হ্যাট্স অফ টু ফখরুজ্জামান চৌধুরী

শাহাবুদ্দীন নাগরী | ১৯ জুন ২০১৪ ৬:৪৮ অপরাহ্ন

border=0আমাদের প্রিয় ফখরুজ্জামান চৌধুরী সবাইকে ছেড়ে চলে গেছেন গত ১২ জুন সন্ধ্যায়। অন্য আর পাঁচটা দিনের মতোই সকালটা শুরু হয়েছিলো, কিন্তু রাতে যে এমন একটি দুঃসংবাদ শুনবো তা ছিলো ধারণার বাইরে। ক’দিন আগে দেখে এসেছিলাম তাকে তার উত্তরার বাসায়। শুয়ে ছিলেন বিছানায়, চোখে এক ধরনের তন্দ্রা ছিলো। আমি নাম বলে ঢুকতেই খুশি হয়ে উঠেছিলেন তিনি। চোখ খুলে তাকিয়েছিলেন, তারপর তার অনর্গল গল্প। কানে কম শুনতেন বলে অনেক কথা বলতে হয়েছিলো কানের কাছে মুখ নিয়ে। কিছু সুসংবাদ দিয়েছিলাম তাকে, খবরগুলো শুনে কেমন এক আনন্দে তার মুখটা ভরে উঠেছিলো। (সুসংবাদের বিষয়টা উহ্য রাখলাম নীতিগত কারণে)। বলেছিলেন, এমন আর কিছু সুসংবাদ শুনলে আমি সত্যি সত্যি আবার হাঁটতে পারবো।

সবশেষ হাসপাতাল থেকে আসার পর শয্যাশায়ী ছিলেন। বিছানায় উঠেও বসতে পারতেন না। শরীরের এমন অবস্থায় যে লেখালেখি হয় না, তা বলাই বাহুল্য। তবে আমি সেদিন লক্ষ্য করেছিলাম, ফুসফুসের এতো বড়ো অসুস্থতা সত্বেও তার স্মৃতিশক্তি ছিলো আগের মতোই প্রখর। নাকে সারাক্ষণ লাগানো থাকতো অক্সিজেন-টিউব, তবুও কথা বলছিলেন আগের মতোই টনটনে গলায়। তবে টেলিফোনে অনেকের সঙ্গেই বেশিক্ষণ কথা বলতে পারতেন না বলে শুনেছিলাম। কিন্তু সেটাও আমার কাছে সত্য মনে হয় নি, অথবা হতে পারে আমি বলেই হয়তো বাসায় যাবার তিনদিন আগে একনাগাড়ে প্রায় পনেরো মিনিট কথা বলেছিলেন মোবাইল ফোনে। অসম্ভব ভালোবাসতেন আমাকে, বন্ধুর মতো আচরণ করতেন, তার জীবনের অনেক একান্ত কথা আমাকে বলে যেতেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। যে কথা স্ত্রী-কন্যাকে বলেন নি, ভাই-ভাতিজাকে বলেন নি, তার ঘনিষ্ট যে ক’জন বন্ধু ছিলো তাদেরকেও বলেন নি, কিন্তু আমাকে বলেছেন। আমার সঙ্গে তার সম্পর্কটা আসলে কেমন ছিলো তা আমিও শেষপর্যন্ত বুঝে উঠতে পারি নি। ষোল বছরের ছোট আমি, কিন্তু কখনও আমাদের মনে হয় নি আমাদের ভেতর বয়সের কোনো ফারাক আছে।

অনেক ধরনের লেখা লিখেছেন ফখরুজ্জামান চৌধুরী। গল্প, উপন্যাস, কবিতা, ভ্রমণকাহিনি, কিছুই বাদ যায় নি। কিন্তু তিনি যে সবচেয়ে বেশি আনন্দ পেতেন অনুবাদ করে সে কথাটি আমাকে মাঝে মাঝেই বলতেন। চমৎকার ইংরেজি জানার সুবাদে অনুবাদে ছিলেন সিদ্ধহস্ত। সমসাময়িক কালের অনুবাদ পত্র-পত্রিকায় পড়ে কষ্ট পেতেন, বলতেন, মূল লেখক বা কবি তার লেখায় কী বলতে চেয়েছেন, কেন একটি শব্দ ব্যবহার করেছেন (যার নানারকম অর্থ আছে), এসব না বুঝে অনুবাদ করা ঠিক নয়।

ডিকশনারি দেখে ওয়ার্ড টু ওয়ার্ড লিখে যাওয়া অনুবাদ নয়। অনুবাদ অনেক সময় রূপান্তর করে নিতে হয় বাংলাভাষার প্রয়োজনে। ফখরুজ্জামান চৌধুরী সরাসরি অনুবাদের চাইতে রূপান্তর করতে পছন্দ করতেন বেশি। তার অনেক অনূদিত কবিতা পড়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে, যা বাংলায় একটি আধুনিক কবিতা হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। অনুবাদ বা রূপান্তরের দিকে না গেলে তিনি হয়তো কবিই হতেন, আমাকে বলেছিলেন। লেখালেখির শুরুতে, সেই গত শতকের পঞ্চাশের দশকে, কবিতা দিয়েই শুরু করেছিলেন যাত্রা। তার কবিতা বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিলো ছাত্রজীবনেই (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাসাহিত্যে তার ছাত্রজীবন ১৯৫৭-৬১ সাল)। ১৯৫৪-৫৫ সালের দিকে জগন্নাথ কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়ার সময় মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন সম্পাদিত মাসিক ‘সওগাত’ পত্রিকায় তার গল্প ছাপা হয়েছিলো, লিখেছিলেন আজিজ মিসির সম্পাদিত ‘চলন্তিকা’, সরকারি ‘মাহে নও’ পত্রিকাসহ প্রায় সব দৈনিক-সাপ্তাহিক-মাসিক পত্রিকায়। অর্থাৎ মৌলিক লেখার দিকে যে তার আগ্রহ ছিলো না তা নয়, কিন্তু অনুবাদের আনন্দটা বেশি ভোগ করতেন বিশ্বসাহিত্যের কাছাকাছি থাকা যেতো বলে, যেটি আমাদের অনেক সাহিত্যিকই পারেন না। তার জীবনের প্রথম বই বেরিয়েছিলো ১৯৫৬ সালে। নওরোজ কিতাবিস্তান ছিলো তার প্রকাশক। American Folk and Fairy Tales-Gi Rechel Field কর্তৃক নির্বাচিত গল্পের এক অনুপম রূপান্তর ছিলো সেই বইটি, শিশুদের জন্য, হাড়কিপটে বুড়ী। এই বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ একই প্রকাশক বের করে ১৯৭৮ সালে। বইয়ের টাইটেল পৃষ্ঠায় তিনি ‘অনুবাদ’ বলেন নি, বলেছিলেন ‘রূপান্তর’। আমাদের শিশুদেরকে আমাদের ভাষায় বলতে গেলে অনুবাদে হবে না, রূপান্তর প্রয়োজন। ফখরুজ্জামান চৌধুরী তা-ই করেছিলেন। মোট ছয়টি গল্প আছে বইটিতে, মূল বইয়ের ইলাসট্রেশন রেখে দেয়া হয়েছিলো মূল প্রকাশকের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে। ১৯৫৬-তেই প্রকাশিত হয়েছিরো রিপ ভ্যান উইংকল নামের বিশ্বখ্যাত আরেকটি বইয়ের রূপান্তর। সেই কৈশোরোত্তীর্ণ বয়সে রূপান্তরের কাজটি তিনি করতে পেরেছিলেন দক্ষতার সঙ্গেই।
পঞ্চাশের অধিক গ্রন্থের রচয়িতা ফখরুজ্জামান চৌধুরী। তিনি চলে গেছেন, কিন্তু রয়ে গেলো তার অসামান্য কাজগুলো। মানুষ মরবেই, কিন্তু মানুষ বেঁচে থাকে তার কাজের মাধ্যমে। আমাদের অনুবাদ সাহিত্যের ছেঁড়া পালটি তিনি নানাভাবে নানাসময়ে রিপু করে করে হাওয়ায় টানটান রেখেছিলেন। তার এ অবদান লেখকরা ভুলে যাবে না বলেই আমার বিশ্বাস। মোহহীন এই মানুষটি চাইলে অনেক পুরস্কার, অনেক পদ-পদবী নিতে পারতেন, যারা এগুলো বিতরণের দায়িত্বে ছিলো তারা সবাই তার বন্ধু, তার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার ক্ষমতা তাদের ছিলো না। কিন্তু বাংলাদেশে যোগ্যতার মূল্য নিয়ে সংশয় আছে, সব যায় চাটুকারদের পাতে। অমন চাটুকারিতা তিনি জীবনেও করেন নি। এটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় ঐশ্বর্য, সবচেয়ে বড় অহংকার। এমন একজন অহংকারী মানুষের সাথে জীবনের ছত্রিশ বছর বন্ধু হিসেবে থাকতে পেরে আমি নিজেও গর্বিত। হ্যাট্স অফ টু ফখরুজ্জামান চৌধুরী।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com