‘মৃত্যুর আরেক নাম পুনরুত্থান’: মহারাজ মার্কেজ

যুবায়ের মাহবুব | ২৩ এপ্রিল ২০১৪ ১০:২৮ অপরাহ্ন

border=0জেরাল্ড মার্টিন ব্রিটিশ গবেষক এবং সাহিত্য সমালোচক। এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট লাভ করে তিনি বহু বছর যুক্তরাজ্যের পোর্টসমাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের পিটসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। লাতিন আমেরিকার দুইজন নোবেল-বিজয়ী সাহিত্যিক – মিগেল আনহেল আস্তুরিয়াস এবং গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ – তার গবেষণার প্রধান বিষয়। তার লেখা গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ: এ লাইফ (২০০৮) সদ্য প্রয়াত মহান লেখকের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য ইংরেজি জীবনী। মার্কেসের মৃত্যুর পরপরই এই প্রবন্ধটি স্পেনের ‘এল পাইস’ দৈনিকে প্রথম প্রকাশিত হয়। স্প্যানিশ থেকে অনুবাদ করেছেন যুবায়ের মাহবুব।

৩৬ ঘন্টা আগে যখন একটি স্প্যানিশ রেডিও চ্যানেল থেকে ফোন কলটি পেলাম, গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের মৃত্যুতে আমার প্রতিক্রিয়া জানতে চেয়ে — বিমর্ষ বাকরুদ্ধ কন্ঠে বলেছিলাম, ‘প্রথম শুনলাম, এই মুহুর্তে কিছু বলতে পারছি না, একটু ভাবতে দিন আমাকে’ — সেই মুহূর্ত থেকে এখন পর্যন্ত আমার এতটুকু অবকাশ মিলেনি একটু গভীরে চিন্তা করার। এমন একজন মানুষের প্রস্থান ঘটলো, যিনি এক বিচারে আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ ছিলেন, অন্তত ১৯৯০ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে। সেই মুহূর্ত (অন্য এক সময় ছিল, অন্য এক মুহূর্ত) যখন আমি হাভানায় তার বাড়ির দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করেছিলাম, সেই ক্ষণ যখন মহান লেখক এবং তার অখ্যাত জীবনীকারের মাঝে সম্পর্ক জন্ম নিয়েছিল। কিছুটা নিষ্ঠুরভাবেই যেন খবরটি আমার গোচরে এলো – শোনার পর থেকে বিষাদ কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছি, আমার অমোচনীয় অনাথদশা অতিক্রম করার চেষ্টা করছি। তড়িঘড়ি বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছি নিরবধি, নিশ্চয়ই খুব জরুরী এই বক্তব্যগুলো – আজকের দ্রুতগতির পৃথিবীতে আর কী উপায় আছে। কিন্তু তবুও কেন যেন মনে হয় যে এত এত বক্তব্য-প্রতিক্রিয়া দিয়ে আমরা নিজেদের সাথে যেমন বিশ্বাসঘাতকতা করছি, তেমনই বেঈমানি করছি যাকে নিয়ে এত কথা বলছি, তার সাথেও।

আমার প্রথম ভাবনা হলো – গাবো যে উচ্চতায় পৌঁছেছিলেন ( বা পৌঁছেছেন), তার অন্যতম কারণ ছিল তার আকর্ষণীয় বাচনভঙ্গি। পাঠক বা শ্রোতার মনে বরাবরই এই বিশ্বাসের জন্ম দিতে পারতেন যে তার কথাগুলো সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্ত, এমন একজন মানুষের সরাসরি সহজাত নিঃসরণ যিনি কেবল সাক্ষাৎ জিনিয়াসই নন, বরং আপামর জনসাধারণের একজনও বটে। ঈশ্বরের এই বর খুব অল্প কিছু মানুষের ভাগ্যেই জোটে – আমার নিজস্ব সাংস্কৃতিক গন্ডির মধ্যে শুধুমাত্র দুইজন – চার্লি চ্যাপলিন এবং মার্ক টোয়েইন – এই তালিকায় নাম লেখানোর যোগ্যতা রাখেন।

অনেক বছর ধরে আমি সংবাদমাধ্যমে বলে আসছি যে গার্সিয়া মার্কেজের উদাহরণটি অনন্য এবং অদ্বিতীয়। এই প্রপঞ্চ (phenomenon) কেবল সাহিত্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সবচেয়ে ব্যাপক অর্থেই এটি একটি সাংস্কৃতিক ফেনোমেনোন। লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে এমন উদাহরণ আর দ্বিতীয়টি পাওয়া যাবেনা – একজন কলম্বিয়ান লেখক হয়ে উঠেছিলেন প্রথম গ্লোবাল সাহিত্যিক, যার খ্যাতি পাশ্চাত্যের সীমানা পেরিয়ে এশিয়া এবং আফ্রিকার ছোট ছোট শহর গঞ্জেও ছড়িয়ে পড়েছিল। একইভাবে শতবর্ষের নিঃসঙ্গতা ছিল প্রথম গ্লোবাল উপন্যাস, আর মার্কেজীয় মহাকাব্যিক উপন্যাসের উত্থানকে মাথায় রেখে আমরা যদি মার্শাল ম্যাকলুহানের শব্দ-যুগলকে খাপ খাইয়ে নেই, তাহলে আরাকাতাকা ছিল বস্তুত প্রথম ‘গ্লোবাল ভিলেজ’।

এই কথাগুলো আমি বলেছি, পুনরাবৃত্তি করেছি বহুবার। তবে এও ভাবতাম – আসলেই কথাগুলো সত্যি তো? আমি অতিরঞ্জন করছি না তো? এখন উত্তরপ্রজন্ম অবশেষে তার রায় দিতে শুরু করেছে। স্পেনের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র ‘এল পাইস’-এর সম্পাদকীয় আমাদের জানিয়ে দেয় যে একটি পৃথিবীর পতন ঘটেছে। মেক্সিকোর লা জর্নাদা লিখেছে, গোটা বিশ্ব কাঁদছে গার্সিয়া মার্কেজের জন্যে। রাজনীতিবিদরা তাদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন – ওবামা, ক্লিন্টন, রাশিয়ার পুতিন, ফ্রান্সের অলোন্দ। বিল ক্লিন্টন বলেছেন – আমি সম্মানিত বোধ করছি যে বিশ বছরের অধিক সময় ধরে আমি তার বন্ধুত্বের পরশ পেয়েছিলাম, তার বিশাল হৃদয় এবং উজ্জ্বল মানসের সাথে পরিচিত হতে পেরেছিলাম। কলম্বিয়ার রাষ্ট্রপতি হুয়ান মানুয়েল সান্তোস টুইটারে লিখেছেন – সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ কলম্বিয়ানের তিরোধানে সহস্র বছরের নিঃসঙ্গতা এবং বিষন্নতা। পেরুর প্রেসিডেন্ট বলেছেন – শুধু লাতিন আমেরিকা নয়, সমগ্র বিশ্ব এই স্বপ্নদ্রষ্টার প্রস্থানে শোকার্ত। একই ধরনের অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছেন মেক্সিকো, ভেনেজুয়েলা, ইকুয়েডোর, বলিভিয়া, কিউবা, ব্রাজিল এবং মহাদেশের অন্যান্য রাষ্ট্রপ্রধানগণ। ‘বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে স্প্যানিশ সাহিত্যের নক্ষত্র, সার্বজনীন এবং অপরিহার্য এই লেখকের জন্যে ভালবাসা ও শ্রদ্ধা’ প্রকাশ করেছেন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী মারিয়ানো রাহোয়। প্রখ্যাত ইংরেজ ঔপন্যাসিক ইয়ান ম্যাকইউয়ান মন্তব্য করেছেন – আমি তাকে সর্বোচ্চ স্থানে আসন দেবো, শিল্পীদের স্বর্গরাজ্য মাউন্ট পার্নাসাসের চূড়ায়। এবং লাতিন আমেরিকার বুম প্রজন্মের শেষ জীবিত ঔপন্যাসিক, পেরুর মারিও ভার্গাস ইয়োসা যিনি নোবেল বিজয়ে গাবোর উত্তরসুরী ছিলেন এবং লাতিন উপন্যাসের অঙ্গনে তার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী – তিনিও পেরুর আয়াকুচো থেকে তার শোকবার্তা পাঠিয়েছেন।

আমার কথা সত্যিই ফলেছে তাহলে। ভালোবাসা আর শোকের এই বিস্ফোরণ যেন ৩১ বছর আগে আরেক বিস্ফোরণের কথা মনে করিয়ে দেয়। তখন আমরা দেখেছিলাম, অনুভব করেছিলাম কিভাবে একটি গোটা মহাদেশ গাবোর নোবেল বিজয়ের ঘোষণাকে উল্লাস আর পরিতৃপ্তির সাথে বরণ করে নিয়েছিল। এরপর অনেক বছর গড়িয়ে গেছে, কিন্তু আজও লাতিন আমেরিকার সংবাদমাধ্যমগুলো প্রতি বছর এই মাইলফলককে আনন্দচিত্তে স্মরণ করে, গাবোর বন্ধু মেক্সিকোর মহান লেখক কার্লোস ফুয়েন্তেসের ভাষায় ‘আরাকাতাকার চারণকবির’ প্রতিটি জন্মদিন শ্রদ্ধাভরে উদযাপন করে।

আমি খুব, খুব বেশি বিষন্ন বোধ করছি। কিন্তু এই কথা তো সত্য যে অনেকদিন থেকেই আমরা গাবোর কথা ভাবতে গিয়ে, গাবোকে নিয়ে আলাপ করতে গিয়ে বিষাদে ভুগছিলাম। ২০০৫ সালের অক্টোবর মাসে তাকে দেখতে আমি মেক্সিকো গিয়েছিলাম। তিনি আমাকে বলেছিলেন যে তিনিও কিছুটা কষ্ট বোধ করেন, বুঝতে পারেন যে ‘এইসব কিছু’ শেষ হয়ে গেছে। গাবো তার নশ্বর দেহের বিনাশের কথা ভাবছিলেন না। আরো সময় পেরিয়ে যায়, কিন্তু রূপকথার গল্পের মতই (রিপ ভ্যান উইংকেল বা স্লীপিং বিউটি) আমরা বুঝতে পেরেছিলাম যে সময় নিজেই আসলে থমকে গেছে। গাবো বেঁচেছিলেন কিন্তু তিনি আমাদের সাথে আর কথা বলতেন না, আমাদের জন্যে আর নতুন কিছু লিখতেন না। আমরা গাবোকে ভুলতে পারিনি, কিন্তু গাবো যিনি আমাদের স্মৃতির সম্রাট, গোত্রের গল্পকথক – সেই গাবোই যেন আমাদেরকে বিস্মৃত হয়েছিলেন।

অভিঘাত আর বেদনাবিধুর গত ৩৬টি ঘন্টায় আমার মনে হয়েছে যে গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের ক্ষেত্রে তার মৃত্যু সন্দেহাতীতভাবেই একটি পুনরুত্থান। এল পাইস পত্রিকার সম্পাদকীয় লেখক ঘোষণা দিয়েছিলেন – ‘একটি পৃথিবীর পতন’ – কিন্তু তিনি তার নিজের উপসংহারের প্রতিই বিশ্বস্ত থাকতে পারেননি। তার চিন্তামালার শেষপ্রান্তে এসে তিনি বলছেন – ‘গাবো চলে গেছেন, কিন্তু রেখে গেছেন একটি পৃথিবী’। অর্থাৎ – মহারাজের মৃত্যু হয়েছে, মহারাজ দীর্ঘজীবি হোন, তবে তিনিই যেন হন।
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Taufiq Ahmed — এপ্রিল ২৪, ২০১৪ @ ২:৪৩ অপরাহ্ন

      Such a legendary writer will not born again as he wrote the reality with history, tradition & truth for humankind.I salute his work as he will be remembered forever in this world.
      Taufiq Ahmed
      uttara,
      Dhaka.

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com