স্কুলের দিনগুলো: পারিবারিক আনন্দ-বিষাদ

সনজীদা খাতুন | ৫ জুন ২০১৪ ১০:০১ অপরাহ্ন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট হাউসে থাকতে মাসে অন্তত একটি রোববারে বড়দি এক মহা আনন্দের আয়োজন করতেন। ঘোষণা দিতেন– ‘আজ কেক করব, চল।’ নাচতে নাচতে সঙ্গে ছুটতাম সবাই। বড়দি একটা মোড়া কিংবা জলচৌকির অপেক্ষাকৃত উচ্চাসনে বসে অর্ডার করতেন– ময়দা, ডিম, ডিম ফেঁটবার কল, ঘি, চিনি, এক চিমটি নূন, এক কাপ দুধ, এসেন্স অফ ভ্যানিলা, বেকিং পাউডার আর ডিম ফেঁটবার জন্যে বড় খাড়া বাটি, আরো একটা সাদা তামচিনির বল (Bowl), কাঠের ডাট (কেকের উপকরণ নাড়বার হাতা)। সব হাজির হয়ে যেত। সাদা তামচিনির বলে প্রথমে ময়দা চেলে নিয়ে তার সঙ্গে বেকিং পাউডারে সামান্য নূন মেশানো হতো। তার পরে আলাদাভাবে ঘি, দুধ আর ডিমের কুসুম দই দিয়ে খুব করে তাতে ফ্যাটানো হতো। এসেন্স অব ভ্যানিলা দিতেন বড়টি। অন্যদিকে হুকুম হতো– মিনু, তুমি ডিমের সাদাগুলো মেশিনে ফেটাতে থাকো। বাটি উপচে ফেনা উঠলে একটু একটু করে বড় পাত্রের গোলার সঙ্গে মেশানো চলত। তারও পরে ওতে এক চামচ এক চামচ করে ময়দা দিয়ে দ্রুত নাড়া হতো।

ওদিকে উঠোনের বড় উনুনে তেজাল বসানো হয়েছে। তেজাল হচ্ছে বড় গোল একটা উঁচু ধাতব পাত্র, তার তিনটা পায়া। উনুনে জ্বলছে চ্যালা কাঠের আগুন। আর একদিকে কেউ একজন কেক তৈরির গোল গোল, আর পানের আকারের ছাঁচগুলো ভালো করে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করেছে। বড়দি বললেন, রানু- মিনু ওগুলোর ভেতর দিকে ঘি মাখাও। সব তৈরি হলে ট্রে কিংবা কুলোতে কেকের ছাঁচ বসিয়ে বড়দির কাছে নিয়ে গেলে বড়দি ছাঁচগুলোর এক তৃতীয়াংশ ভরে কেকের গোলা ঢালতেন ডই দিয়ে তুলে এক ফোঁটা পড়তো না বাইরে। ততক্ষণে তেজালও প্রস্তুত।

একজন তেজালের গোল ঢাকনা খুলত আর অন্য একজন কুলো আর ট্রে থেকে একটা একটা করে ছাঁচ তেজালের ভেতরে বসিয়ে দিত। ঢাকনা লাগাবার নির্দিষ্ট সময়ের পরে কাঠের আগুন নিভিয়ে ঢাকনার ওপরের বালুর উপরে চুলো থেকে লোহার হাতা দিয়ে জ্বলন্ত কাঠকয়লা তুলে ছড়িয়ে দিত। বড়দি বসে বসে হাতের কবজিতে লাগানো ঘড়ি দেখতেন। মিনিট বিশেক হয়ে গেলে সাবধানে তেজালের ঢাকনা খুলে চিমটে দিয়ে একটা একটা করে ছাঁচ বার করা হতো। কেকগুলো ততক্ষনে ফুলে ছাঁচ ছাড়িয়ে মাথা তুলেছে। রান্না ঘরে বড়দির সামনে ওগুলো নিয়ে রাখলো। খানিক বাদে উনি ছুরি দিয়ে ছাঁচ থেকে কেকটা একটু আলগা করে অন্য পাত্রের ওপরে ধরে ছাঁচের পিছন দিকে ঠুকে ঠুকে আস্ত কেকখানা বার করে আনতেন। ছাঁচে মাখানো ঘি-এর দরুন সহজেই কেক বেরিয়ে আসত। ভালো কথা–ছাঁচের ভিতরে গোলার ওপরে বাদাম কুচি, কিশমিশও দেওয়া হতো । প্রাণভরে শুধু ঘ্রাণ নিতাম আমরা ছোটরা। কিন্তু এমনি সংযমের শিক্ষা ছিল যে, পরদিন সকাল বেলায় খাওয়া হবে বলে আমরা নিজেরাই সব ভরে রাখতাম বড় মিটসেফে।

সেকালের কেক তৈরির বিরাট পর্বের পরব ছিল এইরকম। বালিকা বয়সে বাড়ির পশ্চিম দিকের পুকুরের ধারে নেমে আর-একজন কারো সাথে শাড়ি পেতে মাছ ধরবার চেষ্টা করতাম। মাছেরা এতই চালাক যে মোটেই ধরা দিত না। তারই মধ্যে একদিন দেখি শাড়ির নিচের পাড়ে বেশ বড় মতো একটা টাকি মাছ আটকেছে। সে কী উত্তেজনা। ওদিকে মাছ কোটা টোটা কিছুই জানি না। আঁশ ছাড়ানোর ভঙ্গি করে তিন টুকরো করে নেওয়া হলো শুধু। তারপর ছোট গর্ত খুঁড়ে আগুন জ্বেলে একটা টিনে করে রান্না বসানো হলো। পিকনিকের ভাব আর কী। তারপরে কী যে হয়েছিল স্মরণে নেই। ওই মাছ খাওয়া হয়নি নিশ্চয়ই! মাছ ধরতে পারবার আনন্দটাই জ্বল জ্বল করে মনে।

আমার দশ এগারো বছর বয়সের সময়ে যুদ্ধ আর সৈন্যদের কথা শুনতে পেতাম আম্মুদের আলোচনায়। সৈন্য, বিশেষ করে লালমুখো আমেরিকান সৈন্যরা নাকি ‘লালাবিবি মাংতা’ বলে মেয়েলোক খুঁজে বেড়াতো। একদিন শেষে বিকেলে দেখি জানালার বাইরে থেকে হাত গলিয়ে রুমালে করে একটা কমলালেবু রেখে গেছে কে! ভয়ে সিঁটিয়ে গেলাম আমরা। আম্মুর থেকে এই ভয় আমাদের মনে সঞ্চারিত হয়েছিল।

যুদ্ধের কারণে রেশনিং শুরু হয়েছিল তখন। টিনে করে পনির, সংরক্ষিত মাছ-মাংস দেওয়া হতো রেশনে। ছোট ছোট টুকরো করা শুকনো আলু আসত টিনে করে। ধুয়ে খানিকক্ষণ ভিজিয়ে রেখে ভেজে খাওয়া যেত। ক্রাফ্ট কে চীজের সঙ্গে তখনই পরিচয়। দারুণ ভালো ছিল খেতে। কিছুকাল পরে সেজদির বিয়ে হয়েছিল। সেজ দুলাভাই রেসনিং-এ চাকরি করতেন বলে আমাদের জন্যে ক্রাফ্ট কে চীজ সরবরাহ করতেন।

ইউনিভার্সিটি গেট হাউসের দক্ষিণ দিকের বাড়িতে থাকতে এক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছিল। সেজ দুলাভাইয়ের সঙ্গে আমার ছোট তিন ভাই–সুলতান, নবাব আর নূরু পুকুরে গোসল করতে যেত। দোতলা থেকে দুলাভাইকে নামতে দেখেই ভাইরা ছুটল পুকুরের দিকে। এদিকে আম্মু দুলাভাইকে শরিফা আতা খেতে দিয়েছেন। উনি খেতে খেতে ধীরে সুস্থে পুকুরের দিকে রওনা হলেন। ঘাটে গিয়ে দেখেন– ছোট নূরু চুপচাপ ঘাটে বসে আছে। জিজ্ঞেস করলেন– ‘ওরা দুজন কোথায়?’ নূরু বলল-‘ওরা অনেকক্ষণ হলো ডুব দিয়েছে, উঠছে না’। দুলাভাই দেখলেন পুকুরের মাঝখানে কী রকম বুড়বুড়ি উঠছে। এক লোক স্নানান্তে চলে যাচ্ছিল, দুলাভাই তার পায়ে পড়লেন- ‘আমার শালারা ডুবে গেছে, ওদের তোলেন’। নিজে ডুব দিতে চেষ্টা করে অর্ধেক না যেতেই ধড়ফড় করে ফিরে এসেছেন দুলাভাই। অন্য ভদ্রলোক ডুব দিয়ে নবাবকে তুলে আনলেন। ততক্ষণে পুকুরধারে লোক জমে গেছে। কেউ একজন নবাবের পেটটা মাথার উপরে রেখে জোরে ঘুরাতে লাগলো, যাতে পেটের পানি বেরিয়ে যায়। দুলাভাই আবার উদ্ধারকর্তা ভদ্রলোকের পায়ে পড়লেন-‘আমার আর এক শালা যে পানির তলায়!’

বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ফেকাহ্’ দারোয়ান এক লম্বা বাঁশ নিয়ে পুকুরের তলায় খুঁজতে লাগল। শেষ পর্যন্ত যখন সুলতানকে পাওয়া গেল-তখন সে মৃত। সুলতান-নবাবরা ছোট ছোট লুঙ্গি পরে পুকুরে নামত। আর ভেজা লুঙ্গিতে বাতাস ভরে ফুলিয়ে এক হাতে ধরে অন্য হাতে পানি নেড়ে পুকুরের ভিতরদিকে চলে যেত। তো নবাবের হাতে থেকে লুঙ্গির বেলুন ছুটে যেতে, ওকে হাবুডুবু খেতে দেখে ভয় পেয়ে সুলতান নিজের লুঙ্গির মুঠি ছেড়ে দিয়ে পিছন দিক থেকে ওর গলা জড়িয়ে ধরেছিল। নবাব বলে–খানিক পরে ওর গলা থেকে সুলতানের হাত ছুটে গেল। ও ডুবে গেলে নবাবও ডুবে যায়। পরে শুনেছিলাম সুলতানের হার্ট ফেইলিওর হয়েছিল।
Flag Counter

কিস্তি-১ আমার প্রথম স্কুল

কিস্তি-২ স্কুলের দিনগুলো: আনন্দময়ী স্কুলে

কিস্তি-৩ স্কুলের দিনগুলো: ইডেন স্কুলে

কিস্তি-৪ স্কুলের দিনগুলি: ইডেন স্কুলে

কিস্তি-৫ স্কুলের দিনগুলো: ইডেন বিল্ডিংসের ইডেন স্কুলে

কিস্তি-৬ স্কুলের দিনগুলো: কামরুনসেসা স্কুলে

কিস্তি-৭ স্কুলের দিনগুলো: কামরুননেসা স্কুলের শিক্ষকদের কথা

কিস্তি-৮ স্কুলের দিনগুলো: প্রথম প্রেমের চিঠি

কিস্তি-৯স্কুলের দিনগুলো:সেগুনবাগানে ছেলেবেলা

কিস্তি-১০ স্কুলের দিনগুলো: সেগুনবাগানের বাড়ি

কিস্তি-১১ স্কুলের দিনগুলো: সেই যে দিনগুলি

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com