বাঙ্গালের জাপান দর্শন

আনিসুজ্জামান | ১২ জুলাই ২০১৪ ১১:৩০ অপরাহ্ন

japan-1.jpgকিছুটা পারিবারিক ঝামেলা, তাছাড়া লেখাপড়ার ইচ্ছেও ততদিনে উবে গিয়েছিলো। ঠিক এরকম পরিস্থিতিতে ৮৫/ ৮৬ সালের দিকে বিদেশে যাওয়ার জন্য এক ধরনের আগ্রহ তৈরি হলো আমার মধ্যে। মনে হচ্ছিলো দেশে থেকে আমার পক্ষে কিছুই করা সম্ভব নয়। আমার যখন মানসিক অবস্থা এরকম তখন কুড়িলের এক ভদ্রলোক, শুনলাম জাপানে লোক পাঠায়। ঐ সময় উনি আমাকে নিয়ে গেলেন মতিঝিলে এক উপমন্ত্রীর বাড়ি বা অফিসে। উনি নাকাসিমি নামের এক ভদ্রলোকের মাধ্যমে জাপানে লোক পাঠাতো তখন।

ওখানে গিয়ে কিছুদিন ঘোরাঘুরি করতে লাগলাম। অনেকদিন ধন্না-টন্না দেওয়ার পর দেখলাম সবাইকে কাজের ভিসা দিয়ে পাঠাচ্ছে কিন্তু আমাদের ছয়জন না সাতজনকে আর পাঠাচ্ছে না। আমরা একেবারে হতাশ এবং ক্লান্ত হয়ে পরলাম। অনেকেই টাকা ধার করে জমা দিয়েছে। একবছরের মত আমাদেরকে ঘুরালেন তিনি; প্রতি সপ্তাহে একবার তার সঙ্গে দেখা করতাম। হঠাৎ করে আমরা ছয়জন সিদ্ধান্ত নিলাম ওনার কাছ থেকে টাকা তুলে ফেলবো। তিনি আমাদের সিদ্ধান্ত শোনার পর বললেন যে তোমরা ভিসা না নিয়ে চলে যাও নিজের রিস্কে।

আমরা তার কথায় রাজি হয়ে গেলাম। যাওয়ার সময়, ভদ্রলোক আমাদেরকে একটু ব্রিফিং করলেন। আমি সারাজীবন ঐ ভদ্রলোকের কাছ থেকে নেয়া ব্রিফিংটার জন্য কৃতজ্ঞ। উনি দুটো কথা বলেছিলেন, একটা কথা হলো, সাতটার সময় যদি তোমার কোনো অ্যাপয়েন্টমেন্ট থাকে, তাহলে আধ ঘন্টা আগেই সেখানে পৌঁছে যেও। কারন, ট্রাফিক জ্যাম থাকতে পারে। দ্বিতীয় কথাটা হলো, মুখ গোমড়া করে থাকবা না, কারণ মুখটাকে তুমি বিক্রি করছ। তুমি প্রথম যখন যাবে, কারো কাছে যখন হাজির হবে, তখন তোমার চেহারা দেখে যদি ভাল লাগে, তাহলে তোমার অর্ধেকের বেশি কাজ হাসিল হয়ে গেল। আর যদি মুখ গোমড়া করে থাক এবং তার যদি ভাল না লাগে, তাহলে ফেল করবা। এটা হল আমার জাপান যাত্রার প্রাক্কালীন ইতিহাস। আমরা এই পরামর্শ আর ঝুঁকিটা সঙ্গে নিয়ে ফ্লাই করলাম এখন থেকে।

শুনেছিলাম জাপানে বেশ শীত। তাই যাওয়ার আগে শেয়ালের চামড়ার পশমওয়ালা একটা বাদামী রঙের জ্যাকেট কিনেছিলাম। ঐটা নিয়ে যখন ইমিগ্রেশনের মুখোমুখি হলাম তখন ওরা বোধহয় বুঝতে পারছিলো যে আমরা কাজ করতে এসেছি। কারণ এরকম উদ্ভট সাজে লোকজন ট্যুরিস্ট হিসাবে যাবে, তাও বাংলাদেশ থেকে–এটা অসম্ভব। তারপরেও সময়টা ছিল এরকম, জাপান তখন শিল্প বিপ্লবের চূড়ান্ত পর্যায়ে, সুতরাং ওদের প্রচুর শ্রমিক দরকার।

সেখানে তখন অনেক শিল্পকারখানা ছিল। আমেরিকায়, কানাডায়, ইউরোপের প্রায় সব জায়গায় সাপ্লাই দিতে হচ্ছে ওদের উৎপাদিত পণ্য। ওদের নিজেদের পক্ষে এই বিপুল পরিমাণ চাহিদার জোগান দেয়া কোনোভাবেই সম্ভব ছিলো না। ওদের দরকার ছিলো। আরও বেশি শ্রমিক। ঠিক এই কারণে জাপানে যাওয়া তখন এতটা করাকরি ছিলো না। তখন পোর্টভিসায় যাওয়া যেতো। ইমগ্রেশনে দাঁড়ানোর পর টুরিস্ট হিসেবে আমরা পনেরো দিনের ভিসা চাইতেই ওরা তিন মাসের ভিসা দিল।

আমার কাছে পুরোপুরি অচেনা দেশ জাপান। শুধু জাপান কেন বাংলাদেশের বাইরে অন্য কোনো দেশই তো আমি চিনতাম না। যাইহোক, প্রথম রাতটা আমরা থাকলাম টোকিওতে, দ্বিতীয় রাত গেল টোকিও থেকে সত্তর মাইল উত্তরে ইয়ামসিসিথাংকো নামের একটা ইয়াম, খাসাকরেকেসুনা নামের এক গ্রামে।
border=0
নাকানিশি নামে জাপানের এক ভদ্রলোক আমাদেরকে ওখানে পাঠালেন। আলম নামে এক ভদ্রলোক নাকানিশির অধীনে কাজ করতেন, সমস্ত বাঙালিদের নেতা ছিলেন তিনি। এই আলম সাহেবই আমাদেরকে ওই গ্রামে নিয়ে যান। ঐ দিন ছিল খুব সম্ভব শুক্রবার। উনি ওখানকার কারখানাটা দেখালেন আমাদেরকে। কাজও দিয়ে দিলেন সঙ্গে সঙ্গে। ওই কারখানায় ট্রলির চাকা বানানো হতো। এক একটার ওজন ছিল সত্তর কেজি। বড় বড় লোহার রড বা পাইপ–ব্যাস হবে প্রায় দশ ইঞ্চি, বারো ইঞ্চি, চৌদ্দ ইঞ্চির মতো–ওগুলো কাটতে হতো। কাটার পর ওভেনে দেয়া হতো, ওভেনের তাপ বারশ’ ডিগ্রি ফারেনহাইট। এই প্রবল তাপের মধ্যে আমাদেরকে কাজ করতে হতো। একদিকে তাপ, অন্যদিকে ওজন। গায়ে আমাদের ফায়ারম্যানদের মতো ইউনিফর্ম।
আমাদের কাজ লোহার এই বিশাল টুকরোগুলোকে গরম করে তাপমাত্রা দেখা। রংটা দেখতে হয়। একটা নির্দিষ্ট রংয়ে আসলেই ওটাকে টেনে এনে একটা অটোমেটিক হ্যামারে ডুকাতে হতো। তারপর ঐ হ্যামারের ভিতরে আমাদের কামারের মতই আঘাতের পর আঘাত করে করে এটাকে একটা সেপ-এ নিয়ে আনতে হতো।

একটা ঘটনা মনে আছে এখনও। তখন সিগারেট খেতাম। খুব সিগারেট খেতাম, একটার পর একটা। চেইন স্মোকার বলতে যা বুঝায়। হেলমেটের মাঝখানে একটা ছিদ্র করেছিলাম, যাতে সিগারেট ঢুকিয়ে রাখা যায়। ওটা করার কারণ সিগারেট জ্বালানোর জন্য যাতে লাইটার না লাগে। এত বেশি তাপ ছিল যে আমাদের লাইটার লাগত না, ঐ চুল্লির ওখানে গেলেই সিগারেট জ্বলে যেত।
একদিন অতিষ্ট হয়ে ঐ হেলমেটটা খুলে ফেলেছিলাম। লোহা তো গরম হলে চটচট করে ফোটে, ঐ অঙ্গার এসে ঢুকলো আমার চোখের ভেতরে। ঢোকার সাথে সাথে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়েছিলাম আমি। আমাকে হসপিটালে নেয়া হলো । জ্ঞান ফিরছে। আমাকে অপারেশন করে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিয়ে পাঠিয়ে দিল। কিন্তু আমাকে অ্যাপার্টমেন্টে না নিয়ে আনা হলো কাজের ওখানে। সাথে একজন নার্স,কী ব্যাপার? মালিক বললো, তোমার এখনও সাতশটা মাল বাকি আছে। আর ঐ দেখ, হেলিকপ্টার একটা দাঁড়িয়ে আছে। মালগুলি বানানো শেষ হলে, তারপর হেলিকপটার যাবে এয়ারপোর্টে, ওখান থেকে মালগুলো ফ্লাই করবে কানাডায়। আমার একচোখ ব্যান্ডেজ করা, নার্স আমাকে ইনজেকশন দিচ্ছে। তখন, রাত বাজে প্রায় বারটা। আমি হসপিটালে ছিলাম প্রায় আট ঘন্টা।
যাই হোক, এই অবস্থাতেই শেষ করলাম এক চোখ দিয়ে। কাজ শেষ করার পর ভাবলাম মালিক অন্তত একটা ধন্যবাদ তো দিবে আমাকে। না, সে কিছুই বলল না।

ওখানে একটা মেয়ে ছিল, ও নিজেকে বলত মিসকো বাবা, জাপানি ভাষায় ‘বাবা’ মানে বুড়ি, মানে মিসো বুড়ি, উনি আমাকে জাপানি শিখিয়েছিলেন অনেকটা। আমার জীবনে প্রথম জাপানি শব্দ হল–নিজে নিজে শিখেছি অবশ্য– তামাগো, মানে ডিম। সুপার মার্কেটে গিয়ে সবই পাচ্ছি কিন্তু ডিম পাচ্ছি না। দোকানের লোকদেরকে দুই হাত উঁচু করে বলছি, ‘কোকরো কো, কোকরো কো’। ওরা তো আমার কথা কিছুই বুঝছে না। শেষ পর্যন্ত বুঝতে পারলো আমি কী চাইছি । বললো ‘তামাগো’। তারপরে যে শব্দটা আমাকে শেখাল, সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ; ওটা যে কোন ভাষা শিখার ক্ষেত্রে একটা চাবিকাঠি:
‘কোরে ওয়ান নান্ দেসুকা,’ হোয়াট ইস দিস্? এটা কী?

আপনি যেকোন দেশে যান, যদি বলেন, মানে যদি প্রশ্ন করেন এটা কী, তাহলে আপনার কাঙিক্ষত সবকিছু জানার দরজা খুলে দেবে এই প্রশ্ন। প্রশ্ন করে করে আপনি শব্দ এবং ধারণা সঞ্চয় করতে থাকবেন। অর্থাৎ আপনি ভাষাটা শিখতে থাকবেন। তো এই দুইটা শব্দ শিখলাম ঐ সুপার মার্কেটে। এটা হল একটা ঘটনা। আরো এমন মজার মজার বহু ঘটনা আছে। আমার জীবনে প্রথম মদ্যপানের ঘটনাটা বলি। ওদের বোরনিং কাইয়ে গেছি। বোরনিং কাই মানে, বর্ষ বিদায় দিবস। বর্ষ বিদায় উদযাপন অনুষ্ঠানে আমিসহ সাঁইত্রিশ জন লোক ওরা।

ওদের একটা ট্রাডিশন হলো আপনি এসে বসবেন, আরেকজন এসে আপনাকে মদ ঢেলে দেবে। মালিকের নির্দেশে মদ সার্ভ করার দায়িত্ব পরলো আমার উপর। এটা একটা সম্মানও সেখানে। প্রথম যাকে সার্ভ করছি, তিনি বললেন, তোমার গ্লাস? আমি একটা খালি গ্লাস নিয়ে এলাম। আমি তাকে ঢেলে দিলাম, উনিও আমাকে ঢেলে দিলেন। তারপর বললো, ইক্কি। ইক্কি মানে চির্য়াস। কমপাই বলে, ইক্কি বলে। ইক্কি মানে একবারে গ্লাস শেষ করা আরকি। তলা উপর করে ঢেলে দেয়া, একবারে শেষ করা। এমন ইক্কি করলাম সাঁইত্রিশ জনের সাথে। আমার জীবনে এমন অভিজ্ঞতা আর হয়নি। মালিক তো আমাকে নিয়ে খুব চিন্তিত হয়ে পরলেন। খাওয়ার পর মালিক আমাকে বললো, চল, তোমাকে বাসায় দিয়ে আসি। আমাকে উনি বললেন, সামনের দিকে তাকিয়ে থাকো, ডানে, বামে তাকাবা না। ঠিক আছে, অসুবিধা নাই। আমি সামনের দিকে তাকিয়ে আছি। কিছুক্ষণ ড্রাইভ করার পরে, মালিক আমাকে বললো এই আনিস, আমি গাড়ি থামাচ্ছি। আমাকে একটু ধর। রাস্তার পাশে বসে মালিক বমি করা শুরু করে দিল। যেখানে আমার মাতাল হওয়ার কথা, সেখানে উল্টা আমার মালিক মাতাল হয়ে আছে। ওনার সেবা শুশ্রুষা করতে হলো তখন। কিছুক্ষণ পরে একজনের ফোন পেলাম। কোম্পানির এক লোক এসে আমাদেরকে নিয়ে গেল। জাপানে আমি প্রথম শ্যাম্পু ব্যবহার করা শিখি, আমার জীবনে, শ্যাম্পু ব্যবহার জানতাম না। এইভাবে তিনমাস ছিলাম জাপানে। তিনমাস থাকার পরে দেশে ফিরে এলাম । আমার জীবনের প্রথম অর্জিত বেতন দিয়ে আব্বার কাছে টাকা পাঠানোর বদলে, কিনলাম এক ক্যামেরা। সমস্ত টাকা খরচ করে। আমাদের মধ্যে পাঁচজন থেকে গেল অবৈধভাবে আর আমি ক্যামেরা দুলাতে দুলাতে দেশে ফিরলাম। তবে আসার আগে অ্যাপ্লাই করে আসলাম স্টুডেন্ট ভিসার জন্য। এক বাঙালি ভদ্রলোক আমাকে এই পরামর্শ দিয়েছিলেন, তার নামটা আজ আর মনে নাই।
japan-3.jpg
দেশে ফেরার আগে আমি কাউকে জানাইনি, সবাইকে সারপ্রাইজ দিব বলে। মা বসে বসে তরিতরকারী কাটাকুটি করছিল, আমার চেহারা দেখে তার খুশি হওয়া তো দূরের কথা, মনে হলো সবকিছু হারাতে বসছে–এ ধরনের একটা অভিব্যক্তি তার চেহারায়।
প্রথমে বুঝতে পারিনি কেন, পরে বুঝতে পারলাম যে এত আশা করে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছে, এত টকা পয়সা খরচ করে, ছেলে ক্যামেরা একটা ঝুলিয়ে, দুই মাসের বেতন পকেটে নিয়ে এসে পড়ছে। হতাশ হওয়ারই কথা। এদিকে সবাইকে বলে যেতে লাগলাম, আসছি, আবার যাব, নিজে তো ভাল করেই জানি, স্টুডেন্ট ভিসা নাও হতে পারে।

আমার সাথে আরও চার-পাঁচজন ছেলে স্টুডেন্ট ভিসা করেছে, তাদের একজন বলল যে, ওর ভিসা হয়েছে। দ্বিতীয় আর একজন বলল, তারও ভিসা হয়েছে। এসব শুনে হঠাৎ করে চিন্তা করলাম যে একবার যাই গুলশান পোষ্ট অফিসে, খবর নিয়ে দেখি, আমারটা আসছে কিনা। ফারুক নামে আমার এক বন্ধু বলল গিয়ে খবর নে। পোষ্ট অফিসে গেছি, যাওয়ার পরে, এক ভদ্রলোক বলল–সমস্ত কিছু দেখে টেখে– হ্যাঁ একটা চিঠির মত তো আসছিল, জাপান থেকে আপনার নামে, কিন্তু ওটা তো ডেলিভারি করতে পারি নাই, বাড়িতে কেউ ছিল না আপনাদের। ওটা তো ফেরত চলে গেছে। এই কথা শুনে আমার তো মাথা খারাপ। বুদ্ধি করে তখন বললাম যে, আপনাদের এখানে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা কে। তার পদমর্যাদা মনে নাই-পোষ্টমাস্টার বা এধরনের কেউ আরকি-যাই হোক, ওনার সাথে দেখা করিয়ে দিল আমাকে। তাকে বললাম যে দেখেন, আমি আপনার ছেলের মত, আমার লাইফটা শেষ হয়ে যাবে। কোনভাবে কি কিছু করা যায়? বলল, বাবা তুমি এক কাজ করতে পার। চট্টগ্রাম যাও তুমি। চিটাগাং গিয়ে ওটা যদি জাহাজে উঠে না থাকে, তাহলে এখনও সম্ভাবনা আছে। আমি বললাম, কাকা, আপনি কাইন্ডলি একটা চিঠি লিখে দেন আমাকে। তিনি সেখানকার এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার কাছে একটা চিঠি লিখে দিলেন। চট্টগ্রাম পৌঁছালাম ঐ দিনই, রাত বারটার দিকে। তারপরের দিন ছিলো হরতাল। মনে নাই কোন হোটেলে ছিলাম, কেবল মনে আছে বাজারের মত একটা ছিল, আর পাশে একটা হোটেল, কোন রকম ঘুমানো যায় এরকম একটা হোটেল ছিল। অবশ্যই, কম পয়সার। ওখান থেকে পায়ে হেটে পোষ্ট অফিস পর্যন্ত গেলাম। বন্দরে গিয়ে দেখি সবাই তাস-টাস খেলছে। হরতাল, কাজ কর্ম নেই। সেখানে যাওয়ার পর বিস্তারিত জানালাম।

এক ভদ্রলোককে দেখে বললাম, আমি অমুকের সাথে দেখা করতে চাই। সেই ভদ্রলোক বলে দিলেন, কোথায় যেতে হবে। নিচের লোকজন বললো, এই তো জাহাজে উঠে গেছে সব। ওটাতো পাঠিয়ে দিতে হবে। আমি বললাম যে, আমাকে একটা সুযোগ দেন যাতে জাহাজের ভিতরে খোঁজ করতে পারি। বলল জাহাজে তো পাবা না। তার চেয়ে বরং জাহাজে যাওয়ার জন্য ঐ যে বিরাট একটা বাক্স কনটেইনারের মত, ওটার মধ্যে ভরা আছে। দেখ, তুমি যদি পার ওখানে খোঁজ করে দেখ। লাগলাম ঐটার পেছনে। প্রায় সাত আট ঘন্টা খোঁজার পরে, ঐ বান্ডিলটা পেলাম। বান্ডিলটা ওনার কাছে নিয়ে এলাম। উনি বার করে দিলেন। সেই চিঠি নিয়ে জাপান অ্যাম্বাসিতে গেলাম। ভিসা হল। এই হল দ্বিতীয়বার জাপান গমন।

তখন যে স্টুডেন্ট ভিসা নিয়েছিলাম রিকিওদায়দাকু মানে ওদের যে রিকিওদায়দাকু, জাপানের যে ছয়টা ভাল ভাল ইউনিভার্সিটি আছে তাদের একটাকে বলে রিকিওদায়দাকু, যদিও লাইফে একদিনও আমি রিকিওদায়দাকু যাই নাই। বিশ্ববিদ্যালয়টা একদম শহরের কেন্দ্রে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারে কাছে না গিয়ে আমি কাজে লেগে গেলাম আরকি, আর সবার মত। সেবার ওখানে ছিলাম দেড় বছর। বিভিন্ন ঘটনা ঘটছে এর ভেতরে।

দ্বিতীয়বার আমি যখন ঢাকা ত্যাগ করি তখন বিমানবন্দরে খুব একটা লোক যায়নি আমার বাড়ির তরফ থেকে। অনেক আগে একটা মেয়েকে প্রেম নিবেদন করেছিলাম আমি। মেয়েটা আমাকে পাত্তা দিতো না। বিমানবন্দরে গিয়ে চমকে উঠছিলাম আমাকে পাত্তা না দেওয়া সেই মেয়েটাকে দেখে। তার মানে সে আমাকে বরাবরই পাত্তা দিয়েছে, কিন্তু আমি তা জানতাম না। এই স্মৃতিটা মনে গেথে আছে আজও।

যাই হোক, প্রথম তো গিয়ে উঠলাম ব্যাংককে। ব্যাংককে ঢুকলাম এক হোটেলে। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। ব্যাংকক আমার কাছে তখন নতুন। যা দেখছি, মানে সবই, সবই নতুন। প্লেনে উঠতে গিয়ে একটু ভয় ভয় করছে। প্লেনের ভয় না, নতুন কিছুর ভয়।

ব্যাংককের যে বিমানবন্দর তখন ছিল, আর এখন ব্যাংককের যে বিমানবন্দর–আকাশ পাতাল পার্থক্য। সে সময়ই বাংলাদেশের চেয়ে একটু উন্নত ছিল ব্যাংককের এয়ারপোর্ট। থাইল্যাণ্ডও আলাদা। বাংলাদেশে থেকে যে পার্থক্য দেখলাম, বা দেখেছিলাম তা আলাদা। ওখান প্রচুর মটরসাইকেল। এখানে যেমন রিক্সা প্রধান, ওখানে ছিল মটরসাইকেল। হয়তো এখনও। সন্ধ্যা হয়ে গেল, খুব একটা দেখার অভিজ্ঞতা অবশ্য হয় নাই। আলো ঝলমলে ব্যাংকক তখন ছিল না। কিছু কিছু জায়গা ছিল আলো ঝলমলে। গোটা ব্যাংককে তেমন ছিল না। ব্যাংককের তখন প্রচুর নাম এশিয়ার হোর হিসাবে।

প্রচুর দেশ বিদেশের লোক আসত। আমরা ছয়জন এসে পৌঁছালাম। আমাদের তিনটা রুম দেওয়া হল একটা হোটেলে। স্বাধীন, ফারুক, আলম। আরো দুটো ছেলে ছিল। ওদের চেহারা মনে আছে, কিন্তু নাম ভুলে গেছি। যাই হোক, এর মধ্যে আমার জায়গা হল আলমের সঙ্গে। আলম তো আমাদের এখানকার বিখ্যাত শ্যুটিং পরিবারের ছেলে। দেশবিদেশ তার মোটামুটি ঘোরা ছিল। সে তাই বেরিয়ে গেল। একা একাই। আমি একদিন রেস্ট নিচ্ছি। একটু ঘুম ঘুম আসছে। হঠাৎ দরজায় টোকা। ভাবলাম আলম এসেছে হয়ত। ঘরে ঢুকে বলে, ‘এই শালা ভাগ! স্বাধীনের কাছে গিয়ে শুবি। আমি এখানে একা থাকব। কেন, কী ব্যাপার? দেখি ওর পেছনে একটা মেয়ে গুটিশুটি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। করার আর কিছু নেই। ওকে দিয়ে দিলাম জায়গাটা। আমি বেরিয়ে গেলাম। তখন ভোর হয়ে গেছে। উঠলাম, ঘুম থেকে।

খুব সকাল, সূর্যোদয় হচ্ছে। সূর্য আসছে। আমি আর স্বাধীন ঘুমাই এক বেডে। আর এক বেডে ওই ছেলেটা। আমি ভুলে গেছি তার নাম, দেখি জানালা দিয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে স্বমেহন করছে। আমি ভাবলাম নিচে অবশ্যই আকর্ষণীয় কোনো দৃশ্য আছে। নিচে গিয়ে দেখি, তেমন কিছুই না। একটা মেয়ে বিকিনি পড়ে আছে, যেটা নাকি একেবারেই সাধারণ একটা ব্যাপার ইউরোপ, আমেরিকায়।

পরেরদিন হোটেল ত্যাগ করার পালা। প্লেনের সময় হল। হোটেল থেকে আমরা চলে যাব, হঠাৎ করে হোটেলের লোক এসে আমাদের সবাইকে ধরল। ধরে সবার লাগেজ চেক করা শুরু করল। ভাষা তো বুঝি না তাদের। আমাদের সাথে যে ছেলেটা ছিল, যে আমাদের নিয়ে যাচ্ছিল গাইড হিসেবে সে সবার লাগেজ খুলতে বলল। সবার লাগেজ খুললাম। আমাদের একজন বাঙালির লাগেজে পাওয়া গেল হোটেলের তোয়ালে। দুটো বড় তোয়ালে। মনে মনে ভাবলাম, খাঁটি বাঙালি। দেশ থেকে বেরিয়েছ, তারপরও এধরণের। লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে গেল। দেখলাম, অন্য কারও কোন বিকারই নাই এ ব্যাপারে। আমি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছি সঙ্গীর কার্যকলাপ দেখে। সে বলল আমি মনে করেছি এই সমস্ত তোয়ালে দেয়া হয় নিয়ে যাবার জন্য। তাই নিয়ে যাচ্ছিলাম। বহিবির্শ্বে প্রথম বাঙালির অপকীর্তি প্রত্যক্ষ করলাম নিজ চোখে।

শেষ পর্যন্ত নারিতা বিমান বন্দরে এসে পৌঁছালাম আমরা। তখন এনট্রি ভিসা ছিল। কোন ভিসা না নিয়ে গেছি ওখানে। তেমন কোন প্রশ্ন করেনি। দেখলো, জিগগেস করলো কতদিন থাকবেন। বললাম, দিন পনেরো। কত ডলার আছে? সাতশ ডলার। ওকে। সিল কারে দিল। বিমানবন্দর থেকে যখন নামি, নামার পর যখন ওদের ট্রেনটা দেখলাম– এতদিন বুলেট ট্রেন বুলেট ট্রেন নাম শুনেছি খালি– প্রথম যে ট্রেনটা দেখলাম, সেটাকে আমার মনে হল এটা বুলেট ট্রেনই। ওরকমভাবেই মাথা চোখা, যেমনটা ছবিতে দেখছি। আমিতো খুবই, মানে কি বলা যায়, উৎসাহ আবেগ নিয়ে উঠেছি আরকি। ছাড়লও ট্রেন বুলেটের মত। নারিতা থেকে সাঁইসাই করে চলে আসল টোকিও পর্যন্তু। ওখান থেকে আর এক ট্রেন, সেটা আরও স্পিডি।

দেখলাম ট্রেনে ওঠার আগে এরা দাঁড়িয়ে থাকে একদম সুশৃঙ্খলভাবে। দরজার দু’পাশে। কোন লাইনও ধরে না আসলে। লাইন ধরা যে দরকার, তাও মনে করে না। ভিতরের লোকজন আগে নামে, নামার পর কিভাবে যেন যন্ত্রের মত কারও সঙ্গে গা না লাগিয়ে উঠে যায়। উঠে গিয়ে সুন্দর একদম জায়গামত বসে যায়। মানে খুব সুশৃঙ্খল একটা জাতি। মনে হল এই প্রথম বিশৃঙ্খলা থেকে শৃঙ্খলার মধ্যে গিয়ে পরলাম।

তবে একটা জিনিস খুব চোখে লাগল, এত সুশৃঙ্খল একটা জাতি, কিন্তু নিচে তাকিয়ে দেখি, সিগারেটের উচ্ছিষ্ট অংশে ভরা। এটা খুব অবাক লাগল আমার। কিভাবে এত পরিচ্ছন্ন একটা জাতি, সিগারেটের এই ফিল্টারগুলো ফেলে রাখে।

টোকিওতে এসে দেখি আরেক দৃশ্য। ট্রেন স্টেশনে একজনের পর একজন লোক আসে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নুডল্স খায়; ধূমায়িত নুড্লস, এত গরম যে দেখাই যায় না। দুই মিনিটে শেষ করে ফেলে। মানে, এমনভাবে টানে যে শেষে একটা চুমুক দেয়, দুই মিনিটে শেষ করে ফেলে হাতের খাবারটা। যেন দৌড়ের উপর আছে সবাই, এক ট্রেন থেকে নামলো, কাজটা করল, তারপর আরেক ট্রেনে গিয়ে উঠল। সবার যেন কোথায় যাওয়ার একটা তাড়া আছে। মানে তাড়াও ঠিক না; পালাচ্ছে– এরকম একটা ভাব। মনে হয় যুদ্ধে যাচ্ছে।
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (6) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন zakir hussain — জুলাই ১৩, ২০১৪ @ ১:৫৭ অপরাহ্ন

      লেখাটা পড়ে খূব ভাল লাগল।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন MRL — জুলাই ১৪, ২০১৪ @ ৫:০৭ পূর্বাহ্ন

      লেখাটি পড়ে ভাল লেগেছে, কিন্তু দ্রুত শেষ হয়ে গেছে। এ্ই কারণেই হয়ত অনেক ভাল লাগা থেকে বঞ্চিত হলাম। আশা করি লেখক আরো ডিটেইলস লিখবেন। আমরা আশা রাখি লেখকের এই বিষয়ে ধারাবাহিক বা সিকুয়েল উপহার দেবেন! অপেক্ষায় রইলাম।

      বিনীত – এম আর এল

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Saleh — জুলাই ১৪, ২০১৪ @ ৩:৪৪ অপরাহ্ন

      ভাই লেখাটি পরে ভাল লেগেছে। আবার কবে লিখবেন?

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন anisuz zaman — জুলাই ১৫, ২০১৪ @ ৩:০২ পূর্বাহ্ন

      thanks a lot for your comments. i never thought i shall share all of my personal experience with some one. But somehow and at long last it has come to being. anyway i am grateful to all of you and your time.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Kazi Ensanul Hoque,Tokyo — আগস্ট ১০, ২০১৪ @ ৯:০১ পূর্বাহ্ন

      ভাগ্যান্বেষণে যারা প্রবাসে আসেন তাদের প্রায় সবার শুরুর কাহিনি এরকমই। জনাব আনিসুজ্জামানের লেখাটি সুন্দর, সাবলীল। উনি জাপান ছেড়েছেন আর আমরা এখনও পড়ে আছি।
      দেশে থাকার, টিকে থাকার মধ্যে আছে শান্তি, স্বস্থি আর এক অন্যরকম আনন্দ।
      লিখুন আরও। গাম্বাত্তে কুদাসাই।

      কাজী ইনসানুল হক
      টকিও,জাপান
      সম্পাদক, পরবাস, জাপানের বাংলা কাগজ (porobas.com)
      জাপান কমিউনিটি (communityu.skynetjp.com)

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন হাসানুর — মে ৫, ২০১৭ @ ১২:২২ অপরাহ্ন

      দারুণ একটা ভ্রমন কাহিনী, কিন্তু লেখাটি মনে হলো দ্রুত শেষ হয়ে গেলো। প্রাণবন্ত একটা ফিনিশিং ছাড়া।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com