ঘুড্ডি: বাংলাদেশের প্রথাবিরোধী ও প্রতিবাদী চলচ্চিত্র

নাদির জুনাইদ | ৫ নভেম্বর ২০১৪ ১১:২৩ অপরাহ্ন

ghuddi-1.jpgঘুড্ডি চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্যে রাইসুল ইসলাম আসাদ ও সুবর্ণা মুস্তফা
মুক্তিযুদ্ধের পূর্বে এবং মুক্তিযুদ্ধের পরের দশকেও বাংলাদেশে মূলধারার বিনোদনধর্মী চলচ্চিত্রের বিভিন্ন উপাদান যেমন কাহিনীর গতানুগতিক ও অতি সহজ ধারাবাহিকতা, উদ্ভাবনী ও জটিল চলচ্চিত্র কৌশলের অনুপস্থিতি, অভিনয়ে অতিরিক্ত আবেগের ব্যবহার প্রভৃতি প্রত্যাখ্যান করে বিকল্প ধারার ছবি নির্মিত হয়েছিল কেবল হাতে গোণা কয়েকটি। গতানুগতিক ছবির কাঠামো কিছুটা অনুসরণ করেও রূপকের মাধ্যমে শক্তিশালী রাজনৈতিক বক্তব্য প্রদানের মধ্য দিয়ে জহির রায়হান যেমন তার ছবি জীবন থেকে নেয়া (১৯৭০) সম্পূর্ণ ভিন্ন করে তুলেছিলেন সমসাময়িক বাংলা চলচ্চিত্রসমূহ থেকে, তেমন রূপকধর্মী কাহিনীর মধ্য দিয়ে তীব্র রাজনৈতিক সমালোচনা প্রদানের চেষ্টাও স্বাধীনতার পরের দশকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে চোখে পড়েনি। প্রাধান্য পায়নি সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার বিভিন্ন জরুরি দিককে সরাসরি মোকাবেলা করার প্রয়াস। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছিল আলমগীর কবির নির্মিত চলচ্চিত্রসমূহ। সত্তরের দশকে আলমগীর কবিরের কয়েকটি ছবির (ধীরে বহে মেঘনা, সূর্যকন্যা, রূপালী সৈকতে) মাধ্যমে এদেশের শৈল্পিক এবং প্রথাবিরোধী ছবির অনুরাগী দর্শকরা নিজ দেশে তৈরি নান্দনিকভাবে উদ্ভাবনী এবং বক্তব্যধর্মী চলচ্চিত্র দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। এই ছবিসমূহে কখনো সরাসরি, কখনো অপ্রত্যক্ষভাবে পরিচালক প্রকাশ করেছেন তার রাজনৈতিক বক্তব্যও।

১৯৮০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সৈয়দ সালাহ্উদ্দীন জাকী’র ঘুড্ডি নান্দনিক নির্মাণশৈলী, রাজনৈতিক সমালোচনা, অভিনয় এবং কাহিনীর অগতানুগতিকতা, বক্তব্যের গভীরতা বিভিন্ন বিচারেই ছিল সমসাময়িক বাংলাদেশী ছবি থেকে ভিন্ন। কাহিনী, নির্মাণপদ্ধতি, রাজনৈতিক বক্তব্য প্রভৃতি দিক থেকে ছবিটিকে গতানুগতিক বাংলাদেশী ছবি থেকে ব্যতিক্রমী করে তোলার ক্ষেত্রে পরিচালকের সফলতার কারণে বাংলাদেশে এ পর্যন্ত নির্মিত বিকল্প ধারার চলচ্চিত্রসমূহের মধ্যে ঘুড্ডি অন্যতম শক্তিশালী ছবি হিসেবে বিবেচিত হওয়ার যোগ্য। দর্শকদের জন্য নতুন ধরনের চলচ্চিত্র দেখার সুযোগ তৈরি করার ব্যাপারে ঘুড্ডি’র সাফল্য আলমগীর কবিরের ছবিসমূহের চেয়ে কম ছিল না। বরং ঘুড্ডি ছবিতে ঢাকা শহরের সমসাময়িক পরিবেশ যতোটা সরাসরি এবং বাস্তবসম্মতভাবে উঠে এসেছে, সত্তরের দশকে দেশে নির্মিত অন্য কোন চলচ্চিত্রে ঢাকা এমনভাবে পৃথক একটি চরিত্র হিসেবে উঠে আসেনি। ঘুড্ডি’তে বিভিন্ন সমালোচনা প্রকাশের জন্য যেমন ঝাঁঝালো এবং বিদ্রুপাত্মক ভঙ্গি ব্যবহার করা হয়েছে, তাও ছিল বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে নতুন। অথচ ভিন্নধর্মী এই ছবিটি নিয়ে বাংলাদেশে যথেষ্ট আলোচনা হয়নি। ছবিটি বাংলাদেশে ডিভিডি হিসেবেও পাওয়া যায় না। নতুন প্রজন্মের চলচ্চিত্র-অনুরাগীরা অনেকেই কেবল এই ছবিটির নাম শুনেছেন, কিন্তু ছবিটি দেখার সুযোগ তাদের হয়নি। উদ্ভাবনী নির্মাণশৈলী এবং সাহসী রাজনৈতিক সমালোচনা বিকল্প ধারার চলচ্চিত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই দুটি দিককে প্রাধান্য দেয়ার চেষ্টা যখন বাংলাদেশের বর্তমান বিকল্প ধারার চলচ্চিত্রে দেখা যায় না বললেই চলে, তখন পুরনো দিনের বাংলাদেশী একটি চলচ্চিত্র কিভাবে অগতানুগতিক ও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছিল সে সম্পর্কে নতুন সময়ের দর্শকদের অবহিত করার জন্য ৩৪ বছর আগে তৈরি ঘুড্ডি ছবিটি নিয়ে আলোচনার গুরুত্ব বেড়ে যায়। এই আলোচনার মধ্য দিয়ে এই দেশের অতীতের এবং বর্তমানের বিকল্প ধারার ছবির একটি তুলনামূলক পর্যালোচনা করার সুযোগও তৈরি হবে দর্শকদের জন্য।
ghuddi-2.jpg
ঘুড্ডি চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্যে রাইসুল ইসলাম আসাদ
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ঠিক নয় বছর পর মুক্তি পাওয়া ঘুড্ডি ছবিটিতে পরিচালকের ক্যামেরায় বার বার উঠে আসে ঢাকার রাস্তাঘাট, বিশ্ববিদ্যালয়, দোকান, রেস্টুরেন্ট, সিনেমা হল, ফাইভ স্টার হোটেল, দরিদ্র এলাকার সরু গলি, সাভারের স্মৃতিসৌধ, সোনারগাঁওয়ের পুরনো প্রাসাদ, বুড়িগঙ্গা নদী। ক্যামেরাকে বার বার স্টুডিওর বাইরে সত্যিকারের লোকেশনে নিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে পরিচালক শহরের বাস্তব পরিস্থিতিকে দর্শকের কাছে যেন আরো বেশি স্পষ্ট করে তোলেন। ছবির মূল চরিত্র এক তরুণ, যার নাম আসাদ (রাইসুল ইসলাম আসাদ)। তার নিজের কথায় ”একাত্তরে কুড়ি ছুঁই ছুঁই যার বয়স, এখন কতো বলতে পারি না।” ঘুড্ডি ছবির একটি লক্ষণীয় দিক হলো ছবির প্রায় সব ক’টি প্রধান চরিত্রের নামই রাখা হয়েছে এই চরিত্রসমূহে অভিনয় করা শিল্পীদের আসল নাম অনুসারে। বাস্তবতা এবং সত্যের সাথে ছবিটির সম্পর্ক আরো দৃঢ় করার জন্য পরিচালক হয়তো সচেতনভাবেই এই কৌশলটি ব্যবহার করেছেন। সাভার স্মৃতিসৌধের সামনে আসাদের মনে মনে বলা একটি স্বগতোক্তির (ইন্টারনাল মনোলোগ) মাধ্যমে আমরা জানতে পারি, আসাদ অংশগ্রহণ করেছিল ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে। বাস্তব জীবনেও অভিনেতা রাইসুল ইসলাম আসাদ একজন মুক্তিযোদ্ধা; তিনি ছিলেন ঢাকা শহরে অভিযান পরিচালনা করা মুক্তিবাহিনীর গেরিলা দলের একজন সদস্য। ছবির সাথে বাস্তবতার যোগাযোগ ঘনিষ্ঠ করার চেষ্টাটি আরো দৃশ্যমান হয় যখন একটি দৃশ্যে নাসিরুদ্দীন ইউসুফ বাচ্চুকে দেখা যায় আসাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে। অলসভাবে বাড়িতে শুয়ে থাকা আসাদের সাথে আড্ডা দিতে তার বাড়িতে আসে বাচ্চু। বাস্তব জীবনেও ১৯৭১ সালে আসাদ আর নাসিরুদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু ছিলেন মুক্তিবাহিনীর একই গেরিলা দলের সদস্য। পুরো ছবিতে বাচ্চুকে কেবল এই একটি দৃশ্যেই অল্প সময়ের জন্য দেখা যায়। আসাদের প্রকৃত নামের ব্যবহার, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার পরিচয়, আর তার বন্ধু হিসেবে আরেকজন মুক্তিযোদ্ধা বাচ্চুর উপস্থিতি ছবিতে বাস্তবতার আবহটিকে অনেক জোরালো করে তোলে।

প্রথম দৃশ্য থেকেই ঘুড্ডি হয়ে ওঠে অগতানুগতিক, বোঝা যায় পরিচালক সচেতনভাবে ছবির ফর্মকে ভিন্ন করার চেষ্টা করছেন, এবং সুচিন্তিতভাবে তিনি সেই কৌশলগুলোই ব্যবহার করছেন যা বাস্তবতার সাথে দর্শকের সংযোগকে জোরদার করে। প্রথম সিকোয়েন্সটিতেই ঘুড্ডি হয়ে ওঠে সেল্ফ-রিফ্লেক্সিভ (চলচ্চিত্র মাধ্যম এবং চলচ্চিত্র নির্মাণপদ্ধতির বিভিন্ন দিকের প্রতি দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ করা)। সেল্ফ-রিফ্লেক্সিভ ছবি সবসময়ই দর্শকের সক্রিয়তা বাড়িয়ে তোলে। কারণ চলচ্চিত্র নির্মাণের বিভিন্ন দিক দর্শকের সামনে উন্মোচিত করার ফলে চলচ্চিত্র তৈরির বাস্তব দিকটি দর্শকের সামনে উঠে আসে। ফলে সনাতন বিনোদনমূলক চলচ্চিত্র যেভাবে চলচ্চিত্র তৈরির বিভিন্ন দিক ঢেকে রেখে দর্শকের জন্য বিভ্রম আর মোহ তৈরি করে ছবির কাহিনীতে দর্শককে মজিয়ে রাখে, ছবির কাল্পনিক জগতে দর্শককে মগ্ন করে তোলে, সেল্ফ-রিফ্লেক্সিভ ছবিতে দর্শক তেমন নিষ্ক্রিয়ভাবে মোহাবিষ্ট হতে পারে না। ঘুড্ডি’র প্রথম দৃশ্যে মিড ক্লোজ-আপ শটে দেখা যায় দেয়ালে ঝোলানো একটি বিমূর্ত চিত্রকর্ম, সেই চিত্রকর্মের সামনে এরপর দেখা যায় একজনের হাত। সেই হাত দিয়াশলাই বাক্সে কাঠি ঘষে কাঠিতে আগুন জ্বালায়। তারপরই মিড ক্লোজ-আপ ফ্রেমে প্রবেশ করে আসাদ, মুখে না ধরানো আস্তো একটি সিগারেট। কাঠিটি অবশ্য নিভে যায় সঙ্গে সঙ্গেই। দিয়াশলাই বাক্সেও আর কাঠি নেই; বিরক্ত আসাদ ছুঁড়ে ফেলে দিয়াশলাইয়ের খালি বাক্স। তারপর সামনে থাকা তার বন্ধুর কাছে লাইটার চায়। বন্ধু লাইটার এগিয়ে দিলে আসাদ লাইটার জ্বালায়, কিন্তু সিগারেট ধরায় না। ক্লোজ-আপে দেখা যায় আসাদের মুখের সিগারেটের সামনে লাইটারে স্থিরভাবে জ্বলতে থাকা আগুন।
ghuddi-3.jpg
ঘুড্ডি চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্যে রাইসুল ইসলাম আসাদ ও সুবর্ণা মুস্তফা
”আবে কি করতাছোস্? গ্যাস কি মাগনা?”– এমন অপচয় দেখে অন্যদিক থেকে চিৎকার করে ওঠে লাইটারটির বিরক্ত মালিক। বন্ধুর বিরক্তি দেখেও আসাদ সহসা সিগারেট ধরায় না। মুচকি হেসে আরো কিছুটা সময় নিয়ে তারপর সিগারেট ধরিয়ে আসাদ তার বন্ধুকে বলে ”অ্যাকটিং, বুঝলি, অ্যাকটিং।” এরপর একজন সিনেমাটোগ্রাফার ক্যামেরা চালানোর আগে দৃশ্যের ফ্রেমিং সম্পর্কে আরো নিশ্চিত হওয়ার জন্য দুই হাত পাশাপাশি রেখে তার মধ্য দিয়ে যেভাবে সামনে তাকান, সেই ভঙ্গিতে এগিয়ে আসতে থাকে আসাদ। নিজের প্রসারিত দুই হাতের মধ্য দিয়ে দেখা যায় আসাদের মুখ, ক্যামেরা এরপর ধীরে ধীরে চলে আসে এগিয়ে যাওয়া আসাদের পেছনে। এবার তার হাতের মধ্য দিয়ে দেখা যায় তার বন্ধুর মুখ। আসাদ বলতে থাকে তার দেখা একটি চলচ্চিত্র-দৃশ্যের কথা– ”ছবিটার নাম মনে নাই। একটা মাইয়া, মুখ, সিগারেট… লাইটার জ্বালায়, সিগারেট ধরায় না… আগুনের দিকে তাকায়া রইসে তো রইসেই… কি এক্সপ্রেশন! তারপর পুরা চোখ মেইলা তাকাইলো পোলাটার দিকে… অ্যাকটিং, বুঝলি, কারে কয় অ্যাকটিং।” এই অভিনয় সম্পর্কে তার মুগ্ধতার বর্ণনা দিতে দিতেই এবার আসাদ তিক্ত, ক্রুদ্ধ মন্তব্য করে নিজ দেশের অভিনেতাদের দুর্বল, নিম্নমানের অভিনয় সম্পর্কে। তার কন্ঠে ফুটে ওঠে ”আমাদের হিরো”-দের প্রতি তীব্র বিরক্তি আর ক্ষোভ।
এই সিকোয়েন্সটি আরো দেখায় আসাদ তার বন্ধুর লন্ড্রিতে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলো, এবং এক পর্যায়ে সে তার বন্ধু লন্ড্রি মালিকের জোরালো আপত্তি সত্বেও লন্ড্রিতে থাকা অন্য মানুষের একটি শার্ট নিজে পরার জন্য নিয়ে নেয়। সে লন্ড্রি মালিককে জানায়– ”আই অ্যাম ওয়ারিং ইট টুডে, অ্যান্ড আই প্রমিজ টু রিটার্ন ইট টুমরো।” ছবির প্রথম সিকোয়েন্সটি এভাবে তুলে ধরে বিভিন্ন তথ্য। বোঝা যায়, আসাদ একজন বেকার, এবং তার স্বভাব বেপরোয়া, ছন্নছাড়া গোছের। কিন্তু সে শিক্ষিত এবং উঁচু মানের শিল্পের প্রতি তার আকর্ষণ রয়েছে। একই সাথে গতানুগতিক, গভীরতাহীন, পরিশ্রম ছাড়া তৈরি সাংস্কৃতিক উপাদানের প্রতি তার বিতৃষ্ণা প্রবল। একটি বিমূর্ত চিত্রকর্মের সামনে আসাদকে প্রথম দেখতে পাওয়ার দৃশ্যে নান্দনিক দিক দিয়ে আকর্ষণীয় চিত্রকর্মটি যেন আসাদের সাংস্কৃতিক রুচিকেই নির্দেশ করে। ছবিতে পরবর্তী আরেকটি দৃশ্যে আসাদকে শেক্সপীয়ারের ”ম্যাকবেথ” থেকেও কয়েকটি স্তবক বলতে দেখি আমরা। আসাদ যখন ইংরেজিতে কথা বলে ওঠে, আমরা লক্ষ করি তার ইংরেজি উচ্চারণ বিশুদ্ধ। কিন্তু বন্ধুর সাথে সে কথা বলে ঢাকা শহরের আটপৌরে, কথ্য ভাষায়। সিকোয়েন্সটিতে তা তৈরি করে বাস্তবতার আবহ। আর আসাদের নিজের দেখা চলচ্চিত্র দৃশ্যের বর্ণনা, সিনেমাটোগ্রাফারের দৃশ্য তোলার ঢংয়ের অনুকরণ, অভিনয়ের প্রশংসা চলচ্চিত্রের মধ্যে চলচ্চিত্র মাধ্যমের বিভিন্ন দিকের প্রসঙ্গ উপস্থাপন করে দর্শকের জন্য। চলচ্চিত্রের কাল্পনিক জগতে দর্শকের নিষ্ক্রিয় মগ্নতা এভাবে শুরুতেই বাধাগ্রস্ত করা হয়। আর বাংলাদেশের হিরোদের দুর্বল অভিনয়ের প্রতি আসাদের বিদ্রুপপূর্ণ কড়া মন্তব্য শুরুতেই স্পষ্ট করে তোলে ঘুড্ডি ছবিতে আমাদের দেশের গতানুগতিক ধারার চলচ্চিত্রকে তীব্রভাবে সমালোচনা করার প্রবণতা ।

চাকচিক্য আর বিনোদন-সর্বস্ব অগভীর চলচ্চিত্রের প্রতি পরিচালকের সমালোচনা আর বিরোধিতা ঘুড্ডি-তে উঠে আসে বার বার। ছবির দ্বিতীয় সিকোয়েন্সে আসাদকে দেখা যায় ঢাকার রাস্তায় একটি চলন্ত রিকশায় ফুরফুরে মেজাজে বসে থাকতে, তার পরনে লন্ড্রি থেকে ধার করা অন্যের সেই শার্ট। এই সময় শোনা যায় আসাদের আরেকটি ইন্টারনাল মনোলোগ। বার বার এমন স্বগতোক্তির ব্যবহারও ঘুড্ডি’র ফর্মকে বাংলাদেশের গতানুগতিক চলচ্চিত্র থেকে ভিন্ন করে তোলে। আসাদের ভাবনা শুনতে পাই আমরা: ”হিরো হওয়ার খুব শখ আমার। মাইক-ময়দানের, কলমের, নাকি পর্দার?” হঠাৎ পেছন থেকে আসতে থাকা একটি চলন্ত গাড়ির সামনে রিকশা থেকে লাফিয়ে পড়ে আসাদ। তার এই লাফিয়ে পড়া বিনোদনমূলক অ্যাকশনধর্মী ছবিতে অহরহ দেখতে পাওয়া হিরোদের অবাস্তব ও অতিমানবীয় কাজ করার দৃশ্যগুলোই মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু ঘুড্ডি’র এই দৃশ্যটির উদ্দেশ্য যে বিনোদনমূলক ছবির এমন দৃশ্যের মতো দর্শককে কেবলই আনন্দ যোগানো নয়, বরং তা ব্যবহৃত হয়েছে বিনোদনধর্মী ছবির এমন একটি কৌশলের প্রতি দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য তা সহসাই স্পষ্ট হয়। আসাদ দ্রুত ব্রেক কষে থেমে যাওয়া গাড়িটির চালকের আসনে বসে থাকা তার বন্ধুর দিকে তাকিয়ে নিজেকে নির্দেশ করে নাটকীয় ঢংয়ে বলে ওঠে: ”অ্যাকটিংটা কেমন হইলো? ড্যাশিং হিরো!!” এবার বন্ধুটির কন্ঠে শোনা যায় বিদ্রুপ: ”ড্যাশিং হিরো, না ষাঁড়!” এই বন্ধুটি যখন তৎকালীন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে নিজের গাড়ি পার্ক করে, আসাদকে গাড়িতে বসিয়ে রেখে হোটেলের ভেতরে যায়, তখন হোটেলের পার্কিং স্পেসেই স্থাপত্যবিদ্যার ছাত্রী ঘুড্ডির (সুবর্না মুস্তাফা) সাথে আসাদের পরিচয় ঘটে। ধনী পরিবারের মেয়ে ঘুড্ডির গাড়ি স্টার্ট না নেওয়ায় আসাদ বন্ধুর গাড়িতে করে ঘুড্ডিকে বাড়ি পৌঁছে দেয়। আর তখন থেকেই ঘুড্ডির কাছে আসাদের একের পর এক মিথ্যা কথা বলা শুরু হয়। ঘুড্ডির কাছে বন্ধুর গাড়িটিকে আসাদ নিজের গাড়ি বলেই বর্ণনা করে, আর নিজের আসল নামের পরিবর্তে জানায় তার নাম মোহাব্বত আলী। প্রথম দেখাতেই ঘুড্ডিকে পছন্দ করে ফেলে আসাদ। আর পরের একটি দৃশ্যে দেখা যায় নিজের বাড়িতে ইংরেজি পপ মিউজিক শুনতে শুনতে ঘুড্ডি একলা ঘরে উচ্চারণ করে সদ্য পরিচিত হওয়া মোহাব্বতের নাম, যা মোহাব্বতের প্রতি তার ভালো লাগাকেই নির্দেশ করে।

এই পর্যায়ে ছবিটিতে একটি গতানুগতিক রোমান্টিক কাহিনীর আবহ লক্ষ করা গেলেও কিছু নির্দিষ্ট কৌশল ও বক্তব্য ব্যবহারের মধ্য দিয়ে পরিচালক শুধুই বিনোদন যোগানো চলচ্চিত্র থেকে ঘুড্ডি’র র ভিন্নতা টিকিয়ে রাখেন। আসাদ-ঘুড্ডি’র বার বার দেখা হওয়ার দৃশ্যগুলিতেও একের পর এক উঠে আসতে থাকে চলচ্চিত্রের নানা প্রসঙ্গ আর বিভিন্ন দিকের উল্লেখ। আসাদ-ঘুড্ডি’র দেখা হয় সিনেমা হলে, তাদের হঠাৎ দেখা হওয়াকে আসাদ তুলনা করে ছবির গল্প হিসেবে। একটি দৃশ্যে টেলিফোনে নিজের এক বন্ধুকে মোহাব্বতের সাথে পরিচয় হওয়ার কথা বলার সময় ঘুড্ডিও মোহাব্বতের সাথে তার দেখা হওয়ার ঘটনাটিকে ছবির গল্পের মতো উল্লেখ করে বলে, কোন ছবির শুরু হিসেবে ঘটনাটি মন্দ নয়। তারপরই ঘুড্ডি সরাসরি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে যেন দর্শককে উদ্দেশ্য করেই বলে ওঠে ”হিট।” সরাসরি দর্শকের দিকে তাকিয়ে ছবির একটি চরিত্রের চলচ্চিত্রের সাফল্য সম্পর্কিত এই শব্দটি ব্যবহার করা দর্শকের জন্য এই চিন্তাই তৈরি করে যে চরিত্রটি ঘুড্ডি ছবি সম্পর্কেই এই কথাটি উল্লেখ করেছে কিনা। ঘুড্ডি সম্পর্কেই পরোক্ষভাবে মন্তব্য করার দৃষ্টান্ত আমরা লক্ষ করি একাধিকবার। একটি সিকোয়েন্সে আসাদ আর ঘুড্ডিকে সাভারের রাস্তায় তাদের নষ্ট হয়ে যাওয়া গাড়ি ঠেলতে দেখা যায়, আসাদ এমন সময় খোলা গলায় গানও গেয়ে ওঠে, এরপর তাদের দেখা যায় শালবনের ভেতর, সেখানে পাশাপাশি বসে গল্প করে তারা, ব্যাকগ্রাউন্ড সঙ্গীত হিসেবে বাজে ধীর, রোমান্টিক সুর। পরের সিকোয়েন্সেই আসাদ তার এক শিল্পপতি বন্ধুকে সাভারের সেই দিনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলে: ”গাড়ি নষ্ট হইসে, গাড়ি ঠেলছি, তামাম জঙ্গলে ঘোড়ার মতো দৌড়াইছি, গান গাইছি, গান হুনছি, হারায় যাওনের কথাও কইছি।” লক্ষণীয়, ঘুড্ডি এবং ঘুড্ডির অন্য বন্ধুদের সাথে আসাদকে সবসময় প্রমিত বাংলায় কথা বলতে দেখা গেলেও, নিজের বন্ধুদের সাথে সে কথা বলে আটপৌরে, ঘরোয়া ভাষায়। আসাদের ভিন্ন মুহুর্তে ভিন্নভাবে কথা বলা যা স্বাভাবিক ও বাস্তব তাই তুলে ধরে। এক্ষেত্রে পরিচালক কোন একটি বিশেষ ভাষাকে জোর করে দর্শকের কাছে জনপ্রিয় করার চেষ্টা করেননি।

”ঠেলছস্? লৌড় পাড়ছস্? গান গাইছোস্? পীড়িতের ডায়ালগ কইছোস্? ফাইট ভি করছস্? তয় তো তোরে হিরো হওনের সবক দেওনই লাগে”– আসাদের ধনী বন্ধুর এই কথাগুলো শুধুই বিনোদন যোগানো বাণিজ্যিক ছবির গতানুগতিক, গৎবাঁধা উপাদানসমূহের বর্ণনাই তুলে ধরে যে উপাদানগুলো এমন জৌলুস আর চটক-সর্বস্ব ছবিতে থাকতেই হবে দর্শককে আকৃষ্ট করে ছবির আর্থিক লাভ নিশ্চিত করার জন্য। এরপরই সেই বন্ধুটি আসাদকে নিয়ে যায় একটি ছবির শুটিং হওয়ার স্থানে। বোঝা যায়, সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশে আসাদের এই বন্ধুটি অগাধ টাকার মালিক, এবং তার কিছু টাকা সে ব্যয় করছে মূলধারার ছবি প্রযোজনার কাজে। এই দৃশ্যে দর্শক সরাসরি দেখতে পায় মুভি ক্যামেরা আর চিত্রগ্রাহককে, আলোকসজ্জার উপকরণ, ক্যামেরা ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা পরিচালক আর পরিচালকের সহকারীদের, ক্যামেরার সামনে দেখা যায় নাচতে থাকা ছবির নায়িকাকে, বার বার শোনা যায় পরিচালকের বলা অ্যাকশন আর কাট অর্থাৎ একটি ছবির ভেতর আরেকটি ছবি তৈরির দৃশ্যসমূহ দেখানোর মধ্য দিয়ে ঘুড্ডি সম্পূর্ণভাবেই হয়ে ওঠে সেল্ফ-রিফ্লেক্সিভ, এবং দর্শককে তা আবার মনে করিয়ে দেয় যে চলচ্চিত্র তৈরি করা হয়, পর্দায় যা দেখা যাচ্ছে তা একটি উদ্দেশ্য নিয়ে তৈরি করা হয়েছে, এবং এই ভাবনা চলচ্চিত্রে সৃষ্ট হওয়া ভ্রমকে ভেঙ্গে দেয়, দর্শকের নিষ্ক্রিয়ভাবে ছবির কাহিনী উপভোগ করার সুযোগ ব্যাহত করে।

পরের আরেকটি সিকোয়েন্সে আসাদ আর ঘুড্ডিকে দেখা যায় সোনারগাঁওয়ের প্রাচীন প্রাসাদের ক্ষয়ে যাওয়া দেয়ালের মাঝে দাঁড়িয়ে কথা বলতে। পুরনো, ধ্বংসপ্রাপ্ত দালানে দাঁড়ানো দুই নতুন সময়ের মানুষ, এই বৈসাদৃশ্য যেন প্রতীকী হয়ে ওঠে দ্ইু তরুণ-তরুণীর পরিচয়ের মাঝে টিকে থাকা লুকানো বৈপরীত্যের। একজন আপাতদৃষ্টিতে আনন্দিত, সুখী কিন্তু সে জানায় প্রাচুর্যের মাঝে থেকেও তার বন্দী, অসুখী অস্তিত্বের কথা: ”বিরাট প্রাচীর, আকাশছোঁয়া। প্রাচীর ডিঙ্গিয়ে বাইরের জগতের দুঃখ, কান্না, ভালোবাসার খবর কিছুই পৌঁছায় না। তাই কারাপ্রাচীরের পাথরে আর মণি-মাণিক্যে তফাৎ কই?” আর অন্যজন, যে তরুণীর কাছে দিয়েছে নিজের মিথ্যা পরিচয় সে তরুণীকে তার ঢেকে রাখা কষ্টের কথা বলতে দেখে, নিজে রূপকের সাহায্যে, অপ্রত্যক্ষভাবে স্বীকার করতে চায় তরুণীকে দেয়া নিজের মিথ্যা পরিচয়ের কথা: ”সাবধান, যোদ্ধা, সাবধান। তোমার শরীরে পিতার, প্রপিতামহের ধার করা পোষাক। ছিঁড়ে ফ্যালো, খুলে ফ্যালো। দাঁড়াও কৃষ্ণাঙ্গ যোদ্ধার নগ্ন রূপে। উলঙ্গ চামড়ায় ঝলসে উঠুক চৈত্রের খররৌদ্র। নইলে তোমায় ওরা বানাবে মেলার সাজানো পুতুল।” গভীর, চিন্তাশীল এই সংলাপগুলোর সময় ব্যাকগ্রাউন্ডে শোনা যায় পিয়ানো আর অন্যান্য পাশ্চাত্য বাদ্যযন্ত্রের সুর, সেই সুর দ্রুতলয়ের হলেও কিছুটা বিষাদক্লিষ্ট, তা তৈরি করে গম্ভীরতার একটি আবহ। সিকোয়েন্সটি হয়ে ওঠে ইউরোপীয় আর্ট সিনেমায় সচরাচর দেখতে পাওয়া কোন দৃশ্যের মতো। বাংলাদেশের অনেক বিকল্প ধারার ছবিতেও খুব কমই দেখা গিয়েছে এই দৃশ্যের অনুরূপ কোন দৃশ্য। কিন্তু পরের একটি সিকোয়েন্সেই আসাদের সোনারগাঁওয়ের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে আসাদের শিল্পপতি বন্ধুকে বলতে শোনা যায়: ”নাহ্ হয়নি। পাবলিক বুঝবে না। কঠিন করে ফেলেছিস্। ভাঙ্গা দেয়ালের শব্দ, গন্ধ, বন্দী রাজকন্যা, রাজপুত্র, কালো চামড়া… নাহ্, কিচ্ছু হয়নি।” এই সংলাপটির মাধ্যমে একদিকে যেমন জটিল আর গভীরতাসম্পন্ন্ বিষয়ের প্রতি গতানুগতিক চলচ্চিত্র আর এই ধরনের ছবির দর্শকদের অনীহা আর অপছন্দকে নির্দেশ করা হয়, তেমনি একইসাথে প্রথাগত ছবি থেকে ঘুড্ডি কিভাবে পৃথক তাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বোঝা যায়, ”পাবলিক বুঝবে না” এই ঝুঁকি নিয়েও পরিচালক তার ছবিকে নির্মাণশৈলী আর বক্তব্যের দিক থেকে কঠিন করে তুলেছেন। বাণিজ্যিক ছবির মূলনীতিকে ঘুড্ডি প্রত্যাখ্যান করে পুরোপুরিভাবেই। কোন ছবিতে বিনোদনধর্মী চলচ্চিত্রের কিছু উপাদান ব্যবহার করলেও ফর্মের উদ্ভাবনী ও বুদ্ধিদীপ্ত ব্যবহারের মাধ্যমে যে সেই ছবিকে গতানুগতিক চলচ্চিত্র থেকে আলাদা রাখা সম্ভব, পরিচালক সংহত করেন সেই ধারণাটিকেও।
ghuddi-4.jpgঘুড্ডি চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্য
ঘুড্ডির সাথে রসিকতা করার সময় একবার আসাদ বলে ওঠে: ”আমরা কি সিনেমার কোন দৃশ্যে অভিনয় করছি যে সেন্সর কাটবে? জীবন নামক অভিনয়ে সেন্সরের কাঁচি নেই।” চলচ্চিত্রের মধ্যে চলচ্চিত্র সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রসঙ্গের ক্রমাগত উপস্থাপন দর্শককে বার বার মুখোমুখি করে আকস্মিকতার, যে ঝাঁকুনি বাধাগ্রস্ত করে চলচ্চিত্রের কল্পিত কাহিনীর বিভ্রমকে। পরিচালকের এই কৌশলগুলো তাই হয়ে ওঠে মার্কসবাদী নাট্যকার বের্টোল্ট বেখ্ট্ প্রবর্তিত ’ডিসট্যানসিয়েশন’ কৌশলের অনুরূপ। এই ধরনের কৌশল ব্যবহার করা হয় ছবির কাহিনীতে দর্শকের অসাড়ভাবে মজে যাওয়াকে বিঘ্নিত করে দর্শকের সক্রিয়ভাবে চিন্তা করার সুযোগ সৃষ্টি করার জন্য। আসাদ আর ঘুড্ডির সম্পর্ক এগিয়ে যাওয়া দেখানোর দৃশ্যগুলোর সাথে পরিচালক ছবিতে অন্তর্ভূক্ত করেন আরো কিছু দৃশ্য যা দেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিমন্ডল সম্পর্কে পরিচালকের পর্যবেক্ষণ আর সমালোচনা তুলে ধরে। সাভারের স্মৃতিসৌধে যেয়ে যখন ঘুড্ডি স্মৃতিস্তম্ভের ওপর ফুল রাখছিলো, তখন কয়েকটি শটে আসাদকে দেখা যায় স্মৃতিস্তম্ভ থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে। তার সদা হাস্যোজ্জ্বল মুখ তখন গম্ভীর। এই দৃশ্যগুলো কি নির্দেশ করে স্বাধীনতার পর মুক্তিযুদ্ধের যে ফসল তা থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের দূরবর্তী অবস্থান? মুক্তিযুদ্ধের যে অর্জন তার দিকে মু্ক্তিযোদ্ধাদের কেবল দূর থেকে তাকিয়ে থাকা? আসাদ ডুবে যেতে চায় নিজের ভাবনায়, কিন্তু ঘুড্ডির ক্যামেরার শাটারের ক্লিক শব্দে চমকে উঠে সে থেমে যায়। একটি লং শটে দেখা যায় ক্যামেরা হাতে স্মৃতিস্তম্ভের ছবি তুলছে ঘুড্ডি। আর তার পেছনে দূরে দাঁড়িয়ে এদিকেই তাকিয়ে আছে আসাদ। ১৯৭১-এর স্মৃতির ছবি তুলছে ঘুড্ডি। অথচ তার পেছনে দাঁড়ানো যুবকই যে একজন মুক্তিযোদ্ধা তা ঘুড্ডির জানা নেই। একটু পরই আসাদকে সে জিজ্ঞেস করে ”গন্ডগোলের সময় কোথায় ছিলেন?” স্বাধীন দেশে মুক্তিযুদ্ধ যেন কেবলই এখন ফ্রেমে আটকানো ছবি, আর মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া একজন মানুষ এই সমাজে অপরিচিত, উপেক্ষিত।

একটু পরই ইন্টারনাল মনোলোগের মাধ্যমে আমরা শুনতে পাই আসাদের ভাবনা: ”আমি আসলে খুঁজছি। একাত্তরের ধ্বংসস্তূপ থেকে খেতাব, প্রতাপ আর ইনডেন্টিংয়ের দরদালানের ভেতর। কি? আমিও তো যুদ্ধ করেছিলাম। এখন মুক্ত?” কিন্তু এই সমাজে আসাদ মুক্ত নয়, মুক্ত নয় ঘুড্ডির বাবা হাসান সাহেবও (হাসান ইমাম), পঞ্চাশের দশকে যিনি ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির নেতা, আর এখন ধনাঢ্য একজন মানুষ। ঘুড্ডিদের বাড়িতে এক সন্ধ্যায় একটি পার্টিতে ঘুড্ডির রাজনীতিসচেতন বন্ধু তারিকের (তারিক আনাম) কন্ঠে নেতাদের নিয়ে শোনা যায় বিদ্রুপ: ”ফাঁকতালে সোনা পেয়েই কিন্তু নেতা।” আর বন্ধুর সাথে সিনেমার শুটিং দেখতে যেয়ে সিনেমার নৃত্যশিল্পী নূপুরের (নায়লা আযাদ নূপুর) সাথে পরিচয় হওয়ার পর একদিন নূপুরের বাসায় আসাদ যখন কবিতা বলার ঢংয়ে কথা বলছিলো, তখন নূপুরের মন্তব্য: ”ওহ তুমি কবি? তা কবিবর, কলম ছেড়ে তোমার পর্দার নায়ক হওয়ার শখ কেন?” হাসতে হাসতে আসাদের জবাব: ”কবিবর না, কপিবর… বাঁদর।” এই কথার পরই আসাদের কন্ঠে শোনা যায় কটাক্ষ: ”দেখলাম, সব নায়ক-নেতাদেরই তো দেখলাম।” আরেক দৃশ্যে শিল্পপতি বন্ধুর অফিস কক্ষে প্রবেশ করে বন্ধুর উদ্দেশ্যে রসিকতা করে আসাদ বলে, ”চল্লিশ চোর, চাবি দাও।” শোনা যায় বন্ধুর পাল্টা রসিকতা, ”চোরের কাছে চাবি?” এবার আসাদের কন্ঠে ফুটে ওঠে বিদ্রুপ, ”যুগ পাল্টাইছে, এখন তাই… হেই আমলে শুনতাম বাইশ চোর, এই আমলে…।” আসাদ কথা শেষ করার আগেই তার বন্ধু তাকে কিছুটা ক্রুদ্ধ হয়ে থামিয়ে দেয়। কিন্তু পার্টিতে তারিকের তীব্র ভর্ৎসনার জবাবে হাসান সাহেব স্বীকার করেন, ”এখন শুধু প্রতীক্ষা, কখন সব ক্ষয়ে যাবে, ধ্বসে যাবে। ভেতরটা তো গেছেই। একটা কারাগার। আমাদেরই তৈরি। মুক্তি কই?”

ঘুড্ডিদের বাড়িতে পার্টির দৃশ্যটিও এই ছবির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি সিকোয়েন্স যেখানে সরাসরিভাবে উঠে আসে পরিচালকের রাজনৈতিক বক্তব্য। রাজনীতি নিয়ে আলোচনায় অন্যদের অনাগ্রহ দেখে বিরক্ত হয় তারিক। তার মতে, একদল শিখেছে রাজনীতি পরিত্যাজ্য, তা বখে যাওয়াদের জন্য, আর অন্যদল শিখেছে সমাজে রাজা বনে যাওয়া ভাগ্যবানদের জন্য আলাদা একটা কিছু। সমাজে উচ্চ শ্রেণীর মানুষের শাসন প্রাকৃতিক নিয়মের মতোই, এই কথা বলে যুগে যুগে বিভ্রম তৈরি করার চেষ্টাকেই ইঙ্গিত করে তারিক। শোষণ যে স্বাভাবিক কোন ব্যাপার নয়, বরং তা কিছু সুবিধাভোগী মানুষের তৈরি মার্কসীয় ব্যাখ্যার এই দিকটি সম্পর্কে মানুষের অসচেতনতা এবং রাজনৈতিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের সোচ্চার হওয়ার ব্যর্থতা দেখে ক্ষুব্ধ তারিক। তার কন্ঠে শোনা যায় রাজনৈতিক নেতাদের সমালোচনা: ”একটা পুরনো শার্ট। শার্টটা ছিঁড়ে গেছে এখানে সেখানে। শার্টটা শুধু হাত বদল হচ্ছে। ১৯৪৭-এ বৃটিশরা দিয়ে গেল আমার বাবার গায়ে। বাবা পাল্টালেন না। ছেঁড়া সেলাই করেই বরং তৃপ্তি। বাবা করলেন চরম প্রতারণা… নিঃশব্দে।” হাসান সাহেবের মতে, এই জন্য দায়ী ইতিহাসের ধারা, আর আমরা সবাই ইতিহাসের দাস। তখন তারিকের কন্ঠে প্রকাশ পায় ছবির পরিচালকের তীব্র রাজনৈতিক বক্তব্য: ”ইতিহাস ভুল লেখা হয়েছে। ভুল পড়ানো হয়েছে। ইচ্ছা করে। ইতিহাস তো শুধু জলসাঘরের। তোমরা ভুল ইতিহাসের ফাঁদে আজও সবাইকে বেঁধে ফেলছো।”

পার্টির এই দৃশ্যটি কয়েকবার দেখানো হয় হাই-অ্যাঙ্গল শটে। উঁচু থেকে তোলা দৃশ্যে খাবার টেবিল ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা ছবির চরিত্রদের মনে হয় ক্ষুদ্র, দুর্বল। এই সমাজে অবক্ষয়ের যে কারাগার তৈরি হয়েছে, সেখানে সবাই যেন আজ বন্দী, অসহায়। এই নীতিহীনতা পরিবর্তনের সাধ্য যেন কারো নেই। খাবার ঘরের একপাশের দেয়ালে দেখা যায় পাবলো পিকাসোর বিখ্যাত ছবি গুয়েরনিকা’র বিশাল একটি প্রিন্ট। স্পেনের গৃহযুদ্ধের সময় যুদ্ধবিমানের বোমাবর্ষণের কারণে সাধারণ, নিরীহ মানুষরা মুখোমুখি হয়েছিল নিদারুণ যন্ত্রণা আর ধ্বংসলীলার। এই অন্যায়ের প্রতিবাদেই পিকাসো সৃষ্টি করেছিলেন এই বিখ্যাত চিত্রকর্মটি। এক পর্যায়ে হাসান সাহেব ঘুরে তাকান দেয়ালে ঝোলানো গুয়েরনিকা’র দিকে। ক্যামেরা বামদিকে প্যান করে চলে আসে চিত্রকর্মটির ওপর। তারপরই ভয়েস-ওভার ন্যারেশনে শোনা যায় একটি অচেনা পুরুষ কন্ঠ। কন্ঠটি বলে চলে সেই ইতিহাসের কথা যা ঢেকে রাখার চেষ্টা করা হয় সবসময়, কারো অসৎ স্বার্থের জন্য: ”জলসাঘরের ইতিহাস। কলঙ্কের ইতিহাস, স্বার্থের ইতিহাস। অমুকের উত্থান, তমুকের পতন। ইতিহাসে লেখা নেই মাঠের সোনালী ফসল কখন সবার অলক্ষে সোনা হয়ে জলসাঘরের চমক বাড়ায়।” কথাগুলো শোনা যাওয়ার সময় ক্লোজ-আপে দেখানো হয় গুয়েরনিকা। ক্যামেরা কখনো প্যান, কখনো টিল্ট করে দেখায় চিত্রকর্মটির বিভিন্ন অংশ। ইতিহাসে ঘটে যাওয়া অন্যায় নিয়ে বলা বক্তব্যের সময় এক অন্যায়ের বিরুদ্ধে পিকাসোর প্রতিবাদের ভাষা আমরা দেখতে পাই। হঠাৎ ব্যবহৃত অচেনা কন্ঠের এই ভয়েস-ওভারটি ন্যারেটিভের ধারাবাহিকতা বিঘ্নিত করে দর্শকের জন্য তৈরি করে একটি অভিঘাত, ফলশ্রুতিতে ছবিতে তা তৈরি করে ব্রেখ্টীয় ডিসট্যানসিয়েশন এফেক্ট। রাজনৈতিক ছবির আরেকটি উল্লেখযোগ্য কৌশল হলো ”এক্সপ্লিসিট টিচিং মেথড” যখন ছবির কোন চরিত্র দর্শককে উদ্দেশ্য করে সরাসরি কোন রাজনৈতিক বক্তব্য দেয়, অথবা ছবির চরিত্রদের কথোপকথনই দেখানো হয়, কিন্তু কথাগুলো ছবির সাধারণ সংলাপ না হয়ে মূলত হয়ে ওঠে রাজনৈতিক বক্তব্য। পার্টির সিকোয়েন্সটিতে তারিক এবং হাসান সাহেবের সংলাপগুলো হয়ে ওঠে এক্সপ্লিসিট টিচিং মেথডের উদাহরণ।

ধার করা পোষাক ছবিতে হয়ে ওঠে জড়তা, অসাড়তা, অসচেতনতারই প্রতীক। আসাদের পরনে লন্ড্রি থেকে নেয়া অন্যের পোষাক যেন সেই ছেঁড়া শার্টটি যা অন্যেরা নিজেদের সুবিধার জন্য চাপিয়ে দিয়ে গেছে আমাদের শরীরে। সেই ছেঁড়া শার্ট যেমন মানসিকভাবে দীন ও অসচেতন করে রেখেছে আমাদের, তেমনি ধার করা পোষাক সত্য থেকে দূরে সরিয়ে রাখে আসাদকে। ঘুড্ডির কাছে আসাদের পরিচয় ঢেকে রাখা প্রসঙ্গে ক্ষুব্ধ কন্ঠে নূপুর আসাদকে লক্ষ করে একটি দৃশ্যে বলে ওঠে: ”তোমার ধার করা পোষাকটা খুলে ফেললে তুমি কে? ছিঁড়ে ফ্যালো। তারপর মুখোমুখি দাঁড়াও। বলো ভালোবাসি।” ছবিতে তারিককে প্রায়ই দেখা যায় খালি গায়ে থাকতে। এমনকি ঘুড্ডির সাথে কথা বলার সময়ও একাধিকবার তারিককে দেখানো হয় কেবল ট্রাউজার পরা অবস্থায়। এই ট্রিটমেন্টটি কি তারিকের গভীরতর রাজনৈতিক সচেতনতাবোধকেই প্রতীকীভাবে নির্দেশ করে? ছবির শেষ দিকে যখন ঘুড্ডি জেনে যায় আসাদের প্রকৃত পরিচয়, তখন তারিককে লেখা এক চিঠিতে আসাদ জানায়: ”আমি জানি ও জেনে ফেলেছে আমার ধার-করা পোষাকের ইতিহাস। কিন্তু পোষাকের নীচে আমি তো সত্যি, আমার ভালোবাসা তো সত্যি।”

ছবির শেষে যখন আসাদের এই ভালোবাসাকে মূল্য দিয়ে আসাদের কাছে ফিরে আসে ঘুড্ডি, আসাদ তখন শহর থেকে অনেক দূরে, নদীর কাছাকাছি। শহরের রাস্তায়, অলিগলিতে এতোদিন সে যা খুঁজে বেড়াচ্ছিলো নদীর বুকে তাই সে খুঁজে পেয়েছে: ”এখানে নোনা দেয়াল নেই, লাল-নীল বাঁধানো বই নেই, দেয়ালে ঝোলানো মাকড়ের জালের সাথে নেতাদের ছবিও নেই… আমার শরীরে নির্ভেজাল বৃষ্টি।” ছবির শেষ সিকোয়েন্সে নদীতে ঘুড্ডির সাথে বসা নৌকায় আসাদকে দেখা যায় খালি গায়ে। ধার করা পোষাকের আর প্রয়োজন নেই তার। ছবির প্রথম দৃশ্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময় ক্লোজ-আপে জ্বলন্ত দিয়াশলাই কাঠি দিয়ে আসাদের সিগারেট ধরানোর দৃশ্যটি হয়ে উঠেছিল একটি মোটিফ। শেষ সিকোয়েন্সেও নৌকায় বসে ভিজে যাওয়া দিয়াশলাই দিয়ে সিগারেট ধরাবার চেষ্টা করে আসাদ। কিন্তু ঘুড্ডি এগিয়ে এসে আসাদের ঠোঁট থেকে সিগারেটটি নিয়ে নদীতে ফেলে দেয়। ছবির সমাপ্তি আসাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আমাদের স্পষ্ট ধারণা দেয় না, কিন্তু ছবিতে যে দৃশ্যটি হয়ে উঠেছিল নিয়মিত, তা বদলে যাওয়া পুরনো সময় আর পুরনো অভ্যাস পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত দেয়। এই পরিবর্তন আসাদকে সুযোগ দিয়েছে মুক্তি অনুভব করার, পরিচালক এমনই বক্তব্যই হয়তো তুলে ধরেন।

ছবিতে ঘুড্ডির বন্ধু হিসেবে আমরা দেখতে পাই হ্যাপীকে। সেই সময়ের বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী হ্যাপী আখন্দই অভিনয় করেন হ্যাপী চরিত্রে, এবং ছবিতে তাকে দু’বার গান গাইতেও দেখা যায় যা ছবিটিকে আরো বেশি বাস্তব-ঘনিষ্ঠ করে তোলে। লাকী আর হ্যাপী আখন্দের বিখ্যাত গান ”আবার এলো যে সন্ধ্যা” দর্শকরা খুব সম্ভবত প্রথম শুনতে পান ঘুড্ডি ছবিতেই। গান ও ব্যাকগ্রাউন্ড সঙ্গীতের সুচিন্তিত ব্যবহার, বিভিন্ন জটিল ও উদ্ভাবনী চলচ্চিত্র কৌশল প্রয়োগ, সাহসী সমালোচনা, আর রাজনৈতিক বক্তব্য ছবিটিকে প্রথাবিরোধী এবং প্রতিবাদী করে তুলেছে। পরিচালকের প্রতিবাদ প্রকাশিত হয়েছে একদিকে বাণিজ্যিক ছবির গতানুগতিকতা আর অগভীরতার প্রতি, অন্যদিকে সমাজে টিকে থাকা রাজনৈতিক সমস্যার বিরুদ্ধে। এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যের জন্য ঘুড্ডি সফল একটি রাজনৈতিক সিনেমা হিসেবেও। কিন্তু পরিচালক এই দিকটিও স্পষ্ট করেছেন যে রাজনৈতিক, সমাজ-সচেতন ছবি হতে হলে যে সেই ছবিকে খুবই দুর্বোধ্য করে তুলতেই হবে তা নয়। বরং বাণিজ্যিক ছবির কিছু উপাদান অন্তর্ভূক্ত রেখেও প্রথাবিরোধী, রাজনৈতিক চলচ্চিত্র নির্মাণ সম্ভব। ঘুড্ডি নির্মাণের পর অতিবাহিত হয়েছে তিন দশকেরও বেশি সময়। এই দীর্ঘ সময়ে নির্মাণশৈলী আর বক্তব্যের দিক থেকে প্রতিবাদী ছবি বাংলাদেশে নির্মিত হয়েছে খুবই কম। পুরনো দিনের এই বাংলাদেশী ছবিটি আমাদের বর্তমান বিকল্প ধারার ছবিকে গতানুগতিকতার ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য অনুপ্রাণিত করতে পারলে, আমাদের চলচ্চিত্রেরই মঙ্গল।
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (8) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Rhythm Hasan — নভেম্বর ৬, ২০১৪ @ ১:৩০ পূর্বাহ্ন

      Very well written. Really wish to see progress in Bangladeshi movies. Can’t even say we are going backwards, because we were actually better back then.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Saiful Wadud Helal — নভেম্বর ৬, ২০১৪ @ ৪:৪৭ পূর্বাহ্ন

      ইতিহাস, রাজনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি, সিনেমা সব কিছু তীর্যকভাবে পর্যবেক্ষণ করা ঘুড্ডি ছবির নির্মাতা সৈয়দ সালাউদ্দিন জাকী পরবর্তীতে বাংলাদেশের সিনেমা তৈরীর কারখানা বিএফডিসি পরিচালনার দ্বায়িত্বও পেয়েছিলেন। প্রথম চলচ্চিত্রে দেশীয় বাজারী প্রথার বিরোধী চলচ্চিত্র নির্মাণ করা নির্মাতার জীবনের শেষ চলচ্চিত্রটি আর মোটেও প্রধাবিরোধী থাকে না বরং তিনি চেষ্টা করেন বাংলাদেশের মাঠে-ঘাটের দর্শকদের লোকরূচির কাছাকাছি হতে। তাঁর চলচ্চিত্রের বিষয় হয়ে আসে দেশীয় লোকগাঁথা। ঘুড্ডি যাঁর প্রথম ছবি তাঁর শেষ ছবির নাম আয়না বিবির পালা।

      ঘুড্ডি নিয়ে বিচার বিশ্লেষন করা চমৎকার জ্ঞানগর্ভ এই রচনাটি পড়া শেষ করে কেন যেন এই কথাটি মনে এলো। ধন্যবাদ লেখককে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ লেখার জন্য।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন A K Sarker Shaon — নভেম্বর ৬, ২০১৪ @ ১০:৪৮ পূর্বাহ্ন

      It is a nice movie. I enjoyed it in my childhood at Jhalakathi in Barisal.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন khaled jamal ahmed — নভেম্বর ৬, ২০১৪ @ ৩:৫৭ অপরাহ্ন

      Very impressive and informative article.We want this kind of movie review from News portal not on cheap bollywood/hollywood news.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সাইফুল ইসলাম — নভেম্বর ৭, ২০১৪ @ ১২:১৩ পূর্বাহ্ন

      একটা ভ্যালু থেকে স্বাধীনতার পর ডিরেক্টররা এগিয়ে এসেছিল। যারা স্বাধীনতার আগে চলচ্চিত্র আন্দোলন করেছিল, স্বাধীনতার পর তাদের কাজে নিষ্ঠার পরিচয় পাই। সালাউদ্দীন জাকীর ছবিটা অবশ্যই সে সময়ের প্রতিনিধিত্ব করে। যেমন করে সূর্যদীঘল বাড়ি বা এমিলের গোয়েন্দাবাহিনী। কিন্তু ছবির ব্যাপারটা এমনই যে বাণিজ্যিকভাবে সফল না হলে প্রতিকূল ধারা থেকে সেই ফোক ফ্যাণ্টাসিতেই ফিরে আসে লোকজন। সুশিক্ষিত দেশে মাইনরিটি অডিয়েন্সের জন্য কাজ করার সুযোগ থাকে। এখানে লাল বেনারসী বা আয়না বিবির পালায় গিয়ে হারিয়ে যায় আর্ট ফিল্মের উজান ঠেলার ইচ্ছেটা। আমাদের অন্যতম প্রতিভা মসীহউদ্দিন শাকেরকে সূর্যদীঘল বাড়ির পর আর দেখি নি।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন shafiq — নভেম্বর ৭, ২০১৪ @ ১:১৬ পূর্বাহ্ন

      I was very young when I saw this movie…………no one making such good movie right now…..what we are getting and watching is just nonscence

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন rajkumar sen — নভেম্বর ৭, ২০১৪ @ ১:৩২ পূর্বাহ্ন

      দয়া করে ঘুড্ডি মুভি রিলিজ করার ব্যবস্থা করুন … কৃতজ্ঞ থাকব … এই ছবিটা কোনো রকম ডাউনলোড নয়, সরাসরি সিনেমা হলে গিয়ে দেখতে চাই …

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন রুদ্র আরিফ — জুন ৬, ২০১৬ @ ২:৩৫ অপরাহ্ন

      ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ। যদিও সিনেমাটা দেখার জন্য একযুগের ওপর উদগ্রীব থেকেও, এখনো দেখা পাই নাই :(

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com