তাপস গায়েনের কবিতা: আসিয়াছেন তথাগত, আসিয়াছেন পিতাশ্রী

তাপস গায়েন | ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৪ ১২:৫০ পূর্বাহ্ন

(এক)
পুষ্প বিকাশের নিয়মে পুষ্প ফুটিয়াছে, যেইরূপে রাধাসমীপে শ্রীকৃষ্ণ আসিয়া থাকেন । বর্ষায় কদম ফুটিয়া থাকে না কি কদম ফুটিলে বর্ষার প্রকাশ ঘটে, তাহার মীমাংসা রাধারাণীই করিবেন ! অক্লান্ত বর্ষা আর কদম ফুলের যুগল সম্মিলনকালে এই জগৎ রাধারূপে জাগিয়া ওঠে, যেইরূপে প্রাতঃকালে আলোর স্ফুটন হয়, যেইরূপে ক্রমাগত আলো আমাদের সম্মুখে আসিয়া প্রতিভাত হয় । এইক্ষণে, রাধারাণীকে প্রকৃতরূপে জানা হইলে, শ্রীকৃষ্ণকে আর জানা হইয়া উঠে না, অন্যদিকে শ্রীকৃষ্ণকে জানা সম্পূর্ণ হইলে, শ্রীমতীরাধা অজ্ঞাতই থাকিয়া যান । পূর্ণ অবয়বে রাধা এবং কৃষ্ণ, এই উভয়কে একসাথে জানিয়া উঠিতে পারিলেই প্রেমের সম্যক ধারণা পাওয়া যায় । হে দয়াল ঠাকুর, এই যুগলকে সম্পূর্ণরূপে না জানিতে পারিয়া আমরা অস্থির হইয়াছি, আমরা প্রেমহীন হইয়া রহিয়াছি ।

দয়াল ঠাকুর, এই প্রবাসে, প্রেমহীন হইয়া আমি আপনাকে ভুলিতে বসিয়াছি । প্রেমহীন হইয়া উঠিয়াছি বিধায়, আমি পথ হারাইয়াছি, ফলত এখন আমার পথ বিশৃঙ্খল এবং অন্তহীন । সন্ধ্যার প্রাক্কালে আপনমনে নদীতীরের জেটিতে বসিয়া গাঙচিলের উড্ডয়ন দেখি, ভাবি শেষ বিকালের আলো পাখির পাখনা হইতে পড়িয়া গিয়া জলের অতলে বুঝি বা হারাইয়া গিয়াছে ; আর সেইক্ষণে বুঝি বা জোনাকিরা স্কাইস্ক্রাপারে আগুন ধরাইয়া দিয়াছে, তাই দমকল বাহিনীর সদস্যরা সন্ধ্যার ভাবগম্ভীরতাকে ক্ষুণ্ণ করিয়া চলিয়াছে । বিভিন্ন দেশ হইতে আগত গায়কেরা পার্কে, ষ্টেশনের প্লাটফর্মে, কিংবা কোনো চৌরাস্তার মোড়ে দাঁড়াইয়া যে গান গায়, আমি সেইসব দৃশ্যপটের দিকে নির্নিমেষ তাকাইয়া থাকি ; সুরের স্রোতে ভাসিয়া গিয়া পরিপার্শ্বের জনজঙ্গম ভুলিয়া যাই, যেইরূপে পানশালা আর অপরূপা নারীরা আমাকে ভুলাইয়া রাখে, এবং উহাতে মোহাবিষ্ট থাকিয়া ঈশ্বরের ভজনা ভুলিয়া গিয়াছি । একদিন সাবওয়ে ট্রেনে যে অন্ধ গায়িকার গান শুনিতাম, তাঁহাকে আর আজকাল দেখি না । প্রভু, আমি কী ঈশ্বরদর্শন ভুলিয়া গিয়াছি !

ঠাকুর, অতি কৈশোরে খালের জলস্রোতের দিকে তাকাইয়া থাকিতাম ; উহাতে পিতামাতার মুখচ্ছবি আসাযাওয়া করিত ; মধ্যযৌবনে পিতামাতাকে হারাইয়া বুঝিয়াছি, সময়ের উদ্‌গম আছে, কিন্তু উহার পুনরাবৃত্তি নেই । প্রভু, আমাদের নাম আছে, তাই বিভ্রম রহিয়া গিয়াছে, তাই আজ অবধি নামের মায়ায় পড়িয়া রহিয়াছি । ভন্তে, সকল নামরূপের উর্ধে উঠিয়া আপনি নিজেকে ‘তথাগত’ বলিয়া জানিয়াছেন !

এইরূপে আপনি চলিয়া গিয়াছেন কিংবা এইরূপে আপনি আসিয়াছেন ; এই আপনি, যাওয়াআসার সকল কার্যকারণ সম্পর্কের বাহিরে রহিয়া গিয়াছেন, তাই আপনি তথাগত !

সময়ের এইক্ষণে, সময়কে একই সাথে মান্য এবং অমান্য করিয়া, আমার অনাগত পুত্রের জন্য, তথাগতের দর্শনের নিমিত্তে উন্মুখ হইয়া আছি । কারণ, তিনিই আমার পিতাশ্রী, যিনি অতিশীঘ্রই আমার গৃহে আসিয়া পৌঁছাইবেন ।

(দুই)
পিতাশ্রী, এই দেহভস্ম, যা আপনার দেহের শেষ আধান, এখন ভেসে যাচ্ছে এই ক্ষীণতোয়া জলে আর আমি দাঁড়িয়ে রয়েছি নির্বাক । জানি না কোথায় চলেছেন আপনি ! সকল জানার বাইরে রয়ে গেছে এই যাওয়া-আসা । আমাদের অস্তিত্বের কোনো এক শর্তে আপনি আজো শুয়ে আছেন আপনার শৈশবের স্নিগ্ধ ভূমিতে ; এইতো আপনি চেয়েছিলেন । মানুষের কলস্বরে আপনার আত্মা ছিল স্নিগ্ধ, এখনও এই গ্রামের নির্জনে গৃহবধুদের খুনসুটি, শিশুদের দৌরাত্ব, আর বালকের চপলতা জাগে আপনার স্তুপ ঘিরে । সন্ধ্যায় নারীদের উলুধ্বনি বোধকরি প্রকৃতিকে আশ্বস্ত করেছে, দিন ও রাত্রির মধ্যে যেন তেমন কোনও বিভাজন নেই ! তবু, দেবতাদের হাতে এই পৃথিবীকে ন্যস্ত করে আমরা ঘুমিয়ে পড়ি । শীতের রাতে, রাতব্যাপী, খেজুরের রস জমে ওঠে মাটির হাঁড়িতে, আর অতিভোরে জেগে ওঠে দীর্ঘপথ, পিপীলিকাদের ! এইসব জীবনেরই কলস্বর, আত্মার অনন্ত বুদ্দ্বুদ ।

বহুদিন পরে আপনার চোখে আমি আজ দেখে নিচ্ছি নিজেকে । দীর্ঘপথ অতিক্রম করে আমরা হয়েছি দেশান্তরী, হয়েছি রিফিয়্যুজি, আমরা হেঁটেছি মফস্বল শহরের মাছের বাজারে, যুদ্ধোত্তর গিয়েছি শহর থেকে গ্রামে, লঞ্ছে চড়ে । নদীতে ভেসে গেছে গবাদিপশুর পাশে মানুষের শব ! এইভাবে জন্ম হয় সময়ের । সময় কী সময়ের উদ্গাতা ! এই অনুভব অসমাপ্ত রেখে সেই সময়ের দিকে আমরা তাকিয়ে থাকি, সময় বয়ে যায়, কিন্তু কাটে না বিস্ময়। ময়রার দোকানে রসগোল্লার রসে যখন ভিজে গেছে বালকের মুখাবয়ব, তখন, পিতাশ্রী, আপনার চোখেও দেখেছি বিস্ময় ! কে কাকে বদলে নেয়ঃ শিশু পিতাকে, না পিতা শিশুকে ! আজোবধি এই প্রশ্ন থেকে গেছে অমীমাংসিত ! অমীমাংসাই, বোধকরি, জীবনের অনন্য ধর্ম ।

ধূমকেতুর মতো অতি ক্ষুদ্রকাল এই পৃথিবীতে আমাদের অধিষ্ঠান । তাই শিখি নি এই পৃথিবীতে আমাদের বসবাস । কতো যে সংশয়, কতো যে ক্রন্দন ! ভূমি দখলের মতো দখল চলছে হৃদয়ের ; তাই মানুষ হয়েছে দেশান্তরী, নিত্যই সে হয়ে চলছে প্রেমহীন, নৈরাজ্যবাদী ! একেশ্বরবাদের মধ্যে, বোধকরি, বপন হয়েছে পৃথিবীর সকল ভ্রান্তি ! আজ সাম্রাজ্যবাদ আর একেশ্বরবাদ তাই পুষ্টি জুগিয়ে একে অপরকে । পিতাশ্রী, আর কতকাল থেকে যাবে আমার এই উদ্‌ভ্রান্তি ।

শ্রেষ্ঠ পানীয়ের লোভে আর কিছুকাল থেকে যাব, যেভাবে মধুর নিমিত্তে থেকে যায় পিপীলিকা আর মৌমাছি, কিন্তু সঙ্ঘবদ্ধভাবে নয়, বিশ্বভ্রাতৃত্বের লোভে নয় ; থেকে যেতে চাই পাহাড়ের মতো, মৌনী !

পিতাশ্রী, আপনার চোখে আজ আমি দেখে নিচ্ছি নিজেকেঃ জীর্ণ আমি, বাইছি আমার খেয়াতরী !
Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (3) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Moh L Gani — সেপ্টেম্বর ২৮, ২০১৪ @ ১০:৩৭ পূর্বাহ্ন

      খুব বেশী বুঝেছি তা নয় | তবে, ভালো লেগেছে |

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Md. Zillur Rahman — সেপ্টেম্বর ২৮, ২০১৪ @ ৩:২৭ অপরাহ্ন

      একটা ছোট গল্প পড়লাম, ভালই লেগেছে ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Faroq Faisal — জুন ৭, ২০১৫ @ ২:৩২ অপরাহ্ন

      ভালো লিখেছে কবি। তবে কাব্যিক মূর্ছনার চেয়ে গদ্যপদ্যে পরিণত হয়েছে। এটা দোষের কিছু না। বরং নুতুনত্ব আছে। চর্চা চালিয়ে যান।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com