গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:

নিঃসঙ্গতার একশ বছর

আনিসুজ্জামান | ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৪ ১:৩১ পূর্বাহ্ন

border=0বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে নিঃসঙ্গতার একশ বছর-এর মতো আর কোনো উপন্যাস প্রকাশের পরপরই এতটা পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে কিনা সন্দেহ। জনপ্রিয়তার বিচারে যেমন, তেমনি শিল্পকুশলতা আর শিল্পমুক্তির ক্ষেত্রেও এটি হয়ে উঠেছে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। কেবল স্প্যানিশ সাহিত্যেই নয়, গোটা বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসেই একটি মাত্র উপন্যাসে ইতিহাস, আখ্যান, সংস্কার, কুসংস্কার, জনশ্রুতি, বাস্তব, অবাস্তব, কল্পনা, ফ্যান্টাসি, যৌন-অযাচার ও স্বপ্ন– সবকিছুর এমন স্বাভাবিক ও অবিশ্বাস্য সহাবস্থান আগে কখনও দেখা যায়নি।
ঠিক এই কারণে মারিও বার্গাস যোসা এটিকে বলেছিলেন এক সামগ্রিক উপন্যাস (Novela Total), আর পাবলো নেরুদা একে বলেছিলেন, “সের্বান্তেসের ডন কিহোতের পর স্প্যানিশ ভাষায় সম্ভবত মহত্তম উন্মোচন (“perhaps the greatest revelation in the Spanish language since Don Quixote of Cervantes.”)
বাংলাদেশে এখনও পর্যন্ত কিংবদন্তিতুল্য এই উপন্যাসটি মূলভাষা থেকে অনূদিত হয়নি। এই প্রথম এটি আনিসুজ্জামানের অনুবাদে মূল থেকে ধারাবাহিক অনূদিত হচ্ছে। বি. স.

অনুবাদ: আনিসুজ্জামান

———————————————————————————
ধারাবাহিক উপন্যাস । কিস্তি ৪

সর্বনাশ–চিৎকার করল সে– মাকন্দোর চারদিক পানিতে ঘিরে আছে।

অভিযান থেকে ফিরে এসে মানচিত্রে যুক্তিহীনভাবে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার আঁকা মাকন্দো উপদ্বীপের ধারণাটি অনেকদিন পর্যন্ত টিকে ছিল। রেখাগুলো এঁকেছিল প্রচন্ড রাগে, যোগাযোগের প্রতিবন্ধকতাকে অতিরঞ্জিত করে, যেন চরম বুদ্ধিহীনভাবে জায়গাটা বেছে নেবার জন্য নিজেকে শাস্তি দেবার জন্য। “কখনই পৌঁছুতে পারব না কোথায়ও,” খেদ প্রকাশ করে সে উরসুলার কাছে, “ বিজ্ঞানের সুবিধাগুলো না পেয়ে এখানেই আমাদের জীবন পচতে থাকবে”। ছোট্ট গবেষণাগারে কয়েক মাসের উপর্যুপরি চিন্তার ফলপ্রসূ এই নিশ্চয়তা মাকন্দোকে আরও উপযুক্ত এক অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণে তাকে উদ্বুদ্ধ করে। কিন্তু এইবার, উরসুলা তার এই অস্থির পরিকল্পানার কথা আগেই আঁচ করে ফেলে। এরই মধ্যে স্থানান্তরের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করা পুরুষদের হুজুগের বিরুদ্ধে গোপন ও পিপড়ার মতো ক্ষান্তিহীন এক পরিশ্রমে গ্রামের নারীদের সে উপযোগী করে তোলে।
পুরো ব্যাপারটি একেবারে বিশুদ্ধ আর সাধারণ একটা মরিচীকায় রূপান্তরিত হ্ওয়ার আগ পর্যন্ত হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া বুঝতেই পারলো না কখন, এমনকি কোন প্রতিকূল শক্তির গুণে তার পরিকল্পনাগুলো নানান সব অজুহাত, বিপত্তি ও ওজরের বিশৃঙ্খলার মধ্যে জড়িয়ে পড়লো।

উরসুলা তাকে নিষ্পাপ মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করলো, এমনকি ওর প্রতি একটু দয়াও বোধ হলো। গবেষণাগারের জিনিষগুলোকে তাদের মূল বাক্সের ভেতর যখন গুছিয়ে রাখছিলো তখন ওকে কোনার ছোট্ট ঘড়টিতে স্থান পরিবর্তনের স্বপ্নের কথা বিড়বিড় করে বলতে শুনা গেল । উরসুলা ওকে কাজগুলো শেষ করতে দিল। বাক্সগুলোতে পেরেক ঠোকা, আর ঝর্না কলম দিয়ে বাক্সের গায়ে নামের আদ্যাক্ষর লিখাও শেষ করতে দিল কোনরকম গঞ্জনা ছাড়াই, যদিও উরসুলা জানতো যে ও জেনে গেছে (কারণ সে শুনতে পেয়েছিলো ওর বধির স্বগতোক্তি) গ্রামের পুরুষরা তার এই উদ্যোগে সঙ্গী হবে না। কেবল ঘরের দরজাটা যখন তুলতে যাচ্ছে তখনই শুধু উরসুলা সাহস করল জিজ্ঞেস করে কেন সে খুলছে, আর তার জবাবটা সে দিলো তিক্ততার সঙ্গে “যেহেতু কেউ যেতে চায় না, আমরা একাই যাব”, উরসুলা এতে বিচলিত হলো না।

– আমরা যাব না– বলল সে- আমরা এখানেই থেকে যাব, কারণ এখানেই আমার এক ছেলেকে পেয়েছি।

– এখনও পর্যন্ত কেউ মরেও নি – সে বলল– মাটির তলায় না যাওয়া পর্যন্ত কেউ-ই কোনো জায়গার নয়।

উরসুলা এক কোমল দৃঢ়তায় জবাব দিল – এখানে থেকে যাওয়ার জন্য যদি আমাকে মরতে হয় তবে আমি মরব।

হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া বিশ্বাস করে উঠতে পারল না তার বৌয়ের ইচ্ছে শক্তি এতটা দৃঢ় হতে পারে। চেষ্টা করল তার যাদুময়ী আজগুবি কল্পনা আর বিস্ময়কর এক পৃথিবীর অঙ্গীকার দিয়ে ওকে প্রলুব্ধ করতে যেখানে মাটিতে যাদুকরী তরল পদার্থ ছিটালেই গাছ হয় মানুষের ইচ্ছানুযায়ী, যেখানে বিক্রি হয় খুব সস্তায় ব্যাথা সারানোর সব যন্ত্রপাতি। কিন্তু উরসুল ছিল নিরাসক্ত ওর দূরদৃষ্টিতে।

– এই সব আজগুবী চিন্তার চেয়ে বরং তোমার সন্তানদের দায়িত্ব নেয়া উচিৎ– উত্তর দিল- দেখ ওদের কী অবস্থা, যেন আল্লার ওয়াস্তে ঘুরে বেড়ানো গাধা। হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া আক্ষরিক অর্থেই বৌয়ের কথাগুলো ধরে নিল। জানলা দিয়ে তাকিয়ে রৌদ্রতপ্ত বাগানে দুই ছেলেকে খালি পায়ে দেখতে পেল, ঐ মূহুর্তে ওর মনে হলো কেবল উরসুলার যাদুবলে যেন ওদের অস্তিত্বের শুরু হয়েছে। কিছু একটু ঘটে গেল তার ভিতরে, রহস্যময় এবং সুনির্দিষ্ট এমন একটা ব্যাপার যা তাকে সত্যিকারের সময় থেকে উপরে ফেলে নিয়ে যায় স্মৃতির এক অনাবিস্কৃত অঞ্চলে। উরসুলা যখন এ জীবনে গ্রাম ছেড়ে না যাবার ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে ঘর ঝাড়ু দিচ্ছিল তখন সে মগ্নতা নিয়ে বাচ্চাদের দেখতে থাকে চোখগুলো ছলছল হ্ওয়া পর্যন্ত। হাত দিয়ে দুচোখ মুছে হাল ছেড়ে দেয়ার এক দীর্ঘশ্বাস ফেললো সে।

– বেশ – বলল – ওদের বল যাতে আমাকে বাক্স থেকে জিনিষগুলো বের করতে সাহায্য করে।

বাচ্চাদের মধ্যে সবচেয়ে বড়, হোসে আর্কাদিওর চৌদ্দ বছর পূরণ হয়েছে। ওর ছিল চৌকোমাথা, মাথা ভর্তি চুল আর চরিত্র ছিল বাপের মতই স্বেচ্ছাচারী। শারীরিক বৃদ্ধি আর শক্তিমত্তা একই রকম হলেও তখন থেকেই বোঝা যাচ্ছিল যে ওর ছিল কল্পনাশক্তির কিছু অভাব। ও পেটে আসে এবং জন্ম গ্রহণ করে মাকন্দো পত্তনের আগে কষ্টকর পর্বতসংকুল পাড়ি দেবার সময়, বাবা-মা খোদাকে ধন্যবাদ জানায় ওর শরীরে কোন জন্তুর অঙ্গ ছিল না বলে। আউরেলিয়ানো ছিল মাকন্দোতে জন্মানো প্রথম মানবসন্তান, মার্চে ছয় বৎসর পূরণ হবে। স্বভাবে সে নীরব এবং মনোযোগী। মায়ের পেটে থাকতে কান্নাকাটি করত আর জন্মেছিল চোখ খোলা অবস্থায়। যখন ওর নাড়ি কাটা হচ্ছিল তখন ঘরের জিনিষপত্র চিনতে চিনতে সে মাথা নাড়ছিল এদিক ওদিক। লোকজনের চেহারা পরীক্ষা করছিল এক বিস্ময়হীন কৌতুহল নিয়ে। পরে, যারা ওকে দেখতে এসেছিল তাদের দিকে গুরুত্ব না-দিয়ে সমস্ত মনযোগ কেন্দ্রীভূত করেছিল তালের পাতায় ছাওয়া ছাদটার দিকে যেটা প্রচন্ড বৃষ্টির চাপে প্রায় ভেঙ্গে পরার উপক্রম। ওর দৃষ্টিপাতের এই তীব্রতার কখা আর মনে পড়েনি। মনে পড়লো যেদিন সে জলন্ত উনুনে বলক দিতে থাকা স্যুপের পাতিল সরিয়ে টেবিলে রাখছিল সেই মুহূর্তে তিন বছরের ছোট্ট আউরেলিয়ানে ঘরে এসে হাজির । দরজায় দাড়ানো কিংকর্তব্যবিমুঢ় শিশুটি বলল ‘‘ওটাতো পড়ে যাবে”-। পাতিলটা টেবিলের মাঝখানে ভালভাবেই রাখা ছিল, কিন্তু শিশুর ঘোষণামাত্র , যেন অভ্যন্তরিন এক গতির দ্বারা চালিত হয়ে টেবিলের কিনারে চলে আসে সেটি আর মেঝেতে পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। ভীত উরসুলা ঘটনাটা স্বামীকে জানায়, কিন্তু সে এটাকে এক প্রাকৃতিক কোনো ব্যাপার বলে ব্যাখ্যা করে। বাচ্চাদের অস্তিত্বে উদাসীন হোসে আর্কাদিও কিছুটা এরকমই ছিলো সবসময়, এমন থাকার কারণ শৈশবকে সে মানসিক অপর্যাপ্ততা বলেই মনে করতো আর অন্যদিকে নিজের অবাস্তব কল্পনায় তন্ময় থাকাটাও ছিলো আরেকটা কারণ।
——————————-

আর্হেন্তিনার বুয়েনোস আইরেস-এর
এদিতোরিয়াল সুদামেরিকানা প্রকাশনী থেকে
প্রকাশিত ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’ উপন্যাসের
প্রথম সংস্করণের প্রচ্ছদ

——————————-
border=0

কিন্তু সেই বিকেলের পর থেকে, যেদিন সে বাচ্চাদের ডাকলো বাক্স থেকে জিনিসপত্রগুলো বের করতে সাহায্যের জন্য তখন থেকেই বেশীর ভাগ সময় সে ওদের পিছনে উৎসর্গ করতে লাগলো। মূল বাড়ি থেকে একটু দূরের সেই কামরাটার দেয়াল ভরে উঠছিল ধীরে ধীরে অবিশ্যাস্য মানচিত্র, আর অলীক সব গ্রাফে, সেখানে ওদের শেখাল পড়তে, লিখতে, গুনতে, সর্বোপরি শেখাল পৃথিবীর বিস্ময়গুলো সম্পর্কে যা কেবল ওর জানা জগতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো না বরং সেগুলো ওর অবিশ্বাস্য কল্পনার শেষ সীমা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো । এভাবেই শিশুরা শেখে আফ্রিকার একেবারে দক্ষিণপ্রান্তে এমন সব বুদ্ধিমান আর শান্তিপ্রিয় মানুষ আছে যাদের বিনোদন হচ্ছে শুধুমাত্র বসে বসে ভাবা অথবা এক দ্বীপ থেকে অন্যদ্বীপে লাফ দিয়ে পার হওয়ার মাধ্যমে ইজিয়ান সাগর পাড়ি দেয়া সম্ভব সালোনিক বন্দর পর্যন্ত । সেই সমস্ত ঘোরলাগা বৈঠকগুলো শিশুদের মনের মধ্য এমনভাবে গেঁথে যায় যে, বহু বছর পর পদাতিক বাহিনীর অফিসার ফায়ারিং স্কোয়াডকে গুলি ছোড়ার আদেশের এক মূর্হতে আগে, কর্ণেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া চলে গেল মার্চের সেই নরম বিকেলে যখন ওর বাবা পদার্থবিদ্যায় বিরতি দিয়ে, স্থির চোখে, বাতাসে হাত তুলে মুগ্ধ হয়ে দাড়িয়ে শুনছিল দূর থেকে আসা বাঁশী, ঢোল আর খরতালের জিপসীদের আরও একবার গাঁয়ে আসার শব্দ, আর ঘোষণা করছে মেমফিসের বিজ্ঞ লোকদের আশ্চর্যকর সর্বশেষ আবিস্কারের কথা। এরা ছিল নতুন জিপসী দল। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ও মহিলার দল শুধু মাত্র কথা বলতে পারে নিজেদের ভাষায়। তেলতেলে চামড়া আর বুদ্ধিদীপ্ত হাতের আদর্শ সৌন্দর্যের পুরুষগুলো নাচ আর গান দিয়ে রাস্তায় বপন করেছিলো এক আনন্দময় হট্টগোলের আতংক। এদের সঙ্গে ছিলো ইটালিয় গাথাকাব্য আওড়াতে সক্ষম বহুবর্ণে রাঙানো টিয়া পাখী, তামবোরিনের আ্ওয়াজে শতেক সোনার ডিমপ্রসবী মুরগী, মানুষের চিন্তা আঁচ করতে পারা এক প্রশিক্ষিত বাঁদর, একাধিক কাজে সক্ষম যন্ত্র যা দিয়ে বোতাম শেলাই ও জ্বর নামানো যায়, খারাপ স্মৃতি ভুলে যাবার যন্ত্র, সময় ভুলে যাবার বড়ি। আরও হাজারটা আবিষ্কার, যা এতই উৎভাবনশক্তিসম্পন্ন আর অসাধরণ যে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার খুব ভালো লাগতো যদি ওগুলো মনে রাখার একটা যন্ত্র আবিস্কার করতে পারতো। মূহুর্তের মধ্যে গ্রামটা বদলে যায়। মাকন্দোবাসীরা হারিয়ে যায় ওদের নিজেদেরই রাস্তায়, মেলার ভীড়ে বিহবল হয়ে।

বিশৃংখলার মধ্যে যাতে না হারিয়ে যায়, তাই দুই হাতে দুই ছেলেকে ধরে সোনার দাঁতের কসরৎকারী আর ছয় বাহুর ভেল্কিবাজ, মল আর চন্দন কাঠের দমবন্ধ করা গন্ধের ভিতর, হোঁচট খেতে খেতে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া পাগলের মত সর্বত্র খুঁজছিল মেলকিয়াদেসকে, যাতে করে সে অবিশ্যাস্য দুঃস্বপ্নের গোপন কথাগুলো ব্যাখা দিতে পারে। অনেক জিপসীর কাছেই সে গেল কিন্তু কেউ-ই তার ভাষা বুঝতে পারলো না।

border=0অবশেষে সেই জায়গায় সে এলো যেখানে মেলকিয়াদেস তাঁবু গাড়তো আর পেলো এক মৃদুভাষী আর্মেনিয়কে যে কিনা স্প্যানিশ ভাষায় ঘোষণা করছে অদৃশ্য হওয়ার গুনসম্পন্ন এক সিরাপের কথা। হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া দর্শকদের ভীর ঠেলে যখন ওকে প্রশ্ন করতে পারল তখন লোকটা এক ঢোকে পীতাভ রংয়ের এক পদার্থ কেবল মাত্র গলধঃকরণ করেছে। জিপসী তাকে এক বিস্ময়াষ্টি দৃষ্টিতে জড়িয়ে ফেলে। ধোঁয়া ও দুর্গন্ধময় আলকাতরায় পরিণত হওয়ার আগমুহূর্তে তার দেয়া উত্তরের প্রতিধ্বনি সেখানে ভাসসে থাকেঃ “মেলকিয়াদেস মারা গেছে”। এই খবরে কিংকর্ত্যববিমূঢ় হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া অনড় হয়ে থাকে দুঃখটাকে হজম করার জন্য। ইতিমধ্যে ভীরটা হাল্কা হতে শুরু করেছে অন্য কোন প্রদর্শনী দেখার জন্য আর মিতভাষী আর্মেনিয় সম্পূর্ণরূপে বাষ্প হয়ে গেছে। আরও পরে অন্য জিপসীরা তাকে নিশ্চিত করে যে সত্যি মেলকিয়াদেস সিংগাপুরের বালির স্তুপে হার মানে জ্বরের কাছে আর তার দেহ ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে জাভা সমুদ্রের সবচেয়ে গভীর জায়গায়। খবরটা বাচ্চাদের কাছে কোনো গুরুত্ব পায় না। ওরা বাবাকে তাগাদা দিচ্ছে মেমফিসের বিজ্ঞদের বিস্ময়কর নতুনত্বের সঙ্গে পরিচয় করাতে। ঢোকার সময়েই তাবু থেকে ঘোষণা করা হয়েছিলো সেটার মালিক ছিল রাজা সোলেমান। এত বেশি পীড়াপিরি করে ওরা যে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া তিরিশ রিয়ালের বিনিময়ে তাবুর মাঝখানে প্রবেশ করে যেখানে লোমশ শরীর, কামানো মাথা, নাকে তামার নোলক, গোড়ালিতে ভারী শিকল বাঁধা এক বিশাল লোক পাহাড়া দিচ্ছে জলদস্যুদের এক সিন্দুক। দৈত্যটা যখন সিন্দুকটাকে খোলে তখন ওটার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে এক ঠান্ডা প্রবাহ। ওর ভেতর রয়েছে বিশাল স্বচ্ছ একটি টুকরো যাতে অগুনতি সূঁচ বসানো, এগুলো থেকে উষার নির্মলতায় বিক্ষিপ্ত হচ্ছে তারার মতো রং বেরঙের উজ্জ্বলতা। বিচলিত, হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া জানে যে বাচ্চাগুলো অপেক্ষা করছে শিগগিরই এটার ব্যাখ্যা পাওয়ার জন্য, বুকে সাহস নিয়ে বিড়বিড় করলো সে:

– এটা হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় হিরক খন্ড।
– না – জিপসী শুধরে দেয় – এটা বরফ।

না বুঝে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া হাত বাড়িয়ে দেয় বরফের টুকরোর দিকে। কিন্তু দৈত্যটা হাত সরিয়ে দেয়, “ছোঁয়ার জন্য আরও পাঁচ রেয়াল”– বলল। হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া তাই দিল। বরফের উপর হাত রাখল, ওভাবেই রাখল কয়েক মিনিট আর ততক্ষণে তার বুক ভরে উঠছে ভয় আর রহস্যময় স্পর্শের আনন্দে। কি বলবে বুঝতে না পেরে আরও দশ রিয়াল দিল যাতে কোরে বাচ্চারাও এই আশ্চর্য অভিজ্ঞতা অনুভব করতে পারে। ছোট্ট হোসে আর্কাদিও ছুঁতে অস্বীকার করল। অন্যদিকে আউরেলিয়ানো এক পা বাড়িয়ে হাত রাখল আর সরিয়ে নিল সঙ্গে সঙ্গে। “এটা বলকাচ্ছে”–চমকে গিয়ে বলল। কিন্তু ওর বাবার তাতে মনোযোগ ছিল না। সেই সময়ে এই অত্যাশ্চর্যের প্রমাণে মাতাল সে ভুলে গেল তার ব্যর্থ পরিকল্পনার হতাশার কথা আর স্কুইডের ক্ষিধের কাছে পরিত্যক্ত মেলকিয়াদেসের দেহের কথা। আরও পাঁচ রিয়াল দিয়ে বরফের উপর হাত রেখে পবিত্র হরফ ছুঁয়ে সাক্ষ্য দেয়ার ভঙ্গিতে বললো- “এটা হচ্ছে আমাদের সময়ের মহান আবিষ্কার”।
(চলবে)
কিস্তি-১ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৩ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (8) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Nobonita — সেপ্টেম্বর ১৪, ২০১৪ @ ১০:৫৭ অপরাহ্ন

      সময়মত প্রকাশের জন্য বি.স.কে অসংখ্য ধন্যবাদ!!!
      আরো এক কিস্তি উপহার দেয়ার জন্য অনুবাদক-লেখককে অনেক অনেক ধন্যবাদ!

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আশেক ইব্রাহীম — সেপ্টেম্বর ১৫, ২০১৪ @ ১:২১ পূর্বাহ্ন

      চমৎকার সাবলীল অনুবাদ। পরের কিস্তির অপেক্ষায় রইলাম।

      কয়েকটা বানান ভুল চোখে পড়ল। কয়েক যায়গায় ‘ড়’ এর পরিবর্তে ‘র’ আছে।

      এগুলো ঠিক করা সম্ভব হলে আরো ভালো হয়।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Akash Lina — সেপ্টেম্বর ১৬, ২০১৪ @ ৮:৫৬ পূর্বাহ্ন

      এটা কি ভাবানুবাদ না স্প্যানিশ সাহিত্যের বঙ্গানুবাদ? মার্কেসের কোন কিছু পড়া আমার জন্য প্রথম, তাই জানতে ইচ্ছে করে এখানে কার অবদান কতটুকু! অনুবাদকের কতটুকু লেখকের কতটুকুন?

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন anisuz zaman — সেপ্টেম্বর ১৬, ২০১৪ @ ১১:২৪ অপরাহ্ন

      প্রিয় Akash Lina, না, এটা ভাবানুবাদ নয়। স্প্যানিশ সাহিত্যের একটি চিরায়ত গ্রন্থের বঙ্গানুবাদ বলা যেতে পারে। অনুবাদকের অবদান নিশ্চয়ই মূল লেখকের চেয়ে বেশি হতে পারে না। এই অনুবাদটির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য । আপনাকে ধন্যবাদ মন্তব্য করার জন্য ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Mamun — সেপ্টেম্বর ১৭, ২০১৪ @ ১:৪৩ পূর্বাহ্ন

      ভাল লাগছে পড়তে। অনুবাদককে ধন্যবাদ। অনুবাদকের অন্যান্য লেখা কী কী আছে তা জানতে পারলে ভাল লাগত। সম্পাদক সমীপে আবেদন রাখলাম।- খন্দকার হাবিবুর রহমান (মামুন)

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Shajahan — সেপ্টেম্বর ১৭, ২০১৪ @ ১:৪৫ পূর্বাহ্ন

      চমৎকার এগোচ্ছে, সামনে কী? অপেক্ষায় রইলাম! এটার কি বই আছে?

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Naosheen — সেপ্টেম্বর ১৮, ২০১৪ @ ১:০৩ পূর্বাহ্ন

      বেশ সাবলীল অনুবাদ । মার্কেস-এর আর কিছু লেখা পড়েছি, সেগুলো আমার কাছে বেশ জটিল মনে হয়েছিল! হয়তো ভাষাগত সাবলীলতার অভাবেই! ভাল প্রয়াস। অনুবাদককে ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মতি রহমান — সেপ্টেম্বর ১৮, ২০১৪ @ ৭:৩৪ অপরাহ্ন

      আনিসুজ্জামানকে ধন্যবাদ।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com