পিতৃপ্রতিম ডক্টর খান সারওয়ার মুরশিদ

সৈয়দা আইরিন জামান | ১৫ জানুয়ারি ২০১৫ ৫:৪৯ অপরাহ্ন

border=0অধ্যাপক ডক্টর খান সারওয়ার মুরশিদ স্যারের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয় ১৯৯৯ সালে তাঁর ধানমণ্ডির বাড়িতে। সে সময় নজরুল জন্মশতবার্ষিকীর আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে আমি একজন সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করছিলাম।

নজরুল ইনস্টিটিউটের তৎকালীন নির্বাহী পরিচালক কবি মুহম্মদ নুরুল হুদা আমাকে ডেকে নজরুলবিষয়ক কিছুসংখ্যক গ্রন্থ প্রদান করে মুরশিদ স্যারের বাড়িতে যেতে বললেন। বিষয়টি সম্পর্কে তিনি যা ব্যাখ্যা করলেন, তা হল এই নজরুল জন্মশতবার্ষিকীর দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক কনফারেন্সের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে খান সারওয়ার মুরশিদ স্যারকে ইনস্টিটিউটের পক্ষ থেকে সভাপতির আসন অলঙ্কৃত করবার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু তিনি (মুরশিদ স্যার) বিষয়টি সম্পর্কে কোনো মতামত জানাননি। কবি নূরুল হুদা আমাকে বললেন, ‘তুমি স্যারের কাছে গিয়ে সম্মতি নিয়ে এসো, উনি নিশ্চয় তোমার কথা রাখবেন।’

হলোও তাই। মুরশিদ স্যার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতির আসন পূরণ করতে সম্মত হলেন। প্রথম দর্শনেই আমি স্যারের অফুরান স্নেহ এবং ভালোবাসা অর্জন করলাম। তিনি নির্দিষ্ট দিনে জাতীয় জাদুঘরের সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে এলেন। ঐদিন মিলনায়তন নজরুল গবেষক, লেখক এবং অনুরাগীদের উপস্থিতিতে পরিপূর্ণ ছিল।

এরপর মাঝখানে বেশ কিছুদিন স্যারের সঙ্গে দেখা হয় নি, তবে দূরভাষে কথা হতো। তাতে স্যার সম্পর্কে অনেক কিছু জেনেছি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। কর্মজীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রবাসী সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের সদস্যের দায়িত্ব পালন করেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন তিনি ১৯৭২-১৯৭৪ সাল পর্যন্ত। পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি এবং চেকোশ্লোভাকিয়ার রাষ্ট্রদূত হিসেবেও তিনি কর্মরত ছিলেন। মুরশিদ স্যার ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রজন্মশতবার্ষিকীর সময় সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি বাংলাদেশে ট্রান্সপ্যারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের প্রথম চেয়ারম্যান নিযুক্ত হয়েছিলেন। ‘নিউ ভ্যালুজ’ নামে একটি জার্নাল সম্পাদনা করতেন তিনি।

স্যার সব সময়ই আমাকে ‘মাই সুইট মাদার’ বলে সম্বোধন করতেন। ইতোমধ্যে ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আমার একমাত্র পুত্রের জন্ম হয়েছে। আবার স্যারের সঙ্গে দেখা হল ২০০০ সালের শেষের দিকে বাংলা একাডেমির একটি অনুষ্ঠানে। মহাপরিচালকের দপ্তরে পাশে বসিয়ে স্যার নানা বিষয়ে কথা বললেন। আমি সবসময় মন্ত্রমুগ্ধের মতো স্যারের কথা শুনতাম। এমন চমৎকার শব্দবিন্যাশ, উচ্চারণ এবং স্বরভঙ্গিতে আমি কাউকে কথা বলতে শুনিনি। স্যার কখনও বাংলার সঙ্গে ইংরেজি মিলিয়ে কথা বলতেন না। কখনও কখনও কথা বলতে বলতে ঘণ্টা পেরিয়ে যেত। ব্যক্তিগত এবং সাহিত্যের নানা বিষয় সম্পর্কে কথা হত।

হঠাৎ করেই এক রাতে সংবাদ পেলাম, স্যার অসুস্থ অবস্থায় বারডেম হাসপাতালের ড্যাব সেন্টারে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আমাকে দেখতে চেয়েছেন। তখন আমি আইডিয়াল কলেজ সেন্ট্রাল রোডে পড়াই। ঐদিন ছিল নবীনবরণের অনুষ্ঠান। আলোচনা অনুষ্ঠান শেষ হবার পর সকলের অগোচরে বেরিয়ে আমি ড্যাব সেন্টারে চলে গিয়েছিলাম। গিয়ে শুনলাম, স্যারের কাছে কোন ভিজিটর যেতে পারবে না, ডাক্তারের নিষেধ রয়েছে।
আমি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অনুরোধ করলাম, শুধু আমার আসবার খবরটি স্যারকে জানাতে। জানাবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই একজন ডাক্টার এসে আমাকে স্যারের কাছে নিয়ে গেলেন। আমাকে দেখে স্যার আমার হাত ধরে কেঁদে ফেললেন। বললেন, ‘সত্যি তোমাকে আমি দেখছি, আমি তো ভেবেছিলাম তোমার সঙ্গে আমার আর দেখা হবে না।’

আমি স্যারকে শান্ত করে তাঁর কাছে বসলাম। ঐদিন যে কোনো কারণেই হোক আমার মন খারাপ ছিল। সেটি স্যারের চোখে অধরা রইল না। আমি বললাম, এক ব্যক্তি গতরাতে দূরভাষে অন্যায়ভাবে আমাকে কিছু কটু কথা বলেছে। স্যার বললেন, এ রকম অনেককিছুই মানুষের জীবনে ঘটে। তিনি একটি শব্দ বললেন, যার বাংলা অর্থ ‘রোদ্রোজ্জ্বল আকাশে হঠাৎ একখণ্ড কালো মেঘ’।

তিনি আরও বললেন আমরা এ জন্য কখনও প্রস্তুত থাকি না, তবে এটাই আমাদের মেনে নিতে হয়। স্যার তাঁর জীবনে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার কথা বললেন। স্যারের আম্মা তখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তিনি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে বের হয়েছেন, এমন সময় হাসপাতালের গেটে এক রিক্সাওয়ালা স্যারকে দেখে বলেছিল যে, স্যার তাঁর রিক্সায় করে মগবাজারে গেছেন কিন্তু রিক্সা ভাড়া দেননি। স্যার ভীষণভাবে রিক্সাওয়ালাকে বোঝাতে চেষ্টা করেছেন যে, তিনি তাঁর রিক্সায় চড়েননি এবং তিনি কখনও মগবাজারের যাননি। কিন্তু কোনোভাবেই রিক্সাওয়াকে বোঝাতে পারেনি। রিক্সাওয়ালা স্যারের কথা বিশ্বাস করেনি। রিক্সাওয়ালার আশপাশে জমে যাওয়া লোকজনও তাকেই (রিক্সাওয়ালা) সমর্থন করেছে। ফলে বাধ্য হয়ে স্যারকে রিক্সা ভাড়া দিতে হয়েছে। এ সময় আমি প্রায় দুঘণ্টা ড্যাব সেন্টারে ছিলাম। স্যার তাঁর দুই প্রিয়জন বিয়োগের ব্যথা যন্ত্রণাক্লিষ্ট হৃদয়ে আমাকে জানালেন। একজন তাঁর স্ত্রী নূরজাহান মুরশিদ, যিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরকারের মন্ত্রী ছিলেন; অন্যজন স্যারের নাতিছেলে সাবাব মুরশিদ।

স্যার সুস্থ হবার পর অন্য একদিন স্যারের বাসায় যাচ্ছিলাম। পথে স্যারের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হল। জানতে পারলাম স্যার হঠাৎ করেই কোনো একটি কাজে মতিঝিল গেছেন। এর পরদিন ছিল শুক্রবার। ঐদিন সকালে আমাদের মোহাম্মদপুরের পুরোনো বাড়ির জানালায় তাকিয়ে দেখলাম, মুরশিদ স্যার গাড়ি থেকে নামছেন। বিশ্বাস করতে পারছিলাম না, স্যার আমাদের বাড়িতেই এসেছেন। বসার ঘরে স্যারকে বসালাম। আমার স্বামী মঈনুল হাসান বাড়িতেই ছিলেন। কিন্তু তিনি স্যারের সামনে এলেন না। বললেন, ‘তোমার ধারণা নেই– উনি কত উঁচু মানের মানুষ, কত ভালো মানুষ। উনার মতো মানুষ বাংলাদেশে দ্বিতীয়বার জন্ম নেবে না। তোমার জন্য এসেছেন, তুমি যাও।’

স্যার বেশ কিছুক্ষণ ছিলেন। লবণ পানি পান করলেন এবং ফল খেলেন। অন্য একদিন আমার ছেলে অর্ককে নিয়ে স্যারের বাড়ি গেলাম। তিনি তাঁর লেখাপড়ার ঘরে আমাকে নিয়ে গেলেন এবং উনার চেয়ারে বসতে বললেন। আমি বসলাম না, এখন আফসোস হয় এবং অপরাধবোধে ভূগি– কেন স্যারের কথাটি রাখিনি।

২০০৭ সাল থেকে পিএইচডি গবেষক হিসেবে ব্যস্ততায় নিমগ্ন হতে হয় এবং বাড়ি Developer-কে দেবার ফলে নথিপত্রগত কারণে দূরভাষ নাম্বার বদলে যায়। ফলে স্যারের সঙ্গে যোগাযোগ কিছুটা বিঘ্নিত হয়। এর মাঝেই ২০০৭ সালে স্যার একটি অনুষ্ঠানের সভাপতি হয়ে বাংলা একাডেমিতে এলেন। দেখা হল। বারবার একই কথা বললেন, তোমাকে কতবার রিং করেছি। শরীর খুব একটা ভালো ছিল না, তাই অনুষ্ঠান শেষে মঈনুল হাসানের কাঁধে ভর দিয়ে বইমেলা ঘুরে দেখলেন। মঈনুল হাসান তখন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন। স্যার তাঁর প্রিয় মানুষের মধ্যে থাকতে পছন্দ করতেন, পছন্দ করতেন সবুজের সমারোহ, নান্দনিক সব কিছু। মার্জিত এবং রুচিশীল পোশাক পরতেন এবং মানুষ হিসেবে ভীষণ সৌখিন ছিলেন তিনি।

মাঝেমধ্যে আমার সঙ্গে স্যারের দেখা হত। মুঠোফোনে কথা হত। সব কথা ক্ষুদ্র পরিসরে বলা সম্ভব নয়। একদিন জানালাম আমার লেখা একটি গ্রন্থ স্যারের নামে উৎসর্গ করব– শুনে ভীষণ খুশি হলেন। কিন্তু তিনি সেই উৎসর্গপত্রটি দেখে যেতে পারেননি।

২০১২ সালের মাঝামাঝি স্যার অসুস্থ অবস্থায় গুলশানের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। দেখেতে গেলাম, আমার হাতটা বুকের মধ্যে শক্ত করে ধরে রাখলেন। কথা বলতে কষ্ট হচ্ছিল, তবু কথা বললেন। শেষে বললেন, ‘ভালো থেকো।’

শেষবার স্যারের সঙ্গে দেখা হল ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে খালাম্মার (নূরজাহান মুরশিদ) মৃত্যুবার্ষিকীতে। তখন স্যার পুরোপুরি শয্যাগত। দোয়া মাহফিলে উপস্থিত থাকতে পারলেন না। দোয়া মাহফিল শেষে নাইনো আপু (শারমিন মুরশিদ) বললেন, স্যারের ঘরে গিয়ে দেখা করতে। দেখলাম, চোখ খুলতে পারছেন না। সন্ধ্যার খাবার খাওয়ানোর চেষ্টা চলছে। আমি কাছে গিয়ে হাতটা ধরলাম, কানের কাছে মুখ নিয়ে বললাম, ‘স্যার আমি যাচ্ছি, আপনি সুস্থ হয়ে উঠুন।’
স্যার বললেন, ‘আচ্ছা।’
এরপর আর দেখা হয়নি। ৮ ডিসেম্বর স্যার অনন্তলোকে যাত্রা করেছেন। ছুটে গেলাম শহীদ মিনারে, ৯ ডিসেম্বর সেখানে স্যারকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়।

মাত্র ১৩ বছর বয়সে আমি আমার পিতাকে হারিয়েছি। সে সময় পর্যন্ত আমার জগত ছিল পিতাকেন্দ্রিক। হঠাৎ তাঁর না ফেরার দেশে চলে যাওয়ায় আমার অন্তর্লোক ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যায়। স্যারকে পেয়ে আমার সেই হাহাকার অনেকটা পূরণ হয়েছিল। আজ ভাবি, আমার সেই শান্তির আশ্রয়-যিনি আমার হাতটি শক্ত করে ধরে থাকতেন, ‘মাই সুইট মাদার’ বলে ডাকতেন, তিনি না থাকলেও তাঁর অনিঃশেষ ভালোবাসা, অপার জীবনাদর্শ আমার সঙ্গে রয়েছে। আমাদের সকলের সঙ্গে রয়েছে।
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com