্রশ্নগুলোকে মোকাবিলা করা ছাড়া জীবন আমার বোন পাঠের চেষ্টা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। কিন্তু জীবন আমার বোন দর্শনশাস্ত্রের কোন কিতাবও নয়। তা সাহিত্যরূপে সংগঠিত, চিহ্নিত এবং পঠিত। সাহিত্যের সাথে দর্শনশাস্ত্রের একটা মাধ্যমগত তফাত আছে, তবে সেই তফাতটা চিন্তায় গভীর-অগভীর হওয়ার ব্যাপার নয়। উপন্যাস যদি কাহিনিধর্মের উপর ভিত্তি করে সচল হয়, কবিতা যদি চিত্রকল্প এবং বিবৃতির সংশ্লেষে ক্রিয়াশীল থাকে, দর্শন তবে একটা যৌক্তিক বিন্যাস বিস্তারিত করে যা সদাই পূর্বজ্ঞান ও পরজ্ঞান নিয়ে সচেতন। মাধ্যমগত বিশেষত্বের কারণেই সাহিত্য এবং দর্শন নানা প্রশ্ন কিংবা বিষয়ের সাথে মোকাবিলা করে আলাদা আলাদাভাবে। কিন্তু এই তফাত নির্বিশেষে, সাহিত্য এবং দর্শন একে অপরকে বোঝাপড়ার শর্ত তৈরি করে তাদের বিষয়বস্তুর সমধর্মীতার সূত্রে। এই দ্বন্দমুখর সম্পর্কের কথা মাথায় রেখেই আমি জীবন আমার বোনর অন্তরঙ্গ পাঠের মধ্য দিয়ে এই প্রশ্নগুলোকে মাহমুদুল হক যেভাবে নির্মাণ করেছিলেন তা দৃশ্যমান করার চেষ্টা করব। তবু ভিতর বুঝতে গেলে কখনো কখনো বাইরে যাওয়া লাগে। এই উপন্যাসের অন্তর্গত সংঘটন দেখানোর জন্য তাই মাঝে মাঝে অন্যদেশের অন্যসময়ের কথাও পাড়তে হবে।


ঘটনাকে আদৌ কি ইতিহাসে স্থিত করা যায়? এই প্রশ্নের সহজ সমাধান নাই। ঘটনাকে আমরা ঘটনা বলি তখনই যখন তা নিয়মের সূত্র অতিক্রম করে। ইতিহাসের নিয়ম বৈজ্ঞানিক নিয়মের মতন না—বিজ্ঞানের নিয়মকে স্থানকালের বিশেষত্বে আটকানো যায় না। তাতে কর্তার স্বাধীনতাও নাই। ইতিহাস যেহেতু মানুষের করণযোগে গঠিত হয় এবং করণ তথা অ্যাকশনের গন্তব্য অগ্রিম ঠিক থাকে না, ইতিহাসের নিয়মকে তাই বৈজ্ঞানিক নিয়মের ছাঁচে ফেলে তৈরি করা সম্ভবপর হয় না। ইতিহাসের বিশেষ খণ্ডে বিশেষ কাঠামো থাকে, আর প্রতি কাঠামোতে নির্দিষ্ট কিছু সম্ভাব্যতা থাকে। ইতিহাসের নিয়ম বলতে বড়জোর এই বোঝানো যেতে পারে। ঐতিহাসিক নিয়মের সূত্র ছেদ করা মানে তাই সেই কাঠামোবদ্ধ সম্ভাব্যতার সীমানা অতিক্রম করে যাওয়া। ইতিহাসতত্ত্বের প্রধান সমস্যা হচ্ছে ছেদ তথা পরিবর্তনকে ব্যাখ্যা করা। এবং পরিবর্তনকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তা কাঠামোর দিকে নজর দেয়। কিন্তু কাঠামোর মধ্যে পরিবর্তনের সম্ভাবনা শনাক্ত করলেও ঘটনাকে সূত্রায়িত করা সম্ভবপর হয় না। কারণটা আমরা আগেই বলেছিঃ সেই সম্ভাবনার মধ্যে বরাবর একটা জায়গা থেকে যায় করণ তথা অ্যাকশনের জন্য। আর করণ মাত্রই কিছুটা স্বাধীনতা ধারণ করে। অর্থাৎ ছেদের ফলস্বরূপ কী ঘটবে তা নির্দিষ্ট করা যায় না।তাই এই করণ যে সাধন করে তাকে আমরা কর্তা বলি।

একাত্তর সাল এরকম একটা ঘটনা যা মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ববর্তী রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ছেদ নিয়ে আসে। এটাকে ছেদ বলব এই কারণে যে তা রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের নতুন ভিত্তি রচনা করেছে। রাজনৈতিক প্রতীক-ব্যবস্থায় এই রূপান্তর অনস্বীকার্য। সামাজিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় তার প্রভাব পড়ুক বা না-পড়ুক, এই রাজনৈতিক রূপান্তরকে ঘটনা হিসাবে গণ্য না করবার অবকাশ নাই। মুক্তিযুদ্ধের পিছনে আমরা অনেক বোধগম্য কারণ খুঁজে পেতে পারি– রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, আন্তর্জাতিক, সাংস্কতিক। কিন্তু এইসব কোন ব্যাখ্যানই পঁচিশে মার্চের ধাক্কাটাকে যৌক্তিক বিন্যাসের মধ্যে আনতে পারবে না। একটা ঘটনার পিছনে অনেক কারণ থাকে। কিন্তু ঘটনা সেইসব কারণের যোগফল না। মিশেল ফুকোকে এই সমস্যা বিশেষভাবে ভাবিয়েছিল। পিছন ফিরে আমরা যখন ইতিহাসের কোন এক ঘটনার দিকে তাকাই, তখন সেই ঘটনা স্বতঃপ্রমাণিত বলে আবির্ভূত হয়। এই স্বতঃপ্রমাণের গ্যাঁড়াকল অতিক্রম করার জন্য ফুকো ঘটনার সিংগুলারিটি বা এককত্বকে নির্দেশিত করার পরামর্শ দিয়েছিলেনঃ “ স্বতঃপ্রমাণিত হওয়াকে ভেঙে দিতে হবে। যেইসব জায়গায় ঐতিহাসিক নির্দিষ্টতা, সহজ নৃতাত্ত্বিক ব্যাখ্যান, বা অন্য যে কোন আবশ্যিকতা যা সমধর্মীতা নির্মিত হয়, সেইখানে এককত্বকে দৃশ্যমান করে তোলতে হবে। দেখাতে হবে যে ঘটনাসমূহ ‘যতটা আবশ্যিক দেখায় ততটা আবশ্যিক ছিল না।’ এটা কোন ধারাবাহিক প্রক্রিয়া ছিল না যে পাগলেরা ক্রমে মানসিকভাবে অসুস্থ্ আকারে চিহ্নিত হবে। এটা স্বতঃপ্রমাণিত ছিল না যে অপরাধীর শাস্তি মাত্রই কারাদণ্ড হবে। এইসব স্বতঃপ্রমাণ–যাদের উপরে আমাদের জ্ঞান, আমাদের মৌনসম্মতি, চর্চা নির্ভর করে– তাই খারিজ করতে হবে।” আজকাল কেউ কোন অপরাধ করলে তার শাস্তি হয় কারাদণ্ডের মাপকাঠিতে। শাস্তির মাত্রা অনুসারে কারাদণ্ডের মাত্রা ঠিক হয়। ফরাশিদেশের শাস্তিপ্রদানের ইতিহাসে পর্যালোচনা করে ফুকো দেখলেন যে অপরাধের শাস্তি আঠারো শতকেও ছিল বেশ আলাদা। সার্বভৌমত্বকেন্দ্রিক রাজতন্ত্রে অপরাধের শাস্তি হত রাজার সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের নিরিখে। রাজার সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন ছিল সর্বোচ্চ অপরাধ। এই অপরাধের কোন সংশোধন নাই। শাস্তিও ছিল এক প্রদর্শনবাদী ব্যাপার। তারপর আসল সংশোধনবাদী শাস্তি ব্যবস্থা। যেখানে অপরাধের ধরন অনুসারে শাস্তির চরিত্র নির্ধারিত হত। যেমন, কেউ তহবিলের টাকা তছরুপ করলে তাকে জনসম্মুখে অপদস্থ করা হত। কেউ চুরি করলে তাকে টাকা জরিমানা করার চল ছিল। এরপর আসল শৃঙ্খলাকেন্দ্রিক শাস্তিব্যবস্থা। যেখানে সকল অপরাধের একই শাস্তি: কারাদণ্ড। সমস্যাটা হল ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে। এই যে শাস্তি ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটছে, তার যুক্তিটা কী? ফুকোর দাবি ছিল এইসব পরিবর্তনকে যৌক্তিক ক্রমবিন্যাস আকারে দেখলে কিছুই বোঝা যাবে না, কারণ পরিবর্তনটা ঘটছে ঘটনার মারফতে। যেইসব ঘটনা আবার সিঙ্গুলার, একক। ঘটনাকে কাঠামো দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। কিন্তু সেই ফুকোই আবার বলেন, আমরা যতই ঘটনার পটভূমিকে ব্যবচ্ছেদ করি, ততই দেখি সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ক্ষেত্রে তাদের উপস্থিতি। শাস্তিব্যবস্থার “কারাদণ্ডীকরণ’ পর্যালোচনা করতে গেলে দেখা যাবে শিক্ষাব্যবস্থা, সামরিকব্যবস্থা এমনকি উপযোগিতাবাদি দর্শনের সাথে তার কাঠামোগত সামঞ্জস্য। ঘটনার মালমসলা হাজির থাকে, কিন্তু সেই মালমশলা দিয়ে একাধিক তরকারি তৈরি করা সম্ভব। কেন শেষ পর্যন্ত একটা বিশেষ ঘটনা ঘটল, সেই প্রশ্নের উত্তর তাই কাঠামো থেকে অবরোহণ করে আনা সম্ভব নয়। ইতিহাস আর ঘটনার মাঝখানে যেন বিরাজ করে “বোধগম্যতার প্রাচুর্য” কিন্তু “ঘাটতি রয়ে যায় প্রয়োজনীয়তার।” ঘটনা এক আচমকা ঝড়, যাকে আবহাওয়ার রিপোর্টের মত আগে থেকে নির্ধারণ করা যায় না। আর কখনো আগে থেকে আন্দাজ করতে পারলেও সেই ঘটনার মুহূর্তটা নির্ধারণ করা যায় না।

ঘটনা যখন ঘটে যায় তখন পূর্ববর্তী আর পরবর্তীর মধ্যে এক অমোচনীয় দূরত্ব রচিত হয়। ঘটনার বিশেষত্ব বুঝতে গেলে আবার তার অগ্রপশ্চাৎ হিসাবে আনা লাগে। একটা ঘটনা কতবড় ঘটনা ছিল তা বোঝার জন্য পূর্বাপরের দুইবিন্দুকে দৃশ্যমান করা লাগে। শুধু ঘটনার দিকে তাকালে তাই ঘটনার মর্ম অনুধাবন করা যায় না। মাহমুদুল হক এই কথাটা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন বলেই জীবন আমার বোন উপন্যাসটা মুক্তিযুদ্ধের আগের মুহূর্তে স্থিত। এই কারণেই, আমি বলব, জীবন আমার বোন মুক্তিযুদ্ধ নামক ঘটনাকে তার ঘটনাচরিত্রের মধ্যে প্রকাশিত করতে সক্ষম হয়েছে। যুদ্ধকালীন সময় ক্ষণিকের জন্য উপস্থিত। আর যুদ্ধপরবর্তী সময়(হীনতা) কাহিনি রদ হয়ে যাওয়ার পরের স্থবিরতা নিয়ে হাজির। খোকা ঘটনার সম্ভাব্যতাকে অস্বীকার করে করে আগায়। পঁচিশে মার্চ জীবন আমার বোন-এ অকস্মাৎ বিজলি চমকানোর মত ঘটনা ছিল না। তার ঘনঘটা ছিল আগে থেকেই বিরাজমান। ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার জন্য তাকে বারবার তাগদা দেওয়া হয়। খোকার বন্ধুরা দেয়, তার আত্মীয়স্বজনরা দেয়। ঢাকা ছেড়ে যাওয়া মানুষের ঢল দেখে খোকা ভাবে অন্য কিছুঃ “এতসব লম্ফঝম্ফ সেকি শুধু শহর ছেড়ে গ্রামে পালানোর জন্য…।” আন্দোলন করে জনতা যেন “লঙ্কাকাণ্ড” ডেকে আনছে। ডামি রাইফেল নিয়ে কুচকাওয়াজরত মানুষজনদের দেখে খোকার মনে হয় তাদের “হাতে কলকে এসে গিয়েছে, এখন কেবল গায়ে হাওয়া লাগিয়ে বেড়ানো।” খোকা ভাবে জনতা গাল বাড়িয়ে দিয়েছে থাপ্পড় খাওয়ার জন্য। তার কোন কোন বন্ধু তা মেনে নেয়। কিন্তু তারা বলে জনতার থাপ্পড় খাওয়াই দরকার, এত করে তারা আরো আত্মসচেতন হয়ে উঠবে, স্বাধীনতার তরে ঝাঁপিয়ে পড়বে। খোকা তা মানে না। জনতার কর্তাসত্তা অস্বীকার করার ফলে খোকা ঘটনাকেও অস্বীকার করে চলে। তার মনে হয় বাড়ানো গালে থাপ্পড় পড়লেই সব ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। খোকার এক-আধবার মনে হয় লোকজ্ঞানই মনে হয় ঠিক— কিছু একটা ঘটবে আবার। কিন্তু সেই মনে হওয়াটা অচিরেই উবে যায়, কারণ খোকা হিসাব মিলাতে পারে না। এই হিসাবে গরমিল হয়ে থাকে জনতা। ঘটনার ইঙ্গিত দেখেও খোকা তাই থিতু থাকতে চায়, ঘটনার বাইরে দাঁড়াতে চায়। খোকা বুঝতে পারছিল, এই ঘটনার কর্তা হতে উদগ্রীব সত্তার নাম জনতা। কিন্তু জনতার বাসনা তার কাছে অক্ষমের অবুঝ লাফালাফি—যেন এর কোন গন্তব্য নাই।

খোকার কাহিনি দিয়ে মাহমুদুল হক যে ঘটনার পূর্বাবস্থা নির্মাণ করেন, তাতে আশু ঘটনা অস্বীকৃত হয় না। খোকা যত অস্বীকার করে, তত ঘটনার ঘনঘটা সরব হয়। খোকা তাই সমকালের সাথে যোগাযোগ স্থাপনে, ভাব আদানপ্রদানে, গভীরভাবে অসমর্থ হয়ে পড়ে। গোটা উপন্যাসটাই এক হিসাবে খোকার ব্যর্থ সংলাপে খচিত। খোকা জনতাকে অবিশ্বাস করে শুধু ব্যক্তিবাদের চিন্তাহীন দূরত্ব থেকে তা নয়। তার কাছে মানুষ থেকে জনতা হয়ে ওঠাটা “আধা জানোয়ার” থেকে “পুরোপুরি জানোয়ার” হয়ে ওঠার সমান। মুখভরা অধিবিদ্যায় মুরাদ প্রত্যুত্তর দেয়, মানুষ সদা পরিবর্তন চায়। উন্নতি চায়। ইতিহাসের নিয়মের দোহাই পাড়ে সে। খোকা তা শুনে বলে গুহাবাসীর সাথে রবীন্দ্রনাথের কোন তফাত নাই। মানুষ বদলাতে পারে না। আর বদলালেও আধা-জানোয়ার থেকে পুরো জানোয়ার বনতে পারে বড়জোর। খোকার ধারণাকৃত এই “মানুষ” নেহাত মনুষ্যপ্রজাতির নাম নয়। তার গূঢ়তর অর্থ না-জনতা, অরাজনৈতিক সত্তা। ইয়ুরোপের আদি আধুনিক রাজনৈতিক শাস্ত্রে মানুষের এই অবস্থার নাম দেওয়া হয়েছিল প্রকৃতি রাজ্য। সমাজগঠনের চুক্তি সম্পাদনের মধ্য দিয়ে সেই আধা-জানোয়ার মানুষ প্রকৃতি রাজ্য থেকে রাজনৈতিক সমাজের না-জানোয়ার নাগরিক হয়ে ওঠা তার পরের কাহিনি। খোকা সেই কাহিনিকে উল্টে দেয়। আধা-জানোয়ার থেকে মানুষ কেবলই পূর্ণ জানোয়ার হতে পারে। মানুষের জনতা হয়ে ওঠায় তাই তার ঈমান নাই।


mahmudul-haque-2.jpgউপন্যাসজুড়ে খোকার মারফতে দুইটা প্রশ্ন ফিরে ফিরে আসে। জনতা আর দেশ কী জিনিস? জনতার আধার হিসাবে সবাই যেহেতু দেশকে ধরে নিচ্ছিল, খোকার জিজ্ঞাসায় তাই “দেশ” ও একটা অংশ হয়ে যায়। দেশ এবং মানুষের ধারণাগত সম্পর্ক নিয়ে, বিশ শতকের উপনিবেশবিরোধী প্রেক্ষাপটে, ভারতবর্ষের অনেক ভাবুকই চিন্তা করেছেন। রবীন্দ্রনাথের উত্তরটা ক্রমে সর্বজনগ্রাহ্য কাণ্ডজ্ঞানের অংশ হয়ে উঠে। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেনঃ “দেশ মানুষের সৃষ্টি। দেশ মৃন্ময় নয়, সে চিন্ময়। মানুষ যদি প্রকাশমান হয় তবেই দেশ প্রকাশিত। সুজলা সুফলা মলয়জশীতলা ভূমির কথা যতই উচ্চকন্ঠে রটাব ততই জবাবদিহির দায় বাড়বে। প্রশ্ন উঠবে প্রাকৃতিক দান তো উপাদান মাত্র, তা নিয়ে মানবিক সম্পদ কতটা গড়ে তোলা হল। মানুষের হাতে দেশের জল যদি যায় শুকিয়ে, ফল যদি যায় মরে, মলয়জ যদি বিষিয়ে ওঠে মারীবীজে, শস্যের জমি যদি হয় বন্ধ্যা, তবে কাব্যকথায় দেশের লজ্জা চাপা পড়বে না। দেশ মাটিতে তৈরী নয়, দেশ মানুষে তৈরী।” মহাত্মা গান্ধীর ডাকে সাড়া দিয়ে নেহরু যখন গ্রামগঞ্জ বোঝার চেষ্টা করছেন, তখন গ্রামবাসীদের তিনি জিজ্ঞেস করতেন, ভারতবর্ষ তথা দেশ কী জিনিস। সহসা এই প্রশ্ন শোনে গ্রামবাসী থমকে যেত, যেন যে প্রশ্নের উত্তর তারা সবাই জানত বলে ধরে নিত সেই প্রশ্নের সহজ কোন উত্তর নাই। তারপর ভেবেচিন্তে এক বর্ষীয়ান গ্রামনিবাসী বললেন, ভারতমাতা হল ভারতের জমিন, মাটি। নেহরু তখন শুধালেন, কোন মাটি? এই গ্রামের মাটি, ওই গ্রামের মাটি, কোনটি? তারপর আলোকিত নেহরু ক্রমে “সঠিক” উত্তরটা জানান দিলেন। ভারতবর্ষ মানে এদেশের জনগণ। তা শোনে গ্রামবাসী প্রথমে বিস্মিত হত, তারপর, নেহরুর বয়ানমতে, সত্যপ্রাপ্তির দিব্যালোকে ক্রমশ উদ্ভাসিত হয়ে উঠত। খোকা এই সত্যপ্রাপ্তিতে তুষ্ট হতে নারাজ। কিন্তু তার মাথায় বিকল্প কোন উত্তর খেলা করে না। সে শুধু অস্বীকার করতে করতে আগায়। দেশ তার কাছে এক জলজ্যান্ত সত্তা হয়ে উঠে যা জনতাকে হাঙরের মুখে ঠেলে দিতে উন্মুখ। খোকা সেই জনতার অংশ হতে অপারগ। সে রক্ত দিতে চায় : “দেবো না! এক মুহূর্তে ব্যারিকেড হয়ে যায় খোকা; আমরা রক্ত দিতে শিখি নি! যে দেশ রক্ত দাও, রক্ত দাও বলে দুশো বছর ধরে চিৎকার করে চলেছে আমাদের কেউ নয় সে, দেশমাতৃকা তুই নস! যে দেশ কেবল জন্মান্ধ রাক্ষসপ্রবৃত্তি চরিতার্থ করার অভিপ্রায়ে লক্ষ লক্ষ দরিদ্রকে তোড়ের মুখে ভাসিয়ে নিয়ে যায়, ভূরিভোজের উৎসবে নিমন্ত্রণ করে হাঙরকে, তাকে বিশ্বাস নেই, দেশমাতৃকা তুই নস!” খোকা একদিকে যেমন জনতাকে কর্তাসত্তাহীন বস্তু আকারে শনাক্ত করে, তেমনি দেশকে এক বিধ্বংসী বাসনার রূপ হিসাবে চিহ্নিত করে। এই বোধে দেশ আর মানুষের সমার্থকতা প্রশ্নবিদ্ধ। খোকা ধরতে পারে “দেশাত্মবোধের” দুর্মর টান মানুষকে জনতা করে তোলছে, কিন্তু সেই টানের প্রতি তার তুমুল অবিশ্বাস। এক হিসাবে দেশ আর মানুষের সমকেন্দ্রিকতার যে কাহিনি রবীন্দ্রনাথ কিংবা নেহরু বলেন তার অরাজনৈতিকতা দেখাতে খোকা সহায়তা করে। আমরা আগেই দেখেছি, মানুষ কীভাবে একটা রাজনীতি-পূর্ব নামপদ আকারে হাজির থাকে। নেহরুকথিত ভারতবর্ষের মানুষ ওই ভূখণ্ডের সকল লোকের সমষ্টি, তা বিচ্ছিন্ন ব্যক্তির সমাহার। অর্থাৎ এই মানুষ জলজ্যান্ত কোন সত্তা না। জনতা, অন্যদিকে, একটা সচল এবং করণক্ষম সত্তা। রাজনীতির কেন্দ্রে যা বিদ্যমান থাকে তার নাম জনতা। জনতা মাত্রই আবার বিশেষ। ফরাসি বিপ্লবের জনতা, অক্টোবর বিপ্লবের জনতা, কিংবা একাত্তর সালের জনতা। এই বিশেষায়ন প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে বিশ শতকের উপমহাদেশে বিদ্যমান ছিল “দেশ”–যার সাধারণ নাম রাজনৈতিক সমাজ। জনতার “দেশ” এবং মানুষের “দেশ” তাই আলাদা আলাদা। খোকা অবিশ্বাসী হলেও তার প্রশ্নমুখর প্রতিরোধ রাজনীতিশাস্ত্রের এই মৌলিক সমস্যাটাকে মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষিতে জীবন্ত করে তোলে।

এক কীভাবে বহুতে মিশে যায় খোকা তা ধরতে পারে নাই। জীবন আমার বোন-এর কৃতিত্ব খোকার এক হয়ে থাকা দেখানোয় নয়, বহুত্বের জয় দেখানোতেও নয়—তার সাফল্য এই দুইয়ের মাঝখানের দ্বন্দ্বমুখর মুহূর্তকে জ্যান্ত করে তোলতে পারায়। খোকার এই দ্বিধাসঙ্কুল মনোভাবের বদৌলতেই একাত্তর সালের আগে আগে যে জনতা আত্মপ্রকাশ করছিল, তাদের আবির্ভাবটা ঘটনার মাহাত্ম্য নিয়ে জীবন আমার বোনে নির্মিত হয়। যেহেতু জনতাকে সে সহজভাবে প্রকৃতির অংশ হিসাবে মেনে নিতে অক্ষম, তাই মানুষের জনতা হয়ে ওঠা তার কাছে প্রখরভাবে হাজির হয়। কিন্তু মানুষ কেন জনতা হয়ে উঠছে তা সে বোধগম্যতার আওতার ভিতর নিয়ে আসতে পারে না। এই প্রক্রিয়া তার কাছে অর্ধপতন থেকে পূর্ণপতনের মতন। আবার যারা মানুষের জনতা হয়ে ওঠাকে শুধু অন্যায়ের প্রতিবাদ হিসাবে দেখে, তারা খোকার কাছে সংবাদপত্রের খবরের মতন অন্তর্জ্ঞানহীন। যে জনতা কয়েক বছর আগেই আইয়ুব খানকে স্বাগত জানাতে বানের জলের মত উপচে পড়েছিল, সেই জনতাই স্বাধীনতার দাবিতে উন্মাতাল। দুই জনতার মধ্যে কী তফাত খোকা তা বুঝতে পারে না। কারণ এই দুই “জনতার” আলাদা সংঘটন খেয়াল করবার অবকাশ তার হয় না। জনতা তার কাছে এক উদ্যত সত্তা যা ক্রমে সবকিছু গ্রাস করে নিবে। দাবিদাওয়াসমেত সক্রিয় জনতা আর নেহাত দর্শক জনতার মাঝে কী তফাত আছে তা ঘাঁটবার অবকাশ নাই তার। মুক্তিযুদ্ধের যে স্বতঃপ্রমাণিত বয়ান আছে যেখানে জনতাকে ইতিহাসের স্রোতের সাথে ভেসে চলা এক সত্তা হিসাবে দেখা হয়, খোকার অস্বচ্ছ অবিশ্বাসী আয়না সেই জনতার কর্তাসত্তাকে দেখায়, যদিও খোকা সেই দৃশ্যে ঈমান আনে না। তাকে খারিজ করার চেষ্টায় রত থাকে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে জনতাই যে প্রধান কর্তা জীবন আমার বোন সেই বোধকেই ভাষা দেয়। তিন অক্ষরের হালকা পাতলা একটা শব্দ মানুষের জনতা হয়ে ওঠাই মুক্তিযুদ্ধের এককত্ব, তার ঘটনাচরিত্র। কিন্তু খোকার কাহিনি এই প্রেক্ষাপটে কোথায় ঠাঁই পায়? মাহমুদুল হক খোকার বোঝাপড়াকে যুক্তি দিয়ে খণ্ডাবার চেষ্টা করেন না। সকল জিজ্ঞাসার উত্তর মিলে আরেক ঘটনায়। কিংবা ঘটনার পরিশিষ্টে।


খোকার আত্মবয়ানের মধ্য দিয়ে এই উপন্যাস উন্মোচিত হয়। মুক্তিযুদ্ধের প্রাকমুহূর্তে যে রাজনৈতিক, সামাজিক এবং আস্তিত্বিক দিগন্তের উন্মেষ হচ্ছিল, খোকা তার অস্বচ্ছ আয়না। আর অস্বচ্ছ বলেই তার মধ্য দিয়ে অর্থের বহুরকম প্রতিসরণ ঘটে—খোকা নিজে সেইসব অর্থকে আত্তীকৃত করতে পারুক বা না পারুক। খোকা অপ্রস্তুত— আশু ঘটনাকে মোকাবিলার কোন আস্তিত্বিক প্রস্তুতি তার নাই। সে আবার নিরাসক্ত দর্শকও নয়। এক হিসাবে সে মুক্তিযুদ্ধ নামক ঘটনার না-কর্তা। মুক্তিযুদ্ধের যারা বিরোধিতা করেছিল, যারা প্রতি-কর্তা, তারা ঘটনায় সাড়া দিয়েছিল বিরোধাত্মক দিক থেকে। খোকা ঘটনায় সাড়া দিতেই অপারগ—পক্ষ বিপক্ষ নেওয়া তো পরের কথা। জনতার সাথে খোকার ব্যক্তিক সংগ্রামের বয়ানে তাই জলজ্যান্ত হয়ে ওঠে মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাচরিত্র। ঘটনাচরিত্র বলতে আমি কী বোঝাচ্ছি তা একটু পরিষ্কার করা দরকার। আমরা আগেই যেমন দাবি করেছি, ঘটনার মানে হল ইতিহাসের ছেদ, এবং সেই ছেদের ফলে রাজনৈতিক-সামাজিক জগত রূপান্তরিত হয়। মুক্তিযুদ্ধের সেই ঘটনাচরিত্র বুঝতে হলে তার জগত-রূপান্তরকারী শক্তিকে আমলে আনতে হবে। আর খোকার কাহিনী ঘটনার সেই শক্তিকেই দৃশ্যমান করে তোলে। ঠিক এই কারণেই মাহমুদুল হকের জীবন আমার বোন শেষপর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রচিত মহত্তম উপন্যাসের একটা; বইয়ের প্রধান চরিত্র খোকা মুক্তিযুদ্ধের না-কর্তা হলেও—বা সে তা বলেই—এই কাহিনির মূল কর্তা জনতা।

খোকা এক অবিশ্বাসী দর্শক। পাকিস্তানিদের জন্য তার কোন দরদ নাই—কোন বিশেষ খেদও নাই। পাকিস্তানি শাসন অন্যায্য এটা মেনে নিতে দৃশ্যত তার আপত্তি নাই। সে বরং তার বন্ধুবান্ধবদের এবং জনতার প্রতিরোধ নিয়ে চিন্তিত। মাহমুদুল হকের নির্মিত খোকা এক কেন্দ্রবিহীন সত্তা। নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ জারি রাখতে গেলে “নিজ” কী জিনিস তা জানার দরকার হয়। খোকা একবার বলে তার আপন নিজস্ব যা আছে তা “যন্ত্রণা।” কিন্তু যন্ত্রণাকে সে পুরোপুরি খুঁটি আকারে মেনে নিতে পারে না। তার আরো এক কেন্দ্রের দরকার হয়—যাকে বলা যায় অনুপস্থিত কেন্দ্র। সেই কেন্দ্রের নাম রঞ্জু, যার সাপেক্ষে খোকা তার জীবনকে স্থিত করে। আর তাই এই উপন্যাসের নাম জীবন আমারবোন।

খোকা তর্কপ্রবণ। প্রতি কথায় যুক্তি আছে। কিন্তু বহুবিধ বিচ্ছিন্ন যুক্তির ভিতরে সামঞ্জস্যময় যুক্তি স্থাপন করতে সে ব্যর্থ। যুক্তির যেখানে ছেদ ঘটে সেখানেই শুরু হয় রঞ্জুর আনাগোনা। রঞ্জু তার ছোটবোন, যাকে সে অকর্ষিত জমির মত জনজীবন থেকে আগলা করে রাখতে চায়। খোকা নিজে অকর্ষিত জমি না, সে তার রক্ষক। তার বন্ধুরা একেকজন সম্ভাব্য হন্তারক, যাদেরকে খোকা রঞ্জুর হন্তারক আকারে কল্পনা না করে পারে না। খোকার প্রেমিকারাও রঞ্জুর প্রতিপক্ষ। নীলা ভাবীর সাথে মিলিত হওয়ার পর খোকা ভীত। তার ভয় কোন সহজ ট্যাবু ভাঙ্গার উৎস থেকে আসে না। প্রেমিকার অপবিত্রতাকে সে ক্ষণেক্ষণে রঞ্জুর পবিত্রতার বিপরীতে স্থাপন করে। নীলা ভাবীর বিপরীতে রঞ্জুকে খাড়া করিয়ে খোকা ভাবেঃ “তুমি যদি একটা বাইসন হও রঞ্জু একটা হরিণছানা, তুমি লুলু চৌধুরী সব এক গোয়ালের গরু, মালটানা গাব্দাগোব্দা লেল্যান্ড ট্রাক-বিশেষ, চাকার তলায় পড়লে খেল খতম, গনফট্”। রঞ্জুকে সে “ট্রাকের তলায়” পড়া থেকে রক্ষা করতে চায়। রঞ্জু আর দুনিয়ার মাঝখানে সে প্রহরীর মত ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে চায়। নারী আর জনতাকে খোকা যেন এক কাতারে নামিয়ে আনে। ঊনবিংশ শতাব্দীর মনোবিজ্ঞানীরা জনতার মনস্তত্ত্ব পাঠ করতে গিয়ে যেমন নারী আর পাগলের সাথে জনতার সামঞ্জস্য খুঁজে পেতেন, তেমনি খোকার বোঝাপড়ায় নারী, কামগ্রস্ত পুরুষ, আর উদ্যত জনতার ব্যবধান ঘুচে যায়। এরা সবাই যেন রঞ্জুকে বধ করতে চায়। কিন্তু রঞ্জু কীসের প্রতীক? সে না-নারী। খোকার ভাষায় সে “একটা টিনটিনে ফড়িং। দেখে মাতলামি চাগিয়ে ওঠার মত কিছুই নেই ওর শরীরে। আদর করে একটু জোরে চাপ দিলেই মুড়মুড়িয়ে ভেঙে যাবে ওর হাত… এতো পলকা এতো কোমল যে সামান্য একটি দূর্বাঘাসের ভারও তার জন্য অনেক; এইভাবে তাকে তুলোয় মুড়ে রাখতে খোকার ভালো লাগে।” রঞ্জু যেন জগতের বাইরে বিদ্যমান। খোকা ভাবে রঞ্জু এক ঘরকুনো মেয়ে, যে খোলা বারান্দায় দাঁড়িয়েও রাস্তার দিকে তাকানোর দরকার বোধ করে না। রঞ্জুকে এইভাবে নির্মাণের মধ্য দিয়ে খোকা এক নির্মিত সত্তার মধ্যে নিজেকে গেঁথে দেয়, যে সত্তা না-নারী, না-জনতা, না-জগত।

ঢাকা শহর হঠাৎ করে জনতার দখলে চলে গেল— যে জনতা জনগণের সক্রিয় রূপের নাম। জনতা দ্বারা খোকা গভীরভাবে আক্রান্ত হয়। জনতাকে বোঝার জন্য তার সকল চেষ্টাই তাই ঋণাত্মক। জনতার এই রাজনৈতিক উদ্দামে খোকার বিশেষ আগ্রহ নাই। সে চেষ্টা করে তাদের যুক্তি খুঁজে বের করতে। একবার ভাবে তারা কেবল গুজবে ছোটে। মজা মারতে চায়। তার বন্ধু মুরাদ, রাজিব ভাই এরা কাগজের ভাষায় কথা বলে। বলে, জনগণ স্বাধিকার আদায়ের দাবিতে মাঠে নেমে এসেছে। রঞ্জু তা মানে না। আবার সে কোন ব্যাখ্যা দিতে পারে না। তার ব্যাখ্যা যা আছে তা সরল, অলস অবিশ্বাসীর বাস্তবতাবাদিতার মতনঃ “মুক্তিটুক্তির…সম্পর্কে তাদের [জনতার] কোন স্বচ্ছ ধারণা আছে, প্রোগ্রাম আছে? অর্থনৈতিক মুক্তি ছেলের হাতের মোয়া নয়। লেখাকথা আর কি, বোবা-ব্যাঁকা-হাবা-কালা বেঁড়েদের ঐক্য আবার ঐক্য!” জনতার দৈন্য আর বন্ধুদের আস্তিত্বিক দৈন্য যেন একাকার। এরাই তো জনতার অংশ, খোকা ভাবে, কিন্তু এদের কোন প্রস্তুতি নাই। যুক্তি নাই। তারা কি চায় তা জানে না। জনতা তবে কীসের তরে ছোটছে? এইখানে আবার রঞ্জু তাকে দিশা দেখায়। খোকা ভাবে—চেতনে, অবচেতনে— জনতা (যার অংশ মুরাদ, ইয়াসিন, নীলা ভাবী, লুলু চৌধুরী) রঞ্জুর মত অকর্ষিত জমিতে লাঙ্গল গাড়ার তরে ছোটে চলেছে। খোকার গভীরতর অবচেতন সিদ্ধান্ত দাঁড়ায়ঃ এই অসংস্কৃত “গাঁওয়া” আত্মজ্ঞানহীন জনতা হল অসূর্য্যাস্পর্শা “ঘরকুনো” রঞ্জুর হন্তারক।

মাহমুদুল হক উপন্যাসের শেষটা বর্ণনা করলেন দুই দণ্ডে। তার বয়ান ভঙ্গির মধ্যে ভর করে থাকে স্থবিরতা। খোকার কাহিনি যেন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে ঘটনার সমাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে। পরসমাচার দেওয়ার ছলে মাহমুদুল হক রঞ্জুর মৃত্যসংবাদ অবহিত করেন। রঞ্জু মারা যায় জনতার পায়ের নিচে পড়ে। পঁচিশে মার্চের পরে, যখন মানুষের ঢল ঢাকা ছেড়ে পালাচ্ছে, খোকা তখন অসুস্থ রঞ্জুকে নিয়ে বুড়িগঙ্গার পাড়ে। গুলিবর্ষণের মধ্যে মানুষের, না জনতার, সাথে মিশে গিয়ে খোকা দৌড়ায়, আর রঞ্জু জনতার পায়ের তলায় পড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। খোকা শেষমেষ জনতার অংশ হতে বাধ্য হয়েছিল। জনতা আর ঘটনা যখন একসাথে এসে মিলে, তখন নতুন ইতিহাসই তৈরি হয়। জনতার ইতিহাস হয়ে ওঠাকে রোধ করতে গিয়ে খোকার জীবন—তথা তার বোন— থমকে যায়। জনতা রঞ্জুকে হরণ করতে চায়নি, তা ইতিহাসে ছেদ রচনা করতে চেয়েছিল। জনতার গতিমুখ থেকে রঞ্জু তার ব্যক্তিগত পথ সহসা বিচ্ছিন্ন করতে পারত না। ঘটনা সকল বলয়কে গ্রাস করে। খোকা তা পাঠে ব্যর্থ ছিল। মুরাদ ইয়াসিনও ঘটনার বহির্দেশে আটকে ছিল। তবে তারা ঘটনার প্রতি ঈমান রেখেছিল। খোকা শেষমেশ না-কর্তা হয়ে দাঁড়াল কারণ সে ঘটনা বুঝতে পারে নাই শুধু এই হেতু নয়। ঘটনাকে সে অস্বীকার করেছে বলেই যেন তা তার উপর বজ্রাঘাতের মতন এসে পড়ল। ঘটনার অবশেষে দাঁড়িয়ে খোকা ভাবে জনতার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকার অধিকার “[তা]র বিষণ্ণ দেশ কিছুতেই দিতে পারে না রঞ্জুকে।” খোকার সিদ্ধান্ত দাঁড়ায় দেশ তবে একটা পুকুর, যেখানে রঞ্জুরা চিরতরে ডুবে গিয়েছে। দেশ আর সময়হীনতা তার কাছে একাকার হয়ে যায়। কর্তার জন্য ঘটনা-পরবর্তী সময় ঘটনার পিছনে থাকা দাবিদাওয়াকে ফলিত করার কাল। প্রতি-কর্তার জন্য ঘটনাকে নতুন করে অস্বীকারের যুদ্ধ। কিন্তু খোকার মত না-কর্তার জন্য ঘটনার উত্তরকাল পুকুরের মতই স্থবির। এই স্থির সময়ে ঘটনার রেশ থেকে যায়, কিন্তু গতি থাকে না। খোকার এই ব্যক্তিগত কাহিনি থেকে যে সত্যটা ঠিকরে বের হয়, তা মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাচরিত্র, যে ঘটনা ইতিহাসের ক্রমপরিণতি থেকেআলাদা বলেই তা ইতিহাসে ছেদ রচনা করতে সক্ষম হয়েছিল।


জীবন আমার বোন লেখা হয় মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত পরে, ১৯৭২ সালে। আর বই আকারে প্রকাশিত হয় প্রায় ১৯৭৬ সালে। তারও আগে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হওয়া শুরু হয়। সেই থেকে আজ অব্দি জীবন আমার বোন একই সাথে যেমন একটা ক্লাসিকের মর্যাদা পেয়ে আসছে, তেমনি উৎপাদন করছে তীব্র প্রতিক্রিয়া, যার অনেকাংশই নেতিবাচক। মাহমুদুল হক নিজেই জানান দিচ্ছেনঃ “গত পনেরো-ষোলো বছরে এত পরস্পরবিরোধী আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে যে মাঝে মাঝে আমি নিজেই বিভ্রান্ত হয়ে যাই।” উপন্যাসটার বিরুদ্ধে বিদ্যমান অভিযোগগুলো মোটামুটি সমধর্মী—তা একাত্তর সালের প্রতি সুবিচার করতে পেরেছে কি না সেই প্রশ্ন ঘিরে আবর্তিত। যখন এই বঙ্গে বৃহত্তর জনগণের অংশগ্রহণে একটা যুদ্ধ ঘটছে, সেই সময়ে খোকার মতন বিযুক্ত-বিচ্ছিন এক চরিত্রের কাহিনি নির্মাণ করার যুক্তি কি তা নিয়ে প্রশ্ন আজো জারি আছে। উপন্যাসটা ঘিরে আরেকটা মুখ্য আপত্তি ইতিহাসকেন্দ্রিক। এক সাক্ষাৎকারে নাম না করে মাহমুদুল হক সমকালীন এক সমালোচককে উদ্ধৃত করেছিলেন এই মর্মে। সেই বাণীটা সমালোচনাসূত্রের সারবস্তু বুঝতে সাহায্য করতে পারেঃ “মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত পূর্বের অবস্থার দারুণ বর্ণনা আছে এ বইয়ে, কিন্তু সে রকম অবস্থা কেন সৃষ্টি হল, কারা ছিল পেছনে, তা উপলব্ধি করার কোন উপায় নেই।” মাহমুদুল হক তাঁর মত করে প্রত্যুত্তরে বলেছিলেন, এই উপন্যাস ইতিহাসশাস্ত্র নয়। তবে আমরা বলব, এই উপন্যাস ইতিহাসশাস্ত্রের নথি না হলেও তা মুক্তিযুদ্ধ নামক ঘটনার স্বরূপ প্রকাশে বিশেষভাবে সমর্থ হয়েছে। কারণ তা মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাচরিত্রকে যে প্রখরতায় নির্মাণ করেছে এবং সে ঘটনার কর্তাকে যেরূপে হাজির করেছে তা বিরল। ইতিহাসের কাহিনি নথিকারের মত না বলেও যে ইতিহাসের দর্শনকে দৃশ্যমান করা যায় জীবন আমার বোন তার আরেক প্রমাণ ছাড়া কিছু নয়। প্রথম অভিযোগটার উত্তর দিতে গিয়ে মাহমুদুল হক কোন ব্যাখ্যা দেন নাই। এক প্রয়োজনীয়তার কথা তোলেছেন কেবলঃ “খোকাকে বিচ্ছিন্ন, বিযুক্ত দেখাবার জন্যই ওরকমটি করতে হয়েছে। খোকার ওখানে ভালো লাগে নি। খোকা যে ওখানকার অন্য সবার চেয়ে আলাদা সেটা দেখাবার জন্য আমি আর কীই-বা করতে পারতাম?” বাংলা সমালোচনার পরিমণ্ডলে এই প্রশ্নটা অনেকদিন ধরে ঘোরাফেরা করছে, অর্থাৎ কাহিনিকার বা কবি কেন একটা বিশেষ বিষয়কে বিশেষভাবে নির্মাণ করলেন। যেন লেখকের অভিপ্রায় থেকে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া সম্ভব! `আট বছর আগের একদিন’ কবিতার প্রেক্ষিতে জীবনানন্দ দাশকে আত্মঘাতী ক্লান্তির দোষে দুষ্ট করা হয়। জীবনানন্দ উত্তরে বলেছিলেনঃ “ ‘আত্মঘাতী ক্লান্তি’ আমার কবিতার প্রধান আবহাওয়া নয়… কবিতাটি [আট বছর আগের একদিন] subjective নয়, একটা dramatic representation মাত্র… Hamlet বা Lear বা Macbeth এর ‘আত্মঘাতী ক্লান্তি’র সঙ্গে শেকস্পীয়ারের যা সম্পর্ক, ও কবিতার ক্লান্তির সঙ্গে লেখকের সম্পর্কটুকুও সেই রকম।” জীবনানন্দের কথাটাই মাহমুদুল হক তাঁর মত করে ব্যক্ত করেছেন, খোকাকে বিচ্ছিন্ন করে দেখাবার প্রয়োজন ছিল– সেই ব্যাখ্যা দিয়ে। কিন্তু এই প্রশ্ন এবং উত্তর বিশেষ গুরুত্ববহ নয়। খোকাকে কেন বিযুক্ত চরিত্র হিসাবে নির্মাণ করা হয়েছিল সেই প্রশ্নে আটকে থাকা মানে কাহিনির বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা। একটা ঘটনা তিন রকমের কর্তার জন্ম দিতে পারেঃ কর্তা, প্রতি-কর্তা, না-কর্তা। কর্তা জনতার বিপরীতে নিজেকে দাঁড় করালেও খোকা প্রতি-কর্তা হয়ে ওঠে নাই। জনতা আর তাদের রাজনৈতিক শত্রুর দ্বন্দ্বে বাইরে সে দাঁড়াতে চাচ্ছিল। সে তাই না-কর্তা। জনতার সাথে না-কর্তা খোকার অভিঘাত কীভাবে পুরো ঘটনার রাজনৈতিক-দার্শনিক মাহাত্ম্য দৃশ্যমান করে তোলে তা আমি এতক্ষণ দেখানোর চেষ্টা করেছি।

আমাদের সাহিত্য সমালোচনা যতক্ষণ পর্যন্ত চরিত্র-কেন্দ্রিক আলোচনায় রত থাকবে, ততক্ষণ অব্দি কাহিনির বহিরঙ্গ দেখেই আমরা সিদ্ধান্ত টেনে যাব, অন্তর্গত যুক্তি দেখে নয়। খোকা জনবিচ্ছিন্ন বলেই জীবন আমার বোন নিষ্ক্রিয়তা বা বিচ্ছিনতার দলিল এমনটা ধরে নেওয়ার কোন অবকাশ নাই। নিষ্ক্রিয়তা এবং সক্রিয়তা, কর্তা এবং না-কর্তার মধ্যকার দ্বন্দ্বখচিত জমিন দৃশ্যমান করতে পেরেছে বলেই জীবন আমার বোনে মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাচরিত্র এত প্রকটতা নিয়ে জায়মান হয়। মানুষ থেকে জনতা হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটা মাহমুদুল হক যেভাবে দেখিয়েছেন তাও উত্থাপন করে মৌলিক দার্শনিক জিজ্ঞাসা। জীবন আমার বোন বাংলা সাহিত্যে অনন্য এক ঘটনা। সেই ঘটনার ঝলক অনেককেই মুগ্ধ করেছে। কিন্তু কেন তা ঝলকানি ছড়ায় সেই প্রশ্নের বিশেষ তালাশ হয় নাই। এই লেখাটা মুগ্ধতা এবং নিন্দার বলয় ছাড়িয়ে জীবন আমার বোন নিজেই কেন একটা ঘটনা সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চেষ্টা করেছে।
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন iqbal hasnu — জানুয়ারি ১৯, ২০১৫ @ ৩:০৭ পূর্বাহ্ন

      আমাদের প্রচলিত সাহিত্য সমালেচনার জগতে নতুন ভাবনা-চিন্তা ও তত্ত্বায়নকে সম্ভাবনাময় করে তোলার জন্য নাজমুলকে ধন্যবাদ। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বানানত্রুটি পরিহার করা দরকার ছিল।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Azizul Rasel — জানুয়ারি ২১, ২০১৫ @ ১২:৫১ অপরাহ্ন

      A good piece and worthy to read. Thanks Nazmul.

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com