গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস: তাহলে গানের কথাই বলি

রাজু আলাউদ্দিন | ১৯ এপ্রিল ২০১৪ ৯:৪৪ অপরাহ্ন

marquez-con-shakira.jpgমেহিকো থেকে প্রকাশিত এল প্রসেসো পত্রিকা তার মৃত্যুর বেশ কয়েক বছর আগে মার্কেসকে নিয়ে একটা সংখ্যা করেছিলো। তাতে মার্কেসকে নিয়ে লেখাতো ছিলোই, ছিলো মার্কেসের নিজের লেখাও। তার নিজের লেখাগুলোর একটি ছিলো সঙ্গীত বিষয়ে। এমন নয় যে এই প্রথম তিনি এ বিষয়ে লিখলেন। সাংবাদিক-জীবনে পত্রিকায় তো বটেই, এমনকি পরবর্তীকালেও তার উপন্যাস ও গল্পে গানের এবং বাদ্যযন্ত্রের প্রসঙ্গ এসেছে বহুবার। গান বিষয়ে মার্কেসের এই লেখাটি এখনও পর্যন্ত তার কোনো গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। দুর্লভ এ লেখাটি স্পানঞল থেকে অনুবাদ করেছেন কবি ও প্রাবন্ধিক রাজু আলাউদ্দিন।

দৈনিক পত্রিকার পক্ষ থেকে যেসব জরিপ করা হয় তারই এক প্রশ্ন হিসেবে বহুবারই আমার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে কোনো নির্জন দ্বীপে নির্বাসনে যাওয়ার সময় কেবল যদি একটি গানের ডিস্ক নেয়ার সুযোগ পাই তাহলে কোনটি নেব। মুহূর্তের জন্যও দ্বিধা না করে আমার উত্তর হচ্ছে কেবল যোহান সেবাস্টিয়ান বাখ-এর ‘চেল্লো স্যুট’, আর কেবল একটি নেয়ার সুযোগ খাকলে এক নম্বরটা নেব। ভিন্ন ভিন্ন বেশ কয়েকটি সংস্করণই আমি দেখেছি, এগুলোর মধ্যে অবশ্যই দেখেছি পাবলো কাসালেরটিও । তাছাড়া এর ঐতিহাসিক মূল্যও আছে, চমৎকার এক সংস্করণ, তবে রেকর্ডিংটা এতই পুরোনো যে চমৎকারিত্বের অনেকখানিই ওতে হারিয়ে যায়। আসলে, যে-সংস্করণটি আমাকে বেশি আলোড়িত করে সেটা হচ্ছে মারোয়া জেঁদরো’র। স্প্যানঞল স্বর্ণযুগের কবিতার একটি ভালো সংকলনসহ মোটামুটি এটাই হবে আমার নির্বাসনের সঙ্গী।

এ প্রসঙ্গে সঙ্গীতের সঙ্গে আমার সম্পর্ক নিয়ে সাংবাদিকরা প্রায়শই যে প্রশ্নগুলো করেন সেগুলোর উত্তর দেয়ার অবকাশ এখানে আছে। উত্তরগুলো সব সময়ই সত্য: সাহিত্যের চেয়ে সঙ্গীতই আমার বেশি প্রিয়, এতটাই প্রিয় যে সুগভীর সঙ্গীত শোনার সময় লিখে উঠতে পারি না কারণ লেখার চেয়ে গানের প্রতিই মনোযোগ চলে যায় বেশি। তাছাড়া আমি কখনোই খুব বেশি ব্যাখ্যা করিনি এই বিষয়টি, কারণ আমি মনে করি আমার সাঙ্গীতিক বৃত্তি আমার ব্যক্তিগত জীবনের ভীষণ অন্তরঙ্গ একটি অংশ। এ কারণে আমার একেবারে অন্তরঙ্গ বন্ধুদের সঙ্গে একান্তে সঙ্গীত ছাড়া অন্য এমন কিছু নেই যা নিয়ে কথা বলতে আমার ভালো লাগে। এই বন্ধুদের একজন হোমি গার্সিয়া আসকোত কিছুদিন আগে সুগভীর সঙ্গীতানুরাগের অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি বই বের করেছে যেখানে কোন এক সময় আমার কাছ থেকে শোনা একটা বাক্য অন্তর্ভুক্ত করেছে–’গান নিয়ে আলাপ করাটাই হচ্ছে গানের চেয়ে একমাত্র উত্তম জিনিস।’ এটাকে এখনও সত্য বলে বিশ্বাস করি।

অদ্ভুত ব্যাপার হলো যখন কেউ বলে যে সে সঙ্গীত ভালোবাসে তখন বিশুদ্ধ মানসিক আলস্যের কারণে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতকেই সে বুঝিয়ে থাকে। একে আবার পরিশীলিতও বলা হয়, কিন্তু সমস্যার সমাধান তাতে হয় না। আমি মনে করি জনপ্রিয় সঙ্গীতও পরিশীলিত। যদিও তা ভিন্ন এক সংস্কৃতি। একেবারে বাণিজ্যিক সঙ্গীত যে সব সময়ই খুব বাজে তা কিন্তু নয়, যেমনটা বুদ্ধিজীবীরা বলে থাকেন। মোৎসার্ট বর্গের সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত না-হলেও এদেরও পরিশীলিত গান হিসাবে চিহ্নিত হওয়ার অধিকার রয়েছে। গানের চিরকালীন সব ওস্তাদই জানেন যে তাদের উদ্দীপনার সবচেয়ে সমৃদ্ধ উৎস হচ্ছে জনপ্রিয় সঙ্গীত। বেলা বার্তোক-এর বিশাল ও সুন্দর এক আইকনোগ্রাফির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছবিটিতে দেখা যায় সিলিন্ডার-ধরনের এক টেপরেকর্ডারে এক চাষী মেয়ের ঠোঁট-নিসৃত গান রেকর্ড করা হচ্ছে। এডিসনের আবিষ্কৃত ঐ বিশেষ প্রথম টেপ-রেকর্ডারেই মারিয়া দে কর্দোরিতোর সবচেয়ে মূল্যবান পঙক্তিগুলো ইতিহাসের জন্য রেকর্ডেড হয়ে আছে।

পুরো ব্যাপারটাকে আমি একবারে সাধারণভাবে দেখি: সবধরনের ধ্বনিই সঙ্গীত আর ভালো কি মন্দ সেটা প্রতিষ্ঠা করার ব্যাপারটা আসে পরে। বইয়ের চেয়ে ডিস্কই আমার বেশি, কিন্তু প্রচুর বন্ধুবান্ধব, বিশেষ করে সব বুদ্ধিজীবীরা বিস্মিত হয়ে যান যখন দেখেন যে বর্নণানুক্রমিক বিন্যাসের তালিকাটি ভিভাল্দি (Vivaldi)কে দিয়েই শেষ হয়ে যায়নি। গভীর বিস্ময়ের সঙ্গে তারা লক্ষ্য করেন যে এর পরেই রয়েছে ক্যারিবিয় সঙ্গীতের এক সংগ্রহ, ব্যতিক্রমহীনভাবেই যেটার প্রতি আমার আগ্রহ সবচেয়ে বেশি।

রাফায়েল এর্নান্দেস এবং ত্রিও মাতামোরোসের একেবারে ঐতিহাসিক গানগুলো থেকে শুরু করে পুয়ের্তোরিকোর প্লেনাস, পানামার তাম্বোরিতো, বেনেসুয়েলার মার্গারিতা দ্বীপের গ্রামীন সঙ্গীত কিংবা, সান্তো দোমিংগোর মেরেংগে। আর অবশ্যই, আমার জীবন এবং বইগুলোর সঙ্গে যার সম্পর্ক আরও গভীর তা হলো কোলোম্বিয়ার ক্যারিবিয় উপকূলের কান্তোস বাইয়েনাতো, যেগুলো নিয়ে আলাদাভাবে কোন একদিন কথা বলা দরকার। হামাইকা (Jamaica) এবং মার্তিনিকার রয়েছে গানের বিশাল ধারা। দানিয়েল সান্তোসের কণ্ঠে কিছু গান ছড়িয়ে পড়েছিলো চারিদিকে, বহু বছর আগে ওগুলো বেশ জনপ্রিয় ছিলো। প্রায় কেউই জানতো না যে সেসব গান ক্রেওল ভাষায় কুরাসাও-এর লেখা। বলা উচিত যে চোখ-ধাঁধানো এই অঞ্চলে সবচেয়ে সুন্দর যে-গানটি শুনেছিলাম সেটা ছিলো পানামার সান ব্লাস দ্বীপপুঞ্জে নয় বছর আগে আদিবাসী এক মেয়ের কণ্ঠে। জীবনে এত সুন্দর গান আর কখনোই শুনিনি। মেয়েটার কণ্ঠে ছিলো আদিম মাধুর্য; গাইতে গাইতে বাজাচ্ছিলো মারাকা ( ঝুমঝুমির মতো এক ধরনের বাদ্যযন্ত্র) আর দোলনায়(Hamaca) কয়েক মাসের এক ঘুমন্ত শিশুর পাশে বসে দোল খাচ্ছিলো। গানের যাদুতে আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো ভেসে যাছিলাম। সঙ্গে কোন টেপ-রেকর্ডার না থাকায় ভীষণ মন খারাপ হয়েছিলো। কোন বাকচাতুরীর ভনিতা ছাড়াই আমাদের স্থাণীয় গাইড বলেনি যে ওটা ছিলো আদিবাসীদের দোলনা-গান্। আমি এতটাই অভিভূত হয়েছিলাম যে পরের দিন জেনারেল ওমার তররিহোসকে বললাম আমাকে যাতে একটা রেকর্ডার নিয়ে ওখানে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়। কিন্তু আমাকে সে বিরল ও কঠিন এক সাধারণজ্ঞান দিয়ে নিরুৎসাহিত করলো এ ব্যাপারে। ’ওখানে, আর যেওনা’, বললো সে, ‘এ ধরনের ব্যাপার জীবনে কেবল একবারই ঘটে।’ সত্যিই যাইনি, কিন্তু ঐ গানটি যে আর কখনোই সত্যি শুনতে পাবো না–এটা আমার জীবনে অসম্ভব বেদনাদায়ক একটা ব্যাপার।
nelson-ned.jpg
ক্যারিবিয় অঞ্চলের যে কোন জায়গারই দুষ্প্রাপ্য বেশ কিছু সংস্করণ আমার কাছে আছে। এগুলো এমন জায়গায় পেয়েছি যার কথা কেউ কল্পনাও করতে পারবে না। যেমন নিউ ইয়র্কের ১৪ নং সড়কের লাতিন ডিস্কের মার্কেটে। তারপর অবশ্যই রয়েছে সালসা গানের ডিস্ক যা নতুন কিছু নয়, বরং এ হচ্ছে কুবার ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীতের নির্বাসিত এবং অভিজাত এক ধারাবাহিকতা। ক্যারিবিয় সঙ্গীতের জন্য আমার আবেগটা যে বেশ সংগতিপূর্ন তা প্রমাণ করাটা আমার জন্য আনন্দের। কয়েক বছর আগে বার্সেলোনার এক ভদ্রলোকের কাছ থেকে একটা টেলিগ্রাম পেয়েছিলাম– তার স্মৃতিকথা লেখার জন্য আমার সহযোগিতা চাইলেন। তিনি ‘এল ইন কিয়েতো আনাকোবেরো’–এই ছদ্মনামে অটোগ্রাফ দিতেন। তার ঐ ছদ্মনাম গোটা ক্যারিবিয় অঞ্চলে ওস্তাদ দানিয়েল সান্তাস-এর নামে পরিচিত। আরও পরে, আমার কিছু গল্প গান হিসাবে গাইতে চায়–এটা জানিয়ে আমাকে রুবেন ব্লাদেস নিউ ইয়র্ক থেকে ফোন করেছিলো। আমি আনন্দের সঙ্গেই জানার কৌতূহল নিয়ে বললাম বেশ দেখা যাক এই অভিযান থেকে কী বেরিয়ে আসে। কোন রকম আয়রনি ছাড়াই বলি; পেদ্রো নাবাহা সম্পর্কে একটা অসাধারণ সুন্দর ইতিহাস লিখতে পারলে আমি ভীষণ খুশি হতাম। সর্বশেষ, সাম্প্রতিক যে ফোনকলটি আমার মেহিকোর বাসায় পেয়েছি তা ছিলো গানের জগতের বিশাল ব্যক্তিত্ব নেলসন নেদ-এর। বছর কয়েক আগে রসবোধহীন কিছু লেখকের বন্ধুত্ব হারিয়েছি এক সাক্ষাৎকারে আমার সত্যিকারের অনুভূতি প্রকাশের কারণে । বলেছিলাম স্পানঞল ভাষায় সত্যিকারের বড় কবিদের একজন আমার বন্ধু আর্মান্দো মানসানেরো।
manzanero.gif
বোলেরো বাদ দিয়ে গান নিয়ে কথা বলা মানে গান নিয়ে কিছুই না বলা। তবে ভিন্ন ধরনের খসড়ার জন্য এটা একটা উদ্দীপনা এবং অন্তহীন প্রসঙ্গ বটে। বোলেরোর ক্ষেত্রে কোলোম্বিয়ার যে উচ্চতা তার সঙ্গে কেবল চিলেই একমাত্র প্রতিযোগিতা করতে পারে। সব ধরনের ধারার মধ্যে দিয়েই সে বিশ্বস্ততা বজায় রেখেছে আবেগকে অক্ষুণ্ন রেখেই। এই কারেণ বোলেরোর প্রত্যাবর্তনের খবরে আমাদের আনন্দিত হওয়ার উচিত। ছেলেমেয়েরা এখন বাবামার কাছে এই নাচ শেখার জন্য বায়না ধরছে যাতে শনিবারের স্ফূর্তির উৎসবে অন্যদের চেয়ে নিজেকে খাটো বোধ না করে। আবার যেন অন্য কালের পুরোরো স্বর হৃদয়ে এসে এই সময়ে তোনঞা লা নেগ্রার অবিস্মরণীয় স্মৃতিতে উপচে ওঠে। তাছাড়া নিঃসন্দেহে আমার উত্তর ছিলো সুচিন্তিত এবং আন্তরিক: নিঃসঙ্গ কোন দ্বীপে যে-গানের ডিস্ক আমি নিয়ে যাবো তাহলো কেবল যোহান সেবাস্তিয়ান বাখ-এর এক নাম্বার চেল্লো স্যুটটা।

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (4) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন shams Hoque — এপ্রিল ২০, ২০১৪ @ ১:২২ অপরাহ্ন

      গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস-এর চলে যাবার পর গোটা লাতিন আমেরিকায় আবেগের ঝড় যাচ্ছে। ধ্রপদী সাহিত্যের অন্যতম এই মায়েস্ত্র লাতিন আমেরিকার বাইরেও বহুল-পঠিত এবং বহুল-আলোচিত সেকথা তাঁর “একশ’ বছরের নির্জনতা” বইটির অনুবাদ এবং বিক্রয় সংখ্যাই প্রমাণ করে। বাংলাদেশেও তাঁর পাঠক সংখ্যা কম হবার কথা নয় । এই লেখাটি এখনও পর্যন্ত মার্কেস-এর কোনো গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়নি বলে জানতে পারছি প্রাবন্ধিক-এর প্রাক-কথনে। দুর্লভ এ লেখাটি স্প্যানিশ থেকে
      বিশিষ্ট কবি ও প্রাবন্ধিক রাজু আলাউদ্দিন আমাদের উপহার দিয়েছেন তাঁর প্রাঞ্জল অনুবাদে। সেজন্য তাঁকে আন্তরিক অভিনন্দন। খুব শিগগিরই মার্কেসকে নিয়ে আরও লেখা আসবে এই পাতায়- এই ভরসায় আপাততঃ এখানেই। ধন্যবাদ প্রাবন্ধিক রাজু আলাউদ্দিনকে সেই সাথে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Biren Mukherjee — এপ্রিল ২০, ২০১৪ @ ৩:১৫ অপরাহ্ন

      কবি ও প্রাবন্ধিক রাজু আলাউদ্দিন ভাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি মার্কেজের এই লেখাটি পাঠের সুযোগ করে দেয়ার জন্য।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন onindo oli — এপ্রিল ২০, ২০১৪ @ ৯:০৫ অপরাহ্ন

      এক আল্লাহ
      এক রসুল
      এক কিতাব
      থেকে বাঙ্গালি মোসলমান বেরিয়ে গা. গা. মার্কেস পরছে।
      খুবই আনন্দের বিষয় !

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন minar monsur — এপ্রিল ২৩, ২০১৪ @ ৫:১০ অপরাহ্ন

      সাবলীল ও সুখপাঠ্য। ধন্যবাদ রাজু আলাউদ্দিন…মিনার মনসুর

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com