স্মৃতিচারণ: আমার ভাই গার্সিয়া মার্কেস

যুবায়ের মাহবুব | ২৭ এপ্রিল ২০১৪ ৮:০৪ অপরাহ্ন

marquez-y-jaime.jpgগাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের মৃত্যুর পর তার ছোট ভাই হাইমে গার্সিয়া মার্কেসের এই লেখাটি ছাপা হয় কলম্বিয়ার ‘সেমানা’ সাপ্তাহিকে। লেখাটি স্প্যানিশ থেকে অনুবাদ করেছেন যুবায়ের মাহবুব।

১৯৪৬ সালের সেই নভেম্বর মাসের কথা মনে পড়ছে – সঠিক দিনক্ষণ স্মরণ নেই আজ – যেদিন আমাকে তুলে ডাইনিং টেবিলে বসানো হলো। বয়স তখন ছয়ের মত। আমার মুখের খুব কাছাকাছি আরেকটি মুখ – এক যুবকের মুখ। বড় গোঁফ আর একান-ওকান হাসিমাখা সেই মুখ আমাকে বলছে – ‘জিমি, লটারির গানটা গেয়ে শোনাবি আমাকে?’ আমার ভাই গাব্রিয়েল, আমার থেকে ১৩ বছর বড়। কন্ঠ শুনে ওকে চিনতে পারলাম, আমাকে অনুরোধ করছে কার্নিভালের লোকটার নকল করতে। গলায় ব্যাগ ঝুলিয়ে মেয়েলি সুরে ঢং-ঢাং করে লটারির এক কর্মচারী টিকেট বিক্রি করতো, আর কার্নিভালের সং তার অবিকল নকল করতে পারতো।

রাজধানী বোগোতা থেকে গাবিতো* মাত্র বাড়ি ফিরেছে সেদিন। সুক্রে নামে এক গঞ্জের জেটির ধারে আমাদের বাসা, বড় ভাইয়ের আগমনে যেন ঘরে উৎসব লেগেছে।

স্মৃতিকাতর এই মুহূর্তগুলো আজ সব স্তূপ হয়ে আছে। সময় পেরিয়ে যায়, দুনিয়া বদলায়। মেধা, শৃঙ্খলা, ভাষার উপর নিরেট দখল, আর মানবমনের মোড়-বাঁক সম্পর্কে তার স্বতঃলব্ধ প্রজ্ঞার গুণে সেই যুবক হয়ে ওঠে সুবিখ্যাত সাহিত্যিক। এই সব গুণ এসে মিশে ওর হৃদয়হরণকরা গল্পগুলোতে – গাবিতো বলতো গল্পগুলো ও শিখেছিল আমাদের নানা-নানুর কাছ থেকে।

একই ছাদের নিচে শেষবারের মত আমরা দুজন বসবাস করি ১৯৫১ সালে, যখন আমাদের গোটা পরিবার তল্পিতল্পা গুটিয়ে কার্তাহেনা-তে স্থানান্তর করে। এরপর থেকে সারা বিশ্বে ওর পদচারণার খোঁজ রেখেছি ওর লেখালেখির মাধ্যমে। সেই বয়সে লোন রেঞ্জার আর টারজানের বইয়ের সাথে পাল্লা দিয়ে পড়তাম ভাইয়ের লেখা।

১৯৬০ সালে গাবিতো ছিল প্রেন্সা লাতিনা বার্তা সংস্থার বোগোতা শাখার প্রধান। জেলা শহর কার্তাহেনার বলিভার কলেজ থেকে ১৩০ জন ছাত্র এসেছিল রাজধানী সফরে, কিন্তু ঘটনাক্রমে থাকার ব্যবস্থা ছিল না ওদের। বোগোতার একটি পার্কে তাদের দেখা পেয়ে ভাই ওদের সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছিল। একবার ও আমাকে টেনে নিয়ে গেল দর্জির কাছে, ইতালীয় রাজদরবারের স্টাইলে একটি জামা বানিয়ে দেবে বলে। নাম রোমানো – বললো যে আমার জন্যে ঐ জামা নাকি একদম মানানসই। আমার ডিগ্রী পাশ উপলক্ষে ওটাই ছিল ওর উপহার।

১৯৬৬ সালে কার্তাহেনা ফিল্ম ফেস্টিভালের সময়ে আমাদের পরিবার আর ‘বীরোত্তমা’ নগরীর (Cartagena la Heroica) সাথে ওর আবার পরিচয় হলো। মেক্সিকান প্রতিনিধিদলের সাথে গাবিতো এসেছিল একটি চলচ্চিত্র প্রদর্শন করতে। ছবিটির নাম ‘তিয়েম্পো দে মোরির’ (মরণের ক্ষণ), চিত্রনাট্য ওর লেখা। একই বছর গাবিতো আমাকে জানালো যে ও একটি বই লিখছে। তার জন্যে কিছু গবেষণা করা লাগবে, দায়িত্ব ন্যস্ত হলো আমার উপর। সেই কোয়েশ্চেনেয়ারের সাথে যুক্ত ছিল একটি দীর্ঘ চিঠি। পড়ে জানতে পারলাম অনেক কিছু – দেশ নিয়ে, পরিবার নিয়ে ওর ভাবনা, উদ্বেগ। পাশাপাশি আমাকে বিস্তারিত পরামর্শও দিয়েছিল ও, সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে পেশাগত জীবনে ঠিক কী কী পদক্ষেপ আমার অনুসরণ করা উচিত।

বলা বাহুল্য, ঐ উপন্যাসটির নাম ছিল শতবর্ষের নিঃসঙ্গতা

প্লেনে চড়ার ব্যাপারে আমার ভেতর সর্বদা একটা প্রবল ভীতি কাজ করে। গাবিতো সবসময় চেষ্টা করতো আমি যেন মান্ধাতার আমলের ভয়টাকে বশ মানাতে পারি। ১৯৯০ সালে নিউ ইয়র্কের এক রেস্তোরাঁয় আমাদের জন্যে ডিনারের বুকিং দিল ও – স্বনামধন্য চিত্রপরিচালক উডি অ্যালেন সেই রেস্তোরাঁয় প্রায়ই স্যাক্সোফোন বাজাতেন। উডির সাথে সাক্ষাতের ছুঁতোয় সেবার আমাকে প্লেনে তুলতে সক্ষম হয়েছিল ও। তার আগে একবার আমাকে ইউরোপে আনার ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়েছিল – সেবারের অজুহাত ছিলো প্যারিসে যখন তুষার পড়বে, তখন আমার মুখের অভিব্যক্তি কী হয় তাই দেখা। ২০০১ সালে আমাদের ছোট ভাই এলিহিও আমাকে জানালো যে ১৯৮৩ সালে একটি টিউমার অপারেশনের জন্যে আমাকে লস এঞ্জেলেস শহরে নিয়ে যাবার পরিকল্পনা ফাঁদা হয়েছিল। সেই আয়োজনের দায়িত্বে ছিল গাবিতো। কিন্তু বোগোতাতে বসে আগে থেকেই কিছু টেস্ট করিয়ে রেখেছিলাম আমি, সেগুলোর পজিটিভ রেজাল্ট পেয়ে বেঁচে গেলাম। সে যাত্রা আর সেই ভয়াল যন্ত্রটিতে চড়তে হয়নি।

যখন কেউ গাবিতোকে প্রশ্ন করতো, কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সবচেয়ে ভাল উপায় কি? ও সবসময় একই উত্তর দিতো – ‘যেটা কেউ টের পায় না।’ ২৫ বছর আগে যখন ও নোবেল পেলো, সাংবাদিকরা মা’কে প্রশ্ন করেছিল – ‘আপনার ছেলের সবচেয়ে ভাল গুণ কোনটি?’ মা সবসময়ই তার নিজের মতামত জানানোর সুযোগ খুঁজতেন। দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে জবাব দিয়েছিলেন – ‘ওর ঔদার্য।’

* নামের শেষে স্নেহসূচক অন্ত্যাক্ষর জুড়ে দেয়া স্প্যানিশ সংস্কৃতির রীতি – যেমন পেদ্রো থেকে পেদ্রিতো, গাবো থেকে গাবিতো, এভা থেকে এভিতা ইত্যাদি।
Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আজাদ রহমান — মে ১, ২০১৪ @ ১০:০৫ পূর্বাহ্ন

      কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সবচেয়ে ভাল উপায় কি? ও সবসময় একই উত্তর দিতো – ‘যেটা কেউ টের পায় না।

      অসাধারণ। প্রাণ ছুঁয়ে গেল।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com