মেঘমল্লার, বাংলাদেশের ছবির পালাবদল

মুহম্মদ খসরু | ২১ অক্টোবর ২০১৪ ৮:০৫ অপরাহ্ন

জাহিদুর রহিম অঞ্জনের ‘মেঘমল্লার’ ছবিটি আমাদের প্রাণপ্রিয় অকাল-প্রায়ত প্রখ্যাত গল্পকার আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘রেইনকোট’ গল্প অবলম্বনে চলচ্চিত্রায়িত, এখানে উল্লেখ থাকা দরকার যে ‘রেইনকোট’ নামে দুটি ছবি পরপর নির্মিত হয়েছে। প্রথমটি হলিউডে, দ্বিতীয়টি ভারতীয়। চলচ্চিত্রকার ঋতুপর্ন ঘোষ ঐ ইংরেজী ছবির হিন্দি ভার্সন নির্মাণ করেন এবং ছবিটি দর্শকদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। এবংবিধ কারনে জাহিদুর রহিম এই ‘রেইনকোট’ গল্পটির নাম পরিবর্তন করে ‘মেঘমল্লার’ রাখেন, যাতে করে দর্শকদের সাথে কোন ভুল বোঝাবুঝি না হয়।

জাহিদুর রহিমের ‘মেঘমল্লার’ ছবিটি বাজার চলতি ছবির ধারায় নির্মিত নয়। ছবিটি সম্পূর্ণরূপে নতুন একটি জঁর-এর প্রকাশ ঘটায়, যা এদেশের চলচ্চিত্রের একটি নতুন মাত্রা সংযোজিত করে। ‘মেঘমল্লার’ ছবিটি দেখে এদেশের দর্শকবৃন্দ কিছুটা হোঁচট খেলে অবাক হব না।

এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ চলচ্চিত্র সম্পর্কে যে উক্তি করেছিলেন তা বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য- “ উপকরণের বিশেষত্ব অনুসরন করে যে নূতন কলারূপের আবির্ভাব প্রত্যাশা করা যায় এখানে তা দেখা যায়নি। রাষ্ট্রতন্ত্রে স্বতন্ত্রের সাধনা কলাতন্ত্রেও তাই। আপন সৃষ্টি জগতে আত্মপ্রকাশে স্বাধীনতা প্রত্যেক কলাবিদ্যার লক্ষ্য। নাইলে তার আত্মমর্যাদার অভাবে আত্মপ্রকাশ ম্লান হয়। ছায়াচিত্র এখনো পর্যন্ত সাহিত্যের চাটুবৃত্তি করে চলেছে- তার কারন কোন রূপকার আপন প্রতিভার বলে তাকে এই দাসত্ব থেকে উদ্ধার করতে পারে নি। করা কঠিন, কারন কাব্যে বা চিত্রে বা সংগীতে উপকরণ দুর্মূল্য নয়। ছায়াচিত্রের আয়োজন আর্থিক মূলধনের অপেক্ষা রাখে শুধু সৃষ্টি শক্তির নয়”।
25.gif
বর্তমান চলচ্চিত্র কেবল গল্প বলে না, বক্তব্যই ছবির প্রানভোমরা। ‘প্রতীচ্যে জঁ-লুক গোদারের আগেই এই প্রাচ্য দেশীয় স্রষ্টা চলচ্চিত্রীয় বক্তব্যধর্মিতা উদ্ভাবন করেন যে মহান চলচ্চিত্র স্রষ্টা তাঁর নাম ঋত্বিক কুমার ঘটক। তার শ্রেষ্ঠ একটি চলচ্চিত্র ‘কোমল গান্ধার’। ছবিটি ছিল সময়ের চাইতে অনেক অগ্রসর। সেজন্যই ‘কোমল গান্ধার’ ছবিটি উপলদ্ধি করতে দর্শকরা ব্যর্থ হয়েছে। অঞ্জনের ‘মেঘমল্লার’ যদি অনুরূপ কারনে বাংলাদেশের দর্শক হৃদয়কে স্পর্শ করতে না পারে তাহলে অবাক হওয়ার কিছুই নেই। এই ছবির ন্যারেটিভ-এর মধ্যে যে স্বল্পকথন ও দৃশ্যবাহী ইঙ্গিতময়তা রয়েছে তা হৃদয়ঙ্গম করা অতি সহজ নাও হতে পারে।

ছবিটির শুরুতে আমরা দেখতে পাই সবুজ ধঞ্চে পাতার অনন্য দৃষ্টিনন্দন আলোছায়ার কাব্যিক নৃত্য এবং এই দৃশ্যটির সূত্রধরে দৃশ্যবাহী সৌন্দর্যের প্রকাশ ছবিটির পরতে পরতে লক্ষ্য করা যায়, যা এদেশের চলচ্চিত্রে অতি বিরল ঘটনা ।
একটি মফস্বল শহরের কলেজ শিক্ষক নূরুল হুদা তার স্ত্রী কন্যা ও শ্যালককে নিয়ে কলেজ স্টাফ কোয়ার্টারে বসবাস করতেন। শ্যালকটি মুক্তিবাহিনীর সাথে পাকবাহিনীর ক্যাম্পে অপেরেশন করে বেড়ায়। একদিন নূরুল হুদার শ্যালক বোনের সাথে দেখা করতে আসে এবং তার রেইনকোটটি ফেলে চলে যায়। এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতা ঐ সময় অত্যন্ত বাড়তে থাকে এবং পাকবাহিনীর তল্লাশি ও ধরপাকড় ব্যাপকভাবে শুরু হয়।
7-1.gif
পাক আর্মিরা কলেজের শিক্ষক নূরুল হুদা এবং তার এক সহকর্মীকে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে যোগসাজসের সন্দেহে টর্চার ক্যাম্পে ধরে নিয়ে যায়। তাদের প্রতি অমানুষিক অত্যাচার শুরু করে। অমানুষিক অত্যাচারের পরও আপাতদৃষ্টিতে ভীতুপ্রকৃতির নূরুল হুদা নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা ভাবতে শুরু করে। পাকবাহিনী নূরুল হুদাকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে।

গোলাগুলি, সম্মুখ যুদ্ধ, মর্টার বাজি ইত্যাদি ক্লিশের মধ্যে না গিয়ে একটি যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং তার আবহ জাহিদুর রহিম তার ‘মেঘমল্লার’ ছবিতে যে নিপুনতার সাথে প্রকাশ করেছে তা এক কথায় আমাদের দেশের ছবির প্রেক্ষিতে অভাবনীয়।

‘মেঘমল্লার’ ছবিটির নৈঃশব্দই যেন হয়ে উঠেছে শব্দের দ্যোতনা। আন্ডার এ্যাক্টিং খুবই চলচ্চিত্রসুলভ মনে হয়েছে। সুধীর পালসানের ক্যামেরায় অঝোর বৃষ্টি, ট্রেনবিহীন একটি নিথর রেললাইন, নিঃসঙ্গ বনস্থলি, চুয়ে পড়া বৃষ্টির ফোটা ক্যামেরায় বন্দী করার অসাধারণ নৈপুন্য বাংলাদেশের অন্য কোন ছবিতে দেখেছি বলে মনে পড়ে না।

ছবির আবহ সঙ্গীতে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের ব্যবহার এবং একটি মুক্তিযুদ্ধের গানকে থিম মিউজিক হিসাবে প্রয়োগ নতুনত্বের দাবি রাখে। আশা করি জাহিদুর রহিম অঞ্জনের প্রথম ছবি ‘মেঘমল্লার’ বুদ্ধিপ্রভ দর্শকদের চিত্ত আলোড়িত করবে।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমাদের দেশের বেশ কিছু ছেলেমেয়ে ভারতের পুনে ফিল্ম ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউট-এ বৃত্তি পেয়ে চলচ্চিত্রের বিভিন্ন শাখায় পড়াশুনা করার সুযোগ পায়। সেই সব ছাত্রদের মধ্যে জাহিদুর রহিম অঞ্জনও ছিল।
পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউট থেকে ফেরত এসে অনেকেই ছবি বানিয়েছে, কিন্তু তেমনভাবে সফলতা লাভ করতে পারেনি। কিন্তু নানা গুনে গুণান্বিত এবং শৈল্পিক প্রয়োগ শৈলীর উৎকর্ষতায় অঞ্জনের ‘মেঘমল্লার’ এক অনন্য শিল্প সৃষ্টি রূপে অভিনন্দিত হওয়ার দাবি রাখে।

পুনেতে জাহিদুর রহিমের শিক্ষক ছিলেন ইনস্টিটিউটের সহকারী প্রিন্সিপ্যাল শ্রী ঋত্বিক কুমার ঘটকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছাত্র ভারতের নিউওয়েভ চলচ্চিত্রের অন্যতম রূপকার মনি কাউল। সেজন্য মনির নির্মান শৈলীর ছোঁয়া এ ছবিতে দূরনীরিক্ষ নয়। এ যেন গুরুর প্রতি শিষ্যের শ্রদ্ধাঞ্জলী।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র গগনে যে বন্ধাত্ব ও নৈরাশ্যের ঘনঘটা তা মেঘমল্লারের মনমুগ্ধ স্নিগ্ধ বর্ষণে নয়া দিগন্তের বাতাবরন উন্মোচন করবে বলে আশা রাখি।
মেঘমল্লার, বাংলাদেশের ছবির পালা বদল।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (7) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন হাবীবুল্লাহ সিরাজী — অক্টোবর ২১, ২০১৪ @ ১০:২০ অপরাহ্ন

      মেঘমল্লার দেখা হয়নি। মুহম্মদ খসরুর লেখাটি পড়ে আগ্রহ জাগছে। ধন্যবাদ খসরু ভাই।
      হাবীবুল্লাহ সিরাজী

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কা.শা. — অক্টোবর ২১, ২০১৪ @ ১১:৪৭ অপরাহ্ন

      প্রলুব্ধ! এবং অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি অঞ্জনের ‘মেঘমল্লার’ দেখার…

      ধন্যবাদ খসরু ভাই…

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন imran robin — অক্টোবর ২২, ২০১৪ @ ৮:২১ পূর্বাহ্ন

      খসরু ভাইয়ের লেখা অনেকদিন পর পড়লাম। খসরু ভাই যেই টেকনিকগুলোর কথা বললেন, তার জন্য আমি অবশ্যই ছবিটি দেখবো, কিন্তু তিনি এও বললেন ছবিটির নির্মাণশৈলী বাংলাদেশের দর্শক নাও বুঝতে পারে । আসলেই চিন্তার বিষয় যখন সময়ের আগে কোন শিল্পী তৈরি হয়ে যায়, নিশ্চয়ই সমাজ তার জন্য বোঝা স্বরূপ ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল — অক্টোবর ২২, ২০১৪ @ ৭:৪২ অপরাহ্ন

      onek din por khashru bhaier lekha pore mugdho holam.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইকবাল হাসনু — অক্টোবর ২৩, ২০১৪ @ ১০:০৭ পূর্বাহ্ন

      “গোলাগুলি, সম্মুখ যুদ্ধ, মর্টার বাজি ইত্যাদি ক্লিশের মধ্যে না গিয়ে একটি যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং তার আবহ জাহিদুর রহিম তার ‘মেঘমল্লার’ ছবিতে যে নিপুনতার সাথে প্রকাশ করেছে তা এক কথায় আমাদের দেশের ছবির প্রেক্ষিতে অভাবনীয়।” খসরু ভাই যখন এমন শংসাবাচন চলচ্চিত্রটি সম্পর্কে বলেন তখন এটি দেখার জন্য অপেক্ষায় থাকা কষ্টকর হয়ে পড়ে।

      দেশের চলচিত্রশিল্পকে সাবালক করে তোলার জন্য কী তীব্র আকুতি খসরু ভাইয়ের – এই লেখাই সাক্ষী!

      ইকবাল হাসনু
      টরন্টো

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তির্থক আহসান রুবেল — অক্টোবর ২৩, ২০১৪ @ ১২:০৪ অপরাহ্ন

      আশা তো করতেই হবে… নতুবা বদলাবে কিভাবে…..
      চলচ্চিত্রটির জন্য শুভকামনা

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মুনতাসির মামুন সজীব — december ১৮, ২০১৪ @ ৩:৪০ পূর্বাহ্ন

      চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের প্রাণপুরুষ মুহম্মদ খসরু ভাই এর আগেও শাকের ভাইয়ের সূর্যদীঘল বাড়ি চলচ্চিত্র এবং প্রয়াত শ্রদ্ধেয় তারেক মাসুদের মাটির ময়না ছবি দুটির ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন।এই দুটি ছবিই বাংলাদেশের শিল্পসম্মত ছবির শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। খসরু ভাই এবার মেঘমল্লার নিয়ে লিখলেন।আশাকরি চলচ্চিত্রটি শিল্পের মানদন্ডে উত্তীর্ণ হবে সফলভাবে।অঞ্জন দাকে অভিনন্দন অনেক প্রতিকূলতাপূর্ণ পরিবেশে এরকম ছবি উপহার দেয়ার জন্য। চলচ্চিত্র আন্দোলনের জয় হোক।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com