শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা: মৈত্রীতে পূর্ণ হোক ধরা

ভিক্ষু সুনন্দপ্রিয় | ৮ অক্টোবর ২০১৪ ১:৩৩ অপরাহ্ন

purnima-1.gifশুভ প্রবারণা পূর্ণিমা বৌদ্ধদের একটি আনন্দময় উৎসব। ত্রৈমাসিক বর্ষাব্রত পালন শেষে প্রবারণা পূর্ণিমা আসে শারদীয় আমেজ নিয়ে । প্রবারণার আনন্দে অবগাহন করেন সকলেই । এটি সর্বজনীন উৎসব । আকাশে উড়ানো হয় নানা রকম রঙ্গিন ফানুস । নদীতে ভাসানো হয় হরেক রকমের প্যাগোডা আকৃতির জাহাজ । সবাই আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে নানা রকমের কীর্তন, গান গেয়ে আনন্দ প্রকাশ করে । আবহমান বাংলার সংস্কৃতি, কৃষ্টিকে তুলে ধরে উৎসবের মধ্যে । এ উৎসব আশ্বিনী পূর্ণিমাকে ঘিরে হয়ে থাকে । এ পূর্ণিমায় বৌদ্ধদের তিন মাসব্যাপী আত্মসংযম ও শীল-সমাধি প্রজ্ঞার সাধনার পরিসমাপ্তি ও পরিশুদ্ধতার অনুষ্ঠান বলে বৌদ্ধ ইতিহাসে এ পূর্ণিমার গুরুত্ব অপরিসীম । ফলে এ পূর্ণিমা বৌদ্ধদের কাছে দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎসবে রূপ পেয়েছে । ৭ অক্টোবর ২০১৪ পালিত হয় শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা।

আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা – এ তিন মাস বৌদ্ধদের কাছে বর্ষাবাস বা ব্রত অধিষ্ঠান হিসাবে পরিচিত । বর্ষার সময় বৌদ্ধ ভিক্ষুদের চলাচলে অসুবিধা হচ্ছে দেখে ভগবান বুদ্ধ ভিক্ষু সংঘকে তিন মাস বিহারে অবস্থান করে শীল – সমাধি – প্রঞ্জার সাধনা করার জন্য বিনয় প্রঞ্জাপ্ত করেন । সেই থেকেই তিনমাস বর্ষাব্রত অধিষ্ঠান পালনের শুরু । গৃহী বৌদ্ধরাও এ তিনমাস ব্রত পালন করে থাকে । এ তিমাস ব্রত পালনের পরিসমাপ্তি প্রবারণা । প্রবারণার আনন্দকে সবাই ভাগাভাগি করে নেয় । প্রবারণার অর্থ আশার তৃপ্তি , অভিলাষ পূরণ , ধ্যান সমাধির শেষ বুঝালেও বৌদ্ধ বিনয় পিটকে প্রবারণার অর্থ হচ্ছ ত্রুটি বা নৈতিক স্খলন নির্দেশ করাকে বুঝায । অর্থাৎ কারও কোন দোষ ত্রুটি বা অপরাধ দেখলে তা সংশোধন করার সনির্বন্ধ অনুরোধ । সংক্ষেপে বলা যায় – অকুশল বা পাপের পথ পরিহারপূর্বক প্রকৃষ্ট রূপে বারণ করে বলে প্রবারণা বলা হয় ।

প্রবারণাকে বিনয় গ্রন্থে পূর্ব কার্তিক ও পশ্চিম কার্তিক ভেদে দু’ভাগে ভাগ করা হয়েছে । আষাঢ়ী পূর্ণিমায় র্বষাবাস শুরু হয়ে আশ্বিনী পূর্ণিমায় যে প্রবারণা হয় তাকে পূর্ব কার্তিক দ্বিতীয় বা শ্রাবণী পূর্ণিমায় যে বর্ষাবাস শুরু হয়ে কার্তিক পূর্ণিমায় শেষ হয় তাকে পশ্চিম কার্তিক প্রবারণা বলা হয় । ভগবান বুদ্ধ প্রথম পাঁচজন ভিক্ষুদের নিয়ে প্রবারণা বিধান চালু করেন । পরবর্তীতে দু’জন ভিক্ষু’র পারষ্পরিক প্রতি দেশনীয় প্রবারণার বিধান চালু করেন । একজন ভিক্ষুও প্রবারণা বিধান পালন করতে পারে । ভিক্ষু’র অভাবে একজন ভিক্ষু মণ্ডপে কিংবা বৃক্ষমূলে ও আসনাদি করে প্রদীপ জ্বালিয়ে একজন ভিক্ষু প্রবারণা পালন করেন ।

ভগবান বুদ্ধের জীবনে দেখা যায়, আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত তিন মাস তাবতিংস স্বর্গে অবস্থান করে তাঁর মাতৃদেবী প্রমূখ অসংখ্য দেবদেবী অভিধর্ম দেশনা করে সাংকাশ্য নগরে অবতরণ করেন । এবং প্রবারণার দিনে ষাট জন ভিক্ষুকে বহুজনের হিত ও মঙ্গলের জন্য দিকে দিকে বিচরণ করে সদ্ধর্মকে প্রচার করার নির্দেশ দেন । ভিক্ষু সংঘকে লক্ষ্য করে ভগবান বুদ্ধ বলেন – ’ হে ভিক্ষুগণ ! আমার ন্যায় তোমরাও দিব্য এবং জাগতিক সকল প্রকার বন্ধন হতে মুক্ত হয়েছ । তোমাদের ন্যায় স্বল্পরজ ব্যত্তির অভাব জগতে নেই । কিন্তু প্রকৃত মার্গের সন্ধান না পেয়ে তারা শুধু অন্ধকারে হাতড়িয়ে বৃথা উদ্যম ও শক্তির অপচয় করছে । সদ্ধর্ম শ্রবণের সুযোগ না পেলে এরা সকলেই বিনাশ প্রাপ্ত হবে । ’
purnima-2.gif
’ হে ভিক্ষুগণ ! তোমরা দিকে বিচরণ কর, বহুজনের হিতের জন্য, বহুজনের সুখের জন্য, জগতের প্রতি অনুকম্পা প্রর্দশনের জন্য । দেব ও মানবের আত্মহিত এবং সুখের জন্য । কিন্তু দু’জন এক পথে যেও না । তোমরা দেশনা কর আদিতে কল্যাণ, মধ্যে কল্যাণ, অন্তে কল্যাণ । সদ্ধর্মকে প্রকাশিত কর অর্থ ও ব্যঞ্জনযুক্ত, কৈবল্যময় পরিশুদ্ধ ব্রক্ষচর্য ।’
ভগবান বুদ্ধের নব আবিস্কৃত সদ্ধর্মকে প্রচার ও প্রকাশ করতে প্রবারণার দিন এ নির্দ্দেশ দান করেন । প্রবারণা পূর্ণিমার পর দিন থেকে ভিক্ষুরা দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়েন সদ্ধর্মকে প্রচার ও প্রকাশ করতে । ভিক্ষুরা বুদ্ধের সাম্য ও মৈত্রীর বাণী অন্তরে ধারণ করে গ্রাম গঞ্জে ছড়িয়ে পড়েন।
ভগবান বুদ্ধ যে ধর্ম প্রচার করার জন্য ভিক্ষুদের নির্দেশ দেন তাতে সাম্য ও মৈত্রীতে ভরপূর। বুদ্ধের ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যই হলো সকল প্রাণীর সুখ ও অহিংসা প্রতিষ্ঠা করা। বুদ্ধের অহিংসার শিক্ষাগুলো হলো এই —
মৈত্রী: বিশ্বের সকল প্রাণীর প্রতি প্রীতিবোধ প্রণোদিত আচরণ হলো মৈত্রীর চর্চা। কিভাবে অহিংসিত হয়ে অবস্থান করবেন তা আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গে সুস্পষ্ট নিদের্শনা দেন। সম্যক সংকল্পে হিংসা বিদ্বেষ পরিহারের নির্দেশ আছে। সম্যক বাক্যে পরনিন্দা ও অপ্রিয় ভাষণ, সম্যক কর্মে অহিংস আচরণ, সম্যক আজীবে পঞ্চশীল নীতির যাতে বত্যয় না ঘটে । আজ মৈত্রী চর্চার অভাবে মানুষ মানুষকে নিবিচারে হত্যা করছে, প্রাণী হত্যা তো এখন মামুলি।
করুণা: মমত্ববোধ থেকে করুণার সৃষ্টি। প্রাণীর প্রতি করুণার উদ্রেক সৃষ্ঠি হলেই শান্তি প্রতিষ্টিত হবে। হিংসা হানাহানি লোপ পাবে।
মুদিতা: মানুষ নিজের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে পরের দুঃখে দুঃখি ও সুখে সুখী হয় এভাবে মুদিতা প্রতিষ্টিত হয়।
উপেক্ষা: এ তিন অবস্থা অনুশীলনে উপেক্ষায় উপনীত হয়। তখন মানুষ সকলের কল্যাণে নিজের জীবনকে উৎসর্গীত করে। এগুলোই হলো ব্রক্ষবিহার।
বুদ্ধের মৈত্রী অনুশীলনের নির্দেশ এই –‘মা যেমন তার একমাত্র সন্তানকে নিজের জীবন দিয়ে রক্ষা করেন, তেমনি জগতের সকল প্রাণীর প্রতি অপ্রমেয় মৈত্রী পোষণ করবে।’ এ মৈত্রী অনুশীলন তো বর্তমানে সূদূর পরাহত। এখন দেখি ধর্মের নামে কতো নিরীহ প্রাণী বধ, কতো মানুষ নিষ্টুরতার শিকার।

বুদ্ধের অহিংসা হলো শুধু প্রাণী হিংসা থেকে বিরত থাকা নয়, সকলের প্রতি প্রীতি বহন করা, কল্যাণ চিন্তা করা, পরার্থে আত্মনিবেদিত থাকা। বুদ্ধের মতো এমন আত্মত্যাগীর পক্ষে সম্ভব প্রাণীর প্রতি করুণাঘন হৃদয় বিতরণ করা। পৃথিবীকে আমরা মৈত্রী হৃদয়ে ভরিয়ে দিই।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com