হাল্লাজ এবং দ্রৌপদীর বিলাপ

তাপস গায়েন | ২১ জুন ২০১৪ ১:১৮ পূর্বাহ্ন

মনসূর হাল্লাজের বিলাপ

আমাকে ফেলে রেখে চলে গেছে মরুপথের যাত্রী, কিন্তু তাদের যাত্রাপথের কোনো চিহ্ন নেই কিংবা জল সিঞ্চনের জন্য নেই কোনো কুয়া, যেন বিলুপ্ত নগরী ইরাম ! অতঃপর পদদলিত হয়েছে পরিত্যক্ত জনতা; যেন পশুর মতো অন্ধ, যেন মাদি-উটের থেকেও অন্ধতর। হে আল্লাহ্‌, আপনাকে ভালোবেসে আমাকে হতে হয়েছে অবরুদ্ধ, কারাবাসপ্রাপ্ত, বেত্রাঘাতপ্রাপ্ত; ফাঁসির রজ্জুতে উত্তোলিত হবার আগে কর্তিত হয়েছে আমার পা, আমার হাত । আমার নিঃসাড় দেহকে করা হয়েছে ভস্মীভূত; আমার দেহভস্ম এখনও উড়ছে মরুভুমির বাতাসে এবং অসংখ্যবার দোল খেয়ে চলছে সাগরের লোনা জলে। হে খোদা- যে পাপী, আপনি তাকেও দিয়েছেন অনুগ্রহ, কিন্তু আমার দেহভস্ম, আমার শরীরের এই ছাই, ঘৃতকুমারীর মতো যা প্রশংসায় ধাবিত হয়েছে আপনার দিকে, কিন্তু আপনি থেকেছেন নিস্ক্রিয়, নিঃশ্চুপ। আমার দেহের এই রূপান্তর, হয়তো, এই পৃথিবীতে রেখে যাবে স্থায়ী ছাপ, যা পাহাড়ের থেকেও হবে দৃঢ় !

হে আমার আত্মার মাধুর্যের কবি, বিপুল তরঙ্গের গর্জনশীল নদী, তাইগ্রীসের মতো আপনি এখনও প্রবাদপ্রতীম, নিজস্ব অস্তিত্বে দীপ্যমান, আপনার বিলাপ এখনও শ্রুতিগোচর। আপনি তো চেয়েছিলেন সকল গন্তব্যের বাইরে গিয়ে শাশ্বতের সাক্ষ্য দিতে, কিন্তু আপনার সাক্ষ্য দিতে গিয়ে আমরা হয়ে উঠি ক্রন্দনশীল, আমাদের হৃদয় ভারাতুর। দেখেছি আপনাকে আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের শীর্ষবিন্দুতে, যেভাবে সুউচ্চ পাহাড় থেকে দেখি আমরা এই জগতকে, কিন্তু আপনার আত্মার সত্য আজো হয়নি উদ্ভাসিত, যেভাবে আল্লাহ্‌কে বুঝিনি আমরা ; আমাদের অলস কলিজায় ফুটে উঠে না আল্লাহ্‌র শতাধিক নাম। পৃথিবীর বুকে শুধু কুয়াশাই জেগে আছে।

সুফি কবি, আপনার মৃত্যুর কারণ একাধিক! প্রথমত, আপনি তো মাতা মেরীর সন্তানের মতো মৃত্যুই আকাঙ্ক্ষা করেছেন। আরাফাতের ময়দানে অনেক পাপীদের শাস্তির পরিবর্তে চেয়েছেন নিজের বলিদান, সুতরাং আজ আর ক্রন্দন নয়; দ্বিতীয়ত, আপনি বলেছেন, মক্কা নগরীর বাহিরেও হজ্জ সম্ভব, সুতরাং আজ আপনার ক্রন্দন অর্থহীন। তৃতীয়ত, জেনেছি কোনো কোনো সুফিসাধক হয়েছে আপনার বিরুদ্ধগামী। সকল সংঘই বিরোধকে করে আভাষিত, তাঁকে করে উচ্চকিত। হে সুফি কবি, আপনি আপনার মৃত্যুকে ত্বরাণ্বিত করেছেন; সুতরাং, নিরর্থক এই ক্রন্দন । চতুর্থ, আল্লাহ্‌র একটি নামের মাধুর্যকে আপনি কোনো এক অলৌকিকতায় নিজের করে নিয়েছেন! আল্লাহ্‌ হয়েছেন ক্রুদ্ধ; বোধকরি, তিনি নন দয়ালু । শেষাবধি, আপনি বলেছেন, “আমি সত্য ; আমিই ঈশ্বর!” হে আমার প্রিয় কবি, কেউ জানেনি ঈশ্বরকে; কিন্তু সবাই নিয়েছেন তাঁর মালিকানা। তাই এতো প্রফেট, তাই এতো ধর্মযুদ্ধ । ধর্মযুদ্ধের মতো আপনার মৃত্যুকেও আমি স্বাভাবিক জেনেছি।

প্রবহমান তাইগ্রীসের মতো আজও আপনি গর্জনশীল, আর আমি শুধু তার ক্ষীয়মাণ দূরাগত ধ্বনি!

দ্রৌপদীর বিলাপ

এই জীবন নয় হস্তিনাপূরের রাজসভায় দ্যূতক্রীড়া; কিংবা নয় যাজ্ঞসেনী ধ্রূপদকণ্যার বিলাপ! তবু মহাকালব্যাপী রৌদ্র আর মেঘ জুড়ে মঞ্চস্থ হতে থাকে দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের ব্যর্থ পালা আর কিশোর-যোদ্ধা-অভিমন্যুর বীরগাথা। পৃথিবীর সব নারীদের অশ্রু ঝরে পড়ার মধ্যে যে বিষাদগাথা, তাকে আমি ‘দ্রৌপদীর বিলাপ’ নামে জেনেছি!

“আমাকে স্পর্শ করবেন না, রাজমাতা কুন্তী! আমি মলিন হয়ে যাব। এখন আমি আর আপনার পুত্রবধূ নই, আপনার পুত্রদের পত্নী নই, কুরুবংশের কুলবধূ নই। এখন আমি নামহীন, পতিহীন, এবং বংশহীন হয়ে গেছি। আমি তো মানুষ নই, আমি বনবাসির উনুনে জ্বলা আগুন; স্বয়ং শুদ্ধ আমি কিন্তু পৃথিবীর সব অশুদ্ধির উপরে আমার বাস!” [১]

অশ্রুনদীর ভিতরে, বোধকরি, এই জীবনের উদ্বোধন, আর জীবনব্যাপী যেন তারই ব্যাপ্তি। মানুষ কি মানুষকে কাঁদায় না কি এই কান্না নির্দেশ করে সময়ের সাথে মানুষের অনিঃশেষ দ্বৈরথ, যেখানে লিপিবদ্ধ হয়ে আছে জলমগ্ন হবার স্মৃতি, উদ্বাস্তু মানুষের স্বদেশভূমি প্রস্থান, জীবনের বৃত্তে আমাদের অপমান তবু জীবনচক্রে পুনারপি ফিরে আসা, আর মনে রাখা মৃতের তালিকা, যা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকে! দেশান্তরী নৌকা যত দূরগামী হয়, জীবনের গল্প যেন তত পল্লবিত হয়ে উঠে! তবু ভাবি, জীবনের দীর্ঘসূত্রিতা আর কান্না কি আবর্তনশীল জলের মতো ঘুরে ঘুরে আসে ?

আমার সকল শরীর কেবল ক্রন্দন হয়ে জেগে উঠে, কিন্তু আমি তার অর্থ বুঝি না। নশ্বর ফুলের মতো এই জীবন, তাই হৃদয় ঈশ্বরমুখ-দর্শন-অভিলাষী ! বনবাসী, প্রান্তিক মানুষ আমি। রাতের গভীরে উনুনের আগুনের দিকে তাকিয়ে থাকি; দেখি আগুন গভীরতর ঐক্যে বাঁধছে এই আকাশ আর এই মাটিকে। মনে পড়ছে পিতৃমুখ, মনে পড়ছে পূর্ব-জন্মের-স্মৃতি, মনে পড়ছে যুদ্ধ হয়েছিল এই বাংলায় ।

এখন মধ্যরাত । শান্ত দীঘির জলে, ঈশ্বরের মুখ নয়, নিতান্তই আকাশের ছায়া পরিদৃশ্যমান, যেখানে মঞ্চস্থ হয়ে চলেছে দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের পালা আর কিশোর-যোদ্ধা-অভিমন্যুর বীরগাথা !

[১] হস্তিনাপূরের রাজসভায় পাশাখেলা শেষে দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণে ব্যর্থ দুঃশাসন যখন ক্লান্ত, তখন রাজমাতা কুন্তী এবং মহারাণী গান্ধারীর প্রবেশ, ঠিক তখন সন্ত্রস্থ এবং উন্মাদিনী যাজ্ঞসেনী ধ্রূপদকণ্যা দ্রৌপদী বিলাপ শেষে রাজসভায় উপস্থিত সকলের প্রতি তিনি অভিশাপ দিতে উদ্যত। ‘ষ্টার জলসায়’ বর্তমানে সম্প্রচারিত হচ্ছে মহাকাব্য, ‘মহাভারত !’
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (8) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Mhiuddin Maswood — জুন ২১, ২০১৪ @ ১:১৫ অপরাহ্ন

      খুব ভালো লেগেছে। কবিকে আন্তরিক অভিনন্দন।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সুবিমল চক্রবর্তী — জুন ২১, ২০১৪ @ ৮:২৪ অপরাহ্ন

      তাপস, খুব ভাল লাগল। তোমার পুরাণ বা ইতিহাস-নির্ভর কবিতা আগেও পড়েছি। আধুনিক যুগে প্রাচীন মহাকাব্য ব্যবহার করে মধুসূদন বা রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন কাব্যাকারে। গদ্যছন্দে লেখা তোমার কবিতাগুলো অপূর্ব। অগ্রবীজে লেখা আমার এধরনের কবিতা তুমি নিশ্চয়ই পড়েছ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন প্রণব আচার্য্য — জুন ২২, ২০১৪ @ ১২:৫৯ অপরাহ্ন

      দু’টোই ভালো লেগেছে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন matin bairagi — জুন ২২, ২০১৪ @ ১:১২ অপরাহ্ন

      কবি তাপস গায়েনের লেখা আমার খুবই পছন্দের । সে আমার প্রিয় কবিদের একজন। পুরানকে নুতন করে বলায় তার বেশ পারঙ্গমতা আছে। তার লেখার ভেতরে ফুটে থাকে বেদনার অশ্রুরাশি । আর তার অর্থই হলো এই কথাটা বলা যা দ্বারা পাঠক প্রকৃত বেদনাকে উপলব্ধি করতে পারবেন। বেদনার প্রকৃত উপলব্ধিই পারে জীবন সত্যকে প্রতিষ্ঠা দিতে। তাপস প্রায় সব সময় একাজটি নিষ্ঠার সাথে করছেন। এজন্য তিনি কবিতায় মিথকে ব্যবহার করছেন প্রয়োজনীয় মাত্রায় এবং কবিতাটিকে মিথের উপযোগী করে বুনে নেন। তিনি আকস্মিক কোন মিথ ব্যবহার করেন না, যতোটুকু আমি লক্ষ করতে পেরেছি। তাপস তার দৃষ্টিভঙ্গির প্রসার তার কবিতায় ছড়িয়ে যাচ্ছেন, কোনরূপ পক্ষপাতিত্ব না করে, বা কোন রাজনৈতিক সংলাপকে উচ্চকিত না করে। তিনি সত্যকেই বলতে চান একধরণের নির্জনতা নির্মাণ করে যা অন্যকে খুব কম ব্যবহার করতে দেখি। যদিও আমার অনেক বলার ছিলো, এটা যে সে যায়গা নয় তা কে না স্বীকার করবে, সে কখনো কোনো এক সময় যদি তার সাথে দেখা-সাক্ষাতের সুযোগ ঘটে। হাল্লাজ এবং দ্রৌপদীর বিলাপ কেবল তাঁদের বিলাপ নয়, এ বিলাপের মধ্যদিয়ে, সমাজচিন্তার একটা রূপরেখা পাওয়া যায়, এবং বর্তমানের সাথে তাকে মিলিয়েও নেয়া যায়। তাপসের টেক্সটগুলোতে সচেতনতা আছে এবং শব্দগুলো বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সজাগ দৃষ্টি থাকে। প্রশংসার বিষয় হলো এই যে সে কবিতায় অতিকথনের লোভ সামলাতে পারে এবং বিষয়ের সংগে কাঠামো নির্মাণে ভাষাকে সচল করতে পারে। তার একলব্য নিঃসীম নগরে কাব্যে সে দক্ষতা ছড়িয়ে আছে। আনন্দ সেখানে যে তাপস সবসময় মানবিকতাকে উচ্চে তুলে রাখতে চান, আর তার বিস্তার প্রায় তার সব কবিতায়, প্রবন্ধে, কিন্তু উদারতাবাদ অনেক সময় বাস্তবকে আড়াল করে দুর্দশা ভোগান্তি বাড়াতে পারে। তবুও আমি বলবো পরিচ্ছন্ন মনকাড়া কবিতা তাপস লেখে, কবিতার ডাক্তারি করে না। তাপসকে অসংখ্য ধন্যবাদ এবং শুভকামনা।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তাপস গায়েন — জুন ২২, ২০১৪ @ ৯:৩৭ অপরাহ্ন

      মাসুদ এবং আচার্য,
      কবিতা দুটি পড়ে আপনাদের ভালো লেগেছে জেনে আমি আনন্দিত ।
      শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা জানবেন । তাপস গায়েন

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তাপস গায়েন — জুন ২২, ২০১৪ @ ৯:৪৯ অপরাহ্ন

      সুবিমলদা,
      আমার এই কবিতা পড়ে আপনি কমেন্ট দিয়েছেন দেখে খুব ভালো লাগছে । পুরাণ- এবং ইতিহাস-নির্ভর গদ্যছন্দে আপনার কবিতা আমি
      পড়েছি এবং প্রভূত সাহিত্যরস পেয়েছি । তাপস

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তাপস গায়েন — জুন ২২, ২০১৪ @ ১০:১৪ অপরাহ্ন

      মতিন ভাই,
      আপনার সুদীর্ঘ এবং সুচিন্তিত মতামত আমাকে অনুপ্রাণিত করছে । বাংলাদেশে সাধারণত কনিষ্ঠ কবি জেষ্ঠ্য কবির কবিতার সমালোচনা করে থাকেন । কিন্তু আপনি এক বিপ্রতীপ ধারার সূচনা করেছেন এবং সেই ধারা নিষ্ঠার সাথে পালন করে যাচ্ছেন । আপনার কবিতার পাশাপাশি, এই কারণেও বাংলাসাহিত্যে আপনি গভীর শ্রদ্ধার এবং অনুসরণযোগ্য । আপনি আমার ভালোবাসা এবং সালাম জানবেন ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ঝর্না রহমান — জুলাই ১, ২০১৪ @ ১২:০৯ পূর্বাহ্ন

      অভিনন্দন কবি তাপস গায়েন। আপনার কবিতা ভালো লেগেছে। খুব ভালো লেগেছে কবি মতিন বৈরাগীর বিশ্লেষণ।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com