ফখরুজ্জামান চৌধুরীকে স্মরণ করা, না-করা

অলাত এহ্সান | ২৭ জুন ২০১৪ ৪:০৫ অপরাহ্ন

border=0পাঠের প্রথম বেলায় রিপভ্যান উইংকল নামক একটি অনুবাদ গ্রন্থ আমিও পড়েছিলাম, নীলক্ষেতে পুরনো বইয়ের মার্কেটের ফুটপাত থেকে সংগ্রহ করে। আমার তখন পাঠের সময়, যাকে বলে গোগ্রাস। তখন তা পড়েছি মাত্র, বলা যায়, রিপভ্যান উইংকল পাঠের আনন্দটা শুধু নিয়েছি। কিন্তু পাঠের যে দায়, অনেকের মতো, আমিও বোধ করিনি। লেখকে যে নার্সিংটুকু দেয়া উচিত, অর্থাৎ লেখক সম্পর্কে, তার অপরাপর গ্রন্থ সম্পর্কে জানা, অন্যকে জানানো; ‘পারলে’ লেখকের সঙ্গে যোগাযোগ, আলাপ ইত্যাদি–যার ফলে একজন লেখক লেখায় উৎসাহ বোধ করেন–তা কিছুই করিনি। অনুবাদ পাঠের ঝুলিটা একটু সমৃদ্ধ হলে, বাজারে প্রচলিত অনুবাদ নামের দস্তাবেজ পাঠের প্রতি ভক্তি উঠে যেতে লাগলে, মনে পড়ে রিপভ্যান উইংকল নামে একটা সু-অনুবাদ পাঠ করে ছিলাম। নিজেও অনুবাদে হাত মকশো করতে গিয়ে রিপভ্যানের মতো বহু বছর পর ঘুম ভাঙলো– এ মোটেই বালখিল্য নয়, বেশ কঠিন কাজ। আর অনুবাদকে ‘অনুবাদ সাহিত্য’ হয়ে ওঠা তো আরো দুরূহ ব্যাপার। ততদিনে রিপভ্যান উইংকল বইটির মতো অনুবাদকের নামও আমার মাথা থেকে বেহাত হয়ে গেছে। গত ১৬ জুন, বিডিনিউজটোয়েন্টিফোর ডটকম-এ, দেশের আরেকজন অনুবাদক ও কবি রাজু আলাউদ্দিনের একটি লেখা থেকে মনে পড়লো, আমার বিস্মৃত হয়ে যাওয়া লেখকের নাম ফখরুজ্জামান চৌধুরী। তিনি ছিলেন একাধারে অনুবাদক, কথাসাহিত্যিক, সাহিত্য সমালোচক ও শিশুসাহিত্যিক। অথচ আমরা তার অনুবাদক পরিচয়ের বাইরে কিছু জানতামই না! ফখরুজ্জামান চৌধুরীর নামটি যখন খুঁজে পেলাম, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে; জানলাম, গত ১২ জুন তাঁর মহাপ্রয়াণ ঘটেছে। বেশ দুঃখজনক, বুকের ভেতর খচ খচ করতে লাগলো। তবে একটি বিষয় ভালো লাগলো, ফখরুজ্জামান চৌধুরীকে কেউ কেউ সমাজ থেকে সম্পূর্ণ গুম হয়ে যেতে দেননি। একটি প্রশ্ন বারবারই আমাকে শরবিদ্ধ করেছে, রাজু ভাই তার লেখায় যে চিন্তা, যে উদ্বেগ উসকে দিয়েছেন, আমরা ভবিষ্যতেও তা এড়াতে পারবো কি?

ফখরুজ্জামান চৌধুরী যেসব পরিচয়ে পরিচিত ছিলেন তার মধ্য সবচেয়ে উচ্চকিত–অনুবাদক। অনুবাদক ব্যতীত অন্য কিছু হলে কেউ সাহিত্য পরিসরে স্থায়ী হন, তা বলতে পারি না যদিও; তবু মনে হয়, অনুবাদক হিসেবে পরিচিত হওয়ার কারণেই তিনি দ্রুত বিস্মৃত হয়েছেন। তার কারণ, আমাদের দেশে অনুবাদ এখনো সাহিত্যের মর্যাদা পায়নি, কিংবা অনুবাদ নিজেই সাহিত্য হয়ে উঠতে পারেনি। অস্বীকার করার সুযোগ নেই, আমাদের দেশে এখন অজস্র অনুবাদ হচ্ছে। অনুবাদকের সংখ্যাও কম নয়। জগৎখ্যাত আর্হেন্তাইন গল্পকার হোর্হে লুইস বোর্হেসের সাহিত্যের অনুবাদক নরমান টমাস ডি জোভান্নির সম্পর্কে একবার রাজু আলাউদ্দিন মজা করে বলেছেন– ‘বিশ্বস্ত বিশ্বাসঘাতক’। আমাদের দেশের অনুবাদকদের অধিকাংশের মধ্যে বোধ হয় সেই ‘বিশ্বস্ততা’ নেই, আছে বিশ্বাসঘাতকতা। বিশ্বস্ততা না থাকার ফল আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। ফলে তারা পাঠকের কাছে ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবেই চিহ্নিত ও উপেক্ষিত হন। সাহিত্যের স্বীকৃতি পান না।

প্রতিবছর একুশে বইমেলায় তো কত শত অনুবাদ গ্রন্থ দেখি। বই মেলা এলেই অনুবাদক পাড়ায় তড়িঘড়ি, ফরমায়েসি অনুবাদের হিড়িক পড়ে যায়। বিশেষ করে প্রতিবার সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার, ম্যান অব বুকার পুরস্কার ঘোষণা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশকরা পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক-লেখিকাদের গ্রন্থ অনুবাদে উৎসাহী হয়ে পড়েন। পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক-লেখিকার লেখার মান, ভাষা, দেশ ইত্যাদি বিচেনা ব্যতিরেকে, তার লেখা অনুবাদ সবচেয়ে কে ভালো করবেন, তা বিবেচনা না করে ফরমায়েস দেয়া হয়। অনেক উৎসাহী অনুবাদক আছেন, এই পুরস্কারের দিকে তাকিয়ে থাকেন। এতে অনুবাদের কী মান দাঁড়ায়, তা পাঠক মাত্রই বুঝেন। অনেক সময় দেখা যায় কলকাতার কোনো অনুবাদকের বই প্রায় হুবহু নকল করে নিজের নামে ছাপিয়ে দিয়েছেন। এ জন্য দু-এক ‘জন’-এর (তাকে নিশ্চয়ই অনুবাদক বলা যায় না) জরিমানা হওয়ার কথাও জানা যায়। এদের কারণে প্রকৃত অনুবাদক হারান তার প্রাপ্য সম্মান, বিস্মৃত হয়ে যান সহজেই। তাই কেউ অনুবাদ সাধনায় নিয়োজিত হতে চান না। অনুবাদ ‘কপি-পেস্ট’ বা ‘গুগল ট্র্যান্সলেট’-এর পর্যায় পড়ে যায়। কিন্তু অনুবাদ তো শুধু ভাষান্তর নয়, একটা ভাষাভাষী মানুষের সংস্কৃতির গভীর থেকে তুলে আনতে হয় সাহিত্যকে অনুবাদের জন্য। গভীর পঠন-পাঠন থাকতে হয় সে বিষয়ে। থাকতে হয় অনুসন্ধিৎসা, অধ্যবসায়, নির্মোহতা। তবেই তো অনুবাদ। কিন্তু এসব ভেবে আর করছে কয়েকজন? দু’চার জন যারা আছেন তারা এইসব অ-অনুবাদকের ভিড়ে ততটা প্রতিভাত হন না। তাই বলে, ফখরুজ্জামান চৌধুরীকে পাঠের দায় ও সাহিত্যে তার অবদান আমরা অস্বীকার করতে পারি না। প্রকাশক এবং পাঠকের দায়িত্ব প্রকৃত অনুবাদক খুঁজে বের করা।

নোবেলজয়ী সাহিত্যিক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস বলেছেন, সবাই বরফ নিয়ে সাহিত্য করেন, আর আমি বরফ ছুঁয়ে যে অনুভূতি তাই নিয়ে লিখি। অনুবাদ নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রথমেই এই প্রশ্ন ওঠে, অনুভূতির কি অনুবাদ সম্ভব? মার্কেস লিখেছেন তার নিজস্ব ভাবাবহে। তার সেই ভাবের কি অনুবাদ হয়? সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্ন হলো এই, আসলে কোনো ভাষাই কি মানুষের অনুভূতির সবটুকু বহন করতে পেরেছে? পারেনি। যে কারণে মানুষ তার মনের ভাব প্রকাশের জন্য ভাষা ছাড়াও অনেক মাধ্যমের বিকাশ ঘটিয়েছে। ভাষার এই সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে নিয়েও বলা যায়, বিদেশি ভাষার সাহিত্যকে আহরণ করার ক্ষেত্রে অনুবাদের কি কোনো বিকল্প আছে? শুধু সাহিত্য নয়, একটি জাতিকে জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ হওয়ার ক্ষেত্রে অনুবাদ অত্যন্ত জরুরি। যে কারণে দেখা যায়, সোভিয়েত ইউনিয়নে (বর্তমান রাশিয়া) সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর, সারা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সাহিত্য ও গবেষণাগুলো সোভিয়েত ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে। সে কাজে নানা বিচ্যুতি ও সীমাবদ্ধতা থাকলেও, এটা স্বীকার করতে হবে, তারা অত্যাবশ্যকীয় কাজটিই করেছেন। রাষ্ট্রীয়ভাবে জনগণের জন্য অনুবাদগুলোকে সহজলভ্যও করেছিলেন। আবার তারা নিজেদের সাহিত্য বিশ্বের কয়েকটি ভাষায় অনুবাদ করে ছড়িয়ে দিয়েছেন। সে বইগুলো আমাদের দেশেও আসতো। অস্বীকার করার সুযোগ আছে কি, ষাট ও সত্তরের দশকে সোভিয়েত সাহিত্যের অনুবাদ পাঠ আমাদের সাহিত্যমানসে প্রভাব ফেলেনি? এখন বাংলা একাডেমি থেকে অনুবাদ সাহিত্যে পুরস্কার দেয়া হয়। এই পুরস্কার আমাদের অনুবাদ সাহিত্যে কী অবদান রাখছে, তা এখনো আমাদের কাছে দৃশ্যমান নয়। কিন্তু অনুবাদে এই পুরস্কার যে গুরুত্বপূর্ণ তা, অনস্বীকার্য। ফখরুজ্জামান চৌধুরী তার অনুবাদ ও সাহিত্য কর্মের জন্য ২০০৫ সালে এই পুরস্কার পেয়েছিলেন, তৃপ্তি এটুকুই। ২০০৫ সালে ফখরুজ্জামান চোধুরীর পুরস্কার প্রাপ্তি আর মৃত্যু পরবর্তী স্মরণ না হওয়ার মধ্যে একটা সংযোগ খতিয়ে দেখা যেতে পারে। আমাদের দুর্ভাগ্য, একজন লেখকের পুরস্কার প্রাপ্তি নিয়েও দলীয় সরকার ক্ষমতায় থাকা না-থাকার কথা ভাবতে হয়। ফখরুজ্জামান চৌধুরী কর্মজীবনে রাষ্ট্রীয় একমাত্র টিভি চ্যানেল বিটিভির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিলেন। রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজনৈতিক দল বদলের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রের অপরাপর প্রশাসনের মতো বিটিভির কর্মচারী-কর্মকর্তাদের মাঝেও ব্যাপক রদবদল ঘটে। দায়িত্বে ক্ষমতাসীনদের অনুসারী ব্যক্তিরা। ফলে রাষ্ট্রীয় টিভি চ্যানেল হয়ে ওঠে দলীয় টিভি চ্যানেল। বাংলা একাডেমির পুরস্কার প্রায়শ এই দোষে দুষ্টু হতে দেখা যায়। তাই ফখরুজ্জামান চৌধুরীর চাকরি জীবন ও সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্তির সময় দ্বারা ‘চিহ্নিত’ হয়, তৎকালীন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক ছিল। যে কারণে রাজু ভাই যখন ফখরুজ্জামান চৌধুরীর বিস্মৃত হওয়া নিয়ে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার শঙ্কা করেন, তখন তাকে উড়িয়ে দেয়া যায় না। সে সঙ্গে দেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকার পাতাগুলো যখন ফখরুজ্জামান চৌধুরীর মৃত্যুকে বেমালুম চেপে যায়, তখন বুঝতে বাকি থাকে না, তাদের অবস্থান কী। কিংবা সাহিত্য পাতার সংকট কোথায়। তাতে দুঃখ করারও কিছু থাকে না। এই জন্য যে, কোনো পত্রিকার সাহিত্যপাতা যদি সাহিত্য ও সাহিত্যিক আবিষ্কার বাদ দিয়ে ‘ঘরানা’ স্টাবলিস ও মেনটেইন করতে চায়, সেখানে ফখরুজ্জামান চৌধুরী বিস্মৃত হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। তাদের কাছে দায় স্বীকার আকাঙ্ক্ষার বাহুল্য বৈ কি।

রাজনৈতিক সংস্রবের কারণে ‘লেখক বাদ পড়া’র সংকট ফখরুজ্জামান চৌধুরীর একার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। অনেকের বেলাই তা সত্য। বিশেষ করে উত্তর-ঔপনিবেশিক দেশে এই সংকট অনেক বেশি প্রকট থাকে। আমাদের দেশে সুযোগ ছিল, মুক্তিযুদ্ধোত্তর সময়ে মুক্তিযুদ্ধকে সুসংহত করার মধ্য দিয়ে এই সংকট কাটিয়ে ওঠার। তা হয়নি। এর ফলে এতবছর পরেও স্বাধীনতাকে হুমকির মুখে পড়তে দেখি।

এ দেশে লেখকের গুণ বিচার হয় না। হয় দল বিচার। যারা দলীয় লেজুরবৃত্তি, রাষ্ট্রীয় প্রলোভন উপেক্ষা করেন, তারা হয়ে যান রাষ্ট্রের কাছে অপাক্তেয়। যারা দলীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেন, তারা উপেক্ষিত হন অপর দল দ্বারা। তারপরও অনেক লেখক তার লেখনির স্বীকৃতি, সামান্য সম্মান, সেই সঙ্গে স্বাচ্ছন্দ্যে বাঁচার আশায় রাজনৈতিক দর্শন চর্চার পরিবর্তে রাজনৈতিক ভোজবাজিতে মত্ত হয়ে পড়েন। বিকিয়ে দেন লেখনিসত্তা। এমন লেখক অনেক আছেন, যারা দলীয় লেজুড়বৃত্তি করেই দিন গুজার করে দিচ্ছেন।

লেখকের রাজনৈতিক সংগ্রামের যে দুটি ধারা–রাজনৈতিক সংস্কৃতি কিংবা সাংস্কৃতিক রাজনীতি– তা শক্তপোক্ত নয়। বোধ করি, এর কোনোটাতেই ফখরুজ্জামান চৌধুরীর বিশ্বাস ছিল না। যে কারণে তার পক্ষে সহজ হয়েছে দলীয় রাজনীতির তকমা লাগানো। তিনি সেই বিরলপ্রজ সাহিত্যিক নন, যারা রাষ্ট্রের প্রলোভনকে উপেক্ষা করতে পারেন। এখানে একটি কথা বলে রাখা দরকার, দলীয় রাজনীতি করলেই যে তার কর্মদক্ষতা উবে যায়, তা কিন্তু নয়। তবে দেশে বিদ্যমান রাজনীতি যে উদারভাবে কাউকে স্বীকৃতি দিতে পারে না, তা সত্য। যদি পারতো তবে বাংলাদেশে অনুবাদ সাহিত্যের বিকাশের ক্ষেত্রে ফখরুজ্জামান চৌধুরীর যে অবদান, তা সবসময়ই স্বীকৃতি পেত। এই দলবাজি ব্যবস্থা ও চর্চা যত দিন থাকবে, ফখরুজ্জামান চৌধুরীরা বিস্মৃত হয়েই যাবেন। আমাদের অপরাধ হলো, তার নিপাট সাহিত্য কীর্তির জন্য যে সম্মান প্রাপ্য, আমরা তা দিতে পারিনি। এ লজ্জা প্রতিটি সৎ পাঠকেরই। নিঃসন্দেহে, একজন লেখক এইভাবে হারিয়ে যেতে পারেন না। রাজু আলাউদ্দিনের উদ্বেগ এই হারিয়ে যাওয়া নিয়ে। উদ্বেগ আমাদেরও, এমন দীনতা নিয়ে আমরা কি কোনো সৎসাহিত্য ও সাহিত্যিকের আশা করতে পারি?

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অভিজিৎ মুখার্জি — জুন ২৮, ২০১৪ @ ১২:২১ পূর্বাহ্ন

      একেবারে প্রকৃত অর্থেই ‘অনেক’গুলো খুব জরুরি কথার উপস্থাপনা করা হয়েছে এই লেখায়। কিন্তু একটা মুশকিল হচ্ছে যাঁরা এর অধিকাংশ ইস্যু নিয়ে খুব একটা ভাবিত নন তাঁদের কি আদৌ লেখার মাধ্যমে তেমন ভাবানো যায়?

      লেখকের প্রতি অনুবাদকের বিশ্বস্ততার কথা এসেছে। অথচ আমরা জানি, অনেক সময়েই রোলাঁ বার্থের সেই বিখ্যাত উক্তি, “দ্য অথর ইজ ডেড” পরিস্থিতির মুখোমুখি অনুবাদককে হতে হয়। অর্থাৎ লেখকের অবস্থান টেক্সটটি থেকে নির্ণয় করা অনুবাদকের পক্ষে পুরোপুরি সম্ভব হয়না। এছাড়াও, ভাষাগত নান্দনিকতার দিকটিও সবসময়ই অনুবাদকের কাছে একটা বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। যেমন ধরা যাক, কেউ যদি সুকুমার রায়ের ছড়া কিংবা গদ্য অনুবাদ করতে যান, খুব তৃপ্ত হওয়া কখনোই তাঁর পক্ষে সম্ভব হবে না। আমি নিজে খুব কৃতি অনুবাদক মোটেই নই, আমি যেটুকু দায়িত্ব নিজের ওপর চাপাই অনুবাদ করতে গিয়ে সেটা হল, যেকারণে আমি চাইছি যে অন্যেরাও এই লেখাটা পড়ুক এবং তাতে সাহায্য করতেই অনুবাদে উদ্যত হয়েছে, সেই কারণটা যেন অক্ষুণ্ণ থাকে। এতে বিশ্বস্ততায় হানি হওয়ার ঝুঁকি যে একেবারে থাকে না তা তো নয় !

      রাজনীতির থেকে লেখাকে তো নয়ই, লেখককেও বা অনুবাদককেও বিযুক্ত করা যায় না, প্রয়োজন উলটোটাই। লেখকের, অনুবাদকের একটা রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি/চাহিদা লেখাটির মধ্যে অন্তর্লীন না থাকলে, লেখা টানে না, জোলো হয়ে যায়। ক’জন অনুবাদক বা লেখক শক্তিশালী রাজনৈতিক স্বার্থের আশ্রয়ে চলে গেলেও ক্ষতি কিছু তেমন হয় না যদি আরও বহু লেখক/অনুবাদক অন্যান্য বিভিন্ন রাজনৈতিক মেরু থেকে নিরন্তর প্রশ্ন তুলে যান। তখন সরকারি আশ্রয়পুষ্ট লেখক/অনুবাদকটিও বাঞ্ছিত দ্বান্দ্বিকতার মধ্যে জড়িয়ে পড়ে কাজ করতে বাধ্য হন। আমাদের দুই বঙ্গেই যে এটি তেমন ফলপ্রদ হচ্ছে না তার কারণ, সত্যি বলতে কি, আমাদের আসলে তেমন কোনও রাজনীতিই নেই ! অনুবাদক সাহিত্যের/চিন্তার দিগন্তটিকে বিস্তৃত করেন, আমরা তো রাজনীতির অভাবে কেবল চুপসে যাচ্ছি, দিগন্ত দিয়ে কী করবো ?

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আমিনুল বারী শুভ্র — জুন ২৮, ২০১৪ @ ১০:৪৫ পূর্বাহ্ন

      লোরকার অসাধারণ নাটক ‘ইয়ারমা’র অসাধারণ অনুবাদ’টির কথা মনে পড়ছে। যেন ওটা ছিল একটা দীর্ঘ কবিতা পড়ার অনুভুতি ।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com