স্কুলের দিনগুলো: সেই যে দিনগুলি

সনজীদা খাতুন | ২৩ মে ২০১৪ ১১:০২ অপরাহ্ন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (এখনকার মেডিকেল কলেজ) উত্তর আর দক্ষিণ দিকের পুব ঘেষা দুটি গেট হাউসেই আমরা বাস করেছি। বেশ কিছুদিন এক বাসাতে থাকা হলেই আমার মা অস্থির হয়ে উঠে বাসা বদলের জন্যে আব্বুকে তাড়া দিতে শুরু করতেন। এ বাসাগুলোতে ওপর-নীচ মিলিয়ে ছোট-বড় আষ্টেক ঘর ছিল। সব ঘর ব্যবহারও হতো না। উঠোনও ছিল বেশ বড় সড়। সেখানে রান্নাঘর খাবার ঘর ছাড়া বড় চৌবাচ্চার ধারে কাপড় কাচার চাতাল, সংলগ্ন স্নানঘর, আর সব শেষ প্রান্তে দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে ছিল শৌচাগার। প্যান বসানো থাকলেও, কোনো লো-ডাউন ছিল না। পানির কল ছিল; কাজ হলে বালতি করে পানি ঢেলে দিতে হতো।

উঠোনে গরু-চাগল, পাতিহাঁস, রাজহাঁস, মুরগি–কী না পোষা হতো! আবার মুরগি তা-এ বসিয়ে হাঁস-মুরগির ডিম ফুটিয়ে বাচ্চাও তোলা হতো। এসব পোষ্যদের খাবার দেওয়ার কাজে আমাদের ছোটদের সাহায্য ছিল অপরিহার্য। অল্প বয়স থেকেই স্বভাবত নানা রকম কাজের অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল। মুরগি ‘তি-তি-তি-তি’ করে ডেকে চালের খুদ ছড়িয়ে দিতাম। কখনো কখনো ছোট গামলাতে ভাতের ফ্যান দিয়ে চালের কুঁড়ো মাখিয়ে খাওয়াতাম। হাঁসদের ডাকতে হতো ‘ক্যাত-ক্যাত্-ক্যাত-ক্যাত’ বা ‘তই-তই-তই-তই’ বলে। ছাগলকে খাওয়াবার খুব একটা হাঙ্গামা ছিল না। খুঁটোসুদ্ধ দড়ি ধরে উঠোনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে সবুজ ঘাসের কাছাকাছি খুঁটো গেড়ে দিয়ে আসতাম ইট দিয়ে। গরুকে উঠোনের দরজা পার করিয়ে দিলে সারাদিন দিব্বি ঘাসটাস খেতো। দুপুরের রান্নার পর উনুনে গুঁড়ো কয়লা ছড়িয়ে দিয়ে ইয়াবড় এক লোহার কড়াইতে চালের খুদ আর মাসকলাইয়ের খিচুড়ি চাপিয়ে দেওয়া হতো। খাবলা খাবলা নূনও দিতে হতো তাতে। বিকাল বেলা উঠোনে বড় মাটির গামলায় অনেক খানি পানি দিয়ে–ঢেলে দিয়ে, পানিতে ডালের খানিকটা ভুষি দিয়ে হাত ডুবিয়ে মিশাতে হতো। খাবার তৈরি হলে উঠোনের দরজা খুলে ‘আ-আ-আ-আ’ বলে ডাকলে গরু দুটো ব্যস্ত হয়ে ঢুকে সোজা গামলাতে নাক মুখ চুবাত। তলার খিচুড়ি খাবার পাল্লা দেওয়া হলে তারপর ওপরের পানি আর ভুষি খাওয়া। বেশ লাগত দেখতে।

রাজহাঁসগুলোকে বড্ড ভয় পেতাম। মাটির সমান্তরালে গলা-মুখ লম্বা করে বাড়িয়ে তেড়ে আসত ঠোকর দিতে। খেতো ওই ফ্যান-মাখানো কুঁড়োর সঙ্গে ছিটেফোঁটা বাসি ভাত। ওগুলোকে পশ্চিমদিকের পুকুরে পাঠিয়ে দিয়ে শান্তি হতো।

তখনকার দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের জমাদার এসে ঝাড়ু টাড়ু দিয়ে, বড় ব্রাশ দিয়ে ড্রেন ধুয়ে যেত। পানি ঢেলে দেবার কাজ করতে হতো আমাদের। বাবুলাল জমাদারের সঙ্গে আম্মু উর্দুতে কথা বলতেন, আর সে খুব ‘হাঁ-হাঁ-হাঁ-হাঁ’ করত বিনয়ের সঙ্গে।

ও বাড়িগুলোতে থাকতে বাছুর হয়ে ছিল বলে মনে পড়ে না। তবে ছাগলের বাচ্চা হয়েছিল। একজন কেউ পেছনের পা দুটো ধরে থাকলে অন্যজন দুধ দোয়াতো। পরের দিকে পেছনের পা দুটো ছড়ি দিয়ে বেঁধে একা একাই দুধ দুইতে পারতাম। রান্না ঘরের বারান্দার খুঁটিতে ছাগল বাঁধা থাকত। ছাগলের দুধ খেলে মেধা হয় বলে ও দুধ ছেলেদের জন্যেই বরাদ্দ ছিল। ভাগ্যিস! যা বিটকেল গন্ধ ছাগলের দুধে!! সেগুনবাগানের বাড়ির টবে ঘৃতকুমারীর গাছ ছিল। তার পাতার ভিতরের সাদাটে শাঁসও, মগজে ঘৃত হবে বলে খেতে হতো ভাইদের। বাঁচোয়া!

ফজলুল হক হলের গেট হাউসে থাকবার সময়ে গরুর বাছুর হয়েছিল। আলীজান দারোয়ান এসে দুধ দুইয়ে দিয়ে যেত।

ইউনিভার্সিটির দক্ষিণ দিকের গেট হাউজের আরো দক্ষিণে ছিল চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের কোয়ার্টার্স। শিক্ষক ক্লাবের বেয়ারার নিবারণ থাকত সেখানে। উত্তর দিকের গেট হাউজে থাকবার সময়ে আম্মু আমাদের বরফ আনতে পাঠাতেন মূল ভবনের ক্লাব থেকে। সে থেকেই তাঁকে চিনতাম। এঁর বড় ছেলে নারায়ণ গরুর দুধ দিতেন বাড়ি বাড়ি। অত্যন্ত ভদ্র ছিল তাঁর চালচলন। এঁরই পরের ভাই বিখ্যাত মধুর ক্যান্টিনের ‘মধু’। ছাত্রদের কাছ থেকে আদায়পত্তর করতে হতো বলেই বোধ হয় এঁর চোখ ছিল লালচে, চলাফেরাও খানিকটা ‘ডেয়ারিং’ বলে থাকে।

নিবারণদের বাস ছিল কোয়ার্টার্সের পুব ধারে। পশ্চিম দিকের ঘরগুলো ছিল কীরকম স্যাঁসসেঁতে মতো। সেদিকটাতে থাকতো মেথররা। হোলির সময় ওদের ঢোলবাদ্যের সঙ্গে ‘ধেক্চালিচা ‘ধেক্চালিচা সারা রারা রদ্যিরা রদিরা। বাহিয়ার বাবা’ গান শুনতে পেতাম আমরা। সেই সময়টাতে যে ওরা নেশার ঘোরে বেশ মত্ত থাকত, সে কথা শুনতাম আম্মুর কাছে।

শীতের ভোরে পশ্চিম ঘেঁষা ওই মেথর পট্টিতেই আমাকে, রীণাকে, সেজদিকে পাঠাতেন আম্মু শিউলি ফুল কুড়িয়ে আনতে। ভেতরে একটি হাত-কাটা উলের সোয়েটার আর ওপরে ফ্লানেলের একখানা পা পর্যন্ত ঝুলের জামা। আম্মুর ভাষায় ‘ঝুবড়ি’) পরে শীতে ঠক্ ঠক্ করতে করতে তিনজনে ছুটতাম ফুল কুড়াতে। মাঝারি সাইজের খাবার ঢাকবার খাঁচি বা জালি ভরতি করে ফুল এনে দিলে আম্মুর মুখখানা ভারি উজ্জ্বল হয়ে উঠত।

সেই সময়ের চল ছিল শিউলির ডাঁড়ি ছাড়িয়ে ফুল দিয়ে জজরার মালা গাঁথা। ডাঁটিগুলো শুকিয়ে তুলে রাখা হতো পরবর্তী ইদে জর্দার রঙ করবার জন্যে। মেজদিরা কখনো কখনো শুকানো শিউলির ডাঁটি পানিতে ফুটিয়ে জর্দা রঙে শাড়ি রাঙাতেন। শাড়িতে শিউলি ফুলের হালকা একটা গন্ধ পাওয়া যেত প্রথম প্রথম। একালে সেসব ভাবা যায়?
কিস্তি-১ আমার প্রথম স্কুল

কিস্তি-২ স্কুলের দিনগুলো: আনন্দময়ী স্কুলে

কিস্তি-৩ স্কুলের দিনগুলো: ইডেন স্কুলে

কিস্তি-৪ স্কুলের দিনগুলি: ইডেন স্কুলে

কিস্তি-৫ স্কুলের দিনগুলো: ইডেন বিল্ডিংসের ইডেন স্কুলে

কিস্তি-৬ স্কুলের দিনগুলো: কামরুনসেসা স্কুলে

কিস্তি-৭ স্কুলের দিনগুলো: কামরুননেসা স্কুলের শিক্ষকদের কথা

কিস্তি-৮ স্কুলের দিনগুলো: প্রথম প্রেমের চিঠি

কিস্তি-৯স্কুলের দিনগুলো:সেগুনবাগানে ছেলেবেলা

কিস্তি-১০ স্কুলের দিনগুলো: সেগুনবাগানের বাড়ি

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com