কবি তিনি প্রবীণতম বা নবীনতম

মুহম্মদ নূরুল হুদা | ৩০ জুন ২০১৪ ৮:৫১ অপরাহ্ন

border=0নব্বুই পার হয়েছেন বছর দুই আগেই। পরিমিত, প্রায়-নিশ্চিত পদক্ষেপে এগোচ্ছিলেন শতবর্ষের পথে। আমরা অপেক্ষা করছিলাম তাঁর সৃষ্টিশীলতার শতবর্ষ উদযাপন করবো তাঁকে সামনে রেখেই। আর কেউ নন; তিনি বাংলাদেশের বদলপ্রবণ কাব্যভুবনের প্রবীণতম কারুকৃৎ, কবি আবুল হেসেন। তাঁর কবিতাসমগ্র-র ফ্ল্যাপে সম্পাদক কবি মনজুরে মওলা যথার্থই লিখেছিলেন, ‘আমাদের প্রবীণতম কবি তিনি। হয়তো নবীনতমও, কে বলতে পারে।’ প্রবীণতম বলার পরপরই তাঁকে ‘হয়তো নবীনতম’ বলার কারণটাও মূলত কাব্যিক। কেননা তিনি সময় ও প্রবণতার দিকে চোখ রেখে সত্তুর বছরেরও অধিক কাল ধরে সৃষ্টিশীল পঙক্তিচয়নে বারবার পরিমিত পরিবর্তনের স্বাক্ষর রেখেছেন; অনেকটা সদ্য-প্রকাশিত নতুন কবির মতোই। ফলে সচেতন কাব্যচর্চার শেষমুহূর্ত পর্যন্ত তিনি কবিতা লিখেছেন কিশোর কবির প্রতিশ্রুতি ও পরিণত কবির পরিশীলনকে সম্পৃক্ত করে। বয়সকে সৃষ্টিশীল কৌশলে পরাজিত করার এই দক্ষতা খুব কম কবিই আয়ত্ত করতে পারেন। আবুল হোসেন সেই বিরলপ্রজদের একজন।
আর সেই তিনিই, সেই বিরলপ্রজ বার্ধক্যজয়ীই, হঠাৎ করে শারীরিকভাবে তিরোহিত হলেন। পরিণত বয়সেই চলেন গেলেন তিনি, তবু বলবো, হঠাৎ করেই গেলেন। সুদীর্ঘ জীবনে কোনো কিছুতেই খুব তাড়াহুড়ো করেননি। বৈষয়িক জীবনটা যেমন যাপন করেছেন ছক কেটে কেটে, তেমনি সৃষ্টিশীলতার পথেও হেঁটেছেন ধীর পদবিন্যাসে, পরিকল্পিত কাঠামো ও পরিমিত চরণ-সজ্জায়। তার সেই সুনিরীক্ষিত পথ-চলা পরবর্তী প্রজন্মের কবিদের জন্যে পরোক্ষ প্রেরণা হয়ে এসেছে। স্বীকার করি, আমার ক্ষেত্রেও তার অন্যথা হয়নি।

আমি তাঁকে দেখেছি বিশশতকের ষাট-দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে। কিন্তু হৃদ্যতা বলতে যা বোঝায়, তা হয়েছে তারও প্রায় border=0তিনদশক পরে। তখন আমি উপপরিচালক হিসেবে কাজ করছি বাংলা একাডেমির ভাষা ও সাহিত্য উপবিভাগে। একটা নিরাপদ ও সশ্রদ্ধ দূরত্বে থেকেছি বরাবর। কিন্তু যখনি কাছে গেছি তখনি শ্রদ্ধায় নুয়ে পড়েছি এই পিতৃপ্রতিম কবি-অভিভাবকের প্রতি। হ্যাঁ, বাংলাদেশের কবিতায় এই অভিভাবকত্ব তিনি বজায় রেখেছিলেন অর্ধ-শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে। তবে সরবে নয়, নিরবে; বলা যেতে পারে তর্করহিত সঙ্গোপনে। এর কারণও অবশ্য মানুষ ও কবি আবুল হোসেনের নান্দনিক নিসঙ্গতা, যা যে কোনো শুদ্ধাচারী স্রষ্টার সচেতন অন্বেষণ। সেই সৃজনসম্মত অন্বেষণের এক পর্যায়ে তিনি অনুবাদ করেছিলেন বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ভাষার বিভিন্ন কালের কবিদের কিছু প্রিয় পঙক্তি। সেগুলো একত্রিত করে বানিয়েছিলেন এক অত্যাশ্চর্য পাণ্ডুলিপি :border=0 অন্যখেতের ফসল। বাংলা একাডেমিতে ‘ভাষা ও সাহিত্য’ উপবিভাগে এসেছিলো সেই পাণ্ডুলিপি। ফলে মানুষ আবুল হেসেনের সঙ্গে সঙ্গে তার লেখার সঙ্গেও ব্যক্তিক পরিচয় লাভের সুযোগ পাই। এই পাণ্ডুলিপিটি গ্রন্থাকারে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়েছে জুন ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে (শ্রাবণ ১৩৯৭)। এটি অনূদিত গ্রন্থ হলেও মৌলিক কবিতার মতো সুপাঠ্য ও উত্তীর্ণ। এতেই অনুমিত হয় কত গভীর কত নৈর্ব্যক্তিক কাব্যবোধ ও পুনঃসৃষ্টির শক্তি নিয়ে এসেছিলেন এই কবি। প্রথম কাব্য নব বসন্ত (১৯৪০, উৎসর্গ : কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) থেকে শুরু করে সর্বশেষ কালের খাতায় (২০০৮) শীর্ষক মাত্র আটটি (অগ্রন্থিত কবিতা বাদে) মৌলিক কাব্যে শব্দবিন্যাসে, পঙক্তির বৈচিত্রায়নে, উচ্চারণের মৌলিকতায়, ভুয়োদর্শনে, ব্যঙ্গে, সরস সহজতায় তিনি যে কাব্যভুবন নির্মাণ করেছেন, তা তাঁর সৃষ্টিসত্তার অনন্যতারই স্বাক্ষরবহ। একই সঙ্গে তা উত্তরকালের কবিতাসাধকের জন্যে পাঠযোগ্য কাব্যভাষ্য। এদেশের মাটি, মানুষ, সমাজ, ভাষা, সংস্কৃতি, জাতি থেকে শুরু করে বিগত একশ শতাব্দীর বাঙালির ইতিহাসের প্রায় সব বিষয়কেই তিনি কোনো-না-কোনোভাবে ধারণ করেছেন তাঁর কবিতায়। কিন্তু কখনো বক্তব্যকে তুলে ধরতে গিয়ে যেমন উচ্চকণ্ঠ হননি, তেমনি প্রতিপাদ্যকে গৌণ করে মেতে ওঠেননি অতিনান্দনিকতায়।

বেশভূষায় যেমন শেষাবধি পরিপাটি, সৃষ্টিসৌকর্যেও তার পরিপূর্ণ অনুবর্তী। ফলে তাঁর দিকে তাকিয়ে আমরা সনাক্ত করেছি একজন সুচর্চিত কবির পরিশ্রুত প্রতিকৃতি। তিরিশোত্তর বাংলা কবিতার ধারার সঙ্গে তিনি যুক্ত করেছেন তাঁর পাঠসমৃদ্ধ বিশ্বকবিতার নানাকৌণিক প্রবণতাও। ফলে বাঙালি কবি হয়েও তিনি বিশ্বকবিতার সঙ্গে সম্পৃক্ত। স্ট্রুগা কবিতাসম্মেলনে গিয়ে তিনি সমকালীন বিশ্বকবিদের একাংশের সঙ্গে মিশতে মিশতে তাঁদেরকে নিয়ে কবিতা লিখে বসেন; কিংবা দূরদেশে ভ্রমণে গিয়ে এক কালো কাঠবেড়ালিকে পিকাসোর মূর্তির উপর বসে পড়তে দেখে স্মরণ করেন ইয়েট্সকে। এই নিয়ে তিনি লেখেন অ্যাবসার্ড ভাবনার অন্যরকম এক কবিতা (‘প্রিন্সটনে কালো এক কাঠবিড়ালি’)। নব্বুই-অতিক্রমী তরুণ কবি আবুল হেসেনের এই হচ্ছে মৃত্যু-অতিক্রমী বদলপ্রবণতা। তাঁর প্রতি উত্তরপ্রজন্মের বিনম্র শ্রদ্ধা।
৩০.০৬.২০১৪
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন manir yousuf — জুলাই ২, ২০১৪ @ ২:২৮ পূর্বাহ্ন

      অগ্রজের প্রতি অনুজের শ্রদ্ধামূলক এই লেখাটি কবি আবুল হোসেন সম্পর্কে আমাদের অনেক জানার সুযোগ করে দিয়েছে। ধন্যবাদ লেখক কবি মুহম্মদ নূরুল হুদাকে।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com