প্রাচ্য পুরাণের নবরূপায়ণের কবি

তপন বাগচী | ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৪ ৩:০৭ অপরাহ্ন

huda-2.jpgপুরাণের নবরূপায়ণ সাহিত্যের এক স্বীকৃত ও নন্দিত প্রথা। ‘কানু ছাড়া গীত নাই’ প্রবাদটির মধ্য দিয়েই পুরাণের নবরূপায়ণের লৌকিক স্বীকৃতি মেলে। প্রেমের গান মানেই কালার বাঁশি আর রাধার বিরহের সুর। বাংলা কবিতা ও গানে পুরাণের নানামাত্রিক ব্যবহার কারও অজানা নয়। এমন কোনো কবি নেই, যিনি জেনে বা না জেনে পুরাণের পূর্ণ কিংবা খণ্ডিত ব্যবহার করেননি। কেবল প্রাচ্য পুরাণ নয়, প্রতীচ্য পুরাণও হয়ে উঠেছে সচেতন কবির অন্বিষ্ট। এমনকি লৌকিক পুরাণ ব্যবহারেও বাংলা কবিতা সমৃদ্ধ হয়েছে। এছাড়া ঐতিহাসিক কিংবা সামাজিক বিষয়াদিও ব্যবহারের গুণে পুরাণের মর্যাদা পেয়ে গেছে। কবিতার অনুষঙ্গ হিসেবে পুরাণে ব্যবহৃত শব্দ, চরিত্র, আখ্যান প্রয়োগের পাশাপাশি কেউ কেউ সম্পূর্ণ পুরাণকাহিনির নবনির্মাণ করেছেন। কাব্যনাট্যে এই উদ্যোগের ঘটনা বেশি লক্ষিত হলেও মালা-কবিতায় এর প্রয়োগ বেশি নেই। যে কজন নিষ্ঠাবান কবি এই ধরনের সচেতন প্রয়াস চালিয়েছেন কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা তাদের শীর্ষ সারির একজন। ‘শুক্লা শকুন্তলা’ (১৯৮৩) তাই বাংলা কবিতার স্মরণীয় উদাহরণ।
‘শুক্লা শকুন্তলা’ কবির খরযৌবনের সৃষ্টি। এর আগেই তাঁর কবিখ্যাতি জুটে গেছে। বলা যায়, প্রথম কাব্য ‘শোণিতে সমুদ্রপাত’ (১৯৭২) কাব্যের মাধ্যমেই তাঁর স্বীকৃতি আসে পাঠকের কাছ থেকে। এরপর ‘আমার সশস্ত্র শব্দবাহিনী’ (১৯১৭৫), ‘শোভাযাত্রা দ্রাবিড়ার প্রতি’ (১৯৭৫), ‘অগ্নিময়ী হে মৃন্ময়ী’ (১৯৮০) এবং ‘আমরা তামাটে জাতি’ (১৯৮১) কাব্যের মাধ্যমে মুহম্মদ নূরুল হুদা বাংলা কবিতায় তাঁর আসন নির্দিষ্ট করেছেন। ষাট ও সত্তর দশকে রচিত কবিতাগুলোই তাঁর সেই স্বীকৃতির মূল। এরপর তাঁর বাঁকবদলের পালা। তিনি চোখ ফেরালেন মহাকবি কালিদাসের দৃশ্যকাব্য ‘অভিজ্ঞান শকুন্তলম’-এর দিকে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ভাষান্তরে এটি হয়ে উঠেছে প্রভাবসঞ্চারী এক গদ্যকাব্য। তারাই ধারাবাহিকতায় মুহম্মদ নূরুল হুদা রচনা করেছেন সনেটকাব্য ‘শুক্লা শকুন্তলা’। ৩২টি চতুর্দশপদীতে তিনি পুনর্নিমাণ করেছেন ‘অভিজ্ঞান শকুন্তলমে’র কাহিনি। পুনর্নিমাণ বলছি এই কারণে যে, তিনি শকুন্তলার কাহিনির হুবহু রূপায়ণ করেননি, সেখান থেকে ভাববস্তু আহরণ করে তিনি সমকালের রসায়নে নতুন ম- প্রস্তুত করেছেন।

প্রথম সনেটে শকুন্তলার পরিচয় বিধৃত হয়েছে। শুক্ল পক্ষে জন্ম যার, সেই শুক্লা। আর রহস্যময় কুন্তল বা চুল যার, সে-ই শকুন্তলা। ঋষি কন্বের তপোবনে সে থাকে। তার মায়ের নাম মেনকা। হস্তিনাপুরের রাজা দুষ্মন্ত সেই শকুন্তলাকে দেখে মুগ্ধ হয়। মুগ্ধতা থেকে প্রণয়, তারপর পরিণয়। কিন্তু রাজা একসময় স্মৃতিভ্রষ্ট হয়। অনেক ঘটনার পরে শকুন্তলাকে দেওয়া অভিজ্ঞান দেখে ফের চিনতে পারে। তারপর মিলন। মোটা দাগে এই হচ্ছে শকুন্তলার কাহিনি।
এই কাব্যে এমন কিছু পদ কবি রচনা করেছেন, যা শকুন্তলার উপাখ্যানকে ঘিরে আবর্তিত হলেও যে কোনো ক্ষেত্রেরই চূড়ান্ত ফসল বলে মান্য করা যায়। যেমন–
অতিথির নেই তিথি, হোক কালো-শাদা
তপোবনে জীবাজীবে নেই অমর্যাদা।

(শু.শ. ১০)
পতির চেয়ে কি বড় বনের অতিথি?
এই প্র্রশ্নে ছিন্নভিন্ন নারীর প্রকৃতি।

(শু.শ. ১২)
ছলনা নারীর খেলা, পুরুষের নয়
কুহেলী কৌশল শুধু নারীর আশ্রয়।

(শু.শ. ২০)
শ্রম যদি ঘর্ম আর ঘর্ম যদি জল
মূল্যহীন শ্রম স্রেফ বিষাক্ত গরল।

(শু.শ. ২২)
মানুষ পরেছে এই জ্ঞানের অঙ্গুরী:
বিনাশ্রমে লব্ধ ধন আদপেই চুরি!

(শু.শ. ২৩)
মিলন-মুহূর্ত এলে কাঁপে তবু বাহু
নারী সত্য, সত্য নয় রমণীর রাহু।

(শু.শ. ২৭)
একচ্ছত্র জয় নেই, নেই কোনো জয়
বিজয়ী বিজিত কভু, বিজিত বিজয়ী।

(শু.শ. ২৯)
মানুষ জানে না তার মিলনের দিন
মানুষ কেবল শোধে সম্পর্কের ঋণ।

(শু.শ. ৩০)
প্রায় প্রতিটি কবিতার শেষের দুইচরণ এ রকম বাণীবহ, এ রকম স্মরণযোগ্য। জোড়চরণগুলো এমনই ইঙ্গিতময় যে তার ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না। সনেটের আঙ্গিক গ্রহণ করেছেন বলেই, ভাবের নির্যাস এরকম প্রগাঢ়ভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। আর তা সম্ভবপর হয়েছে মুহম্মদ নূরুল হুদা প্রকৃত কাব্যসিদ্ধি অর্জন করেছেন বলেই।

দুষ্মন্ত-শকুন্তলার কাহিনিতে ধর্মীয় প্রভাব না থাকলেও আশ্রম, ঋষি, তপোবন, রাজা, মৃগয়া প্রভৃতি অনুষঙ্গ থাকায় এবং কালিক বিচারে এই কাহিনির প্রাচীনত্ব থাকায় একে প্রাচ্য পুরাণ হিসেবে বিবেচনা করতে বাধা নেই। বহুধা ব্যঞ্জনা থাকায় এর এই কাহিনির ধ্রুপদী সাহিত্যের মর্যাদা পাচ্ছে। এই কাহিনি দেশ-কাল-ধর্মের ঊর্ধ্বে। হয়ত মুহম্মদ নূরুল হুদা সেই কারণেই এই কাহিনিকে তাঁর সনেটের উপজীব্য করেছেন। এর আগে কবির পয়ার কিংবা সনেট রচনার অভিজ্ঞতা থাকলেও ‘শুক্লা শকুন্তলা’র মতো এত তীব্রভাবে তার আওয়াজ শোনা যায়নি। কবি কি তাহলে বাঁকবদলের স্মারক হিসেবে বাংলা কবিতার সহস্র বছরের ঐতিহ্যকেই অঙ্গীকার করলেন? এই বিবেচনাকে আমরা সাধুবাদ জানাই।

যেহেতু বিনির্মাণের প্রতি কবি জোর দিয়েছেন, তাই প্রাচীন বক্তব্যের সঙ্গে আধুনিক অনুষঙ্গের সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন। দুষ্মন্ত-শকুন্তলার প্রেমকাহিনি বলতে গিয়ে কবি শ্রমের কথা বলেছেন, ভ্রুণহত্যার কথা বলেছেন, কাল্পনিক দেবতার স্থলে মানুষের কথা বলেছেন। এখানেই কবির নিজস্বতা, এখানেই বিনির্মাণের মূল সূত্র লুকিয়ে আছে। অক্ষয়কুমার বড়াল যেমন দেববন্দনার চেয়ে মানববন্দনার গুরুত্ব দিয়েছেন, সেই একই ধারায় মুহম্মদ নূরুল হুদা, পুরাকালের পাত্রপাত্রীকে সমকালের মানব-মানবীর মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছেন।

আমরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলতে চাই, দুষ্মন্ত-শকুন্তলার প্রণয়কাহিনি সনেটে আঁটসাঁট গাঁথুনিতে রচনা করার এই প্রয়াস অবশ্যই অভিনব। এই কাব্য তাঁকে এনে দিয়েছে ব্যাপক স্বীকৃতি। ফরিদপুর সাহিত্য ও সংস্কৃতি উন্নয়ন সংস্থা কবিকে দিয়েছে ‘আলাওল সাহিত্য পুরস্কার’(১৯৮৩)-এর শিরোপা। একই কাব্যের জন্য তিনি পেয়েছেন যশোর সাহিত্যপরিষদ পুরস্কার (১৯৮৩) এবং আবুল হাসান কবিতা পুরস্কার (১৯৮৩)। বাংলা কবিতায় প্রাচ্য পুরাণের নবরূপায়ণ হিসেবেও এর আদর্শমান চিহ্নিত। ‘শুক্লা শকুন্তলা’ বাংলা কবিতায় এক গুরুত্বপূর্ণ কাব্যের নাম। এই কাব্য কেবল সমকালে নয়, ভাবীকালেও আদরণীয় হওয়ার যোগ্য।
Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Shimul Salahuddin — সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৪ @ ৩:১৯ অপরাহ্ন

      শুভ জন্মদিন কবি…

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Mostafa Tofayel — অক্টোবর ৫, ২০১৪ @ ১১:৫৬ অপরাহ্ন

      প্রাচ্য পুরাণের নব রূপায়ণের কবি প্রবন্ধে তপন বাগচী প্রতিতুলনামূলক সমালোচনা করে সাহিত্যের উদ্ভাস দিয়েছেন, সবিস্তার বিবরণে ও ব্যাখ্যায় অবতীর্ণ হননি। বাংলাদেশের বর্তমান সাহিত্যে পুরাণের ব্যবহার; পৌরাণিক দেবাদিদেব মাহাত্ম্য থেকে মর্ত্যবাসী স্বদেশবাসীদের চরিত্রচিত্রণে কবি মুহম্মদ নূরুল হুদার পক্ষপাত; শেক্সপিয়রের সনেট-প্রথার অনুরূপ ত্রয়োদশ-চতুর্দশ পয়ার-পংক্তিতে নীতিকথা উপহার- একথাগুলো বাগচী স্পর্শ করেছেন। প্রবন্ধের বর্তমান ধারা অনুযায়ী অন্য কোনো সুযোগ ও পরিসরে বাগচী এর সবিস্তার অবয়ব উপহার দেবেন, এমন প্রত্যাশা রইল। বাংলাদেশে সমালোচনাসাহিত্য ও অনুবাদ সাহিত্য এখনও অপর্যাপ্ত। সে-কারণে সুমহান কবি-সাহিত্যিকেরাও পাদপ্রদীপের আলোয় সহসা আসতে পারেন নাই। বাগচী এগিয়ে আসবেন আন্তরিকতার সাথে, সমালোচনাসাহিত্য নিয়ে, আশা করি।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com