উত্তম দাশ-এর মহাপ্রয়াণ

মাহবুব সাদিক | ১৮ জুন ২০১৪ ১২:০৩ পূর্বাহ্ন

uttam.gifকবি উত্তম দাশ চলে গেলেন। কী আকস্মিক আর অকালে ঘটল তাঁর এই মহাপ্রয়াণ! বাংলাদেশে আমরা যারা তাঁর অন্তরঙ্গ ছিলাম তারা সবাই বেদনায় মোহ্যমান। ১২ জুন ভোরবেলা মাহমুদ কামালের ফোন পেয়ে আমি হতভম্ভ হয়ে গেলাম। কামালের সঙ্গে কথা শেষ করার পরেই ফোন পেলাম তপন বাগচীর। কথা হল মুহম্মদ নূরুল হুদার সঙ্গে। প্রত্যেকেই বেদনাহত; কণ্ঠস্বরে কান্নার রেশ। কথা হল সৈয়দ শামসুল হক ভাইয়ের সঙ্গে। গভীর বেদনা প্রকাশ করলেন তিনিও। হক ভাই, আনোয়ারা সৈয়দ হক আর আমি গত মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহেই উত্তম দাসের সঙ্গে তাঁর বাড়িতে একত্রে কাটিয়েছি দুদিন। সৈয়দ শামসুল হক এবং আমি মহাদিগন্ত পুরস্কার গ্রহণ করার জন্যে কলকাতা গিয়েছিলাম। পুরস্কার গ্রহণ করার পর আমরা অন্তরঙ্গ আড্ডায় মেতেছিলাম। হক ভাই ঢাকায় ফেরার পর আমি উত্তমদার সঙ্গে কাটিয়েছি আরও সাতদিন। মনে পড়ছে উত্তমদা কী গভীর শ্রদ্ধা ও আন্তরিকতায় গ্রহণ করেছিলেন হক ভাইকে। উরিষ্যার পুরী ও কোনারকে কাটানো দিনগুলোতে উত্তমদা বেশ কয়েকবার সৈয়দ হক দম্পতির প্রসঙ্গ সশ্রদ্ধচিত্তে উল্লেখ করেছেন। আমার সঙ্গেও তাঁর গভীর আত্মিক সম্পর্ক ছিল। বড়মাপের হৃদয়ের অধিকারী এই মানুষটিকে আমরা অকালে হারালাম। উত্তমবৌদিকে কী বলব জানি না। কোনো সান্তনাবাক্যই তাঁর হৃদয়ের ক্ষতে প্রলেপ দিতে পারবে না।

ব্যক্তি উত্তম দাশের সঙ্গে অন্তরঙ্গ পরিচয় ঘটলো মাত্রই বছর দশেক আগে। কলকাতার কবিদের সঙ্গে তিনিও এসেছিলেন টাঙ্গাইলে কবি-সম্মেলনে। তিন দিনের সম্মেলন– নানা সেসনে বিভক্ত অনুষ্ঠানে আমরা একত্র হয়েছি। সাহিত্যের নানা বিষয় নিয়ে সেখানে অন্তরঙ্গ আলোচনা হয়েছে। সাহিত্য বিষয়ে তাঁর মতামত শুনেছি, নিজের মতামতও ব্যক্ত করেছি অকুণ্ঠচিত্তে। সেখানেই প্রথম পরিচয়। তবে তিনদিনের সাহচর্যে অনুষ্ঠানের বাইরেও সাহিত্য নিয়ে নানা কথাবার্তা হয়েছে। টাঙ্গাইলের অনুষ্ঠান-শেষে আমরা আবারও একত্র হলাম ময়মনসিংহে ফরিদ আহমদ দুলাল-আয়োজিত অনুষ্ঠানে। অনুষ্ঠান-শেষে একত্র ফিরেছি ঢাকায়। দুহাজার সাতে আমরা গেলাম কোলকাতায় কবি-সম্মেলনে। সেখানেও এই কবি-প্রাবন্ধিকের সঙ্গে অন্তরঙ্গ আলোচনা হয়েছে। তবে সর্বশেষ সম্মিলনটিই তাৎপর্যপূর্ণ। সেটি ঘটলো দুহাজার নয়ের জানুয়ারিতে। সাহিত্য-সম্মেলন উপলক্ষেই কোলকাতা গেলাম আমরা কয়েকজন– মাহমুদ কামাল, ফরিদ আহমদ দুলাল, মোহাম্মদ আবদুল মান্নান, মুহম্মদ নূরুল হুদা এবং আমি। বিশেষ কারণে যোগ দেওয়া হয়নি সাহিত্য সম্মেলনে। এবারে হোটেল ছেড়ে সরাসরি এসে উঠেছি উত্তম দাশের রারুইপুরের বাড়িতে। অবিস্মরণীয় কয়েকটি দিন কাটলো তাঁর বাড়িতে। মাঝখানে দুদিন ঘুরে এলাম কবিগুরুর সন্নিধানে– শান্তিনিকেতনে। সেখান থেকে ফেরার পথে একটি আনন্দভরা রাত কাটলো শক্তিগড়ের কাছাকাছি কোথাও মধ্যপথে। গাড়ি নষ্ট– কাছাকাছি কোনো হোটেল নেই। একটি নির্মীয়মান হোটেলের অসমাপ্ত ঘরে ঘুমালেন তিনজন। মাহমুদ কামাল, উত্তম দাশ এবং আমি রাত কাটালাম গাড়িতে। তাতে আনন্দের কমতি পড়েনি কিছুই। বেড়েছে অন্তরঙ্গতা। এইটুকু ব্যক্তিগত স্মৃতি থাকুক এই ছোট্ট লেখাটিতে। মানুষ এবং কবি উত্তম দাশকে আমার কাছে অন্তরঙ্গ করে তুলেছে এই সম্মিলন।

উত্তম দাশ শুধু একালের বিশিষ্ট কবি নন, প্রবন্ধকারও। সাহিত্যের এই দুই শাখায় আমিও কিছু কাজ করেছি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাঁর সঙ্গে আমার কিছু মিলও আছে। আমরা দুজনেই পেশাদার শিক্ষাজীবী। আমি পিএইচ.ডি. পর্যায়ে গবেষণার কাজ করেছি বুদ্ধদেব বসুর কবিতা বিষয়ে,উত্তম দাশও বুদ্ধদেবের কবিতা ও কাব্যনাট্য বিষয়ে লিখেছেন। তবে তাঁর লেখা হাতে পেয়েছি অনেক পরে। এর আগেই বুদ্ধদেবের কবিতা ও কাব্যনাট্য বিষয়ে আমার কাজ শেষ করেছিলাম। বাংলা কাব্যনাট্য শীর্ষক একটি চমৎকার বই আছে উত্তম দাশের। এ বই আরো আগে হাতে পেলে আমার কাজে লাগতো। যাই হোক, উত্তম দাশের বুদ্ধদেব বসুর উপর লেখা প্রবন্ধ পড়ে খুবই ভালো লেগেছে। তাঁর বিশ্লেষণ খুবই বুদ্ধিদীপ্ত, দৃষ্টিকোণ সূক্ষ্ম ও স্বচ্ছ্ব, মতামত সুস্পষ্ট। এইসব গুণই একজন প্রাবন্ধিককে পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলে। কবিতার ছন্দ বিষয়ে তাঁর কবিতার ছন্দ, কবির ছন্দ গ্রন্থটি মূল্যবান রচনা। প্রবোধচন্দ্র সেন এবং অমূল্যধন মুখোপাধ্যায়ের ছন্দ বিষয়ক ভাবনার উপর দুটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু মূল্যবান মূল্যায়নধর্মী প্রবন্ধ রয়েছে এ বইয়ে। এই দুটি প্রবন্ধ ছান্দসিকদের ওপর লেখা। প্রবোধচন্দ্র সেন সমস্ত জীবনব্যাপী ছন্দ নিয়ে ভেবেছেন। প্রচুর কাজ করেছেন ছন্দ নিয়ে। রবীন্দ্রনাথের কবিতার ছন্দ বিশ্লেষণ ও বিবর্তন নিয়েও তিনি কাজ করেছেন। উত্তম দাশের প্রবন্ধটি প্রবোধচন্দ্র সেনের কাজের চমৎকার মূল্যায়ন। বাংলা ছন্দের বিধিবদ্ধ আলোচনার ক্ষেত্রে বাংলা ছন্দের মূলসূত্র গ্রন্থটির রচয়িতা অমূল্যধন মুখোপাধ্যায়ের কাজের যথাযথ মূল্যায়ন করেছেন তিনি। অন্য পাঁচটি রচনা সৃষ্টিশীল কবিদের কবিতার ছন্দ নিয়ে রচিত। এগুলোর প্রতিটিই মূল্যবান লেখা। রবীন্দ্রনাথের গানের ছন্দ নিয়ে লেখা তাঁর ছন্দোবন্ধনে অধরামাধুরী চমৎকার রচনা। এ বইয়ের অন্য চারটি মূল্যবান প্রবন্ধ জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, সুভাষ মুখোপাধ্যায় এবং শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার ছন্দ নিয়ে রচিত। কবিতার ছন্দ নিয়ে তিনি এর আগেও লিখেছেন বাংলা ছন্দের অন্তঃপ্রকৃতি। উত্তম দাশের পিএইচ.ডি. অভিসন্দর্ভও ছন্দ বিষয়েই : বাংলা সাহিত্যে সনেট। এটি বই আকারে প্রথম বের হয় উনিশ শ তেহাত্তরে।

সম্পাদক হিসেবেও উত্তম দাশ বিখ্যাত। ষাট ও সত্তর দশকের কবিতা সম্পাদনা করেছেন, সম্পাদনা করেছেন আধুনিক প্রজন্মের কবিতা ও আঞ্চলিক ভাষার কবিতা। আগের বই দুটি আমার হাতে আসেনি কখনো। কিন্তু তাঁর সম্পাদিত শতাব্দীর বাংলা কবিতা আমার কাছে সুসম্পাদিত বলে মনে হয়েছে। অবশ্য একথা সত্যি যে কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাঁর নির্বাচনের সঙ্গে আমি একমত পোষণ করতে পারিনি। তবে সেইসব ক্ষেত্রের সংখ্যা কমই। আর এ মতান্তর সর্বত্রই থাকবে। প্রতিটি সচেতন পাঠকের রুচির প্রভেদ অনিবার্য। তবে তাঁর অধিকাংশ নির্বাচনই সাধারণ পাঠকের অনুমোদন পাবে।

পত্রিকা সম্পাদনার ক্ষেত্রেও উত্তম দাশের খ্যাতি ঈর্ষণীয়। বহ্ণিশিখা-র সম্পাদনার সঙ্গে তিনি জড়িয়ে ছিলেন প্রায় সাত-আট বছর। আর দীর্ঘদিন যাবত তিনি সম্পাদনা করছেন তাঁর বিখ্যাত পত্রিকা মহাদিগন্ত। এ পত্রিকার মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা কবিতা ও বাংলা সাহিত্যের সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছেন।

উত্তম দাশের মূল পরিচয় তিনি কবি। সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কাব্য সংগ্রহের ভূমিকায় বুদ্ধদেব বসু মন্তব্য করেছেন সুধীন্দ্রনাথ দত্ত মর্মে মর্মে রোমান্টিক। এই অভিধাটি উত্তম দাসের কবিতা প্রসঙ্গেও সমান প্রাসঙ্গিক। একালের কবিতার মর্মে রোমান্টিকতা এক অপরিহার্য উপাদান। একালের প্রতিটি কবিই মর্মে মর্মে রোমান্টিক। কারো কারো কবিতায় হয়তো আবেগের আতিশয্য থাকে। আবার কারো কারো কবিতায় আবেগের সংহত ও সংযত প্রকাশ বর্তমান। সুধীন্দ্রসাথ দত্তের কবিতায় আবেগের প্রকাশ ছিলো সংহত ও সংযত। উত্তম দাশের কবিতা আবেগম-িত এবং তাঁর আবেগ আমাদের চেতনায় আলোড়ন তোলে। দুএকটি উদাহরণ দেয়া যাক :
বাহুর শ্যামল ছায়ার নির্ভরতা
ধরা দিলে হয় মুক্তিতে মন্দ্রিত,
কামনা স্তব্ধ অসীম অস্থিরতা
সুভগ মোহের শৃঙ্খলে হয় স্থিত।

বক্ষে ফুটেছে যুগল কুসুম-কলি
সৌরভ তার রটেছে দিগবিদিক
লুব্ধ ভ্রমর একান্ত কুতুহলী
স্থির বিন্দুতে বসে আছে নির্ভীক।

দেহবল্লরী শ্রোণীভারে অস্থির
ক্ষীণ কটিতট ব্যাকুল দুমুখী চাপে
মর্মরদ্যুতি তোরণ দুয়ারটির
বর্তুল দুই ঊরুর স্তম্ভ কাঁপে।
( নির্বাণ , লৌকিক অলৌকিক )

প্রিয়ার দেহের রূপবর্ণনা করতে গিয়ে কবি উত্তম দাশ ছয় মাত্রার মাত্রাবৃত্ত ছন্দের আশ্রয় নিয়েছেন। মাত্রাবৃত্তের মধ্যলয়ের পর্বগুলো এখানে প্রায় গানের মতো বেজে বেজে উঠেছে। উত্তম দাশ শুধু ছন্দ বিষয়ে বিশেষঞ্জ নন– নিজের কবিতায় ছন্দ প্রয়োগেও নিপুণ।

উত্তম দাশ জন্মেছেন বাংলাদেশের নোয়াখালি জেলার হাতিয়া অঞ্চলের চর আলেকজান্ডার গ্রামে। এ এলাকাটি বলতে গেলে বঙ্গোপসাগরের প্রায় তীর-ঘেঁষা। সম্ভবত দেশবিভাগের সময় তাঁদের পরিবার পশ্চিমবঙ্গে পাড়ি জমায়। জন্মভূমি ত্যাগের সেই বেদনা দীর্ঘশ্বাসের মতো ঝরে পড়েছে একটি কবিতায় :
মুহূর্তে এসেছি ফেলে
জানালার চাপা দৃষ্টি ব্যাকুল বাগান
ভ্যান গগের আঁকা স্বদেশী মাঠের হাওয়া
রাস্তার ধারের সেই খেঁজুর গাছ গাড়োয়ানরা
ইজারা নিয়েছিল বলে যে আট বছর শৈশবের
মাঠে দাঁড়িয়েছিল– মনে পড়ে আমাকে তোমার
উনিশ শ সাতচল্লিশের বাংলাদেশ
আমার সুতো-ভর্তি লাটাই ফেলে
আমি জারির দোনার কুমিরের ভয় ফেলে
অচেনার চেয়ে সুদূর অন্য দেশে চলে গিয়েছিলাম
–মনে পড়ে
(মনে পড়ে, জ্বালামুখে কবিতার)

এখনো কবির মনে পড়ে সেই দেশ– জন্মভূমির কোনো বাড়ির জানালায় কারো চাপা ব্যাকুল দৃষ্টি। এখনো তাঁর মনে পড়ে ভ্যান গখের ছবির মতো আঁকা স্বদেশের হাওয়ার মাঠ– এবং তাঁর সোনার শৈশব। এখনো উত্তম তাঁর শৈশবের নস্টালজিক চেতনা বহন করছেন রক্তে। লোকজীবন ও বাংলার লোকছড়ার ঢঙ নিচের কবিতাখণ্ডে অন্তরঙ্গ তাপ ছড়িয়েছে:
এপার বাংলা ওপার বাংলা মধ্যিখানে চর
কান্না হাসির দোলায় আমরা বাঁধছি নিজের ঘর
মুক্ত আকাশ চাঁদ-সুরুজে নিচ্ছে লুটি আঁধার
ভাইয়ের জন্যে মনটা হুহু করছে তোমার আমার।
( আমার বাংলা, লৌকিক অলৌকিক )
দেশত্যাগ করে এসে উত্তম দাশ স্থিত হয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায়। সে দেশের আর্থ-রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়েছেন নিজের মানসজীবন। সেখানকার অন্তঃসারশূন্য রাজনীতিকে ব্যঙ্গ করতে ছাড়েননি উত্তম দাশ। রাজনীতি-সচেতন এই কবি লিখেছেন:
ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল ডাক দিয়ে তিনি এখন
জলের দরে আগমার্কা বিপ্লব বিক্রি করে সন্যাস নিয়েছেন
সমবেত জনগণ প্যারেড গ্রাউন্ডের এই শীতের বিকেল
বঙ্গ-সংস্কৃতির মণ্ডপে জলসার মত মনে হচ্ছে না?
( বিপ্লব বিষয়ক, এ জন্মেও প্রত্যাহার চাই)

উত্তম দাশের কবিতা নানা বক্তব্যে সমৃদ্ধ। তিনি লিখেছেন প্রেম, প্রকৃতি, জীবন, সমকাল এবং ভ্র্রমণ বিষয়ক কবিতা। কবিতা সমগ্রের প্রথম খণ্ডের রণুকে শীর্ষক ছোট্ট কাব্যে স্থান পেয়েছে কেবল প্রেমের কবিতা। একালের প্রেমের কবিতার নায়িকা অনিবার্যভাবেই শরীরী। দেহনিরপেক্ষ প্রেম একালের কবিতায় থাকার কথা নয়– উত্তমের কবিতায়ও নেই। লৌকিক অলৌকিক-এর প্রেমের কবিতার কয়েকটি পঙক্তি এরকম :
অনেক নারীর হৃদয়ের নীলাকাশে
প্রেমের রশ্মি ছড়িয়ে রাত্রিদিন
তোমার স্নিগ্ধ সহবাস-আশ্বাসে
প্রণয়ী শরীর রেখেছি ক্লান্তিহীন

অনেক ক্লান্ত বিষন্ন বিভাবরী
পুষ্পবাসরে কেটে গেল নিরালায়
মিথ্যাই আমি তোমাকে হে সুন্দরী
চেয়েছি গৃহের নিষিদ্ধ সীমানায়।
( চিরন্তনী )

উত্তম দাসের কবিতা সমগ্র ২-এ স্থান পেয়েছে তাঁর পরিণত বয়সের কবিতা। সময়ের ব্যবধানে পরিবর্তিত ও রূপান্তরিত হয়েছে তাঁর কবিতা। ছন্দ ব্যবহারে তাঁর নৈপুণ্য বেড়েছে। একালে তিনি গদ্যছন্দও ব্যবহার করেছেন। নিরূপিত ছন্দের কবিতায় গদ্য ও পদ্যের বিভেদ কমেছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। একালের কবিতা পেয়েছে তাঁর প্রাজ্ঞ জীবনাভিজ্ঞতার স্পর্শ। নির্মাণে এসেছে শীর্ষক কাব্যের একটি কবিতার প্রাজ্ঞ ও দীপ্র উচ্চারণ :

যৌনতার কাছে গিয়ে শিল্প বেঁচে আছে
কিংবা একে বলা যায় আত্মসমর্পণ
যেন ধ্যানে বিঘ্ন ঘটে যায়, যেন
অপ্রতুল আলো তার সর্বস্ব সুষমা মেখেছে।
( খাজুরাহু )
কবিতা সমগ্র দ্বিতীয় খণ্ডে উত্তম দাশের ভ্রমণজাত কবিতা রয়েছে। ঘুরে বেড়িয়েছেন নানা দেশ।
এসব কবিতায় কবি প্রয়োগ করেছেন ভিন্ন মাত্রা– ভ্রমণের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জীবনের নানা ভাবনা। ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি নিজের দেশকে আরো গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছেন। একই সঙ্গে তিনি য়ুরোপের প্রাণস্পন্দন অনুভব ও তা রূপ দেবার চেণ্টা করেছেন কবিতায়। এসব কবিতা মূলত অভিজ্ঞতা-নির্ভর। তাঁর ভ্রমণ-বিষয়ক কবিতার কয়েকটি পঙক্তি :
ফ্লোরেন্স থেকে রোম, আপেনীজ পাহাড়ের মধ্য দিয়ে পথ,
পাহাড় অরণ্যের বন্ধুত্ব এই চড়াই-উৎরাইয়ে বেশ
অনুভব করা গেল । উপত্যকায় আঙুরের খেত,
আঙর আর আঙুর, ইতালীয় মানুষের কোনো খাদ্যশস্যের
মাঠই যেন নেই, এখন আমরা উমব্রিয়ান প্রদেশে
আপেনীজ আর উমব্রিয়ান-এর যৌগ থেকে র‌্যাফাইলের
গ্রামের ছবিটি ভেসে উঠল, এখানেই তো সেই
দেবশিশুর জন্– পোপ তাঁকে এ নামেই তো ডাকতেন।
( এক ভারতীয় কবির ডায়েরী থেকে : ১২ )

একালের মঙ্গলকাব্য গ্রন্থে উত্তম দাস বাংলার লোকপুরাণের চমৎকার ব্যবহার করেছেন। বাংলা মঙ্গলকাব্যের পটভুমি, পারিপার্শি¦ক ও পাত্রপাত্রীর অন্তর্জীবনের আধুনিক ভাবনা ব্যবহার করে তিনি একালের জীবনভাষ্য রচনার চেষ্টা করেছেন। মনসামঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গল, অন্নদামঙ্গল এবং শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের কাহিনী-অনুষঙ্গ ব্যবহার করেছেন কবি। এসব কবিতায় তিনি উত্তরাধুনিক কাব্যভাবনার প্রয়োগ করার চেষ্টা করেছেন সন্দেহ নেই। লোকজীবন চিত্রণের মধ্য দিয়ে উত্তম দাশ বাংলার কাব্য ঐতিহ্যকে ব্যবহার করেছেন। চণ্ডীমঙ্গলে ফুল্লরা-কালকেতুর একটি যুগলচিত্র রচনা করেন তিনি এভাবে :
সারাদিন খাবার জুটেনি, এমনিতেই মেজাজ তিরিক্ষে
কাঁড় তুলে চ্যাড় জুড়ল, হাত থেকে বেরুল না,
ফুল্লরা জড়িয়ে ছিল কালকেতুকে,
রামকিঙ্কর বেজের যুগল-ভাষ্কর্যের দিকে তাকালেন দেবী
তোদের ঘরে থাকতে এলুম রে কালকেতু।

একালের কবি উত্তম দাশ প্রচুর লিখেছেন। কবিতা-নির্মাণে তিনি শিল্পকৃতিকে কখনো বিস্মৃত হননি। তাঁর এই আকস্মিক অকালপ্রয়াণে আমরা ব্যথিত, বেদনার্ত।
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com