সাগরতরঙ্গে কবির মুখ

বিনয় বর্মন | ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৪ ২:৪৪ অপরাহ্ন

nurul-huda.jpgকবি মুহম্মদ নূরুল হুদার মুখের দিকে তাকালেই কেন জানি সাগরের ছবি ভেসে ওঠে। তাঁর চোখে সাগরের উষ্ণস্রোত। নিঃশ্বাসে প্রমত্ত মৌসুমি বাতাস। ঠোঁটে বিড়বিড়-করা উর্মিমালা। দাড়িগোঁফে শ্যাওলা-গুল্ম, ফসফোরেসেন্স। কবি সাগরজাতক; সাগরের নোনাজল বালিপলিতে গঠিত, লালিত তার দেহ। উপকূলের গাছ তাকে ছায়া দিয়েছে, সাগর থেকে ভেসে আসা মেঘ তার উপর বারিপাত করেছে। কবির স্বীকারোক্তি: ‘অনন্ত প্রশ্নের মুখে ধাবমান আমি আজও তরঙ্গ সফেন’। সাগর তাঁর অস্তিত্বে শেকড় গেড়েছে, তাকে করেছে সৃষ্টিশীলতায় উন্মাতাল। কবির হৃদয়ে-মননে যত ভাব-অনুভব, তা প্রকাশিত হয় কবিতার মাধ্যমে। তার প্রতিটি উচ্চারণ সাগর মন্থন করে তুলে আনা অমৃতের মতো। আমরা সেই অমৃতবাণী শ্রবণ করে মুগ্ধ হই, ধন্য হই, পুণ্যবান হই। আমরা পুলকিত হতে হতে হারিয়ে যাই নন্দনের অচেনা বন্দরে।

সমুদ্রের ঢেউ দেখতে যেমন ভালো লাগে, তেমনি ভালো লাগে সমুদ্রের তীরে প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে থাকা সারবাঁধা ঝাউ গাছ। কী ইঙ্গিতে তারা আকাশের সঙ্গে কথা বলে, কবি তা বুঝতে পারেন। মৃদুমন্দ কিংবা দমকা হাওয়ায় তারা নাচে, হাত-পা আন্দোলিত করে। তারা উড়ন্ত গাঙচিলকে ডাকে, আয় আয়, এই সবুজ মায়ায়, একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার উড়াল দে মাছের খোঁজে। আকাশে যখন চাঁদ ওঠে, তখন ঝাউগুলো একে অপরকে জড়িয়ে ধরে। আবেগের ঢেউ ওঠে তাদের শাখাপ্রশাখায়। তখন তারা আর ঝাউ নয়, সবাই মিলে তারা এক মহাসমুদ্র, সবুজ স্বপ্নের বিস্তার। এই দরিয়া ঝাউদরিয়া। এই দরিয়ার বুকে ঝিনুকে মুক্তার মতো লুকিয়ে থাকে জীবনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না। কবি তা সন্ধান করেন, আহরণ করেন। আবার ঝাউদরিয়ার ডানায় উড়ে যান চিলের দেশে, মেঘের দেশে। এভাবেই চলে কবির কাব্যসাধনা।

মুহম্মদ নূরুল হুদার কবিতায় শোনা যায় দিগস্তবিস্তারি নীলাভ সাগরের কল্লোল। শব্দে শব্দে ফেনায়িত হয়ে ওঠে সাগরলীলা। দরিয়ার সঙ্গে চলে কবির নিরন্তর বোঝাপড়া। তার হাত ধরে হাঁটেন, তাকে নিয়ে ভাবেন। মধ্যরজনীতে তিনি দরিয়াকে বসিয়ে রেখে ছুটে যান মনদরিয়ায়। ‘দরিয়া হাঁসফাঁস করে, নড়েচড়ে, সিংহীর মতো গর্জন করে’ এবং কবির ‘বুকের শেকড় উপড়ে ফেলার জন্য নখর মেলে ধরে’। কবি তার খুঁটি থেকে না সরে পিষে ফেলেন তরঙ্গস্তন। দরিয়া তাকে ভয় দেখায়, কিন্তু তিনি ভীত নন। তাকে ছাড়ানোর জন্য হাঙর, রূপচাঁদা আর অন্য মাছেরা মিছিল করে। তিনি দরিয়ার নাভি রগড়াতে রগড়াতে ডিগবাজি খান, শীর্ষাসন করেন। দরিয়ানগরের রহস্যগুহায় তখন আরব্যরজনীর উন্মাদনা। ইলিশশিকারি নৌকাগুলোকে রণতরী মনে হয়, তারা হন্যে হয়ে খোঁজে কবিকে। কবি লুকিয়ে যান। এভাবেই দরিয়ার সঙ্গে চলে কবির সারাদিন খেলা। কবির উপলব্ধি:
‘আমি তো আমাকে পাই না, দরিয়াও পায় না, দুজন দুজনের দূরত্বে শুধু সাঁতরাই
তিন ভুবনের ঝাউপ্রহরীকে সাক্ষী রেখে আমরা পরস্পরের ভেতর কাতরাই
আমাদের দিন নাই আমাদের রাত নাই।’

ঝাউদরিয়ার কূলে বসে কবি শোনান এক ‘অমরাবতী’ বুড়ির উপাখ্যান। সাগরকে আলিঙ্গন করে মৃত্যুকে অতিক্রম করার এক অনন্ত ইচ্ছা রূপায়িত হয় রূপকগদ্যের ক্যামোফ্লাজে। সাগরের বুকে আশ্চর্য দ্বীপ, সে কি কোনো রূপকথা? ঝাউ আর দরিয়ার মাঝখানে যে বালিঢিবি, দূরতম নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে সেই ঢিবির চূড়ায় বসে ধ্যান করে বুড়ি-মা। শ্যাওলানগর থেকে উদ্ভিন্না সুন্দরী এসে তার মুখোমুখি দাঁড়ায়। বুড়ি তাকে জানায়, তার ভেতর থেমে আছে অনঙ্গযৌবন আর দরিয়ার দহন তরঙ্গ। তারপর মৃত্যুপুরী সাঁতরে গিলগামেশ যখন তার সামনে এসে দাঁড়ায়, তখন সে দিগদিগন্তে ছড়িয়ে দেয় তার এলোকেশ। এরপর ঘটে দৈবদুর্বিপাক ও কল্পবিজ্ঞানের অভাবনীয় ঘটনা। ‘ঝড় ওঠে জলেস্থলে, গগনে গগনে, ফোঁসে সাইক্লোন। লাশ হয়ে ভেসে আসার আগেই জগতের তাবৎ যুবকযুবতী ক্লোন হতে থাকে।’

কবি প্রাচীন ভারতীয় মিথের মধ্যে দিয়ে দরিয়াকে পুনর্সৃজন করেন। তিনি যুগযুগান্ত ধরে প্রবহমান ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে তুলে আনেন দরিয়ানগরে। প্রত্নতাত্ত্বিক ও নৃতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে তার আত্মপরিচয়ের বীজভূমি নতুনরূপে আবিষ্কৃত হয়। তিনি প্রত্যক্ষ করেন: ‘আসমুদ্র হিমাচল হাঁটছেন আর্য-অনার্য-কাপালিক-শূদ্র… নদীতে পানকৌড়ি, নৌকায় সাপিনী বেদেনী। যে মহানাগ তার ত্রিভঙ্গ মুদ্রায় ধারণ করেছেন এই মহাবিশ্ব, তার সামনে নতজানু উড়ালডানার শীতবসন্তগ্রীষ্ম’। বর্ষা কাঁদে অঝোরধারায়, দুর্গতিনাশিনী থমকে দাঁড়ায় ভুবনমুদ্রায়। দরিয়ানগরে মানুষের বাঁচার জন্য নিত্য সংগ্রাম। যদিও একে অপরের সঙ্গে দেখা হয়, তবু তারা একা। কোনো বিবাদ নেই। একাকী জীবনে তারা খুঁজে নেয় নিজস্ব শান্তি। কবির উচ্চারণ: ‘ওম শান্তি, ত্রিভুবন অদ্যপি জড়িয়ে পড়েনি বৈশ্বিক বিবাদে।’

কবি জানেন দক্ষিণপূর্ব বাংলার সমুদ্র উপকূলে আদিকাল থেকে ছিল উপজাতিদের বাস। সবুজ পাহাড়ি প্রকৃতির মধ্যে তাদের অকৃত্রিম জীবনযাপন। কবি তাদের বিস্মৃত হন না। তাদের নামে গাথা রচনা করেন। কেমন করে আসল তারা? কেমন করে পাহাড় ফুলেফলে ভরে উঠল? কবি সমুদ্রকন্যা লুসাইবালার গল্প শোনান। স্নানশুদ্ধ হয়ে সে হলুদ ফুলের দেশ দূর পেনোয়ারে যাত্রা করে। দরিয়া তাকে ডাকে, কদলিবৃক্ষে তার পা থেমে যায়। তাকে ডাকে ইলিশ, রূপচাঁদা, কোরাল, হাঙর, চিংড়ি, বোয়াল, লবণের মাঠ ও পাহাড়ি শাল। মাছরাঙার মাধ্যমে লুসাইবালার বুকে বীর্যবীজ উপ্ত হয়। সকলেই ভুলে যায় তার কথা। যেমন দুষ্মন্ত একদিন ভুলে যায় শকুন্তলার কথা। ‘ভোলে না কিছুই কিন্তু গিরিরং মুরং রমণী। গর্ভে তার তড়পায় ধুকপুক বাড়ন্ত ধমনী।’

নিমীলিত নয়নে কবি ধ্যানমগ্ন। আবার দুর্যোগের ঘনঘটা। ‘উড়ন্ত বালির কণা দীর্ঘতম সূতা হয়ে পাক খায় দৃষ্টিসীমানায়।’ বাতাসের তোড়ে তার ধ্যান টুটে যায়। তিনি প্রমাদ গোনেন, ছুটে যান মৃত্যুর চোখ ফাঁকি দেওয়া সেই গল্পবুড়ির কাছে। অনন্তের জরায়ু ছিঁড়ে দরিয়ার ঔরস থেকে বেরিয়ে আসা অলৌকিক সূতা ঘুরে ঘুরে বাড়ে বুড়ির চরকায়। লালকাঁকড়া আর গাঙচিল ছোটাছুটি করতে থাকে। বুড়ি ত্রিভুবন সাক্ষী মেনে দক্ষিণপশ্চিম পানে হাতে বাড়ায়। কিন্তু হায় সে তখন দৃষ্টিহীন। নোনাজলে তার চোখ ভেসে গেছে। সে অস্ফূট মন্ত্র পড়ে, খোয়াজ খিজিরের জপগান গায়। মন্দিরে উলুধ্বনি, মসজিদে আজান এবং কিয়াংচূড়ায় বুদ্ধের শরণধ্বনি ওঠে। সবাই দৌড়ে পালায়, একমাত্র সমুদ্র ছাড়া। ‘আকাশে বাগিয়ে ডানা এ দরিয়া যায় না সরিয়া। বুকে তার জলজন্ম, বুকে তার গিরিদরী, মাৎস্যন্যায়, মনুষ্যবসতি।’ গল্পবুড়িকে নিয়ে প্রহেলিকা আরও ঘনীভূত হয়: ‘বুড়ি ফের যৌবনে ফেরে ঘোর লাস্যবতী।’ এবং ‘বুড়ির সিনায় বাড়ে দরিয়ার ডানা হরদম।’

কবির দরিয়াপ্রত্যয় সীমাহীন। তিনি সমুদ্রকে চেনেন অন্তরে-বাহিরে, অনন্তকাল ধরে। ‘হু হু বাতাসের পাশে এখানে আকাশ আছে চিরদুখি চিরসুখী, মুখ দেখে সমুদ্র দর্পণে / যে সমুদ্র জন্ম দেয় পুরাণের মৎস্যকন্যা, উন্মাতাল ঘুর্ণিঝড়ে, স্বমেহনে, স্বহর্ষ মন্থনে / সুন্দরের ভয়ঙ্কর রূপ দেখে স্বয়ং দরিয়ারাণী উর্বশীর নৃত্যে জাগে গগনে গগনে।’ সমুদ্রের সঙ্গে তার বন্ধন অদৃষ্ট-নির্ধারিত, চিরন্তন। সমুদ্রের সন্তান তিনি। তাই তিনি প্রহরী সেজে সমুদ্রকে রক্ষা করতে তৎপর। তিনি পাহারা দেন সমুদ্রবাতাসে ভেসে আসা মানুষের দীর্ঘশ্বাস। মেঘলা দিনে তার মন হিমছড়ি ঝরনাধারা, চোখ সজল সঘন। প্রহরীর গর্ব-শপথ:
দরিয়াপ্রহরী আমি, সূর্যোদয় সূর্যাস্তের আজ্ঞাবাহী দিগন্তপ্রহরী
দরিয়াপ্রহরী আমি, গর্জনের রাজসাক্ষী, ক্ষিপ্রতোয়া তরঙ্গপ্রহরী
দরিয়াপ্রহরী আমি, ঝাউডানা, দীর্ঘশ্বাস, বুকে বুকে ছায়ার প্রহরী।

মুহম্মদ নূরুল হুদা দরিয়ার কবি, নোনাবাংলা কাব্যভূমের একচ্ছত্র অধিপতি। তাঁর কবিতার দৃশ্যপট উপসাগরের জল-কাজলে আঁকা। তাঁর কবিতার সঙ্গী মাছধরা নৌকা, ডানামেলা টার্ন, লাল-নীল মেঘ, সাগরডিঙানো সূর্য। কবির আত্মবিবরণ: ‘আমার শ্রীঅঙ্গ জুড়ে লালকাঁকড়ার ত্রস্ত চলা, শিরোদেশে ঘাসরং পাতার মুকুট।’ সাগরতরঙ্গে কবির মুখ ভাসে। ভেসে ভেসে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করে। তিনি হয়ে ওঠেন পৃথিবীর কবি। সাগরজলেই কবিসত্তার জন্ম এবং বিস্তার। সাগরজলেই হয়ত তার নির্বাণ। সাগর ছাড়া কবির আলাদা অস্তিত্ব নেই। সাগর এবং কবিআত্মা শব্দার্থের মতো অবিচ্ছেদ্য। সাগর যেমন কবিকে অস্তিত্ববান রাখে, কবিও সাগর ও সাগরভূমি রক্ষায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ভূমিদস্যু ও ভূমিব্যবসায়ীর চোখরাঙানিতে তিনি ভীত নন। সাগরের সঙ্গে কবির একাত্মবোধ:
দরিয়ার পাশে বসে গুনছি দরিয়া
আমার আঙিনা থেকে কখনও সরিয়া
যাবে না সে সাফ কবলায়
যাবে না সে ভিন মহলায়
আমাকে সে করেছে দখল
আমি তাকে করেছি দখল
আমাদের দুজনেরই আছে দলবল
সবাই মরিয়া যাবে দরিয়া যাবে না
দরিয়া সকলি খাবে, কবিকে খাবে না।

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Mostafa Tofayel — অক্টোবর ২, ২০১৪ @ ১২:৩৯ পূর্বাহ্ন

      An awesome interpretation of a masterpiece poem,composed by Mohammad Nurul Huda, the representative poet of Bengali literature. Convinced by the use of jingling ornamentation and high-flown rhetoric of poet-critic Binoy Barmon, I have been sometimes deluded to compare the poem with Coleridge’s Rhyme of the ancient Mariner.
      But, that would have been an oversimplification in the name of critical appreciation. Nor should I compare the poem with Hemingway’s The Old Man And The Sea, because Hemingway has not made the use of mythology in his novel.So meaningful a poem it is that if it could have been translated in English with due cadence and propriety,it would have fetched glory to the talented poet and pride to the credit of our nation.Many thanks to Dr. Binoy Barmon for his bright attempt at discovering the golden treasury.

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com