মার্কেসের রাজনৈতিক চেতনা

বিনয় বর্মন | ২৬ এপ্রিল ২০১৪ ৭:০৭ অপরাহ্ন

marquez-and-castro.gifগাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস ছিলেন আপাদমস্তক একজন রাজনীতি-সচেতন ও রাজনৈতিক লেখক। তাঁর এমন কোনো লেখা নাই যেখানে রাজনীতি নেই। নিঃসঙ্গতার একশো বছর থেকে শুরু করে জেনারেল তার গোলকধাঁধা পর্যন্ত সর্বত্র ছড়িয়ে আছে প্রচ্ছন্ন ও প্রকাশ্য রাজনীতি। তাঁর কাছে রাজনীতি মানে সাধারণ মানুষের কল্যাণ, নিজের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতনতা।

মার্কেস নিজে কখনো সক্রিয় রাজনীতিতে নামেননি। কিন্তু রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে ওঠাবসা করেছেন। দৈশিক ও বৈশ্বিক উভয় স্তরেই। ডান-বাম নির্বিশেষে অনেক প্রভাবশালী নেতার সঙ্গে বন্ধুত্ব ছিলো তাঁর। তাঁর বন্ধুর তালিকার একদিকে ছিলেন ফিদেল কাস্ত্রো, অন্যদিকে বিল ক্লিনটন। এজন্য তাঁর বিরুদ্ধে হঠকারিতার অভিযোগ আনা হয়। এ নিয়ে পেরুর ঔপন্যাসিক মারিও ভার্গাস ইয়োসার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের অবনতি ঘটে, এমনকি ১৯৭৬ সালে মেহিকোর এক থিয়েটারে হাতাহাতি পর্যন্ত হয়। ফলশ্রুতিতে পুরো লাতিন আমেরিকান সমাজ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে।

মার্কেসের বন্ধুত্ব যেমন ছিলো অগণন, তেমনি শত্রু-সমালোচকেরও অভাব ছিলো না। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি কেনো কিউবায় ফিদেল কাস্ত্রোর শাসনকে সমর্থন করেছেন, এমনকি যখন সেখানে ভিন্ন-মতাবলম্বী সাহিত্যিকদের আটক করে জেলে পোড়া হচ্ছে। এজন্য তাঁকে তোপের মুখে পড়তে হয়। এ প্রসঙ্গে মার্কেসের বক্তব্য হলো, কাস্ত্রোর সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব পুরোপুরি কিউবান নেতার সাহিত্যপ্রীতিকেন্দ্রিক এবং তাঁদের বন্ধুত্ব রাজনৈতিক নয়।

মার্কেস সবসময় রাজনীতি নিয়ে চিন্তা করেছেন এবং কথাসাহিত্যে একে মিশিয়েছেন অত্যন্ত চাতুর্যের সঙ্গে। তাঁর লেখা যাতে রাজনৈতিক প্যামফ্লেটে পরিণত না হয় সেদিকে ছিলো তাঁর সজাগ দৃষ্টি। প্রতিটি গল্প উপন্যাসকে শিল্পোত্তীর্ণ করাই ছিলো তাঁর লক্ষ্য এবং সে কাজে তিনি সফলও হয়েছেন। তিনি কেবল লেখার জন্য লিখে যাননি। তাঁর কাছে লেখা ছিলো সমাজ পরিবর্তনের কৌশল। এদিক থেকে তিনি মার্ক্সবাদী। তাঁর লেখার একটি রাজনৈতিক এজেন্ডা ছিলো এবং তিনি তা কখনোই গোপন রাখেননি।

আশির দশক থেকেই বিশ্বপাঠকের নজর কাড়তে শুরু করেন মার্কেস। তখন থেকে শুরু করে ৮৭ বছর বয়সে মেহিকো সিটির বাসগৃহে সম্প্রতি তাঁর মৃত্যু অবধি অনেকেই তাঁর একশো বছরের নিঃসঙ্গতা, কূলপতির শরৎকাল এবং কলেরার সময়ে প্রেমসহ মাস্টারপিসগুলো নিয়ে অনেক প্রশংসাসূচক আলোচনা করেছেন। তাঁর রচিত আধুনিক ক্লাসিকগুলো অনেকের মধ্যে এই বিশ্বাস এনে দিয়েছে যে তিনি বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক।

লাতিন আমেরিকার শিল্পী, গীতিকার ও লেখকগণ ষাট ও সত্তরের পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক পটভূমিতে গুরুত্ব সহকারে নিজেদের উপস্থিতি জাহির করছিলেন। তাঁর সমসাময়িক লেখক যেমন মারিও ভার্গাস ইয়োসা, পাবলো নেরুদা, কার্লোস ফুয়েন্তেস, ভিক্তর হারা, ইসাবেল আইয়েন্দে এবং আরো অনেকের মতো এই গুম্ফধারী কলম্বিয়ান নিজেকে ঠেলে দিয়েছিলেন একটি সংঘাতমুখর, অস্থিতিশীল এবং ক্রমশঃ সহিংস অঞ্চলের রাজনীতির মধ্যে। যখন চিলির হারার মতো কয়েকজন সাহসিকতা ও স্পষ্টবাদিতার জন্য নির্যাতিত ও খুন হয়েছিলেন, তখন তিনি চুপ করে থাকতে পারেননি।

মার্কেসের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিলো তিনি গেরিলাদের সঙ্গে গোপন আঁতাত রাখতেন এবং তাদের নানাভাবে ইন্ধন যোগাতেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের এক পর্যায়ে বামপন্থী গেরিলা দলের সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতার ব্যাপারে সেনাবাহিনি তদন্ত করছে এই ভয়ে তিনি তাঁর নিজের দেশ কলম্বিয়া ছেড়ে চলে যান। পরে অবশ্য তাকে গেরিলাপক্ষ ও বোগোতা সরকারের মধ্যে শান্তি আলোচনায় মধ্যস্থতা করার জন্য দেশে আসার আহ্বান জানানো হয়েছিলো।

মার্কেস মেধাবি লেখক ছিলেন বটে, কিন্তু তিনি নিজেও কখনো ভাবতে পারেননি যে তাঁর লেখা পাঠককুলের কাছে এতোটা গ্রহণযোগ্য হবে। তাঁর নিজের দেশেও তিনি প্রথমদিকে তেমন সাড়া পাননি। জীবনের শেষদিকে যখন স্বাস্থ্য খারাপ হওয়ার দরুণ জনসমক্ষে আসা বন্ধ করে দিয়েছেন, তখনই কেবল তিনি কলম্বিয়ার সবচেয়ে নন্দিত ও আকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি হয়ে যান। সংবাদপত্রে সাংবাদিকতা ও গল্প লেখালেখির শুরুটা সাদামাটা হলেও খ্যাতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের বদৌলতে তাঁর আদুরে নাম তৈরি হয় গাবো। এটা তিনি প্রত্যাশাও করেননি, উপভোগও করেননি।

মার্কেসের মাথায় ছিলো রাজনীতি, কলমে ছিলো বারুদ। তাঁর অক্ষরগুলো বিস্ফোরিত হয় পাঠকের মস্তিষ্কে। ১৯৮৮ সালে নিউ ইয়র্ক টাইমসের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি না যে সাহিত্যকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা উচিত। কিন্তু নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেও লেখায় আদর্শগত অবস্থান প্রতিফলিত হয় এবং তা পাঠককে প্রভাবিত করে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমি মনে করি লাতিন আমেরিকায় আমার বইয়ের রাজনৈতিক প্রভাব আছে কারণ এখানে লাতিন আমেরিকান আত্মপরিচয়ের একটি ব্যাপার থাকে; এগুলো এখানকার লোকজনকে তাদের নিজেদের সংস্কৃতি সম্পর্কে আরো সচেতন করে তোলে।’

অনেক লাতিন আমেরিকান শিল্পীর মতো, গার্সিয়া মার্কেস ছিলেন প্রচণ্ড সাম্রাজ্যবাদবিরোধী। উত্তর আমেরিকায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গোলমেলে অবস্থার প্রতি অনাস্থা ছিল তাঁর, ফলে তিনি এর কঠোর সমালোচনা করেছেন। সে সময়ে অবস্থা এমন ছিলো যে এ অঞ্চলটা হয়ে গিয়েছিলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চাদাঙ্গন। তদুপরি, মার্কিনিরা মনে করতো (মনরো-মতবাদের ওপর ভর করে) এখানকার সব বিষয়ে নাক গলানোর আইনি অধিকার তাদের আছে এবং এ অধিকার খোদ ঈশ্বরই তাদের দিয়েছেন। তিনি এটা মেনে নিতে পারেননি। মার্কেস ধনবাদী ব্যবস্থায় আঙ্গুল ফুলে গলাগাছ প্রক্রিয়ার বিরোধী ছিলেন। তিনি সেই সমস্ত লাতিন আমেরিকান নেতা ও উচ্চবর্গীয় লোকদেরও তুলোধুনা করেছেন যারা গ্রামের লোকদের শ্রমঘাম ও মালিকানাহীন ভূমির বদৌলতে নিজেদের গায়ে চর্বি জমিয়েছেন ও ধনি হয়েছেন।

তাঁর প্রিয় লিখনশৈলি (যদিও এটা তাঁর একমাত্র লিখনশৈলি নয়) যাদু বাস্তবতাকে কাজে লাগিয়ে মার্কেস বিশ্বসাহিত্যে যাদু দেখিয়েছেন। তিনিই একমাত্র ও শেষ লেখক নন যিনি পরাবাস্তব ও বাস্তব পৃথিবীকে মিশিয়ে এক নিখুঁত শিল্পকর্ম রচনা করেছেন, কিন্তু প্রশ্নাতীতভাবে তিনি এর সর্বোত্তম ব্যবহারকারী। প্রত্যেক মানুষের ভেতরে থাকে বাস্তব-অবাস্তব লৌকিক-অলৌকিকে গড়া এক নিজস্ব পৃথিবী। সেই পৃথিবীর সঙ্গে যখন মার্কেসের গল্পের পৃথিবী মিলে যায়, তখন পাঠক পুলকিত বোধ করেন। আর এভাবেই মার্কেস ধীরে ধীরে ঢুকে যান পাঠকের মনোলোকে।

মার্কেসের গল্পকাহিনির প্রায়োন্মাদ কিম্বদন্তীয় চরিত্রগুলো এসেছে তাঁর শ্রুতিঅভিজ্ঞতা থেকে। এগুলো শৈশবে তিনি তাঁর দাদীমার কাছ থেকে শুনে থাকবেন। তাঁর গল্পে যে সীমান্তশহর, বনজঙ্গল, দুর্নীতিবাজ জোতদারির বর্ণনা পাওয়া যায়, তা একেবারে খাঁটি লাতিন আমেরিকান জিনিস। তিনি তাঁর দাদুকে দেখেছেন সামরিক বাহিনির লোক হিসেবে কাজ করতে, শুনেছেন রাজনীতি নিয়ে আলাপ করতে। মার্কেসের চারিত্রিক ও মনস্তাত্ত্বিক গঠনে তারও ব্যাপক প্রভাব ছিলো।

মার্কেস রীতিমত একজন জোকার, মানুষ হাসানোর ওস্তাদ। তাঁর লেখায় থাকে সূক্ষ্ম হাস্যরস। তার উপন্যাসগুলো যে এতো জনপ্রিয় তার অন্যতম কারণ সেন্স অব হিউমার। তিনি সাধারণ মানুষের সাধারণ কথা লিখতে চেয়েছেন সাধারণ ভাষায়। তাঁর উপন্যাসগুলো যে এতো সিরিয়াস আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ও উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে তা দেখে তিনি মনে হয় নিজেও চমকে উঠেছেন। তিনি কৌতুক করেন বাস্তবকে নিয়ে। তিনি নিজে বলেছেন, তাঁর লেখায় এমন কোনো লাইন খুঁজে পাওয়া যাবে না যার কোনো বাস্তবভিত্তি নেই।

তাঁর বর্ণিত চরিত্রসমূহ ও দৃশ্যাবলি লাতিন আমেরিকার সমস্ত সৌন্দর্য ও কদর্যতা নিয়ে হাজির হয়েছে। স্বৈরশাসক, প্রেমিক, চাষী, অভিজাততন্ত্রী, বুনো মধ্যভূমি ও ঊষর সমুদ্র উপকূলে সংগ্রামরত মানুষ সবকিছু মার্কেসের সাহিত্যে উপস্থিত। ফলে সবাই তাঁকে কাছে টেনে নিয়েছে, তাঁর লেখার সঙ্গে একাত্ম হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, এসবকিছু লাতিন আমেরিকার লোকদেরকে তাদের নিজেদের সংস্কৃতি ও মহাদেশকে বুঝতে সাহায্য করেছে।

মার্কেস তাঁর উপন্যাসে পল্লী দারিদ্রের ভয়াবহতা তুলে ধরেছেন। তাঁর লেখা থেকে আমরা সামরিক বাহিনির লোকদের নৃশংসতা ও গৃহযুদ্ধের অন্তসারশূন্যতা সম্পর্কেও জানতে পারি। মার্কেস রাজনৈতিক ফায়দাবাজির বিরোধী ছিলেন। যখনই রাজনীতিবিদদের নোংরামি দেখেছেন, তখনই ফুঁসে উঠেছেন। বেপরোয়াভাবে তিনি একজন রাজনৈতিক লেখক, কিন্তু একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত। মার্কেস বিজ্ঞ ছিলেন এই অর্থে যে তিনি তাঁর রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন। প্রচুর চাপ সত্ত্বেও, তিনি কখনো সক্রিয় রাজনীতিতে নামেননি। ইয়োসা কিন্তু রাজনৈতিক নেতার ভূমিকায় নেমেছিলেন এবং তাঁর প্রেসিডেন্ট হওয়ার স্বপ্ন ব্যর্থ হয়েছিলো। এতে তাঁর মোহভঙ্গ ঘটে এবং অনেকের চোখে তিনি খাটো হন।

সম্ভবত ইংরেজি ভাষায় ডিকেন্স যেমন, গার্সিয়া মার্কেসও তেমনি একজন চৌকশ কাহিনিকার যাঁর গল্পের মূলে আছে তাঁর নিজের অথবা পরিবারের লোকজনদের অভিজ্ঞতানলব্ধ সত্যের নির্যাস। আদতে তিনি নিজেকে সবসময় একজন সাংবাদিক বিবেচনা করতেন। কখনো কখনো, যেমনটা দেখা যায় নিউজ অব কিডন্যাপিং নামক চমৎকার বইটিতে, তিনি বাস্তব ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দেন। তাঁর তুলিতে চিত্রিত হয় আশির দশকে কলম্বিয়ার গণ্ডগোল, যখন নিষ্ঠুর ড্রাগ ব্যবসায়ীরা শাসনক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের জন্য দেশের দুর্নীতিবাজ ও আপোষকামী নেতাদের সঙ্গে দ্বন্দ্বে অবতীর্ন।

মার্কেস একজন স্বাপ্নিক ছিলেন। যখন তিনি নিজের দেশে আগন্তুক বনে গিয়েছিলেন, তখনও অবাস্তবায়নযোগ্য স্বর্গরাজ্যের খোঁজে সারা বিশ্ব চষে বেড়িয়েছেন। তাঁর লেখায় প্রতিফলিত হয়েছে নিষ্পাপতা ও জীবনের প্রতি ভালোবাসা, যদিও জীবনে থাকে নানা প্রতিকূলতা ও অবিবার্য হতাশা। তাঁর কাছে, স্বপ্নরাজ্য তাত্ত্বিকভাবে অর্জন করা সম্ভবপর, যদিও মানুষের দুর্বলতার জন্য তা বাস্তবে অর্জন সম্ভব নয়। কেউ কর্নেলের কাছে চিঠি লেখে না বইতে দেখা যায়, যদিও রোগক্লিষ্ট কেন্দ্রীয় চরিত্রটির সঙ্গে সকলেই বেঈমানি করে, তথাপি তিনি শেষ পর্যন্ত এই বাক্যটি উচ্চারণ করতে সমর্থ হন : ‘সৃষ্টির সবচেয়ে ভালো বস্তুটি হলো জীবন’। মার্কেস এই জীবনকে ভালোবেসেছিলেন। জীবনগল্পের সফল কথক তিনি।

(বিবিসি অনলাইনে সম্প্রতি প্রকাশিত Wyre Davies-এর ‘Gabriel Garcia Marquez: Guide to Surreal and Real Latin America’ অবলম্বনে)
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (6) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Hasnat All Mahmud — এপ্রিল ২৭, ২০১৪ @ ১:১২ অপরাহ্ন

      Nagoriker odhikar protisthar jonno obossoi susto dharar rajniti proyojon

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Hasnat All Mahmud — এপ্রিল ২৭, ২০১৪ @ ১:১৫ অপরাহ্ন

      It’s wonder full

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন shanu mostafiz — এপ্রিল ২৭, ২০১৪ @ ১:৩২ অপরাহ্ন

      অনেক ধন্যবাদ লেখককে।
      মার্কেস সম্পর্কে ৮-১০টি লেখা পড়েছি। কিন্তু সবচেয়ে ভাল লাগল আপনার লেখাটি। অনেক সহজ, সুন্দর এবং গোছানো লেখা। যা জানতে চাইছিলাম এর অনেকখানিই ছিল। অন্য লেখাগুলো সময় নষ্ট করেছে। মনে রাখার মত কিছুই ছিল না এবং উপভোগের বিষয়টি একেবারে শূণ্য ছিল। এ দিক থেকে আপনার লেখা অনেক ভালো লেগেছে। আমার জানতে ইচ্ছে করে মানুষ এত কঠিণ করে লিখে কেন, যা পড়তে বারবার হোঁচট লাগে? এক কথা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে লেখে কেন? দুঃখ একটাই বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম মাঝে মাঝে ভালো লেখা প্রকাশ করলেও পরিমাণে সেটা অনেক কম। বিশ্বসাহিত্য ও সাহিত্যিকদের উপর এরকম ভালো লেখা সপ্তাহে ২/১টি প্রকাশ করার জন্য বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতি অনুরোধ রইল।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Manik Mohammad Razzak — এপ্রিল ২৭, ২০১৪ @ ৬:৩০ অপরাহ্ন

      সুন্দর লিখেছেন বিনয় বর্মন। তবে তার রাজনৈতিক দিক আরও সুনির্দিষ্ট ভাবে তুলে ধরলে মনে হয় ভাল হতো। সার্বিকভাবে লিখাটি মন কেড়েছে। বিনয়কে অভিনন্দন।

      মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বনি আমিন — এপ্রিল ২৭, ২০১৪ @ ৬:৪৪ অপরাহ্ন

      মার্কেস সম্পর্কে আরো ব্যাখ্যাধর্মী লেখা পড়তে চাই।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Mostafa Tofayel — এপ্রিল ২৮, ২০১৪ @ ৬:১১ অপরাহ্ন

      বিনয় বর্মনের প্রবন্ধের শিরোনাম মার্কেসের রাজনৈতিক চেতনা। মার্কেসের রাজনৈতিক চেতনা কথাটি যৎসামান্য সম্প্রসারণযোগ্য। আমরা ইচ্ছে করলে একটু কসরৎ করে বলতে পারি: গার্সিয়া মার্কেসের সাহিত্যে রাজনৈতিক চেতনা। অধুনা ঢাকার আকাশ বর্ষণশূণ্য, আবহাওয়া তপ্ত, শক্ত। প্রবন্ধটি সে-প্রভাবে অনেকটা আঁটোসাটো, মেদমুক্ত। যা বলার তা অতি স্পষ্ট করে বলেছেন বিনয় বর্মন। এটা তার স্টাইল। এই স্বকীয়তা তাঁকে ধন্য করবে।
      রাজনীতির কথাসাহিত্যিক গার্সিয়া মার্কেসের কীর্তিগাথা পড়তে পড়তে আমার মনে পড়ে গেল রাজনীতির কবি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের কথা। মুজিবও ছিলেন ফিডেল ক্যাস্ট্রোর বন্ধু, ছিলেন উপনিবেশবাদবিরোধী, ছিলেন শোষণ-নির্যাতন-গুম-খুনের বিরুদ্ধে এবং মানুষের মুক্তির পক্ষে। গার্সিয়া মার্কেস ল্যাটিন অ্যামেরিকার মানুষের ঘুম ভাঙিয়েছেন, এবং তাদের পরাধীনতার শেকল ভাঙার চেতনা দান করেছেন। তা তিনি করেছেন তাঁর কথাসাহিত্যের জাদুকরী ভাষায়। “কঠিন লোহা কঠিন ঘুমে ছিল অচেতন/ও তার মুখ ভাঙাইল কে?” উত্তর আসছে একবাক্যে: গার্সিয়া মার্কেস। গার্সিয়া মার্কেসের স্পোপার্জিত উত্তরও আছে তাঁর শিরোনামে: ওয়ান হানড্রেড ইয়ারস অব সলিটিউড-কলম্বিয়ার শত বছরের দিকনির্দেশনাশূন্যতা ও বন্ধুত্বহীনতা। বাংলাদেশের কবি নির্মলেন্দু গুণ বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণ উপলক্ষে যেমন লিখেছেন: শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে/কবি শোনালেন তাঁর/অমর কবিতাখানি।
      গার্সিয়া মার্কেসের কথাসাহিত্যের প্রভাবকে বিনয় বর্মন তুলনীয় বিবেচনা করেছেন ইংরেজী সাহিত্যের চার্লস ডিকেন্সের সাথে। এ-তুলনা যথার্থ। ডিকেন্সের লেখনীর প্রভাবেই ইংল্যান্ডে শিশুশ্রম আইন তৈরি হয়েছে। সমাজে প্রচুর সংস্কার এসেছে। শিল্প বিপ্লবের কুফল ও বিমানবিকীকরণ প্রতিহত করার সূত্রপাত তাঁর উপন্যাস থেকেই ঘটেছে। হার্ড টাইম উপন্যাসে তিনি মূল্যবোধের অবক্ষয়ের চিত্র উপহার দিয়েছেন যা পাঠ করে ইংরেজ জাতি ও তার উপনিবেশবাসীদের মূল্যবোধ উদ্ধার বিষয়ে বোধোদয় ঘটেছে। যথার্থ বিনয় বর্মনের তুলনা।
      রাজনৈতিক-সামাজিক চেতনা বিকাশে আমরা বাংলাদেশের একজন লেখকের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবের কথা অত্যন্ত গর্বের সাথে স্বীকার করি। তিনি রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। এদেশের বহু উন্নয়নমুখী সিদ্ধান্ত রোকেয়াচিন্তা থেকে জাত। বহু প্রতিষ্ঠানের নামকরণ রোকেয়ার নামে ধন্য। জ্ঞানপূণ্যবান অনেকেই রোকেয়াকে নারী অগ্রগতির পথিকৃত বলে অর্ধেক রাস্তায় গাড়ি থেকে নামেন। আসলে রোকেয়া বিশ শতকের প্রথম পর্বের ভারতবাসীগণের আর্থ-সামাজিক মুক্তি এবং শিক্ষা বিষয়ে উর্দু, ইংরেজি ও বাংলায় অনেক বক্তৃতা করেছেন, লিখেছেন এবং একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। তিনি বলেছেন, শিক্ষিত মায়েরা শিক্ষিত সন্তান জন্ম দেবেন; তিনি কখনই বলেননি যে, শিক্ষিত মায়েরা শুধুমাত্র কন্যা সন্তানই জন্ম দেবেন। তিনি শিক্ষিত ও স্বনির্ভর নব প্রজন্মের মানুষের কথাই বলেছেন। মতিচুর নামক রোকেয়া প্রবন্ধসমগ্রে ‘চাষার দুঃখ’, ‘এন্ডিশিল্পি’ ইত্যাদি বেশ কিছু প্রবন্ধ আছে যেগুলো অর্থনৈতিক উন্নয়ন চিন্তায় বেশ অগ্রসর। পন্ডিত নেহেরু যে রেশমশিল্প বিষয়ে পত্রপ্রবন্ধ লিখেছেন ১লা ডিসেম্বর ১৯৩২ তারিখে, রোকেয়া সে রেশমশিল্প বিষয়ে মতিচুর-এ লিখেছেন ১৯২৯ সালেই। মতিচুর-এর হিউমার বা হাস্যরসের কথা ভাবলে গার্সিয়া মার্কেসের হাস্যরসের কথা স্মরণে আসে। দুঃখ হয়, স্পেনীয় লেখক গার্সিয়া মার্কেস আরো পঁচিশটি ভাষায় অনূদিত হওয়ার পাশাপাশি বাংলাতেও অনূদিত হয়েছেন, কিন্তু রোকেয়ার উঁচু মানের প্রবন্ধ সাহিত্য মতিচুর এমনকি ইংরেজীতেও অনূদিত হয়নি! “গেঁয়ো যোগী ভিখ পায় না।” প্রতিভাবান লেখকরা বুদ্ধিতে এগিয়ে থাকেন বলে উইটি হন। সাহিত্যে এ-কারণে উইট ও হিউমার পাশাপাশি চলে। গার্সিয়া মার্কেস যেমন, রোকেয়াও তেমন উইট ও হিউমারের চর্চা করেছেন। তিনিও ছিলেন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী এবং মুক্তিকামী।
      বিনয় বর্মন গার্সিয়া মার্কেসের লেখনীশৈলীতে জাদুবাস্তবতা কৌশলের উল্লেখ করেছেন। জাদুবাস্তবতা পৃথক কোনো শৈলী নয়। লেখকের সার্বিক লেখনীশৈলীর লাগসই ও টেকসই সাফল্য নিশ্চিতকারী ভূমিকাটাই মুখ্য বিষয়। ১৯৭২ এর ১০ই জানুয়ারি সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার বিবিসি বাংলা প্রবাহে সৈয়দ শামসুল হক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে জাদুকর আখ্যায়িত করেছিলেন। কিন্তু, প্রকৃতপক্ষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ম্যাজিক দেখানো জাদুকর ছিলেন না; তিনি ছিলেন বাঙালির মুক্তি ও স্বাধীনতার ভাষিক জাদুকর। শৈল্পিক উৎকর্ষই এর মূল কথা। বিনয় বর্মনেরই কথায়: গার্সিয়া মার্কেসের উপন্যাস জীবনগল্পের সফল কথকতা। আমি ঘোর আশাবাদী যে অনুবাদে, মৌলিক কবিতা ও আলোচনা সাহিত্যে যুগপৎ সাফল্যের নতুন মাইলফলক স্পর্শ করবেন বিনয় বর্মন।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com