আবেল আলার্কন: স্পানঞল ভাষায় গীতাঞ্জলির প্রথম অনুবাদক

রাজু আলাউদ্দিন | ৮ মে ২০১৪ ৬:২৭ অপরাহ্ন

border=0স্পানঞল ভাষায় রবীন্দ্রচর্চার ও রবীন্দ্র-অনুবাদের মোটা দাগের ঘটনাপঞ্জি লক্ষ্য করলে খানিকটা আশ্চর্য্য হতে হয় এটা দেখে যে, যে-বইটির জন্য রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার পেলেন তার অনুবাদ প্রথমে হলো না, হলো অন্য বইগুলো, যেমন দ্যা গার্ডেনার কিংবা দ্য ক্রিসেন্ট মুন। স্পানঞল ভাষায় রবীন্দ্রনাথের অনুবাদের সূচনা ১৯১৫ সালে, ততদিনে Gitanjali তিন বছরের পুরোনো বই। আটলান্টিকের এপার ওপার, দুপার থেকেই কেন সাড়া জাগেনি Gitanjali-এর প্রতি তা খানিকটা রহস্যময় এখনও পর্যন্ত। অনুবাদের অনুমতি না পাওয়াটাই এর পেছনে মূল কারণ কিনা জানি না। সে রকম হয়ে থাকলে অন্য দুটো বইয়ের ক্ষেত্রেও কি তা হতে পারতো না? সেটা না হয়ে থাকলে তাহলে Gitanjali-এর ক্ষেত্রেই তা কেন হবে? আবার Gitanjali-এর স্পানঞল অনুবাদ যখন হলো তখন দু’পার থেকেই প্রায় একই সময়ে অর্থাৎ ১৯১৮ সালে বের হলো, একদিকে আটলান্টিকের পূর্ব পাড়ে সেনোবিয়া-হিমেনেথের হাতে, অন্যদিকে পশ্চিমদিক থেকে পেদ্রো রেকেনা লেগাররেতার হাতে। কেন একই সঙ্গে বেরুলো এবং কেন আগে বেরুলো না, এর সঠিক উত্তর জানার জন্য খুঁটিনাটি অনুসন্ধানের অপেক্ষায় থাকা ছাড়া আপাতত কোনো উপায় নেই। আমার অভিজ্ঞতা থেকে যে-ব্যাপারটি নিশ্চয়তার সাথে জানি তাহলো পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখকদের সেরা লেখাটিই বা পুরস্কারপ্রাপ্ত বইটিই প্রথম অনুবাদ করার প্রতি সাধারণ ঝোঁক থাকে অনুবাদকদের। রবীন্দ্রনাথের এই বইটির ক্ষেত্রে স্পানঞল ভাষায় এই বিরল ব্যতিক্রম ঘটায় মনে খানিকটা খটকা না-লেগে পারে না। অথচ ফরাসী ভাষায় Gitanjali ১৯১৪ সালেই আঁদ্রে জিদের অনুবাদে বেরিয়ে গেল, অন্য দিকে জার্মান ভাষায় বেরিয়ে গেল আরও এক বছর আগেই। এবং এই দুই অনুবাদের ক্ষেত্রেই প্রকাশক ম্যাকমিলান(1) বা লেখকের(2) অনুমোদন ছিলো বলেই আমরা জানতে পারছি। স্পানঞলভাষী কোনো অনুবাদক বা প্রকাশকই তবে এই বইয়ের অনুবাদের জন্য তৎপর হননি? কিংবা এটি এড়িয়ে কেন অন্য বইগুলোর ব্যাপারেই কেবল তৎপর হলেন? স্পানঞল ভাষায় Gitanjali-এর অনুবাদ প্রসঙ্গে এই সব প্রশ্নের পাশাপাশি আরেকটি তথ্যও আমাদের কাছে কৌতুহলোদ্দীপক এই কারণে যে এই ভাষায় স্পানঞা থেকে বইটি প্রথম বেরুলো না, এমনকি যে-আর্হেন্তিনা লাতিন আমেরিকার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত তাদের হাত থেকেও নয় কিংবা মেহিকো বা চিলে থেকেও নয়, বেরুলো ১৯১৭ সালে প্রথমবারের মতো এমন এক দেশের এমন এক অনুবাদকের হাতে যার খ্যাতি বা প্রতিপত্তি হুয়ান রামোনোর তুল্য নয় কোনভাবেই। বলিবিয়ার রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক গুরুত্ব মেহিকো, আর্হেন্তিনা চিলে বা অন্য পারের স্পানঞার মতো নয় কোনো অর্থেই, তবু বলিবিয়ার আবেল আলার্কনই সেই অনুবাদক যিনি গোটা স্পানঞল ভাষায় Gitanjali-এর প্রথম অনুবাদকের গৌরব অর্জন করেছিলেন। অথচ এমন নয় যে ইস্পানো-আমেরিকার রবীন্দ্র-উত্থানে বলিবিয়ার দীর্ঘ ও ব্যাপক কোনো তৎপরতা ছিলো। চিলে, মেহিকো এবং আর্হেন্তিনার তুলনায় লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশগুলোর মতো বলিবিয়ারও সাংস্কৃতিক তৎপরতার সূচক খানিকটা নিচেই অবস্থান করছিলো।

border=0আবেল আলার্কন ছিলেন এই সূচকে একটা ব্যতিক্রম নিঃসন্দেহে। আবেলের জন্ম হয়েছিলো ১৮৮১ সালের ১০ অক্টোবরে বলিবিয়ার রাজধানী লা পাস-এ। রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী এবং লেখক আবেলকে কূটনৈতিকসূত্রে নানা দেশে স্থান বদল করতে হয়েছে। হয়তো এই কারণে Gitanjali-এর অনুবাদ মুদ্রিত হয়েছিলো মাদ্রিদের M. Garcia Y G. Saez প্রকাশনী থেকে কথাসাহিত্যিক, কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক আবেল Gitanjali অনুবাদে কেন এবং কিভাবে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন তার ইতিহাস আমাদের জানা নেই। তবে তিনি নিজে যেহেতু লেখালেখি করতেন আর অন্যদিকে বাঙালি এক কবির নোবেল প্রাপ্তি– এই দুয়ের সম্মিলনই হয়তো তাকে উদ্বুদ্ধ করেছে Gitanjali অনুবাদে। এছাড়া লেখক হিসেবে তিনি নিশ্চয়ই লক্ষ্য করে থাকবেন স্পানঞা এবং লাতিন আমেরিকায় রবীন্দ্রনাথ নিয়ে আগ্রহের সূচনা। নিজের ব্যক্তিগত মুগ্ধতাও এর পেছনে থাকতে পারে।

‘মুগ্ধতার’ কথা বলছি এই কারণে যে, চার পৃষ্ঠাব্যাপী অনুবাদের যে ভূমিকাটি গ্রন্থে যুক্ত হয়েছে তাতে ইয়েটসের মতোই মুগ্ধতার প্রকাশ লক্ষ্য করা যাবে। যদিও কোথাও তিনি ইয়েটসের উল্লেখ না করেই ইয়েটসের ভাষায় সেই মুগ্ধতার কথা জানিয়েছেন। যেমনটা এর আগেও আমরা ঘটতে দেখেছি মারিয়া মার্তিনেসের ক্ষেত্রে। যেমন তার ভূমিকা শুরুর স্তবকেই তিনি বলেছেন:

“আলোকিত শৈশবে তিনি যে সব পদাবলী লিখেছিলেন সেগুলো এখনও কলকাতায় গাওয়া হয়, ভরা যৌবনে উৎসারিত কবিতাসমূহ এবং তার অস্তিত্বের স্বচ্ছ পাত্র থেকে নির্গত কবিতাগুলো ভারতের পশ্চিমাঞ্চল থেকে মিয়ানমার পর্যন্ত বন্দনার মতো ছড়িয়ে পড়েছে। সুমিষ্ট সব বাংলাভাষীদের মুখে মুখে এগুলো স্পন্দিত।”
Las trovas que compuso en su iluminada adolesencia cantanse todavia en Calcuta, las poesias que vertio su plena juventud y las que vierte el vaso limpido de su existencia, desgrananse como rezos desde el Oeste de la India a Burmah y tiemlen en todos los labios que hablan el dulce idioma de los bengalis.(3)

আরও এক জায়গায় ইয়েটসের প্রতিধ্বনি আমরা দেখতে পাবো ভূমিকাটির মাঝামাঝি গিয়ে:
“রবীন্দ্রনাথের মরমীবাদের স্বাতন্ত্র্য হচ্ছে এখানে যে তা জীবনকে প্রত্যাখ্যান করে না, বরং প্রকৃতির জন্য তার আবেগদীপ্ত ভালোবাসার নানান সুরে এরই গান তিনি গেয়ে বেড়ান।”
La diferencia del misticismo de Tagore esta en que no rehusa la vida, pues la canta en los diferentes tonos de su arrebatado amor por la naturaleza.(4)

এটা ঠিক যে স্পানঞলে যারাই রবীন্দ্রনাথ চর্চা করেছেন বা অনুবাদ করেছেন তাদের অনেকেই ইয়েটসের এই ভূমিকা দ্বারা প্রবলভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। তবে, আবেলের উপর ইয়েটসের সামান্য প্রতিধ্বনির অংশটুকু বাদ দিলে এতে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে অনুবাদকের নিজস্ব অনেক উপলব্ধিও রয়েছে। কখনো কখনো তিনি স্পানঞলভাষী আধ্যাত্মিক বা মরমী অন্য কবিদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথকে মিলিয়ে দেখারও চেষ্টা করেছেন।

“পশ্চিমের সন্তদের মতোই রবীন্দ্রনাথ কথা বলেন ঈশ্বরের সাথে, মাঙ্গলিক বিশ্বাসের মধ্য দিয়ে তিনি তাকান আর অনুভব করেন ঈশ্বরের অশেষ প্রেমকে।
“তিনিই আমার মাঝে তার স্নিগ্ধ মমতা দিয়ে আমার সত্তাকে জাগিয়ে তোলেন”- কবি বলেন। অন্যকালের আরেক কণ্ঠ, করুণাসিক্ত ও বিভাময়ী মাদ্রে সান্তা তেরেসা যেমনটা বলেছিলেন:

হে জীবন, বল কিবা দিতে পারি
জীবনস্বামীকে, বিরাজ করে যে আমাতে?

আর সান হুয়ান দে লা ক্রুসের মতোই রবীন্দ্রনাথেও রয়েছে দীপ্যমান জীবন ও আত্মিক আলোর জন্য তীব্র আকাঙক্ষা।”

Tagore, como los santos de Occidente, conversa con Dios, lo mira a traves de una fe edificante y siente su infinito amor.
“Es el, el que esta dentro de mi, quien despierta mi ser con sus luminosas caricias”–dice el poeta–, como otro tiempo, mas bañado de la gracia, dijo la resplandeciente madre Santa Teresa:
vida, que puedo yo darle
a mi Dios que vive en mi?
Y Rabindra Nath, cual San Juan de la Cruz, tiene tambien ansias de luz espiritual y de radiosa vida.(5)

আবেল নিজে কবি ছিলেন বলেই হয়তো, কবির স্বভাবসুলভ সংবেদনশীলতা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের কবিতার বাচনিক স্বাতন্ত্র্য ও ঐশ্বর্য়্যকে যেমন দেখার চেষ্টা করেছেন, তেমনি এর আলাংকারিক বৈশিষ্ট্যকেও বুঝবার চেষ্টা করেছেন। Gitanjali-এর কবিতার মূল প্রবণতাকে চিহ্নিত করতে গিয়ে পাঠকদেরকে তিনি ভূমিকার দ্বিতীয় স্তবকেই স্মরণ করিয়ে দেন যে “রবীন্দ্রনাথের কবিতা দর্শনাশ্রয়ী, আবেগময় এবং ধর্মীয় বোধসম্পন্ন (La poesia de Tagore es filosofica, sentimental y religioso)|” তবে এসবের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের কাব্যশক্তির প্রধান গুণ যে-কল্পনা ও সৌন্দর্য্য এও তিনি লক্ষ্য করেন নির্ভুলভাবে:

তবে পল্লবিত কল্পনা খুঁজে আনে সজীব রূপকগুচ্ছ আমাদের সামনে তার সুগভীর ধারণাগুলো তুলে ধরার জন্য। আর একে তিনি সৌন্দর্যের সরল বোধ দিয়ে সুনিপুণভাবে মুড়িয়ে দেন।

Sus imaginacion frondosa, halla vivas metaforas para mostrarnos las mas profundas de sus ideas, y envuelve a estas Pulcramente con una vision recta de la belleza.(6)

রবীন্দ্রনাথের কবিতা সম্পর্কে পাঠকদেরকে একটা মোটামুটি আন্দাজ দেয়ার জন্য আবেলের ভূমিকাটির গুরুত্বকে উপক্ষো করা যায় না। সাড়ে চার পৃষ্ঠার সংক্ষিপ্ত পরিসরে তিনি রবীন্দ্র-বৈশিষ্ট্যের চুম্বক অংশটুকু স্পানঞলভাষী পাঠকদের সামনে তুলে ধরেছেন অনেকটা সফলভাবেই।

Gitanjali-এর মোট ১০৩ টি কবিতা থেকে ৯৬টি কবিতা তিনি অনুবাদ করেছিলেন। মূলত শেষের দিকের ৭টি border=0কবিতা তিনি অনুবাদ করেননি। অনুবাদের প্রসঙ্গ এলেই মানের বিষয়টি না এসে পারে না। আমি জানি না এই বইটি নিয়ে স্পানঞা বা লাতিন আমেরিকার পত্রপত্রিকায় কী ধরনের আলোচনা হয়েছিলো। তবে অনুবাদক যে মূলের কাছে থাকতে চেয়েছেন তা অনুবাদগুলো একটু মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করলেই বোঝা যায়। আবেলের অনুবাদের সঙ্গে হিমেনেথ এবং পেদ্রো রেকেনার অনুবাদের যদি তুলনা করা যায় তাহলে দক্ষতা এবং মূলানুগতার বিচারে আমার ব্যক্তিগত পক্ষপাত পেদ্রো রেকেনার প্রতিই। আর মূলের ব্যাপারে খুব খুঁতখুতে না হলে হিমেনেথের অনুবাদ কাব্যিক পুনর্সৃষ্টিতে স্পর্শময়। আবেলের অনুবাদের বৈশিষ্ট্য এই যে তিনি রবীন্দ্রনাথের গদ্যভঙ্গীকেই নির্ভুলভাবে অনুসরণ করেছেন, এমনকি ভাষাভঙ্গিতেও তিনি খানিকটা অসমসাময়িকতারই পক্ষে ছিলেন, যেমনটা রবীন্দ্রনাথও ছিলেন। রবীন্দ্র-গবেষক শিশিরকুমার দাশ এবং শ্যামাপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায় প্রথম কবিতাটির অনুবাদ প্রসঙ্গে কখনো কখনো মূল থেকে সরে যাওয়া এবং সৌন্দর্য ক্ষুণ্ন করার ব্যাপারে হিমেনেথের প্রবণতাকে চিহ্নিত করেছেন উদাহরণ দিয়ে। আবেলের অনুবাদটির সঙ্গে হিমেনেথ এবং সমকালিন আরেক অনুবাদক হোর্হে রতনের অনুবাদ মিলিয়ে দেখলে যা দাঁড়ায় তা এরকম:

হিমেনেথ: Fue tu voluntad hacerme infinito,
Este fragile vaso mio. Tu lo derramas una
y otra vez, y lo vuelves a llenar con tu neva vida.

আবেলের অনুবাদে এই অংশটুকু হয়েছ এরকম:

vos me hicisteis infinito como es
vuestra voluntad. A este fragil
barco, que mas vacias una ver y otra
vez, llenaslo siempre con vida fresea.

পরবর্তীকালের এক অনুবাদক হোর্হে রতনের-এর অনুবাদে হয়েছে এরকম:
Ha sido tu voluntad hacerme infinito. Vacias una y
otra vez esta fragil vasija que soy y la vuelves a llenar de vida nueva. (7)

মূলে ছিলো:
Thou hast made me endless, such is thy pleasure.
This frail vessel thou emptiest again and again and fillest it ever with fresh life.

শিশিরকুমার এবং শ্যামাপ্রসাদ মনে করেন হিমেনেথ ইংরেজি ‘Endless’-এর পরিবর্তে ‘infinito,’ ‘pleasure’-এর পরিবর্তে ‘voluntad’ এবং ‘Fresh life’- পরিবর্তে ‘nuva vida’ ব্যবহার করে ‘মূলের সৌন্দর্য্য ক্ষুণ্ন’ করেছেন। আবেল এবং রতনেরও ‘Endless’ পরিবর্তে ‘infinito’, ‘pleasure’-এর পরিবর্তে ‘voluntad’ শব্দই ব্যবহার করেছেন। তবে ‘Fresh life’ শব্দবন্ধের পরিবর্তে আবেল অন্য দু’জন থেকে আলাদা হয়ে মূলের অনুসরনণ ‘vida fresca’ শব্দদুটি ব্যবহার করেছেন।

আবেলের অনুবাদে হয়তো গীতিস্পন্দন কম, কিংবা নেই ভাষার তীব্র মাদকতা, তবে বিশ্বস্ততার গুণে এটি আলাদা মর্যাদা অর্জন করে আছে।

দু একটি কবিতার কোনো কোনো শব্দার্থে দুএকটি অসর্তকতা অবশ্য পাঠককে বিভ্রান্ত করতে পারে। যেমন ২৬ নং কবিতার মূলে আছে:

He came and sat by my side but I woke not.

border=0আবেল এর অনুবাদ করেছেন এভাবে: El vino y sentose a mi lado; Pero me desperte. (এই অংশটুকুর আক্ষরিক অনুবাদ করলে দাঁড়ায়: সে এসে বসলো আমার পাশে; কিন্তু আমি জেগে উঠলাম।) ইংরেজিতে জেগে ওঠার (I woke not) কথা বলা হয়নি। আমার ধারণা মুদ্রণ প্রমাদবশত ‘Desperte’(জেগে উঠি) শব্দটার আগে No শব্দটি বাদ গিয়ে থাকতে পারে। কারণ গোটা বাক্যের প্রথমাংশের ইতিবাচকতার বিপরীতে দ্বিতীয় বাক্যাংশের নেতিবাচকতাকে স্পষ্ট করার জন্য আমরা যেমন ‘কিন্তু’ ব্যবহার করি, স্পানঞলেও সেই রীতি আছে বলেই আবেলের বাক্যের দ্বিতীয়াংশে Pero শব্দটি আছে। এই কারণেই একে অনুবাদকের না বোঝার ভুল নয়, বরং মুদ্রণ-বিভ্রাট বলেই মনে হয়। তবে ৬০ নং কবিতায় তার ভুল বুঝবার বা অসর্তকতার একটা ভুল নমুনা হচ্ছে এই যে তিনি শব্দটির ভুল অর্থ করেছেন। ইংরেজিতে বাক্যটি ছিলো এরকম:

They seek not for hidden treasures, they know not how to cast nets.

আবেল এই অংশটির অনুবাদ করেছেন এভাবে:
Ellos no saben buscar teseros escondidos;
Ellos no saben como se coge nidos.

স্পানঞলে ‘nidos’ মানে পাখির বাসা, যার ইংরেজি শব্দ হলো ‘Nest’, আমার ধারণা দৃষ্টিবিভ্রমের কারণে ‘Nets’ শব্দটিকে ‘Nest’ হিসেবে পড়তে গিয়ে এই ভুলটি করেছেন। এরকম ধারণা করার কারণ এই যে অন্যত্র তিনি Nest অর্থে স্পানঞলে Nido শব্দই ব্যবহার করেছেন। কোনো কোনো কবিতায় কোনো কোনো শব্দের নিহিতার্থকে তিনি বুঝে নিয়েছেন খুবই সাফল্যের সাথে। যেমন ইংরেজিতে ২৯ নং কবিতার শুরুতেই বলা হচ্ছে:
He whom I enclose with my name is weeping in this dungeon.

আবেলের অনুবাদে এই অংশটুকুর অনুবাদ হয়েছে এভাবে:
Esta llorando aquel a quien, en nombre de mi fama, encierro en este calabozo.

পেদ্রো রেকেনাও এই কবিতাটি অনুবাদ করেছিলেন, সেখানে তিনি Name-এর পরিবর্তে স্পানঞলে Nombre শব্দটাই ব্যবহার করেছেন। কিন্তু নাম এখানে শুধু নিছক নাম নয়, রবীন্দ্রনাথ এর নিহিতার্থে ‘খ্যাতি’র ইঙ্গিতই দিয়েছেন:

আমার নামটা দিয়ে ঢেকে রাখি যারে
মরছে সে এই নামের কারাগারে।

আবেল এই ইঙ্গিতটা ধরেই নামের পরেও খ্যাতিসূচক একটি শব্দ (fama) ব্যবহার করে অর্থকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছেন।

স্পানঞলভাষী সংস্কৃতিতে বা খোদ বলিবিয়াতেও আবেলের গীতাঞ্জলির অভিঘাতের ফলটা কী রকম ছিলো তার কোনো স্পষ্ট জরিপ আমাদের হাতে নেই। তবে আবেল আলার্কন স্পানঞলভাষী অন্যসব অনুবাদকদের আগেই যে গীতাঞ্জলির মর্মসুধা স্পানঞলভাষীদের হাতে তুলে দেওয়ার বিরল কৃতিত্ব অর্জন করেছিলেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

পাদটিকা
…………………
1. জার্মান ভাষায় যে প্রকাশকের অনুমোদন ছিলো তার সাক্ষ্য পাওয়া যাবে মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স থেকে মাঘ-১৮০৫ সনে প্রকাশিত মার্টিন কেম্পচেন রচিত জার্মানিতে রবীন্দ্র-বীক্ষা গ্রন্থে: “গীতাঞ্জলি প্রকাশনার ব্যাপারে কুট উওলভ-এর বক্তব্য কিন্তু অন্য রকম। তার ভাষ্য অনুযায়ী ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দের গ্রীষ্মকালেই তিনি ব্রিটিশ প্রকাশক ম্যাকমিলান (Macmillan) কোম্পানিকে এক কপি ইংরেজি ‘গীতাজ্ঞলি’ পাঠানোর জন্যে অনুরোধ করেছিলেন। তবে বইটা ছাপানো হবে কিনা তা নিয়ে সত্যিসত্যিই তিনি দোটানায় পড়েছিলেন। কারণ পাণ্ডুলিপি পরীক্ষকদের মধ্যে প্রচণ্ড মতানৈক্য দেখা গিয়েছিলো।” (পৃ. ৩৭) তার মানে প্রকাশকের অনুমতি ছিলো, কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন পরীক্ষকদের পরস্পরবিরোধী মত।

2. অন্যদিকে ফরাসী অনুবাদের জন্য রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে কবি সাঁ ঝ পের্সের দুতিয়ালীর সাক্ষ্য পাওয়া যাবে রবীন্দ্র জবানীতেই। রবীন্দ্রনাথ নিজেই ১৯১৩ সালের ১৮ অক্টোবর (শুক্রবার, ২ কার্তিক) এক চিঠিতে বলেছেন: “কাল সকালে একজন ফরাসী গ্রন্থকার আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। … ইনি আমার এই তর্জ্জমাগুলো ফরাসীতে অনুবাদ করবার অনুমতি নিয়ে গেলেন।” (প্রশান্ত পাল, রবিজীবনী ষষ্ঠ খণ্ড, আনন্দ, ১৯৯৩, পৃ: ৩৪১)

3. Abel Alarcon, Gitanjali, 1917, P-I
ইয়েটসের যে-অংশটুকু আবেল অনুসরণ করেছেন তা এরকম:He is as great in music as in poetry and his songs are sung from the west of Indian into Burma wherever Bengali is spoken, (Sisirkumar Das, English writings of Rabindranath Tagore, Vol-1, Sahity Akademic, P-38)

4. Ibid, P-III . তুলনীয় অংশটুকু এরকম: “He is the first among our saints who has not refused to live, but has spoken out of life itself,” (Ibid, P-38)
5.Ibid, P-V
6. Ibid, PII-III
7. Ibid, PV.
8. Jorge Rotner, Rabindranath Tagore: obras Escogidas, Edicomunicacion, Barcelona, 1999, P 19

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তাপস গায়েন — মে ৮, ২০১৪ @ ৯:৩৭ অপরাহ্ন

      রবি ঠাকুর সমগ্র মানবের মিলনের নিমিত্তে যে আনন্দযজ্ঞে আমাদের সামিল করতে চেয়েছেন, অনুবাদক রাজু আলাউদ্দিন সেই কাজটিই করে যাচ্ছেন তাঁর সৃ5জনশীল অনুবাদকর্মে, তাঁর সাহিত্যকর্মে । স্প্যানিশ ভাষা বাংলাভাষীদের কাছে দুরূহ ; এবং সেই দুরূহ কাজটি করছেন অনুবাদক, প্রবন্ধকার রাজু আলাউদ্দিন । তাঁকে আমার আলিঙ্গন !

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Mostafa Tofayel — মে ৮, ২০১৪ @ ৯:৪১ অপরাহ্ন

      স্পেনীয়রা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে এতো বেশি আপন করে নিয়েছিলেন যে, তাঁরা নোবেল বিজয়ী গদ্য গীতাঞ্জলি একের পর এক স্পানিয়ল ভাষায় অনুবাদ করে গেছেন। সর্বপ্রথম স্পানিয়ল অনুবাদকের নাম আবেল আলার্কন আমরা রাজু আলাউদ্দিনের প্রবন্ধ থেকে পেলাম। নবতর এ তথ্য দেয়ার জন্য তাঁকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। স্পানিয়ল ভাষাতেই অনুবাদক আবেল ও অন্যান্যদের রবীন্দ্রবিষয়ক মন্তব্য তাঁর প্রবন্ধে বৈচিত্র্য এনেছে। পরবর্তী অপর দু’জন অনুবাদক হুয়ান র‌্যামন হিমিনেজ ও তাঁর স্ত্রী যেনোবিয়া ক্যামপ্রবি। ওঁরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে স্পেনে সম্বর্ধনা দেয়ার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। প্রস্তুতির অংশ হিসেবে গার্সিয়া লোরকার একটি নাটক এবং আমন্ত্রিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাটক বিসর্জন মঞ্চায়নেরও প্রস্তুতি ছিল। সেটা ছিল ১৯২১ সালের মে মাস। কিন্তু, সময় স্বল্পতার কারণে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্পেন সফরে যেতে পারেননি। বিডিনিউজটুয়েন্টিফোরডটকম রবীন্দ্রজন্মতিথিতে তাঁকে ঘিরে আরো নতুন কিছু উপহার দিক- প্রত্যাশা রইল।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com