মুহম্মদ নূরুল হুদার সাক্ষাৎকার: ‘টেকনিকের বিবর্তনের ইতিহাস’ কথাটা একটি খণ্ডিত সত্য

রাজু আলাউদ্দিন | ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৪ ৬:১৪ অপরাহ্ন

nurul.gifআজ ৩০ সেপ্টেম্বর (২০১৪) ষাট দশকের অগ্রগণ্য কবি মুহম্মদ নূরুল হুদার ৬৫তম জন্মদিন। এ উপলক্ষে কয়েকদিন আগে কবিতা ও অনুবাদ প্রসঙ্গে যে-আলাপচারিতা অডিওতে ধারণ করা হয়েছিলো তারই শ্রুতিলিপি এখানে উপস্থাপন করা হলো।

রাজু আলাউদ্দিন : হুদাভাই, আপনি কবি হিসেবে ততটা আলোচিত না হলেও অবশ্যই পরিচিত, কিন্তু অনুবাদক হিসেবে আপনার পরিচয় অন্য পরিচয়গুলোর তুলনায় খানিকটা সীমিত, আর তার চেয়েও যেটা বেশি– কম আলোচিত। তো আপনার অনুবাদ প্রসঙ্গেই আমরা আলোচনাটা শুরু করি। আমি আপনার অনুবাদ গ্রন্থগুলোর সঙ্গে মোটামুটি পরিচিত বলা যায়। যেমন ধরা যাক, ইউনুস এমরে-এর কবিতা আপনি অনুবাদ করছেন, কলাবরেশন, আসাদুজ্জামানের সঙ্গে। তারপর আপনার একক অনুবাদে আছে ইস্কিলাসের আগামেমনন, তার পরে আছে ভিনদেশি প্রেমের কবিতা। এই বইয়ে আছে অনেক কবির অনুবাদ। তো আমি যেটা লক্ষ করলাম সেটা হল, অনুবাদের ক্ষেত্রে আপনি নির্দিষ্ট একটি আদর্শকে কখনও অবলম্বন করেননি। যেমন ধরা যাক, ইউনুস এমরে-র ক্ষেত্রে অনুবাদের যে কৌশল বা আদর্শ আপনি গ্রহণ করেছেন এবং প্রয়োগ করেছেন, ভিনদেশি প্রেমের কবিতার ক্ষেত্রে সেটা একেবারেই ভিন্ন। আবার আগামেমনন আর একটু ভিন্নরকম। যেমন আগামেমননভিনদেশি প্রেমের কবিতা ক্ষাণিকটা কাছাকাছি। তো ভিন্ন ভিন্ন আদর্শের প্রয়োজনবোধ করলেন কেন?
মুহম্মদ নূরুল হুদা : খুবই জটিল বলব না, তবে প্রয়োজনীয় প্রশ্ন। আমি অনুবাদ শুরু করি আমার লেখালেখির শুরু থেকেই বলা যেতে পারে। ১৯৬৫ সনে ঢাক শহরে প্রবেশ করে ঢাকা কলেজে ভর্তি হলাম, তারপর থেকেই আমি লেখালেখি ছাপতে শুরু করি। তার আগে লিখেছি ঈদগাঁ আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের দেয়াল পত্রিকায় এবং আমার নিজের সম্পাদিত সংঙ্কলন ‘কলতান’-এ আমার লেখা বেরিয়েছিল। কিন্তু কোনো বড় পত্রিকায় বের হয়নি। এই পত্রিকায় প্রকাশ করতে গিয়েই আমি দেখলাম, মৌলিক লেখার পাশাপাশি অনুবাদ, বিশেষ করে অনুবাদ কবিতা… ঐ সময়ে আমি সোভিয়েত লিটেরেচারের বেশকিছু সংখ্যা হাতে পাই। এবং লেখা ছাপতে গিয়ে যখন আমি ‘সংবাদে’ যাই তখন আমাকে বলা হল যে আমার কবিতা, মানে মৌলিক কবিতা ঠিক আছে, তবে তার পাশাপাশি বিদেশি সাহিত্য পাঠ করতে হবে। এবং সাহিত্য সম্পাদক বললেন কিছু অনুবাদ যদি আপনি করতে পারেন। তো আমি প্রথমে অনুবাদ করলাম মিখাইল ইজাকোভস্কির একটি কবিতা। অনুবাদ করে দিলাম সাহিত্য সম্পাদককে। তখন সাহিত্য সম্পাদক শহিদুল্লাহ কায়সার। কিন্তু তখন তিনি ছুটিতে ছিলেন। শামসুল হক নামে আর একজন সাংবাদিক চট্টগ্রামে বাড়ি, তিনি সংবাদে সাহিত্য সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার হাত দিয়ে আমার প্রথম, বলা যেতে পারে অনুবাদ কবিতাটি বেরিয়ে যায়। তবে সে অনুবাদ কবিতাটি আমার হাতে এখন আর নেই। পাঠ করার পড়ে আমার কেমন মনে হল যে, না মূল যে কবিতাটা ছিল সেই কবিতাটা অনুবাদে হুবহু ধরা পড়েনি। অনুবাদে যেটা হয়েছে সেটা একটা জাস্ট অনুবাদ বা শব্দান্তর। তখনই আমি সচেতন হলাম, না, বোধহয় কবিতা অনুবাদ এভাবে করা ঠিক হবে না। কবিতাটি পাঠ করার পর এটাকে একেবারে সম্পূর্ণ নতুন করে নিজের মতো করে লেখা উচিৎ, তা হলেই সুপাঠ্য হবে। শুধুমাত্র ছাপানোর জন্য অনুবাদ করার কোনো কারণ নেই। এটাই প্রথম সচেতনতা এবং তারপর আমি যে অনুবাদগুলো পরে করতে শুরু করি, তখন প্রতিটি রচনা পাঠ করার পর ঐ রচনার ধরন, শৈল্পিক যে বিন্যাস কাঠামো– সেটাকে চেনার চেষ্টা করেছি। এমন যদি হত আমি মিখাইল ইজাকোভস্কির কবিতা অনুবাদ করলাম কিংবা তার কবিতাই শুধু অনুবাদ করেছি, তাহলে তার অন্য কবিতার যে কাঠামোটা সেটা তার মতো হত। কিন্তু আমি তার কবিতাই অনুবাদ করছি, তার ডিকশন, তার শব্দরাজি এবং তার স্টাইলস্টিকস আমাকে মেনে চলতে হত।
রাজু : আপনি বলছিলেন যে এই যে অনুবাদ নিজের মতো করে উপলব্দি করা– আমি এই বিষয়টা পরিষ্কার হওয়ার জন্য জানতে চাচ্ছি: নিজের মতো করে উপলব্ধি করা বলতে কী বোঝাতে চাচ্ছেন? অনুবাদকের দায়িত্ব কি মূল কবির ঐ বোধের কাছাকাছি যাওয়া, নাকি মূল টেক্সটাকে আপনার মতো করে জারিত করে আপনার ভাষায় পুনরোৎপাদন করা?
নূরুল হুদা : আমি এরপর যে কথাটি বলতে চেয়েছিলাম, তা হল, রিল্কের একটা কবিতা। আমি অনুবাদ করেছিলাম ‘হেমন্ত’ নামে একটি কবিতা যেটি আরও অনেকেই অনুবাদ করেছেন, ‘পাতা ঝরে, পাতা ঝরে যায়…’, আরও দুই একটা কবিতাও অনুবাদ করেছিলাম। ওটা করার সময় মনে হল যে মিখাইল ইজাকোভস্কির যে-কবিতা অনুবাদ করেছিলাম তার সমাজ বাস্তবতার সঙ্গে রিলকের এই কবিতার দূরত্ব অনেক। তখন যতদূর সম্ভব অক্ষরবৃত্ত ছন্দে মিল রেখে কবিতাটি অনুবাদ করার প্রয়োজন আমি বোধ করলাম। আসলে অনুবাদ করার সময় সাধারণত আমরা যেটা মনে করি যে বাক্যের, শব্দের অর্থ মিলিয়ে দিলেই অনুবাদ হয়ে গেল। অনুবাদ কিন্তু মোটেই তা নয়। প্রথমে মিখাইল ইজাকোভস্কির কবিতা অনুবাদ করতে গিয়ে ঐ পদ্ধতি প্রয়োগ করেছিলাম। কিন্তু আমার ভুলটা আমি বুঝতে পেরে রিলকের ‘হেমন্ত’ অনুবাদ করার সময় আমি একটু সরে গিয়েছিলাম। আমি কবিতাটা বোঝার চেষ্টা করলাম, বোঝার চেষ্টা মানে এই যে একজন লেখক যখন কিছু লেখেন, যে ভাষায় লেখেন আমরা সেটাকে নিজের ভাষা, বা সোর্স ল্যাঙ্গুয়েজ বলি। এখানে রিলকে হচ্ছেন সেই সোর্স লেখক। এই লেখার পেছনে তার একটা ইনটেনশন ছিল। তিনি জানুন বা না-জানুন ইনটেনশনটা ঐ কবিতায় তৈরি হয়ে গেছে। একজন অনুবাদকের কাজ হল পাঠ করার সঙ্গে সঙ্গে লেখকের ইনটেনশনটা বোঝা। ইনটেনশন যদি বোঝা না যায় তাহলে শব্দের অনুবাদে লেখাটি আসবে না। তার অভিপ্রায়টি অনুবাদ হবে না। এবং অনুবাদকের কাজ হচ্ছে অনুবাদ করার সময় শব্দ, চিত্রকল্প অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি লেখক যা বলতে চেয়েছিলেন যতটা সম্ভব তার কাছাকাছি গিয়ে তাকে ধরে তার ইনটেনশটি তৈরি করা। আমি যখন জার্মান ল্যাঙ্গুয়েজ থেকে, রুশ ল্যাঙ্গুয়েজ থেকে, উর্দু থেকে বা তেলেগু থেকে বাংলায় অনুবাদ করতে চাই তখন কয়েকটি প্রক্রিয়া আমাকে পার হয়ে আসতে হবে। আমরা যদি তত্ত্বের কথা বলি তাহলে ভালো অনুবাদ করতে চাইলে তত্ত্বের যে পর্যায়গুলো আছে সেগুলো একটার পর একটা পার হয়ে আসতে হবে। প্রথমটা হচ্ছে আমাকে প্রতিটি শব্দ পড়ে বুঝতে হবে। শব্দ বুঝার পর নিজের ভাষায় ঐ শব্দের একটা যথার্থ রূপ খুঁজে বের করতে হবে। অনুবাদের এই প্রাথমিক পর্যায়কে আমরা বলি টেক্সচুয়াল পর্যায়। এটা করতে গেলে শব্দের অর্থ, শব্দের অর্থের পাশাপাশি বাক্য এবং সবশেষে কবিতাকে বুঝে ফেলতে হবে। বাক্যের ক্ষেত্রে, গদ্যের ক্ষেত্রে শুধু বাক্য নয়, বাক্যের পাশাপাশি যে প্যারাগ্রাফ, সেটা তোমাকে পুরোপুরি বুঝে ফেলতে হবে। তারপর এখানে এমন কিছু অনুষঙ্গ ব্যবহৃত হতে পারে, যা শব্দ দিয়ে বোঝা যায়। চিত্রকল্প তোমাকে বুঝতে হবে। কিংবা এমন যদি হয় যে অনুষঙ্গ ব্যবহৃত হয়েছে তা আমার সংস্কৃতিতে নাই, তখন কী হবে? বাংলা কবিতায় যে বাউল বলে একটা ব্যাপার আছে এই বাউল অনুষঙ্গটা কিন্তু স্প্যানিশে পাওয়া যাবে না, ইউরোপে পাওয়া যাবে না। অর্থাৎ সেই কালচারাল অনুষঙ্গগুলো তোমাকে বুঝতে হবে। বোঝার পরে পরিপূর্ণতার যে বার্তাটা, তা হয়ত পুরোপুরি বুঝব না, তবু যতটা সম্ভব তার কাছাকাছি যেতে হবে। কাছাকাছি গিয়ে তাকে আমার ভাষায় আনতে হবে। আনতে গিয়ে এখানে একটা ইন্টারপ্রিটেশনের ব্যাপারও আছে। একটা লেখা যতবার পড়ব ততবার তা ভিন্ন ভিন্ন অর্থ নিয়ে হাজির হবে। সুতরাং ইনটেনশন বোঝাতে গিয়ে একটা পার্থক্য হয়ে যেতে পারে; প্রত্যেকটা পাঠেই এটা হয়। এই অর্থে লেখকের ইনটেনশন হুবহু বোঝা হয়ত সম্ভব নয়। না হলেও যতটা সম্ভব তার কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করতে হবে। বোঝার পর বাংলায় তখন আমি ঐ মূল ভাষার সমান্তরাল বৈশিষ্ট্যগুলোকে তুলে ধরতে পারব। এভাবে চারটা পর্যায় চলে যাবে। টেক্সচুয়াল পর্যায় পার হওয়ার পর আসে রেফারেন্স, এই পর্যায় চলে যাওয়ার পর থাকছে লেভেব অব কোহেসিভ। আমাদের কাজ হচ্ছে টেক্সেটের উদ্দেশ্যটা বের করা। এরপরে একটা গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হচ্ছে লেভেল অব নেচারালনেস, এর মানে মূল ভাষায় যা ছিল হুবহু তা নিজের ভাষায় আনার চেষ্টা করা। এরপর থাকবে কোহেসিভ লেভেল। টেক্সট এবং রেফারেন্সিয়াল পর্যায়ে আমরা যা পেলাম, তা এক জায়গায় এনে মূল রূপটাকে উদ্ধার করা। তারপর এখানে আমি বলব টেক্সটা যে রীতির, তোমার অনুবাদে এসেও দেখা গেল সেটার মতোই অনুবাদ হয়ে গেছে, এমনও তো হতে পারে, তাই না? ধরা যাক একজন কবি অনুবাদ করেছে ইউনুস এমরে, তিনি লিখেছেন তুরস্কের তুর্কি ভাষায় নয়, লিখেছেন তুরস্কের আঞ্চলিক ভাষায় এবং তিনি ছিলেন লোককবি। আমি যদি বাংলা ভাষায় অনুবাদ করতে চাই তাহলে আমার লোককবিতার ভাষাকে গ্রহণ করতে হবে, এটা করতে হবে লেভেল অব নেচারালনেস-এর জন্য। ধরা যাক আমি যে রিলকে অনুবাদ করেছি কিংবা ভিনদেশি প্রেমের কবিতা–এদের অধিকাংশই কিন্তু লোক কবি না, তারা আধুনিক কবি, ক্লাসিক কবি। তাদের অনুবাদ করতে হলে বাংলা ভাষার ধ্রুপদী ভঙ্গিকে নিতে হবে। আমি ইউনুস এমরে অনুবাদ কারার সময় দেখেছি আমাকে লালনের ভাষার কাছাকাছি যেতে হবে। এই কারণে মূল কবি এবং চরিত্র ভেদে বাংলা ভাষায় অনুবাদের ভাষা এবং পদ্ধতি বদলে নিতে হয়েছে।
রাজু: অনুবাদক হিসেবে আপনি যে আদর্শের কথা বললেন সেটা আমার কাছে পরিষ্কার। এই আদর্শের সবচেয়ে সফল প্রয়োগ আমরা দেখতে পাই ইউনুস এমরের কবিতায়। আপনি যে পর্যায়গুলোর কথা বললেন, ইনটেনশনের কথা বললেন সেটা যদি আমরা দেখি, আমি মূলটা পড়িনি কিন্তু আপনাদের এই ভূমিকা এবং কাজের কৌশল সম্পর্কে আপনারা যে আভাস দিয়েছেন সেগুলো থেকে আমি বুঝতে পারি যে ইউনুস এমরে আপনার আদর্শের সবচেয়ে সফল একটি সন্তান। কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে ভিনদেশি প্রেমের কবিতার ক্ষেত্রে আপনি অনুবাদের আদর্শের এই জায়গা থেকে একটু সরে গেলেন কেন? নিশ্চয়ই কোনো উদ্দেশ্য ছিল। সেটাই আমি জানতে চাই।
নূরুল হুদা : ইউনুস এমরেতে আমরা চেষ্টা করেছি যথাসম্ভব লেখকের প্রতি, লেখকের অভিপ্রায়ের প্রতি, তার ভাষার প্রতি, ডিকশনের প্রতি এবং কবিতার মিলের প্রতিও যথাসম্ভব অটুট থাকা। আনাতোলীয় ভাষায় তিনি যা লিখেছিলেন আমরা হুবহু তার প্রতিধ্বনি করার চেষ্টা করেছি। আমাদের বইটিতে ইংরেজি টেক্স নাই; বাংলা টেক্স আছে, পাশাপাশি আমরা তুর্কি টেক্স দিয়েছি যেহেতু রোমান হরফে লেখা তাই পড়লেই বোঝা যায় কোথায় কোথায় মিলটা আছে। এবং আগে যে তত্ত্বের কথা বললাম সেই তত্ত্বের পুরোটাই কিন্তু এখানে প্রয়োগ করা হয়েছিল। তখন কিন্তু এই তত্ত্ব সম্পর্কে এতটা সচেতন ছিলাম না। না থেকেও কিন্তু এই পর্যায়গুলো আমরা পার হয়েছি।
রাজু : আপনারা তো এটা কোলাবোরেশনে করেছেন।
নূরুল হুদা: আমার সহ-অনুবাদক আসাদুজ্জামান, উনি কিন্তু এক অক্ষরও লেখেননি। উনি যেটা করেছেন, আমি বলি, উনি মূল কবিতাটা পাঠ করেছেন, আমি ইংরেজি কবিতাটা পাঠ করছি। ইংরেজি কবিতা আর মূল কবিতার ভেতর পার্থক্য আছে। দেখা যাচ্ছে ইংরেজি অনুবাদে মূল কবিতার মতো মিলটা ছিল না। আমি সঙ্গে সঙ্গে নোট করে নিলাম, যে বাংলা কবিতায় আমি হুবহু মিলটা রাখার চেষ্টা করব। ইংরেজি কবিতায় দেখা যাচ্ছে যে কোথাও মিল আছে, ছন্দ ঠিক আছে, কিন্তু ছন্দের যে দোলা সে দোলাটা এখানে নেই। এইভাবে বলব অনুবাদ কিন্তু সবসময় একপাক্ষিক নয়। সবচেয়ে ভালো হয় যদি মূল লেখককে পাওয়া যায়। মূল লেখককে না পাওয়া গেলে মূল লেখা জানে এমন কাউকে পাওয়া গেলে ভালো। ইউনুস এমরের ক্ষেত্রে আমি ক্যাটালিস্ট হিসেবে আসাদুজ্জামানকে পেয়েছিলাম। তার পরে ভিনদেশি প্রেমের কবিতা, এই কবিতাগুলোতে আমি ভিন্ন আদর্শ অবলম্বন করেছি। আর একটা কথা বলা যেতে পারে: ঐ যে পদ্ধতি সেই পদ্ধতি প্রয়োগ থেকে আমি সরে গেছি। কারণ এই যে কবিতাগুলো, এইগুলো কিন্তু বিভিন্ন ভাষায় রচিত কিন্তু অনূদিত হয়েছে ইংরেজি ভাষায়। আমি ইংরেজি ভাষায় যে বিভিন্ন টেক্স থেকে এটা অনুবাদ করেছি আমি বুঝতে পেরেছি এখানে মূলের চেয়ে কোনো না কোনো ক্ষেত্রে তারা সরে এসেছেন অর্থাৎ মূল কবিতাটা আমি পাইনি। কিন্তু কবিতাটা পাঠ করার পর ঐ কবিতার মূল সুরটাকে, কবির ইনটেনশনটাকে বোঝার চেষ্টা করেছি। তখন বাংলা ভাষায় এই কবিতাটিকে অনুবাদের চেয়েও আমি সফল একটা কবিতা তৈরি করার চেষ্টা করেছি। প্রতিধ্বনি করা, এই প্রতিধ্বনি করতে গিয়ে কোনো কোনো অংশ ধরা যাক, ব্যাখ্যা করার মতো কোনো লোক আমি পাইনি। কোনো কোনো অংশ দুর্বোধ্য ঠেকেছে। আমি এর ভেতরে প্রবেশ করতে পারিনি। পুরো কবিতার ভেতর, কবিতার যে ম্যাসেজটা, কবিতার চিত্রকল্প– এগুলো পেয়েছি। ওটাকে নিয়ে হয়ত একটা মূল কবিতা যত বড় তত বড় কিংবা তার চেয়ে ছোট কিংবা তার চেয়ে বড় করে আমি আমার কবিতা লিখেছি। এবং আমি ভূমিকাতেও বলেছি এগুলো কিন্তু আমার কবিতা, আবার একই সঙ্গে এগুলো মূল ভাষার যে একজন কবি আছেন, এটি তারও। মূল চিত্রকল্পটা কিংবা সেই ম্যাসেজটা নিয়ে বাংলা ভাষায় আরেকটি কবিতা রচনার চেষ্টা করেছি আমার মতো করে। ফলে আমি বলব যে এটা যতখানি অনুবাদ তার চেয়ে বরং অবলম্বিত মৌলিক কবিতা।
রাজু : আপনি তো আমাদের প্রধান একজন সৃষ্টিশীল লেখক, কবি। কবি হয়ে আপনি কেন অনুবাদ করেন? যেমন ধরা যাক ইউনুস এমরে আপনি অনুবাদ করেছেন যতটা আপনার নিজের তাগিদে, তার চেয়ে বরং বলা যায় আপনার উপরে এসে দায়িত্বটা পরেছিল। এটি অনুবাদের ক্ষেত্রে যে আদর্শের কথা বললেন এবং যে আদর্শকে আমার কাছে অনুসরণীয় মনে হয়, সেই আদর্শের জায়গা থেকে এটাকে যথাযথ মনে হয়েছে। কিন্তু যখন একজন সৃষ্টিশীল লেখক হিসেবে নিজের ভালো লাগা থেকে অনুবাদ করেন তখন সেটার একটা অন্য অর্থ দাঁড়ায়। এই কারণে আমার প্রশ্ন হচ্ছে আপনি যাদের অনুবাদ করলেন তারা কি কোনো না কোনোভাবে আপনার সৃষ্টিশীল সত্তারই নানান মুখোশ হিসেবে কাজ করে কিনা?
নূরুল হুদা : হ্যাঁ অবশ্যই। ইউনুস এমরে সম্পর্কে আমি বলব, ইউনুস এমরে আমাকে যখন প্রথম দেওয়া হল, আমি প্রথম রাজি হইনি কিন্তু। তখন অ্যাম্বাসি থেকে প্রদত্ত একটা বই দেওয়া হল, যাতে ৫০টি কবিতাই ছিল, যে ৫০টি কবিতা আমি অনুবাদ করলাম। এর আগে এই ধরনের অনুরুদ্ধ হয়ে আরও কিছু কবিতা অনুবাদ করেছিলাম। জাপানি কিছু কবিতা এবং গোজো ইউসোমাসের কিছু দীর্ঘ কবিতা অনুবাদ করেছিলাম, যখন তিনি এখানে একটি অনুষ্ঠানে এসেছিলেন। অনুবাদ করতে গিয়ে আমি অনুভব করলাম যে এ কবিতা আমার মতো, আমি এটাকে পছন্দ করছি। ইউনুস এমরের কবিতা অনুবাদ করতে গিয়ে ৫০টি কবিতা আমি অনুবাদ করব– এটা ভাবিনি। আমি ভাবলাম হয়ত ৫টি কবিতা আমি অনুবাদ করে দেব। কিন্তু কবিতা পড়ার পর এবং তুর্কি যে ভাষা সে ছন্দ শোনার পর মনে হল, এই কবিতা তো আমার প্রাণের কবিতা, এই কবিতাই আমি চাই। ফলে এটাকে পছন্দ করেছি বলে আমি পুরো ৫০টি কবিতাই অনুবাদ করে ফেলেছি। আর অন্য যে কবিতার কথা বলছি তার কিছু কিছু আমার অনেক বইতেও কিন্তু মৌলিক কবিতা হিসেবে ঢুকে বসে আছে। যেমন ব্লেকের কবিতা, ‘টাইগার টাইগার বার্নি ব্রাইট, ইন দ্য ফরেস্ট অব দ্য নাইট’– এটাও অনুবাদ করেছি, এটি আমি মৌলিক কাব্যগ্রন্থে দিয়েছি। অবশ্য নিচে মূল কবি উইলিয়াম ব্লেকের উল্লেখ আছে। অর্থাৎ আমার রুচির সঙ্গে আমার ভাবনার সঙ্গে, আমার গ্রহণযোগ্যতার সঙ্গে যে সমস্ত পংক্তির ইশারা আমি পেয়েছি, আমি সেগুলোকেই গ্রহণ করেছি। এগুলো আমার সত্তার অংশ, আমার কবিতারও অংশ এবং একটা ফুল দেখে যেমন আমি প্রভাবিত হই, একজন নারী দেখে যেমন প্রভাবিত হই, তেমনি ঐ যে কবিতা, ঐ কবিতাটি আমাকে নারীর মতো আকর্ষণ করেছে।
রাজু: এরা কোনো না কোনোভাবে আপনারই বিদেশি মুখোশ?
নূরুল হুদা: হ্যাঁ, আমারই মুখোশ। হুবহু আমার কাছাকাছি যা আমি বাইরে পেয়েছি তাকে গ্রহণ করেছি। আবার বিরুদ্ধবাদী যা পেয়েছি তাকেও গ্রহণ করেছি, এ জন্য যে এর দ্বারা আমি একটি বৈপরীত্যসূচক কবিতা রচনার প্রেরণা পেয়েছি।
রাজু : মান্নানভাই তো বেশকিছু কবিতার অনুবাদ করেছেন। সেই কবিতার অনুবাদ নিয়ে মূলানুগতার প্রশ্ন উঠতে পারে, মূল থেকে এগুলোর দূরত্ব আছে অনেক। কিন্তু আমি বলব এই অনুবাদগুলো তার সৃষ্টিশীল সত্ত্বার বিভিন্ন মুখোশ আবিষ্কারের মতো। সেই অর্থে আমি বলব যে মান্নানভাই আসলে অনুবাদক না…
নূরুল হুদা : অনুবাদক না, তিনি হলেন গ্রহিতা, আমরা সবাই কিন্তু, যারা প্রকৃত অনুবাদক তারাও গ্রহিতা। যেমন বদ্ধুদেব বসু। বদ্ধুদেব বসুর কবিতা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পাঠ করি বুদ্ধদেব বসুর কবিতাকে মনে হয় বদলেয়ারের কবিতার যে ভাষ্য তারই আরেকটা নির্মাণ তার কবিতা। বুদ্ধদেব বসু নিজের কবিতা লিখেছেন বদলেয়ারকে গ্রহণ করে। এইভাবে একজন কবি সমস্ত পাঠের মধ্য দিয়ে, তার চোখের মধ্য দিয়ে, তার অনুভুতির মধ্য দিয়ে যেমন গ্রহণ করে, তেমন পাঠের মধ্য দিয়েও প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো গ্রহণ করে। প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো সংগ্রহ করে।
রাজু : তার মানে আমরা এইভাবে মূল লেখক সত্তাকে সম্প্রসারিত করি…
নূরুল হুদা: নিজেকে সম্প্রসারিত করি। এটা আমরা করি কখনও স্বীকার করে, অনুবাদ করে, গ্রহণ করে আর কখনও-বা স্বীকার না করে, নিজের ভেতরে জারিত করে গ্রহণ করে। যেমন জীবনানন্দ দাশও তাই করেছেন, আমরা প্রত্যেকে তাই করি।
রাজু : আপনি প্রথম দিকে বলছিলেন যে কবিতার ইন্টেনশনটা বুঝতে হয়, এই বুঝার ক্ষেত্রে অনেক সময় দেখা যায় কোনো কোনো জটিল কবিতার ক্ষেত্রে শুধু কবিতাটা পড়ে আসলে এই ইন্টেনশন অনেক সময় পরিষ্কার বুঝা যায় না। আপনি কি মনে করেন তখন বোঝার জন্য ওই কবিতাটির বাইরে গিয়ে ওই লেখক সম্পর্কে বা তার কালচার সম্পর্কে পাঠ করা কি অনিবার্য নয় যদি ইন্টেনশনটা পরিষ্কার বুঝতে চাই আমরা?
নূরুল হুদা: ওই রচনাটি, ওই কবিতাটি যদি সে দেশের সামাজিক বিবর্তন, যে ঐতিহাসিক বিবর্তন, ওই জাতির, ওই দেশের সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত হয় তাহলে অবশ্যই এইসব বিষয়ে জানতে হবে কবিতাটিকে পুরোপুরি বুঝতে হলে। আর এটা যদি সম্পূর্ণ তার মন্ময় সৃষ্টি হয়, তাহলে এসব পাঠ না করলেও চলে। প্রকৃত কবিতা অনেক এলিগোরি, এলুশন, সংকেত নিয়ে গড়ে ওঠে– এসব না বোঝা সত্ত্বেও যদি আমার এটা ভালো লাগে এবং এটা ভালো লাগাতে পারাটাই কিন্তু কবিতার মূল কাজ। সুতরাং ওগুলো না হলেও, সেগুলো বাদ দিয়েও কবিতার মূল বস্তু আমি গ্রহণ করতে পারি যা আমার ভিনদেশি প্রেমের কবিতার ক্ষেত্রে ঘটেছে। তাছাড়া প্রকৃত কবিতা প্রতি পাঠেই নতুন অর্থ নিয়ে হাজির হয়। ঠিক একইভাবে একই কবিতা ভিন্ন ভিন্ন অনুবাদে দেখা যায় একেক ধরনের অর্থ। যেমন ধরা যাক শেক্সপিয়রের সনেট। শেক্সপিয়রের সনেট আমাদের বাংলাদেশে জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী অনুবাদ করেছেন, আরও কেউ কেউ করেছেন, সুধীন দত্ত করেছেন এবং সেলিম সরোয়ার করেছেন। আমি নিজেও করে দেখেছি একটা বিখ্যাত সনেট। দেখা যাচ্ছে যে সেলিম সরোয়ারের যে ব্যাখ্যা, সুধীন দত্তের যে ব্যাখ্যা তা একটু একটু করে সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে যাচ্ছে। বোধের তারতম্যের জন্যই কবিতার অনুবাদের ধরনটা আলাদা হয়ে যায়; ব্যক্তিভেদে তো বটেই এবং সময়ভেদেও একই ব্যক্তি একই কবিতা তিনবার অনুবাদ করলে তিন রকম হয়ে যায়।
রাজু : একটা ভালো কবিতা পুরোপুরি বোঝা না গেলেও ওর যে বক্তব্য ওইটার যে শক্তি সেই শক্তিটুকু আপনি টের পেয়ে যান।
নূরুল হুদা : বক্তব্য নয়, আমি বলব ইশারা; বক্তব্য তো আছেই, যা আমাকে আচ্ছন্ন করে তাহলো ইশারা। ওর সে সিগনিফিকেশন, তাৎপর্য, তার সঙ্গে জারিত হয়ে কবিতা লিখলেও সেটাও কিন্তু এক ধরনের অনুবাদ কবিতা। এমনও হতে পারে যে ওই কবিতার অনেক কিছু এখানে নাই। না থাকলেও ওই কবিতাটিই তোমাকে এই কবিতা লিখতে সাহায্য করেছে। এটাও এক ধরনের অনুবাদ।
রাজু : এই সূত্রে আমি অনুবাদের বাইরে একটা প্রশ্ন নিয়ে যেতে চাই, সেটা হচ্ছে যে আমরা যখন বলি যে কবিতার– যেমনটা আরাগঁ বিশ্বাস করতেন– কবিতার ইতিহাস হচ্ছে তার টেকনিকের ইতিহাস। কিন্তু টেকনিকের চেয়ে আমার কেন জানি মনে হয়, হুদাভাই, কবিতার ম্যাসেজটাই মুখ্য। ওইটা যদি না থাকে শুধু টেকনিক দিয়ে একটি কবিতা কালকে জয় করতে পারে না। যেমন, আপনি তো অনুবাদ করছেন অনেক, তাই না? ধরা যাক, এই যে আপনি স্প্যানিশ কবিতা অনুবাদ করেছেন, জার্মান কবিতা অনুবাদ করেছেন, তারপরে ইতালিয়ান কবিতা অনুবাদ করেছেন। আমরা কিন্তু এগুলোর সঙ্গে মূল ভাষায় পরিচিত নই। মূল ভাষায় এর ছন্দ ধ্বনিটা কেমন ছিল বা এর যে সাংস্কৃতিক রূপ বা এমন কিছু লোকাল কালার রয়েছে সেগুলো আমরা জানি না। যেমন আমরা যখন রূপসী বাংলা পড়ি ওর মধ্যে ছোট্ট একটা সাংস্কৃতিক উল্লেখ যেভাবে আমাদের শিহরিত করবে, বিদেশি পাঠককে তা করবে না কারণ সে এই সংস্কৃতির ভেতর দিয়ে বেড়ে ওঠেনি। এই কারণে আমার মনে হয় টেকনিকের চেয়ে– যতি সেটা মহৎ কবিতা হয়– তখন ম্যাসেজটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আপনার কাছে কী মনে হয়?
নূরুল হুদা : একটি দেশে, একটি ভাষিক পরিপ্রেক্ষিতে ওই কবিতাটা, ওই রচনাটা কীভাবে নতুন হয়ে যায় তার একটা ইতিহাস থাকে। রবীন্দ্রনাথ যে ভাষায় কবিতা লিখেছেন, মাইকেল যে ভাষায় কবিতা লিখেছেন, একালের একজন কবিতো সে ভাষায় লেখা না, লেখার কথাও নয়। ফলে মাইকেলের কবিতার চেয়ে রবীন্দ্রনাথের কবিতাকে আলাদা করতে হলে আমরা দেখতে পাব ভাষার বিবর্তন, টেকনিকের বিবর্তন। আবার রবীন্দ্রনাথের চেয়ে জীবনানন্দ দাশের কবিতাকে আলাদা করতে হলে তার টেকনিকের বিবর্তনকে দেখতে পাব। টেকনিকের, অনেক ভাষিক টেকনিক আছে। আর যদি বলি সিম্বলের কথা বলি, আগের কবি কী ধরনের প্রতীক ব্যবহার করেছিল, পরের কবি সেই প্রতীক সেভাবে নাও ব্যবহার করতে পারে। ধরা যাক চিত্রকল্প। আগের কবি জীবনানন্দ দাশ চিত্রকল্প ব্যবহার করেছেন, আবার আমাদের নজরুলও ব্যবহার করেছেন। নজরুলের চিত্রকল্প ও রবীন্দ্রনাথের চিত্রকল্প যত বেশি মূর্ত, জীবনানন্দ দাশের চিত্রকল্প তার চেয়ে অনেক বেশি বিমূর্ত। একটা জাদুবাস্তবতা যেন এখানে এসে গেছে। কাজেই এই যে পরিবর্তনটা, একই ভাষার ভেতর কবিরা, লেখকরা এই ভেরিয়েশনটা নিয়ে আসেন। এই নিয়ে আসার ব্যাপারটা মূলত দেশীয় গণ্ডির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যদি এখন স্প্যানিশ কবিতার বিবর্তন দেখতে চাই, তাহলে হিমেনেথের কবিতা আগের কবিদের ভাষা ও ভঙ্গির দিক থেকে কোথায় কীভাবে আলাদা হয়ে যাচ্ছে তা বুঝতে হলে সে ভাষায় পড়তে হবে। কিন্তু অনুবাদের ক্ষেত্রে, অনুবাদক যেটা করবে, তা হল ওই কবিতায় ভালো লাগার কী আছে সেটা সে দেখবে। আমাদের ম্যাসেজ শুধু না, ম্যাসেজ থাকা তো একটা বড় কথা, পৃথিবীর সব বড় কবিতায় একটি ম্যাসেজ দেখা যায়। মহৎ কবিতা ম্যাসেজ ছাড়া আসে না– এটা আমার ধারণা। জাতিগত ম্যাসেজ নিয়ে আসে, মানুষের ম্যাসেজ নিয়ে আসে। কিন্তু ম্যাসেজের বাইরেও, কখনও কখনও কবিতা কিছু শিহরণ নিয়ে আসে, আক্রমণ নিয়ে আছে যা পাঠ করার সঙ্গে সঙ্গে পাঠক উত্তেজিত হয়ে যায়। অর্থাৎ কবিতার– আমি বলি, সংক্রমণ। ভালো কবিতা পাঠ করার সময় সঙ্গে সঙ্গে এটা তোমাকে সংক্রমিত করবে। এই শিহরণটাকে যে যেভাবে বোঝে তার নিজের ভাষায় সেভাবে অনুবাদ করে। এটা ব্যক্তিভেদে কিন্তু আলাদা হয়ে যাবে। আর এটাও ঠিক যদি কবির পক্ষে সম্ভব হয় ওই মূল ভাষাটি জানা এবং মূল ভাষা জেনে সেটার কাঠামো নিজের ভাষায় নির্মাণ করতে পারলে ভালো। নির্মাণ না করলেও কোনো অসুবিধা হবে না। এই যে তার মতো করে তার ভাষায় পুননির্মাণ করবেন, তারপর পাঠক পড়ে মনে করবে এটা তার ভাষার কবিতা। ফলে টেকনিকের বিবর্তনের ইতিহাসের কথাটা অনুবাদের ক্ষেত্রে ওইভাবে খাটে বলে মনে হয়।
রাজু : সে অর্থে টেকনিকের গুরুত্ব দেশীয় পরিমণ্ডলের ক্ষেত্রে ঠিক আছে, কিন্তু যখন একটি কবিতা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের দিকে যাত্রা শুরু করে, তখন টেকনিকের গুরুত্বটা ওইভাবে আর থাকে না।
নূরুল হুদা: না, এটা আগে হতে পারত, এখন কিন্তু তা হবে না। এখন মানুষ বিভিন্ন ভাষায় কবিতা লিখছে, পৃথিবীটা খুব ছোট হয়ে গেছে। বিভিন্ন ভাষার কবিতার যে পালাবদল সেটাও মোটামুটি আমরা জেনে ফেলেছি। এখন কিন্তু সারা পৃথিবী জুড়ে এক ধরনের টেকনিক বিবর্তিত হচ্ছে। এটা যদি জানা যায় তাহলে আমরা এখনকার কবিতাটির ক্ষেত্রে যেটা বলব সেটা হচ্ছে টেকনিক বিশ্বজুড়ে বদলে যাচ্ছে– এটা সম্পর্কে এখনকার কবিকে মোটামুটিভাবে অবহিত থাকতে হবে। অনুবাদের ক্ষেত্রে সেই কাজটি করতে হবে।
রাজু : তা তো বটেই। এই জিনিসগুলো জানলেই শুধু আপনি আবার নতুন কিছু…
নূরুল হুদা: তবে এটা নিশ্চিত যে ‘টেকনিকের বিবর্তনের ইতিহাস’ কথাটা একটি খণ্ডিত সত্য। অবধারিত সত্য নয়। পূর্ণাঙ্গ সত্য নয়। টেকনিকের বিবর্তনের ইতিহাস তো বটেই, পাশাপাশি বোধের বিবর্তনের ইতিহাসও বটে। আমাদের প্রতিটি মানবিক বোধ পাল্টে যায়। হত্যা, যুদ্ধ– একটা সনাতন বোধ। কিন্তু হাবিল কাবিলকে হত্যা করার সময় যে বোধ ছিল, হিরোশিমায় বোমা ফেলার সময় হত্যার বোধ এক না। এই যে মাত্রা পাল্টে যাচ্ছে; কাজেই আমরা বলব ঘটনাও পাল্টে যাচ্ছে, রচনাও পাল্টে যাচ্ছে, আমাদের বোধ পাল্টে যাচ্ছে এবং বোধের প্রকাশভঙ্গিও পাল্টে যাচ্ছে। ম্যাসেজও পাল্টে যাচ্ছে। আগে মানুষ ধর্ম থেকে শুরু করে অনেক কিছু দিয়ে নিজেদের একটা সমাধান খুঁজত। এখন মানুষ ধর্ম তো আছেই, ধর্মের পাশাপাশি সংস্কৃতি দিয়েও একটা বিশ্বজনীন, একটি মানবিক বোধ দিয়েও ধর্মকে ধারণ করেই মুক্তি খুঁজতে চায়। যদিও দ্বন্দ্ব আছে। মুক্তির পথ খুঁজতে সে সব মানুষকে এক মানুষ হিসেবে চিন্তা করে। এই একরূপতার দিকে যাত্রা, অনুবাদের ক্ষেত্রেও আমি বলব, তাই ঘটছে। অনুবাদ মানে এক ধরনের এক্সপ্রেশন। একজন এক্সপ্রেস করে ফেলেছে, সে একটা এক্সপ্রেশনকে আবার এক্সপ্রেস করছে। সে ক্ষেত্রে অনুবাদের কিন্তু একটা ঐক্য আছে। মূল কবি যেভাবে যা লিখেছে, অনুবাদকও যতটা সম্ভব তাকে পুনর্নিমাণ করছে, কিছুটা বিচ্যুত সত্ত্বেও একরূপতা তৈরি করছে। সেই একরূপতার ক্ষেত্রে আমি বলব যে ম্যাসেজ যদি থাকে ওয়েল এন্ড গুড, ম্যাসেজ থাকলে সেটা বোঝা যায়। যতদূর সম্ভব কাছাকাছি যাওয়া যায়।
রাজু : আরেকটা জিনিস জানতে চাই, এই বয়সে আপনি বা আমি এখন কিন্তু আর সেই পাঠক না। এখন আপনি আর আমি কিন্তু অনেক বেশি কৌশলী পাঠের ক্ষেত্রে। কৌশলী মানে কী, আপনার ঠিক যেটুকু প্রয়োজন সেটুকুই আপনি পড়েন, এরচেয়ে বেশি কিন্তু আপনি পড়েন না। যখন, ধরেন, বয়স ২০-২৫ ছিল তখন কিন্তু গোগ্রাসে নানান রকম পড়তেন, ওটা ছিল একদম নেশা। পাঠের ওই স্তরটা, ধরা যাক যখন জীবনানন্দ দাশের কবিতা আমরা পড়তাম, তখন কিন্তু কবির টেকনিক সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণা নেই। আমরা কেবল লক্ষ করি তার কবিতা আক্রমণ করতে পারছে কি না, তার ম্যাসেজটা আমাকে আকর্ষণ করতে পারছে কি না। আমি মনে করি ওই বয়সের পাঠকই হচ্ছে আসলে সত্যিকারের ইনোসেন্ট এবং রিয়েল পাঠক। রিয়েল পাঠক এই অর্থে যে সে আসলে কবিতার মূল বাণী দ্বারা সে মুগ্ধ।
নূরুল হুদা: ম্যাসেজ ঠিক আছে, কিন্তু অনেক সময় ম্যাসেজটা বিভ্রান্ত করতে চাইলেও তার ভাষিক আকর্ষণ আমাকে বেশি আকর্ষণ করে। যেমন জীবনানন্দ দাশের কবিতা অতি ব্যবহৃত একটি লাইন– ‘সরোজিনি ওইখানে শুয়ে আছে, জানি না ওইখানে শুয়ে আছে কি না।’
ম্যাসেজ কী এখানে? ‘শুয়ে আছে’– প্রথম ম্যাসেজ, ‘জানি না সে শুয়ে আছে কি না’– এখানে উল্টো ম্যাসেজ। কবিতায় এই ধরনের বিরোধাভাস সবসময় আছে। তারপর ম্যাসেজটা হচ্ছে ওর অস্তিত্ব সম্পর্কে আমি সন্দিগ্ধ, আমি জানি না। আমার জানার ভেতর কোথাও না কোথাও একটা ফাঁক রয়ে গেছে।
রাজু : ইল্যুশান এন্ড রিয়ালিটি।
নূরুল হুদা: ইল্যুশান এন্ড রিয়ালিটি। ঠিক আছে, একই কথা আমি বলতে চাচ্ছিলাম। লস অব আইডেন্টিটি, বিচ্যুতি, প্রতিটি মুহূর্তের বিচ্যুতি, মানুষের মধ্যে আমি আছি কি নাই। এই মুহূর্তে আমি আছি কি না– এইটাও একটা ম্যাসেজ। এটাও এক ধরনের বিমূর্ত বাণী।
রাজু: আমি ওই মুহূর্তকে কেন গুরুত্বপর্ণ বলছি তা হল, ভালো লাগা শুরু হয় কিন্তু ওই সময়টা থেকে। সাহিত্যের প্রতি যে ভালোবাসা…
নূরুল হুদা: ওইটা হচ্ছে বীজ বোনার…
রাজু : আপনার যে কবিতা, ‘মানুষ কী চিজ’ এই যে এই রকম একটা কথা…
নূরুল হুদা: ওই সময়টার পাঠটা হল জমি চাষ করার সময়। জমি চাষ করার সময় তুমি জমি চাষ করলে, বীজও ছড়িয়ে দিলে, তারপর গাছের চারাগুলো হতে থাকে। চারার সঙ্গে কিন্তু অনেক বেচারা, অচারা, ঘাস– এইসব জঞ্জালও জন্মায়।
রাজু : এগুলো নিড়ানি দিয়ে সরাতে হয়। বেচারা, অচারার সঙ্গে কুচারাও হয়।
নূরুল হুদা: নিড়ানি দেওয়ার পর যখন পাকা ধান ফলবে তখন কিন্তু চারার পরিমাণও কমে আসবে, ধানের পরিমাণও কমে আসবে। কিন্তু যে ধান আসবে তা রাশিরাশি ভারা ভারা ধান কাটা হল সারা। আমরা কিন্তু এই বয়সে এসে বসে আছি। শুরুর বয়সে যা আছে সবটাকে চাষ করো, সবটাকে ফলাও। পাঠের ক্ষেত্রেও তাই…
রাজু : আমি বলতে চাচ্ছি সাহিত্যের প্রতি নিখাঁদ প্রেমময়তা হচ্ছে ওই বয়সে।
নূরুল হুদা: আগ্রাসী প্রেমময়তা ওই সময়ে থাকে, সামনে যা আসে তা তুমি গোগ্রাসে গিলে খাও। যেমন ধরা যাক মান্নান সৈয়দের কবিতা– “জ্যোৎস্না কী? জ্যোৎস্না হল জল্লাদের ডিমের মতো…”– পড়ার পর এটা কিছুই বোঝা যায় না। কিন্তু অনেকক্ষণ ইয়ে করার পরে জল্লাদ, ডিম, জ্যোৎস্না, মাথা– সবকিছু মিলে কোথায় যেন একটা আভাস দিচ্ছে, আমরা দেখতে পাচ্ছি। জীবনের শুরুতে গোগ্রাসে পাঠটা আমাদের জন্য প্রয়োজন। আর আমরা বুঝে ফেলেছি পৃথিবীতে সময় কমে যাচ্ছে, সবটুকু আমার প্রয়োজন নেই।
রাজু : এই বয়সে বোধহয় নতুন কিছু যুক্ত হয় না। যুক্ত মানে আসলে কী ধরনের জিনিস আপনি পছন্দ করবেন কী করবেন না সেটা তো ওই বয়সেই নির্ধারিত হয়ে যায়। আমাদের পরিণত বয়সে আমরা ওইগুলোকেই শুধু মাত্র আমরা রিফাইন করার চেষ্টা করি।
নূরুল হুদা: রিফাইন করার সঙ্গে, আমি বলব, আমরা এক ধরনের জাবর কাটি। একেবারে নতুন কিছু আসে না– এমন নয়। নতুন বই এলে পাঠ করতে ইচ্ছা করে। নতুন রমনী এলেও দেখা যায় সে রমনী চেখে দেখতে ইচ্ছে করে, সৌন্দর্য দেখতে ইচ্ছা করে। যেমন সেই বয়সে একজন রমনীকে কীভাবে আর এই বয়সে কীভাবে দেখছি সেটা, এরং কীভাবে আগে একজনকে দেখেছি এখন কীভাবে দেখব সেটা মনে হয়। আমার একটা ছোট্ট কবিতা আছে “তোমাকে চাই, তোমাকে চাই তোমাকে চাই মেয়ে/ সত্তুরেও থাকব যুবক তোমার দেখা পেয়ে।”– এটা কিন্তু প্রত্যেক সৃষ্টিশীল মানুষের মনের কথা। এখানে মেয়ে মানে কিন্তু শুধু মেয়ে নয়, ‘তোমাকে চাই’ বললে শুধু প্রেম নয়, এটি হল সৃষ্টিশীল মানুষের নবায়নের আকাঙ্ক্ষা। ফলে জীবনের শেষমুহূর্ত পর্যন্ত একজন সৃষ্টিশীলতাকে নবায়ন করতে চায়। এবং নবায়নের সূত্রই হল ‘পড়’। না পড়লে তুমি কী নবায়ন করবে? যা তুমি পড়েছ তাকে তোমার নবায়ন করতেই হবে। ফলে আমি বলব এখনকার নতুন পাঠের আগ্রহ, নতুন পাঠের ধরন আগের মতো না।
রাজু: হুদাভাই, শেষ প্রশ্ন দিয়ে শেষ করি সেটা হচ্ছে যে এই মাসে আপনার ৬৫ বছর বয়স হবে। এই ৬৫ বছর বয়সে আপনি তো কর্মময় সৃষ্টিশীল জীবনের একটা বড় অংশ পার করে এসেছেন। তারপরও আমি বলব যে সামনে আপনার আরও দীর্ঘ সময় রয়েছে, আপনার দীর্ঘায়ু কামনা করি অবশ্যই। তো এই বয়সে এখন নতুন সৃষ্টির ক্ষেত্রে আপনার অনুসন্ধান কী?
নূরুল হুদা: আমার মাঝেমধ্যে মনে হয় ৬৫ বছর বয়সে তেমন কিছুই লিখিনি। আবার পরিমাণগত দিক থেকে বলা যাবে যে আমি একেবারে লিখিনি– এমনও না। কিন্তু যে লেখাটি, যে রচনাটি আমি লিখতে চাই, আমি নিশ্চিত জানি সেটা আমি এখনও লিখিনি। লিখতে পারিনি। এখনও মনের ভেতর হঠাৎ যে বিষয়টা, যে থিমটা আমার ভেতর কাজ করছে, তাহল আমি ঘরের পর ঘর, স্তরের পর স্তর, পর্যায়ের পর পর্যায় বদল করে চলেছি। ইংরেজিতে বলতে পারে ‘এন ইলিউসিভ আই’, এক মায়াময় পরিবর্তনশীল আমিতে আছি। এই ৬৫ বছর বয়সে এসেও আমার হঠাৎ করে মনে হয় আমি তো এইমাত্র জন্মগ্রহণ করেছি। নতুন কবিতা যখন লিখছি তখন একেবারে নতুন কবি মনে হচ্ছে নিজেকে। প্রতি মুহূর্তে, লেখার মুহূর্তে মনে হয় কবিতা হচ্ছে তো?– এই দ্বিধা কাজ করে। আমার মনে হচ্ছে যে যত দিন বাঁচব এই দ্বিধা এবং সংশয়ের মধ্যেই আমি থাকবে এবং নিজেকে আমি নবায়ন করতেই থাকব। এই নবায়নপ্রবণতা আমার ভেতরে জেদের মতো রয়ে গেছে। এই সত্যটাকে আমি বুঝতে চাই। আমার কাছে মনে হয় মায়ের গর্ভ আর কবর–এই দুয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। একসময় এই খণ্ডিত আমি বিশ্বজীবনে প্রবেশ করার আগে শুয়ে ছিলাম ১০ মাস ১০ দিন। কিন্তু তার আগে আমি কোথায় ছিলাম? জানি না। ২. এক রমনী আর এক পুরুষের সব ভালোবাসা থেকে আমরা দুই থেকে দুই অর্ধ এসে একটা হয়ে গেলাম। তার আগে আমরা কোথায় ছিলাম? নিশ্চয় বিশ্বভুমণ্ডলের কোথায়ও। এই থিমটা আমাকে সাংঘাতিকভাবে তাড়া করে। আমি একে নির্মাণ করতে চাই। যদি এটাকে নির্মাণ করা যায় তো কোনপথে– গদ্যে হবে না পদ্যে হবে, কোন ভাষায়– সেটাও জানি। সেটা যদি নির্মাণ করা যায় তাহলে আমি হয়ত আমার কিছুটা হলেও প্রার্থিত লেখার কিছুটা লিখতে পারব। আমি যে জাতির ভেতরে ছিলাম; আমার জাতিকে বলা হয় বাঙালি জাতি। এই বাংলাদেশের ভূখণ্ড, সেই ভূখণ্ডের বিবর্তন সম্পর্কে আমি উৎসাহী ছিলাম। এই ভূখণ্ডের প্রথম মানুষটি আসার পর তার বর্ণ কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, তার বাক্য কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, তার রক্ত কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে এবং একটি মানুষ কীভাবে একটি সমষ্টিতে পরিণত হয়েছে, একজন বাঙালি কীভাবে একজন বাঙালি জাতির জন্ম দিয়েছে– সেই অন্বেষণটাও কাব্যিকভাবে আমার ভেতর কাজ করে। এই অস্তিত্বটা বিগব্যাঙের সঙ্গে সম্পর্কিত। সেই অস্তিত্বটা আস্তে আস্তে, হতে হতে আমি নামক, একটা মুহম্মদ নূরুল হুদা নামক একটি ব্যক্তির ভেতরে নিহিত হয়ে আছে। চলে গিয়ে, কোথায় গিয়ে আবার উত্থিত হবে। এই যে ভাবনা: একটি বিন্দু থেকে, বিন্দুময় থেকে মহাজাগতিকতা। এটা বোধের বাইরের একটা ইশারা মাত্র। ইশারার জায়গাটিকে আমি ধরার চেষ্টা করছি।
রাজু: হুদাভাই, আপনার জন্মদিনের জন্য সময় দেওয়ায় অসংখ্য শুভেচ্ছা আর আপনার যে ভাবনা, যে বোধাতীতকে, যে অনুভুতিকে আপনি ধরতে চাচ্ছেন তার সাফল্য কামনা করি। অনেক ধন্যবাদ।
নূরুল হুদা: ধন্যবাদ তোমাকেও। সফলতা বিফলতা বড় কথা নয়, ধরতে চাওয়া, এই আকুলতা– এটাই হচ্ছে মূল বিষয়। এটা হচ্ছে এক ধরনের সংগ্রাম। একজন শিল্পীর মূল সংগ্রাম হচ্ছে সৃষ্টিশীলতা।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (3) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Mostafa Tofayel — অক্টোবর ২০, ২০১৪ @ ১২:২৪ অপরাহ্ন

      “এভাবে চারটা পর্যায় চলে যাবে। টেক্সচুয়াল পর্যায় পার হওয়ার পর আসে রেফারেন্স, এই পর্যায় চলে যাওয়ার পর থাকছে লেভেব অব কোহেসিভ। আমাদের কাজ হচ্ছে টেক্সেটের উদ্দেশ্যটা বের করা। এরপরে একটা গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হচ্ছে লেভেল অব নেচারালনেস, এর মানে মূল ভাষায় যা ছিল হুবহু তা নিজের ভাষায় আনার চেষ্টা করা। এরপর থাকবে কোহেসিভ লেভেল। টেক্সট এবং রেফারেন্সিয়াল পর্যায়ে আমরা যা পেলাম, তারপর এখানে আমি বলব টেক্সটা যে রীতির, তোমার অনুবাদে এসেও দেখা গেল সেটার মতোই অনুবাদ হয়ে গেছে, তা এক জায়গায় এনে মূল রূপটাকে উদ্ধার করা।“
      আমার নিজের জন্য এবং যেকোনও নবীন অনুবাদকের জন্য কবি হুদা বর্ণিত ঐ চারটি পর্যায়ের সাথে পরিচিত হতে হবে। সেটা সম্ভব হলে অনুবাদকর্ম সফল হয়ে উঠতে পারে। রাজুভাই এর সাক্ষাতকারটি ছাঁচে-ঢালা স্তুতিবাচক কোনও প্রশ্ন-উত্তর নয়, বরং এটা আগাগোড়াই উদ্দীপক। এর থেকে জানার ও শেখার আছে। ধন্যবাদ রাজু ভাই কে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন prangbasak — নভেম্বর ১, ২০১৪ @ ৯:৪১ অপরাহ্ন

      khub valo laglo…anek katha jante pere khushi holam…prangbasak

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com