মুহম্মদ নূরুল হুদা : দীপ্ত কণ্ঠের কবি

মোস্তফা তারিকুল আহসান | ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৪ ১:৪৯ অপরাহ্ন

huda-1.gifবাংলাদেশের এবং বাংলা ভাষার অন্যতম কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা; বাংলাদেশের সামগ্রিক কাব্যস্বরের সাথে তিনি অন্বিত হয়ে আছেন প্রগাঢ়ভাবে । একই সাথে কাব্য নিয়ে যে সকল আন্দোলন বা জাগরণমূলক কর্মকাণ্ড হয়ে থাকে এদেশে তার সঙ্গেও তিনি অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। তাঁর লেখালেখির জন্য তিনি গুরুত্বপূর্ণ সম্মাননা পেয়েছেন এবং আরো পাবেন ভবিষ্যতে তবে তাঁর লেখকসত্তার ভেতরে যে বৈভব রয়েছে, রচনাশৈলীর যে বৈচিত্র্য রয়েছে এবং বিশেষত কাব্যসিদ্ধির যে উচ্চস্থানে তিনি পৌঁছে গেছেন সেটা সবেচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের কাব্যধারায় পঞ্চাশ ও ষাট দশককে যেভাবে সব সমালোচক ও পাঠকের কাছে ব্যাপকভাবে আদৃত ও আলোচিত কিংবা তাৎপর্যবাহী ধারণা করা হয় সেভাবে সত্তর দশক ততটা গভীর বার্ত নিয়ে আমাদের সমানে হাজির হয়নি; সেটা প্রকরণ ও বিষয়ের তাৎপর্যের দিক থেকে অবশ্যই বিবেচিত। যদিও দশকওয়ারি এই আলোচনা-সমালেচনার মূল্য সব সময় বিবেচনায় না নিলেও চলে তবু এটা বাতিল করাও যায় না। যেমন, অনেকে বলেন আবুল হাসানের মতো কবি সত্তরে আমরা পাইনি। তাঁর ভাষাবোধ, শব্দ ব্যবহারের কৌশল এবং জীবনকে কবিতার সাথে মিলিয়ে দেবার গভীরজাত অনুভবঋদ্ধ পংক্তি আমাদের নাড়িয়ে দেয়, আমাদের মননে, আমাদের অনুভূতিতে নতুন নতুন দ্যোতনার জন্ম দেয় যা আগে কোন কবি আমাদের দিতে পারেন নি। এই জন্য হয়তো তিনি আলাদা। তবে তার অর্থ এই নয় যে সত্তর দশক আমাদের কাছে নিষ্প্রভ। বরং এই সময়ে অনেকে আছেন যারা সত্যিকার অর্থে বাংলা কবিতায় বা বাংলাদেশের কবিতায় নতুন কিছু যোগ করেছেন যার জন্য ইতিহাস তাদের মনে রাখব্ কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা তাদের মধ্যে অন্যতম।

কবি মুহ্হম্মদ নূরুল হুদাকে আমার প্রথম পড়ার সুযোগ হয় নব্বইয়ের প্রথম দিকে আর প্রথম কবিতা পড়ি ‘আমরা তামাটে জাতি’; আমরা সবাই মিলে কবিতাটি আবৃত্তি করতাম। নিজেরা কবি বলেই শুধু নয় এই কবিতা সাধারণ পাঠক হিসেবে সবার মাঝে আলোড়ন তুলেছিল। বলতে কোন দ্ধিধা নেই মুহম্মদ নূরুল হুদার এই জাতীয় উদ্দীপনামূলক কবিতার চরণে চরণে তাঁর প্রকৃত কবিসত্তা মিশে আছে। তাঁকে খুব বেশি রোমান্টিক আমার কখনো মনে হয়নি বরং মনে হয়েছে এই সমুদ্রমেখলার দেশে এই পললমাটির কালো কালো সোনামুখ মানুষের হৃদয়ের আর্তিকে তিনি ধরতে চেয়েছেন বরাবর। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা, প্রমিত বাংলাভাাষা এবং ইংরেজি ভাষার দক্ষতা নিয়ে আর বাংলা ভাষার প্রাণের অনুরণিত ধ্বনিমাধুর্য, ভাষিক জাতির গৌরব নিয়ে তিনি কবিতার কাছে সমর্পিত হতে চেয়েছিলেন। কবিতার প্রগাঢ় ডালপালা ও শিশিরের জগতে তিনি যুক্তি, বুদ্ধি, প্রজ্ঞা, স্বদেশ আর জাতীয় চেতনার উৎসরণ নিয়ে এসেছেন খুব সাবলীল আর সচেতনভাবে, এক ধরণের আনন্দঘন অথচ ঘনপিনদ্ধ ধ্রুপদী বাক্যবলয় তাঁকে পৃথক করেছে তাঁর সময়ের কবিদের থেকে। প্রবহমান সময় আর রাজনৈতিক সামাজিক নানা প্রপঞ্চকে তিনি ব্যবহার করেছেন নিজের মতো করে, তবে কবিতার গহন ঘণ নিবিড় মোহাচ্ছন্নতাকে দূরে যেতে দেননি কখনো, কাছে রেখেছেন জীবনের মানবিক বোধের আগুনপ্রতিমা। ভুলে যান নি কবিতার অমরাবতীকে, তাকে কাছে কাছে রেখেছেন যত্ন করে ,বড় করে তুলেছেন নিবিড় পরিচর্যা দিয়ে। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত তাঁর ধারাক্রম লক্ষ করলে তাঁর সচেতন প্রয়াস বোঝা যাবে; বোঝা যাবে সৃজনী প্রতিভা, মানবজীবন ও সমাজের সামূহিক বিষয়াদিকে কীভাবে মণ্ডনপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে কবিতার পংক্তিতে পরিণত করে তোলে। প্রথম দিকের একটি ছোট্ট কবিতা ‘শামুক’ থেকে উদ্ধৃতি দেয়া যাক; গুটিয়ে যাও গুটিয়ে গেলেই সুখ/রোদ-দুপুরে পুড়বে না আর বুক/ বুকের তলে হৃদয় নামক আঁখি/ টের পাবে না তীর-শিকারি পাখি/ গুটিয়ে যা্ও গুটিয়ে গেলেই ভালো/ গহন সুখে জ্বলবে জ্বলুক আলো’। ছোট্ট কবিতায় বেদনার বোধের পাশাপাশি বাঙালির জীবনের সতর্ক পদক্ষেপের কথা কবি বলতে চেয়েছেন শামুকের উপমায়। একই সময়ে অন্য একটি কবিতায় কবি লিখেছেন; ফুলের মতো ফোটার আগে আলো/ নীল শাড়িতে সোনার তনু ঢেকে/ সত্যাগ্রহ তুমিও আজ জানি নামলে এসে যাদুঘরের দ্বারে/—- গাঁয়ের পথে রুখু চুলের যুবা/ সচল ছবি স্তব্ধ করে হাতে/ রোদের ভারে তোমারো চোখ, ওকি,/ ঝিমিয়ে-পড়া যুগল প্রজাপতি!/ সবকিছুই ফুলের মতো ফোটে/ প্রজাপতির ওড়ে যুগল ডানা/ নীল আধারে নীরব দীপ জ্বলে/ সোনা গাঁয়ের সোনা তোরণ খোলা।’ আটোসাটো ছন্দের গাঁথুনিতে রোমান্টিক চেতনাকে স্থায়ী মননের ছাপে কবিতাটি মনে দাগ কেটে যায়। প্রেমের এক শাশ্বত প্রত্যয় ব্যক্ত হয়েছে প্রকৃতির উপমার সহায়তা নিয়ে আর উপযুক্ত ছন্দআবহে। এই হলো কবিতার শক্তি যার মৃত্যু হয় না, দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানেও কবিতা তার শক্তি সুষমা হারায় না। ক্লাসিক এক আবরণ এর গায়ে জড়িয়ে দেন কবি। তিনি যে ক্লাসিক পংক্তির সহজ এক উদগাতা সেটার জন্য তাঁর অজস্র কবিতা থেখে উদাহরণ দেয়া যাবে। আপাতত ‘ শোভাযাত্রা দ্রাবিড়ার প্রতি’ কবিতার কয়েকটি চরণের সাহায্য নিই; কে এক পাপিষ্ট যায় বিষাক্ত সংসার বেঁধে তার নগ্ন পায়/ ঐশ্বর্য গর্জে ওঠে উজ্জ্বল সকালে আর গোধূলির রক্তিম বিস্তারে/ দ্বিপ্রহরে ‘জীবন, জীবন’ স্বরে ফুটে ওঠে মানুষের দীঘল মিছিল/ তুমি কোথা গরিয়ষী নীরন্ধ্র প্রকোষ্ঠ একা জ্বেলে দাও দীপ!’ দীর্ঘ এই কবিতায় বাঙালির স্বাধীকার, উত্তরাধিকার ও জাতীয় জীবনের নানা সংকটের কথা এবং তার সাথে নিজের আত্মিক যোগকে নতুন ভাষ্যে উপস্থাপন করেছেন।
দ্রাবিড়া নামক নারীকে তিনি প্রতীকে পরিণত করেছন। তামাটে দ্রাবিড় জাতির কাছে কোন এক দ্রাবিড়াই তো উপযুক্ত আশ্রয়। কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা বাঙালির পুর্বপুরুষের ঐতিহ্যকে বিশেষ করে সাহিত্যিক ঐতিহ্যকে তার কবিতার অন্যতম উৎসভূমি হিসেবে বেছে নিয়েছেন। তিনি জানেন এবং বিশ্বাস করেন এটাই একজন বাঙালি কবির প্রধান উত্তরাধিকার। তবে তার অর্থ এই নয় যে তার কবিতার ভূগোল সংকীর্ণ। বরং দেশ জাতি রাষ্ট্র ইতিহাস সভ্যতা সমাজ বিশাল ক্যানভাসে তিনি মানবিক বোধের ছবি আঁকেন। বাংলাদেশের সীমানাও তিনি অতিক্রম করেন অনায়াসে। নিয়মিত ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তাঁকে নতুন ধারার বৈশ্বিক কবিতা সংকেত পেতে সাহায্য করেছে। ‘মানোয়া উপত্যকায় বৃষ্টি’ কবিতায় তিনি লিখেছেন, উইকেন্ডে উন্মাতাল হে আলোহা, তুমিও বেবাহা?/ হলি-ডে মার্কেট থেকে ওয়াইকিকি , সী-বীচ,বার/ মানোয়া উপত্যকায় বেড়ে ওঠা সবুজ ভার্সিটি/ সাদা- কালো-বাদামীর তীব্রচারী গাড়িদের সিটি/ হঠাৎ নীরব্ মুষলধারে শুধু কাঁদে হনলুলু/ ।

বাঙালির অন্যতম প্রাণভোমরা তার ভাষা। কবি মনে করেন এটা তার সবচে বড় উত্তরাধিকার। তিনি বাংলাদেশকে বাংলা ভাষার সাথে এক সূত্রে গাথতে চান। বাঙালি জাতীয়বাদের নতুন সংজ্ঞা তিনি দিতে চান বাংলা তাঁর মাতৃভাষাকে কেন্দ্র করে। বাংলার সব ঐতিহ্যকে বাংলাভাষার মর্মমূলে গ্রথিত করে তিনি এই প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি ‘বাঙালি’নামক দীর্ঘ কবিতার শেষে লেখেন; তুমি উড়ে যাচ্ছো স্বপ্ন থেকে বাস্তবতায়/ উচ্চতম গিরিশৃঙ্গ থেকে গভীরতম সমুদ্রদেশ; /বিবর্তনের স্রোতে সিদ্ধ, মনে রেখ,/ এই সত্য ভভিষ্য অশেষ/- যতদূর বাংলা ভাষা, ততদূর এই বাংলাদেশ।’
কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কবি; তিনি দিনে দিনে নিজেকে বিকশিত স্তরে নিয়ে গেছেন। উপন্যাস প্রবন্ধ অনুবাদ বা শিশু সাহিত্যে তাঁর ক্ষমতার পরিচয় তিনি দিয়েছেন। গবেষক হিসেবেও তাঁকে বিশেষজ্ঞ মহল স্বীকৃতি দিয়েছেন, তবে তিনি প্রধানত কবি। এবং তাঁর সম্ভাবনার সকল লক্ষণ তাঁর কবিতায় প্রগাঢ়ভাবে উপস্থিত। তাঁর সময়ে এবং তাঁর সমসাময়িক অন্য কবিদের থেকে তিনি নিজেকে স্বতন্ত্র মর্যাদায় উন্নীত করতে পেরেছেন । এখানে তাঁর ধারাবাহিক গভীর অনুশীলনজাত কাব্যপ্রয়াস তাঁকে সিদ্ধি দিয়েছে। স্বদেশ স্বজাতি মাতৃভাষা আর সব মানবিক বোধের পক্ষে তাঁর শক্ত অবস্থান। সেই অবস্থানকে তিনি সুদৃঢ় করেছেন কাব্যের নান্দনিক পথপরিক্রমণ দ্বারা। তিনি এ ব্যাপারে সচেতন ছিলেন বরাবর। বাংলাদেশের সামূহিক সমস্যা অন্যায় পদস্খলনকে তিনি তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছেন তবে তা কখনো কবিতার নন্দনকে অস্বীকার করেন নি।
ব্যক্তিগতভাবে এই কবিকে আমি কোলকাতায় প্রগতি সাহিত্য সংসদ কত্তৃর্ক আয়োজিত একটি সভায় প্রথম আবিষ্কার করি যেখানে তাঁকে সংবর্ধনা দেয়া হচ্ছিল। পরে জয়পুরে সার্ক রাইটার্স কনফারেন্সে তাঁর লেখা শুনি এবং তাঁর সাথে ভালোভাবে পরিচয় হয়। আজ কবির জন্মদিনে তাঁকে প্রাণভরে শুভেচ্ছা জানাই অন্য এক অনুজ কবির পক্ষ থেকে।

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com