মাহবুব আজীজের একগুচ্ছ কবিতা

মাহবুব আজীজ | ১৮ এপ্রিল ২০১৪ ৬:৪৮ অপরাহ্ন

ছোট্ট একটি মেলা

ছোট্ট একটি মেলা-
ক্ষীণকটি রাস্তার দু’পাশে ইতস্তত: ছড়ানো দোকান-
আলোর সারি।
হাল্কা হাওয়ায় চুল ওড়ে-
স্মিত চোখে দেখি
উচ্ছল মানুষের ছোটাছুটি।
মায়ের হাত ধরে শিশুটির ছোটা…
-লাল জুতো কিনবো মা! লাল জুতো!
-কি নির্ভার আনন্দে ধরে আছে মায়ের হাত।
শিশুর প্রতি ঈর্ষা জাগে মনে;
-আহা, লাল জুতো! আহা, মা!

দুটি শিশু : ভাই-বোন হতে পারে।
একজন তাড়া করছে আরেকজনকে;
তারা এদিক ওদিক দিচ্ছে ভো দৌড়।
-আমি কি যোগ দেব শিশুদের সাথে?

লাজুক বউ, স্বামীর হাত ধরে
এটা ওটা কেনে সংসারের।
আহা, বউ! অনঙ্গ বউ!
ইচ্ছে হয় বলি-
‘বড়দেখে কড়াই কেনো একটা বউ।
বেশি করে তেল দিয়ে বেগুণভাজি খাওয়াবে একদিন!’

ইচ্ছে হয় চারপাশের আনন্দে বিস্ময়ে
নিজেকে ছিন্নভিন্ন করে ভাসিয়ে দিই-
হয়ে যাই মেলার একজন!

না বউ, না শিশু, না আনন্দিত চারপাশ
আমি কারও নই।
আমি কেবল দেখতে থাকি-
মেলাভর্তি মানুষ-
অবিরাম কলকল, ছলছল।
najib-tarek.jpg
২.
হঠাৎ চোখ যায়
মেলার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া
একা জলের দিকে।
শান্ত, টলমল জল। ধীর, গহন-মগন।
ইচ্ছে হয় একশো বছরের নিরাশ্রয়ী মুখখানা
জলের গভীরে নিয়ে লুকাই। দিই ডুব পরম পাতালে।

আমার মুখে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে ওঠে।
কি যেন মনে পড়ছে আমার! কি যেন!

চরাচরজুড়ে সেই কথাটি ভেসে আসে আবার-
‘- কে আর কার জন্যে অপেক্ষা করে কবে!’

হঠাৎ দরজায়

হঠাৎ দরজায় পড়ে একটি টোকা-
জন্মান্ধ হাতের শিরা কেঁপে কেঁপে ওঠে-
করোটিতে লাল সূর্য নীল হয়ে ফোটে।
চমকে উঠি, দৌঁড়ে যাই। দেখি-ধোকা!

স্বপ্নবারান্দায় বসে ডাকে হৃৎ পাখি।
এসো, অস্তিত্বে বৈশাখ পাতা হয়ে ঝরো-
তোমার মৃগয়াকে বলো- সরো!
আমি আর কতোকাল একা বসে থাকি।

আমি, নিঃসঙ্গ কফিন, শুয়ে আছি মেঘে।
-আমাকে বৃষ্টিতে ভাসিয়ে ঝরাও।
-আমাকে রৌদ্র বারান্দায় হাঁটাও।
আমারই মতো তুমিও থাকো রাত জেগে।

এসো, অপস্মার-লুকোই মেঘের নীলে।
আবার মিশে যাই ভুলে যাওয়া মিছিলে।।

উঠান

তোমাদের উঠানে জিরোবার একটু জায়গা দেবে?
বস্তুবাদী রোদ, উদ্বাহু দৌড়; দাঁড়াবার অবসর নাই।
অবিশ্বাসীরও দ্বিধা জাগে-এ’সত্য কে মেনে নেবে!
নিক না নিক, সরাসরি স্বীকারোক্তি-ঠাঁই চাই।

আমারতো দিন যায়: দৌঁড়-ক্ষোভ-নির্ঘুম আত্মযুদ্ধ-
উদ্বাহু ছুটে চলা; আরও উর্ধ্বে পতাকা তোলা;
জীবনট্রেনের নিশানা কি? প্রশ্নে সবাই বাকরুদ্ধ।
শুধু ছুটে চলা, কেবলই ছুটে চলা; যেন আত্মভোলা।

রোরুদ্যমান আয়ুক্ষয়ী দৌঁড়-শেষ হয় না এর রেশ;
বুঝবার আগেই- শুরু হয় দৌঁড়; জীবনব্যপী চলে।
মুহুর্তমাত্র থামা যায় না, থামলেই যেন সব শেষ;
জীবনভর একটাই ভয়-কোন্ সিড়ি থেকে যে পা টলে!

তোমাদের উঠানে জিরোবার একটু জায়গা দেবে?
একটু থেমে আকাশের রঙ চেটে খাব; সঙ্গী হবে?


পাখি স্বভাব

পাখির মতো উড়ে উড়ে
ঘুরে ঘুরে এ মানুষ ও মানুষে বসা।
– মানুষের এখন এই পাখি স্বভাব।

দ্রুত পুরনো হয় একজন আরেকজনের কাছে।
হয় পরিত্যক্ত; ওঠে নাম বাতিলের খাতায়।
অচিরে সব রঙ ম্লান হয়; ধুসর থেকে ধুসরতর।
আরেক মানুষ খোঁজে সে-
অন্য এক ডালে বসা আরেক রঙের পাখি।

কত না পুলক নিয়ে একজন
ধরা দেয় অন্য ডালে-বসা আরেক পাখির নিকট।
পাখিদু’টি পরস্পরের কাছে আসে। আসতে থাকে।
ডাকে। ডাকতে থাকে। ঠোঁটে ঠোঁট রেখে তারা কথা কয়।
– চিরায়ত ক্রন্দন নতুন হয়ে
দেখা দেয় আরবার। স্মিত মধুরহাস্যে।

সব সাঙ্গ হলে পর
পাখি আবার এ ডাল ও ডাল ঘুরতে থাকে।
ঘুরতেই থাকে;
পাখির পাখি খোঁজা আর শেষ হয় না।।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (6) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শিমুল সালাহ্উদ্দিন — এপ্রিল ১৮, ২০১৪ @ ১০:৪৭ অপরাহ্ন

      এই প্রথম একসঙ্গে কবি মাহবুব আজীজের এতগুলো কবিতা পড়ার সুযোগ করে দেবার জন্য আর্টসকে ধন্যবাদ। কবিতাগুলির দৃশ্যকল্প ও গল্পের ছল, নিখুঁত ছন্দের কারবার আমাকে দারুণ আনন্দ দিয়েছে। মেলাভর্তি মানুষের কলকল ছলছল, কিংবা ‘চরাচরজুড়ে সেই কথাটি ভেসে আসে আবার- ‘- কে আর কার জন্যে অপেক্ষা করে কবে!’’র মতো চিরায়ত অনুভূতিগুলি দাগ কাটবে যে কারও মনে। সচেতন পাঠকের মনে আরো বেশি করে। এসো অপস্মার লুকোই মেঘের নীলে, দারুণ। দারুণ পাখিদের পাখি খোঁজা। কবির আরো কবিতা পড়তে চাই।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন saifullah dulal — এপ্রিল ১৯, ২০১৪ @ ১:৫৩ পূর্বাহ্ন

      বাহ! মন ছুঁয়ে গেলো।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Junan Nashit — এপ্রিল ১৯, ২০১৪ @ ৩:১৫ অপরাহ্ন

      কবি, বিস্মিত হলাম।

      না বউ, না শিশু, না আনন্দিত চারপাশ
      আমি কারও নই।
      আমি কেবল দেখতে থাকি-
      মেলাভর্তি মানুষ-
      অবিরাম কলকল, ছলছল।…………বাহ্ বাহ্………..
      সবকটি পড়ালাম। ভালো লাগল।
      ধন্যবাদ কবি।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন rashed hassan — এপ্রিল ২১, ২০১৪ @ ২:৪৫ অপরাহ্ন

      just awsm

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শামস আরেফিন — এপ্রিল ২৩, ২০১৪ @ ১১:০০ অপরাহ্ন

      অনেক বেদনা নিয়ে জীবনের সংসার বসবাস আমাদের। কিন্তু কেউ এই বেদনা এত সহজে প্রকাশ করতে পারে না। প্রকাশে সাবলীল আর হৃদয়স্পর্শী প্রয়োগ হতে পারে ‌‌
      ‌[না বউ, না শিশু, না আনন্দিত চারপাশ/ আমি কারও নই। ]
      বা আবিদ আজাদের লেখা ‌[তোমাদের উঠোনে কি বৃষ্টি নামে? রেলগাড়ি থামে] এর পর এই প্রথম উঠোনে জিরোবার যে কাতরতা তা ভালো লাগল। যেমন [তোমাদের উঠানে জিরোবার একটু জায়গা দেবে?/একটু থেমে আকাশের রঙ চেটে খাব; সঙ্গী হবে?] এ তো পুরো বাংলাদেশে থেকে র‌্যাবোর স্বর এর প্রতিউচ্চারণ। অসাধারণ কবি, অসাধারণ। তারপর মানুষের যে পাখির মতো চরিত্র; জীবনে প্রেমিকার চাতুরতার শিকার মানুষ এই বাস্তবতা বুঝে। আর যদি কবি এই পংক্তি লেখেন[পাখির মতো উড়ে উড়ে/ ঘুরে ঘুরে এ মানুষ ও মানুষে বসা।/- মানুষের এখন এই পাখি স্বভাব।] তবে তো বলতেই হয় কবির নিজের জীবনে এই রকম অভিজ্ঞতা ছাড়া কী করে এত সুন্দর পংক্তি তিনি রচনা করতে পারেন? ধন্যবাদ কবির এই অভিজ্ঞতা অর্জনের অংশীদারদের। নয়তো আমরা এত সুন্দর পংক্তি থেকে বঞ্চিত হতাম। আজকে ভাই প্রমাণ করে দিলেন- কবিতা কাকে বলে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সুহিতা সুলতানা — মে ২০, ২০১৪ @ ২:১০ অপরাহ্ন

      জীবনের গভীরতম আবেগ ,চিন্তন আর অস্তিত্বের সমূহসংকট একজন কবিকে বিপর্যস্ত করে তোলে ;তখন অস্তিত্ব চেতনার বিস্তার নানাভাবে তার কবিতায় বাসা বাঁধে । আমি যখন মাহবুব আজীজের কবিতা পাঠ করছিলাম ঠিক এরকম ভাবনা আমার ভেতরে ক্রমশ প্রভাব বিস্তার করতে থাকে । বক্তব্য ,ভাষা ও সৌন্দর্যের প্রতি তিনি যত্নশীল । আত্মানুসন্ধান ও জীবনাভিজ্ঞতা বহুরৈখিকভাবে মাহবুব আজীজের কবিতায় তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে । একজন কবি কীভাবে তার চারপাশ এবং জীবনকে দেখেন ‘পাখি স্বভাব’ কবিতাটির ভেতরে গভীর অনুভূতির ব্যঞ্জনা মূর্ত হয়ে উঠেছে ।এই কবিতার ভেতর স্বপ্ন ও দু:স্বপ্নের যাত্রাপথ নির্মীত হয়েছে । যা একজন কবির ভাবনার সক্রিয়তাকে পাঠকের ভাবনাকেও সমানভাবে আন্দোলিত করে । মননের সংযোগসূত্রিতা তার কবিতাকে পৌছে দিয় নতুন এক কাব্যভুবনে ।’হঠাৎ দরোজায়’ ও’ উঠান’ কবিতা দু’টিও বক্তব্যধর্মী ও সুপাঠ্য । ধন্যবাদ মাহবুব আজীজ আপনাকে ।
      কবিতা একটি বিশেষ ধরণের শিল্প মাধ্যম । কবিতার নির্মাণকৌশল ও কবিতার উপকরণ আমরা খুঁজে পেতে চেষ্টা করি । নাগরিকযন্ত্রণা,নি:সংগতা, দ্রোহ, নৈরাশ্য ও ক্লান্তি মাহবুব আজীজের কবিতায় মূর্ত হয়ে উঠেছে । অস্তিত্বময় সত্যের উন্মোচন ও উপলদ্ধিজাত ভাবনার বিস্তার তার কবিতায় লক্ষ্যনীয় । তার কবিতা সুপাঠ্য ও নতুন ভাবনার উদ্রেক করে ।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com