এলিস মুনরোর গল্প: চোখ

নুসরাত সুলতানা | ১ জানুয়ারি ২০১৫ ১১:০৯ অপরাহ্ন

alice-munro-005.jpg নোবেলজয়ী লেখক এলিস মুনরোর এ গল্পটি তার Dear Life গ্রন্থ থেকে নেয়া হয়েছে। নুসরাত সুলতানার অনুবাদে গল্পটি আর্টস.bdnews24.com-এর পাঠকদের জন্য এখানে প্রকাশ করা হলো । বি. স.

হঠাৎই আমার মায়ের একটা ছেলে জন্মাল। আমার বয়স তখন পাঁচ। আর আমার মা বলতে শুরু করল আমি নাকি সবসময়ই একটা ভাই চাইতাম। এই ধারণা মায়ের মাথায় কোত্থেকে এল আমি জানি না। মা বেশ রসিয়ে রসিয়ে ব্যাপারটা বর্ণনা করত–মনগড়া তথ্যে ভরা অথচ অস্বীকার করার জন্য পাল্টা জবাব দেয়াও কঠিন।

এর এক বছর পর ঘরে এল একটা মেয়ে সন্তান। আবারও শুরু হল একরাশ আদিখ্যেতা। তবে এবার আদিখ্যেতার পরিমাণটা গতবারের চেয়ে খানিকটা কম।

প্রথম বাচ্চাটা জন্মানোর আগ পর্যন্ত আমি আমার সম্পর্কে মায়ের সব কথাই বেদবাক্যের মত মেনে নিতাম, ভাবতাম মা যেমন বলে আমি ঠিক তেমনই। আর সে পর্যন্ত আমাদের বাড়ী জুড়ে মায়ের উপস্থিতিই ছিল সবচেয়ে প্রবল, মায়ের পায়ের শব্দ, কণ্ঠস্বর, মা ঘরে না থাকলেও তার ভয়-জাগানো গন্ধে ঘরগুলো ভরে থাকত।

ভয় জাগানো কেন বললাম? আমি তো ভয় পেতাম না। কখনও জিজ্ঞেস করত না আমার কেমন লাগছে। কাউকে কোন কিছু জিজ্ঞেস না করেই অন্যের অনুভূতি ব্যাখ্যা করার অধিকার তার ছিল। শুধু ছোট ভাই জন্মানোর অনুভূতি নয়, রেড রিভার সিরিয়াল যে আমার জন্য সবচেয়ে ভাল এবং আমার যে সেটাই পছন্দ করা উচিৎ সে নির্দেশও মায়ের ছিল। এমনকি আমার বিছানার পায়ের দিকে ঝুলানো যিশুর ছবিটার ব্যাখ্যা কি তাও মা বলে দিত। ছবিতে যিশু কয়েকজন শিশুকে নিজের কাছে আসতে ডাকছিল। ছবির কোনায় একটা মেয়ের উঁকি দেওয়া আধখানা মুখ। লজ্জায় যিশুর কাছে যেতে পারছে না সে। মা বলত, ঐ মেয়েটা নাকি আমি। আমারও তাই মনে হত। যদিও মা বলে দেয়ার আগে আমি ব্যাপারটা বুঝতে পারিনি। আরও মনে হত মেয়েটা আমি না হলে খুব ভাল হত।

এলিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড বইটা পড়ার সময় বিশাল আকৃতি এলিস যখন খরগোশের গর্তে আটকা পড়ত, আমার ভীষণ মন খারাপ হত এলিসের জন্য। কিন্তু ঐ অংশটা পড়ার সময় আমি হাসতাম, কারণ মাকে দেখে মনে হত তার খুব মজা লাগছে বিষয়টা।

কিন্তু আমার ভাইয়ের জন্মের সাথে সাথে যখন আমার মা অসংখ্যবার বলতে শুরু করল যে আমার ভাই আমার জন্য কত বড় উপহার, তখন আমি বুঝতে শুরু করলাম আমার সম্পর্কে আমার মায়ের ধারণা সত্যিকারের আমার চেয়ে কতটা আলাদা।

এসব ঘটনা সম্ভবত আমাকে শ্যাডির জন্য তৈরী করছিল। শ্যাডি নামের মেয়েটি আমাদের বাড়িতে কাজ করতে এসেছিল। মা বাচ্চাদের নিয়ে নিজের গন্ডির বাইরে খুব একটা আসত না। আর আশেপাশে মায়ের উপস্থিতি কমে যাওয়াতে আমি নিজের মত করে ভাবার সুযোগ পেতাম কোনটা সত্য, কোনটা নয়।

শ্যাডি ছিল রীতিমত প্রসিদ্ধ। যদিও এ বিষয়টা আমাদের বাড়ীতে কোন গুরুত্বই পেত না। আমাদের স্থানীয় রেডিও স্টেশনের স্বাগত সঙ্গীতটা ওর নিজের সৃষ্টি যেটা ও নিজের গিটার বাজিয়ে গেয়েছে।

“শুভেচ্ছা শুভেচ্ছা শুভেচ্ছা সবাইকে—”

আবার আধ ঘণ্টা পর “বিদায় বিদায় বিদায় সবাইকে”। এর মাঝে শ্রোতাদের অনুরোধ করা গান গাইত শ্যাডি, নিজের পছন্দের গানও গাইত। আমাদের এই ছোট্ট শহরের পরিশীলিত মানুষগুলো শ্যাডির গান নিয়ে হাসাহাসি করত, রেডিও স্টেশনটা নিয়েও। হালের জনপ্রিয় গানগুলো বাজাত বলে টরোন্টো স্টেশন ওদের কাছে বেশী পছন্দের ছিল। কিন্তু খামারবাড়ীতে বসবাস করা সাধারণ মানুষগুলো আমাদের শহরের ছোট্ট স্টেশনটাই বেশী ভালোবাসত, শ্যাডির গাওয়া গানগুলোও। শ্যাডির কণ্ঠটা ছিল জ্যোরালো আর বিষাদ মাখা। সে গাইতও মন খারাপ করা একাকিত্বের গানগুলো।

আমাদের দেশের এ অংশের বেশীরভাগ খামারই সরে এসে আমাদের এ অঞ্চলে ঠাঁই করে নিয়েছে প্রায় দেড়শ বছর আগে। যে কোন খামার বাড়ী থেকে দূরে তাকালেই মাঠ পেরিয়ে অন্য একটা খামার বাড়ী দেখা যায়। তবুও খামারীরা পছন্দ করত নিঃসঙ্গ রাখাল, দূর দেশের হাতছানি অথবা কোনো অপরাধীর মৃত্যুর সময় নিয়ে লেখা গান।

শ্যাডি এধরনের গানগুলোই ভীষণ দরদ দিয়ে গাইত। তবে ও ভীষণ উদ্যমী আর আত্মবিশ্বাসী ছিল আমাদের বাড়ীতে। কথা বলতে খুব ভালবাসত, বিশেষ করে নিজের সম্পর্কে বলতে। কথা বলার সঙ্গী হিসেবে শ্যাডি আমাকেই পেত সবচেয়ে বেশী। মা বাচ্চাদের নিয়ে ব্যাস্ত থাকত আর শ্যাডি থাকত তার কাজ নিয়ে। তাই মায়ের সঙ্গে খুব বেশী কথা হত না ওর। আমার কেন যেন মনে হয়, ওদের কথা হলেও কথা জমত না খুব একটা। আগেই বলেছি, মা খুব রাশভারী ধরণের মানুষ, একসময় স্কুল শিক্ষক ছিল। শ্যাডিকে তার উচ্চারণের বিষয়ে জ্ঞান দিতেই হয়ত মার বেশী ভাল লাগত। অন্যদিকে শ্যাডি মনেই করত না যে এ বিষয়ে জ্ঞানের কোন প্রয়োজন আছে তার। এমনকি সে যে ভাষায় কথা বলত তা বিন্দুমাত্র পরিমার্জন করার কোনো ইচ্ছাও তার ছিল না।

দুপুরে খাবার পর শুধু শ্যাডি আর আমি রান্নাঘরে থাকতাম। মা দুপুরে ঘুমাতে চলে যেত। উপরে গিয়ে মা পোশাক পাল্টে নিত। যেন সারা দুপুর আর কিছুই করার নেই, শুধুই অবসর। অথচ বেশ ক’বার ডায়পার বদলানোসহ আরও কিছু অপ্রিয় কাজ অপেক্ষা করে থাকত তার জন্য।

বাবাও দুপুরে একটু ঘুমাতো– স্যাটার্ডে ইভনিং পোষ্টটা মুখের উপর দিয়ে পোর্চের উপর পনের মিনিটের একটা ঘুম। এরপর গোলঘরে কাজ করার পালা।

এ সময় শ্যাডি চুলার পানি গরম করে থালাবাসন ধুতো। আমি সাহায্য করতাম। জানালার পর্দাগুলো টানা থাকত রোদের তাপ থেকে বাঁচার জন্য। এরপর শ্যাডি মেঝে পরিস্কার করত আর আমি মেঝে শুকাতে সাহায্য করতাম। মেঝে শুকানোর বুদ্ধিটা আমার নিজের বের করা–একটা ন্যাকড়ায় ভর করে ঘরময় স্কেটিং করে বেড়ানো। তারপর আমরা যেতাম মাছি ধরার জন্য সকালে ঝুলানো আঠালো কাগজগুলো নামিয়ে নিতে। কাগজগুলো ততক্ষণে ভারী হয়ে যেত মরা আর আধমরা মাছির ভারে। নতুন করে আবার ঝুলানো হত আঠালো কাগজ। আর এই পুরোটা সময় শ্যাডি আমাকে তার নিজের কথা বলত।

মানুষের বয়স তখন আমি খুব ভাল আন্দাজ করতে পারতাম না। আমার বিচারে মানুষ ছিল হয় বাচ্চা নয় বড়। শ্যাডি আমার দৃষ্টিতে ছিল বড়দের দলে। ওর বয়স হয়ত ছিল ষোল বা আঠার নয়ত বিশ। বয়স যাই হোক শ্যাডি বেশ কয়েকবার বলেছিল যে সহসা বিয়ে করছে না সে।

সাপ্তাহিক দুটির দিনগুলোতে শ্যাডি নাচতে যেত, একা। ও বলত ও একা যায় এবং শুধুই নিজের জন্য যায়।

শ্যাডি আমাকে নৃত্যশালাগুলো সম্পর্কে বলত। একটা নৃত্যশালা আমাদের শহরেই ছিল, বড় রাস্তাটা পার হয়েই, যেখানে শীতের সময় স্কেটিংয়ের আয়োজন করা হত। একবার নাচার জন্য এক টাইম দিতে হত ওখানে। টাকা দেয়ার পর নাচের মঞ্চে নাচার ব্যবস্থা। একদল গায়ে-পরা ন্যাকা ছেলে গিজগিজ করত চারপাশে। শ্যাডি অবশ্য পাত্তা দিত না। নিজের টাকাটা নিজের দেয়াই পছন্দ ছিল তার, কারোও নজরে পড়তে চাইত না। কিন্তু মাঝে মাঝে একটা ছেলে এগিয়ে এসে কথা বলতে শুরু করত। জিজ্ঞেস করত শ্যাডি তার সাথে নাচতে চায় কিনা। শ্যাডি পাল্টা প্রশ্ন করত, পার? তুমি নাচতে পার? ভাবলেশহীন মুখে প্রশ্নটা করত ও। ছেলেটা শ্যাডির কৌতুকভরা চোখের দিকে তাকিয়ে বলত, অবশ্যই। বুঝাতে চাইত, তা না হলে আমি এখানে কেন? এবং পরে বোঝা যেত নাচ বলতে ছেলেটা যা বুঝিয়েছে তা আসলে তার ঘেমো মাংসল হাতে শ্যাডিকে ধরে এপাশ ওপাশ দোলা। মাঝে মাঝে ও নাচের মাঝখানেই ছেলেটাকে একলা ছেড়ে চলে আসত, একাই নাচত বাকিটা সময়। সেটাই ভাল লাগত শ্যাডির। নাচ শেষে টাকা দিতে গেলে অনেক সময় ওরা দু’জনের টাকা চাইত। শ্যাডি তখন জবাব দিত, ও তো নাচলই না। আরও বলত, ও একা নাচল বলে ওরা যদি হাসাহাসি করতে চায় তো করতে পারে।

অন্য নৃত্যশালাটা ছিল শহরের বাইরে, মহাসড়কের পাশে। এখানে ঢোকার মুখেই টাকা দিয়ে ঢুকতে হত, তবে একবার নাচার জন্য নয়, সারা রাতের জন্য।, রয়্যাল-টি নাম ছিল নৃত্যশালাটার, এখানেও নিজের টাকা দিয়ে নাচত শ্যাডি। এখানে যারা আসত বেশ ভাল নাচত তারা। নাচতে শুরু করার আগে শ্যাডি ওদের নাচের কায়দাগুলো বেশ ভালভাবে দেখে নেবার চেষ্টা করত। এখানে শহরের ছেলেরাই বেশী আসত আর অন্যটায় যেত মূলত গ্রামের লোকেরা। শহরের ছেলেরা ভাল নাচত বটে তবে ওরা গায়ে পড়ে ভাব জমাতে চায় কিনা সেদিকে নজর রাখতে হত। মাঝে মাঝে শ্যাডিকে রায়ট অ্যক্ট উল্লেখ করে বলতে হত পিছু না ছাড়লে ওদের কি হাল করবে ও। এটাও জানিয়ে দিত যে সে ওখানে গিয়েছে শুধু নাচতে এবং নিজের টাকায়। এদের কিভাবে শিক্ষা দিতে হয় ভালই জানত শ্যাডি। অবশ্য ভাল নাচতে পারে এরকম অনেকের সাথে ভাল সময়ও কাটাত শ্যাডি মাঝেমধ্যে। আর শেষ নাচটা শুরু হলেই চম্পট দিত।

শ্যাডি ছিল অন্যরকম, অন্যদের চেয়ে আলাদা, ও বলত। কারো ফাঁদে পড়তে চাইত না।

ফাঁদ। যখনই শ্যাডি ফাঁদে পড়ার কথা বলত আমি চোখের সামনে দেখতে পেতাম একটা বড় তারের জাল ওপর থেকে নেমে আসছে আর কতগুলো ছোট ছোট শয়তান জালটা পেঁচিয়ে দিচ্ছে শ্যাডির চারপাশে। দমবন্ধ করে মেরে ফেলতে চাইছে ওকে যাতে সে ঐ জাল থেকে কখনও বেরিয়ে আসতে না পারে। শ্যাডি নিশ্চয় ব্যাপারটা খেয়াল করেছিল কারন ও বলত, ‘ভয় পেও না’,

“পৃথিবীতে আসলে ভয় পাওয়ার মত কিছুই নেই, শুধু নিজের মধ্যে ডুবে থেকো।’

* * *

তুমি আজকাল শ্যাডির সাথে অনেক বেশী সমসয় কাটাচ্ছ’, মা বলত।

আমি বুঝতে পারছিলাম কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে, এমন একটা কিছু যার ব্যাপারে আমার সতর্ক থাকা উচিৎ। কিন্তু বুঝতে পারি ব্যাপারটা কি।

“তুমি ওকে খুব পছন্দ কর, তাই না?’
আমি বললাম, হ্যাঁ, করি।
“বেশ। আমিও ওকে পছন্দ করি।’

আমি আশা করছিলাম এ বিষয়ে কথাবার্তা এখানেই শেষ হয়ে যাবে। এক মুহূর্তের জন্য মনেও হয়েছিল যেন শেষ হয়ে গেছে। এরপর, “তোমার আর আমার একসাথে খুব বেশী সময় কাটানো হয় না এখন। বাচ্চাদের জন্য সে সুযোগ পাচ্ছি না আমরা, তাই না?”
“কিন্তু আমরা বাচ্চাদের ভীষন ভালবাসি, ঠিক?”
আমি তাড়াতাড়ি বললাম, হ্যাঁ।
মা বলল, সত্যি?
আমি সায় না দেওয়া পর্যন্ত মা আমাকে কোনভাবেই ছাড়ত না। তাই আমি বললাম, সত্যি।”

মা ভেতরে ভেতরে একটা কিছু প্রচন্ডভাবে চাইত। ভাল বন্ধু চাইত কি? যে মহিলারা ব্রিজ খেলতে পারে আর যাদের গৃহকর্তারা কোট টাই পরে অফিস করে তাদের বন্ধুত্ব? মনে হয় না। তার সুযোগও ছিল না আসলে। সেই পুরানো আমাকে কি চাইত? যে মায়ের কাছে চুল বাঁধার সময় লক্ষ্মী মেয়েটি হয়ে থাকত? লক্ষী হয়ে থাকত সানডে স্কুলে শ্লোক পাঠের সময়? এখন আর মা এসব করার সময় পায় না। আর আমার ভেতরের কোন একটা সত্তাও দিন দিন বিশ্বাস ঘাতক হয়ে উঠছিল। মা বুঝতে পারত না কেন, আমিও জানতাম না। সানডে স্কুলে আমার শহুরে কারো সাথে বন্ধুত্ব হয়নি। বরং শ্যাডিকেই আমি পছন্দ করতাম অনেক বেশি, উপাসনা করতাম ওর। মাকে বাবার কাছে বলতে শুনেছি, “ও শ্যাডির উপাসনা করে।’

বাবা বলত শ্যাডি আমাদের জীবনে আশির্বাদের মত। এ কথার কি অর্থ হতে পারে? বাবার কণ্ঠ খুশী খুশী শোনাত। মনে হত বাবা কারো পক্ষ নিতে চাইছে না।

“আমাদের রাস্তার ধারটা বাঁধানো হলে খুব ভাল হত, “ মা বলত, “তাহলে ও রোলার স্কেট চালানো শিখতে পারত, কিন্তু বন্ধু বান্ধবও জুটে যেত সেই সুযোগে।”

মনে মনে আমি সবসময়ই একজোড়া রোলার স্কেট চাইতাম। কিন্তু ঐ মুহূর্তে, কি কারনে জানি না, আমার মনে হল আমি কিছুতেই রোলার স্কেট নেব না।

এরপর মাকে বলতে শুনেছি স্কুল খুলে গেলে হয়ত ব্যাপারটা ঠিক হয়ে যাবে। কোন ব্যাপারটা ঠিক হয়ে যাবে? আমার কোনো কিছু নাকি ব্যাপারটা শ্যাডি সংক্রান্ত, আমি শুনতে চাইনি।

শ্যাডি আমাকে ওর গাওয়া কিছু গান শেখাত। গান আমি ভাল গাইতাম না। আমি ভাবতাম আমার গান নিয়ে কথা বলছে না তো মা? ভাল গাইতে না পারলে গান করা বন্ধ? কোনভাবেই গান বন্ধ করতে রাজী ছিলাম না আমি।

বাবা এসব নিয়ে বেশী কিছু বলত না। আমার ভাল মন্দ দেখাটা মায়ের দায়িত্বেই ছিল, যতদিন পর্যন্ত না আমি খুব মুখরা হয়ে উঠি। ঐ সময় বাবা আমাকে শাস্তি দিত। বাবা অপেক্ষা করছিল কবে আমার ভাইটা বড় হবে। ভাইটাকে নিজের করে পাওয়ার ইচ্ছা ছিল বাবার। ছেলেরা খুব একটা জটিল হয় না তো।

এবং সত্যিই তাই। আমার ভাই ছিল এক্কেবারে ভাল ছেলে।

******

স্কুল খুলে গেছে আরও কয়েক সপ্তাহ আগেই, পাতাগুলো রং পাল্টে লাল আর হলুদ হবার আগেই। এখন পাতাগুলো প্রায় সবই ঝরে গেছে। আমি আজ আমার স্কুলের কোটটা পরিনি। পরেছি বেড়াতে যাবার কোটটা। ভেলভেটের কলার আর আস্তিনওয়ালাটা। মা পরেছে চার্চে যাওয়ার কোটটা আর চুলগুলো টুপিতে ঢেকে নিয়েছে।

আমরা কোথাও একটা যাবার উদ্দেশ্যে বের হলাম। মা গাড়ী চালিয়ে আমাকে নিয়ে যাচ্ছিল। মা গাড়ী খুব কমই চালায়। খুব সুচারুভাবে চালালেও বাবার তুলনায় কাঁচা হাতে গাড়ী চালায় মা। যে কোন বাঁকেই হর্ণ বাজাতে থাকে।

‘এই তো’, বলার পরও গাড়িটা ঠিক জায়গায় রাখতে বেশ কিছুটা সময় লাগল মা’র।

‘চলে এসেছি আমরা’, কণ্ঠ শুনে মনে হল সাহস যোগানোর চেষ্টা করছে মা। হাত ধরার সুযোগ দেবার জন্য মা আমার হাত স্পর্শ করল, কিন্তু আমি এমন ভাব করলাম যেন লক্ষ্যই করিনি। হাত সরিয়ে নিল মা।

বাড়িটার কোনো ড্রাইভওয়ে নেই। রুচিসম্পন্ন কিন্তু খুব সাধারণ একটা বাড়ী। মা দরজায় কড়া নাড়ার জন্য হাত তুলতেই দরজাটা খুলে গেল আমাদের ঢুকতে দেবার জন্য। মা মাত্র আমাকে কিছু একটা বলতে শুরু করেছিল, সাহস যোগানো কিছু–খুব বেশীক্ষণ লাগবে না এখানে– এ ধরণের কিছু হয়ত। কিন্তু কথা শেষ করতে পারল না মা। মা’র কঠোর কণ্ঠস্বরে সান্তনা দেবার একটা চেষ্টা ছিল। দরজা খোলা মাত্রই কণ্ঠস্বর বদলে আরও কোমল হয়ে গেল তার। যেন মাথা নুইয়ে কাউকে কুর্ণিশ করতে চাইছে মা।

দরজাটা খোলা হয়েছিল কিছু মানুষ বেরিয়ে যাচ্ছিল বলে, শুধু আমাদের ঢুকতে দেবার জন্য নয়। যারা বেরিয়ে যাচ্ছিল তাদের মধ্যে একজন মহিলা মাথা ঘুরিয়ে বলল “এই মহিলার বাড়িতেই কাজ করত ও, আর এই যে, ঐ মেয়েটা।” মহিলার কণ্ঠে কোমলতার চিহ্নমাত্র ছিল না।

পরিপাটি পোষাক পরা এক মহিলা এগিয়ে এসে মা’র সাথে কথা বলল, তার কোটটা খুলে রাখতে সাহায্য করল। মা আমার কোট খুলে রাখতে রাখতে মহিলাকে জানাল যে শ্যাডিকে আমি ভীষণ পছন্দ করতাম। তাই আমাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছে মা।

‘ওহ্ কি মিষ্টি মেয়েটা,’ মহিলা বলে উঠল। মা আমাকে আস্তে করে স্পর্শ করে ইঙ্গিত করল মহিলাকে অভিবাদন জানাতে।

‘শ্যাডি বাচ্চাদের ভীষণ পছন্দ করত’’, মহিলা বলল, “ভীষণ’”।

দেখলাম আরও দু’জন বাচ্চা আছে ওখানে। ছেলে। ওরা আমার স্কুলেই পড়ে। একজন আমার সাথে ক্লাস ওয়ানে আর অন্যজন উপরের ক্লাসে। ওরা যে ঘরটা থেকে উঁকিঝুকি মারছে সেটা সম্ভবত রান্নাঘর। ছোট ছেলেটা একটা আস্ত বিস্কুট মুখে পুরে হাস্যকরভাবে খাচ্ছে আর বড় ছেলেটা মুখে রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে বসে আছে। বিরক্তিটা যে আস্ত বিস্কুট মুখে পুরে দিচ্ছিল তার প্রতি নয়, আমার প্রতি। ওরা আমাকে পছন্দ করে না। স্কুলের বাইরে কোথাও দেখা হলে ছেলেরা হয় গ্রাহ্যই করবে না (স্কুলেও অবশ্য ওরকমই করে) নয়তো এরকম চেহারা বানিয়ে কুৎসিত সব নামে ডাকতে থাকবে। ভাগ্য ভাল এখন আমাকে ওদের ধারে কাছে যেতে হবে না। অবশ্য আশেপাশে বড়রা থাকলে ব্যাপারটা আলাদা। ছেলেগুলো চুপচাপই ছিল, তাও আমার একটু অস্বত্তি কাজ করছিল যতক্ষণ পর্যন্ত না কেউ একজন ওদের দু’জনকে হ্যাঁচকা টান মেরে রান্নাঘরের ভেতরে নিয়ে গেল। এতক্ষণে আমি আমার মায়ের অস্বাভাবিক ভদ্র আর সহানুভূতিপূর্ণ কণ্ঠস্বরটা খেয়াল করলাম। যে মহিলা আমাদের ভেতরে নিয়ে এল তার চেয়েও মেয়েলী কণ্ঠে কথা বলছিল মা। আমি ধরেই নিলাম যে ঐ মহিলার সাথে কথা বলার জন্যই মা’র কণ্ঠস্বরে এই পরিবর্তন। এমনিতে স্কুলে মা আমাকে যেভাবে ডাকত সেটা পেছনে অনেকেই নকল করত।

যে মহিলা আমাদের সাথে কথা বলছে, মনে হল সেই সবকিছুর দায়িত্বে আছে। সে আমাদের ঘরের ভেতরের দিকে নিয়ে গেল যেখানে সোফায় এক বয়স্ক ভদ্রলোক ও ভদ্রমহিলা বসে ছিলেন। উনাদের দেখে মনে হচ্ছিল উনারা কেন এখানে বসে আছেন সেটা ভাল বুঝে উঠতে পারছেন না। মা উনাদের সাথে কথা বলল ঝুঁকে এবং খুব বিনয়ের সাথে। কথার বিষয় ছিলাম আমি।

“ও যে শ্যাডিকে কি ভীষণ পছন্দ করত “ মা বলল, আমি বুঝতে পারছিলাম যে ঐ মুহূর্তে আমার কিছু একটা বলা উচিৎ কিন্তু আমি কিছু বলার আগেই সোফায় বসা মহিলা আর্তনাদ করে উঠলেন। উনি কারো দিকে তাকাচ্ছিলেন না। কোনো হিংস্র প্রাণী কামড়ে দিলে কেউ ব্যাথায় যেমন চিৎকার করে, ঠিক তেমন শোনাচ্ছিল তার আর্তনাদ। হাত দিয়ে নিজের দুই বাহু আঁচড়াচ্ছিলেন যেন অদৃশ্য কিছু একটা ঝেড়ে ফেলতে চাইছেন কিন্তু কোনো লাভ হচ্ছে না। মহিলা মায়ের দিকে তাকালেন। তার দৃষ্টি যেন বলছিল, “তোমার তো আমাকে সাহায্য করা উচিৎ’’।

পাশের বয়স্ক ভদ্রলোক মহিলাকে শান্ত হতে বললেন।

‘উনি শোকে পাগল প্রায়’ আমাদের সাথের মহিলা বলল। কি করতে কি করছেন কিছুর ঠিক নেই।’ এবার ঝুঁকে বয়স্ক মহিলাকে বলল, ‘ছোট্ট মেয়েটা ভয় পেয়ে যাবে তো।’

‘ছোট্ট মেয়েটা ভয় পেয়ে যাবে।’ শান্ত গলায় বললেন বয়স্ক ভদ্রলোক।

একথা বলতে বলতেই মহিলা শান্ত হয়ে গেলেন। হাত বুলাতে লাগলেন তার আঁচড় কাটা বাহুতে, যেন উনি জানেনই না কি করে এমন হাল হল তার বাহু দু’টোর।

মা বলল, ‘আহা বেচারী’।

“একমাত্র সন্তান তো “ বলল আমাদের যে মহিলা ভেতরে নিয়ে এসেছিল সে। আমাকে বলল, “তোমার ভয়ের কিছু নেই।”

আমি ভয় পাচ্ছিলাম, তবে তা মহিলার আর্তনাদের জন্য নয়।

আমি জানতাম শ্যাডি এখানেই কোথাও আছে। আমি ওকে দেখতে চাই না। মা অবশ্য স্পষ্ট করে বলেনি যে আমার ওকে দেখতেই হবে, তবে দেখতে হবে না–এমন কিছুও বলেনি।

রয়্যাল-টি থেকে হেঁটে বাড়ী ফেরার পথে এক দুর্ঘটনায় মারা যায় শ্যাডি। রয়্যাল-টির পার্কি, স্পেসের শেষ এবং শহরের রাস্তা শুরু মাঝের জায়গাটায় খানিকটা পথ পাথরে ঢাকা। ঠিক ঐ পাথুরে পথেই একটা গাড়ি শ্যাডিকে ধাক্কা দেয়। প্রতিদিনের মত সেদিনও নিশ্চয় শ্যাডি তাড়াহুড়া করে ফিরছিল। ও নিশ্চয় নিশ্চিন্ত ছিল এই ভেবে যে গাড়ীগুলো তো ওকে দেখতেই পাবে, অথবা ভাবছিল রাস্তায় গাড়ীর যতটুকু অধিকার পথচারী হিসেবে তারও তা সমান প্রাপ্য। হয়ত শ্যাডির পেছনের গাড়ীটা হঠাৎ দিক বদলেছিল অথবা শ্যাডিই রাস্তার ভুল জায়গা ধরে হাঁটছিল। শ্যাডিকে পেছন থেকে ধাক্কা দিয়েছিল গাড়িটা। শ্যাডির ঠিক পেছনে যে গাড়িটা ছিল তার পেছন থেকে একটা গাড়ি এসে হঠাৎ ওকে মেরে দিয়ে শহরের রাস্তা ধরে পালিয়েছিল। নৃত্যশালাগুলোতে মদ বিক্রি না হলেও কিছুটা মদ্যপান তো হয়ই। আর নাচের আসর শেষ হবার পর হৈ চৈ হুড়োহুড়িও তো কম হয় না। এর মধ্যে শ্যাডি যখন তাড়াহুড়া করে বাড়ি ফিরত, হাতে একটা টর্চও না নিয়ে, এমন একটা ভাব করত ও যেন ওকে পথ ছেড়ে দেয়াটাই সবার দায়িত্ব।

“একটা মেয়ে ছেলেবন্ধু ছাড়া নাচতে যেত তাও আবার পায়ে হেঁটে,” মহিলা বলল, মায়ের সাথে এখনও খুব অন্তরঙ্গ ব্যবহার করছে সে। খুব মৃদু স্বরে কথাগুলো বলল মহিলা, মা বিড়বিড় করে আফসোস করার মত কিছু একটা বলল।

“হাতে ধরে বিপদ ডেকে আনা আরকি” গলার স্বর আরও খাদে নামিয়ে বলল মহিলা।

বাড়িতে আমি বাবা মাকে কিসব আলোচনা করতে শুনেছি যার কিছুই আমি বুঝিনি। মা বলত কিছু একটা করা উচিৎ বোধ হয় শ্যাডি আর ঐ গাড়িটার বিষয়ে। কিন্তু বাবা বলত–এর মধ্যে না জড়ানোই ভালো। আমি এই আলোচনার কিছু বোঝার চেষ্টা পর্যন্ত করিনি কারণ আমি প্রাণপনে শ্যাডিকে আমার চিন্তা থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করছিলাম, শ্যাডির মৃত্যু নিয়ে চিন্তা করার তো প্রশ্নই ওঠে না। আমি যখন বুঝতে পারলাম যে আমরা শ্যাডিদের বাড়ি যাচ্ছি, আমি খুব চাইছিলাম শেষ পর্যন্ত আমার যেন যেতে না হয়। কিন্তু তার কোনো উপায় ছিল না।

বৃদ্ধ মহিলার আর্তনাদের পর আমার মনে হচ্ছিল এখনই আমাদের বাড়ি ফিরে যাওয়া উচিৎ। একটা সত্য এ সুযোগে স্বীকার করে ফেলা ভাল, মৃতদেহ আমি ভীষণ ভয় পাই।

ঠিক যখনই আমার মনে হল এখন বোধহয় বাড়ি ফেরা সম্ভব তখনই আমি শুলনাম মা আর ঐ মহিলা কথা বলছে ভয়ঙ্কর সে বিষয়টা নিয়ে।

শ্যাডিকে দেখা।

মা বলছিল, ‘এবার শ্যাডিকে দেখে আসা উচিৎ।’

মৃত শ্যাডি।

এতক্ষণ আমি শুধু নিচের দিকেই তাকিয়ে ছিলাম। আমার চেয়ে ছোট ছেলেগুলো আর বসে থাকা বৃদ্ধদের ছাড়া প্রায় কিছুই দেখিনি। এবার মা আমার হাত ধরে ঘরের অন্যদিকে নিয়ে চলল।

প্রথম থেকেই এ ঘরে একটা কফিন রাখা ছিল কিন্তু আমি ভাবছিলাম এটা বোধহয় অন্যকিছু। আগে কখনো দেখিনি বলে আমি জানতাম না কফিন দেখতে ঠিক কেমন হয়। যে জিনিসটার দিকে আমরা এগুচ্ছিলাম সেটা একটা ফুল রাখার তাক কিংবা একটা বন্ধ পিয়ানোর মত দেখাচ্ছিল।

সম্ভবত চারপাশে মানুষ ঘিরে থাকায় জিনিসটার আসল মাপ, আকৃতি বা উদ্দেশ্য কোনটাই বোঝা যাচ্ছিল না। আমরা এগিয়ে যেতেই সবাই সরে গিয়ে পথ করে দিল। আর আমার মা খুব কোমল স্বরে কথা বলে উঠল, এই কণ্ঠস্বরটা একদম নতুন রকমের।

‘এসো’ মা আমাকে বলল। তার মৃদু কণ্ঠস্বরে আমার প্রতি ঘৃণা ঠিকরে বেরুচ্ছিল, বিজয়ী কণ্ঠস্বর।

মা আমার দিকে ঝুঁকলো আমার মুখটা দেখার জন্য। এবং আমি নিশ্চিত জানি এটা সে করল আমি ঠিকঠাক মত তাকিয়ে দেখছি কিনা সেটা বোঝার জন্য। এরপর অন্য দিকে তাকালেও আমার হাতটা মা শক্ত করে ধরে রেখেছিল। আমি কোনোমতে চোখের পাতা আধখোলা রেখেছিলাম, পুরোপুরি বন্ধ করিনি কোন কিছুতে বেঁধে যদি পড়ে যাই কিংবা কেউ যদি ধাক্কা দিয়ে আমাকে ঠিক কফিনের সামনে পাঠিয়ে দেয় এই ভয়ে। আমি শুধু অস্পষ্টভাবে কিছু ফুল আর পালিশ করা কাঠের চাকচিক্য খেতে পাচ্ছিলাম।

হঠাৎ শুনলাম মা ফুপিয়ে কাঁদছে। ধীরে ধীরে ওখান থেকে সরেও আসল মা। তারপর ক্লিক করে একটা শব্দ হল তার পার্স খোলার। পার্স খোলার জন্য হাতগুলো ব্যবহারে দরকার পড়ল মা’র আর এই ফাঁকে মা’র হাত থেকে মুক্ত হলাম আমি। মা কাঁদছিল। চোখের পানির দিকে তার ভালভাবে মনোযোগ দিতে হল বলেই তার হাত থেকে মুক্তি পেলাম।

এবার আমি সরাসরি কফিনটার দিকে তাকালাম আর দেখলাম শ্যাডিকে।

শ্যাডির ঘাড় আর মুখ ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল। আমি অবশ্য সেটা তেমনভাবে দেখতে পেলাম না। শুধু বুঝতে পারলাম আমি যে এত ভয় পাচ্ছিলাম তার আসলে কোনো কারন নেই। আমি তাড়াতাড়ি চোখ বন্ধ করে ফেললাম আর সাথে সাথেই টের পেলাম কোনভাবেই শ্যাডিকে আর একবার না দেখে থাকতে পারছি না। প্রথমে তাকালাম হলুদ কুশনটার দিকে যেটার জন্য শ্যাডির গলা আর থুতনি ভালভাবে দেখা যাচ্ছিল না, একটা গাল দেখতে পাচ্ছিলাম শুধু। শ্যাডিকে ভালভাবে দেখার কৌশলটা ছিল চট করে ওর একটা অংশ দেখে নিয়ে তাড়াতাড়ি আবার কুশনটার দিকে তাকানো। তারপর সাহস সঞ্চয় করে আবার একটু বেশী সময় ধরে শ্যাডিকে দেখা। এর পর এক সময় শুধুই শ্যাডিকে দেখছিলাম আমি। শ্যাডির সবটুকু কিংবা বলা যায় ওর যতটুকু দেখা যাচ্ছিল।

কিছু একটা নড়ে উঠল। স্পষ্ট দেখলাম শ্যাডির চোখের পাতা নড়ে উঠল। চোখ খোলেনি শ্যাডি এমনকি আধখোলাও নয়। চোখের পাতাটা অতি সামান্য ফাঁক করার মত। তুমি যদি শ্যাডি হতে কিংবা ওর ভেতরে থাকতে তাহলে চোখের পাপড়িগুলোর ভেতর দিয়ে কিছু দেখার জন্য যতটুকু ফাঁক করতে, ঠিক ততটুকু। যেন বাইরে আলো নাকি অন্ধকার সেটা বোঝার জন্য চোখের পাতাটা একটু আলগা করা।

তখন আমি একটুও ভয় পাইনি এমনকি অবাকও হইনি একটুও। শ্যাডিকে আমি যেমন জানতাম তাতে ওর অমনই করার কথা। আমি কাউকে একথা জানানোর কথা চিন্তাও করলাম না কারণ এটা শ্যাডি অন্য কারো জন্য তো করেনি, করেছে শুধুই আমার জন্য।

মা আবার আমার হাত ধরল। বলল, এখন আমরা যাব। আরও কিছুক্ষণ এর তার সাথে কথাবার্তা বলল মা। কিন্তু আমার মনে হল মুহূর্তেই আমরা বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে।

মা বলল, ‘বাহ্’, আমার হাতে মৃদু চাপ দিয়ে বলল, ‘চল, এখানকার কাজ শেষ,’ গাড়িতে উঠে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলাম আমরা।

আমি জানতাম মা আমার কাছ থেকে কিছুু শুনতে চাইছে। শুধু শুনতে নয়, জানতেও চাইছে হয়ত কিছু। কিন্তু আমি একটা কথাও বললাম না।

এরপরে এরকম আর কিছু কখনও ঘটল না। সত্যি বলতে কি শ্যাডি আমার চিন্তা আর চেনায় বেশ দ্রুতই বিবর্ণ হয়ে গেল। এটা সম্ভবত ঘটল স্কুলে নিজেকে খাপ খাওয়াতে গিয়ে। অসম্ভব ভীতু হয়েও কি করে উপরে উপরে খুব সাহস দেখাতে হয় স্কুলে সেটাই শিখছিলাম আমি। আসলে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে শ্যাডি যখন জানিয়েছিল যে বাবা মাকে দেখাশোনার জন্য ওকে এখন থেকে বাড়িতে থাকতে হবে, আমাদের বাড়িতে আর কাজ করতে পারবে না, তখন থেকেই ওর গুরুত্ব কমে গিয়েছিল আমার কাছে।

মা অবশ্য পরে জানতে পেরেছিল যে আমাদের বাড়ির কাজ ছেড়ে ও একটা মাখন আর পনির তৈরীর কারখানায় কাজ করছে।

এরপরও অনেকদিন পর্যন্ত যখন আমি শ্যাডির কথা ভাবতাম ঐ ব্যাপারটা আমি অবিশ্বাস করিনি। আমি বিশ্বাস করতাম ওটা আমাকে দেখানো হয়েছিল এরও অনেক অনেকদিন পরে যখন আমার অতিলৌকিক কোন কিছুর প্রতিই আর আগ্রহ ছিল না তখনও আমার মনে ছিল যে এমন একটা ব্যাপার ঘটেছিল। খুব সহজেই বিশ্বাস করতাম আমি বিষয়টা। অনেকটা আমাদের প্রথম গজানো দাঁতগুলোর মত–আমরা বিশ্বাস করি, এমনকি আমাদের মনেও আছে যে আগে আমাদের আরেক পাটি দাঁত ছিল। এখন নেই বটে তবে সত্যিই ছিল তো। আমার কৈশরের দিনগুলো পর্যন্ত মনের ভেতরে ঘোলাটে একটা কোটরে এই বিশ্বাস পুষে রেখেছিলাম আমি। আজ আর সে কথা বিশ্বাস করি না।
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (4) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Fazilatun Sonio — জানুয়ারি ৫, ২০১৫ @ ৪:৩০ অপরাহ্ন

      একজন মা হয়ে শুধু এইটুকু বোধ হচ্ছে, যতটুকু সন্তানকে উপলব্ধি করি বলে মনে করি, আসলে কি তাই? অসম্ভব সুন্দরভাবে প্রকাশিত হয়েছে এই গল্পের মাধ্যমে কেন আমাদের সন্তানের সাথে আমাদের এতো দূরত্ব তৈরী হয়। আজ এই গল্পের মাধ্যমে বিশ্বাস শব্দটার এক নতুন অর্থ আমি যেন খুঁজে পেলাম।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Belayet Hossain — জানুয়ারি ৭, ২০১৫ @ ৩:২৯ অপরাহ্ন

      ভালো লেগেছে তবে, বড্ড ভালো নয়। অন্ধ হলে যা হয় , মানে মৌলিক তত্ত্ব থেকে দূরে থাকা । তার পরও বলবো ভালো লিখেছ।
      আর্শীবাদ রইলো। চালিয়ে যাও ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন প্রতাপ শেখর মোহন্ত — জানুয়ারি ৭, ২০১৫ @ ৮:৩৭ অপরাহ্ন

      ইংরেজি ভাষার গল্প/উপন্যাস বাংলায় অনুবাদ করার সময় একটা বিষয় খেয়াল রাখা উচিত। ইংরেজিতে যে কথাটা খুব স্বাভাবিক মনে হয়, সেটার আক্ষরিক বাংলা শুনতে ভালো নাও লাগতে পারে। কখনও কখনও বিশ্রীও লাগে। সেক্ষেত্রে সে অংশটুকু একটু ঘুরিয়ে অনুবাদ করাটাই শ্রেয়।

      “হঠাৎই আমার মায়ের একটা ছেলে জন্মাল। আমার বয়স তখন পাঁচ।”
      আমার মনে যথেষ্ট সন্দেহ আছে, বাংলা সাহিত্যে এটা আদৌ শিল্পসম্মত বাক্য বলে স্বীকৃত হবে কি না।
      “When I was five years old my parents all of a sudden produced a baby boy…”
      “আমি যখন পাঁচ বছরের, হঠাতই ছেলে এলো বাবা-মা’র কোলজুড়ে।”
      এমনও হতে পারতো প্রথম বাক্যটা। ভালো অনুবাদক নিশ্চয় আরও ভালো কিছু লিখতে পারবেন চেষ্টা করলে।

      আসলে অনুবাদ করার সময় প্রতিটা বাক্যকেই আলাদাভাবে ভাবতে হবে সময় দিয়ে। সেটা সম্ভব হয় না বলেই আমাদের দেশে অনুবাদ পড়বার সময় মনে হয় যেন অনুবাদককে পরীক্ষায় হলে বসিয়ে দিয়ে বলা হয়েছে– এই গল্পটার বঙ্গানুবাদ করো। যেমনটা আমরা করতাম স্কুলে পড়তে।

      তবে অস্বীকার করার উপায় নেই, নুসরাত সুলতানার লেখার হাত আছে। গল্পের পরের দিকটা পড়বার সময় মাঝে মাঝেই তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত-মনযোগী শব্দচয়ন এবং বাক্যগঠন সেটা বলে দেয়। শুধু খেয়াল রাখতে হবে, প্রতিটা বাক্যই সেই মনযোগ সমানভাবে দাবী করে একটা শিল্পসম্মত অনুবাদ গল্পে।

      শুভকামনা নুসরাত সুলতানার জন্যে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন এনামুর রেজা — জানুয়ারি ৮, ২০১৫ @ ৫:২৪ অপরাহ্ন

      ভাল লেগেছে।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com