গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস: সাহিত্য ছুতারগিরি ছাড়া কিছু নয়

রওশন জামিল | ২৪ এপ্রিল ২০১৪ ৮:০১ অপরাহ্ন

border=0গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের এই সাক্ষাৎকারটি ১৯৮১ সালে প্যারিস রিভিউর শীত সংখ্যায় ‘দি আর্ট অভ ফিকশন’ সিরিজে প্রকাশিত হয়। মার্কেস্ এতে তাঁর সাংবাদিকতা ও সাহিত্যভাবনা এবং এই দুয়ের মধ্যে লেনদেন বিষয়ে আলো ফেলেছেন। সাক্ষাত্কারটি গ্রহণ করেন পিটার এইচ. স্টোন। এটি গৃহীত হয় মেক্সিকো সিটিতে, তাঁর বাড়ির ঠিক পেছনদিকে অবস্থিত স্টুডিও-কাম-অফিসে। সদ্যপ্রয়াত মহান এই গদ্যশিল্পীর শিল্পচিন্তা সম্পর্কে ধারণা পেতে সাক্ষাৎকারটির অংশবিশেষ অনুবাদে প্রকাশ করা হল। এটি বিডিনিউজ আর্টস-এর জন্য অনুবাদ করেছেন রওশন জামিল

প্যারিস রিভিউ: টেপ রেকর্ডার ব্যবহার করতে পারি?
গার্সিয়া মার্কেস্: সমস্যা হল ইন্টারভিউ টেপ হচ্ছে জানলেই মনোভাব বদলে যায়। আমার যেটা হয়, আমি সাবধান হয়ে যাই। সাংবাদিক হিশেবে আমার মনে হয় আমরা এখনও শিখিনি ইন্টারভিউর সময়ে কীভাবে টেপ রেকর্ডার ব্যবহার করতে হয়। সেরা উপায়, আমার মতে, দীর্ঘ আলাপচারিতা হবে, আর সাংবাদিক নোট নেবেন। পরে সেই আলাপচারিতার স্মৃতিচারণ করবেন তিনি এবং তার অনুভূতির কথা লিখবেন, সেটা হুবহু ওই কথাই হতে হবে এমন নয়। আরেকটা কাযর্কর উপায় হল নোট নিয়ে পরে সেগুলোর ব্যাখ্যা লেখা, যেখানে ইন্টারভিউ যিনি দিলেন তাঁর প্রতি একধরনের আনুগত্য কাজ করবে। সবকিছু টেপ রেকর্ড করার যে ব্যাপারটা আপনাকে জ্বালাতন করে তা হচ্ছে যন্ত্রটা যিনি ইন্টারভিউ দিচ্ছেন তার প্রতি অনুগত নয়, এমনকি তাঁর গাধামিও সে মনে রাখে এবং রেকর্ড করে। তাই টেপ রেকর্ডার থাকলে আমি সচেতন হয়ে যাই, আমার ইন্টারভিউ নেয়া হচ্ছে; আর টেপ রেকর্ডার না থাকলে, আনমনে, সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে কথা বলি।

প্যারিস রিভিউ: আপনার একথার পরে জিনিসটা ব্যবহার করতে আমার নিজেকে খানিকটা অপরাধী-অপরাধী লাগছে, কিন্তু আমি মনে করি এধরনের ইন্টারভিউতে আমাদের বোধহয় এটা দরকার হবে।
গার্সিয়া মার্কেস্: যাকগে, আমার কথার মূল উদ্দেশ্য ছিল আপনাকে সাবধান করে দেয়া।
প্যারিস রিভিউ: আপনি তাহলে কখনো ইন্টারভিউ নেয়ার সময়ে টেপ রেকর্ডার ব্যবহার করেননি?
গার্সিয়া মার্কেস্: সাংবাদিক হিশেবে কখনো ব্যবহার করিনি। আমার খুব ভাল একটা টেপ রেকর্ডার আছে। আমি ওটা দিয়ে গান শুনি। তবে সাংবাদিক হিশেবে আমি কখনো ইন্টারভিউও করিনি। রিপোর্ট করেছি, কিন্তু প্রশ্নোত্তর ধাঁচের ইন্টারভিউ করিনি।
প্যারিস রিভিউ: আমি একটা বিখ্যাত ইন্টারভিউর কথা শুনেছি, জাহাজডুবি এক নাবিকের কথা।
গার্সিয়া মার্কেস: ওটা প্রশ্নোত্তর ধাঁচের ছিল না। নাবিক আমাকে তার অভিযানের কথা বলে গেছেন আর আমি সেটা তার জবানিতে পুনর্লিখনের চেষ্টা করেছি। যেন সে-ই লিখছে। খবরকাগজে লেখাটা যখন ধারাবাহিকভাবে বেরোয়, দুসপ্তাহ ধরে রোজ এক কিস্তি, তখন লেখক হিশেবে ওই নাবিকের নামই ছাপা হয়েছিল, আমার না। কুড়ি বছর পর লেখাটা আবার প্রকাশিত হওয়ার আগে অবধি মানুষ জানতও না ওটা আমার লেখা। আমি শতবর্ষের নিঃসঙ্গতা রচনার আগে কোন প্রকাশকই উপলব্ধি করেননি ওটা ভাল একটি লেখা ছিল।
প্যারিস রিভিউ: আপনার কি মনে হয় উপন্যাস এমন কিছু করতে পারে যা সাংবাদিকতা পারে না?
গার্সিয়া মার্কেস্: না। আমার মনে হয় না এমন কোন পার্থক্য আছে। উৎস এক, সামগ্রী এক, সহায়সঙ্গতি আর ভাষা এগুলোও এক। ডানিয়েল ডিফোর মড়কের বছরের রোজনামচা একটি মহৎ উপন্যাস আর হিরোশিমা সাংবাদিকতার একটি মহৎ নিদর্শন।
প্যারিস রিভিউ: সত্য আর কল্পনার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার ব্যাপারে সাংবাদিক এবং ঔপন্যাসিকের দায় কি আলাদা?
গার্সিয়া মার্কেস্: সাংবাদিকতায় একটি মিথ্যা তথ্যই পুরো কাজটাকে পক্ষপাতদুষ্ট করে তোলে। অন্যদিকে, গল্পে একটি সত্য তথ্য পুরো কাজটাকে বৈধতা দেয়। এটাই একমাত্র পার্থক্য, আর এটা নির্ভর করে লেখকের অঙ্গীকারের উপর। একজন ঔপন্যাসিক তাঁর যা ইচ্ছে তা-ই করতে পারেন, মানুষকে সেটা বিশ্বাস করাতে পারলেই হল।
প্যারিস রিভিউ: কীভাবে লেখা শুরু করলেন?
গার্সিয়া মার্কেস্: ছবি আঁকার মাধ্যমে। কার্টুন এঁকে। পড়া বা লেখা শেখার আগে আমি স্কুলে আর বাড়িতে কার্টুন আঁকতাম। মজার ব্যাপার হল আমি যখন হাই স্কুলে পড়ি তখন লেখক হিশেবে আমার সুনাম ছিল, যদিও আমি কখনই কিছু লিখিনি। যদি কোন পুস্তিকা বা আবেদনপত্র লেখার দরকার পড়ত, আমাকেই করতে হত সেটা, কারণ মনে করা হত আমি হচ্ছি লেখক। যখন কলেজে প্রবেশ করলাম, সাধারণভাবে সাহিত্য সম্পর্কে একটা ভাল ধারণা ছিল আমার, অন্যান্য বন্ধুর তুলনায়। বোগোটায় ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময়ে, আমি নতুন বন্ধু, অন্তরঙ্গতা করতে শুরু করি, যাঁরা আমাকে সামসময়িক লেখকদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। একরাতে এক বন্ধু ফ্রানৎস কাফকার ছোটগল্পের বই পড়তে দিলেন। আমি যেখানে থাকতাম, সেই বোর্ডিংয়ে ফিরে গিয়ে রূপান্তর (Metamorphosis) পড়তে শুরু করলাম। প্রথম লাইনটাই আমাকে বিছানা থেকে প্রায় ছিটকে ফলার জো করল। আমি এত বিস্মিত হয়েছিলাম। প্রথম লাইনটায় বলা হয়েছে, ‘ওই সকালে অস্বস্তিকর ঘুম থেকে উঠে গ্রেগর সামসা আবিষ্কার করল সে এক অতিকায় পতঙ্গে পরিণত হয়েছে…।’ লাইনটা পড়ে আমার মনে হল আমি জানতামই না ওভাবে কারো লেখার অনুমতি আছে। যদি জানতাম তাহলে অনেক আগেই লেখা শুরু করতাম। ফলে তক্ষুণি আমি ছোট গল্প লেখা শুরু করি। ওগুলো ছিল পুরোপুরি বৌদ্ধিক গল্প কারণ আমি লিখছিলাম সাহিত্য পড়ার অভিজ্ঞতা থেকে এবং তখনো সাহিত্য আর জীবনের মধ্যে কোন যোগসূত্রের হদিস পাইনি। গল্পগুলো বোগোটার এল এসপেকতাদোর পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকীতে বেরোয়। সেসময় বেশ সুনাম কুড়িয়েছিল ওগুলো সম্ভবত কলম্বিয়ায় কেউ তখন বৌদ্ধিক ছোটগল্প লিখছিলেন না বলে।
প্যারিস রিভিউ: আপনি তখন জয়েস পড়েছিলেন?
গার্সিয়া মার্কেস্: আমি আগে জয়েস পড়িনি, তাই ইউলিসিস পড়তে শুরু করি। তখন একটাই স্প্যানিশ সংস্করণ লভ্য ছিল। আমি সেটাই পড়ি। তারপর, ইংরেজিতে আর একটা ভাল ফরাসি অনুবাদে ইউলিস পড়ে বুঝলাম মূল স্প্যানিশ অনুবাদটা একবারেই অখাদ্য ছিল। তবে আমি কিছু জিনিস শিখেছিলাম যেটা ভবিষ্যতে আমার লেখায় কাজে আসে, যেমন অন্তর্গত স্বগতকথনের টেকনিক। পরে ভার্জিনিয়া উলফে এর দেখা পাই, এবং ওর ব্যবহারটা আমার জয়েসের-টার চেয়ে ভাল লাগে। যদিও পরে জেনেছিলাম অন্তর্গত স্বগতকথনের আবিষ্কারক হলেন লাযারিও দি তর্মেস-এর বেনামি লেখক।
প্যারিস রিভিউ: শুরুর দিকে আপনার ওপর কোন লেখকদের প্রভাব ছিল বলবেন?
গার্সিয়া মার্কেস্: ছোটগল্পে আমাকে বুদ্ধির কসরত এড়াতে সাহায্য করেছিলেন আমেরিকার হারানো প্রজন্মের লেখকেরা। আমি উপলব্ধি করি তাঁদের সাহিত্যের সঙ্গে জীবনের একটা সম্পর্ক আছে যা আমার ছোটগল্পে নেই। তারপর একটা ঘটনা ঘটল যা এই মনোভঙ্গির ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ। ঘটনাটা হচ্ছে ৯ এপ্রিল ১৯৪৮ তারিখে সংঘটিত বোগোটাযো (দাঙ্গা)। গাইতান নামে এক রাজনৈতিক নেতাকে হত্যা করার পর উন্মত্ত জনতা নেমে আসে বোগোটার রাস্তায়। আমি আমার ঘরে লাঞ্চের জন্য তৈরি হচ্ছিলাম যখন পেলাম খবরটা। দৌড়ে গেলাম সেখানে, কিন্তু ততক্ষণে গাইতানকে একটা ট্যাক্সিতে তুলে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমি ঘরে ফেরার পথে দেখলাম মানুষ রাজপথ দখল করেছে, বিক্ষোভ করছে, দোকানপাট লুট করছে, বাড়িঘরে আগুন দিচ্ছে। আমি যোগ দিলাম ওদের সঙ্গে। সেই বিকেলে এবং সন্ধ্যায় আমি সচেতন হলাম আমি কোন ধরনের দেশে বাস করছি এবং এর সঙ্গে আমার ছোটগল্পের সম্পর্ক কত পলকা। তারপর যখন ক্যারিবিয়ানের বারানকুইয়ায়, যেখানে আমার শৈশব কাটিয়েছি সেখানে আমাকে ফিরে যেতে বাধ্য করা হল, আমি উপলব্ধি করলাম যে ওই ধরনের জীবন আমি যাপন করেছি, জানি এবং এর কথা লিখতে চাই।
১৯৫০ বা ‘৫১র দিকে একটা ঘটনা ঘটল যেটা আমার সাহিত্যিক প্রবণতাকে প্রভাবিত করে। মা আমাকে বললেন তাঁর সঙ্গে আরাকাতাকা, যেখানে আমার জন্ম সেখানে গিয়ে বাড়িটা বিক্রি করে দিতে। ওই বাড়িতে আমি আমার জীবনের প্রথম দিনগুলো কাটিয়েছিলাম। প্রথম যখন সেখানে গেলাম সেটা ছিল আমার জন্য একটা ঘোরের মতো। তখন আমার বয়স ২২ বছর, আট বছর বয়সের পর আর ওখানে যাইনি। কিছুই বাস্তবে বদলায়নি কিন্তু আমার মনে হল আমি গ্রামটা দেখছি না, বরং পড়ার মধ্য দিয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করছি। মনে হল আমি যা কিছু দেখছি তার সব আগেই লেখা হয়ে গেছে, আমাকে শুধু ওখানে বসে টুকতে হবে যা আগে থেকেই আছে ওখানে আর যা আমি এইমাত্র পড়ছি। সবকিছু সাহিত্যে রূপান্তরিত হয়েছে: বাড়ি, মানুষ আর স্মৃতি। আমি নিশ্চিত নই আমি আগেই ফকনার পড়েছিলাম কিনা, কিন্তু এখন বুঝলাম ফকনার যে কৌশল ব্যবহার করেছেন একমাত্র সেরকম কিছুই আমি যা দেখছি তা লেখার সামর্থ্য আমাকে দিতে পারে।
গ্রামের ওই সফর থেকে ফিরে আমি পাতাঝড়, আমার প্রথম উপন্যাস লিখতে বসি। আরাকাতাকায় ওই সফরে বস্তুত আমার জীবনে যা ঘটেছিল তা হল আমি উপলব্ধি করেছিলাম যে আমার শৈশবের সবকিছুরই একটা সাহিত্যমূল্য আছে যার তাৎপর্য আমি এই প্রথমবারের মত বুঝতে পারছি। পাতাঝড় লেখার মুহূর্ত থেকেই আমি উপলব্ধি করি আমি লেখক হতে চাই এবং কেউ আমাকে থামাতে পারবে না আর একটা জিনিসই করার রয়েছে আমার, আর তা হচ্ছে বিশ্বের সেরা লেখক হতে চেষ্টা করা। এটা ১৯৫৩ সালের কথা। তবে ১৯৬৭ সালের আগে আমি আমার প্রথম রয়্যালটি পাইনি, আর ততদিনে আমার আটটা বইয়ের পাঁচটাই বেরিয়ে গিয়েছিল।
প্যারিস রিভিউ: আপনি কি মনে করেন নবীন লেখকদের একটা সাধারণ প্রবণতা নিজেদের শৈশবের মূল্য অস্বীকার করা এবং বুদ্ধির খেলায় মনোযোগী হওয়া যেমন আপনি করেছিলেন শুরুতে?
গার্সিয়া মার্কেস্: না, প্রক্রিয়াটা আসলে শুরু হয় উল্টোভাবে, তবে আমাকে যদি একজন নবীন লেখককে পরামর্শ দিতে হয় তাহলে আমি বলব এমন কিছু নিয়ে লিখতে যেটা তার জীবনে ঘটেছে; একজন লেখক তার নিজের জীবনের ঘটনা নিয়ে লিখছেন না কিছু পড়ে বা শুনে লিখছেন খুব সহজেই বোঝা যায়। পাবলো নেরুদার একটা কবিতায় আছে, —‘আমি যখন গান করি তখন উদ্ভাবনে ঈশ্বর আমার সহায় হোন।’ আমি সবসময়েই বেশ আমোদ পাই যখন আমার কাজের সেরা প্রশংসাটা আসে কল্পনার জন্য, যখন সত্যি এটাই যে আমার কোন লেখায় এমন একটি লাইন নেই যার বাস্তব ভিত্তি নেই। সমস্যা হল ক্যারিবীয় বাস্তবতার সঙ্গে বল্গাহীন কল্পনার ভীষণ মিল।
প্যারিস রিভিউ: আপনার গল্পে সাংবাদিকতার প্রভাবটা কতটা?
গার্সিয়া মার্কেস্: আমার মনে হয় প্রভাবটা পারস্পরিক। গল্প আমার সাংবাদিকতায় সাহায্য করেছে, ওতে সাহিত্যমূল্য জুগিয়ে। সাংবাদিকতা আমার গল্পে সাহায্য করেছে কারণ এটা আমাকে বাস্তবতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখতে সাহায্য করেছে।
প্যারিস রিভিউ: ওই কৌশল বা মেজাজে একধরনের সাংবাদিকতাধর্মী বৈশিষ্ট্যও রয়েছে মনে হয়। আপনি অদ্ভুত সব ঘটনার এমন খুঁটিনাটি বর্ণনা দেন যে তা ওগুলোকে ওদের নিজস্ব একটা বাস্তবতা দেয়। এটা কি আপনি সাংবাদিকতা থেকে গ্রহণ করেছেন?
গার্সিয়া মার্কেস্: ওটা সাংবাদিকতার একটা কৌশল যা আপনি সাহিত্যেও প্রয়োগ করতে পারেন। যেমন, আপনি যদি বলেন আকাশে হাতি উড়ছে তাহলে মানুষ বিশ্বাস করবে না। কিন্তু আপনি যদি বলেন আকাশে চারশ পঁচিশটা হাতি উড়ছে তাহলে হয়ত মানুষ আপনাকে বিশ্বাস করবে। নিঃসঙ্গতার শতবর্ষ এধরনের জিনিসেই ভরপুর।আমার দিদিমা ঠিক এই কৌশলটাই ব্যবহার করতেন। আমার বিশেষ করে ওই চরিত্রটার কথা মনে আছে যাকে হলুদ প্রজাপতি ঘিরে ছিল। আমি যখন খুব ছোট, বাড়িতে এক ইলেকট্রিশিয়ান এসেছিল। খুব কৌতূহল বোধ করেছিলাম আমি, কারণ ওর সঙ্গে একটা বেল্ট ছিল যেটার সাহায্যে সে ইলেকট্রিক পোস্ট থেকে জুলে পড়ত। দিদিমা বলতেন এই লোক যখনই আসে বাড়িটা প্রজাপতিতে ভরে ওঠে। কিন্তু লিখতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম আমি যদি না বলি প্রজাপতিগুলো হলুদ, মানুষ বিশ্বাস করবে না। আমি যখন রেমিদিওস সুন্দরীর স্বরেগ যাওয়ার কথা লিখছিলাম তখন ওটাকে বিশ্বাসযোগ্য করতে আমার অনেক সময় লেগেছিল। একদিন বাগানে বেরিয়েছি, দেখি আমাদের বাড়িতে যে মহিলা আসতেন কাপড় ধুতে তিনি চাদর শুকোতে দিচ্ছেন। প্রবল হাওয়া বইছিল। হাওয়াকে বকছিলেন তিনি, যেন চাদরগুলো উড়িয়ে নিয়ে না যায়। আমি দেখলাম আমি যদি রেমেদিওস সুন্দরীর জন্য চাদরগুলো ব্যবহার করি, সে আরোহণ করতে পারবে। ব্যাপারটাকে বিশ্বাসযোগ্য করবার জন্য ওভাবেই করলাম আমি। যে কেউ যা ইচ্ছা লিখতে পারেন, বিশ্বাসযোগ্য হলেই হল।
প্যারিস রিভিউ: নিঃসঙ্গতার শতবর্ষ-এ অনিদ্রা মড়কের উত্সটা কী?
গার্সিয়া মার্কেস্: ইডিপাস থেকে শুরু করে, মড়ক সম্পর্কে আমার একটা অসীম আগ্রহ। মধ্যযুগের মড়কগুলোর উপর প্রচুর পড়াশোনা করেছি। ড্যানিয়েল ডিফোর মড়কের বছরের রোজনামচা আমার প্রিয় বইগুলোর একটা। একটা কারণ অবশ্যি ডিফো একজন সাংবাদিক যাঁকে মনে হয় বিলকুল আষাঢ়ে গল্প বলছেন। বহুদিন অবধি আমার ধারণা ছিল ডিফো তাঁর দেখা লন্ডন মড়কের কথা বলছেন। তারপর আবিষ্কার করলাম ওটা আসলে একটা উপন্যাস, কারণ লন্ডনে যখন মড়ক হয় ডিফোর বয়স তখন সাত বছরেরও কম।মড়কের থিম ফিরে ফিরে এসেছে আমার কাজে, বিভিন্ন আঙ্গিকে। দুষ্ট ঘণ্টায় পুস্তিকাগুলো মড়ক।বহুকাল পর্যন্ত আমার মনে হয়েছে কলম্বিয়ায় রাজনৈতিক সহিংসতার নিগূঢ় রহস্য মড়কের মতই। নিঃসঙ্গের শতবর্ষ-এর আগে আমি একটা গল্পে সব পাখি মেরে ফেলার জন্য এক মড়ক ব্যবহার করেছিলাম। গল্পটার নাম শনিবারের পর একদিন।নিঃসঙ্গতার শতবর্ষ-এ অনিদ্রার মড়ক ব্যবহার করেছি একটা সাহিত্যিক কৌশল হিশেবে, যেহেতু এটা হচ্ছে নিদ্রা মড়কের বিপরীত। শেষবিচারে সাহিত্য ছুতারগিরি ছাড়া কিছুই না।
প্যারিস রিভিউ: রূপকটা আরেকটু ব্যাখ্যা করবেন কি?
গার্সিয়া মার্কেস্: দুটোই ভীষণ কঠিন কাজ। লেখা ব্যাপারটা প্রায় একটা টেবল তৈরির মতই কঠিন। দুটোতেই আপনি বাস্তবতা নিয়ে কাজ করছেন, কাঠের মতই শক্ত একটা উপাদান। দুটোই কায়দা আর কলাকৌশলে পরিপূর্ণ। বলতে কি খুব অল্পই জাদু আর প্রচুর কঠোর পরিশ্রম জড়িত। আর প্রুস্তই মনে হয় বলেছেন কথাটা, এর দশ শতাংশ প্রেরণা, আর বাকি নব্বই শতাংশ হচ্ছে ঘাম। আমি কখনো ছুতোরের কাজ করিনি তবে কাজটাকে সবচেয়ে শ্রদ্ধা করি, বিশেষ করে আপনার জন্য কাজটা করে দিতে পারে এমন কাউকে আপনি কখনো খুঁজে পাবেন না।
প্যারিস রিভিউ: আপনি প্রায়ই একাকিত্বের শক্তি ব্যবহার করেন।
গার্সিয়া মার্কেস্: যত বেশি ক্ষমতা আপনার ততই জানা কঠিন কে আপনাকে মিথ্যে বলছে কে নয়। আপনি যখন নিরংকুশ ক্ষমতায় পৌঁছে যান তখন আর বাস্তবতার সঙ্গে কোন সম্পর্ক থাকে না, আর ওটা হচ্ছে সবচেয়ে জঘন্য ধরনের একাকিত্ব। একজন অত্যন্ত ক্ষমতাশালী মানুষ, একনায়ক, স্বার্থ আর চাটুকার দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকেন যাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে তাঁকে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করা; সবকিছুর যোগসাজশ তাঁকে আলাদা করা।
প্যারিস রিভিউ: লেখকের একাকিত্বের কী অবস্থ? এটা কি আলাদা কিছু?
গার্সিয়া মার্কেস্: এর সঙ্গে একাকিত্বের শক্তির অনেকটাই সম্পর্ক। বাস্তবতা চিত্রণে লেখকের খোদ প্রচেষ্টাই অনেকসময় তাঁকে এর বিকৃত রূপের কাছে নিয়ে যায়। বাস্তবতার জায়গা বদল করতে গিয়ে তিনি এর সঙ্গে যোগযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গজদন্তমিনারবাসী হয়ে পড়তে পারেন। সাংবাদিকতা এর বিরুদ্ধে একটি উত্তম ঢাল। সেজন্যই আমি সবসময় সাংবাদিকতা করে গিয়েছি, কারণ এটা আমাকে বাস্তব দুনিয়ার জগতের সঙ্গে সংযুক্ত রাখে, বিশেষ করে রাজনৈতিক সাংবাদিকতা এবং রাজনীতি। নিঃসঙ্গতার শতবর্ষ-র পর আমাকে যে নিঃসঙ্গতা চোখ রাঙিয়েছিল সেটা লেখকের নিঃসঙ্গতা ছিল না; ওটা ছিল খ্যাতির নিঃসঙ্গতা, যার সঙ্গে ক্ষমতার নিঃসঙ্গতার মিল অনেক, অনেক বেশি।আমার বন্ধুরা এটা থেকে আমাকে রক্ষা করেছেন, আমার বন্ধুরা সবসময় পাশে থেকেছেন।
প্যারিস রিভিউ: কীভাবে?
গার্সিয়া মার্কেস্: কারণ আমি সারা জীবন একই বন্ধুবান্ধব বজায় রেখেছি। মানে, কখনো পুরোন বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করিনি, আর ওরাই আমাকে মাটিতে নামিয়ে আনে; ওরা সবসময় ওদের পা মাটিতে রাখে। ওরা বিখ্যাত কেউ নয়।
প্যারিস রিভিউ: আপনার উপন্যাস কি কখনো অপ্রত্যাশিত বাঁক বদল করে?
গার্সিয়া মার্কেস্: এটা আমার শুরুতে হতো। প্রথম দিককার গল্পগুলোয় মেজাজ সম্পর্কে আমার একটা সাধারণ ধারণা থাকত, কিন্তু মাঝে মাঝে আকস্মিকতার কাছে নিজেকে সমর্পণ করতাম।শুরুতেই খুব ভাল একটা পরামর্শ পেয়েছিলাম, তরুণ বয়সে, যখন একজন লেখকের প্রেরণার তোড় থাকে তখন এভাবে কাজ করা ঠিক আছে।কিন্তু আমাকে বলা হল আমি যদি কারিগরি রপ্ত করতে না পারি তাহলে পরে বিপদে পড়ব যখন প্রেরণা ফুরিয়ে যাবে এবং ঘাটতি পূরণের জন্য কারিগরির দরকার পড়বে। তখন যদি না শিখতাম তাহলে এখন আগেভাগে একটা কাঠামোর ছক কষতে পারতাম না। কাঠামো একটি বিশুদ্ধ কারিগরি সমস্যা, আর আপনি যদি শুরুতেই এটা না শেখেন তাহলে কোনদিন শিখবেন না।
প্যারিস রিভিউ: শৃঙ্খলা তাহলে আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ?
গার্সিয়া মার্কেস্: অসামান্য শৃঙ্খলা ছাড়া একটা ভাল বই লেখা সম্ভব আমার মনে হয় না।
প্যারিস রিভিউ: কৃত্রিম উত্তেজক নেই কিছু?
গার্সিয়া মার্কেস্: হেমিংওয়ের একটা কথা আমার মনে দারুণ ধরেছিল। সেটা হল লেখার কাজটা তাঁর কাছে মুষ্টিযুদ্ধের মতো ছিল। তিনি নিজের স্বাস্থ্য, সুখস্বাচ্ছন্দ্যের ব্যাপারে মনোযোগী ছিলেন। মদ্যপ হিশেবে ফকনারের দুর্নাম ছিল, কিন্তু যতগুলো সাক্ষাত্কার তিনি দিয়েছিলেন সেগুলোর প্রতিটিতে বলেছেন মাতাল হয়ে এক লাইন লেখাও অসম্ভব। হেমিংওয়েও একথা বলেছেন। অপদার্থ পাঠকরা আমাকে জিজ্ঞেস করেছেন আমার কোন কোন লেখার সময়ে আমি মাদকাচ্ছন্ন ছিলাম কিনা।ওই কথা এটাই প্রমাণ করে যে ওরা সাহিত্য বা মাদক কোনটা সম্পর্কেই কিছু জানেন না। একজন ভাল লেখক হওয়ার জন্য লেখার প্রতিটি মুহূর্তে আপনাকে সাবলীল হতে হয়, সুস্থ থাকতে হয়। লেখালেখি নিয়ে একধরনের রোম্যান্টিক ধারণা আছে, লেখা হল আত্মত্যাগ, আর্থিক অবস্থা বা মনের অবস্থা যত খারাপ, তত ভাল হয় লেখা, আমি এর ঘোর বিপক্ষে। আমি মনে করি আপনাকে মানসিক ও শারীরিকভাবে সুস্থ থাকতে হবে।আমি মনে করি সাহিত্য সৃষ্টিতে সুস্বাস্থ্যের প্রয়োজন হয়, এবং হারানো প্রজন্ম এটা বুঝেছিলেন। তাঁরা জীবনকে ভালবেসেছিলেন।
প্যারিস রিভিউ: স্বপ্ন কি কখনো অনুপ্রেরণার উত্স হিশেবে কাজ করেছে?
গার্সিয়া মার্কেস্: শুরুতে আমি এদিকটায় যথেষ্ট মনোযোগ দিয়েছিলাম। কিন্তু তারপর উপলব্ধি করলাম জীবন নিজেই অনুপ্রেরণার সেরা উত্স, আর স্বপ্ন হচ্ছে জীবনের সেই তোড়ের ছোট্ট একটা অংশমাত্র। আমার লেখার ক্ষেত্রে যেটা সব থেকে সত্যি সেটা হল স্বপ্নের বিভিন্ন ধারণা এবং সেগুলোর ব্যাখ্যার ব্যাপারে যথেষ্ট আগ্রহী। আমি স্বপনএক জীবনের অংশ হিশেবে দেখি, তবে বাস্তবতা অনেকবেশি সমৃদ্ধ। কিংবা এটাও হতে পারে আমি ভীষণ দুর্বল স্বপ্ন দেখি।
প্যারিস রিভিউ: অনুপ্রেরণা ও সহজাত বোধের মধ্যে পার্থক্যটা বলবেন কি?
গার্সিয়া মার্কেস্: প্রেরণা হচ্ছে আপনি যখন ঠিক সুরটা পেয়ে যান, যেটা আপনার আসলেই পছন্দ; এতে কাজ অনেক সহজ হয়ে যায়। সহজাত বোধও গল্প লেখার জন্য খুব জরুরি একটা ব্যাপার। এটা একটা বিশেষ ক্ষমতা, যা আপনাকে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান, বা অন্য ধরনের বিশেষ শিখনের প্রয়োজন ছাড়াই আসল বিষয়টা বুঝতে সাহায্য করে। সহজাত বোধের সাহায্যে মাধ্যাকর্ষণের সূত্রগুলো অনায়াসে বুঝে ফেলা যায়, এজন্য অন্য কিছু লাগে না। এটা হচ্ছে অর্জনের জন্য কষ্ট না করেই অভিজ্ঞতা থাকার মতো। একজন ঔপন্যাসিকের এই সহজাত বোধটা থাকা আবশ্যক। এটা মূলত বুদ্ধি চর্চার বিপরীত, যেটা আমি দুনিয়াতে সবচেয়ে অপছন্দ করি, এই অর্থে যে বাস্তব জীবনকে অনড় তত্ত্বে পরিণত করা হয়। সহজাত বোধের সুবিধাটা হল হয় এটা ঠিক, নয়ত বেঠিক। আপনি অন্তত বেমানান কিছু করার জন্য গলদঘর্ম হন না।
প্যারিস রিভিউ: তার মানে আপনি তাত্ত্বিকদের অপছন্দ করেন?
গার্সিয়া মার্কেস্: ঠিক। মূলত আমি ওদের ঠিক বুঝতে পারি না বলে। সে কারণেই আমাকে বেশির ভাগ জিনিস চুটকির মাধ্যমে বলতে হয়। বিমূর্তভাবে কোনকিছু বলার ক্ষমতা নেই আমার। এজন্য অনেক সমালোচক বলেন আমি যথেষ্ট পরিশীলত নই। অনেক উদ্ধৃতি ব্যবহার করি ।
প্যারিস রিভিউ: আপনি কি মনে করেন সমালোচকেরা আপনাকে খুব আটসাট ছাঁচে ঢেলে দেন বা শ্রেণিবদ্ধ করেন?
গার্সিয়া মার্কেস্: সমালোচকেরা হলেন আমার বিবেচনায় বুদ্ধি চর্চার সেরা নিদর্শন।প্রথমত, একজন লেখক কেমন হওয়া দরকার তার একটা তত্ত্ব আছে তাঁদের। তাঁরা লেখককে সেই ছাঁচে আঁটাতে চেষ্টা করেন। আর তিনি যদি না আঁটেন, তারপরে জোর করেন আঁটাবার জন্য। আমি জবাবটা দিচ্ছি স্রেফ আপনি জানতে চাইলেন বলে। সমালোচকেরা আমার সম্পর্কে কী বলেন আমার কোন আগ্রহ নেই সে বিষয়ে, আর বহু বছর হল আমি কোন সমালোচনা পড়িও না। তাঁরা লেখক আর পাঠকের মধ্যে সেতুবন্ধের দায়িত্ব নিয়েছেন। আমি সবসময়ে একজন স্পষ্ট ও সুমিত লেখক হতে চেষ্টা করেছি, সমালোচকের সাহায্য ছাড়াই সরাসরি পাঠকের কাছে সহজে পৌঁছুতে চেষ্টা করেছি।
প্যারিস রিভিউ: অনুবাদকদের সম্পর্কে আপনার কী ধারণা?
গার্সিয়া মার্কেস্: অনুবাদকদের সম্পর্কে আমার অনেক উঁচু ধারণা, কেবল যাঁরা ফুটনোট ব্যবহার করেন তাঁদের ছাড়া। ওঁরা সবসময়ই পাঠকদের একটা কিছু ব্যাখ্যা করতে চেষ্টা করেন যেটা সম্ভবত লেখক বোঝাননি; কিন্তু যেহেতু ওটা আছে ওখানে সেহেতু পাঠককে ব্যাপারটা মেনে নিতে হয়। অনুবাদ খুব শক্ত কাজ, মোটেও লাভজনক নয়, আর পয়সাও কম।একটা ভাল অনুবাদ সবসময়ই ভিন্ন একটা ভাষায় অনুসৃষ্টি। সেজন্যই গ্রেগরি রাবাসাকে আমি এত সম্মান করি। আমার বই একুশটি ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। রাবাসা একমাত্র অনুবাদক যিনি কখনো কোনকিছুর ব্যাখ্যা চাননি যাতে ফুটনোট যুক্ত করতে পারেন। আমি মনে করি আমার কাজ ইংরেজিতে পুরোপুরি পুনঃসৃষ্টি করা হয়েছে। বইয়ের কিছু অংশ আছে যেগুলো আক্ষরিকভাবে অনুসরণ করা কঠিন। মানুষ যে ধারণাটা পায়, অনুবাদক বইটা পড়েছেন আগে এবং তারপর স্মৃতি থেকে নতুন করে লিখেছেন। এজন্যই অনুবাদকদের সম্পর্কে আমার এত উঁচু ধারণা। বুদ্ধিচর্চার চেয়ে তাঁদের মধ্যে সহজাত বোধ কাজ করে বেশি। প্রকাশকেরা তাঁদের কেবল কম পারিশ্রমিকই দেন না, তাঁদের কাজটারও সাহিত্যমূল্য আছে মনে করেন না। বেশকিছু বই আছে আমি যেগুলো স্প্যানিশে অনুবাদ করতে আগ্রহী হতাম, কিন্তু সেটা করতে আমার নিজের বই লেখার মতই পরিশ্রম হতো এবং আমার খাওয়ার জন্য যথেষ্ট পয়সা জুটত না।
প্যারিস রিভিউ: আপনি কী অনুবাদ করতেন?
গার্সিয়া মার্কেস্: মালরোর পুরোটা। কনরাড, এবং সেইন্ট এক্সুপেরি। পড়তে গিয়ে অনেকসেময়ে মনে হয় আমি এই বইটা অনুবাদ করতে চাইব। সেরা সৃষ্টিগুলো বাদ দিলে, আমি মূল ভাষায় একটা বই পড়ার চেয়ে মাঝারি মানের অনুবাদে সেটা পড়তে আগ্রহ বোধ করি। আমি কখনই ভিন ভাষায় পড়তে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি না, কারণ একমাত্র স্পানিশ ভাষাটাই আমি আদ্যোপান্ত জানি। তবে ইতালিয়ান আর ফ্রেঞ্চ বলতে পারি, এবং কুড়ি বছর যাবত ফি হপ্তায় টাইম ম্যাগাজিনে বুঁদ হওয়ার মতো যথেষ্ট ইংরেজি জানি।
প্যারিস রিভিউ: আপনি কি মনে করেন অল্প বয়সেই কোন লেখকের খ্যাতি বা সাফল্য পাওয়াটা খারাপ?
গার্সিয়া মার্কেস্: যেকোন বয়সেই খারাপ। আমি ভালো বোধ করতাম আমার বইগুলো আমার মৃত্যুর পর স্বীকৃতি পেলে, অন্তত পুঁজিবাদী দেশগুলোয় যেখানে আপনাকে একধরনের পণ্যে পরিণত করা হয়।
প্যারিস রিভিউ: আপনি কেন মনে করেন খ্যাতি একজন লেখকের জন্য বিনাশী?
গার্সিয়া মার্কেস্: প্রথমত এটা আপনার ব্যক্তিজীবনে নাক গলায়। বন্ধুদের সঙ্গে ব্যয় করতে পারেন, কাজ করতে পারেন এমন সময়গুলো কেড়ে নেয় আপনার থেকে। আপনাকে বাস্তব দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চায়।একজন বিখ্যাত লেখক যিনি লেখা অব্যাহত রাখতে চান তাঁর নিজেকে খ্যাতি থেকে রক্ষা করতে হবে। আমি আসলে ঠিক এটাই বলতে চাই না, কেননা কথাটা কখনই আন্তরিক মনে হয় না, তবে আমি সত্যিই খুশি হতাম আমার মৃত্যুর পর আমার বই বেরোলে। তাহলে আর আমাকে এই খ্যাতি, বিখ্যাত লেখক এসব বিষয়ের মধ্যে দিয়ে যেতে হতো না। আমার ক্ষেত্রে খ্যাতি একটা সুবিধাই এনে দিয়েছে, আর সেটা হল এটাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছি।অন্যথায়, ব্যাপারটা খুবই অস্বস্তিকর। সমস্যা হল, আপনি খ্যাতিমান থাকেন দিনেরাতে চব্বিশ ঘণ্টার জন্য, ইচ্ছে করলেই বলতে পারেন না, ‘ঠিক আছে, আমি কালকের আগে আর বিখ্যাত হব না’ কিংবা একটা বোতাম টিপে বলতে পারেন না ‘আমি আর বিখ্যাত নই।’

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন azim hossain — এপ্রিল ২৫, ২০১৪ @ ১১:২৭ অপরাহ্ন

      i am happy to read this page.

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com