অসম্পূর্ণ জীবনের দাসত্ব: জানা-বোঝার ভেতর-বাহির

ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী | ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৪ ৬:৫৫ অপরাহ্ন

zia_haider.jpgজিয়া হায়দার রহমান সম্প্রতি ৫৫৫ পৃষ্ঠার এক ঢাউস উপন্যাস লিখেছেন। নামটিও চমৎকার, প্রচ্ছদটিও – ইন দ্য লাইট অফ হোয়াট উই নো। উপন্যাসটি এক কথায় চমৎকার, যদি অবশ্য পুরোটা পড়ে শেষ করার ধৈর্য কারো থাকে। জিয়া হায়দার সেই প্রজন্মের বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত লেখক যাঁদের জন্ম বাংলাদেশে হলেও বাবা-মায়ের হাত ধরে বিদেশে থিতু হয়েছেন। সবচেয়ে বড় কথা, তাদের বিদ্যালয় জীবনটি বিদেশে রচিত হয়েছে। বিদ্যালয়ের ব্যাপারটা জরুরি, কেননা সেখানেই মানসভূমি রচিত হয়, সেখানে সারাজীবনের বন্ধুত্ব রচিত হয়। স্কুল-জীবনের বন্ধু বলে কথা! প্রবাসী সমাজের রীতিনীতি শেখার সর্বোত্তম স্থান হলো বিদ্যালয় – প্রাথমিক কিংবা মাধ্যমিক অথবা হাইস্কুল। প্রবাসী সমাজে টিকে থাকা, সেখানকার মানুষেরা কী নিয়ে আড্ডা দিতে পছন্দ করে, কেমন ভাবতে পছন্দ করে – এসবই স্কুল থেকে মানুষ শেখে। বিশ্ববিদ্যালয়েও মানুষ বন্ধু তৈরি করে, নতুন সমাজের আদব-কায়দা, রীতি-লেহাজ রপ্ত করে। কিন্তু বিদ্যালয়ে এটা ঘটে আরো গভীরে, আরো গহন অন্তরালে। বিদ্যালয়-জীবনের বন্ধুত্ব সারাজীবনের বন্ধুত্ব। যদি প্রবাসী সমাজের প্রধান ধারায় মিশে যেতে হয়, তাহলে সেখানকার স্কুলিং খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নয়ত পাঁচজন মানুষ একত্র হলে কী নিয়ে কথা বলবে সেটাও হাতড়াতে হয়। কাজেই জিয়া হায়দার সেদিক দিয়ে এগিয়ে।

তাঁর বিদ্যালয় জীবনটি বিলাতেই হয়েছে এবং ফলত সেইসব টুকরো ও গভীর অভিজ্ঞতাকে তিনি তাঁর উপন্যাসে ব্যবহার করেছেন। উপন্যাসের প্রোটাগনিস্ট জাফর অনেকখানি লেখকেরই আদল যেনবা – অলটার ইগো। সেও সিলেটে জন্মেছে, অতঃপর বাবামায়ের হাত ধরে বিলাত গমন করেছে। পাবলিক স্কুলে পড়েছে এবং পাবলিক-প্রাইভেট ও স্টেট স্কুল নিয়ে তার বিদ্রূপ ও আগ্রহের শেষ নেই। অবশ্য এটা ঐ চরিত্রের একটা বৈশিষ্ট্য। সে নিজে ঐ বিলেতী সমাজেরই পুঞ্জীভূত সঞ্চয়। কিন্তু ঐ সমাজের নানা অসঙ্গতি জাফর বলে যায় এমনভাবে যেন সে একজন আউটসাইডার। তবে আগন্তুকের এই দৃষ্টিভঙ্গিটি সে পেয়েছে এ কারণে যে তার জন্ম বিলেতের বাইরে, ঘরে সে সিলেটি ভাষায় কথা বলে এবং তার চামড়ার রঙটি বাদামী। ব্রাউন সাহেবদের মনের বিন্যাস বিখ্যাত সাহিত্যিক নাইপলের বিশেষত্ব। জিয়াও অনেকটা সেই পথ ধরেছেন। এবং এ কাজে তিনি অনেকখানি সার্থক তা বলতেই হবে। কাজেই তাকে যে নাইপলের উত্তরসূরী বলা হচ্ছে তা নিছক কথার কথা নয়।

জাফর যেসব কারণে আগন্তুকের মতো ভাবতে পারে, চিন্তাক্লিষ্ট ভঙ্গিতে দীর্ঘ ভূমিকা দিয়ে শুরু করতে পারে, তার বন্ধু, এই উপন্যাসের অনামা কথক, সেভাবে পারে না। এই কথক একজন পাকিস্তানী বংশোদ্ভূত যাঁর বাবা একজন পদার্থবিদ এবং মা একজন মনোবিদ। তার ছেলেবেলা কেটেছে প্রিন্সটনের মার্কিনি এলিট পাড়ায়। সে বাড়িতে ইংরেজিতে কথা বলে এবং তার পিতামহ সাবেক রাষ্ট্রদূত ও জাঁদরেল ব্যবসায়ী। নিউইয়র্কের পাকি-মার্কিনি সমাজে তার অঢেল প্রভাব। কথকের বাবা একজন ‘হাফ-মুসলিম’, শুক্কুরবারে জুমা নামাজ ভিন্ন আর কোনো ধার্মিকতা পালনে তাকে দেখা যায় না। দেদারসে হুইস্কি আর বেকন খান। এই উপন্যাসে এই দিকটা বারবার উঠে আসে – কথকের বাবার হুইস্কি পান, জাফর আর তার বন্ধুর অমুসলিম প্র্যাকটিস, পাকিস্তানে জাফরের আশ্রয়দাতার হুইস্কি পান। ক্ষমতাশীল পাকিস্তানীরা কেবলই হুইস্কি পানে ব্যস্ত। আর ধর্মের ব্যাপারটাও এখানে লেখক খুব পাশ কাটিয়ে এনেছেন:
a. My father’s faith, as I said, was a private affair, my mother abhorred Islam, and while I attended Anglican services at Eton, in the end I grew up like many, I think, without acquiring the taste for religion, organized or otherwise. [p.186]
জাফর স্পষ্টভাবে খ্রিষ্টপ্রেমী, একমাত্র তার দয়িতের দুবাই-আগমনের জন্য আকুল প্রতীক্ষারত অবস্থায় তাকে ফজরের আজানে হাঁটু গেড়ে নামাজের ভঙ্গিতে আত্মসমর্পণ করতে দেখা যায়। সেই ভঙ্গিল সময়ে ঈশ্বরই তার সর্বাপেক্ষা প্রিয় অবলম্বন। এছাড়া পাকিস্তান-বাংলাদেশ-আফগানিস্তানের এতো বিষয় এই উপন্যাসে এসেছে, কিন্তু এখানকার মুসলমানত্ব বেশ খানিকটা উপেক্ষিত। ধর্মকে আইডেন্টিটি হিসেবে ব্যবহার করা প্রবাসী দক্ষিণ-এশিয়দের একটা প্রধান উপসর্গ। সেখানে দ্বিতীয় প্রজন্মের বাসিন্দা হিসেবে জাফরকে বা কথককে প্যান-ইসলামিক রাজনীতির কোনো কিছুই স্পর্শ করে না। এটা বিস্ময়ের এ কারণে যে ৯/১১-পরবর্তী তাদের জীবন যেভাবে পরিবর্তিত হয়েছে বলে তারা কথোপকথনে স্বীকার করেছে সেখানে দক্ষিণ-এশীয় অভিবাসী সমাজে এইভাবে আউটসাইডার হিসেবে কীভাবে তারা থাকতে পারল সেটা ঠিক বোঝা গেল না। হয়ত এমন যে তারা দক্ষিণ-এশীয় অভিবাসীদের থেকে সম্পূর্ণ উন্মূলিত, তাদের মূল বদলে গেছে, অভিন্ন দক্ষিণ-এশীয় আইডেন্টিটি তাদের আর দরকার পড়ে না। তারা ইটন-হ্যারো-অক্সফোর্ড পড়ুয়ার দল এক নিজস্ব আলাদা সত্তা তৈরি করে নিয়েছে। পুরো পৃথিবী জুড়ে ৯/১১ নিয়ে ধর্মভিত্তিক যে প্রকোষ্ঠকরণের প্রচ্ছন্ন ধারা শুরু হয়েছে, এবং বিপরীতক্রমে আধুনিক মানুষকে এখন প্রতিনিয়ত জঙ্গিবাদের প্রতিরোধে আলাদা সিকিউরিটির মুখোমুখি হতে হচ্ছে সেটা যেন জাফরদের জগতে কোনো বিষয়ই নয়।
জাফর তার প্রেমিকা এমিলি হ্যাম্পটন-উইভার্নকে একইসাথে ভালোবাসে এবং ভালোবাসে না। জীবনানন্দের সুবিনয় মুস্তফীর মতো – একইসাথে বেড়ালকে এবং বেড়ালের মুখে ধরা ইঁদুরকে সে ছুঁয়ে যায়। এমিলি সম্পর্কে বিভিন্ন সময়ে জাফরের মন্তব্য থেকে কয়েকটি তুলে দিচ্ছি:
b. You ask if I loved her, and I tell you I did and I didn’t. [p.476]
c. … a woman who had all the blessings of life, who had been born to wealth and privilege, had gone to the finest schools in the world, a tall and slender lady possessed of a sufficient beauty and the quietly confident charm of upper-class women. Beside her, others seemed shrill.
d. Emily was such a shifty thing, so secretive and unforthcoming, that I had to find my own sneaky ways of eliciting information from her. [p.456]
e. She had men falling about her like fruit from a tree, no, from an orchard of trees, an orchard in an earthquake, all there for picking her. [p.420]
এমিলির পদবী তাকে আকৃষ্ট করে। তার পরিবার তাকে কৌতূহলী করে। এমিলি তাকে কখনোই ‘দুঃখিত’ বলেনি এটা যেমন সত্য, এমিলির বন্ধুদের সামনে নিয়ে যেতে এমিলির কুণ্ঠাও সত্য, আবার তার কাছে ফিরে আসতে চাওয়ার আকুতিও সত্য। কিন্তু জাফরের প্রেম ঠিক বুনো নয়, আবার তার উপরে ঠিক আস্থাও রাখা যায় না। জাফর প্রকৃতপক্ষে একজন সোশাল ক্লাইম্বার, সে ভালো স্কুলে পড়ার চেষ্টা করে, তার মেধা দারুন ঝরঝরে, তার প্রভাবশালী বন্ধু আছে, সে বিলেতের অভিজাত সমাজে প্রেম করে এবং সেই সমাজে মিশতে ইচ্ছুক। কিন্তু একই সাথে সে দারুণ দার্শনিক এবং গণিতে পড়ালেখা তাকে ভীষণ অ্যানালিটিকাল করে তোলে। এ প্রসঙ্গে জাফরের বন্ধু, উপন্যাসের কথকের একটি মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য। প্রিন্সটনের এলিট সমাজের বাচ্চারা যে স্কুলে পড়ে, সেখানেই সে ভর্তি হয়। এই স্কুলের বাচ্চাদের বাবামায়েরা কীরকম প্রভাবশালী সেটা বোঝাতে সে একটি ঘটনার কথা বলে। কোনো এক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের অর্থনীতির উপদেষ্টা বোর্ডের দুজন সদস্যই ঐ স্কুলের ছাত্র ছিল। একটি বড় দেশের একটিমাত্র পাবলিক স্কুল থেকে দুজন সদস্য ইকোনমিক অ্যাডভাইজার হওয়া একটা বড়রকমের কাকতাল। প্রভাবশালী পিতা-মাতা, তাদের প্রভাবশালী বন্ধু-বান্ধব ও তাদের মধ্যকার ভ্রাতৃত্ববোধ বা ফ্র্যাটার্নিটি ছাড়া শুধু নিয়তি দিয়ে এই ঘটনার ব্যাখ্যা মেলে না। একেই বলে স্কুলিং!
গণিত ও পদার্থবিজ্ঞান এই উপন্যাসে ঘুরেফিরে আসে। উপন্যাসের প্রোটাগনিস্ট গণিতের স্নাতক, অতঃপর ব্যাঙ্কার, অতঃপর আইনজীবী, অতঃপর বাংলাদেশে কর্পোরেট বনাম সরকারী আইনী লড়াইয়ের মহার্ঘ্য পরামর্শদাতা। বাংলাদেশে উন্নয়ন খাতে একটু বিদেশী ডিগ্রির সুঘ্রাণ থাকলে বড় সুবিধে হয়। ফলে একজন ডঃ হাসান কবিরের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সুবিধে হয় জাফরের। এই হাসান কবিরকে আঁকা হয়েছে আমাদের পরিচিত ডঃ কামাল হোসেনের আদলে। দেখা যায় হাসান কবিরও এদেশের সংবিধান প্রণেতাদের অন্যতম:
f. Of the eight or so who put their pens to the document [of Bangladeshi constitution], all but Kabir were to perish over the years in coups and assassinations. Wit and cunning, they say. [p.248]
হাসান কবিরের নির্দেশে এবং এমিলির পত্র-আহবানের সুবাদে জাফর পাড়ি জমায় ৯/১১-পরবর্তী আফগানিস্থানে যেখানে যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশের উন্নয়ন-এক্সপেরিমেন্ট চলছে পুরোদমে। এখানে জাফর ব্যঙ্গ করতে ছাড়ে না যে বড় মানুষের অনুরোধ আসলে ছদ্মবেশী আদেশ। Influential people seem to think that helping them would be an honour [p.249] — হাসান কবিরের ইমেইলের সাপেক্ষে জাফর এই উক্তি করে। যাহোক ঢাকা থেকে দুবাই হয়ে ইসলামাবাদ যেতে হয় জাফরকে। এখানে কাকতালীয়ভাবে পরিচয় হয় পাক-আর্মির অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল মুশতাকের সাথে। কর্নেল সাহেব তাকে অপত্য স্নেহ দেখায়, বলতে দ্বিধা করে না: “I should have liked a son like you.” [p.363]। কর্নেল সাহেব দাবা খেলেন, বড় বড় জেনারেলদের ডিনারে হুইস্কি খাওয়ান এবং খুব সম্ভবত পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থার সাথে কাজ করেন। কাবুলে এক দারুন থ্রিলিং মুহুর্তে তার গোপন কাজের ছাপ পাওয়া যায়। এ সংক্রান্ত কড়া প্রশ্নের জবাবে কর্নেল সাহেব জাফরকে একটা গভীর খেলার ইঙ্গিত দেন, যে খেলায় যেকোনো দেশের সাধারণ মানুষ – তা সে মার্কিনীই হোক, বা হোক আফগানী – প্রকৃতপক্ষে কোনো গণনায় ধরা হয় না। অবলীলায় মানুষ বধ চলতে থাকে – সেখানে আইএসআই তার নিজের স্বার্থ দেখে, মার্কিনীরা তাদের নিজেজেদের স্বার্থ দেখে, তালেবান দেখে তাদেরটা। মধ্যিখানে ক্রসফায়ারে সাধারণ মানুষ! মধ্য এশিয়া নিয়ে এই দাবার গুটি চালাচালিই চলছে:
g. In the mess of Central Asia there are as many sides as there are opportunities to steal a march. There are no sides to tell us who is doing what, for whom, and why. There are only exegensis, strategies, short-term objectives, at the level of governments, regions, clans, families, and individuals …No sides. …After all [we know that] good people do bad things, that friends will hurt you, and that everyone is from first to last on his own side. [p.537]
ওমর খৈয়াম যেমন বলেছেন:
ঘুটি চলেফেরে অপরের হাতে দক্ষিণে আর বামে
যেমন চালায় খেলোয়াড় তাকে চলে সে অথবা থামে।

মূলত দাবাকে এখানে লেখক চমৎকার রূপকাকারে নিয়ে এসেছেন। পুরো যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা আর তারপর উন্নয়নের নামে পশ্চিমী খ্যামটা নাচ। এই অশ্লীল নাচের অংশ হলো ল্যান্ড-রোভার গাড়ি – যেখানেই উন্নয়ন সেখানেই ল্যান্ড-রোভার। পশ্চিমের উন্নয়ন-শিল্পীরা ল্যান্ড-রোভার ছাড়া যেন উন্নয়ন বোঝেনই না। লেখক এখানে এই বিশেষ শকটটি নিয়ে যথার্থ বিদ্রূপ করতে পিছুপা হননি।
আগেই বলেছি, গণিত এই বইতে এসেছে কেন্দ্রীয় রূপকের আশ্রয়ে। কুর্ট গোডেলের অসম্পূর্ণতার উপপাদ্যটিকে লেখক এখানে নানাভাবে এনেছেন এবং দেখাতে চেয়েছেন আমাদের জানার অসম্পূর্ণতা কীভাবে প্রচ্ছন্নে রয়েই যায়। গোডেলের উপপাদ্য বলে– যেকোনো ফরমাল সিস্টেমে এমন কিছু সত্য প্রস্তাবনা থাকে যাদেরকে ঐ ফরমাল সিস্টেমের মধ্যে থেকে প্রমাণও করা যায় না আবার অপ্রমাণও করা যায় না। ফলে সকল এবং যেকোনো ফরমাল সিস্টেমই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। যেমন ইউক্লিডিয় জ্যামিতি পাঁচটি স্বীকার্য আর কিছু স্বতঃসিদ্ধ নিয়ে তরতর করে গড়ে উঠেছে। সামান্য কিছু সত্য স্বতঃসিদ্ধ থেকে আমরা একের পর এক উপপাদ্য প্রমাণ করে যেতে পারি। কিন্তু এখানেই আছে পঞ্চম স্বীকার্য যাকে ইউক্লিডিয় সিস্টেমের ভেতর থেকে প্রমাণ করা যায় না। আর পঞ্চম স্বীকার্যকে অস্বীকার করলে অ-ইউক্লিডিয় জ্যামিতির প্রসার ঘটে। বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, ইউক্লিডিয় সিস্টেম কেবল সমতল স্থানে প্রযোজ্য। অসমতল বা বক্রস্থানে পঞ্চম স্বীকার্যটি সঠিক নয় এবং এভাবে রিমানিয় জ্যামিতি কিংবা মিনকোস্কির জ্যামিতি দৃশ্যপটে চলে আসে। গোডেলের এই থিওরেম তাই বলছে যে, সকল সিস্টেমই অসম্পূর্ণ থাকে যতোই তাকে নিখুঁত করা হোক না কেন। ১৯৩০-এর দশকের এই উপপাদ্য গণিত ও বিজ্ঞানের দর্শনে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। এসব কথা এ উপন্যাসেও এসেছে অত্যন্ত চমৎকারভাবে। এমনভাবে এসেছে যাতে উপন্যাসকে বিজ্ঞান-লেখনীর মতো না করেও বিজ্ঞানের সঠিক নির্যাস আর্টের ভাষায় জীবন-দর্শনের ছদ্মবেশে ফুটে উঠেছে। এখানে লেখকের মুন্সিয়ানার প্রশংসা করতে হয়। গোডেল উপপাদ্য নিয়ে উপন্যাসের দুটি উক্তি এখানে তুলে ধরছি জাফরের কথনে, পাঠক ইঙ্গিতটা ধরতে পারবেন –
h. … time after time, the time and again, because I wished it, and because mathematics remains a refuge, I thought of Godel’s Incompleteness Theorem, a theorem so enchanting and disturbing, like love, a theorem that illuminates itself all the while it casts a shadow over mathematics, the queen of the sciences, the queen because she stands aloof, so resolutely disavowing the methods of sciences, so unstintingly disparaging of what we feel, what we touch, what we taste. [p.495]
i. Remember Godel’s Incompleteness Theorem, which tells us truth is not there always to be found and that we cannot know ahead of the search whether the truth itself is of a kind that can be uncovered. [p.545]
এছাড়াও বিজ্ঞান বিষয়ে দুটো উদ্ধৃতি দিলে বোঝা যাবে লেখক কীভাবে বিজ্ঞান আর উপন্যাসের আর্টফর্মকে সুচারুভাবে মিলিয়ে দিয়েছেন, সার্থক বিজ্ঞান-লেখনী এবং সার্থক ন্যারেটিভ:
j. If the province of science is how?, continued Zafar, then the rigor of life, the predicament of living in the world, is contained in the question why? Wittgenstein said that when all the questions of science have been answered, all the problems of life will still remain. That may be, but it is equally true that when all the work of art is finished, when we have been blinded by every metaphor under the sun, not one question of how? or why? will have been touched. [p.320-21]
k. We know or we believe that as well as taking the form of a wave, light has a quantum form of discrete packets. And, defying intuition, these two forms exist together, at the same time, if they exist at all. It is the simultaneity of the opposites in one that pleases me, the coterminous existence of contradicting states. … I am reminded of what Einstein said on the death of his friend: He has departed from this strange world a little ahead of me. That means nothing. For us believing physicists, the distinction between past, present and future is only a stubborn illusion. [p.466]
প্রকৃতপক্ষে লেখক জিয়া হায়দার নিজেও অক্সফোর্ডে গণিতের স্নাতক, তাঁর প্রোটাগোনিস্ট এবং তদীয় বন্ধুর পিতাও একজন পার্টিক্‌ল ফিজিসিস্ট হিসেবে উপন্যাসে চিত্রিত হয়েছে। কাজেই উপন্যাসে বিজ্ঞান আসা স্বাভাবিক। গোডেলে উপপাদ্যের মূলসার যে অসম্পূর্ণতা সেটা আমাদের আধুনিক পাসপোর্ট-সর্বস্ব বহুজাগতিক মাল্টিকালচারাল মানুষের জীবনকে কীভাবে ছন্দিত করে সেটাও ভাবার বিষয়। আর একইসূত্রে উপন্যাসের নামটিও মাথায় অনুরণন তোলে, তাইতো “যদ্দূর জানা যায়” – ইন দ্য লাইট অফ হোয়াট উই নো – জানার সীমা তো অসীম নয়, সেখানে অসম্পূর্ণতার কাঁটা স্বর্গোদ্যানে সাপের মতো বিচরণ করে! উপন্যাসটির শেষে আছে গোডেল এবং আইনস্টাইনের সেই দূরাগত ছবি। দূরে দেখা যাচ্ছে, দুই তদ্‌গত অধ্যাপক হেঁটে যাচ্ছেন, তাঁদেরকে পেছনে থেকে দেখা যাচ্ছে। বামের জন গোডেল, ডানের জন আইনস্টাইন। গভীর চিন্তালাপে মগ্ন দুই মৈনাক! এক অসাধারণ একুশ-শতকীয় উপন্যাসের এক অভূতপূর্ব গাণিতিক সমাপয়েৎ!
উপন্যাসটিতে বিজ্ঞানের কিছু চিত্রও ব্যবহৃত হয়েছে। এখানে মার্কেটর প্রোজেকশনে পৃথিবীর মানচিত্রে কোনো কোনো দেশকে মাত্রাতিরিক্ত বড় আবার অন্যান্য দেশকে ছোট কেন দেখায় সেই সম্পর্কে চিত্রসহ ব্যাখ্যা উপস্থিত! লেখকের মন্তব্য :
l. But the point of all this is that all these representations or translations begin from needs. Consequently, the loss of information and understanding that every act of representation involves is the effect of an act of destruction that serves a need. We might appear to have taken a step forward, but in fact we took one step back and two steps forward. Every time we want to understand anything, we have to simplify and reduce and, importantly, give up the prospect of understanding it all, in order to clear the way to understanding something at all. This, I think, is true of all human inquiry. [p.25, footnote]
এইভাবে প্রতিরূপ ব্যবহারের ফলে আমাদের বোধ কীভাবে বাধাগ্রস্ত হয়, অথচ মূল উদ্দেশ্য যেখানে ছিল বোধগম্যতার উৎসার, তা নিয়ে জাফরের দার্শনিক আবিলতা লক্ষণীয়। মানুষের সকল জ্ঞানতৃষ্ণার মূলে রিপ্রেজেন্টেশন বা প্রতিরূপ ব্যবহারের এই নিষ্ফলতা আবারো গোডেলের উপপাদ্যের দিকে পাঠককে ধাবিত করে। আরেক জায়গায় আরেকটি ছবি লেখক ব্যবহার করেছেন আলোকীয় বিভ্রম বোঝাতে। আপাতভাবে যেটা দেখা যায়, অর্থাৎ আমাদের ইন্দ্রিয়সমূহ আমাদের যে তথ্য দেয় সেটা প্রায়শই ধোঁকা দিতে পারে বা প্রবঞ্চক হতে পারে। ড্যানিয়েল কাইনম্যান এই নিয়ে দারুন এক বই লিখেছেন –‘থিঙ্কিং ফাস্ট অ্যান্ড স্লো’ – এই উপন্যাসেও তাঁর আইডিয়াকে ব্যবহৃত হতে দেখি, তাঁর সম্পর্কে আলোচনায় আসে। এই প্রসঙ্গে লেখকের মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য: Illusions of the senses tell us the truth about perception. [p.206]।
বিজ্ঞানের ছবি সম্বলিত উপন্যাসের কথা এখন থেকে আমাদের আর বিস্মিত করবে না, সে বিষয়ে জিয়া হায়দার আমাদের আশ্বস্ত করেন। আমাদের মতো বিজ্ঞান-লেখকদের জন্য এটা দারুণ আশার কথা এবং আমাদের জন্যও শিক্ষণীয়ও বটে। তবে বিজ্ঞানের আর্টিস্টিক কচকচানি থাকা সত্ত্বেও তাকে কচকচানি বলে মনেই হয় না, এতোই চমৎকার লেখকের লেখন-শৈলী। দারুনভাবে প্রবাহিত হয় উপন্যাসের বয়ান। নদীর স্রোতের মতো, একবার ধরলে তরতরিয়ে অনেকখানি এগিয়ে যাওয়া যায়। গদ্যধারা একেবারেই ভারাক্রান্ত নয়। তবে মাঝেসাঝে ক্লান্তি আসে অহেতুক প্লটের বিস্তারে, পাঠক বিরক্ত হবেন। শ্রদ্ধেয় কাফকা-অনুবাদক মাসরুর আরেফিন যেমন বলেন, বয়ানের বাহুল্য বিরক্তি উদ্রেক করে, তিনি এডিটর হলে ঘসঘস করে কেটে উপন্যাসটিকে একটি স্লিম বই করে দিতেন! সত্যিই তো, আলেসান্দ্রো ইয়াকোবনির কাহিনি এই উপন্যাসে কী করছে কিছুই বোঝা গেল না। খামোখা পৃষ্ঠা ভর্তি কি উপন্যাসে ক্লাসিক গুণ আনয়ন করে? যাহোক, সকল
শক্তিমত্তা ও সাফল্য সত্বেও এই উপন্যাসটি একটি বৃহৎ পটভূমির সমকালীন জগতের আধুনিক মানব-মানবীর উপাখ্যান হতে পারে, কিন্তু ঠিক ক্লাসিক উপন্যাস নয়। না, চিরকালীনতার গভীরতা অন্তত এই উপন্যাসে পাওয়া যায় না। তবে লেখকের সেই গভীরতা এবং ক্ষমতা আছে সেটা মানতেই হয়। তিনি পারবেন।

জাফর তার বন্ধুর বাসায় আচানক এক সেপ্টেম্বর ২০০৮-এ এসে ওঠে। বন্ধু তাকে চিনতেই পারেনি। আগন্তুকের নিখুঁত বর্ণনা দিয়ে উপন্যাসের শুরু। জাফর তার বন্ধুকে শোনায় এতোদিন সে কোথায় ছিল, কী করেছিল, কেমন ছিল। দুই বন্ধুরই মধ্যজীবনের সংকট শুরু হয়ে গিয়েছে। ব্যাঙ্ক খাতে বিপর্যয়ের ফলে দুজনেই টালমাতাল, সেইসাথে ৯/১১-এর ঘটনাবলিও কম প্রভাব ফেলেনি জাফরের জীবনে। তার প্রেমিকা এমিলির সাথে তার যৌথজীবনের ভাঙ্গাগড়াও যেন নিয়ন্ত্রণ করেছে ঐ ৯/১১-এর ঘটনা। জাফর বলে, “Emily and I were all but finished, a final finish subverted by 9/11 breaking open the ambiguous days at the end of an affair.” [p.476] তিন মাস জাফর কাটায় তার বন্ধুর বাড়িতে। আবারো আচানক এক ফেব্রুয়ারি দিনে ২০০৯-এ সে চলে যায় তার জীবনের সন্ধানে। কথকের বাড়িতে জাফরের আগমন এবং বিদ্যা – দুটোই চমৎকার বর্ণনা করেছেন লেখক, একদম পুরো দৃশ্যপট যেন চোখের সামনে ফুটে ওঠে। নিজেই পড়ে দেখুন সে বর্ণনা:
m. … a brown-skinned man, haggard and gaunt, the ridges of his cheekbones set above an unkempt beard. He was in his late forties or early fifties, I thought, and stood at six foot or so about an inch shorter than me. He wore a Berghaus jacket whose velcro straps hung about unclasped and whose sleeves stopped short of his wrists, revealing a strip of paler skin above his right hand where he might once have worn a watch. His weathered hiking boots were fastened with unmatching laces, and from the bulging pockets of his cargo pants the edges of unidentifiable objects peeked out. He wore a small backpack, and a canvas duffel bag rested in one end against the doorway. [p.1-2]
n. In the first daylight hour of a morning in February 2009, as I lay awake after a restless night and Kensington lay still asleep, I heard the low and heavy sound of the front door closing. With my one ear against the pillow, my other followed the metronome of steps outside. I did not run downstairs or even go to the window to call out, for I already knew that this is what would happen and I already understood that no response from me is what he would want. [-p.549]
তার গল্পে জাফর বলে সিলেটের কথা, বিলেতে স্কুল-ইউনিভার্সিটির কথা, এমিলির সাথে তার প্রেম/বিচ্ছেদ/আবারো-প্রেমের কথা। আফগানিস্তান ও বাংলাদেশের কথা। নানান দর্শন আর জীবনের গল্প। সবচেয়ে তীর্যকভাবে সে বলে বিলেতী এলিট সমাজের নানা অসঙ্গতির কথা। তার ডিপ্রেশন অ্যাটাকের কথা, হাসপাতাল বাসের কথা, এমিলির সন্তান-ধারণ এবং তার মেডিকেল অ্যাবোর্শনের কথা, এমিলির বিশ্বাসহীনতার কথা। জাফর এক অদ্ভূত সন্ধ্যায় অংক কষে বের করে ফেলে যে এমিলির গর্ভস্থ শিশুটি তার ঔরসজাত নয়। এমনকি তার হাসপাতাল শয্যার দ্বিতীয় সপ্তাহে যে তার গর্ভসঞ্চার হয়ে থাকতে পারে সেটাও সে বের করে ফেলে LMP-সংক্রান্ত সাধারণ অঙ্ক কষে। এই ভীষণ সঙ্কটকালেও জাফরকে তার বন্ধু, উপন্যাসের কথক, দেখতে যায়নি। এদিকে এমিলি জাফরকে একবার কাছে টেনে নেয়, আবার দূরে সরে যায়, আবার আসে আর কাবুলের এক দুর্দান্ত ঘটনায় আবারো দূরে সরে যায়। এই বন্ধন-বিচ্ছেদের গল্পও এই উপন্যাসের প্লটের অংশ। খুব আশ্চর্য শোনায় যে, একাদিক্রমে তিন বছর জাফর তার পিতামাতার সাথে ফোনালাপটাও করেনি! এত অবজ্ঞা! এরই ফাঁকে ফাঁকে চলে কথকের পাকিস্তানি পটভূমির কিছু আলোচনা। লক্ষণীয়, দুজনেরই কথার ঢং কাছাকাছি। তবে জাফরের স্টাইলটা একটু নজরকাড়া – দূরাগত আগন্তুকের ভাষ্যের মতো শোনায়। জাফরের আচরণও ঠিক তেমনই – … that faraway look he sometimes had, evidence of a mind considering its memories, perhaps considering what to say, and I felt no urge to breach the silence stretching out over us. [p.547]। যেন সবকিছুতে সে তৃতীয়পক্ষ, যেন উঁচু থেকে সবকিছু দেখছে। গণিত কি তাকে এই উচ্চতা দিয়েছে? নাকি জীবনের অভিজ্ঞতা?
উপন্যাসের প্রতিটি অধ্যায়ের শুরু হয়েছে অন্তত একটি এপিগ্রাফ দিয়ে। কোনো-না-কোনো লেখকের বিরাট বিরাট উক্তি। উপন্যাসের ন্যারেটিভের স্টাইলের সাথে এই এপিগ্রাফগুলোও চমৎকার মানিয়ে যায়। এটা খুব লক্ষণীয়। সেই দূরাগত দৃষ্টিভঙ্গী, একটা ড্রন-আউট স্টাইল, ভাষ্যের মতো শোনায়। জিয়া হায়দার তাঁর এক আলাপচারিতায় বলেছেন যে, এই এপিগ্রাফগুলো উপন্যাসের অবিভাজ্য অঙ্গ। ওগুলো জাফরের কথনকে আরেকটু বারিয়ে দেয়, সূত্র ধরিয়ে দেয়। মাঝেমাঝে জাফরের কথায় ফুটনোট দিয়ে কথক কিছু প্রাসঙ্গিক তথ্যও জানিয়ে দেয়। ফলে পাঠকের ধরতাইয়ে সুবিধে হয়। এমনই এক ফুটনোটে একাত্তরের জামালপুর রণাঙ্গনের এক পাকিস্তানি লেফটেন্যান্ট-কর্নেল সুলতান আহমেদের সাথে ভারতীয় আর্মির ব্রিগেডিয়ার ক্লেরের এক চমকানো চিঠির বয়ান পাই, সিদ্দিক সালিক এই চিঠির কথা তাঁর বই ‘উইটনেস টু সারেন্ডারে’ও লিখেছেন:
o. “Dear Brig, Hope this finds you in high spirits. Your letter asking us to surrender has been received. I want to tell you that the fighting you have seen so far is very little, in fact the fighting has not even started. So let us stop negotiating and start the fight. … Give my love to the Muktis. Let me see you with a sten in your hand next time instead of the pen you seem to have such mastery over, Now get on and fight.” [p.221, footnote]
এই প্রসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের কথা চলে আসে। পুরো বইয়ে সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গীতে মুক্তিযুদ্ধের প্রমিত বয়ান আমরা পাই। আমরা জানতে পারি, উপন্যাসের কথক জাফরের বন্ধুর বাবা পাকিস্তানি বুদ্ধিজীবী হিসেবে ১৯৭১-এ পাকিস্তানি কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে থাকায় পাকিস্তানি এলিট সমাজে তারা অনেকটা একঘরে হয়ে ছিল। বিভিন্ন এপিগ্রাফ ও ফুটনোটে আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সপক্ষের বয়ান পাই, একটি এপিগ্রাফ খুবই উল্লেখযোগ্য: “I can remember at one official function [in West Pakistan] where there was a group of women, wives of members of the elite, and I overheard one laughing to the others, “What does it matter if women of Bengal are being raped by our soldiers? At least the next generation of Bengalis will be better looking.” That was the attitude you found here in 1971, and it is still hear today.” Quoting Patrick French [epigraph of Ch. 14, p.342] । বন্ধুর বাবার সাথে কথোপকথনে জাফর মুক্তিযুদ্ধে হতাহতের সংখ্যা ভিন্নতা সম্পর্কে বয়ান-ভিন্নতার সুর তুললেও (পৃষ্ঠা ২১৯), কর্নেলের সাথে আলাপচারিতায় যখন এক পাকি-জেনারেল কথা প্রসঙ্গে ‘পূর্ব-পাকিস্তানের বিশ্বাসঘাতকতা’র কথা বলেন, তখন জাফর খুব রূঢ়ভাবে বলে ‘কার বিশ্বাসঘাতকতা?’ জাফরের কণ্ঠস্বর শুনে আলোচনা তৎক্ষণাৎ থেমে যায় বলে আমরা উপন্যাসে জানতে পারি। কিন্তু এই উপন্যাসের একটা খুব বড় দিক বেশ প্রচ্ছন্নে থেকে যায়। জাফর মূলত এক যুদ্ধশিশু, যাদেরকে সে মা-বাবা বলে জানে, তারা আসলে তার মামা-মামী। কিন্তু জাফরকে কেন যুদ্ধশিশু হতে হবে বা এই তথ্যের কোনো আলাদা দিক আছে কিনা বা এই সত্য জাফরের জীবনে কীভাবে প্রভাব ফেলে, উপন্যাসে সে বিষয়ে কোনো দিক-নির্দেশনা নেই। যুদ্ধশিশুর এই খটকাটা রাখাটা একান্ত জরুরিই বা কেন সেটাও পরিষ্কার নয়। এক কথায় এটা বেশ অস্বস্তিকর একটা তথ্য, কিন্তু অস্বস্তিটা কোথায় সেটাও ঠিক স্পষ্ট নয়। হয়ত সেটা পাঠক-ভেদে ভিন্ন হবে। কিন্তু উপন্যাসে এই তথ্যের কোনো বিস্তার নেই দেখেই খটকাটা লাগে যে এই তথ্যের প্রাসঙ্গিকতাটা কোথায়।
একটা উপন্যাসের সাফল্য বা মাহাত্ম্য নির্ণীত হয় তার জীবনঘনিষ্ঠ উপাদানে। এই উপন্যাসে জিয়া হায়দার প্রচুর উপাদান গ্রহণ করেছেন তাঁর জীবন থেকে, অভিজ্ঞতার প্রায় পুরোটাই ঢেলে দিয়েছেন উপুড় করে। এক সমালোচক বলেছিলেন, অতো ঢেলো না, নিঃশেষ হয়ে যাবে, পরের উপন্যাসের জন্য কিছু রেখো। জিয়া হায়দার সেকথা শোনেননি। তাঁর ছোট ছোট জীবনঘনিষ্ঠ উপাদানের কিছু উদাহরণ দিচ্ছি –
p. In England, the root of true, rightly guided power, the essence of authority, was not learning but the veneer of knowledge, while projecting genuine ignorance of all that is vulgar. [p.120]
q. He, like so many of them, came from that breed of international development experts unsparing in its love for all humanity but having no interest in people. [p.133]
r. Knowing doesn’t fix things. [p.205, footnote]
s. We are a species in love with lists. … Everything is made simple by lists, made digestible, parceled into manageable units, reducing the complexity of the world into the simplicity of a line. [p. 243]
t. A banker’s taste in clothes is about the only thing predictable in banking. [p.17]
এমন আরো অজস্র উদাহরণ সারা উপন্যাসে ছড়িয়ে আছে যা লেখকের বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতার নির্যাস থেকে চয়িত হয়েছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, এ এক অভিনব উপন্যাস, মহান তো বটেই। তবে চিরকালীনতার কিছু ঘাটতি আছে। হোসে সারামাগো বা সালমান রুশদি যেসব শক্তিশালী উপন্যাস লিখেছেন তার তুলনায় এটা ঠিক অতোটা শক্তিশালী নয়। তবে ঝুম্পা লাহিড়ী কিংবা মনিকা আলির চেয়ে ঢের সুপাঠ্য। জিয়া হায়দারের দৃষ্টি গভীর, জীবনবেদী, তবে প্রসারিত নয়। উপরন্তু উপন্যাসটিতে সাধারণীকৃত উপাদান কম। লেখকই সব বয়ান দিয়ে দেন, ফলে পাঠকের কল্পনার জায়গাটা সীমিত থাকে। একঘেয়ে নয় যদিও, তবে একমুখী। চরিত্রচিত্রণও দ্বিমাত্রিক তলে সীমাবদ্ধ। তবে সাম্প্রতিক ভূ-রাজনীতি ও সমকালীন মাল্টিকালচারাল সমাজ খুব সুন্দরভাবে চিত্রিত হয়েছে এই উপন্যাসে। কাজেই জিয়া হায়দার রহমানকে অভিনন্দন জানাতেই হয়। গোডেলের অসম্পূর্ণতা উপপাদ্য মূল থিম হওয়া সত্ত্বেও উপন্যাসটি অসম্পূর্ণ নয়! জাফর সম্পর্কে তার অনামা-কথক বন্ধুটির মন্তব্য যেন পুরো উপন্যাসেরই সারমর্ম, উদ্ধৃত না করে পারছি না –
u. Zafar had set himself to the pursuit of knowledge … to lay ground for his feet to stand upon; … to go home, somewhere, and take root. [But he had] come to see …that understanding is not what this life has given us, that answers can only beget questions, that honesty commands a declaration not of faith but of ignorance, and that the only mission available to us … is to let unfold the questions, to take to the river knowing not if it runs to the sea, and accept our place as servants of life. [p.553]

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Salim Aurnab — সেপ্টেম্বর ২৯, ২০১৪ @ ৬:৩৬ অপরাহ্ন

      স্যার আপনি বলেছনে…
      প্রতিরূপ ব্যবহারের ফলে আমাদের বোধ কীভাবে বাধাগ্রস্ত হয়, অথচ মূল উদ্দেশ্য যেখানে ছিল বোধগম্যতার উৎসার, তা নিয়ে জাফরের দার্শনিক আবিলতা লক্ষণীয়। মানুষের সকল জ্ঞানতৃষ্ণার মূলে রিপ্রেজেন্টেশন বা প্রতিরূপ ব্যবহারের এই নিষ্ফলতা আবারো গোডেলের উপপাদ্যের দিকে পাঠককে ধাবিত করে। আরেক জায়গায় আরেকটি ছবি লেখক ব্যবহার করেছেন আলোকীয় বিভ্রম বোঝাতে। আপাতভাবে যেটা দেখা যায়, অর্থাৎ আমাদের ইন্দ্রিয়সমূহ আমাদের যে তথ্য দেয় সেটা প্রায়শই ধোঁকা দিতে পারে বা প্রবঞ্চক হতে পারে।
      সহমত জ্ঞাপন করছি। তবে এর আগে উপন্যাসটা পড়ার চেষ্টা অন্তত করবো। প্রশ্ন হচ্ছে এই ঢাউস সাইজের বই পড়ার সময় কোথায় যেখানে বইমেলা সমাগত। :) সুন্দর রিভিউয়ের জন্য ধন্যবাদ।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com