গড়া ও ভাঙা। গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস : নিঃসঙ্গতার একশ বছর (১ম পর্ব)

জি এইচ হাবীব | ২৯ এপ্রিল ২০১৪ ৬:২৬ অপরাহ্ন

আন্দ্রে ব্রিঙ্ক : দক্ষিণ আফ্রিকার স্বনামধন্য কথাসাহিত্যিক। জন্ম ১৯৩৫ খৃষ্টাব্দ। দেশের বর্ণ বৈষম্য নীতির সমালোচনার কারণে আফ্রিকানস ভাষায় রচিত তাঁর উপন্যাস ‘Kennis van die aand’ নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। তখন তিনি নিজেই সেটি ইংরেজিতে অনুবাদ করে ‘Looking on Darkness’ নামে প্রকাশের ব্যবস্থা করেন বিদেশ থেকে। ‘গড়া ও ভাঙা। গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস : নিঃসঙ্গতার একশ বছর’ ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত লেখকের দ্য নভেল : দ্য ল্যাঙ্গুয়েয এন্ড ন্যারেটিভ ফ্রম সার্ভান্তেস টু কালভিনো গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত প্রবন্ধ ‘মেকিং এন্ড আনমেকিং. গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস : ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অভ সলিচুড’ প্রবন্ধের অনুবাদ। অনুবাদ করেছেন বাংলাদেশে নিঃসঙ্গতার একশ বছর-এর অনুবাদক জি এইচ হাবীব।

border=0 নিঃসঙ্গতার একশ বছর রচনা প্রসঙ্গে গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস একবার বলেছিলেন — বলাই বাহুল্য, দুষ্টুমি করে — ‘আমি কেবল একটা বংশের গল্প বলতে চেয়েছি যে বংশের লোকেরা একশ বছর ধরে সাধ্যমত চেষ্টা করে গেছে যাতে শুয়োরের লেজওয়ালা কোনো ছেলের জন্ম না হয় সে-বংশে, যদিও শেষ অব্দি সফল হয় না তারা।’ কিন্তু ১৯৬৭ খৃষ্টাব্দে Cien Años de Soledad বের হওয়ার পর থেকে উপন্যাসটির ওপর লেখা গবেষণা-প্রবন্ধ জমতে জমতে তৈরি হওয়া রীতিমত এক গ্রন্থাগারের দিকে স্রেফ এক পলক তাকিয়েই কারো আর বুঝতে বাকি থাকে না যে সেখানে তার চাইতে ঢের বেশি কিছু আছে।

একেবারে চোখ খুলে দেয়ার মতো গবেষণা রয়েছে এই উপন্যাসটিতে স্থানীয়তা ও বৈশ্বিকতার সম্পর্ক নিয়ে, মার্কেস ও দন কিহোতের সম্পর্ক নিয়ে; জাদুবাস্তবতার স্বরূপ নিয়ে, অজাচার, বংশগতি, ট্যাবু আর পিতৃতান্ত্রিকতা নিয়ে; চরিত্রচিত্রণ, ট্র্যাজেডি ও কমেডি ও পুরষোচিততা নিয়ে; পুরাণ নিয়ে, ইতিহাস নিয়ে, এবং ইতিহাসের পুরাণ নিয়ে, এবং পুরাণের ইতিহাস নিয়ে; উপন্যাসটির কালিক কাঠামো নিয়ে, আর সেটার স্থানিক কাঠামো নিয়ে, আর সেটার স্থানিক-কালিক কাঠামো নিয়ে; আছে উপন্যাসটির মার্ক্সবাদী পাঠ, নারীবাদী পাঠ, আখ্যানবিদ্যামূলক পাঠ, এবং বিনির্মাণবাদী (ডিকন্সট্রাকটিভ) পাঠ; মনোবিশ্লেষণাত্মক পাঠ, আর পূরাণপ্রসূ পাঠ আর জীবনীমূলক পাঠ। কিন্তু এসব সত্ত্বেও একের পর এক গবেষাণায় স্বীকারোক্তি মিলছে গ্রন্থটির আপাত অনিঃশেষতার, সেটার ‘ছলনাময় আর রহস্যময়’ প্রকৃতি বা চরিত্রের। নিঃসন্দেহে এটি কাফকার উপন্যাসগুলোর মতো এমন একটি কাজ যেটা বিশেষভাবে পরিকল্পিত হয়েছে ইন্টারপ্রিটেশনকে একই সঙ্গে আমন্ত্রণ ও প্রতিহত করতে।’

ভাষার সঙ্গে কোনো টেক্সট-এর সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে সবচাইতে উদ্দীপনাময় প্রবন্ধগুলোর একটি হচ্ছে Aníbal Gonazáles-এর ‘Translation and Genealogy’ (Gonazáles, 1987) বা, ‘অনুবাদ ও উদ্ভববিজ্ঞান’। প্রবন্ধটির একটি বাড়তি আকর্ষণ হলো ‘দন কিহোতের’ বিপরীতে বা পটভূমিতে ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’-এর একটি পাঠ। গনযালেস এর বক্তব্য হলো, কেবল দক্ষিণ আমেরিকার উপন্যাসই নয়, একটি ঘরানা (genre) হিসেবেই উপন্যাসের উৎস নিহিত রয়েছে অনুবাদের ধারণার মধ্যে, বিশেষ করে সহিংসতা বা বদলের মাধ্যমে অন্যান্য টেক্সট ও অন্যান্য ভাষা থেকে সাহিত্যিক টেক্সট-এ মানে বা অর্থের পরিবহনের মধ্যে।

উপন্যাসটির টেক্সটে বিদেশি ভাষার অসংখ্য উল্লেখের (যে বৈশিষ্ট্যের দিকে খুব শিগগিরই নজর দেবো আমরা) নিবিড় পর্যবেক্ষণ থেকে গনযালেস অনুবাদের আবশ্যিকতার বিষয়টি আলোচনা করেছেন, যে-আবশ্যিকতার সৃষ্টি হয়েছে এধরনের মোকাবেলা থেকেই। এই ধারণাটিকে পাঠ করা হয়েছে ৩টি তাত্ত্বিক দিকের (এপ্রোচ) পটভূমি থেকে: প্রথমটি — যেটার ইঙ্গিত ওয়াল্টার বেঞ্জামিন দিয়েছেন — সেটি একটি কর্তৃত্ব-ফলানো ‘পবিত্র টেক্সট’কে, একটি অভিব্যক্তিহীন এবং সৃজনশীল ‘শব্দ’কে — যা সব ভাষাতেই বোঝানো হয়ে থাকে — তর্কের খাতিরে সত্য বলে মেনে নেয়; দ্বিতীয়টি আমরা পেয়েছি দেরিদার কাছ থেকে। এটি নজর দেয় দুটো সমানভাবে “যথাযথ” ভাষার মধ্যে সীমালঙ্ঘনমূলক লড়াইয়ের দিকে, যে ভাষা দুটোর একটি চেষ্টা করে আরেকটির সুনির্দিষ্টতা অস্বীকার করতে; বোর্হেস-নির্ভর তৃতীয়টি এই প্রস্তাব করে যে ‘অনুবাদের ধারণা সাহিত্যের প্রকৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত, এবং অনুবাদ সাহিত্যের কার্যধারা বা কার্যপ্রণালীর ব্যাপারে সমালোচনামূলক অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।’

এই হেতু-বাক্যের (premises) ওপর নির্ভর করে গনজালেস অনুবাদের ধারণাটির এক রোমাঞ্চকর বিস্তারের প্রস্তাব করেছেন নিঃসঙ্গতার একশ বছর-এর আখ্যানে বিভিন্ন নির্ণায়ক পদ্ধতি থেকে অর্থের এক দেরিদীয় ‘পরিব্যাপ্তি’ (dissemination) পাঠ ক’রে, আত্মীয়তার ভাষায় — তা সেটা অজাচার, ট্যাবু আর ব্যক্তিনামের গুরুত্ব বলতে যা কিছু বোঝায় তার সবটুকুসহ — সেই জিপসির পাণ্ডুলিপি অনুবাদে বুয়েন্দিয়াদের কাজের মধ্যে একটা সাযুজ্য টেনে। পাঠটি এই বিবেচনা থকে উৎসারিত হয়েছে যে ‘অনুবাদ এবং অজাচার এই দুইয়ের-ই একটি সীমালঙ্ঘনকারী চরিত্র রয়েছে, দুটোই “অসঙ্গত” কাজ, যার মধ্যে নিহিত রয়েছে একই পরিবারের সদস্যদের বা দুটো ভাষার মধ্যে বিদ্যমান বাধা ভেঙে ফেলার ধারণাটি।’ এই যুক্তিধারার সমাপ্তি টানছেন তিনি এ-কথা দাবি করে যে:

অজাচারের মতো অনুবাদও আত্মসমালোচনার দিকে ঘুরে যায়, নিজের সত্ত্বার দিকে এক প্রচণ্ড বাঁক নেয় যা নিরেটত্বের, এক ‘খাঁটি ভাষার’ সব বিভ্রম মুছে দেয়, মুছে দেয় ‘ঔচিত্যের’ সব মরীচিকা, আর তার বদলে গুরুত্ব আরোপ করে একেবারে ‘অপরতা’-র ধারণাভিত্তিক ভাষার নির্ভরশীলতার ওপর, ফারাকের ওপর, যাতে করে ‘কোনোকিছু’-কে চিহ্নিত করা যায় বা বোঝানো যায়, আর সেই সঙ্গে বোঝানো যায় ‘অন্যান্য’ ডিসকোর্সের (যেমন বিজ্ঞানের, আইনের এবং ধর্মের ডিসকোর্সের) ওপর উপন্যাসের একই ধরনের নির্ভরশীলতা যাতে করে উপন্যাস নিজেকে গড়ে নিতে পারে।

আত্মীয়তার মাধ্যমে সংযুক্ত ব্যক্তিবিশেষদের মধ্যে যৌন সম্পর্ক আর একই ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠির সদস্য নানান ভাষার (যেমন সংস্কৃত ও হিস্পানি) মধ্যে আদান-প্রদানের মধ্যে গনযালেস যে মিল দেখিয়েছেন তা নিয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলতেই পারেন, কিন্তু তারপরেও এ এক সম্মোহক পাঠ। আর এই সম্পর্কটি যখন আরো ঘটে — নিঃসঙ্গতার একশ বছর-এ যেমনটি — হিস্পানি ও গুয়াজিরো (যে স্বদেশী ভাষাটি আর্কাদিও আর আমারান্তা তাদের নিজদের ভাষা শেখার আগেই শিখে ফেলে), বা পাপিয়ামেন্তো(ছোট অরেলিয়ানো যে-ভাষায় ভাঙা ভাঙা কথা বলে বুড়ো ওয়েস্ট-ইন্ডীয় নিগ্রো-র সঙ্গে)-র ক্ষেত্রে, তখন এই পাঠটি হয়তো ভেঙে পড়ার জোগাড় হয়। আবার, টেক্সট-এ যতোগুলো ভাষার উল্লেখ রয়েছে সেগুলো সব-ই যে অনুবাদের একটি প্রয়োজন আরোপ করে তা নয় : লাতিন থেকে ইংরেজি অব্দি, বা সেই জিপসি ভাষা থেকে ফারনান্দা-র বানানো ভাষা পর্যন্ত বেশ কিছু এপিসোডে সেসব ভাষার কাজ ঠিক এটুকু যে, অন্তত তাদের নির্দিষ্ট প্রেক্ষিতে সেগুলো অনুবাদ করা সম্ভব নয়।

তার মানে এই নয় যে গনযালেসের পাঠ অগ্রাহ্য করা চলে; সাধারণভাবে মার্কেস বিষয়ে এবং বিশেষ করে নিঃসঙ্গতার একশ বছর সম্পর্কে ক্রমবর্ধমান রচনার শিল্পে এটি একটি উদ্দীপনামূলক অবদান। তবে তার মানে এই যে ভাষাকে অনুবাদ হিসেবে দেখার বিষয়টি টেক্সট ভাষার যে রূপটি উপস্থাপন করে সেটিকে এবং টেক্সটটির মধ্যে পাঁপড়ি মেলা আখ্যানের সঙ্গে সেটার সম্পর্কটিকে আলোকিত করার দিকে যথেষ্ট অগ্রসর হয় না।
Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন রহমান হেনরী — এপ্রিল ৩০, ২০১৪ @ ১১:২১ অপরাহ্ন

      ভালো ও দরকারী আলোচনা। গোনজালেস-কে গনযালেস না লিখে সঠিক হিস্পানীওলে লিখলে ব্যক্তিগতভাবে আরও আনন্দিত হতাম।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com