গড়া ও ভাঙা। গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস : নিঃসঙ্গতার একশ বছর (দ্বিতীয় পর্ব)

জি এইচ হাবীব | ২২ জুন ২০১৪ ৫:৫৬ অপরাহ্ন

আন্দ্রে ব্রিঙ্ক : দক্ষিণ আফ্রিকার স্বনামধন্য কথাসাহিত্যিক। জন্ম ১৯৩৫ খৃষ্টাব্দ। দেশের বর্ণ বৈষম্য নীতির সমালোচনার কারণে আফ্রিকানস ভাষায় রচিত তাঁর উপন্যাস ‘Kennis van die aand’ নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। তখন তিনি নিজেই সেটি ইংরেজিতে অনুবাদ করে ‘Looking on Darkness’ নামে প্রকাশের ব্যবস্থা করেন বিদেশ থেকে। ‘গড়া ও ভাঙা। গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস : নিঃসঙ্গতার একশ বছর’ ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত লেখকের দ্য নভেল : দ্য ল্যাঙ্গুয়েয এন্ড ন্যারেটিভ ফ্রম সার্ভান্তেস টু কালভিনো গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত প্রবন্ধ ‘মেকিং এন্ড আনমেকিং. গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস : ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অভ সলিচুড’ প্রবন্ধের অনুবাদ। অনুবাদ করেছেন বাংলাদেশে নিঃসঙ্গতার একশ বছর-এর অনুবাদক জি এইচ হাবীব। এর আগে প্রকাশিত হয়েছিলো প্রখম পর্ব । আজ প্রকাশিত হচ্ছে দ্বিতীয় পর্ব।

border=0২। নিঃসন্দেহে, টেক্সট-এ হিস্পানিভাষী মাকোন্দোর প্রেক্ষিতে নানান বিদেশী ভাষার উল্লেখের বাড়-বাড়ন্ত উপন্যাসটিতে ভাষার ভূমিকার ব্যাপারে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রারম্ভিক আভাস দেয়। গনযালেস যেটা এরি মধ্যে দেখিয়েছেন (১৯৮৭:৬৬-৮), মাকোন্দোর ভাষা আর জিপসিদের ভাষার মধ্যে একটা ফারাকের কথা গোড়ার দিকে বলা হয়েছিল যখন সেই জিপসি মেয়েটার কানে ফিসফিসিয়ে বলা হোসে আর্কাদিওর আদুরে খিস্তিগুলো ‘আরেক ভাষায় অনূদিত হয়ে বেরিয়ে আসে মেয়েটির মুখ থেকে।’ আর্কাদিও আর আমারান্তাকে গুয়াজিরো ভাষা শেখায় পরিবারে রাজ-ভৃত্য ভিসিতাসিওঁ; রেবেকা যখন এসে পৌঁছয়, দেখা যায় সে-ও কথা বলতে পারে গুয়াজিরো ভাষায়। হিস্পানি আর জিপসিদের ভাষার পাশাপাশি আরো অনেক ভাষা ছাড়াও মেলকিয়াদেস জটিল এক জগাখিচুড়ি ভাষায় কথা বলে; আঙ্গিনায় কাঠবাদাম গাছের নিচে যখন তাকে বেঁধে রাখা হয়েছে, সেই বুড়ো বয়েসে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া এক অদ্ভুত ভাষায় কথা বলে, যেটা — পরে আবিষ্কৃত হয় — লাতিন; হোসে আর্কাদিওর হিস্পানি হচ্ছে ‘নাবিকদের খিস্তিতে ভরা’ আর তার অসাধারণ পৌরুষের ‘পুরোটাই লাল নীল কালিতে জড়ানো, নানান ভাষার শব্দের উল্কি আঁকা’; পিয়েত্রো ক্রেসপি পেত্রার্কের সনেট অনুবাদ করে; মেলকিয়াদেসের পাণ্ডুলিপি, যা বুয়েন্দিয়া পরিবারের ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছরের’ পরম সূত্র হাজির করে, সেটা সংস্কৃতে লেখা, আর সেটা অনুবাদ করতে গিয়ে কনিষ্ঠতম অরেলিয়ানোকে কেবল সংস্কৃতই নয়, ইংরেজি, ফরাসি, আর খানিকটা লাতিনও শিখতে হয়, আবার অন্যদিকে পাপিয়ামেন্তো ভাষাও শিখে ফেলে সে; গনযালোর দেয়া উদাহরণগুলো ছাড়াও হিস্পানি ছাড়া অন্যান্য ভাষাও নাছোড়বান্দার মতো অনুপ্রবেশ করে মাকোন্দোর জগতে; ‘সুন্দর দেখতে নারী-পুরুষ বাস করে আর শিশুসুলভ ভাষায় কথা বলে’ এমন একটা ইউটোপিয়ার স্বপ্ন দেখে আমারান্তা; আর্কাদিও ইন্ডিয়ানদের সঙ্গে কথা বলে তাদের নিজেদের ভাষায়; মি. হার্বার্টকে যে বাইরের লোক হিসেবে চিহ্নিত করা হয় তার কারণ হলো সে ‘ভাঙা হিস্পানিতে’ কথা বলে; যেসব শব্দ উচ্চারণ করা ঠিক নয় সেগুলো এড়ানোর জন্য ফারনান্দা — আমরা আগেই উল্লেখ করেছি — তার নিজস্ব একটা ভাষা আবিষ্কার করে; মি. ব্রাউনকেও আলাদা হিসেবে চিহ্নিত করা হয় তার ‘অদ্ভুত ভাষার কারণে’; মেমে তার বন্ধুদের কাছে ইংরেজি শেখে কলা কোম্পানির এনক্লেভে বসে; বুড়ো কাতালোনীয় বই বিক্রেতা তার মাতৃভাষায় কথা বলে; দাওয়াখানার বোতলের লেবেলগুলো লাতিনে লেখা; যে-বিশ্বকোষ থেকে অরেলিয়ানো সেগুন্দো তার বাচ্চাদের শেখায় সেটা লেখা ইংরেজিতে, ইত্যাদি ইত্যাদি।

কিন্তু, যাকে বলা যেতে পারে ‘বস্তুর ভাষা’ তা-ও আছে বুয়েন্দিয়া পরিবারের বা সংসারের নানান রহস্যময় ঘটনার মধ্যে ( যেমন সেই খালি ফ্লাস্কটা যেটা নিজে নিজেই এতো ভারি হয়ে যায় যে সেটাকে আর নাড়ান যায় না, বা সেই পাত্র ভরা পানি যেটা আগুন ছাড়াই গরম হতে থাকে, যেটা হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া আর অরেলিয়ানো খেয়াল করেছিল, ‘কিন্তু ব্যাখ্যা করতে পারেনি, বরং জিনিসটার ভবিষ্যদবাণী হিসেবে দেখেছিল’। যে অংশে মেমেকে মাকোন্দো থেকে সরিয়ে কনভেন্টে নিয়ে যাওয়া হয়, সেখানে সেই তরুণী — চিরতরে কথা বলা বন্ধ করে দিয়ে — এমন এক ভূদৃশ্যর ভেতর দিয়ে ভ্রমণ করতে থাকে যা দেখে মনে হয় তা যেন ভাষাহীন, যদিও আসলে সেটি ছিল এমন এক ভূদৃশ্য যা নিজেই নিজেকে একটি অত্যন্ত উচ্চমার্গীয় ভাষায় পরিণত করে ফেলেছে, এবং মেমে-র হয়ে ( যে কিনা কিছুই দেখে না কিছুই শোনে না) বর্ণনাকারী সেটাকে পড়তে থাকে, যেন একটা বই সেটা, তার মধ্যে পাঠককে ফুরসত দেয় মাকোন্দোর গোটা ইতিহাসটাকে পুনরাবিষ্কার করার।

এ-ধরনের অন্য কোনো চিহ্নায়ক পদ্ধতির অস্তিত্বের ব্যাপারে একবার পাঠক সতর্ক হয়ে পড়ার পরে প্রক্রিয়াটি বিস্তার লাভ করে। সেখানে রয়েছে ভবিষ্যতের একটা ভাষা যা পিলার তারনেরা পড়ে তার তাসগুলোর মধ্যে। আছে অতীতের একটা ভাষা যা কেবল বিস্তীর্ণ পতিত জলাভূমির মধ্যে আটকে পড়া পালতোলা হিস্পানি জাহাজ বা পানির নিচে ডুবে থাকা এক প্রস্থ বর্মের মতো কিছু সংকেত উদ্ধার করেই কেবল পড়া যেতে পারে। আছে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার ভূতের ভাষা যা কেবল তার প্র-প্র-প্র দৌহিত্র অরেলিয়ানোই পড়তে পারে। পিলার তারনেরার সঙ্গে প্রথমে হোসে আর্কাদিও ও পরে অরেলিয়ানোর মধ্যে সাক্ষাতের মাঝে যৌনতার ভাষা আছে, যা সামাজিক লেনদেনের ভাষার চাইতে সুনির্দিষ্টভাবে ভিন্ন; ঠিক যেমন আছে অরেলিয়ানো সেগুন্দো আর পেত্রা কোতেসের মধ্যে সাক্ষাতের মাঝে (যা তার ভাবাবেগগত দিক থেকে অবদমিত স্ত্রী ফারনান্দার সঙ্গে তার সম্পর্কের বাচনিক প্রকাশের চাইতে একেবারেই ভিন্ন); আর শেষ অব্দি আছে ‘লিরিকাল সর্বগ্রাসিতা’-র এক ভাষা, কনিষ্ঠতম অরেলিয়ানো আর তার ফুপু আমারান্তা উরসুলার মধ্যে, যা শুরু হয় লক্ষণীয়ভাবে, দুজনের এক প্রণয়াবেগঘটিত সাক্ষাতের সময় যখন তার স্বামী একটা চিঠি লিখছে, যেন প্রতিটি কর্মকাণ্ডই আরেকটির দর্পণ প্রতিবিম্ব। আর, স্ত্রী-পুরুষ ভেদের ভাষার অনুমোদন হিসেবে একটা লিঙ্গভিত্তিক ভাষার পরিষ্কার ইঙ্গিত পাওয়া যায় সেই সময় যখন সুন্দরী রেমেদিওস সম্পর্কে বলা হয় যে ‘পুরুষের ভাষা তার কানে পশবে না’।
আমি বলবো, এই মুহূর্তগুলো সব এক সঙ্গে আমাদেরকে জানায় একই সঙ্গে বাইরের জগত থেকে মাকোন্দো-র ‘বিচ্ছিন্নতা’ আর বহির্জগতের তরফ থেকে নানান হুমকির ক্ষেত্রে মাকোন্দোর দুঃখজনক ‘অরক্ষিতদশার’ কথা। বা, অন্য কথায় বলতে গেলে, ‘ভিন্নতা’ বা ‘difference’-এর বোধটুকুর কথা যা মাকোন্দো ও বাকি দুনিয়া সম্পর্কে পাঠকের ধারণার ওপর ভাষা আরোপ করে ( যেটাকে অবশ্যই বহুমাত্রিক বা স্তরবিন্যস্ত হিসেবে দেখানো হয়েছে : বিজ্ঞানের জগত আর ইন্টুইশনের জগত; ইউরোপ আর ‘তৃতীয় বিশ্ব’; সমাজ-রাজনীতি, বাণিজ্য, ইতিহাস, সংস্কৃতি, ইত্যাদি সম্পর্কে নানান অভিজ্ঞতা আর সংজ্ঞা)।

ভিন্নতা সম্পর্কে এই সচেতনতা উপন্যাসটির প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রবেশ করে এবং সেসব নিয়ন্ত্রণ করে। এবং ভিন্নতাকে উপন্যাসটি উপস্থাপন করে দেশ ও কাল-এর ভাষায় (এখানে-এবং-এখন-এর বিপরীতে অন্যান্য স্থান ও অন্যান্য সময় ); ভেতর ও বাহিরের ভাষায়; প্রারম্ভ ও সমাপ্তির ভাষায়; একটা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে যা বাস্তব বলে প্রতিভাত হয় এবং অ-বাস্তব, অতিবাস্তব, কাল্পনিক বা জাদুকরী বলে প্রতিভাত হয় সেই ভাষায়; সত্তার বা অপর-এর পরিচয়ের ভাষায়। এটি একেবারে আক্ষরিক অর্থেই আখ্যানের (ন্যারেটিভ) জগতটাকে প্রতিষ্ঠা করে ও উপড়ে ফেলে, সৃষ্টি করে আবার ভেংগে ফেলে, গড়ে আবার ভাঙে। ‘Hacer para dehacer’ — ‘ভাঙার [বা, পূর্বাবস্থায় ফেরার] জন্য গড়া [বা, করা]’ — নিঃসঙ্গতার একশ বছর-এর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দবন্ধ। নির্দিষ্ট চরিত্রের জন্য তা নির্দিষ্ট কাজ বরাদ্দ করে : কর্নেল অরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া, যে ক্ষুদে ক্ষুদে সোনার মাছ তৈরি করে যা সে আবার বিক্রি করে দেয় সোনার বদলে যে সোনা দিয়ে সে নতুন মাছ তৈরি করে সেগুলো আবার সোনার বদলে বিক্রি করবে বলে, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে বিক্রি বন্ধ করে দিয়ে প্রতিদিন মাত্র দুটো মাছ তৈরি করাতে থিতু হয়, ‘আর মাছের সংখ্যা পঁচিশ হলে সেগুলো গলিয়ে ফের লেগে পড়ে গোড়া থেকে’; বা, আমারান্তা, যে কিনা দিনে তার শবাচ্ছাদনবস্ত্রটা বোনে, ‘অডিসি’-র পেনেলপির মতো রাতের বেলা সেটা আবার খুলে ফেলতে। কিন্তু এটা উপন্যাসটির সার্বিক পরিকল্পনাটিকে, সেটার সৃষ্টির ও / বা বিবর্তনের নকশা বা ছাঁদকে একটা চরিত্র-ও দান করে, (মাকোন্দোর পত্তন, কলা কোম্পানির স্থাপন, প্রণয় সম্পর্কগুলো, কাল্পনিক সমস্ত প্রকল্প), যার পরে আসে ক্ষয়, ধ্বংস আর সম্পূর্ণ স্মৃতিবিলোপ। বৃষ্টিতে ধুয়ে মুছে যাওয়ার আগে কলা কোম্পানি পরিণত হয় দানবে; জীবনে যা কিছু প্রতিষ্ঠা করেছে তারা — হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া, কর্নেল অরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া এবং অন্যরা — সেসব ভেঙে-চুরে ধ্বংস করে দেবার তাদের ধারাবাহিক প্রচেষ্টার পর আসে সেই সব কিছু ধ্বংসকারী বাতাস যা মাকোন্দোকে উড়িয়ে নিয়ে যায় পৃথিবীর বুক থেকে।

শেষ বিচারে বা আলোচনায় এসব সৃষ্টি বা কল্পনাকে ‘ভাষা’ মুছে ফেলে দেয়। উপন্যাসের মহাপ্রলয়ের আগে, নিকৃষ্টতম সেই নির্মূলীকরণের ঘটনার সময় হোসে আর্কাদিও সেগান্দোর ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পর ( শ্রমিকদের ধর্মঘটে ইতি টেনে দেয়া গণহত্যা, আর সমুদ্রে ফেলে দেবার জন্য প্রায় দুশ মালগাড়ি বিশিষ্ট মৃতদেহ বহনকারী ট্রেন আবিষ্কার ) সে মাকোন্দোতে ফিরলে এক মহিলা তার ক্ষত পরিষ্কার করে দেয় এবং তাকে খানিকটা কফি খেতে দেয়; কিন্তু যখন সে-ঘটনাটা নিয়ে আলাপ করতে যায় মহিলা তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে: ‘এখানে তো কেউ মারা যায়নি। [ … ] তোমার চাচা, মানে কর্নেলের সময় থেকে কোনো কিছুই ঘটেনি মাকোন্দোতে।’

এটা অবশ্য কলা কোম্পানীর শ্রমিক আর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষর মধ্যেকার বিরোধ প্রসঙ্গে আরো আগে আদালতের দেয়া সিদ্ধান্ত ‘শ্রমিকদের কোনো অস্তিত্ব ছিল না’ , বা পরবর্তী আনুষ্ঠানিক ঘোষণা যে, ‘কোনো কিছুই ঘটেনি মাকোন্দোতে, কখনোই ঘটেনি কিছু, ঘটবেও না কিছু কখনো’ সেটাকেও ছাড়িয়ে যায়, কারণ এই ঘোষণাগুলো একদিকে স্রেফ ‘বাস্তবতা’ ও ‘ইতিহাস’ আর অন্যদিকে সেটার আনুষ্ঠানিক ঘোষণাগুলোর মধ্যেকার বৈষম্যকে প্রতিষ্ঠিত করে। সেই রমণী যখন হোসে আর্কাদিও সেগুন্দোকে লক্ষ করে কথা বলে তখন সেটা সাধারণ মানুষের সাধারণ ভাষা, যা কোনো কিছুই ঘটেনি এই ‘ঘটনা’কে ‘সত্য’ বলে গ্রহণ ও প্রচার করে, আর ওদিকে পাঠক-কে বলা হয় যে কিছু একটা ‘ঘটেছে’। কোনো কিছু আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত হয়েছে কিনা বা জনসাধারণ ‘বিশ্বাস’ করেছে কিনা, বা এমনকি হোসে আর্কাদিও সেগুন্দো যেসব ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সেগুলো কলম্বিয়াতে ১৯২৮ সালে ইউনাটেড ফ্রুট কোম্পানির বিশাল ধর্মঘটের অন্তত কিছু ঐতিহাসিক ভাষ্য দ্বারা সমর্থিত কিনা সেটা আর কোনো আলোচ্য বিষয় নয়: আসল কথা হলো, আখ্যানের এক পর্যায়ে পর্যায়ক্রমিক কিছু ঘটনা (ধর্মঘট ও তার ফলাফল) ভাষার সাহায্যে এবং ভাষার মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এবং, আরেক পর্যায়ে সেই একই পর্যায়ক্রমিক ঘটনাবলী মুছে ফেলা হয়েছে, এবং তা আবারো ভাষার মধ্যে ও ভাষার সাহায্যে। স্বাভাবিকভাবেই, এধরনের পরিস্থিতিতে পাঠকের প্রথম প্রতিক্রিয়া হচ্ছে বিষয়টাকে কোনো কিছু লুকোবার একটা ফন্দি হিসেবে পাঠ করা, তা সেটা কর্তৃপক্ষের তরফ থেকেই চাপিয়ে দেয়া হোক, অথবা জনগণের মধ্যে কোনো তীব্র মর্মাঘাতের ফলে সংঘটিত হোক, এবং বর্ণনাকারী গণহত্যা সম্পর্কে সেই মুহূর্তে যা প্রকাশ করেছে তা বিশ্বাস করা — বিশেষ করে যখন তা এমন একটি চরিত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত যার দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি সহানুভূতি দেখানোর জন্য বর্ণনাকারী আমাদেরকে প্রণোদিত করেছেন। কিন্তু ধরুন, মার্টিন (১৯৮৭:১০৭) যেটাকে ‘গোটা উপন্যাসটির আকৃতিদানকারী কেন্দ্রীয় এপিসোড’ বলছেন সেটার বর্ণনাকারীর দেয়া সংস্করণটি যদি ঠিক কর্মকর্তাদের বা সেই সহৃদয় নারীর সংস্করণটির মতোই সন্দেহজনক হয়, তাহলে কী হবে?

আমরা তাহলে আরেকটি এপিসোডের দিকে তাকাই। উপন্যাসের শেষ দিকে যখন তরুণতম অরেলিয়ানো তার প্রিয়তমা উরসুলা আমারান্তার মৃতদেহ ফেলে রেখে তার সদ্য ভূমিষ্ঠ শুয়োরের লেজবিশিষ্ট সন্তানকে ঝুড়ির মধ্যে রেখে সাহায্যের সন্ধানে বেরোয় :
‘সেই ঔষধের দোকানে গিয়ে টোকা মারে সে — অনেকদিন সেখানে তার যাতায়াত নেই — দেখতে পায় সেটা একটা ছুতোরের দোকান হয়ে গেছে। হাতে বাতি নিয়ে যে বৃদ্ধা মহিলা দরজা খুলে দেয় সে তার বিকারগ্রস্ত দশা দেখে করুণা অনুভব করে ঠিকই, কিন্তু বলে যে কস্মিনকালেও এখানে কোনো ওষুধের দোকান ছিল না, আর মার্সিদিয নামের পাতলা গলা ঢুলুঢুলু চোখের কোনো মেয়েকেও সে চিনত না কখনো।’

বিশেষ ধারার পাঠে অভ্যস্ত পাঠক হয়তো আবারো ভাবতে বসবেন কাকে বিশ্বাস করবেন তিনি: দাওয়াখানার মহিলাকে নাকি বর্ণনাকারীকে? হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার সঙ্গে যে গুড সামারিটানের দেখা হয়েছিল তার মতো এই নারীর কিন্তু কোনো কিছু ধামাচাপা দেবার ‘কারণ’ ছিল না। আর বর্ণনাকারী এ-বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করে যে সেই নারী হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার ‘চিত্তবিভ্রম’-এর প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেছে। অরেলিয়ানো তখন যে পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে তাতে সে এক ধরনের বিভ্রমের মধ্যে থাকতেই পারে। কিন্তু পাঠক সেই দাওয়াখানার সঙ্গে আগে থেকেই পরিচিত, আর মার্সিদিয নাম্মী মেয়েটিও তাদের চেনা, যে কিনা সম্ভবত তার প্রেমিক গাব্রিয়েল মার্কেস-এর সঙ্গে চলে গিয়েছিল যখন সে যুবক ‘দুই প্রস্থ জামা-কাপড়, এক জোড়া জুতো, আর রাবেলের রচনা সমগ্র’ নিয়ে যাত্রা করেছিল প্যারিসের উদ্দেশে। স্বয়ং মার্কেসের সঙ্গে কয়েকটি সাক্ষাতকারসহ বেশ কিছু সূত্র থেকে আমরা জানতে পারি যে এই গাব্রিয়েলের সঙ্গে ‘প্রকৃত’ লাতিন আমেরিকান লেখক যিনি প্যারিসের উদ্দেশে কলম্বিয়া ছেড়েছিলেন তার যথেষ্ট মিল রয়েছে, যদিও একমাত্র আপাত তফাত হচ্ছে বইয়ে গাব্রিয়েলের সঙ্গে ছিল রাবেলের একটা বই, আর বাইরের গাব্রিয়েল নিয়েছিলেন ডিফোর আ জার্নাল অভ দ্য প্লেগ ইয়ার্স। উড বলছেন (১৯৯০ঃ ৫৫), ‘ইঙ্গিতটি এমন নয় যে ইতিহাস আর ফিকশন একই, তবে এই দুইয়ের সীমান্ত খুব স্পষ্ট নয়; তার ওপর, তা স্থির-ও নয় খুব একটা।’ নিশ্চিতভাবেই, নিঃসঙ্গতার একশ বছর-এ অনেকটাই সমাপতিত হওয়া, কিন্তু আবার তাদের ভিন্নতা বজায় রাখা দুটো টেক্সট — মেলকিয়াদেসের আর “the book of Gabriel” — সম্পর্কে অনেক কথা-ই বলা যায়, (এবং, বলা হয়েছে-ও)। কিন্তু যে দুটো এপিসোডের কথা খানিক আগে উল্লেখ করলাম, আর সর্বোপরি সবশেষের সেই বিস্ময়কর রহস্যোদ্ঘাটন (যখন দেখা যায় যে বিগত সাতটি প্রজন্ম ধরে বুয়েন্দিয়া পরিবারে যা কিছু ঘটছে তার সঙ্গে একশ বছর আগে সেই বৃদ্ধ জিপসি যা লিখে গিয়েছিল তা হুবহু মিলে যাচ্ছে, প্রতিটি ঘটনা অন্যটির নিখুঁত পরিপূরক হিসেবে, প্রতিটি অন্যটিকে নিখুঁতভাবে অস্বীকার ক’রে) কার্যত দুটো সংস্করণের মধ্যে একটিকে বেছে নেবার অতিরিক্ত কিছুতে গিয়ে ঠেকে। সেগুলো, এবং কাহিনীর আরো অগুনতি মুহূর্ত আসলে যে-বিষয়টির ওপর আলোকপাত করে তা হলো ভাষার গুণেই কেবল এসব সংস্করণ এবং এসব নির্বাচন চিন্তনীয় হয়ে ওঠে। প্রতিটি পরিস্থিতি বা ঘটনার সময় যখন মাকোন্দোর সমাজ এক ধরনের বিলুপ্তির অভিজ্ঞতা লাভ করে, তা সেটা যে রূপেই হোক — অনিদ্রা রোগ বা গণ হারে শ্রমিক হত্যার পর আরোপিত স্মৃতিবিলোপ, বা প্রায় অবিশ্রান্ত বারিধারা যা কিনা শহরটাকে এক রকম ভাসিয়েই নিয়ে যাচ্ছিল, আর পরিশেষে সেই ঘূর্ণিঝড় যা অঞ্চলটিকে মুছে ফেলে পৃথিবীর বুক থেকে (সেই সঙ্গে মেলকিয়াদেসের পাণ্ডুলিপিটিকেও) — সেই শূন্যস্থানে “ভাষা” প্রবেশ করে, নৈঃশব্দ্য থেকে সব কিছু উদ্ধার করতে — তার মানে, প্রথমত ভাষার মাধ্যমে যা কিছু প্রতিষ্ঠিত তার সবকিছু, অন্যথায় যা কিনা হারিয়ে যেতো। এটা অবশ্য মার্টিন (১৯৮৭: ১০৪) এবং আরো অসংখ্য জন যা ঘূর্নায়মানতার (circularity) উদাহরণ হিসেবে খতিয়ে দেখেছেন তা অনেকাংশে অতিক্রম করে যায়। এটি ভাষার সমীহ-উদ্রেককারীর ক্ষমতা দেখিয়ে দেয়, যে-ভাষার সাহায্যে চিহ্নায়িতদেরকে (signified) এক সঙ্গে বুনে একটা বাস্তবতা তৈরি করা যায়, এবং চিহ্নায়ক আর চিহ্নায়িতর মধ্যে সংযোগ সূত্র ছিঁড়ে ফেলে সেই বাস্তবতা আবার ভেঙে ফেলা যায়। এ-হলো এমন এক ফন্দিবাজি যা জিপসিরা মাকোন্দোতে প্রথম বার যা-যা এনেছিল তার যে-কোনোটিকে টেক্কা দিতে পারে। এ হলো ভাষার উদযাপন, আবার এক-ই সঙ্গে সেটা সম্পর্কে মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন। ভাষা দেয়, ভাষা কেড়েও নেয়। কাল ও দেশে তা সম্পর্ক স্থাপন করে, আবার তা ছিঁড়েও ফেলে। ভাষা করে, আবার তা নাকচ করে। ‘Hacer para dehacer’।
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com