দেয়ালের চিত্রিত ভাষা

মাসুদ হাসান উজ্জল | ৬ জানুয়ারি ২০১৫ ১২:৫৮ পূর্বাহ্ন

immage-of-wall01.jpgএকটা গুহার দেয়ালে শেকলবন্দি কিছু মানুষ আগুনের সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়া কিছু ছায়া দেখে সেগুলোর নামকরণ করে চলেছিল– হয়তো বা মুক্ত ছায়ার চলাচল দেখে তারাও পেতে চাইছিল মুক্তির স্বাদ। অথচ তারা জানেই না ছায়াগুলো সত্য অবয়ব নয়!– এমন একটা কাহিনী বর্ণনা করতে গিয়ে মহামতি সক্রেটিস প্লেটোকে বুঝিয়েছিলেন দার্শনিকগণও এমনটি শৃঙ্খলিত- বাস্তব অবাস্তবের দোলাচলে। এই ভাবনা পরবর্তীতে প্লেটোর ‘থিওরি অফ ফর্মস’কে প্রভাবিত করে। গ্রীক-দর্শন অনুযায়ী কোনো বস্তুর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিগত মূল্যায়ন হলো ‘ফর্ম’। নির্দিষ্ট আকারের বস্তুর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা তাকে ভিন্নভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করতে সক্ষম। কবি জীবনানন্দ দাস বলেছিলেন `পশ্চিমের মেঘে সোনার সিংহ আঁকে’ আরেক জায়গায় বলেছেন– ‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি’। ‘পশ্চিমের মেঘে সোনার সিংহ আঁকে’ অথবা ‘কেউ কেউ কবি’ এই দুটি বাক্যে ফর্মের ব্যখ্যাটা খুব স্পষ্টভাবে ধরা দেয়। কারও কারও কাছে– মেঘ সেতো নিছক মেঘই, বড় জোর বৃষ্টি ঝরাতে সক্ষম, কিন্তু কেউ কেউ সেই মেঘের ভাঁজে খুঁজে ফেরে ‘সময়’ নামক সাদা ঘোড়া, হারিয়ে যাওয়া সোনার সিংহ, হাজারো অবয়ব!

পারভেজ চৌধুরীর ‘দেয়ালচিত্র সিরিজ’ দেখে এই কথাগুলোই ঘুরে ফিরে মাথায় আসছিল। শহরের অলিতে-গলিতে ছড়িয়ে থাকা নির্বিবাদ কিছু দেয়াল, রোদে-জলে সবুজাভ– স্যাঁতসেতে। কোথাও-বা দেশভাগের মানচিত্রের গভীর ক্ষত’র মতো কিছু ফাঁটল। ফাঁটলে চোখ পড়লেই মনে হয় ১৯৪৭-দেশভাগ, ফাঁটলে চোখ পড়লেই মনে হয়– ‘They have drawn our map with blood sheds! ১৩ আগস্ট ১৯৬১, জার্মান ডেমোক্রেটিক রিপাব্লিক বার্লিনে প্রকাণ্ড এক দেয়াল তুলে পূর্ব-জার্মানি আর পশ্চিম-জার্মানি নাম দিয়ে দু-খণ্ডে বিভক্ত করে দিল গোটা জার্মান জাতিকে। দেয়ালের এপিঠ দেখলো না ওপিঠের ছায়া, বাতাসে ভারি দীর্ঘস্বাস! ১৯৭৭, বন্দিত্ব, একাকিত্ব, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পিতৃহারা হবার যন্ত্রণাময় স্মৃতি কিংবা প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থাকে কটাক্ষ করে একটা দেয়ালে আরও একটি নতুন ইটের মেটাফোরিক উপস্থাপনা নিয়ে রচিত হলো কালজয়ি সঙ্গীত ‘Another brick in the wall. সুতরাং দেয়াল আদৌ কোনো জড়বস্তু নয়, দেয়াল কথা বলে, সাক্ষি রাখে মুহূর্তের।

পারভেজ চৌধুরীর একটি দেয়ালচিত্রে দেখলাম রঙচটা সাদা দেয়ালে লাল কালিতে লেখা ‘না’, চোখে খেলে গেলো ইতিহাসের প্যানারোমিক ফ্ল্যাশব্যাক– ৪৭, ৫২, ৬৯, ৭১, ৯০; কত বার, কত যুগ দেয়ালে দেয়ালে লেখা হয়েছে ‘না’! বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে টিএসসি’র পাশ দিয়ে রিক্সা করে যাবার সময়ে বলিষ্ঠ অক্ষরে লেখা দেখতাম Raise high the banner of Marxism, Leninism, Maoism মাথায় তখন মন্ত্রের মতো মার্ক্সীয় দ্বন্দমূলক বস্তুবাদ– ‘বস্তুকে চিনতে হয় তার প্রবণতার ভেতর দিয়ে’… আহ! পরক্ষণেই সামসুন্নাহার হলের দেয়ালে রুগ্ন হরফে– ‘কষ্টে আছি-আইজুদ্দিন’; অথবা ‘সোমা+মিলন’; কী-অদ্ভূত বৈপরীত্য! ভরা বর্ষায় এক দঙ্গল ছেলেমেয়ে কার্জন হলের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে ভিজেই চলেছে, ঝরে পড়ছে থোকা থোকা জারুল, জলকুমারি রঙ্গন। বৃষ্টি থেমে যায়– ছেলেমেয়েদের ঘরে ফেরার তাড়া– দেয়াল সাক্ষি হয়ে রয়ে যায় বাঁধ ভাঙা সে তারুণ্য। দেয়ালচিত্রের একটিতে তেমনই কিছু একটা যেন খুঁজে পেলাম ‘দেয়াল-বৃষ্টি’। শ্যাওলা-রঙা দেয়ালে যেন বৃষ্টি ঝরছে। আরেকটি দেয়ালচিত্রে দেখা গেল বৃষ্টির জলে উদ্যাম ভিজছে শহুরে জলপোকা।

দেয়ালের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্থির চিত্রে পারভেজ চৌধুরী হয়তোবা খুঁজে ফিরেছেন বুড়ো শহরের বুকে অতীতের জলছাপ, পলকেই হারিয়ে যাওয়া দুর্লভ কোনো মুহূর্ত অথবা শেষ দেখা করে চলে যাওয়ার পর ফেলে যাওয়া তরুণীটির সুগন্ধি রুমাল! বরুণা কথা রাখেনি, কেউ কথা রাখে না। থেকে যায় বিমূর্ত সিমেন্টের দেয়াল, আমাদের সেকাল-একাল।
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মাহমুদা চৌধুরি — জানুয়ারি ১০, ২০১৫ @ ৯:০৭ অপরাহ্ন

      পারভেজ চৌধুরির ছবির উপর বিশ্লেষনমুলক লেখাটি এক কথায় চমৎকার। পাঠককেও ভাবুক করে তোলে। সঙ্গে ছবি থাকলে অারো ভাল লাগতো।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Mamun Abdullah — জানুয়ারি ১৩, ২০১৫ @ ৬:২৪ অপরাহ্ন

      ভালো লাগলো তবে ছবি থাকলে আরো ভালো লাগতো

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com