সরদার ফজলুল করিমের প্রয়াণে

মনির ইউসুফ | ১৭ জুন ২০১৪ ১:৩৪ পূর্বাহ্ন

border=0বাংলাদেশের যে কয়জন ভাবুক ও বুদ্ধিজীবী নিজের পথ নিজে নির্মাণ করে দেশকে একটি স্থিত অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সরদার ফজলুল করিম। স্বাধীন বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ বিনির্মানের ক্ষেত্রে এই ভাবুক মানুষটির প্রভাব অস্বীকার করা যাবে না।
১৯২৫ সালে বরিশালের উজিরপাড়া উপজেলার আটিপাড়া গ্রামের এক কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। সারা জীবন কৃষকের ছেলে হিসেবে নিজের আত্মপরিচয়কে বড়ো করে দেখিয়েছেন সমাজে। কোনো হীনম্মন্যতাই তাকে স্পর্শ করে নি।

১৯২৬ সালে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ ও তার মুখপত্র ‘শিখা পত্রিকা’র মাধ্যমে আরও অনেক বাঙালি মনীষা তাদের কর্মপন্থা ঠিক করে নেন। কাজী আবদুল ওদুদ, আবুল হুসেন, কাজী মোতাহার হোসেন, মোতাহের হোসেন চৌধুরী, আবুল ফজল প্রমুখ মনীষীবৃন্দ চেয়েছিলেন একটি কুসংস্কার-মুক্ত মুক্তবুদ্ধির বাংলাদেশ। যেখানে সব ধর্ম ও সব মতবাদের মানুষেরা সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে তাদের যাপিত জীবন কাটাবেন। সরদার ফজলুল করিম সেদিকে যান নি; তিনি সরাসরি সমাজ ব্যবস্থার রাজনৈতিক পরিবর্তন চেয়েছিলেন। গণমানুষের মুক্তির প্রশ্নে তিনি ছিলেন রাজনৈতিক প্রজ্ঞাময় পুরুষ। উত্তর-ঔপনিবেশিক চিন্তার রাজ্যে তিনি ছিলেন আপসহীন সংগ্রামী ও যোদ্ধা। ভারতবর্ষ ভাগ হয়ে যাওয়ার পর ভারত ও পাকিস্তান যেমন বাস্তব সত্য তেমনি ১৯৭১ সালের পর বাংলাদেশও আরেক নতুন বাস্তবতা। ব্রিটিশ উপনিবেশ শেষে অনেক রক্তাক্ত ঘটনার মধ্য দিয়ে তিনটি দেশ ভারতবর্ষের নতুন বাস্তবতা হয়ে যখন দেখা দিলো তখন এদেশের প্রবুদ্ধ পুরুষেরা বুঝতে পেরেছিলেন যে, যে দেশ তারা চেয়েছিলেন কিংবা যে নতুন মানুষ তারা তৈরি করার জন্য জীবনের সোনালি সময় ব্যয় করেছিলেন তা হয়নি, বরং এক দেবপুত্রের হাত থেকে আরেক দেবপুত্রের হাতে ক্ষমতার বদল হয়েছে মাত্র। সেই দেবপুত্ররা এই দেশগুলিকে তাদের আরেক উপনিবেশ কিংবা শোষণ ও শাসনের যন্ত্র বানিয়েছেন। গণমানুষের অবিমিশ্র যে মুক্তি তা অধরাই রয়ে গেলো। উপনিবেশ-শক্তি চলে গেছে বটে দেশীয় দেবপুত্রদের নতুন উপনিবেশ তৈরি হলো আরো নতুন বাস্তবতায় আরো নতুনভাবে। দেশের মানুষ বিদেশি দেবপুত্রদের চিহ্নিত করতে পারলেও দেশীয় দেবপুত্রদের উপর ভরসা রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তা হয়নি। তাদের মধ্যে মননের উপনিবেশ ও আত্মঅহংকার এমনভাবে গেড়ে বসলো যে রাষ্ট্রযন্ত্র হয়ে গেলো তাদের কাছে পয়সা বানানোর অনন্য এক ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান। রাজনীতি, সমাজনীতি সর্বোপরি সাম্রাজ্যবাদী মিডিয়ার নতুন আগ্রাসনে জর্জরিত হয়ে পড়লো তারা। পুঁজি নিয়ন্ত্রণ করতে লাগলো ধর্ম, দর্শন, বিজ্ঞান, সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসন। দেশে এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হলো যা মানুষের কল্যাণের বদলে অকল্যাণ নিয়ে এলো। সরদার ফজলুল করিম এইসব গতানুগতিক সিস্টেমকে কখনো মেনে নেন নি। তিনি বেছে নিয়েছিলেন নতুন পথ, যে বাস্তবতার পথ ধরে এদেশে একদিন গণমানুষের শাসন কায়েম হবে। মানুষে-মানুষে কোনো শ্রেণিবৈষম্য থাকবে না, থাকবে না হিংসা, লোভ ও স্বার্থপরতা। তিনি শুধু শিল্প-সাহিত্যের মাধ্যমে তার যুদ্ধ ঘোষণা করেন নি, সরাসরি রাজনীতিকে বেছে নিয়েছিলেন। সামাজতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাসী সরদার ফজলুল করিম মানুষের সামাজিক সাম্য চেয়েছিলেন। সুবিধাবাদী শিক্ষিত মধ্যবিত্ত কিংবা সুবিধাবাদী সামন্তীয় মানুষদের নিয়ে নয়, দেশের উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত কৃষক, জেলে, জোলা, চামার, কামার, কুমার, রাজমিস্ত্রী, শ্রমিক, বস্তিবাসী, পাহাড়ি, যাপিত জীবনের যারা সব বিষয়ে শ্রম দেয় সেই সব শ্রমিকসহ সবাইকে বুকে নিয়ে একটি দেশের স্বপ্ন দেখতেন।

যারা মানুষের শ্রম শুষে নিয়ে বড় বড় হাইরাজ বিল্ডিং থেকে শুরু করে বাড়ি-গাড়ি হাঁকাচ্ছেন এই অবিবেচক দেশীয় দেবপুত্রদের প্রতি ছিলো তার অসম্ভব ঘৃণা। পুঁজির আগ্রাসন ও কর্পোরেটোক্রেসির নতুন জামানায় প্রবেশ করেছে বিশ্ব। সেই বিশ্ব জনাব সরদারের অজনা ছিলো না। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন শুধু স্বপ্ন দেখে একটি জাতির অর্থনৈতিক জীবন ও সামাজিক জীবন বদলে দেওয়া সম্ভব নয়। তার জন্য সংগ্রাম ও সাধনা প্রয়োজন। প্রয়োজন দিকনির্দেশনা। তিনি মানুষের অন্তর্জগত যেমন বদলাতে চেয়েছেন তেমনিভাবে বদলাতে চেয়েছেন মানুষের বহির্জগতও। এই দুই জগতের সম্পূর্ণ সমন্বয় না হলে কোনো জাতি তার লক্ষে পৌঁছতে পারে না কিংবা কোনো মতবাদই প্রতিষ্ঠা করা যায় না, সেটা বুঝে সেভাবে কর্মপন্থা ঠিক করে নিয়েছিলেন তিনি। সরদার ফজলুল করিম বড় হওয়ার বদলে মহৎ মানুষ হওয়ার দিকে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন এবং সেই মতে মানুষদেরও পরিচালিত করতে চেয়েছিলেন। পশ্চিমের সাম্রাজ্যবাদী নাকউঁচু মানুষেরা চায় না উন্নয়নশীল বিশ্ব তাদের নিজেদের পায়ে দাঁড়িযে বিশ্ব সমাজে নতুন কিছু উপহার দিক। সরদার ফজলুল করিম এই সব বুঝতেন বলেই জ্ঞানের মাধ্যমে এদের পরাজিত করতে চেয়েছিলেন, তেমনি রাজনৈতিকভাবেও এদেরকে পরাজিত করে গণমানুষের রাষ্ট্র কায়েম করতে চেয়েছিলেন। তাই সমাজতান্ত্রিক রাজনীতিকে বেছে নিয়েছিলেন তিনি এবং অনুবাদ করেছিলেন বিশ্বজ্ঞান ভাণ্ডারের ক্ল্যাসিকস ও গুরুত্বপূর্ণ বইগুলো। বাঙালি জাতিকে বিশ্ববাঙালি করার ও জ্ঞানের দরোজায় প্রবেশ করিয়ে দেওয়ার গুরু দায়িত্ব স্কন্ধে তুলে নিয়েছিলেন এই শিক্ষাগুরু। তিনি ছিলেন একাধারে সাহিত্যিক, সমাজ সংস্কারক ও প্রাবন্ধিক এবং আগাগোড়া মুক্তিকামী প্রবুদ্ধ জ্ঞানী। জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য চার দফায় ১১বছর জেল খেটেছেন তিনি। তবু কারো সঙ্গে আপস করেন নি। ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে মুক্ত হলেও ভারতবর্ষের মানুষের মননে এখনো সক্রিয়ভাবে রয়ে গেছে মগজের উপনিবেশ। যা তারা উঠতে-বসতে, খেতে-ফিরতে চর্চা করে। এমন কোনো প্রবুদ্ধ লোক নায়ক এই ভারতবর্ষে আসে নি যারা এই মননের উপনিবেশের বিরুদ্ধে মানুষকে জাগিয়ে তুলবে নতুন করে, নতুন করে দেশপ্রেম, জাতীয়তাবোধ, আন্তর্জাতিকতা, তার সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিষয়গুলো বুঝিয়ে জাতিকে কর্পোরেটোক্রেসির ঘাতক আগ্রাসন থেকে বাঁচাবেন। সরদার ফজলুল করিম সেই চেষ্টা করেছিলেন। দেশকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন পুঁজির এই নির্দয় আঘাত থেকে। কিন্তু পারেননি। তার পথনিদের্শনা তার কাছের মানুষেরাও পালন করেননি। কেন করেননি তা তিনি জানতেন। সেই পথ অনেক কঠিন ও বন্ধুর। সবাই পারে না। সবাই সহজ ও সস্তা জীবনকে বেছে নেয় এবং সেই মতে জীবন যাপন করে।

‘প্লেটোর রিপাবলিক’, সক্রেটিসের জবানবন্দী, এ্যান্টিডুরিংসহ অসংখ্য কাজ করেছেন তিনি। সব কিছু বাদ দিলেও বাঙালি জাতিকে বিশ্বজ্ঞানের সঙ্গে পরিচিতি করার কারণে তার অবদান জাতির কাছে চির অম্লান হয়ে থাকবে। এক জীবনে নানান কাজের মধ্য দিয়ে এই কর্মবীর মানুষ হিসেবে তার দায়িত্ব পালন করে গেছেন। এখন উত্তর প্রজন্মের দায়িত্ব হচ্ছে তার পথে নিজেদেরকে নিয়োজিত করে একটি সাম্য ও শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার দিকে মনোযোগী হওয়া। তা পারবে কি এই প্রজন্ম! নাকি ঘাতক কর্পোরেটোক্রেসির কাছে ধরা দিয়ে পুঁজির পেছনে দৌড়াদৌড়ি করে এই মূল্যবান মনুষ্যজন্ম নষ্ট করে ফেলবে। একুশ শতকের নতুন জামানার কাছে সরদার ফজলুল করিমের সত্য কি মিথ্যে হয়ে যাবে! হতে পারে না। কেননা মানুষের জন্য তার নির্দেশিত ও যাপিত জীবনই সুন্দর ও সত্য ছিলো, মানুষকে ওই পথে ফিরতেই হবে। তা হলেই মানব জীবনের শুদ্ধ কল্যাণ। আর তা না হলে শহীদ কাদরীর মতো করে বলতে হয়, ‘প্রেমিক মিলবে প্রেমিকার সাথে ঠিকই/ কিন্তু শান্তি পাবে না, পাবে না, পাবে না।’
Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (3) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Dilruba Shahana — জুন ১৭, ২০১৪ @ ৭:৪৬ অপরাহ্ন

      লেখাটি পড়ে ভাল লাগলো। কথায় ও কর্মে যিনি এক, জ্ঞানে যিনি নিবেদিত জাতি তাকে শ্রদ্ধার সাথে মনে রাখবে। ধন্যবাদ লেখককে ও বিডিনিউজটোয়েন্টিফোর ডটকমকেও।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বাংলাদুনিয়া — জুন ১৭, ২০১৪ @ ৯:১১ অপরাহ্ন

      ‘স্ব-আলোয় উদ্ভাসিত মানব’ তৈরীর কারিগর।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Asrar Ahmed — জুন ১৭, ২০১৪ @ ৯:৪৫ অপরাহ্ন

      “jibon o moroner shimana chara-e bondhu he amar roecho darae”

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com