জামান ভাই, আমাদের ব্যস্ততা, উপেক্ষা ও কদরহীনতাকে ক্ষমা করবেন

রাজু আলাউদ্দিন | ১৬ জুন ২০১৪ ২:৩০ অপরাহ্ন

border=0অনুবাদক, কথাসাহিত্যিক, সাহিত্য সমালোচক ও শিশুসাহিত্যিক ফখরুজ্জামান চৌধুরী গত ১২ জুন আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। বাঙালিদের গড় আয়ুর বিবেচনায় হয়তো পরিণত বয়সেই মৃত্যু বরণ করেছেন, তবু কোনো মৃত্যুকেই, আমাদের কাছে পরিণত মনে হয় না, অন্তত প্রিয়জনদের মৃত্যুতো নয়ই। না, প্রিয়জন বলতে আমি কোনো আত্মীয়তার বন্ধনের ইঙ্গিত করছি না। সে সম্পর্ক তার সাথে আমার ছিলো না। তারপরেও তিনি প্রিয়জনই ছিলেন আমার কাছে। প্রিয়তার কারণ ব্যক্তি মানুষটি নয়, বরং তার সাহিত্যকৃতি।

আমরা আশির দশকে যারা লেখালেখি শুরু করি, তাদের কাছে তিনি অপরিচিত ছিলেন না। তার অনুবাদে রাজা আর্থারের দরবারে (১৯৬৮) পড়েছিলাম বোধ হয় আশির দশকের আগে আগেই। হাড়কিপটে বুড়ি (১৯৫৬) এবং রিপভ্যান উইংকলও বোধ হয় তখনই পড়া। জগন্নাথ কলেজের সামনে তখন পুরোনো বই রাস্তায় ছড়িয়ে বিক্রি করা হতো। আর তার পাশেই ছিলো ছোট ছোট পুরোনো বইয়ের দোকান সারিবদ্ধভাবে। এখান থেকেই কিনেছিলাম বইগুলো। আরও বড় হয়ে আধুনিককালের বিদেশী সাহিত্যের তৃষ্ণাও মিটিয়েছি তার অনুবাদে আনাবাজ (১৯৮৬) ও দূরদিগন্ত (১৯৮৬) পাঠের মাধ্যমে। সাঁ ঝ পের্সের মতো দূরূহ কবির কবিতার অনুবাদ বাংলা ভাষায় আমাদের জন্য পাঠের সুযোগ করে দিয়েছিলেন তিনি। খোদ ইংরেজি অনুবাদেই পের্স আমাদের কাছে রীতিমতো অবোধ্য মনে হতো। বাংলায় তাকে অনুবাদ করা খুবই দুঃসাহসের ব্যাপার। জামান ভাই সেই দুঃসাহস দেখিয়েছিলেন তার অসামান্য ইংরেজি জ্ঞান আর উন্নত কাব্যরুচির উপর ভর করে। এই সময় ফেদেরিকো গার্সিয়া লোর্কাও ছিলো আমাদের কৌতুহলের কেন্দ্রে। জামান ভাইয়ের অনুবাদে আমরা তখন কবি লোর্কার নাট্যসত্তার সাথে পরিচিত হই ইয়ের্মা নাটকের মাধ্যমে। আরও একটি অনুবাদও আমাদের কাছে তখন প্রিয় হয়ে উঠেছিলো সেটি বিখ্যাত ‘প্যারিস রিভিউ’ পত্রিকায় প্রকাশিত পৃথিবীর সেরা লেখকদের সাক্ষাৎকার সংকলন Writers at work -এর বাংলা তর্জমা: লেখকের কথা। জামান ভাই এবং গল্পকার জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত যৌথভাবে অনুবাদ করেছিলেন। দুটো খন্ড তারা অনুবাদ করেছিলেন। বিশ্বসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ অংশগুলোর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়ার মাধ্যমে আমাদের সাহিত্যরুচিকে তিনি সমৃদ্ধ করে যে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন তা অসাধরণ। আজকাল বিদেশি লেখকদের লেখা ইন্টারনেটের সুবাদে যতটা সহজলভ্য হয়ে উঠেছে তখন তা ছিলো না। আমরা যারা ইংরেজি ভালো জানতাম না, বা জানলেও সেসব আমাদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে তাদের জন্য এসব অনুবাদের মাধ্যমে বিশ্বসাহিত্য সম্পর্ক আন্দাজ পাওয়াটা ছিলো সহজ এবং একমাত্র উপায়। কেবল অনুবাদই নয় তিনি বেশ কিছু উপন্যাসও লিখেছেন। লিখেছেন দেশি বিদেশি লেখকদের জীবনী। তার সাহিত্যকৃতির জন্য বাংলা একাডেমী পুরষ্কারও পেয়েছিলেন ২০০৫ সালে। তারপরেও তিনি ছিলেন উপেক্ষিত। উপেক্ষিত এই জন্যে যে তার সাহিত্যকৃতি নিয়ে, কিংবা সাহিত্যের যে-বিভাগটিতে তিনি সবচেয়ে বেশি কাজ করেছেন সেই অনুবাদের গুণাগুণ নিয়ে বলতে গেলে কোনো আলোচনাই হয়নি। আলোচনা হয়নি তার শিশুসাহিত্য নিয়েও। তার তুলনায় কত অযোগ্য লেখকরা পত্রিকা আর গণমাধ্যমের পক্ষপাতদৃষ্ট, সিন্ডিকেটেড একাচোখা অসততার ফর্মালিনে চকচকে ও তরতাজা রূপে আমাদের সামনে হাজির হচ্ছে প্রতিনিয়ত! উপেক্ষার সর্বশেষ নির্দশন প্রথম আলোয় তার মৃত্যুসংবাদটি বেমালুম গুম করে দেয়া। যদিও তারা–উপেক্ষাকে অক্ষুন্ন রেখেই–চালাকির আশ্রয় নিয়ে পরেরদিন ইন্টারনেট সংস্করণে সংবাদটি প্রকাশ করেছে। কাগজ সংস্করণে ঠাঁই হয়নি এই গুণী লেখকের। প্রথম আলো তাদের নিজেদের বিপুল সংখ্যক পাঠককে তার কৃতি সম্পর্কে তো কোনোদিন জানতে দেয়ইনি, এমন কি তার মৃত্যু সম্পর্কেও নয়। রাজনৈতিক বিশ্বাস বা সাহিত্যরুচির ভিন্নতার কারণেও যদি ফখরুজ্জামানকে তারা অপছন্দ করেন, তারপরও তার মৃত্যুর সংবাদমূল্যকে তো কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না। প্রতিদিন কত অপদার্থ, ইতর আর দুর্বৃত্তদের সংবাদ তারা পরিবেশন করে আসছেন, সেখানে ফখরুজ্জামান চৌধুরীর মৃত্যুসংবাদটিকে সাংস্কৃতিক গুরুত্বের কারণেই কি প্রকাশ করা উচিত ছিলো না? স্রেফ তথ্য জানার অধিকারের কথা্ও যদি বিবেচনা করি তাহলেও এই সংবাদকে উপেক্ষা করা অনৈতিক বলেই মনে হয়।
ফখরুজ্জামানকে উপেক্ষার মাধ্যমে প্রথম আলো তাদের সিন্ডিকেটেড ও সংকীর্ণ মানসিকতাকেই স্পষ্ট করে তুলেছে।


জামান ভাইয়ের সাথে আমার কবে প্রথম পরিচয় হয়েছিলো মনে নেই। খুব সম্ভবত আশির দশকের শেষ দিকেই হবে। তার অনুবাদে আনাবাজ তখন আমাদের হাতে হাতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। একবার সম্ভবত ৯৬ সালে তার একটা সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম আমি এবং ব্রাত্য রাইসু। তখন তিনি বোধহয় আজিমপুর কলনিতে থাকতেন। সাক্ষাৎকারটিতে তিনি অকপটে আমাদের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন লেখক সম্পর্কে বেশ কটু মন্তব্য করেছিলেন। আমরা যেহেতু রেকর্ড করছিলাম, তাই তিনি বলার পরপরই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন বেফাঁস মন্তব্যের ভবিষ্যত ফলাফল কল্পনা করে। তখনও তিনি সরকারী চাকরী করছেন, ফলে উদ্বিগ্ন হবারই কথা। তবে সৌভাগ্যক্রমে আমরা সেটি আর প্রকাশ করিনি। কেন করা হয়নি এখন আর মনে পরছে না। হয়তো তার উদ্বেগকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে এটি আর প্রকাশ করা হয়নি।

এরপরে তাঁর সঙ্গে আরও কয়েকবার দেখা হয়েছে। আমি তখন কবি আবিদ আজাদের প্রতিষ্ঠিত শিল্পতরু পত্রিকা ও প্রকাশনার কার্যালয়ে প্রায়ই যেতাম আড্ডা দিতে। সেখানে তাঁকে প্রায়ই আসতে দেখতাম। খুব নিয়মিত না হলেও তিনি যেতেন। তার কয়েকটা বইও বের হয়েছিলো শিল্পতরু থেকে। ৯৯ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত তার সাথে আর কোনো যোগাযোগ ছিলো না। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে যোগ দেয়ার পর তার সাথে আবার যোগাযোগ গড়ে ওঠে। তিনি বোধহয় তখন কানাডা থাকতেন বড় মেয়ের সাথে। আমাদের মতামত বিশ্লেষণ এবং সাহিত্য বিভাগে তাকে লেখার আমন্ত্রণ জানালে তিনি খুব খুশী মনে আমাদের জন্য লিখেছেন বেশ কিছু লেখা। শেষের দিকে তার গদ্য শৈলীর একটা নিজস্ব ধরণ নজরে পড়ার মতো ছিলো। লিখতেন হাতে, ওখান থেকেই তিনি হাতে লিখে স্ক্যান করে লেখা পাঠাতেন ইমেইলে। কখনো কখনো হাতের লেখা বুঝতাম না বলে আমি কম্পোজ করে তাকে সংশোধন করে পাঠাতে বলতাম। শেষের দিকে লিখতে তার কষ্ট হতো; কষ্টের কারণ তার শারীরিক অসুস্থতা। কিন্তু লেখায় এর কোনো প্রতিফলন ছিলো না। অর্থাৎ ভাবপ্রকাশ বা বাক্য গঠনে কোনো অসংলগ্নতা ছিলো না। লিখতে তিনি ভালোবাসতেন। আত্মপ্রচারের কলাকৌশলের চেয়ে লেখার কলাকৌশলের প্রতি তার ভালোবাসা এতই প্রবল দিলো যে অসুস্থতাকে উপেক্ষা করেই লিখতে পারতেন অনায়াসে। লিখেছেন্ও শেষের দিকে।

বছর দেড়েক বা দুয়েক আগে তিনি দেশে ফেরেন। তখন প্রায়ই ফোনে কথা হতো। বোধহয় ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমনারির কারণে শ্বাসকষ্ট ছিলো। ফোনে কথা বলার সময় সেটা স্পষ্ট বুঝা যেত। আমি তাই ইচ্ছে করেই কম কথা বলতাম যাতে তিনি কথা সংক্ষিপ্ত করতে পারেন।

গত দেড় দু’মাস তার সাথে আর কোনো যোগাযোগ ছিলো না। কেউ বলেওনি যে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আমাকে তিনি বেশ কয়েকবার তার উত্তরার বাসায় সপরিবারে যাওয়ার দাওয়াতও দিয়ে রেখেছিলেন। যাবো যাবো করে আর যাওয়া হয়নি। হাতের কাছে পেয়েও এই গোপন শিক্ষককে তার জীবনের শেষ দিনগুলোতে দেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলাম। জামান ভাই, আমাদের ব্যস্ততা, উপেক্ষা ও কদরহীনতাকে ক্ষমা করবেন।
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন zunnu — জুন ১৮, ২০১৪ @ ২:০১ অপরাহ্ন

      এই দেশে ক্ষমাই চেয়ে যেতে হবে…

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com